গল্পটা হচ্ছে আমরা সকলেই ফুটেজ খোর। আমি, আপনি, পাশেরজন সক্কলে, এদের ডান বাম লিবারেল রাম কোনো বিভেদ নেই। নেটিজেনদের সকলেই এখন ইভেন্টজীবি। যেখানে ইভেন্ট সেখানে কলরব করে হাজির, চারটি সেলফি, ‘আমাকে ঘিরে’ একবেলা তুরীয় আলোচনা, ব্যাস- ফুল অর্গাজম। সূর্য ঢলতে ঢলতে বাজারে আবার নতুন ইভেন্ট হাজির হয়ে যাবে। যে পৃথিবীটাতে আমরা এই ফুটেজের রেশন খুঁজি, সেটা বিশ্ব নাগরিকদের খেলাঘর, সেখানে অচেনা ‘কাবো ভার্দে’র বিশ্বকাপে চান্স পাওয়া থেকে, টেইলর সুইফটের নিম্নাঙ্গের অন্তর্বাসের দিকে তাক করা ক্যামেরার সূচীভেদ্য দৃষ্টি- সব স্ক্রলতন্ত্রে মুহুর্তে পুরাতন হয়ে যায়।
উত্তরবঙ্গের বন্যা ভয়াবহ, যেখান দিয়ে নদী তার উছল জলধারা বইয়ে তাণ্ডব করেছে, সে গুলোকে একপ্রকার নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের দক্ষিণ বঙ্গের বন্যার সাথে এর একটা ফারাক আছে, উত্তরবঙ্গের ঢালু ভূপ্রকৃতির জন্য জল জমে থাকেনা ব্যতিক্রিমী ক্ষেত্র ছাড়া। নদী উন্মত্ত তান্ডব করতে করতে বিনাশী রুপেই নেমে যায় বলে- নিকাশি হীন জমা জলের যন্ত্রণা, ড্রেনের গু, মুত সহ যাবতীয় নোংরা ও তা থেকে হওয়া রোগজ্বালা, নিত্য পচা জল ডিঙিয়ে ঘরে থাকার পীড়াটা থাকেনা, যা দক্ষিণবঙ্গের বন্যার এটাই মূলচিত্র।
খোদ শহর কোলকাতার, পুরসভার ১৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের অবস্থা, বিগত ১ মাস ধরে জল নামেনি, নৌকা ব্যবহার হচ্ছে। অন্যটা শহরতলী সংলগ্ন কোলকাতার উপকন্ঠে বেলুরের। সাপুঁইপাড়া বসুকাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ২৮২ নম্বর বুথের অবস্থা। মালদার ভুতনির চর দেড় মাসের উপরে ডুবে, ঘাটালের মানুষের বাৎসরিক অভ্যাস্ত জলকষ্ট, পূর্ব বর্ধমান জেলার বিস্তীর্ণ ভাগীরথীর পার বরাবর নদী ভাঙনের যন্ত্রণা, এমন শত শত বিপর্যয়ের উদাহরণ রয়েছে গোটা রাজ্য জুড়ে।
এর জন্য কোনো প্রশাসন নেই, মখ্যমন্ত্রীর উদ্বিগ্নতা নেই, নেটিজেন সমাজের হ্যাজ নেজ, প্রসেনজিৎ এর বাংলা সিনেমা পাশে থাকার বার্তা নেই, রাশিয়ান দিদির কান্না নেই, আমরা বঞ্চিত বলে অবহেলিতর পক্ষে আওয়াজ নেই, কোনো বিপ্লবী দল নেই, কোনো রাষ্ট্রবাদী দল নেই, রেড ভলেন্টিয়ার নেই, স্বয়ংসেবক নেই, অভিষেক সেনা বা দেব সেনা কেউ নেই। কে জানে এখানে গেলে হয়ত ছবির ভিউ উঠবেনা, প্রেমিকা বা সমাজের কাছে ততটা পরোপকারী সাজা যাবেনা, যতটা উত্তরবঙ্গে গিয়ে ত্রাণ বিলির স্রোতে গা ভাসালে মিলবে।
আসলে ১৪৩ নাম্বার ওয়ার্ড বা বেলুর নিয়ে ইভেন্ট হয়নি, তাই
এতে কেউ আগ্রহই খুঁজে পায়নি। রাজনীতি, জনসেবা, দরদ, আবেগ সব গাধার পিছনে, ইভেন্ট মূলক
ফুটেজ না পেলে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই। শুনতে তেতো, কিন্তু এর চেয়ে সত্যি আর কিছু
নেই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন