রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

গালওয়াল কি ও কেন?



লাদাখের যে অঞ্চলে বর্তমানে ভারত চীন দ্বন্দ্ব চলছে সেই অঞ্চলটির নাম আমরা সকলেই জেনে গেছি, ‘গালওয়ান উপত্যকা’; কিন্তু এটা কি জানি- কেন এই অঞ্চলের নাম গালওয়ান?
এটি বিরল উদাহরণগুলির মধ্যে একটি, যেখানে একটি বিশিষ্ট ভৌগলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছিল তথাকথিত ‘নেটিভ’ এক্সপ্লোরারের নামে।
সমুদ্র পৃষ্ঠের ৫০০০ থেকে ৭০০০ মিটার উচ্চতার হিমালয়ে, যেখানে স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ৩০ ডিগ্রী, এমন সব অগম্য দুর্গম স্থানে, পাহাড়ি চিতার মতো অনায়াস পথ খুঁজে সভ্যতার সামনে নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে গেছেন সারাজীবন ধরে যে মানুষটি, তার নাম- গোলাম রসূল গালওয়ান।
‘লেহ’ থেকে লাদাখের পথ অন্বেষণকারী প্রথম ব্যক্তির নাম ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’। আয়ারল্যাণ্ডের অভিজাত কাউন্টি ডানমোরের সপ্তম আর্ল ‘ডুনমোর মুর’ সাহেব এলেন হিমালয় অভিযানে, সেটা তখন ১৮৯২ সাল; এই আইরিস-ব্রিটিশ অভিযাত্রী দলটি ‘চ্যাং চেনমো’ উপত্যকার উত্তর দিকের অঞ্চল অন্বেষণ করছিল। একদিকে রাশিয়ান অভিযাত্রীদের সাথে তিব্বত দখলের লড়াই- অন্যদিকে ব্রিটিশদের আগের প্রতিবারের ব্যর্থ অভিযানের ইতিহাস বেয়ে, একসময়ে মুর সাহেবরাও ভ্রমবশত পূর্ব দিকে এক অজানা নদী উপত্যকায় এসে পড়েছিল, যেখান থেকে সামনে দুর্ভেদ্য খাড়াই হিমালয়ের প্রাচীর ছাড়া আর কিছুই ছিলনা।
দুর্গম অঞ্চলে পথ হারিয়ে যখন প্রায় মৃত্যুমুখে অবতীর্ণ হতে বসেছে অভিযাত্রী দলটি, ঠিক তখনই একটি ১৪ বছরের বালক কুলি, গোটা দলটাকে একটা এমন পথে দিয়ে বের করে নিয়ে আসে, যা ওই অভিযানের সবচেয়ে সহজলভ্য পথ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে দেয়।
কোনও ধরনের পুর্ব অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া, আশ্চর্য অনুমান ক্ষমতা, সাহস, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, আর কঠিন পরিস্থিতিতে স্নায়ুর উপরে পূর্ন নিয়ন্ত্রণ রেখে, সাথে হিমালয়কে অনুসন্ধানের এক অবিশ্বাস্য নেশার দৌলতে সে যাত্রায় গোটা অভিযাত্রি দলটা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। আজও ওই অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য এই পথের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ কোনো উত্তরণের পথ পাওয়া যায়নি।
জীবন বাঁচানোর কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে যান আর্ল ‘ডুনমোর মারে’, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেই বালকের কাছে জানতে চান- ‘তোমার কী পুরস্কার চাই বলো’! তখন বালক গোলাম রসূল বলেন- ‘যে পাহাড়ী নদীটি আছে এটি আমার উপজাতির নামে রাখা হোক ‘গালওয়ান নাল্লা’। নূন্যতম কালক্ষেপ না করে অভিযাত্রী দলটি তৎকালীন ব্রিটিশ বাহাদুরকে যে নথি পাঠায় সেখানে প্রায়োরিটি হিসাবে নদীর নাম ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’ এই পুরো নামটাই উল্লেখ করে পাঠান।
সেইমতো পরবর্তী ব্রিটিশ মানচিত্র প্রকাশিত হলে দেখা যায়, ওই অঞ্চলের ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ যে নদী, সরকারি ভাবে তার নাম রাখা হয়েছে ‘গালওয়ান নদী’; যা লাদাখের পূর্ব অংশে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পাড় বরাবর যে পথ, সেই নতুন পথেরও নাম রাখা হয়েছিল গালওয়ান পাস। শুধু তাইই নয়, অঞ্চলটির নামও গালওয়ান উপত্যকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল মানচিত্রে। গালওয়ান নদীটি বর্তমান ‘আকসাই চিন’ অঞ্চলের একটি ছোট অনাম্নী হ্রদ থেকে উদ্ভূত হয়ে চীনের সীমান্ত বরাবর পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ‘শায়ক’ নদীর সাথে মিলিত হয়েছে, এই শায়ক নদী সিন্ধু নদীর একটি গুরুত্বপুর্ণ শাখা।
‘ফোরসাকিং প্যারাডাইজঃ স্টোরিস অফ লাদাখ, বই অনুসারে যে তথ্য পাওয়া যায়-
বইতির লেখক, ব্রিটিশ ‘রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির’ ১৯১৯ সালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ‘লেফটেন্যান্ট কর্ণেল স্যার ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’; যিনি তার সেনা কর্মজীবনে তিব্বত অঞ্চলের কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৯০ সালের শীতে তিনি কাশগরে শীত কাল কাটিয়ে সেখান থেকে হিমালয়ের পাদদেশ বরাবর অভিযান শুরু করেন, সহজে ‘চাইনিস তুর্কিস্তানে’ যাবার রাস্তা খোঁজার মিশনে পাঠানো হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের তরফে। বলাই বাহুল্য সেই মিশন সাফল্যের মুখ দেখেনি। এই একই রাস্তা খুঁজছিল বেশ কয়েকটি রাশিয়ান, ফরাসি, মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় অভিযাত্রী দল; প্রসঙ্গত কেউই সফলতার মুখ দেখেনি চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্গম আবহাওয়ার জন্য।
ডুনমোর আর্লের পাঠানো নথিতে বিস্ময় বালকের সন্ধান পেতেই ব্রিটিশ বাহাদুর পুনরায় ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’কে তিব্বত অভিযানে পাঠায় পথের সন্ধান করতে; তবে এবারে অর্ডার ছিল ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’ কে গাইড হিসাবে নেওয়ার। ব্যাস, ১৮৯৯ সালে শুরু হওয়া অভিযান অচিরেই সফলতা অর্জন করে ও পরবর্তীতে ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ তিব্বতের কমিশনার পদে নিযুক্ত হন।
আরও পরবর্তীতে ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ মাউন্ট এভারেস্ট কমিটির চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন, যার দরুন ১৯২১ সালের ‘ব্রিটিশ রিকনোসায়েন্স এক্সপিডিশন টু মাউন্টে এভারেস্ট’ মিশনে মুখ্য কোঅর্ডিনেটর নিযুক্ত হন; আবার সেই গোলাম রসূল গালোয়ানের দ্বারস্থ হয় গোটা অভিযাত্রি দলটি। এমন হরেক বীরত্বে ঠাসা তথ্য সযত্নে লিখিত রয়েছে রয়েছে ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ রচিত ২৬টি পুস্তকে, যা ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত রাখা আছে। তাছাড়া আরো অন্তত ৫০ জন আলাদা আলাদা অভিযাত্রীর লেখা বইতে ‘গোলাম রসূল গালওয়ানের’ গৌরবান্বিত উপস্থিতি রয়েছে।
গোলাম রসূল গালওয়ান সারা জীবন ধরেই বহু দুর্গম অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্থানীয় গাইড হিসাবে। তিনি ব্রিটিশ, ইতালিয়ান এবং আমেরিকান এক্সপ্লোরারদের নেতৃত্বে হরেক অভিযানগুলিতে শুধুই গাইড হিসাবে সহায়তা করেননি, বরং একজন নিখুঁত পরিকল্পনাকারী ও তার সফল রূপায়নকার হিসাবে নির্দিষ্ট করে নিজের কর্মের ছাপ রাখতেন। তিব্বত, জিনজিয়াংয়ের ইয়ারকান্দ যা বর্তমানে চীনের উইঘুর প্রদেশের কাছে অবস্থিত, কারাকোরাম শৈলসীমা, পামির মালভূমি অঞ্চল সহ অন্যান্য মধ্য এশিয়ার দুর্গম থেকে দুর্গমতম অঞ্চল গুলোতে কেউ অভিযানের কথা ভাবলে সকলের আগে তারা গালওয়ানকে ভাবতেন।
১৮৭৮ সালে লেহ’তে জন্মগ্রহন করা গোলাম রসূল গালওয়ান মাত্র ১২ বছর বয়সের আর্থিক দুরবস্থার কারণে, ঝুঁকিপূর্ণ, পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘ-দূরত্বে অভিযান চালানো বিভিন্ন দলের সাথে গাইডের কাজে নিযুক্ত হয়ে যান। কাজের সন্ধানে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাড়ি ত্যাগ করেন, নতুন জায়গা সন্ধানের প্রতি তাঁর অসীম আগ্রহ ও আবেগ তাকে ব্রিটিশদের প্রিয় গাইড হিসাবে গড়ে তুলেছিল।
গোলাম রসূল গালওয়ান প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু ভীষণ পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। একজন আগ্রহী শিক্ষানবিশ কিশোরের সামান্য মুটে থেকে অপ্রতিরোধ্য গাইড হিসাবে বেড়ে উঠার কথা, ফ্রান্সিস ইয়াংহাজবেন্ডের প্রতিটি লেখায় ফুটে উঠেছে। চোস্ত ইংরাজির সাথে সাথে, চীনা, রাশিয়ান, তুর্কি, তিব্বতি, ইতালীয় ও স্প্যানিশ ভাষায় তার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। এর সাথে সাথে নেটিভ ভারতীয়দের ভাষা, যেমন লাদাখি, উর্দু, হিন্দি, কাশ্মীরি, পুস্তু, আফগানী, গাড়োয়ালী, কিন্নরী ইত্যাদি সহ প্রায় ১৮টি ভারতীয় ভাষায় অনর্গন কথা বলতে পারতেন। একজন সামান্য কুলি এবং টাট্টু ঘোড়ার সহিস হিসাবে জীবন শুরু করে, ১৯১৭ সালে লেহ’এর ব্রিটিশ যুগ্ম কমিশনারের প্রধান সহকারী পদে উত্তীর্ন হয়েছিলেন।
গোলাম রসূল গালওয়ানেরা কাশ্মীরি ‘গালওয়ান’ উপজাতির অন্তর্ভুক্ত, যার অর্থ কাশ্মীরি ভাষায় ‘ঘোড়ার রক্ষক’; আমরা বাংলায় যাকে উচ্চারণ করি ‘গাড়োয়ান’। কথিত আছে যে, গোলাম রসূল গালওয়ানের মাতামহ ‘কারা গালওয়ান’ নামের কুখ্যাত ছিল, কাশ্মীরি ভাষায় যার অর্থ ‘কালো দস্যু’। ‘কারা’ সে সময় তার উপজাতির গোষ্ঠী প্রধান ছিল, এবং তারা শুধুমাত্র ধনী জমিদারদের সম্পদ লুঠ করত, যা তার জ্ঞাতিভাইদের মাঝে বিতরণ করত। এক সময় কাশ্মীরের ডোগরা রাজার ঘরে দস্যু বৃত্তি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় ‘কারা’, ফলস্বরূপ গোটা উপজাতি দলটির উপরে নেমে আসে সাহার খাঁড়া। গালওয়ান উপজাতিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়ে একটাকে লেহ আর অন্যটিকে বালোচিস্তানের ঊষর অঞ্চলে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। লেহ এর দুর্গম আবহাওয়া সহ্য না করতে পেরে বহু ‘গালওয়ানিস’ মারা যাওয়া শুরু হলে, তখন তারা হিমালয় টপকে উইঘুর প্রদেশের ইয়ারকান্দে বসতি স্থাপন করেছিল, যদিও গোলাম রসুলের পরিবার লেহ তেই রয়ে যায় কয়েকঘর স্বজাতির সাথে। তার পারিবারিক জীবনের ইতিহাস তিনি নিজেই তার লিখিত বইতে উল্লেখ করে যান, যা তিনি তার মা ও স্বজাতিদের কাছে শুনেছিলেন।
১৯৪৫ সালে এক দুর্গম অভিযানে গিয়ে আর ফেরা হয়নি গালওয়ানের, হিমালয়ের কোনো এক দুর্গম অঞ্চলে বরফের মাঝেই তার নশ্বর দেহ চিরতরে হারিয়ে যায় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে। এভাবেই একটা বর্ণময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। বর্তমান দিনে, ওল্ড লেহ’এর চামসপা ইয়ার্টং সার্কুলার রোডে গোলাম রসূলের চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য বসবাস করেন। সেখানের সরকারি গেস্টহাউজ ‘গালওয়ান গেস্ট হাউস’টি ওনারই সম্মানার্থে নামকরণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার দ্বারা, যা আজও রয়েছে।
কিন্তু এত সবের পর আর গালওয়ানের নাম থাকবেনা কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। ইতিমধ্যেই এলাকাটিকে চীন তাদের দেশের অংশ বলে অন্যায় দাবী করে নতুন নাম দিয়েছে; আর চীনকে সমুচিত জবাব দিয়ে যদি আমাদের সেনা ওই এলাকা পুনরুদ্ধার করে আনে, যোগী আদিত্যনাথ কি আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে! হাজার হোক নামটা গোলাম রসূল, গৌড় বা রাসেল নয়, তাই অতি শীঘ্রই এমন একটা ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।
তথ্য সুত্রঃ
indian defence research wing এর ওয়েবসাইট

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মাননীয়া মমতা ব্যানার্জী

আজ আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবলাম, যা বুঝলাম- আমি সত্যিকারের একজন মমতাপ্রেমী মানুষ, আপনার সবচেয়ে জাবড়া ফ্যানদের মধ্যের শীর্ষস্থানীয়। আমি চটি চাঁটা ...