এতোদিন ধরে
আলাদা কিছু ছিলো কী? এর মধ্যে শেষ ৫
বছরে কোনটা নতুন?
শেষ দু বছর ধরে সিকিমের পর্যটন ব্যবসার ৭০% বেশী পতন হয়েছে। NH 10 এর কোনো সুরাহা নেই, কবে খোলা আর কবে বন্ধ কেউ জানেনা। ঠিক আজ এই মুহুর্তেও রাস্তা বন্ধ, এদের মেরামতির কাজ কখনই শেষ হয়না। বাংলা ছাড়া পূর্ব বিহারের কিছু আর সামান্য আসাম ব্যাতিরেকে, বাইরের
রাজ্য থেকে পর্যটক প্রায় আসা বন্ধ। অথচ একসময় দক্ষিণের ৪টে রাজ্য থেকে, মহারষ্ট্র,
গুজরাত, রাজস্থান, উড়িষ্যা থেকে ঢেলে পর্যটকের দল আসত। বাংলাদেশের
টুরিস্ট একসময় রোজগার দিতো, যা মোট আয়ের ২০% বা তারও বেশী ছিলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতির
বাধ্যবাধকতায় সেটাও আজ দেড় বছর লাটে উঠেছে, কোনো বিকল্প আসেনি।
২০২৩ থেকে উত্তর সিকিমের লাচেন একপ্রকার বন্ধই, অথচ গুরুদংমারের টানেই
অধিকাংশ পর্যটক সিকিম ভ্রমণে আসেন। লাদাখের প্যাংগং হ্রদের রূপ একপ্রকার, কিন্তু গুরুদংমারের
ভয়ঙ্করী শান্ত রূপ অনন্য। মাউন্টেন এ্যাডভেঞ্চার বাইকারদের একমাত্র পাখির চোখ এই সুউচ্চ
হিমালয়ান হ্রদটিকে কেন্দ্র করেই ঘোরাফেরা করে। যদিও ছাঙ্গু হ্রদ বাদে, কুপুপ বা খেঁচিপেরি
নিয়ে পর্যটকদের মাঝে তেমন আগ্রহ নেই। লোনাক, সামিতি কিম্বা সলামো হ্রদ সাধারণ পর্যটকদের
অগম্য, পরে পাওয়া চোদ্দ আনার মত- সাংলাফু নামে হ্রদের পাড়ে যাওয়ার কোনও সহজ উপায় বের
করতে পারেনি আজও, যাতে পর্যটন ব্যবসা কিছুটা মুক্তি পায় দম বন্ধ করা
দশা থেকে। ফলত, গুরুদনংমার যাত্রা বন্ধ থাকলে, এ্যাডভেঞ্চার বাইকারদের আসার হার কমে
যায় ৯০% এরও বেশী মাত্রায়। নর্থ সিকিমের ব্যবসাটাই লাটে তুলে
দিয়েছে। লাচুং খোলা, কিন্তু সরকারের
উদাসীনতাতে কোনো কিছুই স্বচ্ছ নয় পর্যটকের কাছে।
সিকিমেও ডোল পলিটিক্স চলছে, বিজেপি ঘেঁষা সরকার, উন্নয়নের নামে
প্রকৃতিকে ধর্ষণ করছে। একটা তিস্তাতে ৪৯টা বাঁধ প্রোজেক্ট, নদী গর্ভেই মদ আর ফার্মা ফ্যাক্টারি বানিয়ে নিয়েছে। আদানি
আম্বানি গেঁড়ে বসেছে। স্থানীয় সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে গিয়ে উলঙ্গ পশ্চিমা সংস্কৃতির
গ্রাসে গোটা রাজ্যটা। ড্রাইস্টেট বিহারের শুঁড়িখানা আর বাইজি বাড়িতে পরিনত হয়েছে
গ্যাংটক- সর্বত্র ছামিয়া ডান্স না রাতপরীদের নিষিদ্ধ হাতছানি যুক্ত নাইটক্লাব। গোটা গ্যাংটকে স্থানীয় সিকিমিজ বাসিন্দার থেকে
হোটেল বেশী, একেকটা আবার ১৫-২০
তলা। রাণীপুল থেকে বোজোগাড়ি অবধি সবটা যেন কংক্রিটের স্তুপ, ফাঁক গলে পাহাড়ের দেখা পাওয়াই দুষ্কর। পাহাড়ের ভূমি অদৌ এটার ভার
সইতে পারবে! পারলে কতদিন পারবে!
বিবিধ অঞ্চলে প্রতিটা হোটেলে পানীয় জলের তীব্র সঙ্কট, হোটেল গুলোকে ট্যাঙ্কারে করে জল আনতে হয়। ট্যুরিজমের কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন
নেই,
যা আছে খাতায়কলমে। প্রায় সমস্ত হোটেল লিজে
চলে, যত খুশি প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটুক, বিল্ডিং মালিককে বাৎসরিক লিজের পুরো পয়সা মেটাতে
হবেই। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির কেউ সামান্য দায় নেবেনা, না মালিক
না প্রশাসন। যেন বিপর্যয়য়ের দায় একান্তই লিজারের। প্রতিবাদ করলেই স্থানীয় পুলিশের সাথে
লিজারকে তুলে নিয়ে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন রোজকার ঘটনা।
যেটা আছে সেটা স্থানীয় পয়সাওয়ালা ভুটিয়াদের অত্যাচার, অন্ধকার নামলেই পাতাখোর মাতালদের দাদাগিরি, স্থানীয় হোটেলের দালালদের তোলা আদায়, স্থানীয় লোকেদের কর্মসংস্থান এর নামে কিছু বখাটে ছেলেপুলেকে
বসিয়ে খাওয়ানো আর বেতন দেওয়া। যত্রতত্র শরীর
বিক্রির অলিখিত ধান্দা, আর সিজেনে
নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ির ভাড়া। কোনো মানুষই
অসভ্য হয়ে জন্মায়না। সরকারের মত নিয়ন্ত্রক সংস্থাই যদি নিজে অসভ্য হয়ে যায়, তখন তথাকথিত এই অশিক্ষিতের দল তার ফায়দা নেবেই। এই করতে
করতে আজকে সাধারণ পর্যটকদের কাছে সিকিমের গাড়ি মানেই আতঙ্ক। সিজেনের সময় দেউরালি থেকে MG Marg সংলগ্ন হোটেলে পৌঁছে দিতে
৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দাবী করে, একটু দূরে হলে রীতিমত ছিনতাই। দাবী মত না দিলেই হুজ্জোতি,
পুলিশ প্রশাসন সব মুকখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে।
এর সাথে ফাউ লিমিটহীন
জানজট, হ্যাচব্যাগ পাবলিক ট্যাক্সিতে ছেয়ে গেছে গোটা শহর, এর সাথে ধনীর দুলালদের
একেক জনের ৪টে করে গাড়ির বহর। সামান্য বাজরা স্ট্যান্ড থেকে দেউরালি
শিলিগুড়ি স্ট্যান্ডে আসতে গেলে অফসিজেনেও আধাঘন্টা লাগে, সিজেনে খোদা ভরসা।
ধনী দরিদ্রের বৈষম্য চরমে। যার আছে সে কোটিপতি, যার নেই সে কাল কী খাবে জানেনা। জনসাধারণের জীবনযাত্রার খরচা সমতলের তিনগুণ, কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য অর্ধেক। দৈনন্দিন আনাজপাতি
মুদিদ্রব্যের মাল ছুঁতে গেলে হাত পুড়ে যায়। পর্যটন ব্যবসা যে রাজ্যের মূল রোজগার, তা নিয়ে লোকদেখানো চমক, গিমিকের বাইরে শুধু
যেটা আছে সেটা- পশ্চিমবঙ্গ সরকার আর কেন্দ্র
সরকারের উপরে দোষ চাপানো।
তাই এই সব কোলকাতায় বসে লোমের সাংবাদিকতা না করে, আসল সমস্যা নিয়ে লিখুন। আপনাদের দু’পয়সার এই জাতীয় সাংবাদিকতা আসলেই মূল্যহীন। যোগ্য প্রতিবেদন লিখতে চাইলে গ্যাংটকে যান, সিংটামে যান, গেজিং, নিমাচেন, কাবি, রেনক, সিংগিক, গ্যালসিং, গ্যাটসিলিং, ইয়াংতে, মারতাম, সোরেং, জোরথাং, মেল্লি, এসব জাইগাতে গিয়ে, নিজেরা ঘুরে, দেখে,
শুনে, বুঝে সেই মত লিখুন- তবে বুঝবেন কী লেখা উচিৎ আর
কোনটা ছ্যাবলামো। পাশাপাশি নিজেদের
অউকাতটও বুঝে যাবেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন