প্রাক কথন
চাইনিস কোম্পানি বর্জনের গল্প তো অনেক হল, নেপালি কোম্পানি ‘বয়কট’ হোক এবারে।
গান্ধী পরবর্তী ভারতে আবার স্বদেশি যুগের ‘বিকাশ’ ঘটেছে, অন্তত ভক্তদের হিসাবে। চীনা অগ্রাসনের জবাবে, তাদের ভূমিতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের বদলে চীনাপণ্য বয়কট করাকেই ধর্মযুদ্ধ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে নাগপুর; ভক্তরা চীনাদ্রব্য বর্জনের পণ করেছে টুনি লাইট ও টিকটক আনইন্সল করে।
যদিও আমাদের দেশকে ২০০ বছর ধরে লুটে নিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ কংগ্লোমেরেট কোম্পানি ‘ইউনিলিভার’কে বর্জনের বিষয়টা সেভাবে উঠে আসেনি কখনও, কারন ভক্ত আইকন স্বঘোষিত ‘বীর’ সাভারকরকে এই ব্রিটিশ প্রভুরাই মাসিক মাসহারা দিয়ে তাদের হয়ে লালনপালন করেছিল, সেটারই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ব্রিটিশ বাপের প্রতি আজকের ভক্ত সন্তানদের আহুতি জ্ঞাপন হয়ত।
নেপাল বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রের মাথাব্যাথার কারন, যদিও আমাদের প্রতিরক্ষা ‘কড়িনিন্দা’ মন্ত্রী- নেপাল কনফ্লিক্ট বিষয়ে দৈবযোগের উপরে ভরষা রাখতে বলেছেন ১৫ই জুন ২০২০ তারিখে এক সাক্ষাৎকারে। এক্ষেত্রেও সেনাকে দিয়ে জবাব দেওয়ানোর মত বুকের পাটা তৈরি হয়নি ৫৬ ইঞ্চির মিত্রো’র, যেটা উহ্যই রেখে গেছেন। আজকাল আর নেপালিরা দারোয়ান থাকেনা সেভাবে, তাহলে নেপালকে শায়েস্তা করতে নেপালি পণ্য বর্জন হোক।
আকাশ থেকে পরলেন নাকি? ভারতে আবার নেপালি কোম্পানি কোথায়, যাকে বর্জন করা যায়? আজকের গল্পটাই তো সেটা, হোক নেপালি পন্য বয়কট ।
ভূমিকাঃ
বিদেশী মাল্টিন্যাশানাল FMCG ও Conglomerate বিকল্প ভারতীয় পণ্যের কথা ভাবলেই আপনার মনে কোন নামটা ভেসে উঠে বা আপনার মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, মোদী সরকারের কর্তাকর্তা ও নাগপুরের খাটালপতিদের- বিগত ৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে!
কেন পতঞ্জলী, এ তো খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন। শুদ্ধ দিশি ভারতীয় কোম্পানি।
গেরুয়া বস্ত্র গায়ে একজন সনাতন সাধু সন্ত, হাজার হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য তৈরি করেছে বলে- জিহাদি মুসলমানের বাচ্চা আর চীনের দালাল কমিউনিষ্টগুলোর বক্ষশূল শুরু হয়ে গেছে, চলতি ভাষায় পিছন ফাটছে ব্যার্থ ঈর্শাতে; অনেক সেলিব্রিটি ভক্ত তো প্রকাশ্যেই বলছে- “দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি”, তা ভাই দেশদ্রোহীরা লুচির মত ফুলতে থাকুক, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- পতঞ্জলী কি অদৌ ভারতীয় কোম্পানি?
প্রশ্নঃ
পতঞ্জলী কি অদৌ ভারতীয় কোম্পানি? প্রশ্ন দু’দুবার না করলে তা জোশ পায়না, আমাদের সমাজে।
অন্বেষণঃ
‘মিনিষ্ট্রি অফ কর্পরেট এ্যাফেয়ার্স’ এর তথ্যমতে ‘পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ লিমিটেড’ নিশ্চই ভারতীয় কোম্পানি, ভারত সরকারের কোম্পানি বিষয়ক মন্ত্রকের থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত কোম্পানি ভারতীয় হবেনা? তাহলে তো কাকা প্রতিটি বিদেশী কোম্পানিই ভারতে এসে লিমিটেড বা প্রাইভেট লিমিটেডের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসা করে, অতএব কেউই বিদেশী হতে পারেনা এই ফান্ডাতে। যাই হোক ছেঁদো কথাতে ভক্তেরা ভুলে থাকুক, কারনে ধর্মের তাড়ির নেশা সহজে নামেনা, বাকিদের জন্য কিছু তথ্য নিয়ে এলাম, যেটা জনৈক ‘রঞ্জিত টমাস’ টুইটারে বিষয়টি সর্বপ্রথম সর্বসমক্ষে নিয়ে আসেন দিন দুয়েক আগে, সেখান থেকে প্রাপ্ত এন্থু নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে আনলাম।
পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ এই মুহুর্তে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটির সম্পদশালী FMCG তথা Conglomerate কোম্পানি, যার CIN- U24237DL2006PLC144789। MCA তে দাখিল করা তথ্যমতে কোম্পানির ৭ জন ডিরেক্টর, যথাক্রমে-
1. রাম ভারত2. আচার্য বালকৃষ্ণ3. স্বামী মুক্তানন্দ4. অজয় কুমার আর্য5. রাকেশ মিত্তল6. সুমেধা7. ইয়াজ দেব আর্য
এনাদের মধ্যে রাম ভারত হলেন স্বামী রামদেবের আপন ভাই, স্বামী মুক্তানন্দ রামদেবের সহচর, বাকিরা আত্মীয় ও বেতনভুক কর্মচারী।
পতঞ্জলী আয়ুর্বেদের শেয়ার হোল্ডিং প্যাটার্নটা আরও ইন্টারেস্টিং,
1. গঙ্গোত্রী আয়ুর্বেদ- ০.৫৮%2. কাংখাল আয়ুর্বেদ- ০.২০%3. চৈতন্য আয়ুর্বেদ- ০.১০%4. ডায়ানামিক বিল্ডকন- ০.৪৪%5. পতঞ্জলী করুপ্যাক- ০.০৮%6. আরোগ্য হার্বস- ০.০৫%
সব মিলিয়ে ১.৪৫% শেয়ারের মালিক বাইরের(!) কেউ; আর বাকি ৯৮.৫৫% শেয়ারের মালিক আচার্য বালাকৃষ্ণ নিজে। কিন্তু এখানেই সব শেষ নয়- কাঙ্খাল, চৈতন্য, ডায়ানামিক, আরোগ্য হার্বস, গঙ্গোত্রী ও পতঞ্জলী করুপ্যাক কোম্পানি গুলোরও প্রতিটির ৯০% এর বেশি শেয়ারের মালিক আচার্য বালকৃষ্ণ। অর্থাৎ আক্ষরিক এবং খাতায় কলম উভয় ক্ষেত্র মিলিয়ে আচার্য বালকৃষ্ণই পতঞ্জলী সাম্রাজ্যের ৯৯.৯২% এর মালিক; বাকিরা বেতনভুক কর্মচারী।
তথ্য বলছে গত ২০১৯ অর্থবর্ষে পতঞ্জলির ‘নেট ইনকাম’ ছিল ৮৩৩০ কোটি টাকা, সুতরাং পতঞ্জলী আয়ুর্বেদের সম্পত্তি সাড়ে চার হাজার কোটির গিঁটে আঁটকে থাকলেও এর মালিক আচার্য বালাকৃষ্ণ’র সম্পদ ২০১৮ সালে দাখিলকৃত তথ্যানুযায়ী- ৪৩৯৩২ কোটি টাকা, এই ২০২০তে সেটা যে আর বেড়েছে সেটা বলাই বাহুল্য, যেটা তাকে ভারতের(!) পঁচিশতম ধনী ব্যাক্তির শিরোপা দিয়েছে।
কে এই আচার্য বালাকৃষ্ণ?
যদি উইকিপিডিয়া আর হোয়াটসএ্যাপ ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞদের রায়কে অভ্রান্ত বলে ধরে নেন, সেক্ষেত্রে উনি খাঁটি ভারতীয় নাগরিক; নেপালি উদবাস্তু পিতা- জয়বল্লভ সুবেধী’র ঔরসে ও মাতা সুমিত্রাদেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭২ সালে, ভারতের হরিদ্বারে।
এটাই যদি সত্য হবে তাহলে ২০১১ সালের ২৩শে জুলাই CBI ভুয়ো ডকুমেন্টস সাবমিট করে ‘জালি’ ভারতীয় পাসপোর্ট বানানোর দায়ে বালাকৃষ্ণর নামে ফরজারি ও চিটিং এর মামলা করেছিল কেন, ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট এক্ট ১২ লঙ্ঘনের অপরাধে? যেখানে আদালত এরেষ্ট ওয়ারেন্ট বের করলে তাকে হেফাজতেও নেওয়া হয়, ও পরে জামিনে মুক্ত হলেও মামলা চলতে থাকে।
পাশাপাশি ED ও SFI তদন্ত শুরু করে তথ্যপ্রমাণ পায় যে, বিপুল পরিমাণে আর্থিক তছরুপ, নেপালে টাকা পাচার, হাওলার মাধ্যমে স্কটল্যান্ডে টাকা পাচার, করফাঁকি সহ হরেক মানি লন্ডারিং কেস এমনকি চিটফান্ডের নামে জনগনের টাকা আত্মসাৎ এর মত গুনেরও অধিকারী এই আচার্য বালকৃষ্ণ। পতঞ্জলীর প্রথম লগ্নিই ছিল স্কটল্যান্ড প্রবাসী নেপালি ধনকুবের ‘সারোয়ান পোদ্দার ও তার স্ত্রী সুনিতার’ করা লগ্নি দিয়ে। যাই হোক CBI, EB, SFI একত্রে মামলাও শুরু করে বালকৃষ্ণর নামে ২০১২ সালে, CBI চার্যসিটও দাখিল করে দেয় যথাসময়ে। সেসময় বালকৃষ্ণ কর্টে হলফনামা দাখিল করে স্বীকার করে নিয়েছিল যে তার জন্ম হয় নেপালের গন্দকী প্রদেশের সঞ্জিয়া নামক এক স্থানে।
এই সময়েই আন্না হাজারের নেতৃত্বে, বাবা রামদেব সহ কেজরিওয়াল, কিরণ বেদীদের মত ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যাক্তিরা দেশপ্রেমিকদের সরকার আনতে তীব্র লড়াই শুরু করেছিল রামলীলা ময়দানে, উদ্দেশ্য মনমোহন সরকার ফেলে দিয়ে আচ্ছেদিনের সরকার আনা। রামদেবের- ৩৫টাকা লিটার পেট্রোলের ধাপ্পাবাজিও এই সময়েরই।
এরপর ২০১৪ সালে দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় আচ্ছেদিনের সরকার, শুরুতেই যাদের যাদের আচ্ছেদিন এসেছিল তাদের মধ্যে এই আচার্য বালকৃষ্ণ পায়োনিয়ার ব্যাক্তি। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসতেই যাবতীয় মামলা ও অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, ও ২০১৭ সালে তাকে ক্লিনচিট ও ঘোষণা করা হয়। যদিও বালকৃষ্ণকে আজ পর্যন্ত অফিশিয়ালি ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়নি মোদী সরকার, যেমনটা আদনান স্বামীকে দিয়েছিল। এরপর আর কী, ‘বিপ্লব’ শেষ হয় বালকৃষ্ণর টাকায় চলা ‘দম দেওয়া কলের পুতুলদের’। আন্না হাজারে শীতঘুমে ফিরৎ চলে যায়, কেজরিওয়াল দিল্লির ক্ষমতায়, কিরন বেদী বিজেপি জয়েন করে রাজ্যপাল হয়ে যায়, আর বাবা রামদেব? গেরুয়া ধারী সন্ন্যাসীর ভেকে, হাজার কোটির ‘ব্যবসায়িক’ সাম্রাজ্যের বেতাজ বাদশা।
আর আপনি ৮০ টাকা পেট্রোল কিনছেন-
আত্মনির্ভরতাঃ
এরপর থেকে পতঞ্জলীর সম্পদ আর ততটা বাড়তে দেননি বালকৃষ্ণ, যতটা নিজের সম্পদ ও শেয়ার বাড়িয়েছেন ‘বিকাশ’ পুরুষের পরবর্তী ৬ বছরের রাজত্বে। দেশজ মিডিয়ার প্রোপাগান্ডার কল্যাণে, নেপালি নাগরিকত্বকে সুন্দরভাবে ধামাচাপা দিয়ে ভারতীয়দের দেশপ্রেমের নতুন আইকন হয়ে উঠে এসেছে নেপালি নাগরিক ‘আচার্য বালকৃষ্ণর’ পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ। নেপালি মানেই বাহাদুর নয়, চোর ও জালিয়াৎ ও হয় এটাও জানা গেল।
বালাকৃষ্ণর গুণ এখানেই শেষ নয়, বারানসীর ‘সম্পূর্ণনন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়’ নামের যে প্রতিষ্ঠান থেকে ওনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে দাবী সমস্ত অফিসিয়াল নথিতে- সেখানে এই সেদিন, মানে মধ্য নব্বইয়ের দশকের কোনো নথিতেও বালকৃষ্ণর নামগন্ধও নেই। বিকাশপুরুষের মতই তিনিও জালি ডিগ্রীধারি, এই না হলে যুগলমিলন!
বালকৃষ্ণর নামে মামলার আগে পর্যন্ত যে পোদ্দার সাহেব বাবা রামদেবের ছায়াসঙ্গী ছিলেন, মামলা শুরু হতেই স্বভাবতই ‘স্কটিট নেপালি’ পোদ্দার ‘বামাল’ ছেড়ে ‘জান’ বাঁচাতে গিয়ে আর ফেরেনি এ দেশে; প্রসঙ্গত এই সারোয়ান ওরফে ‘শ্যাম’ বাবুর স্ত্রী- বাবা রামদেবকে একটি আস্ত দ্বীপ কিনে উপহার দিয়েছিলেন, যার মূল ব্যবসার প্রায় সবটা চীনে ছিল বা আছে। পতঞ্জলিতে থাকা সারোয়ান পোদ্দারের অধিকাংশ সম্পত্তি মোদী সরকারের বাদান্যতায় অফিশিয়ালি বাজেয়াপ্ত করে এই বালকৃষ্ণ, বাকিটা দান হিসাবে দেখিয়ে দেয়।
এরপর নতুন করে পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ নেপালে লগ্নি শুরু করে দেয় ২০১৬ সাল থেকে। তৎকালীন নেপালি রাষ্ট্রপতি ভন্দ্রাই, প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কামাল দহল, নেপাল কংগ্রেস সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা, মন্ত্রী, সান্ত্রী, নেতারা এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটা বিরাট সদস্য দল নিয়ে বীরগঞ্জে একটা প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে এগারো হাজার কোটি টাকা নেপালের বিভিন্ন ক্ষেত্রে লগ্নি করেন প্রবাসী নেপালি ‘আচার্য বালকৃষ্ণ’। ২০২০ সালে সেটা ঠিক কতটা বেড়েছে সেই তথ্য না থাকলেও সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কোঅপারেশন (MCC)’ নামের ভেঞ্চার গুলোকে ফিরিয়ে দিয়েছে নেপাল সরকার, যেখানে চীনের সংস্থার সাথে জুটি বেঁধে কাজ করছে আচার্য বালকৃষ্ণর সংস্থা।
তাহলে? একজন নেপালি নাগরিককে জালি ভারতীয় বানিয়ে দেশপ্রেমের রজঃস্রাবে স্নান করার মাঝে সুখ ঠিক কতটা ভক্তজন?
ভারতীয় আইনব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রতার সুযোগ নিয়ে বালকৃষ্ণরা ক্লিনচিট পেয়ে যায় বেনিয়া সরকারদের কাছ থেকে, মামলা যদি চলত, তাহলে কে বলতে পারে যে ‘বালকৃষ্ণ নিজেও চীনা পুঁজির দ্বারা সম্পৃক্ত, ভায়া নেপাল’ এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে আসতনা। নিশ্চই তেমন কিছু সম্ভাবনা তো ছিলই, ঝুলি থেকে বেড়ার বেড়িয়ে যাবার; নতুবা ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার ১১ দিনের মাথায় কীভাবে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে নিতে পারে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত কোনো সরকার?
উত্তর খুঁজুন আপনি নিজেই। আমি শুধু তথ্য গুলো দিয়ে দিলাম।
নেপালের লাল চোখকে জবাব দিতে হলে, নেপালি পণ্য বর্জন হোক। ভারতে এসে ব্যবসা করে, সেই লভ্যাংশ নেপালে লগ্নিকরা নেপালিদের বর্জন করা হোক। লোগোতে তেরঙ্গা লাগিয়ে আর সাধুসন্তদের নিয়ে ভারতীয়দের আবেগ ও ভক্তিকে ব্যবহার করে এমন মুরগি বানাবার ইতিহাস বেশ বিরলই।
#বয়কট_নেপালি_পণ্য#বয়কট_পতঞ্জলী
আরও পড়ুন-
এর পাশাপাশি ‘বিদেশী পণ্য বর্জন’ করার উথলে পরা দেশপ্রেমের ফেনার ভিড়ে চাপা পরে যাওয়া কিছু নেপথ্য গল্প, কেউই যেগুলো নিয়ে বলছেনা সেটা হল, ২৫শে মে ২০২০ তারিখে- রিলায়েন্স ইন্ড্রাস্ট্রিজের ‘জিও মার্ট’ ভারতের ২০০টি শহরে নিজস্ব বিপনী সহ অনলাইনের মাধ্যমে- গোটা দেশে মুদি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবসার ‘পাইলট প্রজেক্ট’ লঞ্চ করেছে। যার পার্টনার আর ১১টি ‘ইউরোপীয়, আমেরিকা ও ইজরায়েলি’ পুঁজির লগ্নি কোম্পানির সাথে জুকারবার্গের ‘ফেসবুক’ তথা হোয়াটসএ্যাপ নিজেই- স্বাভাবিকভাবেই ভক্তকুলের মাঝে দেশপ্রেমের জোয়ার এসেছে, তাতে দিনের শেষে লাভের অংশ মুম্বই এর ‘আন্তেলিয়াতে’ না গিয়ে যে ‘পালো অল্টো’র প্রিসিলা চ্যানের লকারে জমা হবে সেটা বললেই আপনি দেশদ্রোহী।
ঘটনাক্রমে প্রিসিলা চ্যানও খাঁটি ‘মেড ইন চায়না’, মার্কিন নাগরিকত্বের ইহুদী স্বামীর বৌদ্ধ স্ত্রী, বিচিত্র কম্বিনেশন।
সে যাই হোক, আমাদের দেশে বর্তমানে আম্বানীর জিও, নাগপুরের গোয়াল আর জুকারবার্গের ‘ফেসবুক- হোয়াটসএ্যাপ-ইন্সটাগ্রাম’ এর ত্রিবেণী সঙ্গম চলছে, তারা আক্ষরিক অর্থেই ‘Brother in same boat’, প্রত্যেকের মধ্যেই ঘোষিত আন্তঃব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে। সম্পূর্ণভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থে দোকান খুলেছে আলাদা আলাদা ধাঁচে, কেন্দ্রের সরকারও যে এদেরই হাতের পুতুল হবে সেটা বলাই বাহুল্য। তবে এটা ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে, মধ্যযুগে পোপ যেমন ক্রুসেডারদের দিয়ে বিশ্বজয়ের অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিল, নাগপুরও সেই পুরাতন মদ নতুন বোতলে পরিবেশনা করছে ‘দেশপ্রেম’ লেবেল সেঁটে।
সুতরাং দেশপ্রেমের তাড়ি খাইয়ে কীভাবে ভক্তপিতারা তাদের গোবৎস গুলোকে বায়বীয় জাবর কাটাচ্ছে সেটা ইতিহাসে স্থান পাবার যোগ্য। অন্ধত্ব যখন সর্বাঙ্গকে গ্রাস করে, ধূর্ত শেয়াল ওরফে বেনিয়ারা সে সুযোগ কাজে লাগাতে ভোলেনা।
আম্বানির মাধ্যমে বিদেশী পুঁজি, সঙ্ঘের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দিয়ে তৈরি দেশপ্রেমের গ্যাঁজলা, সাথে জুকারবার্গের ফেসবুক ও হোয়াটসএ্যাপের মত প্রতিষ্ঠিত প্রোপাগান্ডা মেকানিজম- এমন 3D তথা ত্রিমাত্রিক লুঠেরা সিস্টেম কিন্তু ইংরেজরা আমদানি করেছিল অষ্ঠাদশ শতকে, যারা বণিকের বেশে এসে শাসকের রাজদণ্ড হরণ করেছিল। এখানে শাসক অবশ্য আগে থেকেই এদের পদতলে; এখন এটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ না অতলের আহ্বান সেটা পাঠকের ভাবনার উপরেই ছাড়া থাকুক।
তাহলে, আপনার মাঝে দেশপ্রেম কতটা জাগল?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন