(১)
এই প্রবন্ধটিতে আমরা এমন একটি বিষয়ের আলোচনা করব, যার দ্যোতনা আমাদের দৈনন্দিন দৃষ্টিভঙ্গিতে সচরাচর এড়িয়ে যায়। ভাবনাগত দৃষ্টিবিভ্রমের দরুন বিষয়টি নিয়ে সেভাবে কোনো স্পষ্ট ধারনা আমাদের মাঝে নেই। এটা এমন একটা জটিল ও বহুমুখী সাবজেক্ট যেখানে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ এর মত বহুজাতীয় বিষয়গুলো আপনার থেকেই চলে আসে, নতুবা বিষয়ের ব্যাপ্তিকে এই স্বল্প পরিসরে ধরাই যাবেনা। প্রায় সকল কবি, সাহিত্যিক, সমালোচক, বুদ্ধিজীবীরা যৌনতাকে ফ্যান্টাসাইজ, রোমান্টিসাইজ করে গেছে। স্যুররিয়ালিস্টদের কলমে তুলিতে আঁকা পরাবাস্তব কল্পনার ছবি, গল্পের আড়ালে- যৌনতা ও তাকে কেন্দ্র করে চলা ফল্গুধারার অর্থনীতিকে কেউ কখনও দেখার বা ভাবার যোগ্যই মনে করেনি।
মানুষ যা নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করেনা তার উপরে কখনও আর্থিক লগ্নি করেনা, ফলে অর্থনীতির সাথে তার কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়না। যৌনতার চেয়েও বড় গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তিয় কর্ম হচ্ছে পায়খানা করা বা চালু ভাষায় হাগা, যেহেতু সকলেই হাগে তাই ফ্যান্টাসিজম নেই, এর সঙ্গে কোন অর্থনীতিরও সেভাবে যোগাযোগও নেই। যা কিছু সলভ ও সস্তা, যা সকলের কাছে রয়েছে তা নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করিনা আমরা। রাস্তায় পরে থাকা গু দেখে আমরা বলতে পারবনা সেটা হিন্দুর না মুসলমানের, আমেরিকান নাকি চাইনিসদের। আমরা বিরিয়ানি, পোলাও খেলে সোস্যালমিডিয়াতে তার ছবি দিই, সাদা ভাতের দিইনা, কারণ সাদা ভাত সকলের খায় ও ছবিতে আলাদা ভাবে বোঝা যায়না- চালটা মিনিকেট নাকি লালস্বর্ণ চাল। ফ্যান্টাসি তৈরি না হলে ঐচ্ছিক এমন কোন বিষয়ে অর্থনীতি ঢোকে না, তা যতই প্রাণদায়ী হোকনা কেন। বাতাসকে আমরা দেখতে পাই না বলে, তাকে নিয়ে ততটা ফ্যান্টাসি পালন করি না, যতটা না চাঁদকে নিয়ে করি; অথচ চাঁদ অনেক দূরে আর বাতাসে ঘেরা অবস্থায় আমরা বেঁচে থাকি।
আমাদের ভারত উপমহাদেশে চামড়ার রং নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করি। অথচ ইউরোপ আমেরিকায় মত সাদা চামড়ার দেশে চামড়ার রঙ তাদের কাছে ফ্যান্টাসাইজের বিষয়ই নয়, কারণ তারা সবাই সাদা। আমাদের দেশে চামড়া সাদা জন্য ক্রিম ইন্ডাস্ট্রি, বিউটি পার্লার গড়ে উঠেছে, আপনি ইউরোপ বা আমেরিকায় ফেয়ার এন্ড লাভলী বিক্রি করতে পারবেন? কিংবা আফ্রিকার কালো চামড়ার দেশে ফেয়ারনেস ক্রিমের কোনো বাজার আছে? পশ্চিমা সভত্যাতে যৌনতা অনেক বেশী খুল্লমখুল্লা, যেখানে যৌনতা কেন্দ্রিক বাজারের সংজ্ঞা আলাদা। আবার আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ সহ এশিয়ার প্রায় প্রতিটা দেশই যৌনতা নিয়ে আমরা চুড়ান্ত রকমের ফ্যান্টাসাইজ করি, সেহেতু এটাকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিটাও গোপনেই গড়ে উঠে। যেহেতু এমন কোনো বিষয় কখনও পড়ানো হয়নি, তাই চোখে দেখেও দেখিনা।
প্রতিটা অর্থনীতি গড়ে উঠে নির্দিষ্ট কারনের পরিপ্রেক্ষিতে। যৌনতা নিয়ে ফ্যান্টাসাইট করার মতন আমাদের মুখ্য কারণ হচ্ছে দুটো বিপরীত আলাদা আলাদা লিঙ্গ, যা একে অন্যকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করে। ফ্যান্টাসিজম নির্ভর করে- যা আমার কাছে নেই, অথচ অন্যের আছে, এটার উপর ভিত্তি করে। সমতলের লোক পাহাড়ে যেতে পছন্দ করে, ওদিকে পাহাড়ের বাসিন্দা সমুদ্র নিয়ে ফ্যান্টাসি করে। দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিটা ক্ষেত্রে আর্থিক মুনাফার যোগ আছে, সুতরাং যৌনতা শুধুই একটা জৈবিক চাহিদা বলে ‘অযৌক্তিক জুগুপ্সা’র মত উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের তৃতীয় বিশ্বে যৌনতা কেন্দ্রিক অর্থনীতি যতটা পরিসরে বিস্তৃত, পশ্চিমা দুনিয়াতে তার অর্ধেকও নেই। যৌনতা ততক্ষণ তীব্র আকর্ষনীয়, যতক্ষণ তাকে রেখেঢেকে প্রকাশ্যে আনা হয়। পশ্চিমা শৃঙ্খলাহীন খুল্লমখুল্লা যৌনতার কল্যাণে ‘আবিষ্কার’ করা কিম্বা চরম প্রাপ্তি বিষয়টাই নেই। আমাদের নিরিখে এই আগ্রহ হীনতা- তাদের সামাজিক অর্থনীতিতেও যে প্রভাব ফেলবে, সেটাতে প্রমানের কিছু নেই।
‘যৌন অর্থনীতি’ নামে কোনো সাবজেক্টের অস্তিত্ব আজকের তারিখ অবধি পৃথিবীতে নেই। কিন্তু এটা এমন একটা অদ্ভুত বিষয়, যা না থেকেও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে। আমাদের সমাজে যৌনতা হল বিবর্তনীয় এবং সামাজিক মনোবিজ্ঞানের একটি বিতর্কিত বিষয়। যৌন মিলনের আচরণকে বিশ্লেষণ করার কোনো অর্থনৈতিক মানদণ্ড নেই। ধর্ম, জাতি, স্থান ,কাল পাত্র ভেদে আমাদের সামাজ বহুধাবিভক্ত, যেখানে কোনো সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট যৌন নীতি নেই। প্রত্যেকের নিজশ্ব যুক্তি রয়েছে, যার কোনটা মুক্ত যৌনতার পক্ষে সাওয়াল করে, কোনটা স্টিরিওটাইপ ঐতিহ্যবাহী আন্তঃসাংস্কৃতিক বৈধতার উপরে ভিত্তি করে বানানো।
আজকের এই ডিজিটার যুগে পুঁজিবাদ আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম- যৌনতাকে পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। সোশ্যাল ইনঞ্জিয়ারিং এবং বিভিন্ন সফটওয়্যার টুলকিট, কুকি ব্যবহার করে, তথ্য যোগার ও তার বিশ্লেষণের মাধ্যমে- আমাদের আবেগ, প্রেম জীবন, যৌনতাকে পুঁজি বানিয়ে নিয়েছে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ ব্যাতিত একে যখন সাধারণ মানুষ দেখে, খুব অদ্ভুত আর বোকা বোকা লাগে। কিন্তু আপনি যদি পুঁজিবাদকে মানদণ্ড রেখে বোঝার প্রচেষ্টা করেন, তাহলে দেখবেন এরা জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সব জাইগা থেকে মুনাফা বের করে আনে। সুতরাং যৌনতা কেন্দ্রিক প্রতিটা প্রতিষ্ঠান, যেমন প্রেম, ভালবাসা, ডেটিং, বিবাহ, গণিকালয় এমন সকল ক্ষেত্রের একটা অর্থনৈতিক মুনাফার দৃষ্টিকোন রয়েছে, বাজার আপনাকে মনে করিয়ে দেয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। মূলধারার বাজার অর্থনীতির যে সরল দৃষ্টিভঙ্গি, তার চেয়ে এটা আমূল আলাদা।
নারী পুরুষের থেকে শারীরিকভাবে দুর্বল, তাই তাকে যৌন শাসন ও শোষণ দুটোই করা যায়। নারী শরীরকে ভোগ্য বস্তু হিসেবেই বিবেচনা করা হয়, আর্থিক কারনে যে ‘পছন্দসই’ যৌনতাকে সুলভে কিনতে পারেনা, তারা অধিকাংশই ধর্ষকামী হয়ে উঠে। বর্তমানে নারীদেহ বাজারের পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে ফ্যাশন, বিনোদন, বিজ্ঞাপন, বা সরাসরি যৌন বাণিজ্যের মাধ্যমে। ফলে শরীরের উপর অর্থনৈতিক চাহিদা তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের হিংস্র শোষণের এটা একটা প্রতীকী ছবি মাত্র।
যৌনতা সম্পর্কিত প্রতিটা সহিংসতা ও বলপ্রয়োগ, যেমন- ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি, গুন্ডামি, যৌন শোষণ ও দাসত্ব, যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে পাচার, কুমারীত্ব পরীক্ষা, অনুভূত যৌন অনুশীলন, যৌন অভিমুখীতা, লিঙ্গ পরিচয় এবং অভিব্যক্তি, পছন্দসই শারীরিক বৈচিত্র্যের অনুপস্থিতি জনিত সকল সহিংসতার প্রশ্নে, প্রায় ১০০% ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয়টাই পরিনাম নির্ধারন করে দেয়। যারা বেহিসাবি অর্থের মালিক, অধিকাংশ অত্যাচারি তাদের মধ্যে থেকে আসে; আবার যারা দরিদ্র, আর্থিকভাবে নিম্নবৃত্তের তারা শোষিতের দলে থাকে। এখানে সামাজিক পরিচয়, সৌন্দর্য, শিক্ষা কোনো কাজে আসেনা।
কেউ যখন কোন দেশ দখল করছে, সেটা তার অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করার জন্যই করে, দখলকৃত দেশের অর্থ সম্পদ লুট করে। আগেকার দিনে যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে সোনাদানা অর্থসম্পদের প্রাপ্তির পাশাপাশি, যুবতী মহিলাদের সম্পদ হিসাবেই লুঠ করা হতো। নারীর যৌনতা না থাকলে কে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ ও সময়ের অপচয় করত! সারা পৃথিবীর যুদ্ধ ও সংঘাতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নারীর শরীরকে প্রায়শই একটি প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্রে হিসাবে প্রতিকৃতি করা আছে। প্রতিপক্ষের ভূমি দখলের পাশাপাশি তাদের নারীদের শরীর ‘দখল’ করাকে বিজয়ের চূড়ান্ত স্মারক হিসেবে দেখা হয়। ধর্ষণ শুধুমাত্র একজন সেনা বা সেটলারের বিকৃত যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ নয়। এটি একটি বহুস্তরীয় বার্তা বহন করে- ক্ষমতার বার্তা, অপমানের বার্তা, দখলের বার্তা, এবং সবচেয়ে বড় হলো তাদের উপরে আর্থিক প্রভুত্বের বার্তা।
যৌনতা মানব জীবনের একটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য, যা লিঙ্গ
পরিচয়, যৌন অভিমুখীতা, কামোত্তেজকতা, আনন্দ, ঘনিষ্ঠতার এবং প্রজননকে প্রবাহিত করে। মানবের
চিন্তাভাবনা, কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস, মনোভাব, মূল্যবোধ, আচরণ, অনুশীলন এবং এগুলোর ভূমিকা- যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে স্বরূপে প্রকাশিত হয়। যৌনতা যখন আনন্দের
বহিঃপ্রকাশ, মানসিক সুস্থতার অন্যতম উৎস, মানসিক ও শারীরিক পরিপূর্ণতা ও তৃপ্তির কারন, সেখানে অর্থনীতিকে আসতেই হবে;
কারন আনন্দ, অসুস্থতা ও তৃপ্তির সাথে আর্থিক যোগ সরাসরি। যৌনতা জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আইনি,
ঐতিহাসিক, ধর্মীয় এবং
আধ্যাত্মিক, এমন প্রতিটা বিষয়গুলোর সাথে মিথস্ক্রিয়া করে সমাজে কর্তৃত্ব জাহির করে,
সেখানে অর্থনৈতিক ভাবে তার প্রভাব থাকবেনা, এটা হতে
পারে?
(২)
যৌনতা, প্রতিটা প্রাণেরই আগামীকে সৃষ্টির জন্য একে প্রয়োজন। প্রত্যেকের যৌনতার নিজ নিজ নিয়ম আছে, কিন্তু খুব কম প্রানই এমন আছে যাদের যৌনতা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সারাবছর ধরে 24x7 যে কোনো সময় চলতে পারে। প্রাইমেট বর্গের প্রাণীদের মধ্যে বেবুন, গরিলা, ম্যাকাক, শিম্পাঞ্জি, ওরাং ওটাং ও এদের মত স্বজাতীয়দের মধ্যে সারাবছর যৌনতা লক্ষ্য করা যায় বটে, এরাও যৌন সঙ্গমকে আনন্দ ও সুখ দায়ক হিসাবে নেয়, যৌনতার মাধ্যমে আত্মিক পরিতৃপ্তি বা ‘প্লেজার’ পেয়ে থাকে। গবেষকদের মতে, সিংহরাও অতি অল্প সময়ের মধ্যে বহুবার সঙ্গম করে, এই কারনে সারা বছর ধরে তাদের প্রজনন, আর সন্তানকে জন্মাতে দেখার সুখেই হয়ত যৌনতাকে আনন্দদায়ক মনে করে।
এছাড়া পুরুষ ডলফিন, সামুদ্রিক পুরুষ ভোঁদড়, কিছু প্রজাতির ইঁদুর যেন বেঁচেই থাকে যৌন মিলনের জন্য। পুরুষ মৌমাছি নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও যৌনতায় লিপ্ত হয়। প্যাসিফিক স্যামন মাছ ও গভীর সমুদ্রের অক্টোপাস- এরা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া থেকে মৃত্যুর আগের মুহুর্ত অবধি উন্মাদের মত, যখন তখন তাদের মত করে যৌনতাতে লিপ্ত হয়। এদের সমাজে হারেম অবধি দেখা যায়। প্রানী জগতে এদের বাইরে প্রায় সকলেই শুধুমাত্র প্রজননের তাগিদে বছরের একটা নির্দিষ্ট ঋতুতে যৌন সঙ্গম করে। পৃথিবীতে পান্ডাই সবচেয়ে কম যৌন আকাঙ্ক্ষা সম্পন্ন প্রাণী, এরা ছাড়া আর এমন কোনো প্রানী নেই যারা নির্দিষ্ট ঋতুতে বছরে কেবল মাত্র একদিন, একবারই যৌনমিলন করে। পাশাপাশি হ্যামস্টার নামের এক জীব আছে যাদের গড় আয়ু মোটামুটি ৩ বছরের আশেপাশে, এরই মধ্যেই কয়েকলক্ষ বার তারা যৌন সঙ্গম করে, মানে দিনে গড়ে ১০০ বার।
তবে যৌনতাতে সবাইকে ছাপিয়ে যায় স্ত্রী সিংহ, বিজ্ঞানীদের মতে স্ত্রী সিংহই পৃথিবীর সবচেয়ে কামুক প্রানী। শাবকদের দুধ ছাড়ার সাথে সাথেই সে আবার বুভুক্ষু যৌনতায় আগ্রহী হয়ে ওঠে, দলের প্রতিটি পুরুষ সিংহের কাছে নির্লজ্জভাবে প্রেম নিবেদন, আলিঙ্গন ও সঙ্গম করে। বেপাড়ার রসিক কোনো ‘পরপুরুষ’কে পেলে, তাকেও ছাড়েনা। এই ধরণের স্ত্রী সিংহ গুলো প্রতি ৩ দিনে ৩০০ বারেরও বেশী যৌন সঙ্গমে- আলাদা আলাদা পুরুষের সাথে মিলিত হয়। পুরুষ সিংহের উপরে শুয়ে পরা, সামনে অকারনে হেলেদুলে চলা, তীক্ষ ক্যানাইনের জান্তব হাসি সহ মন্দ মন্দ তালে নাচা ও বিচিত্র মনোরঞ্জক ক্যাটওয়াক করা, পুরুষের মুখের সামনে গিয়ে পশ্চাদদেশের ফেরোমন শোঁকানো, পুরুষের পাছায় থাবা দিয়ে চাঁটি মারা, কেশরে বিলি কেটে উত্তেজিত করা, ঘাড়ের কাছে আদুরে কামড় দেওয়া, নাক, মুখ ঠোঁট চেটে দেওয়া, মাথার চারপাশে তার লেজ জড়িয়ে রাখা, ক্রমাগত একটানা মিহি সুরে কান্নাকাটি করা, এমনকি এসবেও কাজ না হলে পুরুষ সিংহের অণ্ডকোষে কামড়ে অবধি দেয় এরা।
আজকের আলাপটা প্রাণীদের যৌনতা শীর্ষক নয়, বরং মানুষের যৌনতা ও তাকে কেন্দ্র করে গড়া অর্থনীতি নিয়ে। মানুষ একমাত্র প্রাণী যারা সবচেয়ে বেশী ফ্যান্টাসাইজ ও রোমান্টিসাইজ করে যৌনতাকে। মানুষ কল্পনায় যৌন সুখ পেতে হস্তমৈথুন করে তৃপ্তি নেয়। এমনকি ধর্ম ভেদে কোথাও অপ্সরা তো কোথাও হুর প্রাপ্তিকে- ইহজগতে সর্বোচ্চ পূন্যার্জনের মাত্রা হিসাবে গন্য করা হয়। পৃথিবীর আর কোনো প্রানীর মধ্যে হস্তমৈথুন বা হুর/অপ্সরা প্রাপ্তির জন্য, ধর্মপালনের নামে ভবিষ্যতের জন্য প্লেজার বা পরিতৃপ্তি সঞ্চয়ের কোনো নজির নেই। যৌনতাকে আনুষ্ঠানিক রূপদানের জন্য ‘বিবাহ’ নামে একটা কমপ্লিট উৎসব আয়োজনের প্যাকেজ রাখা রয়েছে, প্রতিটা সমাজে নিজ নিজ স্টাইলে। কবিতা, গান, সিনেমা, সমালোচনা, হানাহানি, খুন জখম কি না হয় কাঙ্খিত যৌনতাকে ছোঁয়ার জন্য। তাই মানুষের যৌনতার অনুরূপ ও আনুষাঙ্গিক কর্মকান্ড পৃথিবীতে আর কোনো জীবসমাজে নেই।
মানুষের যৌন কল্পনা শুধুমাত্র আনন্দ অনুভব করা বা উত্তেজনা বৃদ্ধি করার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে মনস্তাত্ত্বিক কাজ করে, অপূর্ণ চাহিদা পূরণে সহায়তা, সান্ত্বনা, অবসর বিলাস, এমনকি বিভ্রান্তি মুক্তির সহজ উৎস হিসাবে যৌনতাকে ব্যবহার করে। আমাদের সমাজে ‘কাঁচা’ গালিগালাজ গুলোও তীব্র যৌন গন্ধীময়। এখানে কোনটা অশ্লীল, যৌনতা নাকি গালিগালাজ সেই প্রশ্নের জবাবও কেউ কোনোদিন খুঁজেছে কী! সুতরাং, এই যৌনতাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা গড়ে উঠবেনা তা কী করে হয়! শুধুমাত্র যৌনতার অনুসারী বিষয় গুলোকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে শহরে গ্রামে, প্রতি দিন শত শত কোটি টাকার নানান ধরণের ব্যাবসা হয়।
যৌনতা হলো জীবের মৌলিক এবং সর্বজনীন অধিকার। আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘বিশ্ব যৌনবিজ্ঞান কংগ্রেস’ নামের একটা মঞ্চে, ২০১৪ সালে একবারই আলোচনা উঠেছিলো অর্থনীতির সাথে যৌনতা কেন্দ্রিক ব্যবসার সমীকরণ সম্বন্ধীয়, এরপর অজানা কারনে এ নিয়ে কেউ উৎসাহ দেখায়নি আর। বাম মতাদর্শে যাদেরকে শ্রেনী নামে ডাকা হয়, তাদের মধ্যে যৌন শোষণ ও নিপীড়ন সবচেয়ে বেশী, তার সবচেয়ে বড় কারন আর্থিক দুরবস্থা, এদের কাছে বিনোদনের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রই হলো বিছানা ও সহজলভ্য যৌনতা। তাই হয়ত এরিক হবসবম নামের এক ব্রিটিশ বামপন্থী লেখক, ‘বিপ্লব ও যৌনতা’ নামের একটা লম্বা প্রবন্ধ লিখেছেন গত ষাটের দশকে। কখনও সময় সুযোগ হলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান জাত, মার্ক্সবাদী-ফ্রয়েডিয়ান লেখক উইলহেম রেইখ এর একটা বই পড়তে পারেন, যৌনতা বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে বাধ্য। মাস সাইকোলোজি অব ফ্যাসিজম সিরিজের এক চমৎকার মনোজ্ঞ বিশ্লেষন হচ্ছে ‘দি সেক্সুয়াল ইকোনোমি অব পলিটিক্যাল রিয়েকশন অ্যান্ড প্রলেতারিয়ান সেক্সুয়াল পলিসি’ অধ্যয়টা, এগুলো নিয়ে আমাদের সমাজে কখনও আলোচনাই করা হয়না, কারন যৌনতাকে নিষিদ্ধ হিসাবে কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে দেওয়া হয়ে, গোপনে দুর্নীতির জন্য। যেদিন দেখতে শিখবেন ‘সর্বহারার’ যৌনতাও কেমন ভাবে নেই করে দেওয়া হয়, আর্থিক শোষণের মাধ্যমে; তখন আপনার ভাবনারা সেই ঘুরেফিরে অর্থনীতির বৃত্তেই ঢুকে পরবে।
ধরুন একটা অতি ভালো গোবেচারা ও ভদ্র পুরুষ, সেও যৌন সঙ্গম করে। একটি চাঁদপানা লক্ষীমন্ত মিষ্টি মেয়ে তারও যৌন জৈবিক চাহিদা সে নিজের স্টাইলে মিটিয়ে নেয়। প্রাকৃতিকভাবে আমাদের শরীর যন্ত্রের গঠনটাই এমন প্রোগ্রামে তৈরি, আপনার ইন্দ্রিয় আপনার কাছে তার ‘খোরাক’ দাবী করবেই। কামের প্রবৃত্তি নেশা পেয়ে বসলে তার নিবৃত্তি না করা অবধি আপনাকে মুক্তি দেবেনা আপনার রিপু। এখান থেকেই শুরু হয় যৌনতার অর্থকরী সফর। শুরুতেই যৌনকর্মীদের স্বতন্ত্র ভাবে উল্লেখ করলাম, মহিলা বেশ্যা বা পুরুষ জিগালো- সকল পেশাদার পতিতার রুটিরুটির একমাত্র উৎস যৌনতায় মোড়া শরীরকে পণ্য হিসাবে বিক্রি করা। এটা যৌনতা কেন্দ্রিক ক্রেতা বিক্রেতার প্রত্যক্ষ আর্থিক লেনদেন।
আমরা অনেকেই অর্থনীতি আর অর্থ এক মাত্রায় গুলিয়ে ফেলি।
অর্থনীতি হলো সমাজের মধ্যে সম্পদের উৎপাদন, বিতরণ এবং সুষ্ঠু ব্যবহার সম্বন্ধিত বিস্তৃত অধ্যয়ন, এখানে সম্পদ
বণ্টন ও এর সাথে সম্পর্কিত মানুষের আচরণ বিজ্ঞানের
প্রেক্ষিতটাকে ধরা হয়, যার বৃত্তটা অনেক বড়। যেখানে অর্থ,
(টাকা, ডলার, রুপি) হলো বিনিময়ের যন্ত্র মাত্র। অর্থনীতির বিতরণ অংশের একটি ছোট্ট ও নির্দিষ্ট হাতিয়ার, যা অর্থনৈতিক লেনদেনকে সহজতর
করে। এই কারনেই, এক পেট খিদে নিয়ে বিহার উত্তরপ্রদেশের মেয়েগুলো যখন প্রায় পূর্ণ
নগ্ন হয়ে সামনে গোলকরে ঘিরে বসা পুরুষগুলোর দিকে কুৎসিত ইঙ্গিত অঙ্গভঙ্গী করে, এটাকে
অর্থের নিরিখে মেলাতে পারবেননা, অর্থনীতি দিয়ে প্রেক্ষিতটাকে ধরতে হবে। যে শরীরটা এখানে
২০০ টাকার বিনিময়ে যৌন উষ্ণতা বিলোচ্ছে, সে ই কোনো বড় শহরের নাইটক্লাব কিম্বা ডান্সবারে
গেলে এর চেয়ে ১০ গুণ বেশী রোজগার করতে পারত। আপনি যেটাকে শালীনতা, লজ্জা, সভ্যতা বলছেন,
অদ্ভুত পোশাক পরিহিতা মেয়েটির কাছে সবচেয়ে ঘৃন্য অশালীনতা হচ্ছে খিদে। এটাকে ব্যাখ্যা
করতে গেলে সেই ফিরে যেতে হবে সম্পদের
উৎপাদন, বিতরণ এবং সুষ্ঠু
ব্যবহার, ও মানুষের আচরণ এর অধ্যয়নে।
কৈশোরের একটা পর্যায়ে আপনি রিপুর তাড়নাতে যৌন যাত্রা শুরু করবেনই করবেন। লাজুক হলে বুক ফাটলেও মুখ ফুটবেনা, সেক্ষেত্রে যতক্ষণনা ঘর থেকে এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করাচ্ছে, ততক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে অন্যের মিলনাত্মক গল্প দেখে ও শুনে, খালি বিছানাতে একাকী স্বয়ংসেবক হয়ে দিন কাটাতে হবে। যারা একটু সাহসী, তারা অন্বেষণে বেড় হয়; আর খেলুরে হলে অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটায়। প্রেমের নিত্যতা সুত্র বলছে- প্রথমেই কয়েকজনের প্রতি ক্রাশ খেয়ে সিলেবাস শুরু হয়, তাদের মধ্যে থেকে বিশেষ কয়েক জনকে ভাললাগা শুরু হয়, এই ভাললাগা থেকেই ক্রমশ ভালবাসার জন্ম নেয়। পাড়াতে, পড়শিতে, দূরসম্পরর্কের আত্মীয়, ইস্কুলে, টিউশুনিতে, বাজারে, হাটে, পুকুরপাড়ে, পার্কে যেখানে খুশি ‘এই প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে’ আপনি ধরা খাবেনই খাবেন। এই দশায় দুটো অপসন- যাকে প্রেম নিবেদন করেছেন সে প্রত্যাখ্যান করল, সেক্ষেত্রে সকল কাহিনী আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে। আর সে রাজি হয়ে গেলে অর্থনীতিতে তখন দুজন মিলেই কন্ট্রিবিউট করা শুরু করে দেয়।
এই যুগে আবার অনলাইন সিস্টেমে সবচেয়ে বেশী প্রেম হয় হোয়াটশ্যাপ, ফেসবুক, টিন্ডার, ইন্সটাগ্রামের মত হরেক এ্যাপে। এই টেক জায়েন্ট কোম্পানির মালিক থেকে চাপরাশি, সকলেই করে খাচ্ছে পক্ষান্তরে ‘যৌনতা’র বাজার বসিয়ে। মোবাইল ফোন কোম্পানি গুলোর অর্ধেক ব্যবসার টার্গেট কাস্টমারই এই অল্পবয়সি ছেলেপুলের দল, যারা প্রেম করে বলে স্টাইলিস ফোন লাগে ও সেগুলো বদলাতেও হয় নিত্য নিত্য। সুতরাং, প্রেম হোক বা না হোক, অল্পবয়সী ছেলেপুলে ফোন আর ডেটা কেনেই বিপরীত লিঙ্গের ‘মাল’ খুঁজতে।
যারা সফলতা পেয়ে যায় তারা গান, কবিতা, কোটেশন পোষ্ট করে, রিল ভিডিও দেখে। যারা ছ্যাঁকা খায় বা প্রত্যাখ্যত হয়, তারাও বিষাদ সিন্ধু হয়ে বিরহের কবিতা, গান, রিল দেখে ও পোষ্ট করে। মোদ্দা কথা মোবাইল কোম্পানি গুলোর আয়ের বড় অংশ এই ‘প্রেম খোঁজার’ আড়ালে থাকা সুপ্ত যৌনতা। আজকের দিনে নাহয় ডেটা কিনলে কল ফ্রি, কিন্তু যখন টকটাইম কিনতে হতো, রাত রাত ধরে কত যে রিচার্য করতে হতো তার লেখাজোখা নেই। সারারাত এই প্রেমালাপের জন্য মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানিগুলো কত যে সস্তার অফার বা স্কিম আনত তা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
শুরুর দিকে আমাদের প্রজন্মের লোকেরাই টাকা দিয়ে আলাদা করে SMS প্যাক কিনতাম। আজ হোয়াটস্যাপ চালাতে, ফোনে ফোনে প্রেম চালাতে, ইনকঙ্গিটো মোডে গুগুল ক্রোম চলাতে, ভিডিও কলে নিব্বা নিব্বি থেকে বুড়ো দামড়ার দলও ‘একবার দেখেই ডিলিট করে দেবো’ প্রতিশ্রুতির দায় মেটাতে- একমাত্র লাভবান এই ডেটা কোম্পানি গুলো। তারাও বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার করে রেখেছে। বিপুল সংখ্যার কর্মীরা চাকরি করে এই ইন্ড্রাস্ট্রিতে, টাওয়ার মেইনটেনেন্স, কেবল বিছানো, কল সেন্টার চালানো, বিজ্ঞাপন সংস্থাকে দেওয়া টাকাতে সেই ইন্ড্রাস্ট্রিকে চালানো- এমন বহু লক্ষ কোটি মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় ‘ফোন ও ডেটা’ জাত যৌনতার কারনে।
(৩)
টিকটক, রিলস আর শর্টস এর দুনিয়াতে সারাক্ষণ আধা ন্যাংটাদের নাচ দেখছে ৮ থেকে ৮০ বয়সের সকলে- এখানে যৌনতার পসরা সাজানো আছে রাশিরাশি। স্বয়ংসেবকদের জন্য হ্যামস্টারের দুনিয়াতে সানি-জনিদের হেডফোনওয়ালা ‘নিষিদ্ধ’ মুভির দৌলতে রমরমিয়ে একটা গোটা এডাল্ট ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি চলছে লক্ষ কোটি ডলারের। যার পুরো রোজগারটা আসে দৃশ্যমান রগরগে যৌনতাকে বিক্রি করেই। ডিল্ডো, পকেট স্ট্রোকার, ভাইব্রেটার সহ বিবিধ সেক্সটয় ইন্ড্রাস্ট্রিও রীতিমত লাভজনক ব্যবসা। আজকের দিনে কটা জিমে ছেলে মেয়েরা সুস্থ থাকার জন্য ওয়ার্কআউট করে! হট ও সেক্সি লুকের জন্যই অধিকাংশ ছেলেমেয়ে জিমে যায়। কতজন মহিলা চুল বা চামড়ার ট্রিটমেন্ট করাবার জন্য স্পা বা বিউটিপার্লারে যায়? যৌনতার বাজারে নিজেদের আরো আকর্ষনীয় করে তুলতেই এত আয়োজন। জিম আর বিউটিপার্লারের আয়ের অধিকাংশটাই গৌণ যৌনতা থেকে আসে।
আজকালকার প্রেম কিছুদিন গড়াতে না গড়াতেই ডেটিং এর পর্ব শুরু হয়ে যায়। ছেলে হোক বা মেয়ে, ডেটিং একটা বিশাল বড় মার্কেট গোটা দুনিয়া জুড়ে। গোপনে লুকিয়েই হোক বা প্রকাশ্যে সকলকে জানিয়ে, যৌবনকালে ডেটিং একটা পার্বণ বটে, একে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত স্তরে উত্তেজনা আর আকাঙ্ক্ষার সংমিশ্রণে- সাজসাজ রব উঠে যায়। এই পার্বণকে কেন্দ্র করে FMGC, ফ্যাশান ও পোশাক শিল্প বিপুল ভাবে নিজেদের লাভবান করে নেয়, সাথে রেস্টুরেন্ট সেক্টরেও অর্থের সঞ্চালনা বাড়ে। চকলেট, ফুলের বোকে, সফট ড্রিংক্স, সফট টয় এমন বহু মার্কেটের মুনাফাপ্রাপ্তি ঘটে। যাতায়াতকে কেন্দ্র করে ট্রান্সপোর্ট সেক্টর অবধি কামিয়ে নেয়, অথচ ওই দিন ছেলে-মেয়েটি ডেটিং এ না গিয়ে ঘরে শুয়ে ল্যাদ খেলে, এর একটা টাকাও খরচাও হতোনা। ভ্যালেন্টাইন ডে কিসের পরব! আমাদের ছোট বেলায় আমাদের দাদু-ঠাকুমা বা বাবা-মা কে কখনও বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করতে দেখিনি, সবই কর্পোরেটের আমদানি। সবটাই গৌন যৌনতা কেন্দ্রিক ব্যাবসা।
এরপর সম্পর্ককে আরও মসলাদার ও রোমঞ্চের স্বাদ দিয়ে ‘ওয়ো’ জাতীয় হোটেলে গেলে সেই সেক্টারেও টাকার লেনদেন হয়। আরেকটু সাহসী হয়ে যদি আপনি দীঘা, মন্দারমনি বা দার্জিলিং এর দিকে হাঁটা দেন, পর্যটন শিল্পও তখন এই যৌন অর্থনীতির স্বাদ পায়। দীঘার মত পর্যটন স্থানগুলোর অধিকাংশ হোটেল টিকেই আছে ‘লুকিয়ে যৌনতা’ উদযাপন বিলাসীদের সৌজন্যে। অর্থাৎ একটা সামান্য ডেটিং অর্থনীতিতে রোজ বিপুল ভাবে আর্থিক লেনদেন ঘটাচ্ছে। ছেঁকা খাওয়া সন্টুমনাদের দৌলতে মদ, গাঁজা, চরস সিগারেটের শ্রীবৃদ্ধি তো টাটে গণেশ বসিয়ে দেয়। ডেটিং আসলে তো যৌনতারই নান্দীমুখ।
এরপর কামাই করে ফার্মাসিটিউক্যাল কোম্পানি গুলো। কন্ডোম থেকে শুরু করে কন্ট্রাসেপটিভ পিল, এমনকি মাথা ব্যাথার ওষুধ, ধরা খেয়ে যাওয়ার ভয় বা প্রেম সংক্রান্ত ডিপ্রেশনের কারনে হওয়া নানান রোগের ওষুধ বিক্রি হয়। ওদিকে জাপানি তেল, রকেট ক্যাপস হয়ে লুব্রিকেন্ট- কী কী না বিক্রি হয়। ঠোঁট ফোলানো, কিম্বা স্তন ও নিতম্বে সিলিকনের জেলি বসানো আজকাল আকছার হচ্ছে। এর সাথে আছে মেলানিন থেরাপি, কোলাজেন ট্রিটেমেন্ট- এগুলো সবই দিনের শেষে নিজেকে যৌন ভাবে আবেদনময় বা ময়ী দেখাবার জন্য। একেকটা থেরাপির সিটিং এ দেদার খরচা, সবই যৌনতাতে উৎসর্গ করে। মহিলারা সন্তান ধারন করলে সেটা জন্ম দেওয়ার প্রসেসে হোক বা এ্যাবোর্শন করার ঝক্কি- সর্বত্রই ডাক্তার আর নার্সিংহোম হাসপাতাল গুলোতে কাঁড়ি কাঁড়ি ঢেলে আসতে হয়। এরপর আছে অসুরক্ষিত বহুগামী যৌনতার কারনে হওয়া নানান রোগ ও তার চিকিৎসা। বিশ্বজুড়ে HIV/এইডস রোগের ফার্মা বাজেটের অঙ্ক দেখলে মাথা ঘুড়ে যাবে, এর সাথে সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া, হারপিস, ট্রাইকোমোনিয়াসিস, জেনিটাল ওয়ার্টস জাতের মত যৌন রোগের কল্যাণে ফার্মা কোম্পানি গুলো রোজ ফুলেফেঁপে উঠছে।
বটতলার চটি হয়ে ডেবোনিয়ার পত্রিকা, কাগজের মোড়কে লুকানো নীল ছবির সিডি কি একসময় কম ব্যবসা দিয়েছে? কাঁটা লাগা গান অনেক পুরাতন, সেই গানে সেফালি জড়িওয়ালা শুধুমাত্র জিন্সের বাইরে থেকে দেখানো নীল অন্তর্বাস দেখিয়ে নেচে সেলিব্রিটি হয়ে গেলো। শিল্পকর্মে ন্যুড আর্ট সবচেয়ে বেশী দরে বিকোয়, সেটা মূর্যাল হোক, পেইন্টিং হোক বা ভাস্কর্য। আজকের দিনে সিনেমাতে খুল্লমখুল্লা যৌনতা দেখানো মানেই হিট, হেলেন থেকে শুরু করে মালাইকা আরোরা, সানি লিওনি মল্লিকা শেরাওয়াত কিম্বা আজকের ‘সেক্স বম্ব’ তামান্না ভাটিয়ার বিপুল জনপ্রিয়তা ও অর্থের উৎস সেই এক ও অকৃত্রিম সুড়সুড়ি দেওয়া যৌনতা।
ট্রেনে, বাসে, টিভিতে, সোস্যালমিডিয়াতে, সর্বত্র বিভিন্ন যৌনতা বর্ধক ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, জড়িবুটির বিজ্ঞাপন। কেউ শিলাজিৎ বেচছে অশ্বগন্ধার আরকে চুবিয়ে, কেউ পাথর কবজ মাদুলি দিয়ে লিঙ্গ শিথিলতা, ধাতু তারল্য, ইন্দ্রিয় দুর্বলতা সারাবার প্রতিশ্রুতিপত্র বিলি করছে, কেউ কেউ নিজেই ডি কে লোধ। রাজনীতিতেও যৌনতাকে বিজ্ঞাপিত করা হয় নিজ নিজ স্বার্থে, কেউ কথাবাচক যোগীর মত নিজের যৌনতা ত্যাগ করার মত কঠিন রিপু দমন করে সে পূজনীয় হয়ে যাচ্ছে, কেউ পুকি বাবা তো রামদেব- যৌনতা ত্যাগের বিজ্ঞাপনের দৌলতেই কোটিপতি। কোনো দেশে কারো ৪০টা বালবাচ্চা, উচ্চমানের ফার্টাইল দম্পতি, সেই কারনেই তারা রাষ্ট্র ক্ষমতা পেয়েছে, বিপুল ধনসম্পদের মালিক। আজীবন অযৌনতার চর্চা করে মাদার টেরেসা সন্তে উন্নীত হচ্ছেন, তো কেউ আবার ভিকি ডোনার হয়ে কামাই করছে অধিক মাত্রায় সুস্থ বীর্য উৎপাদনের ক্ষমতা গুণে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত যৌন নীতিশাস্ত্রের বিষয়ে সমাজপতিরা সামগ্রিকভাবে রক্ষণশীল ছিল। কিন্তু যবে থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সূচনা হলো, পশ্চিমা পুঁজিবাদী সংস্কৃতি বিশ্বময় দূষিত বায়ুর মত ছড়িয়ে পড়ল। সমাজের বুকে খুল্লমখুল্লা নতুন এক যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা পেলো- ‘লিভ-ইন’ নাম দিয়ে। আর্থিক, সামাজিক, আইনি সর্বদিক থেকে দায়িত্বহীন এইজাতীয় যৌন সম্পর্কে যারা জড়ায়, তারা শুরু থেকেই জানে আমাদের সম্পর্কের কোন প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যৎ নেই। শুধুমাত্র যৌনতা উদযাপন করার বিনিময়ে একে অপরের সঙ্গে থাকে। বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সামাজিক সুরক্ষা, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সম্পদের বণ্টনের মাধ্যমে মহিলাকে অর্থনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থান দেয়, সেটাকে ভেঙে দেয় এই লিভ-ইন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই লিভ-ইন সহবাসকারীরা এই দুর্মূল্যের বাজারে, বিশেষত বড় শহরগুলোতে টিকে থাকতে, জীবনযাত্রার ‘আর্থিক’ খরচা ভাগ করে নেওয়ার জন্য, আরেকটু সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য ও সহজলভ্য যৌনতার সাপ্লাইলাইন ঠিক রাখতে এই ধরণের সম্পর্ককে যুক্তিসঙ্গত বানিয়ে নিয়েছে। এটাও সেই ঘুরেফিরে অর্থনীতির বৃত্তেই পাক খায়।
পুঁজিবাদী দুনিয়ার আর্থিক নীতির মূল ভিত্তি হলো উদারীকরণ ও বিরাষ্ট্রীয়করণ। এই পথেই একটা শিশু জন্মাবার আগেই মাতৃহীন হওয়ার মুচলেকাতে সই করে ফেলে ‘সরোগেসি’ প্রজনন নামে চুক্তিচাষে। এই বিষয়টাকে নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই অসম্ভব, ফলে একজন সারোগেট মা’কে, শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিকভাবে চরম শোষণের মুখোমুখি হয়। সারোগেসি এবং ‘নোংরা অর্থনীতি’ একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে সম্পর্কিত কারণ, বাণিজ্যিক সারোগেসি যে ধরণের শোষণ, বৈষম্য এবং অনৈতিক লেনদেনের চোরা বাজার তৈরি করে তার সবটাই অর্থনীতি ভিত্তিক। গরীবের মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে এই পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়, তাদের শরীরের যত্ন, তার পুষ্টি, প্রসবের পরের তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কেউ খেয়াল রাখে কি? কোনো ধনী মহিলা কখনও তার জরায়ু ভাড়া দিয়েছে বলে শুনেছেন? ধনীরা, দরিদ্র দেশ থেকে সারোগেসি পরিষেবা কেনার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সকল ধরনে নৈতিক ও আইনি জটিলতাকে কাঁচকলা দেখায়, এর জন্য বিপুল পরিমানে অর্থ খরচা করে গ্রহীতা। সরকারী অফিসের চাপরাশি থেকে উচ্চ স্তরের রাজনেতা, সকলেই জড়িত থাকে এই অনৈতিক লেনদেনে।
পরকিয়ার কথা নাহয়
বাদই দিন, বহু মহিলার এটাই ফুল টাইম রোজগারের পথ। তার বাইরেও যারা পুরাতন বাংলা সিনেমার
মত ফুলে ফুলে ঘষা খাওয়া অযৌণ সম্পর্কে লিপ্ত, তাদেরও খরচাটা কম কিছু হয়না। বাকি রইল
ঘরের বৌ, বিবাহিত স্ত্রী। তাকেও খুশি করতে করতেই তো পুরুষ নিমিষে বুড়ো হয়ে যায় চোখের
সামনে। নতুন শাড়ি, ব্যাগ, জুতো, বিউটিপার্লার, ক্রিম, স্নো, পাউডার আর বৎসারান্তে একবার
ট্যুর, নাহলে পাশে শুতে নেবে? যাতে ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে একপাশে শুয়ে ঘুমাবার ফাঁকে
২০ মিনিটের একটু অবসর বের করে আনে পুরুষটির জন্য, তার জন্যই তো এতো ঝকমারি। এতো রোজগারের
স্বপ্ন, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, হানাহানি, উদয়াস্ত পরিশ্রম কার জন্য, ঘরের বৌ কে খুশি
করতেই না! আর খুশির বারোআনাই তো নিশ্চিন্ত যৌনতার প্রাপ্তি যোগের লগ্ন ডেকে আনতে।
(৪)
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার তার গবেষণাপত্র ‘এ থিওরি অফ ম্যারেজ’ এর তত্ত্ব মতে- অর্থ এবং বিবাহ একে অন্যের সমানুপাতিক ও পরিপূরক। সঙ্গী নির্বাচন একটি বাজার, দুজন মানুষের মধ্যে বিবাহ তখনই ঘটে যখন সেটা উভয় পক্ষের জন্য ‘আর্থিক’ লাভজনক হয়। এখানে ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় তাদের উপযোগিতা বাড়াতে চায় এবং প্রতিযোগিদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতা ‘বাজার মূল্য’ নির্ধারন করে। বিবাহ অবশ্যই একটি অর্থনৈতিক বোঝাপড়া দুটো পরিবারের মধ্যে, যেটাকে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে পবিত্র ও মহানতার মোড়ক দিয়ে অর্থনীতির অংশটাকে উপেক্ষিত করে রাখা হয়।
অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গুলোকে আমরা দেখেও দেখিনা, শ্রম ও তার অবিচ্ছিন্ন সরবরাহ করার ক্ষমতা দেখে কি আমরা মেয়েকে পাত্রস্থ করিনা? খুব বেশী আয়ের বৈষম্য থাকলে ছেলে যতই সুপুরুষ হোক আমরা সেই বাড়িতে মেয়ে দিই কী? বৌমা বা স্ত্রী ঘরে আনার আগে সৌন্দর্যের সাথে বাচ্চাকাচ্চা হবে কিনা, অর্থাৎ উর্বরতা বিচার করি, রুগ্ন কিনা মানে সে ঘরের সকল কাজ করতে পারবে কিনা সেই বিচার করি। একটা ‘কমন মিনিমাম’ অবস্থানে তখন পৌঁছায়, যখন শুরুতেই অর্থনৈতিক স্বার্থটা বাইরে থেকে গভীর ভাবে বুঝে নিই। এর পর আসে দুটো অপরিচিত, আধা পরিচিত বা পরিচিতের মাঝে এ্যারেঞ্জ ম্যারেজের দ্বারা নিজেদের মানসিক বোঝাপড়া।
কোনো একটা বিদেশী লেখায় জনৈক মহিলার বয়ানে একটা চিঠি পড়েছিলাম, যার বাংলা করলে দাঁড়ায়- প্রিয় সমাজ, গত ৩৫ বছর ধরে আমি দু’ডজনেরও বেশী আলাদা আলাদা রকমের কাজ করেছি। গৃহরক্ষী, প্রহরী, রাঁধুনি, ঝাড়ুদার, জমাদার, ড্রাইভার, গৃহ সহায়িকা, গরু ছাগল হাঁস মুগরির ছোট খামারের রাখাল, কুকুর বিড়ালের মত শখের পোষ্যের পরিচর্যাকারী, ধোপা, এ্যাটেন্ডার, দর্জি, হাউজকিপিং, ইলেকট্রিসিয়ান, ছোটখাটো মেরামতকারী, বাগানের মালী, রাজমিস্ত্রী, রঙ মিস্ত্রী, ইন্টিরিয়ার ডিজাইনার, কাঠ মিস্ত্রী, বাজার সরকার, টাইপিস্ট, বিনোদনের যোগানদার হিসাবে গান গাওয়া ও নাচা, একাকিত্ব দুর করার জন্য গল্প শোনানো, বাইরের ক্লেদ ব্যার্থতা হেতু রাগ প্রকাশের জীবন্ত শোষক, টেলিফোন গ্রহণকারী, অভ্যর্থনাকারী, হিসাব রক্ষক, বাজার সরকার, মোটবাহক ও সর্বশেষে যখন খুশি বিছানাতে বেশ্যাদের মত শিৎকার সহ উদ্দাম যৌনসঙ্গমের পার্টনার- এ সবই করেছি একজন বসের জন্য, সম্পর্কে উনি আমার স্বামী। এর জন্য পেটের ভাত, পরিধানের কাপড়ের বাইরে সেই অর্থে মজুরী কিছুই পাইনি।
দিনের শেষে সবটাই অর্থনীতির ছাঁকনিতে ধরা পরে যায়। এই কারনেই নানা ভাবে যৌনতাকে ‘ফ্রিতে’ ভোগ করতে কোথাও গ্লোরিফাই করা হয়েছে তো কোথাও নিন্দা। প্রায় প্রতিটা ধর্মে নিজ নিজ আর্থিক লাভকে প্রতিষ্ঠা করতে এই সকল আয়োজন। বাৎসায়নের মতে কামনা হলো একটি পবিত্র মানবীয় অনুভূতি। একই ধর্মে মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে- নারীদের প্রকৃতিই হল পৃথিবীতে পুরুষদের কলুষিত করা। তাই নারীদের সব সময়ে পুরুষদের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। মনু বলেছেন- কোন বালিকা, যুবতী বা বৃদ্ধাদের নিজের বাড়িতেও স্বাধীনভাবে কিছু করতে দেওয়া ঠিক হবে না। বাল্যে নারী থাকবে পিতার নিয়ন্ত্রণে, যৌবনে স্বামীর, এবং স্বামী মারা গেলে পুত্রদের নিয়ন্ত্রণে। মোদ্দাকথা পেটেভাতের গৃহপরিচারিকা ও যখন মন যাবে তখনই বিনামূল্যের যৌনতা নিশ্চিত করতেই এতো আয়োজন।
সতীদাহ মত নারকীয় প্রথা সমাজে তৈরিই হয়েছিলো বিধবার সম্পদকে অনৈতিক ভাবে ভোগ করার জন্য। কোরআনে মহিলা শিক্ষার কথা গোটা গোটা ভাবে বলা থাকলেও, সমাজপতি মোল্লারা নারীদেরকে গৃহবন্দী করে রেখে দেয় যাতে সম্পত্তিতে তাদেরকে ভাগ না দিতে হয়। ইসলামিক বিবাহে মেয়েকে কন্যাপণ বা দেনমোহর দেওয়াটা লিখিত আইন। সেই আইনের ফাঁক গলে কেউ ৫০০ টাকা দেনমোহর ধার্য্য করছে যা একান্তই মূল্যহীন, আর যারা ২-৪ কোটি টাকা ধার্য্য করছে, সেটাও কেবল খাতায় কলমেই রয়ে যায়। নারীর যৌনতাকে বিনে পয়সায় ভোগ করার এক নিকৃষ্ট পুরুষতান্ত্রিক রীতি চলে আসছে, যার গোটাটাই অর্থনৈতিক ভাবে ফাঁকি দেবার জন্য। কেরালার নাম্বুদিরিপাদের শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পরিবারের বড় ছেলের বৌ- নায়ার নামের ছোট জাতি থেকে আসবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু সেই মহিলা ও তার গর্ভজাত সন্তানের, পারিবারিক সম্পত্তির উপর কোন অধিকার থাকবে না। ভাবুন যৌন শোষণ ও আর্থিক শোষণের অর্থনীতিকে কীভাবে সামাজিক নীতিমালার জালে বেঁধে অবৈধ ভোগদখল করেছে সমাজপতিরা। মহাভারতের দ্রৌপদী নিয়ে কিছু শোনার মত সহনশীলতা আজকের সাম্প্রদায়িক বিভেদগ্রস্থ সমাজের নেই।
অথচ মহিলাদের হাতে অর্থ এলে সমাজ বদলে যায়, তার উদাহরণ হলো বাংলাদেশ, উদাহরণ হলো নেপাল- হলোই বা সেটা যৌনতা নির্ভর অর্থনীতি। নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার কারণে যেসব আর্থিক ক্ষতি হয়, তা সামাল দেওয়া যেকোনো দেশের জন্যই কঠিন। বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি ক্ষেত্র পোশাক খাত ৬০ লাখ কর্মসংস্থান দিয়েছে রাষ্ট্রকে, যাদের বেশির ভাগই নারী। এই নারীরা পোশাক শিল্পে আসার দরুন দেশজ উৎপাদনের হার একলাফে বেড়ে গিয়েছে। মা ও শিশুমৃত্যুর হার অনেকাংশে কমেছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড তৈরি করছে। অথচ নিজেদের যৌন বিকৃতির কারনে মোল্লাতান্ত্রিক ফতোয়া দিয়ে মেয়েদের ঘরে বন্দি করে রেখেছিল এই সমাজই। গোটা বিশ্বব্যাপী নারীরা স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে প্রবেশ করে ও টিকে থাকে কেন? অদক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগের অভাব, দরিদ্র সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারনে মহিলারা যৌন পেশায় যুক্ত হয়। সমাজের অন্যান্য সকল অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের চেয়ে বেশি পরিমাণ রোজগার করা সম্ভব, তাই অনেক মহিলা স্বেচ্ছায় পতিতাবৃত্তি করে। পতিতাবৃত্তি এমন একটা বিষয় যার সঙ্গে প্রজননের কোন সম্পর্ক নেই। এখানকার সবটাই জবরদস্তি আর পাচারের গল্প নয়, বরং সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এই আদিম পেশাকে টিকিয়ে রেখেছে।
অন্যান্য সকল প্রাণীদের কাছে পেট আগে, যৌনতা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ। মানব সমাজে, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে, যেখানে যৌনতা রেখে ঢেকে, লুকিয়ে চুরিয়ে সম্পাদন করতে হয়, সেখানে একটা দ্বিতীয় সুযোগ পেতে অনেক অনেক সময় লেগে যায়। তাই আমাদের তৃতীয় বিশ্বের এই দেশগুলোতে আগে যৌনতা তারপর পেট। আলুসিদ্ধ দিয়ে দিনের পর দিন ভাত খেয়েও টাকা জমায় রূপসজ্জার বস্তু কিনতে, যাতে তাকে সুন্দর দেখায়। যৌনতার বাজারে সে যেন ভালো দড়ে বিকিয়ে যায়। কিডনি বেচে ছেলেরা আইফোন কেনে, যাতে মহিলা মহলে টুক করে কাউকে পটিয়ে ফেলতে পারে। আর পটে গেলেই তা যৌনতা দিয়ে শেষ হয়- এটাই নিয়ম।
সুতরাং আমাদের দেশের অর্থনীতি থেকে যদি যৌনতাকে আলাদা করার মত কোনো গণনা পদ্ধতি থাকত, দেখা যেত, প্রায় অর্ধেকের বেশী GDP দখল করে আছে যৌনতা ও তাকে কেন্দ্র করে চলা বিভিন্ন ব্যবসাতে হওয়া লেনদেন বাবদ আয়। তবে এটাও ঠিক যে, অর্থ জড়িয়ে আছে এমন বিষয়ক প্রতিটা ক্ষেত্রে অবৈধভাবে উন্নতির সাধনের জন্য যৌনতাকে টোপ ও ঘুষ হিসাবে ব্যবহার করা হয়, যার আর্থিক মূল্য নিরূপণ করা ভীষণ কঠিন কিম্বা অসম্ভব। স্ত্রী, বোন, বান্ধবীকে ব্যবহার করে, উন্নয়নের সোপানে চড়া মানুষ কী পৃথিবীতে কম! নারী পাচারের সঙ্গে যুক্ত আড়কাঠি পুরুষের প্রেমের অভিনয়কেও কী অর্থের মাপকাঠি দিয়ে মূল্যায়ন করা যায়! প্রতিটা দেশের গুপ্তচরবৃত্তিতে ‘হানি ট্রাপ’ হিসাবে মহিলাদের দিয়ে যৌনতাকে অস্ত্র বানানো হয়, এর আর্থিক লাভক্ষতি মূল্যায়নের সাধ্য আমার অন্তত নেই।
গোটা বিশ্বজুড়ে নারীবাদী নামে এক ধরনের সংগঠন গজিয়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো। যাদের মধ্যে খুব অল্পদল রয়েছে যারা সত্যি করে মহিলা সমাজের মধ্যে কিছুটা কন্ট্রিবিউট করছে, বাকিরা আসলে নেড়িবাদী। এদের মূল এজেন্ডা ছিলো যৌন শোষণ এবং সমাজের মধ্যে লিঙ্গ ভেদে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, তার বিরুদ্ধে লড়াই করা। যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমাজের বুকে সচেতনতা বৃদ্ধির নামে, অধিকাংশ নারীবাদী সংগঠন NGO গঠন করে চাঁদা তুলে তার দ্বারা নিজেরা ফুর্তি করে।
যৌনতা যেমন অর্থনীতিকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে, সেই মুদ্রার উল্টো পিঠটাও ভয়াবহরূপে সত্যি। আর্থিকভাবে পতনশীল বা দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যৌন জীবনের সুস্থতাকে ভয়ঙ্কর ভাবে প্রভাবিত করে, দারিদ্র্যের সম্মুখীন ব্যক্তিরা যৌনতার বিচারে অতৃপ্ত হিসাবে প্রমানিত। বর্ধিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যৌনতাকে অনেক বেশী মুক্ত করে দেয়, তাই ধনী সমাজে কেচ্ছার পরিমানও সবচেয়ে বেশী। বিপরীতভাবে, যেখানে অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত থাকে, বিশেষত মহিলাদের- সেখানে বিবাহের বাইরে যৌনতা বিরল ব্যাপার।
যাই হোক, এই প্রতিবেদন
পড়ার পর ভুলেও যেন নিজেকে পুরুষ সিংহ দাবী করে বসবেননা, বাইচান্স ঘরের লক্ষীটি এটাকে
সিরিয়াসলি নিয়ে নেয়- কী অবস্থা দাঁড়াবে অনুমান করতে পারছেন!

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন