শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫

ভক্তঃ একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ

 

ভক্ত

 দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে, সঙ্ঘের অফিস বাড়ির সামনে স্তুপাকৃতি চিঠিপত্রের বাঁধা ঠেলে বেড়িয়ে আসছে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী ‘বীর সাভারকর’। গুরু গোলওয়ালকার স্বয়ংসেবকদের দানকরা রক্তে খাগের পেন ডুবিয়ে সংবিধান রচনা করছে কেশব ভবনে বসে। বাঁশের খুঁটির ডগায় চড়ে দীনদয়ালজী গেরুয়া রঙের পতাকা বাঁধছে। খাকি হাফপ্যান্ট পরিহিত অটল-লালকৃষ্ণ জুটি তখন ৬০ টাকার পেনসনভোগী পলাতক গান্ধীকে ফেরত আনতে রাজমাতা এলিজাবেথের কাছে সংস্কৃতে চিঠি লিখতে ব্যস্ত, ABVP এর প্যাডে। এলাহাবাদের আনন্দভবনে নেহেড়ু আর আম্বেদকর নামের দুই দেশদ্রোহী মনুস্মৃতি পোড়ানোর দায়ে জেলবন্দি, আন্দামানে তড়িপার করার নক্সা আঁকছে স্বয়ং বালাকৃষ্ণ মুঞ্জে। ওদিকে মাননীয় হবু প্রধানমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তার ট্রেডমার্ক ‘শ্যামা কোট’ পরিধান করে আগামীকাল দুপুরে লালকেল্লা থেকে ভাষন দেবেন বলে প্রম্পটার দেখে দেখে বলা প্রাক্টিস করছে। লাহোর থেকে চট্টগ্রাম অবধি আসুমদ্রহিমাচল ধ্বনিত হচ্ছে ‘নমস্তে সদা বৎসলে মাত্রুভূমে’।

লাহোর থেকে মানে! পাকিস্তান কই! কোথা থেকে জঙ্গি আসবে? কাটা মোল্লার বাচ্চা গুলোকে কোথায় পাঠাবো! মহান গডসে কাকে মারবে? মোদীজি কাকে দোষ দেবে নেহেড়ু প্রথম প্রধানমন্ত্রী না হলে! ধুর খেলবোনা, এ স্বপ্ন বাতিল। ধড়ফড় করে জেগে উঠলো রামশোধন মাতব্বর, উফ কী ভীষণ দেশদ্রোহী স্বপ্ন ছিলো, শাহ জী জানতে পারলে UAPA ধারা পাক্কা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কানাইয়া কুমার বলে, নিজেই নিজেকে গালি দিয়ে নিলো খানিক। সেই যবে থেকে সে স্বয়ংসেবক হয়েছে, তবে থেকে স্বপ্নদোষ হওয়া বন্ধ ছিলো, আজ আবার- নিশ্চই কোনো দেশদ্রোহীর কুনজর লেগেছে।

২০১৪ সাল থেকে দেশে অমৃতকাল এসেছে মোদীজির কল্যাণে, সনাতনীরা প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে। তখন থেকেই গলার শির ফুলিয়ে ‘মোদী, মোদী, মোদী’ করে এসেছে রামশোধন। বর্তমানে সে ১৯টা হোয়াটস্যাপ গ্রুপের এ্যাসিট্যান্ট ভাইস এডমিন পদে রয়েছে, স্থানীয় শাখায় জলসত্র দপ্তরের সহকারী অধক্ষ্যও বটে। ৩ বছর ধরে গোরক্ষপুরে রীতিমত বডি ফেলে রেখে ‘মসজিদ নৃত্য’ শিখে এসেছে। যোগীজির গেরুয়া ইজেরের দিব্যি কেটে বলা যায়, তার চেয়ে ভালো নাচ কম লোকেই নাচে। এই তো গত রাম নবমীতে আকবরপুর জামা মসজিদের সামনে ডিজে বাজিয়ে পাক্কা ৪ ঘন্টা ননস্টপ তান্ডব নৃত্য নেচেছিলো, কাটার বাচ্চা গুলো তবুও বেড় হয়নি এটাই আক্ষেপ।

বসাক পাড়ার পকাই ফটোসপে বেশ চোস্ত, তাকে দিয়ে মন্দিরে গোমাংস ফেলার ছবি, বাংলাদেশে মূর্তি ভাঙার ছবি, লাভ জিহাদ, রোহিঙ্গা, বাংলাদেশী সহ সব বিভাগে ইনোভেটিভ সংবাদ ‘তৈরি’ করাতে যে ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করেছে- তার স্বপ্নে কিনা পাকিস্তান গায়েব! নিশ্চই মোল্লাপাড়ার আব্দুল ব্যাটা জিন চালান করেছিলো, তারাই এই সব অপস্বপ্ন চালান করেছে তার সনাতনী হৃদয়ে। যাই হোক, শুদ্ধিকরণ জরুরি। হঠাৎ করে মিছিলের সমস্বর স্লোগানের মত ‘তুমিও গোঁয়ার আমিও গোঁয়ার, হেডগেওয়ার হেডগেওয়ার’ ধ্বনিত হলো, এটা রামশোধনের মোবাইলের স্বদেশী রিংটোন।

ফোনের ওপাড় থেকে নির্দেশ এলো ১১টার ট্রেন ধরে মুরুলীধর স্ট্রিটে যেতে হবে, বিকালে IT সেলের বিজয়া মিলনোৎসব। নাগপুরের ঐশ্বরিক খোঁয়াড় থেকে আনা ‘কসমিক গোবর’ এর বসে খাও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে, এছাড়া বোনাস প্রাপ্তির বিষয়টাও আছে। সাংসদ পরেশ রাওয়াল স্যার তার ‘তাজ’ সিনেমার প্রচারে আসছেন, উনিই ‘বসে খাও’ এর বিচারক। প্রথম ৩ বিজয়ীকে ওনার ‘সর্বরোগহরা মুত্র’ সহস্তে পান করাবেন। রামশোধন উল্লাসে ফেটে পড়লো। কিন্তু তার আগে আব্দুলের পাঠনো ওই নিষিদ্ধ দুঃস্বপ্নের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে গোমুত্র পান করতেই হবে, নতুবা কোনো শুভকাজে সাফল্য আসবেনা। গোয়ালে গিয়ে দেখলো গরুগুলো চড়তে নিয়ে গেছে তার বাবা, মনমড়া হয়ে জানালার দিকে চাইতেই দেখতে পেলো রাজুর চায়ের দোকানে ধর্মের ষাঁড়টা দাঁড়িয়ে আছে। খুব রগচটা, আর তেমন পালোয়ান গোছের। রামশোধন জয় বাবা গো-পিতা বলে যেই না তার অণ্ডকোষ ছুঁতে গেছে, ষাঁড় বাবাজি সার্কাসের জিমন্যাস্টের মত চকিতে পাক খেয়ে রামশোধনের ওই-কোষ লক্ষ্য করে মারলো ঢুঁসো।

জ্ঞান হারাবার আগে রামশোধন বুঝতে পারলো, গো-পিতার ঢুঁসো তারও যোগীদশা প্রাপ্তি ঘটালো, মানে আঁটকুড়ো আরকি। কী জানি ষাঁড়টার কী মনে জাগল, সে অচৈতন্য রামশোধনের মুখে প্রায় ৫ লিটার মুত্র ও কিলো দেড়েক গোবর ত্যাগ করে ওকে শুদ্ধি স্নান করিয়ে, কেমন যেন মাকুদের মত ফিচেল হাসি হাসি মুখে হেলতে দুলতে চলে গেলো। মুখে মুতের ছিটে পড়তেই খানিকটা জ্ঞান ফিরে পেয়ে রামশোধন আবার স্বপ্ন দেখলো- নেহড়ুই প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানও রয়েছে, শুধু স্বাধীনতাটা ৯৯ বছরের লিজে নিয়েছে দেশদ্রোহী গান্ধী।

উফ, একে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস, সব কিছু রিসেট হতেই বুক থেকে যেন একটা ‘মাজার’ নেমে গেলো। এটাও বুঝলো, গো-পিতার তরফে ওটা ঢুঁসো রূপে- ‘ফ্যাক্টারি রিসেট’ বাটনে চাপ দিয়ে রিস্টার্ট করার প্রক্রিয়া ছিলো। দুম করে তন্দ্রা ছুটে গিয়ে ব্যাথায় ককিয়ে উঠেও মেসেজটা হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড করে দিলো। মনে মনে গো-পিতাকে ধন্যবাদ জানালো, আব্দুলের তাবিজ কবজ থেকে তাকে মুক্ত করার জন্য। আজ এটা নিয়েই একটা সম্পূর্ণ প্রতিবেদন লিখবে ‘নন্দীর লীলা’ শিরোনামে। আজ নির্ঘাত এক্সট্রা বোনাস পাওয়া যাবে মণ্ডলীতে।

হ্যাঁ, রামশোধন। এরা একটা প্রাইমেট বর্গের মনুষ্যেতর প্রজাতি, মূল আবাসস্থল উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, হরিয়ানা হলেও আজকাল সারা ভারতেই এদের দেখা মেলে। বিশেষ করে মানুষের মতই আকৃতি প্রকৃতিতে, কিন্তু কিছুটা তিমি মাছের মত- জলে থাকে কিন্তু মাছ নয়। আসলে বিচার বুদ্ধিতে এরা পুরোটা অভিযোজিত হয়নি, বিশেষ করে মস্তিষ্ক এখনও হোমিনিডি বর্গেরই রয়ে গেছে। বানর থেকে মানুষ হওয়ার পর্যায়ে সবকটা বাঁদরের মানবে উত্তরন ঘটেনি, যে কটা ওই মাঝামাঝি- কী যেন বলে, হ্যাঁ ট্রান্সজেন্ডার বা বৃহন্নলা পর্যায়ে কিছু রয়ে গিয়েছিলো, তারাই রামশোধনের পুর্বপুরুষ।

প্রাইমেট কুলে রামশোধনের জাতের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘হোমো চাড্ডিয়েন্স’, দেশীয় নাম ভক্ত। ওরাংওটাং, শিম্পাঞ্জি, গরিলাদের যেমন প্রভেদ আছে, তেমনই নৃতত্ত্ব বিজ্ঞান অনুযায়ী ভক্তদেরও নানান বর্গ ও উপবর্গ ভেদ রয়েছে। কোথাও এরা বজরং দল, কোথাও হিন্দু সংহতি, শিবসেনা, ABVP, স্বয়ংসেবক, গোরক্ষক, কর্ণি সেনা প্রভৃতি নানান পর্যায়ের বিবর্তিত জনপুঞ্জ দেখা যায়। গবেষকেরা এদের দেখা পেতে রামনবমীর দিন যেকোনো মসজিদের সামনে তাক করে বসে থাকে, বাৎসরিক মাইগ্রেসন রুটে তারা মসজিদের সামনে আসবেই আসবে, তাদের পুর্বপুরুষের দেখানো পথে।

রামশোধন তথা ভক্তদের মূল কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট রয়েছে। এরা বেদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা জাতীয় কোনো ধর্মগ্রন্থই পড়েনা, শুধু হোয়াটস্যাপ পড়ে। এদের বীজ মন্ত্র হচ্ছে ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’, তাই ওকে ‘হিন্দুভীর’ হয়ে ধর্ম রক্ষা করতে হবে, এটাই দায়িত্ব। সেই রক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়ে সর্বক্ষণ চেঁচামেচি, মারামারি, খুনোখুনি, দাঙ্গা হাঙ্গামা করা এদের ডেলি রুটিনের অংশ। রা সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মগুলিতে সবচেয়ে পরিলক্ষিত হয়।

 

(২)

সমসাময়িক ভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভক্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অন্ধভক্ত শব্দটি এদের অলঙ্কার এরা মূলত নরেন্দ্র মোদীর কট্টর সমর্থক, এদের কাছে সমস্ত লৌকিক দেবদেবীর উর্ধ্বে মোদীজির অবস্থানমোদীজির যে কোনো কাজের সমালোচনা এদের কাছে অত্যন্ত নিন্দনীয়- অপবাদ ও অপরাধমূলক কাজ। একচেটিয়াভাবে মোদীজির প্রতি অন্ধভাবে আনুগত্যই ধর্মের তথা হিন্দুত্ববাদের প্রকাশ। এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভয়াবহ পরস্পরবিরোধী অত্যন্ত বিতর্কিত, তাদের সকল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মোদীজির কর্মকান্ডের উপরে নির্ভরশীল।

হোয়াটস্যাপের উৎস থেকে পাওয়া তথ্যকেই এরা একমাত্র মানদণ্ড হিসাব করে, সেই সকল মিথ্য তথ্য গুরুত্ব সহকারে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া এদের দৈনন্দিন কর্তব্যসোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ ফ্যাক্ট চেক করলে তাকে চিন, জর্জ সোরেস কিম্বা পাকিস্তানের দালাল হিসাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়, গ্রুপে গ্রুপে খাপ বসানো হয়। মোদী সরকারের সমালোচনার বিরুদ্ধে গলার শিরা ফুলিয়ে প্রতিবাদ করাই এদের কাছে- ধর্ম রক্ষা করার সংজ্ঞা

এদের কাছে মোদীপ্রেম মানেই দেশপ্রেম, মোদী সহ বিজেপি নেতাদের প্রতি প্রশ্নহীন সমর্থনই একমাত্র জাতীয় কাজ, এটাকেই তারা দেশভক্তি হিসাবে দেখে। সাম্প্রদায়িক ঘৃণার আবহাওয়া সৃষ্টি করে বৃহত্তর সামাজিক মেরুকরণ এদের মূল লক্ষ্য। ধর্মান্ধতার বিচারে এরা তালিবান, আইসিস, মোসাদ, নাইট টেম্পেলার, আল কায়দা বা এই জাতীয় যেকোনো আন্তর্জাতিক মৌলবাদী সংগঠনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম, কিছু ক্ষেত্রে তাদের চেয়েও এরা অনেক বেশী এগিয়ে। মনুবাদী জাতীয়তাবাদ, গেরুয়া শাসনব্যবস্থা, উগ্র হিংসা এবং আদানি-আম্বানির প্রতি নিষ্ঠা ভরে আনুগত্য এদের নিজেদের সমাজে উত্তরণের একমাত্র পথ।

অন্ধভক্তের আরেক বড় গুণ হচ্ছে তারা নিজ চরিত্রের সমালোচনা সইতে পারেনা। প্রশ্নাতীত আনুগত্য এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ছাড়াই এরা মোদীজি BJP কে সমর্থন করে কোনো নীতির ধার ধারেনা, এরা কখনও ব্যর্থ হয়না, প্রতিটা কাজই মাস্টারস্ট্রোক। কোনো ধরণের বিতর্কে অংশগ্রহণ করেনা। তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন সব কিছুর প্রমাণকে চক্রান্ত ও কুৎসা বলে দাগিয়ে দেয়। মোদী সরকার বা বিজেপির যেকোনো নেতার কাজের সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেয়, এবং সমালোচককে জাতীয়তাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে তীব্র হিংস্র প্রতিক্রিয়া জানাবিজেপির নেতাদের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য যাবতীয় কুযুক্তি তথ্যহীন এঁড়ে গোঁয়ার তর্ক বানিয়ে নেয়।

ভিন্ন মতামতের প্রতিটা ব্যক্তিদের সকলকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আপত্তিকর কুরুচিকর ভাষায় গালিগালাজ সহ, নানান ধরণের ব্যক্তিগত পর্যায়ের আক্রমণ শুরু করে। তারা অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, মোদীজি কোনও ভুল করতে পারেন না এবং জনসাধারণের কাছে দায়বদ্ধ নন। রাজ্য ভেদে এদের নানান প্রাদেশিক শ্রেনী থাকলেও, বিজ্ঞানসম্মত ভাবে এদের মূলত সাতটি ভাগে শ্রেনীবিভাগ করা হয়।


) শিক্ষিত ভক্তঃ এরা হোয়াইট কলার ভক্ত। এরা কখনই সরাসরি ভক্তপনাকে সমর্থন করেনা, কিন্তু এদের কথাবার্তা, কাজকর্ম সবকিছু দিয়ে এরা ভক্তগিরিকে বিজ্ঞাপিত করে। এরাই নাগপুরের গোয়াল ঘরের তরফে GI ট্যাগ প্রাপ্ত বুদ্ধিজীবি ও তাদের স্বীকৃত উচ্চবর্গীয় প্রতিনিধি। এরা সুচতুর ভাবেন্যান্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে অনেকটা রেখে ঢেকে, এরা গণেশের মুন্ডু প্রতিস্থাপনকে ইতিহাসের প্রথম সার্জারি, অর্জুনের বাণকে মিশাইল বা রাবনের পুষ্পক রথকে প্রথম বিমান হিসাবে মেনে নেয়, যতই যুক্তি তর্ক করা হোক। এরা মোদী ছাড়া সরকারের অন্যান্য প্রায় সকলের নামে মৃদু সমালোচনা করে, ধর্মের নানান লৌকিক আচার নিয়েও কঠোর সমালোচনা করে। মোদী সরকারের বিরুদ্ধে উঠা যাবতীয় অভিযোগ এরা শুষে নেয় স্পঞ্জের মত, এরা মূলত যাত্রা দলের বিবেকের মত কাজ করে। নিন্মোক্ত সকল ধরণের ভক্তদের বাড়াবাড়ি দেখলে এরা খুব করে ‘বকে’ দেয়। এরা মূলত সাংবাদিক, উপদেষ্টা, সাংসদ, ফিল্মস্টার, শিক্ষায়তনের অধ্যক্ষ, বিচারপতি ও আমলা হিসাবে সমাজে বিরাজ করে।

) ধান্দাবাজ ভক্তঃ এদের কাছে ভক্তগিরি কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা এবং রাজনৈতিক ফায়দা তোলার যন্ত্রএরা সুবক্তা হয়, ফলে উষ্কানি দিতে এদের জুড়ি মেলা ভার। এরা নিরীহ জনগণকে ভক্ত হতে উৎসাহ দেয়। অশিক্ষিত হিংস্র ভক্তদের এরা নিয়ন্ত্রন করে গ্রাউন্ড লেভেলে, এদের ভিড়কে পুঁজি করে এরা উগ্রবাদী সমাজে দ্রুত জনপ্রিয় হয় এবং সরকারী ভাবে ভোটে জিতে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। অশান্তি বা দাঙ্গা লাগলে এরা ব্যবসায়িক ভাবে আর্থিক লাভ খুঁজে নেয়, তাই হিংস্র ভক্তদের দিয়ে এরা সর্বক্ষণ দাঙ্গা বাধাঁনোর ছক কষে। পলায়নে এরা যথেষ্ট পারঙ্গম, তাই কোনো ধরণের দাঙ্গা, হাঙ্গামা, মারামারি, হানাহানি বা কাটাকাটিতে নিজেরা সরাসরি অংশ নেয়না, তাক বুঝে ঠিক কেটে উঠেপঞ্চায়েত সদস্য থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা অবধি এই বর্গের মধ্যে পরে।

) বিদ্যার্থী ভক্তঃ দেশের প্রথম সারির কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাদের খুঁজে পাওয়া যায়না, অথচ মধ্যম ও নিম্ন মানের অধিকাংশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে- তারাই এই শ্রেণীর ভক্ত। না বয়স না শিক্ষাদীক্ষা, কোনো দিক থেকেই এরা ছাত্র নয়, কিন্তু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এরা বছরের পর বছর ধরে নিযুক্ত থাকে। শুরুতে এরা কোনো শিক্ষিত ভক্তের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কিশোর বয়স থেকেই ভক্তপনার হাতেখড়ি পেয়ে থাকেপরবর্তীতে কোনো মতে একটা ক্যাম্পাসে ‘ছাত্র’ রূপে ঢুকে, সরলমতি ছাত্রছাত্রীদের মনে সাম্প্রদায়িকতার ঢালতে থাকে, এই বিষাক্ত পরিবেশকে এরা ‘যুব দাবী’ ও ছাত্র রাজনীতির নাম দেয়।

এই কাজে এদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো- বাম এবং সেকুলার ছাত্রছাত্রীরা। এরা অন্যান্য বাকিদের চেয়ে পড়াশোনা, বাৎসরিক রেজাল্ট, যুক্তি তর্ক, জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যেহেতু এগিয়ে থাকে, তাই এরাই ভক্তদের মুখ্য শত্রু। এদেরকে ভক্তসমাজ মাকু-সেকু নামে ডাকে। এই মাকু-সেকুদের বিরুদ্ধে কলেজ ক্যাম্পাসে অকারনে হুজ্জোতি করা এই শ্রেণীর ভক্তদের মূল কাজ, এতে করে দ্রুত সকলের নজরে আসা যায়। নানান ধরণের কুসংস্কৃতি ও অপবিজ্ঞানকে ধর্মের অংশ বলে প্রচার করে। মুসলমান, দলিত ও আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের বুলি করা, তাদের উত্যক্ত করা, তাদের পঠনপাঠনে নানা ভাবে সমস্যা সৃষ্টি করাটাকেই তাদের মূল সিলেবাস মনে করে। রক্তারক্তি করা, শিক্ষালয়ে পুজোর আয়োজন করে ডিজে সহ নাচানাচি ও মদ গাঁজার আসর বসানো, চুরিচামারি করা, শিক্ষকদের হেনস্থা করা, মেয়েদের অশ্লীল ভিডিও সোস্যালমিডিয়াতে ছেড়ে ব্ল্যাকমেল করা এদের দৈনন্দিন রুটিন।

) ছুপা ভক্তঃ এরা মূলত গিরগিটি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এরা বাস করে, ডান, বাম, অতিবাম, জাতীয়তাবাদী, গান্ধীবাদি, সমাজবাদী, মধ্যমপন্থী সর্বত্র এরা বিরাজ করেঅন্তর থেকে পূর্ণ সাম্প্রদায়িক, কিন্তু ভদ্রসমাজে থাকে বলে সেকুলারের মুখোশ পড়ে থাকে। এরা সমাজের বুকে সর্বদা ভালোমানুষ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এরা ‘রাজনীতি বুঝিনা কিন্তু মোদীজিকে খুব ভালো লাগে’ মন্ত্র জপে। যেকোনো বিষয়ে এরা অরাজনৈতিক, কিন্তু মোদীর বিষয়ে সমালোচনা এরা কিছুতেই সহ্য করেনা- হাাজার হোক উনিই তো আমাদের প্রধানমন্ত্রী। রাই কথায় কথায় আউড়াতে থাকে- দেশের স্বার্থে কিছুটা কষ্ট না হয় সইলেন। তাতেও সামনের জন না বুঝলে বর্ডারে আমাদের সেনাদের কথা ভেবেছেন কখনও’ কিংবা সিয়াচেনের টেম্পারেচার জানা আছে ইত্যাদি জাতীয় মোক্ষম জবাবে সামনের জনকে ঘায়েল করে দেয়।

এরা গান্ধীর মতের অনুসারী, কিন্তু গডসেকে দোষী মানতে নারাজ। সাভারকার এদের কাছে বীর, RSS ঐতিহ্যবাহী পবিত্র দেশপ্রেমিক সংগঠন, শুধু তাদের মতাদর্শে বিশ্বাস করেনা। এরা বিশ্বাস করে ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’, আর চারটে বিয়ে করে গণ্ডা গণ্ডা বাচ্চা পয়দা করা মুসলমান গুলোই দেশের উন্নয়নের আসল বাঁধা। তাই মুসলমান ছাড়া বাকি সমস্ত জাতিকে এরা হিন্দু বলে মনে করে; দলিত, আদিবাসী, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রীষ্টান এমনকি ইহুদিদেরও। এরা স্বঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ, কিন্তু পয়লা বৈশাখে নিরামিষ খাওয়ার ফতোয়াকে সমর্থন করে, যে কোনো জঙ্গিহানাকে ‘ইসলামিক মৌলবাদ’ শব্দে ভূষিত করে। কোরবানি তথা ধর্মের নামে গোহত্যার ভয়ানকভাবে বিরোধী, কিন্তু অষ্টমীর দুপুরে কবজি ডুবিয়ে পাঁঠার মাংস খেয়ে ফেসবুকে পোষ্ট করে- পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন

) ভার্চুয়াল ভক্তঃ  এরা বাস্তবের কোনো জীব নয়, এরা সার্কাসের জোকারের মত সারাবছর ধরে সোস্যালমিডিয়াতে ভাঁড় গিড়ি করে বেড়ায়। এদের যাবতীয় বিক্রম ফেসবুক, এক্স হ্যান্ডেল, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের কমেন্ট সেকশনে। এরা অধিকাংশই ভাড়াটে সৈনিক, পেশাদার দিনমজুর। একজন ব্যাক্তি ২০টা আলাদা আলাদা নামে অস্তিত্ব খুলে রাখে, ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াবার জন্য। যত বেশী কপি পেষ্ট, যত বেশী টুলকিট, যতবেশী হ্যাসট্যাগ, যত বেশি গালিগালাজ, যত বেশী শেয়ার করতে পারবে- তত বেশী রোজগার আসবে বিজেপির IT Cell নামের বিশেষ প্রোপ্যাগান্ডা মেসিনারির অফিস থেকে। এদের মূল শক্তি একতাতে, একজন কেউ আক্রান্ত হলেই শয়ে শয়ে ভক্তের দল ঝাঁপিয়ে পরে। বাম, সেকুলার ও মোদীর সমালোচোকদের এরা সর্বক্ষণ রোমান হরফে লেখা অসংখ্য বানান ভুল সমৃদ্ধ বাংলাতে- কাঁচা খিস্তি, মেয়েদের রেপ থ্রেট এমনকি মার্ডারের হুমকিও দেয়।

যেকোনো প্রোপ্যাগান্ডাকে বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে দিতে এদের জুড়ি নেই। এরা মূলত কোনো একটা সেন্ট্রালাইজড হোয়াটস্যাপ বা ফেসবুক গ্রুপ থেকে বিষাক্ত পোষ্ট, কমেন্ট ইত্যাদি কালেক্ট করে। এরপর একেকজন গোটা পঞ্চাশ গ্রুপে সেটা পাইকারি হারে শেয়ার করে দিয়ে গায়েব হয়ে যায়। এরা সাধারনত কমেন্টের জবাব দেয়না, যুক্তি তর্কের মাঝে আসেনা। যেহেতু এরা দলবদ্ধ ভাবে ‘শিকারে’ আসে, তাই ইতিহাস বদলে দেওয়া, ভূগোল বিকৃত করা, কুসংস্কারকে প্রমোট করা, সাহিত্যকে ব্যাঙ্গ করা, ধর্মীয় রূপক বর্ণনাকে বিজ্ঞান বলে চালানো, ইত্যাদি অপকর্মে এদের সমকক্ষ মেলা ভার। কারো বাবা মারা গেছে বলে একটা জ্ঞাপনামূলক পোষ্ট করেছে, কারো হয়ত ব্রেকাপ হয়েছে বলে দুঃখের পোষ্ট করেছে, কারো সন্তান হওয়ার খুশি, কারো বিদেশ ভ্রমণ, কেউ অর্শের ব্যাথায় কাতর হয়ে পরিত্রান চেয়ে পোষ্ট করেছে- এরা সর্বত্র লিখে আসবে, “মোদী হ্যাঁয় তো মুমকিন হ্যায়’। এরা আজন্ম নির্বোধ, কিছু বোঝেনা, কিছু শোনেনা, যার দেওয়াল পায় সেখানেই গোবরের ঘুঁটে দিয়ে আসে। এরা বর্তমানে এক্সপোজ হয়ে যাওয়া প্রজাতি, সোস্যালমিডিয়াতে মূলত পিওর কমিক রিলিফে পরিনত হয়েছে।

) অশিক্ষিত ভক্তঃ এরা হনুমানকে পিতা ও গরুকে মা হিসাবে দাবী করে। এদের মগজে ঘিলুর পরিবর্তে কাঁচা গোবর থাকে। নিজেরা গু গোবর খায়, পুজো এলেই জনগণকে গরু ও বাঁদরের মত শাকপাতা খেতে বাধ্য করে, তালিবানি ফতোয়া জারি করে। যে হিন্দু ধর্ম নিয়ে সারাদিন চেঁচায় মাতা’ রবে এলাকা অতিষ্ট করে রাখে, সেই ধর্মের কোনো বই এর নূন্যতম ১ পাতাও সারাজীবনে পড়ে দেখেনা। ধর্ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবার হুমকি দেয়’যেকোনো পরিস্থিতিকে এরা দাঙ্গায় পর্যবাসিত করে দিতে পারে, ধর্ম নিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক আলোচনা হলে ১ মিনিটের মধ্যে এরা গালাগালাজে নেমে আসেমোদীজিই এদের একমাত্র বিশ্বাস ও আস্থার স্থান, উনিই সবকিছুর আধার। এরা মূলত কল কারখানায়, ট্রেনে বাসে আর চায়ের দোকানের মত নানান ভিড়ের মাঝে দলবেঁধে থাকে।

) হিংস্র ভক্তঃ এরা অশিক্ষিত ভক্তদেরই অনুরূপ, শুধু হিংস্রতা’ গুণটা এদের আলাদা করে দেয়এদের কাছেও ধর্ম=মোদী, অতএব মোদীকে কিছু বলেছে বা যোগী, কিম্বা RSS এর সমালোচনা করেছে- ব্যাস; লাঠিসোঁটা, রামদা, টাঙ্গি, তরোয়াল বা কাট্টা বন্দুক দিয়ে ‘গোলি মারো শোলোকো’ গায়েত্রী মন্ত্র জপতে জপতে খুনোখুনি শুরু করে দেয়। সনাতন ধর্ম বিষয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকলেও, নিজেদের ধর্মের রক্ষক হিসাবে দাবী করে এবং খুন, জখম, রাহাজানি করাটাকে পবিত্র কর্ম মনে করে। ধর্মীয় দাঙ্গা হচ্ছে এদের তীর্থক্ষেত্র। ধর্মের নামে হত্যা করা এদের কাছে পূন্যার্জন। মুসলমান ও ছোট জাতের হিন্দুরাই এদের মূল শত্রু, এদের নিকেশ করাটাই এদের ব্রত।

আজকের চরম পুঁজিবাদী অতি দক্ষিণপন্থার অন্ধ রাজনীতির যুগে, দেশে দেশে এই ধরণের ভক্তেরা বিরাজ করছে। দেশে ভেদে তাদের নাম আলাদা আলাদা। ক্রণি ক্যাপেটালিজম তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ধর্মের মোড়কে এই জম্বি জাতকে জন্ম দেয়, ধর্মের আরক খাইয়ে তাদের লালন পালন করে। জম্বিদের দল যখন পূর্ণ রূপে ধ্বংস ক্ষমতা অর্জন করে, তাদের দ্বারা সৃষ্ট বিনাসের রক্ত পান করে পুষ্টি নেয় পুঁজিবাদ।

প্রাচীন গ্রীক, রোমান, মিশরীয় সভ্যতা থেকে বিগত শতকের হিটলার, মুসোলিনি বা তোজো- এরাও প্রত্যেকে নিজেদের ভক্ত সমাজ তৈরি করেছিলো। ইতিহাস সাক্ষী, বর্ষার ব্যাঙের ছাতার মতই এদের আয়ুষ্কাল অতি স্বল্প ইতিহাসের নিরিখে। জন্মায়, হানাহানি করে আবার ইতিহাসের অতল গহ্বরে বিলীন হয়ে যায়এই ভক্তরাও একদিন বিলীন হয়ে যাবে কালের আস্তাকুড়ে, আমাদের প্রজন্ম অনেক ভাগ্যবান যে, ভক্তদের মত ইতিহাসের দুষিত জীবানুদের সাথে লড়ে টিকে থাকার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের উত্তরপুরুষ নিশ্চিত এ নিয়ে গর্ব করবে।

আপনার কাছে অষ্টম প্রজাতির সন্ধান থাকলে জানাবেন, আমার এই গবেষণাপত্রে জুড়ে নেবো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...