উত্তরবঙ্গের বন্যাঃ ম্যান মেড ডিজাস্টার।
কিন্তু সেই ‘ম্যান’ গুলোর সামাজিক পরিচয় কী? তারা কোন রাজনৈতিক দলের? প্রসাশনিক ভাবে কারা তাদের সেল্টার দেয়? ৭০-৩০ ভাগের আড়ালে আসলেই তো এগুলো ম্যানমেড ডিজস্টার। সরি, ওম্যান মেড।
দুই মাসের বাচ্চা ভেসে চলে যাচ্ছে, মান্নীয়া তার স্বরচিত গানের ছন্দে দোলা ডোনা গাঙ্গুলির
নাচে মনোনিবেশ করে ছিলেন, হাত দুলিয়ে নাচছিলেন। দক্ষিণ কোলকাতায় ব্যাঙে মুতলে কোচবিহারের ইস্কুলে
ছুটি ঘোষণার বিষয় গুলো আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে, তাই সে প্রশ্নে নতুন করে কারো কোনো হেলদোল হয়না। উনি
হাম্বা রাম্বা চোপ শব্দে ধমকে চমকে দেন, তারপর কিছু টাকা ছুঁড়ে মারেন বুভুক্ষু মুখের উপরে, সব শান্ত হয়ে যায়। ভারতে প্রতি
মিনিটে ৪৫ জন নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে সরকারি হিসাবে, সেখানে গত ১৫ দিনে কোলকাতা ও উত্তরবঙ্গ বন্যা মিলিয়ে মোট
৪৫ জনও মরেনি, তাহলে
সরকার কেন মিছিমিছি উতলা হবে! মিনিটে যে পরিমান আগামীর ভোটার বাড়ছে, সেখানে বিপর্যয়ের নামে বছরে দু-দশ
হাজার মরলে ‘সেটা কোনো বড় কথা নয়’।
বাইরের রাজ্য সিকিম, বিহার ও পড়শি দেশ নেপাল ভুটান থেকে এই প্রথমবার জল পশ্চিমবঙ্গে এলো? লক্ষ লক্ষ বছর থেকেই তো আসে, যখন মানুষ ছিলোনা তখন থেকেই আসে।
বাম আমলেও আসত, আজও আসে, হাজার বছর পরেও আসবে। মান্নীয়া
মানুষকে বোকা নয়, বোকাচো'দা ভাবে তাই এই
আলবাল যুক্তি দেয়। একটা সাংবাদিকের বুকের পাটা নেই যে- এই কথা গুলো বলে। বিজেপি
উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক শাসক, তাই মুখে কুলপ। কিন্তু বামেরা? তাদের মুখ ও পিছনে কে মুলো গুঁজে রেখেছে যে এই প্রশ্ন
গুলো তুলতে পারছেনা? দলের পক্ষ থেকে অফিসিয়ালি কোনো কড়া, যুক্তি ও তথ্য সহ ছিঁড়ে খাওয়া বিবৃতি নেই। এক অদ্ভুত নরম
মোলায়েম দায়সারা বক্তব্য- ইতি।
পাহাড়ে বৃষ্টি হলে ডুয়ার্সের সমতল ভাসবেই, নদীতে নাব্যতা নেই, দু'কুল ভাসানোই দস্তুর। মূর্তি, কুর্তি, নেওরা, মাল, জলঢাকা, তোর্সা, সংকোশ, জয়ন্তী, শিশামারা, ডায়না, করতোয়া, রায়ডাক, কালজানি সব নদীর এক হাল। ভুটানের
পাহাড় কেটে রোজ কতশত রেক ভর্তি করে মালগাড়ি চলে যাচ্ছে সিমেন্ট ফ্যাক্টারিতে, জয়গাঁও ফুন্টশোলিং অঞ্চলে গেলেই
এর প্রমাণ পেয়ে যাবেন। সেই খাদান ধোয়া ‘সাদা’ মাটি ডুয়ার্সের নদীখাত বুজিয়ে
দিচ্ছে। সাপটানা, মুজনাই এর মত নদী গুলো নর্দমাতে পরিনত হয়েছে।
অর্থ আসছে সরকারি কোষাগারে- তার মূল্য নিশ্চই আসানসোল বাসি দেবেনা। সিকিমে
প্রো-বিজেপি সরকার, তারাও ‘বিকাশ’ এ মন দিয়েছে। ২০২৩ এ চুংথাং বাঁধ ভাসিয়ে নিয়েছিলো, সরকার শিক্ষা তো নেয়ইনি, উল্টে আরো জোরকদমে ধ্বংসলীলা
চালাচ্ছে উন্নয়নের নামে। আজও যারা নর্থ সিকিম ভ্রমণ করেন তাদের চোখের দুপাশে
ধ্বংসস্তুপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আজও লাচেন লাচুং এর রাস্তা সারাই হয়নি, ডিক-চু ড্যাম আজও নড়বড়ে। মানুষ
মরে মরুক, তাতে পুঁজিপতি ও
তাদের রক্ষাকর্তা দক্ষিণপন্থী সরকার গুলোর কীইবা যায় আসে! অবশ্যই এগুলো ম্যান মেড
ডিজাস্টার।
৩ দিনের সাইটসিয়িং এ যারা পাহাড়ে বেড়াতে আসেন, তাদের অন্য কোনো খারাপ কিছুতে নজর
যাবেই না- পাহাড়ের এমনই মোহনীয় রূপ। কিন্তু আমাদের মত যারা সারাবছরই প্রায় পাহাড়ে
থাকি, তাদের চোখে
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ছাপিয়ে স্থানীয় মানুষদের লোভের কুৎসিত রূপটাও ধরা পরে। নদীর
পাড় কেটে বালি নিয়ে যাওয়া, যথেচ্ছ বোল্ডার উত্তোলন, যেখানে বাড়ি বানাবার পার্মিশন নেই সেখানে ৩ তলা পাকা কন্সট্রাক্সন এখন
এলেবেলে ব্যাপার। এর সাথে রয়েছে সীমাহীন দুষণ। চিপস এর প্যাকেজ সহ নানান প্লাস্টিক
প্যাকেজ, সিঙ্গেল ইউজড
পাস্টিকের বোতল, ব্যবহৃত
কন্ডম সহ, যতভাবে পাহাড়কে
ধর্ষণ করা সম্ভব, সমতলের লোকেরা সেটা করে আসছে রোজ, বছরে ৩৬৫ দিন। এ বিষয়ে পাহাড়ের স্থানীয়েদের কোনও
ভ্রুক্ষেপ নেই, প্রশাসন
নির্বিকার, বিশেষ
করে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ ও নেপালের বিস্তীর্ন অঞ্চলের স্থানীয়দের। এর দায় কী
বীরভূমের শিউড়ির লোক মেটাবে?
দার্জিলিং জেলাতে কটা নদী আছে আমরা কেউ কখনও খোঁজ করিনি। রাম্মাম নদী, সিরিখোলা নদী (শ্রীখোলা), লোধমা নদী, রিয়াং নদী, ছোট রঙ্গীত নদী, রঙ্গীত নদী, বড়ো রঙ্গীত নদী, পম্পা নদী, রঙ্গিও নদী, রঙ্গু নদী, রাঙ্গাং নদী, মাণ্ডিং নদী, রংবি নদী, রঙ্গিয়াক নদী, রতু নদী, রিলিং নদী, কাহিল নদী, রিংরিয়াৎ নদী, কলোক নদী, মেচী নদী, রংবং নদী, পাইয়াংডং নদী, পোসাম নদী, বালাসন নদী, পাচিম নদী, সুলিয়াসি নদী, দুধিয়া নদী, মারমা নদী, মতুয়া নদী, রকতি নদী, রুহমি নদী, সেবক নদী, মহানন্দা নদী, মামঝা নদী, চেঙ্গা নদী, মুলিয়া নদী, পঙ্খাবাড়ি নদী, পঞ্চাই নদী, লাচিও নদী, কুরুনডাক নদী, তপু নদী, চৈয়াটি নদী, দুমারিয়া নদী, দুল দুল নদী, কুয়ের্চি নদী, রিংচিটং নদী, জোড়াপানি নদী, ফুলেশ্বরী নদী, তিস্তা নদী ও চিঙা নদী প্রতিটার
এক দশা, যা ভয়াবহ ও
বিপদসীমার উপরে চলে গেছে। এই ছোট ছোট নদী, উপনদী গুলো প্রতিটা ভয়াবহ দূষনে আক্রান্ত সাথে বালি
মাফিয়াদের দৌরাত্মে পঙ্গু। পাহাড়ি নদী খাতের বড় বড় বোল্ডার গুলোই তো খরস্রোতা নদীর
তীব্র জলস্রোতকে নিষ্ক্রিয় করে, সেগুলোই হাঙরের দল তুলে নিয়ে চলে গেছে। এগুলো ম্যান মেড ডিজাস্টার না হলে
কোনটা হবে?
সিকিমেও পাইকারি হারে স্বাভাবিক পরিবেশের মা মাসি করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প
বানানো হয়েছে। শুধু তিস্তা নদীর উপর ৪৭টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে তিস্তা-৩ বাঁধ, পূর্ব ভারতের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ
প্রকল্প, যেটা ২০২৩ সালে
বন্যায় ধ্বংস হয়ে যাবার পর আরও শক্তিশালী কংক্রিট কাঠামো দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা
চলছে। এছাড়া তিস্তা-৫ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, রঙ্গিত-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, রঙ্গপো বাঁধ, রঙ্গলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, চুজাচেন এইচইপি প্রকল্প সহ এমন
বহু প্রোজেক্ট গড়ে উঠেছে। এই বাঁধ প্রোজেক্ট গুলো অতি বৃষ্টির জল একসাথে প্রায় একই
মুহুর্তে ছাড়ে সবগুলো মিলে, যার সবচেয়ে বেশী প্রতিঘাত পরে নদী ঠিক যেখানে মুক্ত গতি পায়, সমতল ছোঁয়ার ঠিক আগের অঞ্চলটাতে-
কালীঝোরা থেকে সেবকের মধ্যে NH 10 এ নিত্য ভূমিধ্বস তাই অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। তিস্তা ছাড়াও রঙ্গিত, লাচুং চু, লাচেন চু রংপো চু, জেমু চু, রানীখোলা, ডিক-চু, রংয়ং চু সহ কটা উপনদীর একই হাল।
নেপালের ইলম ড্যাম বিপুল জল ছেড়েছে, কোশী প্রভিন্সে সব তছনছ, ৩৭ জন মৃত, অসংখ্য নিঁখোজ। মেচি নদী চুড়মার করতে করতে সব ভাসিয়ে
সমতলে নামছে। ভুটান আরেক কাঠি সরেস,পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে হ্যাজ নামানোতে খিলারি, ওদিকে তোর্সার রিভারবেডে 'আমো চু টাউনশিপ' বানিয়ে উন্নয়নের নামে প্রকৃতির
মাকে ১০৮ বার নিচ্ছে। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে দুর্নীতির অমৃতকাল চলছে, এই জাতিদের কে বাঁচাবে? ম্যান মেড ডিজাস্টার এর বাইরে আর
কোনো জুতসই বাক্য খাপ খায় কি?
এর সাথে রয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়ে অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট
কর্পোরেশন লিমিটেড (NHIDCL) এর পাহাড়ের পেট ফুটো করে ট্রেনের জন্য টানেল বানানোর প্রকল্প। হিমালয়ের এই
ভঙ্গুর অঞ্চলে আপনি যদি এই লেভেলের বিকাশ করেন, তার মূল্য দিতে হবেনা? পশ্চিমবঙ্গের জোরপোখরি, সেঞ্চেল, মহানন্দা, চাপরামারি, জলদাপাড়া, গরুমারা, হাতিপোতা; ওদিকে সিকিমের ফামবং, কংশলা, বার্সে, মায়নাম, প্যাঙ্গোখোলা, সিংবু, কিতাম, স্লিংডং সহ প্রতি অভয়ারণ্য সরকারি
মদতপুষ্ট রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা চোরাচালানকারি ও স্থানীয় নেতাদের ডাকাতির অভয়ারণ্য
হয়ে উঠেছে।
হিমাচল প্রদেশের বিপাসা নদীতে বা উত্তরাখণ্ডের ক্ষীরগঙ্গা নদীর বন্যাতে ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিলো- হাজারে হাজারে গাছের গুঁড়ি ভেসে আসছে প্রবল জলের তোড়ে, গতকাল তোর্ষা নদীতে একই দৃশ্য দেখা গেছে। এগুলো নিশ্চই ক্যানিং বা ঘাটালের লোক কাটেনি, ন্যাওড়া ভ্যালি উদ্যান, সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যান সহ কাঞ্চনজঙ্ঘা জাতীয় উদ্যানের বনভূমির জঙ্গল কেটে সাফাই করে পাচারের জন্য রাখা ছিলো, এগুলো থেকেই যে এসেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অবশ্যই ম্যান মেড ডিজাস্টার।
ঘরছাড়া কমরেডদের জন্য এভাবে কখনও ত্রাণ গেছে? যারা তোলামুলের অত্যাচারে ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পরিযায়ী হয়ে
গেছে তাদের খবর কে রেখেছে? রাস্তাঘাট সব খোলা, কেন্দ্র রাজ্য দুটো সরকারই ত্রাণ নিয়ে পৌঁছাচ্ছে। অবশ্যই তেলা মাথায় তেল
দিতে হয়, কথায় আছে ‘ব্যাহেতি গঙ্গা মে হাত ধোনা হ্যায়’- সেটাই চলছে। সমস্যা শুদধু উত্তরবঙ্গে নয়, উত্তর বিহারেও একই অবস্থা।
হাসপাতালে অবধি জল ঢুকে গেছে, সোস্যালমিডিয়াতে ভাইরাল সেই
ছবি। নেপালের বাগমতী, ইলম, কোশি, মদেশ অঞ্চল অতি বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত।
বাগমতি, হনুমন্তে, মনোহরা,
ধোবিখোলা, বিষ্ণুমতি, নখু, বলখু ইত্যাদি নদীগুলো হরপার জলে গর্জাতে
গর্জাতে বিহারে ঢুকছে। নেপাল জুড়ে মৃত্যু মিছিল, সরকারি
ভাবে ১০০ ছাড়িয়েছে। সুনসারি, উদয়পুর,
সাপ্তারি, সিরাহা, ধনুশা, মহোত্তরি, সরলাহি,
রাউতাহাট, বড়, পারসা, সিন্ধুলি, দোলাখা,
রামেছাপ, সিন্ধুপালচোক, কাভ্রেপালচোক, কাঠমান্ডু, ললিতপুর, ভক্তপুরা- জুড়ে অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ,
বিপুল ধ্বস। হরপা বানের ভোগান্তি বিহারের মানুষও ভুগছে।
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ডুয়ার্সের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। বন্যপ্রাণী সমৃদ্ধ গ্রীষ্মমন্ডলীয় বন, চা বাগানের সবুজ গালিচা এবং ঢেউ খেলানো সমভূমি জুড়ে অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্ণা, নদী থেকে উঠে আসা নিচু পাহাড়। ডুয়ার্সের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে চা, পর্যটন এবং কাঠের ব্যবসার উপরে। কিন্তু শেষ ১৫ বছরে এই এলাকার জন্য মমতা সরকার কোন এমন একটা কাজ করেছে যার জন্য এই তিনের একটারও উন্নতি হয়েছে, কিম্বা চতুর্থ কোনো দিশা দেখাতে পেরেছে?
সোস্যালমিডিয়া জুড়ে দেখা যাচ্ছে বিপন্ন বন্য জন্তুর দল জলের তোরে ভেসে
যাচ্ছে, কেউ কেউ ক্লান্ত
শরীরে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে, কেউ জলের সাথে অসম যুদ্ধে হেরে মৃত লাশ হয়ে সমতলের দিকে ভেসে যাচ্ছে।
লক্ষ্য লক্ষ্য গাছের গুড়ি নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, যা চর্ম চক্ষে বিশ্বাস করা মুশকিল। আবার কিছু অঞ্চলের
মানুষ বন্যার জলের তোর থেকে ভেসে আসা সেই গাছের গুঁড়ি সংগ্রহ করছে, জীবন সংগ্রামের এ এক আলাদাই
উপজীব্য।
মহানন্দা, কালিন্দি, পূর্ণভবা, টাঙ্গন, পাগলা, কুলিক, করতোয়া, আত্রেয়ী, পুনর্ভবা, ব্রাহ্মণী, গামারী, জলঙ্গী, ভৈরব, ময়ূরাক্ষী, ফুলহার, চুর্নী, বিদ্যাধরী, মাঠভাঙা, চুমরি, মুড়িগঙ্গা, অঞ্জনা, ইত্যাদি নদী গুলো দিয়ে নেপাল, ভুটান সহ সিকিম, দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ের জল নামছে, তাই দুই দিনাজপুর জেলা, মালদা সহ নদীয়ার নিম্ন অববাহিকা অঞ্চল গুলো নতুন করে প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। উত্তরবঙ্গে ভারি এফেক্ট পরেছে কমবেশী সর্বত্র, কিন্তু ঢালু ভূমি রূপের দরুন অধিকাংশ জল খুব অল্প সময়ে নিম্নবঙ্গ তথা বাংলাদেশ ও মধ্য বঙ্গের দিকে নেমে যাবে। সুতরাং মালদার ভুতনির চরের মত এলাকাগুলো আবার নতুন করে জল যন্ত্রনা ভোগের মধ্যে পরে যেতে পারে।
শেষ ৫-৭ বছরের বেশী সময় ধরে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শাসক বিজেপি।
এগুলো সবই আগে রাম পরে বাম প্রকল্পের অধীনস্ত ফসল। পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি তো বটেই তার সাথে
প্রায় সব MLA, MP ই বিজেপির। দেবী দুর্গা যখন কালীঘাটের দেবীকে গার্ড অফ অনার দিতে দিতে
কার্নিভ্যালে হাঁটছিলেন- কালীঘাটের দেবী সেখানে ছক কষছিলেন কার ঘাড়ে দোষ ফেলা যায়।
ম্যান মেড বলার আগে এটা ভুলে গিয়েছিলো যে সেই ম্যান গুলো তার দলেরই একেকটা রত্ন।
আর সেই সব ম্যানকে কন্ট্রোল করা উনি সুপার ‘উম্যান’।
সরকার যখনই বিপদে পরে বামেদের রেড ভলেন্টিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে উঠা যাবতীয় ক্ষোভ ও রাগ স্পঞ্জের মত শুষে নেয়। কালচিনি থেকে কাকদ্বীপ- যাবতীয় অভিযোগের যথাসাধ্য প্রশমন ঘটাতে ত্রুটি রাখেনা তারা। আলিমুদ্দিনের তেমনই হুকুম অঘোষিত ভাবে, সাধ করতে তোলামুলের বিমান ব্যানার্জী- ২৯ বছর ধরে থাকা ফ্রন্টের চ্যেয়ারম্যানকে ‘সৌজন্যের’ জন্য ডাকেন! এক অদ্ভুত মিথোজীবীয়তা, সরকারের ব্যার্থতা পুষিয়ে দিতে এদের পন করা রয়েছে- পালটা যুক্তিও রয়েছে, “একটা বাম দলের কাজটা কী”? এই ধরণের। হ্যাঁ, পারলে পোঁদটাও চেটে দেবেন, তৃনমূল বলে কী গু ঘেঁটে ছোঁচাতে তাদের ঘেন্না লাগেনা!
মূল বিপর্যয়ের এলাকা কোন গুলো? দার্জিলিং এর মিরিক মহকুমা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ, এছাড়া বিজনবাড়ি, পালবাজার ও সুখিয়াপোখরি ব্লক এই
অতিবৃষ্টি জনিত হরপা বাণের শিকার হয়েছে। ২৪ ঘন্টায় ২৮৮ মিলিমিটারের কাছাকাছি
বৃষ্টিপাত হওয়াতে এখানেই সবচেয়ে বেশী মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ২৮ জন। জলপাইগুড়ি, আলুপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলাতেও
২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটারের মত বৃষ্টি হয়েছে। আলিপুরদুয়ারের কালচিনি ও
আলিপুরদুয়ার-১ ব্লক, কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ, কোচবিহার ১, কোচবিহার ২ এবং হলদিবাড়ি ব্লকগুলির মধ্যে, পারমেখলিগঞ্জ, হেমকুমারী, বকশিগঞ্জ, নেহেরু নগর কলোনি, পাটলখাওয়া, পুটিমারি, সাতসিংমারী হরিণচৌড়া, এবং পুন্ডিবাড়ির বাঁশদহ-নটিবাড়ি অঞ্চলে ব্যাপক
ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জলপাইগুড়ির বানারহাট আর নাগড়াকাটা অঞ্চলে মূল বিপর্যয় হয়েছে। শিলিগুড়ির
পোড়াঝাড় অঞ্চলে লোকে হাহাকার করছে, আপনি ১টা ছবি দেখান সেখানে কোনো রেড ভলেন্টিয়ার রয়েছে।
মারাত্বক সংকটাপন্ন স্থানে মালগুলো যায়নি, বা সেখানে অস্তিত্ব নেই। শিলিগুড়ি শহরতলী, জলপাইগুড়ির শহরাঞ্চলে হাঁটুজলে
গিয়ে কুমিরডাঙা খেলছে। যাদবপুরের শ্রমজীবি ক্যান্টনের তো উচিৎ ছিলো নাগরাকাটা, বিজনবাড়ি, কালচিনি বা মেখলিগঞ্জে গিয়ে
‘জনসেবার দোকান’ খোলা, উঁহু সেসবে তারা নেই। যাদবপুরের গোঁড়ালি ডোবা ড্রেনের জলে তাদের যাবতীয়
বিপ্লব। বিস্তীর্ণ উত্তরবঙ্গ জুড়ে রেড ভলেন্টিয়ার, ক্যান্টিন করুননা প্রগতিশীল পদ্ধতিতে, নাকি খগেনের ক্যালানি দেখেই
প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে গেছে ভক্ত বাম্বাচ্চাদের দল!
বাকি রইল খগেন মূর্মু ও শঙ্কর ঘোষ। তারা ক্যালান খেয়েছে এ নিয়ে দুঃখও যেমন
নেই, উল্লাসও নেই।
দূর্গা প্যারেডের সময়েই গতকাল এই স্ক্রিপ্ট লেখা হয়ে গিয়েছিলো। বন্যা নিয়ে, ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে, বিপর্যয় নিয়ে, ২৫ জনের উপরে মৃত্যু নিয়ে কোনো
আলাপ আলোচনা সমালোচনা নেই। মিডিয়া জুড়ে শুধুই রক্তাক্ত খগেন।
কিন্তু প্রশ্ন তোলা যাবেনা, মালদার খগেন কেন? এলাকার বিধায়ক পুনা ভেঙরা বা সাংসদ মনোজ টিজ্ঞা কোথায়? এর জবাব আলিমুদ্দিন থেকে এসেছে-
ওরা প্রাক্তন বাম, তাই মানুষের দুঃখ সইতে না পেরে দুর্গত এলাকাতে ছুটে গেছে। উফ, বামপন্থার গেরুয়া পরাকাষ্ঠা, বাজাও তালি। আচ্ছা- খগেনের সাথে
থাকা CRPF জোয়ানেরা কী
‘বসে ক্যালাও’ অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলো? তারা কেন কেউ কিছু বলেনি? একটা ব্লাঙ্ক ফায়ারও তো করতে পারত! শঙ্কর ঘোষ হেঁটে
যাচ্ছে এমন একটা ভিডিওতে- ১৫ থেকে ২৫ বছরে ছেলেপুলের দল ছেঁকে ধরে বিক্ষোভ
দেখাচ্ছে, এরা যখন এলাকা
পরিদর্শনে গেছে, এদের
দলের সমর্থকেরা কোথায়? অপদার্থ বামেদের সৌজন্যে রাজ্যে বিজেপির ভোট আছে, ভোটার নেই।
কারা খগেনকে ক্যেলিয়েছে? স্বতস্ফুর্ত? উঁহু, অবশ্যই
তোলামুলের মদতপুষ্ট লোকজন। বিরোধী তৃণমুলের এটাই তো চারিত্রিক বৈশিষ্ট, গোটা উত্তরবঙ্গে তোলামুল বিরোধীর
আসনেই বসে আছে। তারা সর্বজ্ঞ বামেদের মত ৭২ ঘন্টার চিন্তনের পর একটা বিবৃতির
চোদনামো করেনা, না গ্রীন
ভলেন্টিয়ার নামায়। সোজা শাসককে ক্যালায়, যেমন বাম আমলে সিপিএম ক্যালাতো। তারা অসভ্য, তারা চোর, তারা দুষ্কৃতী, তারা ধর্ষক কিন্তু ওদের দিয়েই
ওদের নেত্রী রাজনীতিটা করিয়ে নেয়। সুধীজন সেজে থাকার চুতিয়াগিরিটা করেনা।
যেকোনো অঞ্চলের লোকের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ বর্ষণ হয় পঞ্চায়েত সদস্যের উপরে, কারণ তাকে সবসময় হাতের কাছে
পাওয়া যায়। তাহলে উত্তরবঙ্গের ওই সব অঞ্চল, যেখানে তৃণমূলের পঞ্চায়েত রয়েছে সেখানে তৃণমূলের সদস্য
বা প্রধানের বিরুদ্ধে লোকের ক্ষোভ নেই, এটাকে মানতে হবে? পাতি কার্ণিভালের খেমটা নাচ আর সেটাকে কেন্দ্র করে মদের
আসরের বেলেল্লা নিয়ে পাবলিক ছি ছি করতেই চটজলদি এই সমাধান- আলোচনার নজর ঘুরিয়ে
দাও, অতএব উত্তরবঙ্গে
বিজেপির কোনো একটা আবাল মালকে কেলিয়ে দাও। ফলও হয়েছে হাতেনাতে, দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে টুইট
করছে, পাব্লিক এখন
ক্যালানের আলোচনা নিয়েই ব্যস্ত, গতকাল কার্ণিভালের বেলেল্লাপনা মার্কেট থেকে গায়েব।
এটাই ফারাক, একদল আইপ্যাক নিয়ে ঘুঁটি সাজাচ্ছে, আরেক দল প্যাক-মানি নিয়ে ভলেন্টিয়ার ভলেন্টিয়ার খেলছে মার্ক্সের দিব্যি খেয়ে, অন্য দল ক্যালানি খাওয়াকে USP করে ভোটের বাজারে সহানুভুতি কেনার ফিকিরে জিকির করছে। দাঙ্গা লাগানোর অজুহাত খুঁজছে। এর ফাঁকে প্রত্যেকে ফটোশ্যুট করে সোস্যাল মিডিয়া গরম করতে ত্রুটি রাখছেনা, শুধু যার হারাচ্ছে সে সর্বহারা হচ্ছে।
আজকাল কোনো দুর্ঘটনা
মানেই সোস্যালমিডিয়া জুড়ে যেন একটা ইভেন্ট শুরু হয়ে যায়। কেউ পক্ষে হ্যাজ নামাচ্ছে,
কেউ বিপক্ষে, কেউ কেউ সব দিকে তাল মেলাচ্ছে। যে যার মনগড়া কাহিনী বানিয়ে ভয় ধরাচ্ছে।
বাস্তব গল্পটা অন্য, অবশ্যই দার্জিলিনিং শিলিগুড়ি রুটের রোহিনী
রোড ও মিরিকের রাস্তাও
ধ্বসের কবলে। তার মানে এই নয় যে পাহাড়ে পর্যটকেরা আটঁকে থাকবে বা রয়েছে।
পাঙ্খাবাড়ির রাস্তা খোলা, তিনধারিয়ার রাস্তা খোলা. শিটং থেকে মংপু লোহাপুল, রাম্বি হয়ে রাস্তা খোলা, লাটপাঞ্চার হয়ে চম্পাসারি হয়ে
শালুগাড়া পৌঁছানো সম্ভব। NH 10 খোলা, লাভা
গরুবাথাং রোড খোলা। মূল সমস্যা সোস্যালমিডিয়াতে, মিথ্যা প্রচারে। যেখানে সমস্যা সেখানকার খবর নেই, ভুয়ো অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মেতে
আছে সকলে।
এই আবহে কিছু ফুটেজখোরের দল উত্তরবঙ্গ অভিযানে চলেছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকেই তো উত্তরের পর্যটন মরসুম শুরু হয়। অতএব কারন যা খুশি হোক- যাওয়া নিয়ে ব্যাপার। কোলকাতা থেকে যারা যাচ্ছে, তারা কাকে সাহায্য করতে যাচ্ছে? নিজেদের ব্যাক্তিগত ইমেজ, নিজেদের রাজনৈতিক দলের ইমেজ রঙিন করতে? কেন্দ্র ও রাজ্য দুই প্রশাসনই ইতিমধ্যেই উপদ্রুত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে ত্রাণ নিয়ে। PM Care কবে কাজে আসবে? যে ভুটানের জলে তোর্ষা নদীতে বন্যা, সেই ভুটানে ডিজেল ৬৪ টাকা। তারা ডিজেল ভারত থেকেই কেনে, তারাও ডিজেল বেচে লাভ করে। আর আমরা ৪০ টাকার ডিজেলে ৬০ টাকা কর দিই।
সেই বিপুল করের টাকায়
সরকার ত্রাণ দিক, নাহলে এই উদ্বৃত্ত টাকা বিজয় মালিয়া, মেহুল চোক্সীর মত-রা নিয়ে পালাবে, কিম্বা আম্বানি আদানি লুটঠে করে নেবে। তাই 'সবাই মিলে' অর্থ আর খাদ্য সামগ্রী ঝাঁপিয়ে পরতে হবে কেন? সরকার আছে, FCI আছে, কর্পোরেট আছে- তারা দিক। আমি কাল খেতে না পেলে আমাকে কে দেখবে! আমারও পাহাড়ে
ব্যবসা, আমিও পর্যটন শিল্পের
সাথে যুক্ত। আমারও ব্যবসা নেই হয়ে গেছে, আমাকে কে ত্রান দেবে? আমাকেও ৪০ জনের বেতন দিতে হয়, কে দেবে আমাকে ভর্তুকি? আমাকে কোন সরকার, কোন NGO, কোন সঙ্ঘ, কোন রেড ভলেন্টিয়ার, কোন জমিয়ত উলামা সহযোগিতা
করে পুনঃর্বাসন দেবে?
মানুষ যে তিমিরে ছিলো সেখানেই রয়েছে দুই ফুলের চক্করে। অসহায়, আর্ত জনগণ- ভগবানের ভরষাতে থাকা
ছাড়া আপাতত উপায় কী তাদের- বিশুদ্ধ ‘ওম্যান মেড’ হরপা বাণের চক্করে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন