বুধবার, ১ জুলাই, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ ৩



প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ আত্মবিস্মৃত পর্ব


তৃতীয় কিস্তি

ভারতের ইতিহাস অতি সুপ্রাচীন। ধ্রুপদী ভারতীয় যে ইতিহাস তার সূত্রপাতের আগে প্লেস্তোসিন ও মেসোলিথিক যুগের তেমন বিশেষ ইতিহাস পাওয়া যায় না, তবে সেগুলো যে ছিল এই ভূখণ্ডে তার প্রমাণ রয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। পরবর্তীতে প্যালিওলিথিক যুগেরও সামান্য কিছু ধ্বংসাবশেষ ওই যুগ সম্বন্ধে সামান্য ভাসা ভাসা ধারণার বেশি কিছু দিতে পারেনি। ১৯২৯ সালে ‘জারিস-মিডৌর’ মাটি খুঁড়ে মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার নিওলিথিক যুগের ভারতীয় সভ্যতা সম্বন্ধে অকাট্য প্রমাণ দাখিল করে; কিন্তু এ সকল ক্ষেত্রেই সমাজব্যবস্থা সম্বন্ধে কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি, যার উপরে ভিত্তি করে তৎকালীন সামাজিক ইতিহাস রচনা করা যেতে পারে।

এর পরের ইতিহাসটা ব্রোঞ্জ যুগের, ‘ঘগগর হারকা’ নদী উপত্যকা অঞ্চলের সিন্ধু সভ্যতার। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, গানেরিওয়ালা, রুপার, ধোলাবীরা, লোথাল, কালিবঙ্গান, রাখিগড়ি ইত্যাদি স্থানে আবিষ্কৃত হওয়া হরেক ধ্বংসস্থান থেকেও ভারতীয় উপমহাদেশের সভ্যতার প্রাচীনত্বতা বিষয়ে বলিষ্ঠ প্রমাণ রেখেছে, কিন্তু এখানেও সামাজিক গঠন কাঠামোর কোনো অকাট্য ইতিহাস নেই, যার কোনো লিখিত রূপ করা যেতে পারে।

লিখিত ইতিহাস যদি কোথাও থেকে শুরু হয়ে থাকে তাহলে সে সকলই বৈদোত্তর যুগের ইতিহাস। ‘অপৌরুষেয়’ ধারণার ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে এদেশে এসে পৌঁছায় আর্য জাতিরা, এর পরবর্তী যে সমাজব্যবস্থা সেখান থেকে সমাজের খুঁটিনাটি বিষয়ক ইতিহাস পাওয়া যায়, যাকে মোটামুটিভাবে বৃহদর্থে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলা যেতে পারে। ভাষাতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান এবং জিনতত্ত্ব থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত সংশ্লেষণের মাধ্যমে অনুমান করা হয়, আর্যদের অনেকগুলো জাতি ভারতের দিকে এসেছিল এবং তাদের মাঝে বেশ কিছু প্রভেদও ছিল।

‘হিট্টিয়ান ও লুইয়ান’ ভাষাভাষী যে দুইটি ইন্দো-ইউরোপিয়ান যাযাবর জাতি এসে পৌঁছেছিল, তারা ছিল শিকারি ও যোদ্ধাদের দল। দানিয়ুব উপত্যকার প্রোটো সেল্টিক ও বাল্টো স্লাভিক জাতি, এই দুয়ের প্রথম অংশ উত্তর-পশ্চিম অভিমুখে যাত্রা করেছিল, অপরটি পূর্বপানে যাত্রা শুরু করে আনাতোলিয় অনার্য সমাজে এসে পৌঁছায় ও মেরেধরে তাদের থেকে চাষের জমি ছিনিয়ে নিয়েছিল; এরাই ‘আন্দ্রনোভা সংস্কৃতির’ উদ্ভব করেছিল। এরই সাময়িককালে প্রোটো-ইতালীয় একটা গোষ্ঠী ‘ইয়াসন্যা’ (বর্তমানের পারস্য) অঞ্চলে এসে ঘাঁটি গেঁড়ে তারা আরও উত্তর-পুর্ব ‘ওসুন’ (বর্তমানের চীন) অভিমুখে যাত্রা করে। এর কয়েক শতাব্দী পর উক্ত ‘ইয়াসন্যা’ অঞ্চলের পার্থেয়ান ও মেদিয়ান’ গোষ্ঠীগুলি আরও পূর্বে আফগানিস্তান অভিমূখে যাত্রা শুরু করে। এই যে যাত্রাগুলো কোনোটাই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, সবটাই রক্তের পিচ্ছিল পথ ধরে এগিয়েছিল।

এই সময়কার শুরুর দিকের জাতিগুলোর মধ্যে ব্যাক্টেরিয়ান-মার্জিয়ানা নামের এক মিশ্র জাতির উদ্ভব ঘটেছিল, যা বর্তমানে আফগানিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত। বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী ‘ডেভিড অ্যান্টনি’ তার পুস্তকে দাবি করেছেন যে- ইন্দো-আর্য জাতিগুলির প্রবর্তন হয়েছিল ‘সিনতাশতা সংস্কৃতির জাতিগোষ্ঠী’ থেকে- যা ‘বাক্টরিয়ান-মার্জিয়ানা’ সংস্কৃতির একটা অভিশ্রুত রূপ; এরাই পরবর্তীতে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং মায়ানমারের আদিবাসী মানুষদের মাঝে অভিযোজিত হয়েছিল। এই সমস্ত অভিবাসনগুলি আনুমানিক ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সমসাময়িক ঘটনাপঞ্জি, যেগুলো সম্ভব হয়েছিল একমাত্র যুদ্ধের মাধ্যমে, কারণ সেই সময়েই চাকা যুক্ত ঘোড়ায় টানা রথের আবিষ্কার হয়েছিল। অর্থাৎ বিনা যুদ্ধে আর্যরাও এদেশের মাটিতে তাদের সভ্যতা স্থাপনা করেনি, তারাও স্থানীয় অধিবাসী ও তাদের সংস্কৃতি হত্যা করেছিল নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে।

এর পরবর্তীতে লৌহ যুগের সূচনা হয়, যা মূলত সিন্ধু অববাহিকা কেন্দ্রিক হলেও গাঙ্গেয় অববাহিকার বর্তমান বিহার অঞ্চল ও দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গনা ও কর্ণাটকের হলুর অঞ্চলেও এর নিদর্শন পাওয়া যায়। গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলে নগরায়নের ইতিহাসও এই সময়েই শুরু হয়েছিল। চারণভূমি ছেড়ে জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপনের দিকে এই সময়েই ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল, কারণ লৌহ মূলত ধারালো ও টেকসই অস্ত্র তৈরির কাজেই ব্যবহৃত হতো।

কৌসম্বী (এলাহাবাদ), চিরান্দ, মালওয়া, মহিষাদল, পান্ডু রাজারা, বনাসিয়ান, কায়া, বেনারসের দক্ষিণে চান্দৌলি জেলার মলহার অঞ্চল, মহারাষ্ট্রের জোর্হয়ে সহ তৎকালীন ভারতে বহু নিদর্শন পাওয়া যায় হরেক ঢিবিতে। এই সময়কার শ্রেষ্ঠ নিদর্শগুলোর মধ্যে হাড় এবং হাতির দাঁতের উপরে কারুকার্য সম্বলিত হরেক ধরনের চুড়ি, চিরুনি এবং চুলের পিন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য, যেগুলো লোহার তৈরি অস্ত্র দিয়ে খোদাই করা হয়েছিল। টেরাকোটার মূর্তিও এই সময়ের এক অনন্য নিদর্শন; ষাঁড়, পাখি, ম্যামথের মতো কিছু প্রাণী রূপ পাওয়া যায়।

কাস্তে, কাটারি, কুড়ুল, লাঙলের ফলার মতো কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সহ, লৌহ নির্মিত অসাধারণ সব যুদ্ধাস্ত্রের নিদর্শন পাওয়া গেছে; যেমন বর্শার ফলা, তীরের ফলা, সকেটেড রিং, ছোট ছুরি এবং টাঙির মতো দেখতে যদিও খুবই অনুন্নত মানের। এর সাথে পাওয়া গেছে কাঠ, পোড়ামাটি ও হাড় দ্বারা নির্মিত ধর্মীয় জপমালা, অর্থাৎ সে যুগের সমাজেও কোনো না কোনো ধর্ম ব্যবস্থা ছিল। সুতরাং সে যুগেও যে ধর্মই থাকুক, ধার্মিক সমাজের সেনারা বা হয়ত সকলেই বাঁচার ও খাদ্যের প্রয়োজনে বা অন্য যেকোনো প্রয়োজনে যুদ্ধ বিগ্রহ করত এগুলো তারই প্রমাণ দর্শায়।

সুতরাং, ইসলামের বহু আগেও যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল; কোনও জাতিই লাঠির ডগায় তুলো জড়ানো মধু দিয়ে অন্য জাতির মুখে আলতো ভালবাসাবাসি করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেনি।

দেখা হবে পরের পর্বে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...