শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

ইসলামে পদবীর ইতিহাস সন্ধানে


ইসলামে পদবীর ইতিহাস সন্ধানে

 

পদবীর ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসে খুব পুরাতন নয়, সাকুল্যে হাজার খানেক বছর হবে। মধ্য যুগে রাজা মহারাজের থেকে প্রাপ্ত নানান উপাধি ও পেশাগত পরিচয়ই পদবী বা ‘ফ্যামিলি নেম’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল দশম শতাব্দী ও তার সমসাময়িক সময়ে। তবে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে নাম, গোত্র, স্থান বা পিতার নাম নয় এমন পৃথক শব্দ অনেকে নামের সাথে ব্যবহার করত- অনেক ঐতিহাসিক একে ‘পদবী’ ব্যবহারের আদি সুত্র হিসাবে উল্লেখ করেন। কিছু প্রাচীন চীনা নথিতেও খ্রিস্টপুর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে পদবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে জার্মানী সহ পশ্চিম ইউরোপের কিছু দেশ ও মধ্য এশিয়ার পারস্যে আধুনিক পদবীর প্রচলন শুরু হয়। তার আগে বাইজ্যান্টাইন সভ্যতা ও আনাতোলিয়া অঞ্চলের ‘তাতার’ জাতিরা সামাজিক সম্মানের সাথে যুক্ত কিছু পদবী ব্যবহার করত, কিন্তু তা খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে ও স্বল্প পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল

সনাতন ধর্মেও কোনও পদবী ছিলনা, শ্রীকৃষ্ণ, পান্ডব, কৌরব বা শ্রী রামচন্দ্রও পদবীহীন; স্বর্গের দেবতা বা দানবেরাও পদবীহীন। কালিদাস, বরাহমিহির, শঙ্কু, বেতালভট্ট, ধন্বন্তরি প্রমুখদেরও কোনো পদবী নেই। বৌদ্ধদেরও সেভাবে কোনো পদবীর ইতিহাস নেই। খ্রিষ্টানদেরও মধ্যযুগের আগে পদবী নেই, একক-দ্বিতীয়-তৃতীয় বা ততোধিক শব্দদ্বারা নামই বোঝানো হত। প্রাচীন ইহুদী জাতিদের মাঝেও পদবীর চল ছিলনা, ছিলনা মেসোপটেমিয়া বা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতাতে

পদবীর উদ্ভব ঘটে মূলত প্রায় ৮০০ বছর আগে, সেন রাজবংশের অধীনে। তখনই বাংলায় জাত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উচ্ছেদ করে ব্রাহ্মণবাদ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়  প্রাচীনকালে শুধু নাম ও বাবার নাম ছিলো বল্লাল সেনের সময়কালে বাংলায় ধর্মান্তরকরণ ও জাতের গুরুত্ব বাড়ানো হয় এবং এর সঙ্গে সমাজে বিভিন্ন পেশাগত ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পদবীর প্রচলন শুরু হয় 

 

ইসলামেও পদবীর কোনও চল ছিলনা। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর যুগেও পিতার পরিচয়ে বা স্থানের পরিচয় দিয়ে মানুষকে নির্দিষ্ট করা হত। ইসলামের প্রবক্তা খোদ নবীজির নাম হচ্ছে- ‘আবু আল-কাসিম মুহাম্মদ ইবনে ʿআবদুল্লাহ ইবনে ʿআবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম’; এখানে আবু আল কাশিম মুহাম্মদ হচ্ছে ওনার পুরো নাম, আবদুল্লাহ হচ্ছে ওনার পিতার নাম, আব্দুল মুত্তালিব হচ্ছেন ওনার দাদুর নাম ও দাদুর পিতার নাম হাশিম। এই হচ্ছে তৎকালীন নামের সিস্টেম

ইসলামিক নামে পিতার পুত্র বোঝাতে বিন শব্দটা ব্যবহৃত হয়, তেমনই ‘ইবনে’ দ্বারাও পুত্র বোঝানো হয়। বাংলাদেশী ক্রিকেটার ‘মাশরাফি বিন মুর্তাজা’ মানে মুর্তাজার পুত্র মাশরাফি। অনেক দেশে ‘ইবনে’ দ্বারা মায়ের পুত্রও বোঝানো হলেও, ‘বিন’ দ্বারা শুধুমাত্র পিতার পুত্রই বোঝানো হয়। যীশু খ্রিষ্টকে ইসলামে ‘ঈশা ইবনে মরিয়ম’ অর্থাৎ মরিয়মের পুত্র ‘ঈশা’ নামে ডাকা হয়। তেমনই ‘বিনতে’ দ্বারা পিতার মেয়েকে বোঝানো হয়, যেমন ‘ইবনুল’ দ্বারা মায়ের মেয়েকে বোঝানো হয়

যেমন, আমার নাম তন্ময়, পিতার নাম সামসুল হক ও আমার বড় মেয়ের নাম মিঠি। এক্ষেত্রে আমার নাম লেখা হবে ‘তন্ময় বিন সামসুল হক’ কিম্বা ‘তন্ময় ইবনে সামসুল হক’। আমার মেয়ের নাম সেই হিসাবে হওয়া উচিৎ ‘মিঠি বিনতে তন্ময় বিন সামসুল হক’। মিঠির মায়ের নাম রুমি, সেক্ষেত্রে মিঠি মায়ের পরিচয় দিতে গেলে লিখবে – ‘মিঠি ইবনুল রুমি’

ইসলামে ধর্মীয় শব্দ বা প্রতিশব্দ নামের সাথে জুড়ে পদবী হিসাবে ব্যবহারের চল ভীষণ জনপ্রিয়, তারসাথে রয়েছে নবী (সাঃ) এর নাম-উপনাম সহ তাঁর অনুচর ও বংশধরেদের নাম যুক্ত করা। বিভিন্ন খলিফা, সুলতান, সম্রাটদের- নিজেদের জন্য ব্যবহৃত ‘রাজকীয়’ উপাধির ব্যবহার রয়েছে পদবী হিসাবে। এছাড়া রাজা-নবাব-সুলতানদের দ্বারা দেওয়া বিভিন্ন উপাধির পরম্পরার সাথে জুড়ে গেছিল পেশাগত পরিচয়, যা কালক্রমে পদবীতে পরিণত হয়েছে। তেমনই কিছু উপাধি বিষয়ে জেনে নেওয়া যাক-

· মুহাম্মদ বা মহম্মদ বা মোহাম্মদ- এটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে নবীর (সাঃ) নাম নিজের নামের সাথে জুড়ে নেওয়া। মহঃ যার short form.

· আহমেদ, আহম্মদ বা আহমদঃ নবীর (সাঃ) এর অপর একটি নাম ছিল আহমদ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘প্রশংসিত’। অনেকেই নবী (সাঃ) এর সাথে সম্পৃক্ততার স্বার্থে নামের শেষে এটা জুড়ে পদবী বানিয়ে নিয়েছেন

ইসলাম- ইসলাম ধর্মালম্বী বোঝাতে নামের শেষে ইসলাম লেখাটাও পদবী হিসাবে ভীষণ জনপ্রিয়

· আলী- নবীর (সাঃ) জামাতা, আলী (রাঃ) এর নামকে নিজের নামের সাথে জুড়ে নেয় অনেক মুসলমান, বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা। শিয়া শব্দের গোটাটা হচ্ছে ‘শিয়াতুল আলী’ অর্থাৎ আলীর অনুগামী

· হাসান- আলী (রাঃ) এর পুত্র ও নবী (সাঃ) এর দৌহিত্র হাসান (রাঃ) এর নাম নিজের নামের সাথে জুড়ে নেওয়ার চল অতি পরিচিত

· হোসেন বা হুশেন বা হুশাইন- হাসানের অনুরূপ

· উল্লাহঃ এটি একটি আরবি বিশেষণ পদ, যা বিভিন্ন নামের শেষে জুড়ে আলাদা আলাদা অর্থ সৃষ্টি করে। বিশেষত আল্লাহর অনুগ্রহের অধিকারী বোঝাতে এই শব্দ পদবীতে ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে

· আবদুল্লাহ- অনেকেই নামের আগে পিছনে এই শব্দ ব্যবহার করেন। আবদ ও আল্লাহ দুটি আলাদা শব্দ, ‘আবদ’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘দাস বা ভৃত্য’; একত্রে যার অর্থ ‘আল্লার ভৃত্য’

· আবুল- আবুল শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ পিতা, কারো নাম ‘আবুল বাসার’, মানে তিনি বাসারের পিতা

· উল, উর, উজ, উদ ও উস- এগুলিও আরবি অব্যয়সূচক শব্দ, যা নামের মূল ধাতুর সাথে যুক্ত হয়ে একটি আলাদা শব্দ তৈরি করে

· আল- অনেকের নামের মধ্যম শব্দ বা পদবীতে আল শব্দ দেখা যায়, এটি একটি আরবি প্রত্যয় মূলক শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সুনির্দিষ্ট বা একমাত্র’, যা আল্লাহকে বোঝায়

· রহমান- এই শব্দের আক্ষরিক বাংলা প্রতিশব্দ ‘ভাগ্যবান’, ‘আল্লাহর করুণাপ্রাপ্ত’ বোঝাতে রহমান শব্দ নামের সাথে জুড়ে দেন অনেকে

· সৈয়দ- নবী (সাঃ) এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) এর বংশধরেদের সৈয়দ বলা হয়। তাদের বংশের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে সৈয়দ পদবী ব্যবহৃত হয়ে থাকে

· শেখ- এটা নিয়ে নিচে বিশদে রয়েছে, যেহেতু আমাদের পদবী সেখ, উচ্চারণ ভেদে শেখ বা শাইখ

· উদ্দিন- আরবি শব্দ ‘আদ-দ্বীন’ থেকে উদ্দিনের আবির্ভাব; যার বাংলা প্রতিশব্দ- ‘সত্য ধর্মের অনুসারী’

· মীর- আরবি শব্দ আমীর এর অপভ্রংশ থেকে মীর শব্দের উৎপত্তি। হায়দ্রাবাদের নিজামদের পদবী ছিল মীর, যা রাজকীয় উপাধি ‘পরিচালক’ বোঝাতে ব্যবহৃত হত। অনেক পণ্ডিতের মতে ফার্সি শব্দ পীরের অপভ্রংশ থেকে মীরের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। যার বাংলা প্রতিশব্দ- শ্রেষ্ঠ

· আনসারী- আনসারের বাংলা প্রতিশব্দ ‘বন্ধু ও সাহায্যকারী’। মক্কায় নতুন ধর্ম ‘ইসলাম’ প্রচারের সময় সেখানকার মানুষদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) মদীনাতে আশ্রয় গ্রহণ করেন, যাকে হিজরত বলা হয়। সেই সময় যে সকল মদীনাবাসিরা নবী (সাঃ) ও তাঁর অনুচরবর্গদের সহযোগিতা করেছিলেন, তাদের ‘আনসারী’ বলা হয়। তাদের ওই পবিত্র কাজের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে অনেকে নিজের নামের সাথে আনসারী শব্দ জুড়ে নিয়েছেন

· গাজী- আরবিতে ‘গজওয়া’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে যুদ্ধ, যুদ্ধে জয়ী বীরকে বলা হয় ‘গাজী’

· শাহীদ- যিদি যুদ্ধে বীরত্বের সাথে মৃত্যু বরণ করেন তাদের শাহীদ বলায় হয়

· চিশতী- এটি একটি ফার্সি শব্দ, যা সুফি ঘরনার। এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘প্রেম ও সহনশীলতা’

· ফকির- এটিও একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সর্বস্ব ত্যাগী সন্ন্যাসী’। নিজেকে রিপুর উর্ধ্বে বোঝাতে অনেকে এই পদবী ব্যবহার করতেন, যে পরম্পরা আজও চলে আসছে

· মোল্লা- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘পরিপূর্ণ জ্ঞান বিশিষ্ট মহাপন্ডিত’

· মিয়াজী- মূল ফার্সি শব্দ ‘মিঞা’ যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘মহাশয়’, আর জী হচ্ছে আমাদের উপমহাদেশে উর্দু ও হিন্দিতে মানুষকে ডাকার একটা পদ্ধতি, এই দুই মিলে মিয়াজী

শরীফ- শরীফ আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘ভদ্র’ ও ‘পবিত্র’। নিজেকে ভদ্র হিসাবে জাহির করতেই এই পদবীর উদ্ভব

 

· শাহ্‌- বেদের সমসাময়িক গ্রন্থ, পারসিক ‘জিন্দা-আবেস্তা’ গ্রন্থে আবেস্তীয় ভাষায় রাজাকে বলা হয় ‘Xšâyathiya’ যা সংস্কৃতের ‘ক্ষত্র’ শব্দের সাথে ভীষণ রকমের মিল; ক্ষত্র মানে সমরশক্তি। পার্শিয়ান ‘Xšâya’ শব্দটিকে পারশ্যের রাজারা নিজেদের নামের সাথে জুড়ে দিতেন নিজেকে রাজা বোঝাতে। সেখান থেকেই শাহ্‌ পদবীর উদ্ভব। পরবর্তীতে এটা একটা জনপ্রিয় পদবীতে রুপান্তরিত হয়ে যায়

· খাজা- খোয়াজা বা খাজা শব্দটিও ফার্সি শব্দ। যার বাংলা প্রতিশব্দ বহুল ভাবে ব্যবহৃত আছে ফারসি সাহিত্যে, ‘সম্মানী, ধনী, গুরু, জ্ঞানী, শক্তিশালী, স্বামী অথবা দুঃখহরণকারী’ ইত্যাদি বোঝাতে ‘খাজা’ উপাধি প্রদান করা হত শাসকদের দ্বারা, আর সেখান থেকেই পদবীতে স্থান করে নিয়েছে শব্দটি

· ফরাজি- এই শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘হুবহু’ বা ‘অবিকল’। ইসলামের শুরুর দিকে প্রারস্য প্রদেশে যারা অবিকল আরবের মত করে বা কোরানের কপিবুক স্টাইলে অনুসরণ করত তাদের ‘ফরাজি’ বা ‘ফরাজী’ বলা হত। যা পরর্তীতে পদবীতে রুপান্তরিত হয়

· সিদ্দিকী- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সত্যবাদী’। নবী করিমের (সাঃ) ঘনিষ্ট বন্ধু তথা অনুসারী সাহাবী, শ্বশুর তথা আয়েষা (রাঃ) এর পিতা ‘আবু বকর সিদ্দিকি’ এর নামের সাথে জুড়ে থাকার জন্য অনেকে এই শব্দকে নামের সাথে পদবী হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন

· পাশা- প্রাচীন তুরস্কের উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের ‘পাশা’ উপাধি দেওয়া হত

· বেগ- এটি মূলত একটি মঙ্গোল শব্দ, যা মঙ্গোল সেনাপ্রধানদের উপাধি ছিল। পরবর্তীতে পারস্যের সেলজুক সাম্রাজ্যে মঙ্গোল আক্রমণ হলে তাদের আধিপত্য বিস্তার লাভ করে; এরও পরে অটোমান সাম্রাজ্যে সময়কালে তৎকালীন সুলতানেরা বিভিন্ন স্থানীয় যাযাবর গোত্রপ্রধান, সেনা অধ্যক্ষ, ও শাসনকর্তাদের ‘বেগ’ উপাধি প্রদান করতেন। বেগের স্ত্রী লিঙ্গ হল বেগম

· মির্জা- আরবি শব্দ আমীর এর বাংলা প্রতিশব্দ হল নেতা, আমিরের যে পুত্র তাকে মির্জা উপাধি দ্বারা সম্মানিত করা হয়। মূলত মঙ্গোল শাসক তৈমূল লং- তার পুত্র ও বংশধর দের জন্য মির্জা পদবীর ব্যবহার ব্যপক হারে শুরু করেন, যার বাংলা প্রতিশব্দ রাজপুত্র। যার জন্য আরবিতে আমীর শব্দ দেখা গেলেও মির্জা শব্দ নেই

· রেজা- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘তৃপ্তি’। আল্লাহর প্রেমে পরিতৃপ্ত বোঝাতে রেজা শব্দ পদবীতে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে

· সুলতান- তুরস্কে রাজা বোঝাতে সুলতান শব্দ ব্যবহৃত হয়, যেমন রাজার ইংরাজি প্রতিশব্দ King, তেমনই রাজার তুর্কি প্রতিশব্দ ‘সুলতান’

· খাতুন- মঙ্গোল শব্দ ‘খাং’ এর স্ত্রীবাচক ‘খাওয়াতিং’ শব্দ যখন সেলজুক সাম্রাজ্য হয়ে তাতার যাযাবরদের মধ্যে সঞ্চারিত হয় তখন তা তাতারদের উচ্চারণে ‘খাতুন’ শব্দে রুপান্তরিত হয়ে তুর্কি শব্দমালায় জাইগা করে নিয়েছিল। খানম ও খাতুন একই শব্দের ভিন্ন রূপ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘রাজরানী’

· বিবি- এটি একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘আরামবিলাসি সুন্দরী নারী’

· নাহার- এটি একটি আরবি শব্দ যার প্রতিশব্দ ‘দিবস’ বা ‘উজ্জ্বল’। নিজেকে দিনের মত উজ্জ্বল বোঝাতে এই শব্দ নামের শেষে পদবী হিসাবে ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়

· বেগম- বেগের স্ত্রী লিঙ্গ বেগম

· আরা- এটি একটি আরবি শব্দ, যার প্রতিশব্দ ‘সৌন্দর্য’

· বেওয়া- মুসলমান বিধবাদের ‘বেওয়া’ বলা হয়ে থাকে, যা একটি ফার্সি শব্দ। এর আভিধানিক বাংলা প্রতিশব্দ – ‘অসহায়’

· হাজী- যারা হজ্ব করেছে এসেছে, অর্থাৎ আরবের মক্কা শহরে গিয়ে বিধি অনুযায়ী ধর্মীয় রীতি পালন করেছেন তাকে হাজী বা হাজ্বী বলা হয়। প্রতিজন হজ্ব সম্পন্নকারীকেই হাজী নামে ডাকা হয়, যদিও পারিবারিক সুত্র এটাকে কেউ কেউ পদবী হিসাবেও ব্যবহার করে থাকে

· লায়েক- লায়েক একটি আরবি শব্দ, যার প্রতিশব্দ যোগ্য

· হক- আমার নামের অংশ বলে তা আলাদা করে নিচে দেওয়া আছে বিশদে

 

· আলম- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘বিশ্ব বা পৃথিবী’। নামের শেষে বিশেষণ হিসাবে পদবীতে যুক্ত হয়

· ইরানী- সোজা অর্থে, নিজেকে ইরাণ জাত বোঝাতে এই পদবীর ব্যবহার

· মাদানী- মদিনার মানুষদের মাদানী বলা হয়, যেমন আমরা বাংলার মানুষ বাঙালী। অনেকে যারা মদিনায় পড়াশোনা করেন, তাদের মাঝে মাদানী পদবী ব্যবহারের চল রয়েছে

· মওলানা- আরবিতে ‘মওলা’ শব্দের প্রতিশব্দ ‘অভিভাবক বা প্রভু বা মালিক’। ‘আনা’ মানে আমি, দুটো একত্রে হয় ‘মালিক ও আমি’। মালিক বা প্রভুর অধীনস্থ যেকোনো ব্যাক্তিকেই মাওলানা বলা যেতে পারে। যদিও বর্তমানে ইসলামিক মাদ্রাসা, মক্তব, (বিদ্যালয়), জামিয়া (বিশ্ববিদ্যালয়) এর যারা অধ্যক্ষ বা প্রিন্সিপ্যাল তাদের ‘মাওলানা’ উপাধিতে ডাকা হয়ে থাকে। তাই অনেকে মাওলানা শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘জ্ঞানী’ বলে থাকলেও- কোরান বা হাদিসের কোথাও কোনও পণ্ডিতকে সম্বোধন করতে ‘মাওলানা’ শব্দের ব্যবহার নেই। পারস্যের পন্ডিতদের আমদানি করা এটা একটা আরবি অপভ্রংশ, যা কালক্রমে ভীষণ জনপ্রিয় প্রত্যয় মূলক পদবী হিসাবে প্রচলিত রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইরাণে

· মুফতি- ইসলাম শাস্ত্রের আইনগত সকল বিষয়ে যিনি বিশেষভাবে পারদর্শীও সুপণ্ডিত তাকে মুফতি উপাধিতে ডাকা হয়। যা অনেকের পদবী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কোরানের যে শরিয়তি সংবিধান তার ‘ব্যারিস্টার’ সম ডিগ্রী হল মুফতি

· কাজী- কাজী মানে বিচারক বা জাজ; যিনি কোরানে বর্নিত আল্লার হুকুমকে সমাজে প্রতিষ্টিত করেন খলিফার নির্দেশে। এটাই পরে পদবী হয়ে যায়

· হাফিজ- পবিত্র কোরানের দাঁড়ি, কমা, কোলন, সেমিকোলন, উচ্চারণ অবিকল হুবহু বজায় রেখে ক্রমান্বয়ে ৩৩৮৬০৬ শব্দের তথা ৭৭৯৩৪ টি বাক্যের পুস্তককে যা ১১৪ টি অধ্যয়ে বিভক্ত, অবিকৃতভাবে সম্পুর্ন মুখস্ত করে ফেলেছেন ও যে কোন সময় তা নির্দিষ্ট সুরে পাঠ করতে পারেন- তাকেই হাফিজ উপাধি দান করা করা হয়

· মৌলভী- এটিও একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘অধ্যাপক’

· খোন্দকার- এটি একটি ফার্সি শব্দ, খোন্দ শব্দের প্রতিশব্দ ‘পড়া’ ও কার শব্দের প্রতিশব্দ ‘কারী’ বা যিনি করান। অর্থাৎ শিক্ষক বোঝাতে খোন্দকার শব্দ পদবীতে জুড়ে দেন অনেকে

· দেওয়ান- এটিও একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ খাজনা আদায়কারী। বর্তমানে যারা Income Tax বা GST দপ্তরে চাকুরি করেন, সকলেই দেওয়ান

· নিয়াজী- নিয়াজ শব্দতি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘প্রিয়’। আর যিনি প্রিয়তম তাকে নিয়াজী বলে সম্মানিত করা হয়ে, এক্ষেত্রে যিনি আল্লার প্রিয়তম তিনিই নিয়াজী

· চৌধুরী- এর আক্ষরিক মানে একটা নির্দিষ্ট সীমানার চারিদিকের মালিক। ভূস্বামীদের বোঝাতে এটা উপাধি হিসাবে ব্যবহৃত হত, যা কালক্রমে পরবীতে পরিণত হয়েছে

· তালুকদার- তালুকও ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সম্পত্তি’। যারা তালুকের মালিক তাদের নামের শেষে এই উপাধি জুড়ে দেওয়া হত, যা পদবীতে পর্যবাসিত হয়েছে

· ভুইঞা- ভুঁই এর মালিকদের ভূঁইয়া বলা হত। ভুঁই শব্দটা ফার্সিজাত যার বাংলা প্রতিশব্দ- জমি

· মজুমদার- ফার্সি শব্দ ‘মহজৌম’ থেকে মজুম শব্দের উৎপত্তি। যে সকল ভূস্বামীর অধীনে একাধিক মৌজা থাকত, তাকে মজুমদার উপাধিতে ডাকা হয়

· খাসনবীস- নবাব বা সুলতানের ব্যাক্তিগত সচীবের উপাধি ছিল এই শব্দ

· জমাদার- আরক্ষা বাহিনীর সাথে যুক্ত পদস্থ কর্তাদের ‘জমাদার’ বলে সম্মানিত করা হত

· মণ্ডল- এটি সংস্কৃত অপভ্রংশ থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি শব্দ, ভারতীয় উপমহাদেশেই এই ধরনের পদবি দেখা যায়, যার বাংলা প্রতিশব্দ মীমাংসাকারী। মোড়ল মণ্ডলেরই অপভ্রংশ। যদিও মণ্ডল শব্দের আক্ষরিক প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘গোলাকার স্থান বিশিষ্ট নির্দিষ্ট পরিধি’ যুক্ত এলাকা। ভারতীয় উপমহাদেশে সভা সমিতিগুলো গোলাকার ভাবেই বসত, আর সেই সভার সভাপতিত্ব যিনি করতেন তাকেই মূলত ‘মণ্ডল’ নামে ডাকা হয়। বস্তুত মণ্ডল, নন্দী, ভুইঞা বা চৌধুরী ইত্যাদি গুলো এলাকা ভেদে সবই প্রতিশব্দ

 

· মাতব্বর- মণ্ডলের অনুরূপ

· মল্লিক- আরবি শব্দ ‘মালিক’ থেকে ‘মল্লিক’ শব্দের উৎপত্তি। ইসলামিক শাসনাকালে যে সকল ব্যাক্তিরা পুঁথি, দলিল, দস্তাবেজ ইত্যাদির দারুণ ভাবে নকল করতে পারতেন তাদের মল্লিক উপাধি দেওয়া হত। ফার্সি শব্দে ‘মলিক’ হল জোতদারদের উপাধি বিশেষ

· মুন্সী- এই শব্দটিও ফার্সি, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সচিব’। ব্রিটিশ ভারতে ভাষাবিদ, লেখক, উচ্চপদস্থ করণিক ও ঠিকাদারদের মুন্সী উপাধি দানের প্রচলন ছিল

· মৃধা- মিরদাহ’ নামক কামানের গোলা বিষয়ে পারদর্শী মানুষদের মৃধা পদবী দান করা হত নবাবী আমলে

· বিশ্বাস- নবাবের আস্থাভাজন কর্মচারিদের এই উপাধি দান করা হত

· কানুনগো- নবাবী আমলের ভূসম্পত্তি বিষয়ে বিশারদ ব্যাক্তিকে এই উপাধি দান করা হত

· লস্কর- সৈন্যদলে বা জাহাজে চাকুরিকরা কর্মচারীদের লস্কর নামে ডাকা হত

· বাছার বা বাশার- সর্বশ্রেষ্ট মানব’ অর্থে নবী (সাঃ)কে বোঝাতে ‘বাশার’ শব্দ ব্যবহৃত হয়, যা বাঙালীর অপভ্রংশ হিসাবে ‘বাছার’ পদবীতে রুপান্তরিত হয়েছে

· সরকার- এটি একটি ফার্সি ভাষা, রাজকার্য পরিচালনার সাথে যুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরকার উপাধিতে ডাকা হত, সেই থেকেই পদবীর চল

· সরদার বা সর্দার- সর’ একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ হুকুম। এই সর শব্দের সাথে কার, দার, জমিন, পঞ্চ ইত্যাদি হরেক প্রত্যয়মূলক শব্দ যুক্ত হয়ে আলাদা আলাদা বিশেষন যুক্ত শব্দ গঠিত হয়েছে। সরদার শব্দটিও হচ্ছে যিনি হুকুম প্রদান করেন এমন ব্যাক্তি। সেখান থেকেই এই পদবীর উৎপত্তি

· হাওলাদার- হাওলা’ শব্দটি ফার্সি যার প্রতিশব্দ জমি, দার শব্দের প্রতিশব্দ মালিক। জমিদারের একটা প্রতিশব্দ হাওলাদার

· শিকদার- আরবি শব্দ ‘শিক’ শব্দের প্রতিশব্দ খন্ড বা বিভাগ। একটি রাজত্ব বা জমিদারীর একটা অংশের ইজারাদারের উপাধি ছিল শিকদার

· ওয়াদেদ্দার- নবাবী আমলে যারা কর আদায়ে অসমর্থ ব্যাক্তির সম্পত্তি নিলাম করত

· দস্তিদার- নবাবী আমলে যারা দলিল, দস্তাবেজ, চিঠিপত্রের দেখভাল ও সংরক্ষণ করত

· কয়াল- নবাবী আমলে যারা দাঁড়ি পাল্লা নিয়ে মূলত ভুষিমালের ব্যবসা করত

· পোদ্দার- নবাবী আমলে যারা সোনা রুপার ব্যবসা করত

· নিয়োগী- নবাবী আমলে রাষ্ট্রকার্যে যে ব্যাক্তি নিয়োগ সংক্রান্ত কার্যের সাথে যুক্ত থাকতেন তাদের নিয়োগী নামে ডাকা হত

· চোঙাদার- বিভিন্ন সরকারী ফরমান, যারা গ্রামে গ্রামে চোঙা বা মাইক ফুঁকে জানান দিত

· জানা- নবাবদের জমিজমা যে সকল চাষারা দেখাশনা করত

· মহলানবিশ- নবাবী আমলে যারা সরকারী ফরমান লিখত

· পাটোয়ারি- নবাবী আমলে যারা জমি জাইগা কেনাবেচার দালালি করত তাদের পাটোয়ারি নামে ডাকা হত

· মাঝি- নৌ পরিচালনা ও মাছের ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যাক্তিদের মাঝি নামে ডাকা হত

· জোলা- তাঁতী পেশার মানুষদের এই নামে ডাকা হয়

· ঢালী- যুদ্ধক্ষেত্রে যে ব্যাক্তিরা ঢাল শস্ত্রে সজ্জিত থাকতেন তাদের ঢালী উপাধিতে ভুষিত করা হত

· মুস্তাফী- আরবি শব্দ মুস্তাফা শব্দের প্রতিশব্দ ‘প্রিয়’, নবাবের প্রিয় পাত্রদের মুস্তাফী উপাধি দান দেওয়া হত

· সানা- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘উচ্চতম মর্যাদাসম্পন্ন’। নবাব বা সুলতানের রাজসভার প্রিয়পাত্রদের এই উপাধি দান করা হত

· মিস্ত্রী- লাতিন শব্দ ‘maestro’ শব্দের প্রতিশব্দ কারিগর, যা মূলত সংগীতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও, গ্রীক ও রোমান শিল্পীরা যখন মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন স্থাপত্যকলার জন্য এসেছিল, পার্শিয়ান উচ্চারণে তারা ‘মিস্ত্রী’ হয়ে গিয়েছিল মঙ্গোল পূর্ববর্তী সময়ে। সেই থেকেই শিল্পীদের মিস্ত্রী উপাধিতে ভূষিত করার চল রয়েছে। প্রসঙ্গত আমাদের পুর্বপুরুষের পদবীও মিস্ত্রীই ছিল

এছাড়া বহু নাম এমন হয়, যেখানে আলাদা আলাদা শব্দ জুড়ে একজন ব্যাক্তিকে চিহ্নিত করা হয়, যেমন- ওয়াসিম আক্রম, ওয়াসিম জাফর, ইরফান হাবিব, প্রমুখ। বিশেষ করে শিয়া’রা তাদের নামের সাথে আলী (রাঃ) বা তাঁর পুত্রদ্বয় হাসান (রাঃ) ও হোসেন (রাঃ) এর নাম মধ্যনাম তথা middle name হিসাবে জুড়ে দেন। যেহেতু ভারতে ইসলামটা এসেছে পারস্য হয়ে, তাই ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামে পারস্য সংস্কৃতির ছাপ সবচেয়ে বেশি, মূল আরবি সংস্কৃতির চেয়ে

 

এবারে আসি খানেদের ইতিহাসে

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয় ধারণা হল চেঙ্গিস খাং হল একজন মুসলমান, ইতিহাস বিষয়ে মুর্খতা ও অজ্ঞতা যে পর্যায়ে পৌঁছালে এমন ভুল হওয়া সম্ভব; বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজের বিপুল অংশ সেখানেই পৌঁছেছে। চেঙ্গিস খাং এর জন্ম- চীনের ঠিক উপরের একটা দেশ মঙ্গোলিয়াতে, যেখানে আজকের এই ২০২০ সালেও মুসলমানের সংখ্যা মাত্র ৩%। চেঙ্গিস খাং ছিল ‘টেং-রি’ দেবতার উপাসক, তার বর্বরতা যাদের উপরে নেমে এসেছিল তাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান ও খ্রিস্টান। বস্তুত ইহুদী ও মুসলমানেদের প্রকৃত মানুষ বলেই মানতনা চেঙ্গিস খাং। তার মতে এই দুই ধর্মগোষ্ঠীর লোকেরা হচ্ছে জন্মগত ‘দাস’, অতএব দাসেদের দিয়ে যা খুশি করানো যায় এমন মতই পোষণ করতেন। এমনকি মঙ্গোলদের যে ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সামগ্রী, তা মুসলমানেদের জন্য নিষিদ্ধ করেছিলেন চেঙ্গিস, কারন দাসেরা প্রভুদের খাবার খাওয়ার মত সম্মানের অধিকারী নয়

চীনাদের অন্যান্য নাম যেমন তুং, পিং, লিং, সাং, মুং ইত্যাদির মত চেঙ্গিস তথা জিংগিস খাং ও হচ্ছে বিশুদ্ধ ‘মেড ইন চায়না’ প্রডাক্ট (আসলে মঙ্গোলীয়া)। চেঙ্গিস খাং এর শত শত পুত্র থাকলে, স্বীকৃত জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল ‘যোচী খাং’, তিনিও ওই টেংরি ধর্মের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু চেঙ্গিস খাং এর নাতি ‘বির কাই খাং’ এক মুসলমান যাযাবর দলের চরমা সুন্দরী স্ত্রীকে জবরদস্তি তুলে এনে বিয়ে করেন বুখারা প্রদেশে। পরবর্তিতে এই রমণীর প্রভাবেই ‘বির কাই খাং’ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ও আজারবাইজানে থিতু হয়। এভাবেই মিশরের তৎকালীন মামলুক শাসকদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে ইসলামিক সংস্কৃতি সৌহার্দের বিনিময়ে, ও বিপুল সংখ্যক মঙ্গোল সেনা ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়। মঙ্গোলদের দল তিনটি আড়াআড়ি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়; বির কাই খাং এর দল, চেঙ্গিসের অন্য ছেলের দরুন নাতি ছাগতাই খাং এর দল ও চেঙ্গিসের আরেক ছেলের পক্ষের নাতি হলাগু খাং এর দল। টেং-রি ধর্মের অনুসারী হলাগু খাং তৎকালীন ইসলামিক শিল্প সংস্কৃতির পীঠস্থান বাগদাদের উপরে হামলা চালিয়ে গোটা শহরকে ধুলিস্যাত করে দিয়েছিল

এর জন্য মুসলমান হয়ে যাওয়া ‘বির কাই খাং’, হলাগুকে নিজের মঙ্গোল সেনাদল থেকে বহিষ্কার করে দেশে ফিরত পাঠায়, সাথে তার আরেক সহযোগী কিটবুক খাং কেও। কিন্তু দেশে ফিরে কুবলাই খাং কে হাত করে বির কাই খাং এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় ও পরে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করে হলাগু। প্রথম দিকে ‘বির কাই খাং’ মোঙ্গলের তলোয়ারে আরেকটা মোঙ্গলের রক্ত ঝড়ুক এটা চাননি, কিন্তু হলাগু ‘বির কাই’ এর ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষোভে অন্ধ হয়ে আক্রমনের তিব্রতা ক্রমশ বাড়ালে ‘বির কাই খাং’ এর ভাগ্নে ‘নোগাই’ হলাগুকে হত্যা করে

দীর্ঘদিন এই খাং বংশ রাজত্ব করেছিল মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ন অঞ্চলে, এবং এরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়ে যাওয়ার দরুন তুর্কি, আফগানী ও ইরানি মেয়েদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। রাজক্ষমতার সাথে যুক্ত এই পদবী কালক্রমে তাতার, তুর্কি, আফগান, ইরানী ও পামিরীয় স্তেপ অঞ্চলের যাযাবরদের মাঝে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠে আভিজাত্যের নিদর্শন হিসাবে, যা আজকের দিনের সালমান খান, শাহরুখ খানের মধ্যমে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে

আজকের চীনেও ঐতিহ্যবাহী চীনা ভাষায় ‘কান’ (Kan) অতি পরিচিত একটি পদবী, যা মন্দারিনে উচ্চারণ করে ‘Gan’ক্যান্তনেসি, হোক্কান, মিন্নান ও কুয়েনঝ্যাং নামক চীনা ভাষা গুলিতে ওই চেঙ্গিস খাং এর ‘খাং’ পদবীকে ‘জিয়ান’ বলে উচ্চারণ করা হয়, যা ডোরেমন নামক কার্টুন চরিত্রে নোবিতা, সোনিওর সাথেই সমান জনপ্রিয় চরিত্র। জাপানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এই খাং ‘কান-জি’ উচ্চারণে রুপান্তরিত হয়েছে কালক্রমে। যেমন ওলন্দাজ, সাইবেরীয় ও ডায়েসল্যান্ডে তা ‘কান’ (Kann বা Kan) নাম নিয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছে

 

তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদীরা যখন খাং পদবীর মালিক হল সাম্মানিকতা স্বার্থে, তাদের হিব্রু ভাষায় সেই খাং উচ্চারণ বদলে গেল ‘কোহেন’ এ। গোজোসিয়ন যুগে যে চীনা দলটি আরো পুর্ব অভিমুখে যাত্রা করেছিল তাদের নাম ছিল ‘হাঞ্জা’, এরা ওই খাংকেই অপভ্রংশ করে ‘কোরেং’ উচ্চারনে ডাকত, যা থেকে আজকের কোরিয়া নামের উৎপত্তি বলে ধারনা করেন একদল ইতিহাসবিদ

প্রসঙ্গত ইসলামের শুরুর যে ইতিহাস ও কোরান হাদিসের যে রচনা কাল সেখানে কোনো খান পদবীধারী ব্যাক্তির উল্লেখ নেই, এখান থেকেও প্রমাণিত হয় যে আজকের খান কোনো ইসলামিক – আরবি সংস্কৃতি নয়, বরং তা বর্বর মঙ্গোল নেতা চেঙ্গিস খাং এর আভিজাত্যের পরিচায়ক। যার পরবর্তী বংশধরেরা ইসলামের শত্রু থেকে ইসলামে সম্পৃক্ত হয়েছিল

এই হল খান পদবীর শিকড়ের সন্ধান

ভারতীয় যে মুঘল সাম্রাজ্য, তা সরাসরি মঙ্গোল চেঙ্গিস খাং ও তৈমুর লং এর বংশ থেকে উদ্ভূত। মঙ্গোল শব্দের ফার্সি অপভ্রংশ হল মুঘল। ভারতীয় রাজপুতেরা নিজেদেরকে সগৌরবে সূর্য্যবংশী, চন্দ্রবংশী, অগ্নিবংশী, যুগবংশী হিসাবে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করলেও ইতিহাস হচ্ছে ‘হুন’ জাতি তৎকালীন শতদ্রু নদী অঞ্চলে আক্রমণ শানালে বহু সংখ্যক পুরুষকে হত্যা করে ও নারীদের গর্ভবতী বানিয়ে দেয় সৈনিকেরা, যা প্রায় প্রতিটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই করত। গুর্জর নারী ও হুন সেনাদের সংমিশ্রণে নতুন যে জাতির উদ্ভব হয়েছিল তারাই রাজপুত

আমার নামের প্রথমাংশ অর্থাৎ ‘তন্ময়’ শব্দটি একটি বিশুদ্ধ সংস্কৃত শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘মনোনিবেশ, মগ্ন বা একাগ্রচিত্ত’; প্রক্ষান্তরে বলা যেতে পারে ‘যা বস্তুনিষ্ঠ নয়, বরং আত্মিক দশা’। পদবী ‘হক’ আবার একটা ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘ ন্যায্য দাবী, সত্য, বা যথার্থ’। আকিকা’র সময় আর একটা নাম রাখা হয়েছিল, যা কালক্রমে হারিয়ে যায় নথিতে না থাকার কারনে- সেটা ছিল সেখ জিয়াউল হক। সেখ বা শাইখ হল একটা আরবি শব্দ, যা বিভিন্ন গোত্রপতিদের আভিজাত্য ও ক্ষমতার নিদর্শন স্বরূপ ‘উপাধি’ বিশেষ; যা খ্রিস্টান, ইহুদী বা পৌত্তলিক (মুর্তি পূজারী) সহ যে কেউ প্রভাবশালী ব্যাক্তি হলেই তাকে শাইখ নামে ডাকা হয় প্রাচীন আরবে, যে চল আজও বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ‘সেখ বা শাইখ’ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পরিচয়জ্ঞাপক পদবীতে রুপান্তরিত হয়েছে। এবারে ‘জিয়াউল’, এর মানে ‘জ্যোতি’। আরবিতে জিয়া বা দিয়া, দুটো শব্দের প্রতিশব্দই আলো

আমাদের বংশের আদি পদবী হচ্ছে মিস্ত্রী, বিভিন্ন দস্তাবেজ ঘেঁটে লিখিত তথ্যে যা পাওয়া যায় সেই অনুযায়ী আমার উর্ধ্বতন পুর্বপুরুষের নামগুলো হচ্ছে-

  •  সেখ মোহাম্মদ সামসুল হক (আমার পিতা)
  •  সেখ ফজলুল হক
  •  সেখ নাকিবুদ্দিন হক মিস্ত্রী
  •  সেখ বাবুলাল মিস্ত্রী
  •  সেখ আমিন মিস্ত্রী
  •  সেখ হানিফ মিস্ত্রী
  •  সেখ আলি হোসেন মিস্ত্রী
  •  সেখ ইফতিকার মিস্ত্রী

ইফিতিকার মিস্ত্রীর পূর্বের কোনো পুরুষের লিখিত ইতিহাস নেই। ইতিহাসের পথে পদবীর অন্বেষণ যাত্রা এ দফায় এটুকুই


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...