মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০

ভারতীয় যুদ্ধের সহিংস ইতিহাস ও মুসলমান- শুরুর কথা



আজকের ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘দেশপ্রেমিক’ ধারনাটা হলঃ আরবজাত মুসলমানেরা আফগান, পামির অঞ্চল, কখনও মোগল রূপে বা কখনও পারস্য থেকে এসে ভারত আক্রমণ করেছিল, অতএব এই জাতিটাই একমাত্র বর্বর, রক্তপিপাসু, ক্ষমতালোভী, নিকৃষ্ট তথা জিহাদি জাতি। মুসলমানেরা ভারত আক্রমণ করার পুর্বে এই উপমহাদেশে পবিত্র ‘রামায়ণ ও মহাভারতের মত’ ধর্মযুদ্ধ থাকলেও, অধর্মজাত যুদ্ধ বিষয়টা মোটেই ছিলনা, সেটা সম্রাট অশোক করলেও নয়। সকলে নমস্কার, প্রণাম, আলিঙ্গন, চুম্মাচাটি করত আর রেগে গেলে বড়জোর শাপশাপন্ত করে ছেড়ে দিত, বাকিটা ঈশ্বরের কাজ ছিল- ভাবখানা এমনই বর্তমান ভারতীয় ইতিহাসে। এটা যে শুধু বিজেপির দান তা নয়, রাজীব গান্ধী ও তৎপরবর্তী কংগ্রেস সরকার থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদী সরকার- সকলেই সমান অবদান রেখেছে। কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ব তাস খেলত, বিজেপি সেটাই ন্যাংটা উদোম করে দিয়েছে, এটাই যা ফারাক।
মূলত বাবরি মসজিদ ভাঙা ও মুম্বই দাঙ্গার পরবর্তী পর্যায়ে- RSS ও তার রাজ্যওয়ারি প্রকাশ্য বা গুপ্ত রাজনৈতিক সহযোগী, অসাম্প্রদায়িকতার ভেকধারী কিছু আঞ্চলিক স্বার্থবাদী দল গুলো মিলে এই RSS এর ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে সমাজের মাঝে ‘মহীরুহে পরিণত করে দিয়েছে’ নিরবিচ্ছিন্নভাবে সার ও জল সিঞ্চন করে। এদেশে খারাপ কিছু মানেই সেটা মুসলমান জনগোষ্ঠী দ্বারা সম্পৃক্ত, অথবা কমিউনিস্ট; বাকিরা ভাল- কিন্তু ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ’- এমন একটা ইউটোপিও ধারণা রেডিও, টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ২৪ ঘন্টার খবরের চ্যানেল, বিভিন্ন টক-শো, সংবাদপত্র, সমসাময়িক সাহিত্য ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সমাজের মাঝে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে বুনে দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া অন্তত তিনটে প্রজন্ম ঠিক সেটাই শিখেছে যেমনটা ‘RSS’ এর এ্যাজেন্ডা ছিল, কে ভাল তা নিয়ে গবেষণা থাকুক বা না থাকুক- কিন্তু ‘হিংস্র ও খারাপ’ কিছু মানেই তা মুসলমান- এটা প্রতিষ্ঠিত আজকে এই ২০২০ সালে।
যদিও আজকে পর্যন্ত পাকিস্তান তথা ISI এর চর হিসাবে ধরা পরা প্রায় প্রতিটি ব্যাক্তিই- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিজেপি বা RSS মতাদর্শের সাথে যুক্ত, এবং তারা কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়।
প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে রচিত প্রচুর বই রয়েছে বাজারে, সে তুলনায় তৎকালীন রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা মূলক বই খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো হয়েছিল সেগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে অজানা কারনে। এমনই একটা বই এর নাম ‘From Hydaspes to Kargil: A History of Warfare in India from 326 BC to AD 1999’, লেখক কৌশিক বসু। এখানে সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের ঘটনার তিনি যথোপোযুক্ত বর্ণনা করেছেন নথি সহযোগে। এমনই আরেকটা বই ‘Ancient Indian Warfare: With Special Reference to the Vedic Period’ এটার লেখক- সর্ব দমন সিং। এছাড়া বিখ্যাত তামিল ঐতিহাসিক ‘ভিষ্মাপেত রামচন্দ্রনের’ লেখা ‘War in Ancient India’ বইটি, যা একটি দুর্মুল্য নথি- এগুলো কখনও কোনো স্কুলের পাঠ্যসূচিতে আসবেনা, যদিও তিন লেখকের কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়, তবুও। বই তিনটিতে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় যুদ্ধের মতাদর্শগত বিষয়গুলো, নানান ধর্মীয় ও গোষ্ঠীজাত পক্ষগুলোর পরিচয় জ্ঞাপনা, হরেক দিশি বিদেশী ঐতিহাসিকের দলিল সহ বর্ণনামূলক ‘সহিংসতার’ ঐতিহ্যগুলো বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তৃত ধারণার জন্ম দেয় পাঠকের মননে, যা দুর্দান্তভাবে মৌলিক বিষয়।
বিদেশী লেখকদের মধ্যে, Laurie L. Patton এর লেখা ‘Telling Stories about Harm: An Overview of Early Indian Narratives’ ও ‘John R. Hinnells and Richard King’ লেখকদ্বয় সম্পাদিত ‘Religion and Violence in South Asia: Theory and Practice’ এই বই দুটির মাঝে শুধু ভারতের ইতিহাসই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসকে নতুন ভাবে জানা ও বোঝার সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, এই দুটো বই গুগুলে PDF হিসাবে উপলব্ধ।
এর পাশাপাশি গোবিন্দ নিহালানীর ‘তমশ’ জাতীয় সিনেমা বলিউডের সংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে, সেখানে সানি দেওলের টিউবওয়েলের পাইপ তোলা ‘গদরঃ এর প্রেম কথা’ কিম্বা ইজ্রায়েলের জাতীয় সংগীত ‘Hatikvah’ এর সুর চুরি করা (মেরা মুল্ক মেরা দেশ মেরা ইয়ে বতন) ‘দিলজ্বলের’ মত সিনেমাগুলো বিকশিত হয়েছে, শরীর সর্বস্ব সিনেমা গুলোর সাথে সাথে। ওম পুরী, অমরিশ পুরী, কুলভুষণ খারবান্দা, স্মিতা পাতিল, সাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, সদাশিব অমরাপুরকার, নাশিরুদ্দিন শাহ্ প্রমুখদের মত বলিষ্ঠ অভিনেতাদের দ্বারা চিত্রায়িত সমান্তরাল সিনেমা সংস্কৃতি- যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করত, সেগুলো সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বলিউডের এই বিবর্তন নিয়ে আগামীতে একটা প্রবন্ধ নিয়ে আসা যেতেই পারে।
না পড়লে জানা যায়না, না জানলে ভ্রম বা মিথ্যার প্রাচীরকে অতিক্রম করবেন কীভাবে? আজকের ভারতে RSS এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন- বিজেপি, শিবসেনা সহ বিজেপির একদা সহযোগী পশ্চিমবঙ্গের তৃনমূল কংগ্রেস, গোর্খা মুক্তি মোর্চা, বিহারের নীতিশ কুমার, রামবিলাশ পাসোয়ান, মহারাষ্ট্র গোমন্তক পার্টি, তেলেঙ্গনার চন্দ্রশেখর রাও, মেঘালয়ের সাংমা, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু, কর্ণাটকের দেবেগৌড়ার দল, কাশ্মীরের মেহবুবা মুফতি, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, আসাম গণ পরিষদ, ঝাড়খণ্ডে শিবু সোরেন, ওড়িশার নবীন পটনায়ক, তামিলনাড়ুর করুণানিধির DMK, জয়ললিতার AIADMK, পাঞ্জাবের ধর্মী রাজনৈতিক দল ‘আকালি দল’, হরিয়ানা ওমপ্রকাশ চৌথালার দল, এছাড়া উত্তরপুর্বাঞ্চলের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এর মত সহযোগী বহুরূপী দলগুলির মূল শত্রুই হল- কমিউনিস্ট আর মুসলমানেরা; কেউ বিষ খাইয়ে মারছে তো কেউ মধু খাইয়ে। উদ্দেশ্য একটাই- নিকেশ, সেটা যেভাবেই হোক। বাকিদের কিনে ফেলা যায় অতি সহজে।
স্বঘোষিত বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির ‘ধারক ও বাহকের’ দলেরা আপনার মাঝে ‘হিটলার, মুসলিনি, গোয়েরিং’ এর মতাদর্শকে ‘গোয়েবলসের’ ফর্মুলা অনুযায়ী আপনার মাঝে কবেই ঢুকিয়ে দিয়েছে তা আপনি টেরই পাননি। ভাবছেন বুঝি আপনি প্রকৃত দেশভক্ত, ওদিকে দেশের সবকিছু বিকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।
তাই প্রতিটি শুভচিন্তক ভারতীয় নাগরিক- যাদের মনেপ্রাণে ও বিশ্বাসে ঢুকে গেছে যে, ‘শুধুমাত্র মুসলমানেরাই বর্বর, আর কমিউনিস্টরা বিদেশী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ’ পাশাপাশি বাকিরা মুনিঋষি পর্যায়ের; তাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটবে এই বই গুলো পড়লে। এগুলো পড়ার পর বিচার করুন, তার পরেও ঘৃণা বিদ্বেষ থাকলে আরো পোক্তভাবে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ করুন। বাকিরাও পড়ুন, কারন আমাদের কীভাবে ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ভুলভাল, অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা বিষয়কে পরিবেশনা করা হচ্ছে ইতিহাসের নামে, সেটাও জানতে পারবেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ও বাপ ঠাকুর্দা চোদ্দপুরুষকে খুঁজুন গবেষণালব্ধ নথি দ্বারা; হিটলারি বিজ্ঞাপনের দেশপ্রেম দিয়ে কখনই যা আপনি জানতে পারবেননা, বা আপনাকে জানতে দেওয়া হবেনা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...