পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে মিডিয়ার যতটা আগ্রহ, চীন অধিকৃত কাশ্মীর তথা ‘আকসাই চীন’ নিয়ে এরা ততটাই নীরব। জানিনা কোন কারনে কোন মন্ত্রবলে। তবুও এটা আশ্চর্য করেনা, কারন বিগত ছ’বছরে ভারতীয় মিডিয়া নির্লজ্জতার সর্বোচ্চ সীমা পার করে গেছে; কিন্তু যেটা আশ্চর্য করছে সেটা হচ্ছে নেপালের বর্তমান রূপ, রীতিমত আগবাড়িয়ে তারা ভারতের মত দেশকে হুমকি দিচ্ছে। যারা আমাদের ভারতের চেয়ে আকারে আয়তনে ২১৩৩ গুণ ছোট, অর্থনীতি বা সেনাবাহিনী শক্তি তুলনাতেও আসেনা- তা সে তথ্য দেওয়া বৃথা।
সঙ্ঘ পরিবার, মোদী সরকারের ব্যার্থতা ঢাকতে লাল চীনের সাথে বর্তমান নেপালের বাম সরকারকে এক করে ফেলে, অতি সরলীকরণ এর মাধ্যমে নিজেদের লুকাতে চাইছে। সমস্যার যে বিষয়, তার সময়রেখা আজকে নয়; বরং আজ থেকে ২০০ বছর পিছনে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদের সাথে তৎকালীন ‘কিংডম অফ গোর্খা’র সেনাদের লড়াই হয়, যাকে ‘এংলো-নেপালী যুদ্ধ ১৮১৪’ বলা হয় এবং এই যুদ্ধের শেষে ১৮১৫ সালে শেষ নাগাদ ‘সুগৌলির চুক্তি’ সম্পাদিত হয়, যার দ্বারা আজকের নেপাল রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে, যা পশ্চিমে ‘মহাকালী নদী’ বরাবর ও পূর্বে ‘মেচি নদী’ বরাবর। প্রসঙ্গত এই চুক্তি অনুযায়ী নেপালিরা দার্জিলিং ও সিকিম ব্রিটিশদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
সমস্যার সুত্রপাত হয়, পশ্চিম সীমার নির্নায়ক মহাকালী নদী বর্তমান উত্তরাখন্ডের একটা স্থানে এসে দুটো শাখানদীতে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, যে অঞ্চলটার নাম লিপুলেখ ও কালাপানি। এই মহাকালী নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা নামে একটা স্থানে। ব্রিটিশ সার্ভেয়ারেরা ১৮২৭ সালে যে ম্যাপ প্রকাশিত করেছিল নেপালের সীমানার, সেখানে দেখা যাচ্ছে নদীর মোটা যে অংশ সেটাকে তারা ‘অফিশিয়ালি’ মান্যতা দিয়েছিল সীমানা হিসাবে। কিন্তু পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি চীনের সাথে ব্যবসার জন্য একটা গুরুত্বপুর্ন অঞ্চল হিসাবে দেখা দেয়, ফলস্বরূপ ব্রিটিশরা নেপালিদের সাথে আলোচনা না করেই তাদের ম্যাপে সরু নদী ‘পানিখাদ’কে সীমানা করে নতুন ম্যাপ প্রকাশিত করে দেয় ১৮৬০ সালে প্রকাশিত একটা সার্ভে অনুযায়ী।
তৎকালীন দিনে এই অঞ্চলে কেউ বসবাস করতনা, তাই এই অঞ্চলটার কোনো গুরুত্বই ছিলনা নেপালের রাজার কাছে। একে তো দুর্গম এলাকা, দ্বিতীয়ত কেবল ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের- কৈলাসের মানস সরবোরে যাওয়ার এটা একটা সহজ রাস্তা ছিল, নতুবা সিকিম ঘুরে তাদের মানস সরবোরে যেতে হত, তাই ১৮৬০ এর সমসাময়িকালে নেপালি রাজা বিষয়টিকে একপ্রকার উপেক্ষাই করেছিল বলা যেতে পারে, কারন ১৮৫৭ সালের একটি আভ্যন্তরীণ ঘরোয়া বিদ্রোহে তৎকালীন নেপালি রাজা জঙ্গ-বাহাদুর রানা- ব্রিটিশদের সেনা সাহায্যে বিদ্রোহীদের দমন করেছিল, এর পর থেকেই নেপাল কখনও এই অংশকে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ম্যাপে নেপালের অংশ বলে উল্লেখ করেনি। কিন্তু চীনের কুং রাজবংশের প্রকাশিত তৎকালীন ম্যাপে অংশটিকে নেপালের বলেই উল্লেখিত রয়েছে, যেমনটা ১৮২৭ সালে ব্রিটিশদের ম্যাপে ছিল।
এই ধারাবাহিকতা সেই থেকে চলে আসছে, ব্রিটিশরা এর পর প্রায় ১০০ বছর রাজ ক্ষমতায় ছিল, কোন সমস্যা হয়নি; স্বাধীন ভারতেও ১৯৯০ সালে একবারই সামান্য উচ্চবাচ্য শোনা গিয়েছিল, যখন নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। এছাড়া দীর্ঘ কংগ্রেসি শাসনে নেপাল একপ্রকার ভারতের স্বাধীন করদ রাজ্য হিসাবেই ছিল বলা যেতে পারে। স্বাধীন ভারতে উক্ত ‘লিপুলেখ-কালাপানি-লিম্পিয়াধুরা’ অঞ্চলটি উত্তরাখণ্ডের পিথরগড় জেলার অধীনে রয়েছে, বর্তমানে অঞ্চলটি ভারতের দিক থেকে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।
এদিকে নেপালিরা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যেমন চাকরি করে রোজগার করে তেমনই লক্ষ লক্ষ নেপালি ভারতে এসে বিনা পাসপোর্ট বিনা ভিসাতে ব্যবসা, বাণিজ্য, চাকরি সবই করছে একজন আম ভারতীয়ের মতই। তারা আমাদেরই খেয়ে আমাদেরই লাল চোখ দেখাচ্ছে।
বর্তমান ভারতের অকর্মন্য ও চূড়ান্ত ব্যার্থ রাষ্ট্রনেতাদের কল্যাণে নেপালের মত দেশও ভারতের সাথে সংঘাতের যেতে রাজি হয়ে যাচ্ছে, যা এক চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ভুটান ছাড়া এই মুহুর্তে প্রায় প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের সাথেই ভারতের সম্পর্ক তলানিতে।
মোদী সরকার এক্ষেত্রেও স্বভাবগত ভাবেই নেহেরুর উপরে দোষ চাপিয়ে পালাবার বাঙ্কার খুঁড়তে ব্যস্ত হয়ে গেছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন