রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০

ভূমিকম্প, বজ্রপাতঃ বর্তমান সময় ও সোলার মিনিমাম

 

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতাই মাটি খুঁড়ে বা ঢিবি সরিয়ে আবিষ্কার করেছে নৃবিজ্ঞানীরা। সুতরাং, বড় বড় সভ্যতার শহরাঞ্চলে ভূমিকম্পের নমুনা ইতিহাসে কিন্তু ভুরিভুরি। আমাদের দেশের হিমালয় থেকে হিন্দুকুশ পর্যন্ত অঞ্চলটি ভূ-কম্প পীড়িত এলাকা হিসাবে প্রসিদ্ধ, ২০১৫ সালের কাঠমান্ডু ভূমিকম্পই সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের দেশের রাজস্থান অঞ্চলে মাসে এক আধবার ভূমিকম্প হওয়াটা স্বাভাবিক জীবনযাত্রারই অংশ হিসাবে মেনে নেওয়া হয়। মাউন্ট আবু থেকে আরাবল্লী পর্বতশ্রেণী পর্যন্ত এই ভূ-প্রাকৃতিক ক্রিয়া চলতেই থাকে।
প্রখ্যাত ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ‘হর্ষ গুপ্ত’র, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকার মোতাবেক- প্রতিবছরই গোটা পৃথিবীতে হাজার খানেক বড় ভূমিকম্পের ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যেগুলো মূলত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলেই সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দিল্লী সংলগ্ন অঞ্চলের এই মুহুর্মুহু ভূমিকম্পের কারণের উৎস সম্বন্ধে তিনি ও তাদের বিজ্ঞানী মহলও ভীষণ রকমের উদ্বিগ্ন, কারণ দিল্লীর সাথে হিমালয় অঞ্চলের টেকটোনিক প্লেটের কোনো সম্পর্ক নেই, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের সাথে সংস্পর্শে আসছে এমন কোনো ‘প্লেট বাউন্ডারি’ ওই অঞ্চলে পড়ে না। ভূ-আভ্যন্তরীণ কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতিও ভূমিকম্পের আগে পরিলক্ষিত হচ্ছে না, সুতরাং গোটা বিষয়টি বিজ্ঞানী মহলে বিশ্রী রকমের ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে।
জানুয়ারি ২০২০ তে ভারতে রেকর্ড করা হয়েছিল ৫টি ৪ মাত্রার উপরের ভূমিকম্পের ঘটনা, ফেব্রুয়ারিতে সেটা দাঁড়ায় ২৩টি তে। মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ২৬টি, মে মাসে ১৭টি, জুন মাসের ২৯ তারিখ পর্যন্ত ৪৩টি ভূমিকম্পের ঘটনা রেকর্ড করেছে ‘National Center for Seismology’. বর্তমান কম্পিউটার সভ্যতার ইতিহাসে শেষ দুই শতকে ৬ মাসে ১৩৮টি ভূমিকম্পের কোনো বিবরণী নেই।
শুধু দিল্লিতেই যে এমন বিষয়টা ঘটছে তেমনটা নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাদ দিন, আমাদের পড়শি দেশগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, চিনে ৪২৩টা, শুধুমাত্র জুনেই ৫৪টা। আফগানিস্তানে ৩০৮টা, পাকিস্তানে ৫৬টা, বাংলাদেশেও শেষ ২ মাসে ২০টিরও বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে ৪ মাত্রা বা ততোধিক। শুধুমাত্র এশিয়াতেই জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ২৯ তারিখ পর্যন্ত ১৫২টা ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে, যা কয়েক শতাব্দীতে সর্বোচ্চ।
জাপানকে ভূমিকম্পের দেশ বলে অবহিত করা হয়, যেখানে রিখটার স্কেলে ১-৪ মাত্রার মধ্যে দৈনিক কমবেশী ২০-২৫টি ভূ-কম্পণ হয়। তাই জাপানকে বাদ দিয়ে বাকি বিশ্বের পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখলে বিষয়টা বোঝা যাবে যে, এটা ঠিক কোন ভয়াবহ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে।
বিশ্বের নিরিখে ছোট বড় মিলিয়ে (৩ থেকে ৭ মাত্রার), জানুয়ারি ২০২০ সালে ১১১৮৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭৮২টি, মার্চে ১১০৮০টি, এপ্রিলে ১১০৯১টি, মে মাসে ১২৫১৩টি ও জুন মাসে ১২১০৪টে নিয়ে সর্বমোট ৬৭৭৫৫টি ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো, তাদের বরাতে এই তথ্যগুলো প্রকাশ করেছে ‘ভলকানো ডিসকভারি’ নামের একটি ওয়েবসাইট, যা মার্কিন-ইউরোপীয় ভূ-বিশেষজ্ঞ দল দ্বারা পরিচালিত। ২০২০ পূর্ববর্তী দশ বছরে এই ভূ-বিশেষজ্ঞ দলটির দ্বারা রেকর্ড করা ছোট বড় মিলিয়ে মোট ভূ-কম্পনের পরিমাণ ছিল- ১১৭৬৪৩টি। সেখানে ২০২০ সালের প্রথম ৬ মাসেই ৬৭৭৫৫টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে।
গতপরশু মানে ৩রা জুলাই তারিখে মিজোরামের চম্ফাই অঞ্চলে এক স্থানেই পর পর ক্রমান্বয়ে তিনবার চার মাত্রার উপরে ভূমিকম্প হয়েছে, এই দিন সন্ধ্যাতেই দিল্লিতে ভূমিকম্প হয়েছে দুবার, হরিয়ানাতেও একই ঘটেছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি সূত্রের বরাতে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে।
মাসখানেক বা তার কিছু আগে একটা বিষয়ে খুব ছোট্ট করে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, ‘সোলার মিনিমাম’ বিষয়ে। এই ধরণের সময়গুলিতে কী হয়, কী হয় না ইত্যাদি বিষয়ে কিছুটা প্রাথমিক ধারণা দেবার প্রচেষ্টা করেছিলাম। অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, বেশ কিছু গ্রুপে সেই পোস্ট বন্ধুদের কেউ কেউ শেয়ার করলে সেটা নিয়ে বেশ খিল্লিও করেছিলেন, তো সে যাই হোক- সেই প্রবন্ধ কোনো মনগড়া গল্পকথা ছিল না, প্রতিটির তথ্য বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত, যার লিঙ্ক দেওয়া ছিল।
আজকের দিনে এসে কিন্তু এই মহাজাগতিক ঘটনাবলির প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে ভূ-মন্ডলে। বর্তমান সময়ে যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে শুধু ভারত ভূ-খন্ডেই আমরা অতি অস্বাভাবিক অনেক কিছু বিষয় পরিলক্ষিত করতে পারছি। কোনো বিষয়টাই যে কাকতালীয় হয় না বা হচ্ছে না এ নিয়ে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিছু আমুদে পাবলিক সবেতেই মজা খোঁজেন, খুঁজতে দিন তাদের।
একটু শান্তভাবে ভেবে দেখুন তো, এ বছরের গ্রীষ্মে কি সেই রৌদ্র তেজ রয়েছে যেগুলো বিগত বছরগুলোতে ছিল! নাহ কোনো বৈজ্ঞানিক হওয়ার প্রয়োজন নেই, শীত-গ্রীষ্মের স্বাভাবিক প্রাঞ্জল অনুভূতি আপনাকে কী জানান দিচ্ছে? এ বছরে সেই উত্তাপ নেই, কিছুটা হলেও কম, যা আমরা সকলেই অনুভব করতে পারছি, বিগত বছরগুলোর সাথে যার প্রভাব লক্ষ্যনীয় ভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এবারে আসি বজ্রপাতের বিষয়ে।
BBC এর একটা রিপোর্ট অনুযায়ী বজ্রপাতের কারণে, ভারতে গড়ে ২০০০-২৩০০ মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। ‘লাইটনিং রেসিলিয়েন্ট ক্যাম্পেন ইন্ডিয়া’ এর চেয়ারম্যান কর্ণেল সঞ্জয় কুমার শ্রীবাস্তবের একটা সাক্ষাৎকার অনুযায়ী- মোট বজ্রপাতের ৬৪.৫৭% ই IC (In cloud) জাতীয়, বাকি ৩৬.৪৩% হচ্ছে CG (cloud to ground). ভারতের রাজ্যগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় উড়িষ্যাতে, সারা দেশের মোট বজ্রপাতের ১৫%ই এই রাজ্যে হয়। এর পর মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের পর আমাদের পশ্চিমবঙ্গ চতুর্থ স্থানে, সারা দেশের নিরিখে ৮%। উত্তরপ্রদেশ ৮ নম্বরে ও বিহার ১১ নম্বরে এই তালিকাতে; দেখা যাচ্ছে এই দুই রাজ্যতেই বর্তমানে বজ্রপাতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
ইন্ডিয়ান মেট্রলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের অধীনে থাকা IAF সেন্সর, পুণের IITM সেন্সর নেটওয়ার্ক ও INSAT-3D উপগ্রহ চিত্র, ইত্যাদি এক বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে পাওয়া সূত্রানুযায়ী কোনো এক অজানা কারণে IC মাত্রার বজ্রপাতগুলো মাটিতে ছুঁয়ে যাচ্ছে বা আছড়ে পড়ছে কয়েকটা। শুধু তাই নয়, ভূমিতে (CG) যে ধরনের বজ্রগুলো আঘাত হাতে সেগুলো মোটের উপরে উলম্ব প্রকৃতির খাঁজকাটা ধরণের হয়ে থাকে, কিন্তু যেগুলো মেঘের মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় (IC), সেগুলো চাদরের মতো আনুভূমিক ভাবে পতিত হয়, বিমানচালকদের কাছে এ অতি পরিচিত একটা দৃশ্য। কিন্তু বর্তমানে কোনো এক অজানা মহাজাগতিক কারণে ভূমিতে যে বজ্রগুলো স্পর্শ করছে তাদের মধ্যে অনেকগুলোই উলম্ব হয়ে না আঘাত হেনে চাদরের মতো আনুভূমিক ভাবে মাটিতে আছড়ে পড়ছে।
উলম্ব হয়ে পড়লে সাধারণত যে বিন্দুতে পড়ল সেই বিন্দুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেমন বিদ্যুতের খুঁটি, তালগাছ, চিমনি ইত্যাদি। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কম হয়, কিন্তু আনুভূমিকভাবে পড়লে তার ব্যাপ্তি বিশালাকার ধারণ করে, আর এই কারণেই বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এত বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে রোজ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কিছুদিন আগে ব্রাজিলে একটা এমনই আনুভূমিক বজ্রপাত হয়েছিল যার দৈর্ঘ্য ছিল ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি, জাতিসঙ্ঘের পরিবেশ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে গেলেই এই বিষয়ে বিশদে তথ্য পেয়ে যাবেন। শুধু তাই ই নয়, চিলি, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া জুড়েও এমন আনুভূমিক বজ্রপাত বিস্তর মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটাচ্ছে, বনাঞ্চলে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চল, ক্যারাবিয়ান সমুদ্রাঞ্চল, পশ্চিম আফ্রিকা, স্ক্যান্ডেনভিয়ান দেশ সকল, ইস্টব্লক, রাশিয়া, অষ্ট্রেলিয়াতেও এই ধরণের বজ্রপাত লক্ষ্য করা গেছে নাসার জলবায়ু সংক্রান্ত উপগ্রহের মহাকাশ চিত্র থেকে। কিছুদিন আগে জুন মাসেই কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশের বহু পার্বত্য এলাকাতে এমন আনুভূমিক বজ্রপাতের কারণে কয়েক হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জাতীয় বিপর্যয় সূত্রে খবর বেরিয়েছে।
সুতরাং কোনো কিছুই যে কাকতালীয় হচ্ছে না, এটা কিন্তু পরিষ্কার। এ বছরে বর্ষাও অন্যান্য বছরের তুলনাতে বেশি, জুন মাসেই সারা দেশে গড় বৃষ্টিপাত ১৮% বেশি, রাজস্থানে ৪০ দিন আগে বর্ষা পৌঁছেছে, আসামে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত সহ উত্তরবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশে একাংশ তথা গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলকে বন্যার অরেঞ্জ জোন হিসাবে আগাম ঘোষণা করে সতর্ক করে দিয়েছে কেন্দ্র সরকার।
এ বিষয়ে বিজ্ঞান তার সাধ্যমতো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আগাম খবর সংগ্রহ করে বা আবহাওয়া বিশ্লেষণ করে মানুষের ক্ষতির পরিমাণ কমাতে। আমরা সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান ততটা জানি না, যতটা ধর্ম বিষয়ে জানি। আমি আমার ইসলাম ধর্মের হাদিসে এমন বেশ কিছু টিকা পড়েছিলাম, যেখানে ভবিষ্যৎ বাণী করা আছে এমন বজ্রপাত বিষয়ে, যে- “এমন একটা সময় আসবে যখন মানুষের দৈনন্দিন আলোচনাতে এটাই মুখ্য বিষয় থাকবে, কতজন আজ বজ্রপাতে মারা গেছে”। প্রসঙ্গত ২রা জুলাই ২০২০ তারিখেই বিহারে কমপক্ষে ৩১ জন মারা গেছে বজ্রপাতে, উত্তরপ্রদেশে ২৭ জন, ৩রা ও ৪ঠা জুলাই বিহারে যথাক্রমে মারা গেছে ৩৩ ও ২২ জন। যা এই সময়ের জন্য এই অঞ্চলগুলোতে এক ভয়াবহ রেকর্ড তৈরি করে চলেছে রোজই।

যার যার ধর্ম বিশ্বাস তার কাছে, বিজ্ঞান সর্বজনীন। জীবন বাঁচাতে ‘আল্লা-ভগবান-গড’ সকলের একটাই ওষুধ- প্রাথমিক সতর্কতা অবলম্বন করুন। বৃষ্টির সময় ঘরেই থাকুন, জানি না পরবর্তী মুহূর্ত আমাদের জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে। প্রসঙ্গত সোলার মিনিমাম সবে শুরু হয়েছে, ২০২৫ এ এটা সর্বোচ্চ দশায় পৌঁছাবে, যদি এই কারণেই এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তাহলে আগামী যে আরও অনেক বেশি ভয়ংকর তা বলাই বাহুল্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...