রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৫

বাঙালির ভূত

 

ভুতকে সেই অর্থে বাঙালী কোনো কালেই জাতে তুলতে পারেনি। 

সাহিত্যের ভুত কখনই সেভাবে একটা জলজ্যান্ত চরিত্র হতে পারেনি, হাস্য কৌতুক বা গা ছমছমে পিশাচ রূপী পার্শ্ব চরিত্র হয়েই রয়ে গেছে। বাস্তব জীবনে ভুতের ভয়ে বুক ধুকপুক করলেও গবেষণায় দেখা গেছে ৯০% ভীতুর ডিম প্রকাশ্যে ভুতের ভয় স্বীকার করেনা লোকলজ্জায়। আবার অদ্ভুত বাঙালি নাস্তিক সমাজ আছে, যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলেও ভূতে ভয় রয়েছে, সে ভূত অতীতকাল নয়- পাতি বিদেহি আত্মা, তাদের যুক্তিও আছে অতিপ্রাকৃত শক্তির উপরে।

ওদিকে ব্যাঙ্কোর স্কন্দকাটা ভূত, আর ডাইনি নিয়ে নটসম্রাট শেক্সপিয়ার যে কালজয়ী ম্যাকবেথ লিখে গেলেন, তাকে কেউ ভৌতিক উপন্যাস বা নাটক বলেনা, শুধু কাল্ট বা অমর ট্রাজেডি হিসাবে মহা মহা মহা সমাদৃত। ড্রাকুলা কিম্বা মেরি শেলীর ফ্রানকেনস্টাইনও আদতে আধাভৌতিক। এর বাইরে জম্বি, ভ্যাম্পায়ার, গবলিন কিম্বা হালের হ্যারি পটারেও ভূতকে কী দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আরব্য রজনী বা ওই যুগের মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্যের  জ্বীন গুলোকে দেখুন, কী সব একেকটা চরিত্র, তাদেরকে কেন্দ্র করে গল্প, তারাই মূল চরিত্র।

পাশাপাশি আমাদের শীর্ষেন্দুর ভুত গোবেচারা বোকার হদ্দ, লীলা মজুমদার হয়ে সত্যজিতের ভুতও জাতে উঠতে পারেনি। বিভূতি বাবুর তারানাথের ভুতও মূল চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি। এমন বহু বাঙালী বা ভারতীয় লেখকের লেখনিতে ভুতের নানান উপদ্রব থাকলেও, সেগুলো শেষমেষ সাইড নায়ক হয়েই রয়ে গেছে। হরিনারায়ন চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, অদ্রীশ বর্ধণ, হিমানীশ গোস্বামী, প্রমুখেরা ভূতকে এনেছেন সাসপেন্স তৈরির চরিত্র হিসাবে, ভুত কোথাও মুখ্য চরিত্র নয়। যেমন আমাদের ভাতের সাথে নানান পদ খায়, এখানে ভাত নায়ক, তরকারিরা রোজ বদলায়, আমাদের ভূতেরা তেমন মুখোরোচক তরকারি।

আমাদের অধিকাংশ সাহিত্যিক লেখকেরা বিদেশী সাহিত্যিকদের নিরিখে ভূতেদের প্রেস্টিজ পাংচার করে দিয়েছেন। সামান্য কিছু হানাবাড়ি, শ্মশান বা গোরস্থানের কিছুটা গায়ে কাঁটা দেওয়া ছমছমানি থাকলেও, বাকীরা প্রায় সবাই নির্বিষ কোমল হাস্যরস। আমাদের সাহিত্যে ভুতেরাও আত্মহত্যা করতে চায়, ভাবুন অবস্থা। 

সাহিত্যে ভূতের আলাপ হবে আর দাড়িবুড়ো বাদ যাবে সেই ধৃষ্টতা কার রয়েছে। বাংলা সাহিতে তিনিই প্রণম্য, ভূতকে চরিত্র বানাতেও। তিনি সিম্পলি বাকিদের বলতেই পারেন 'তফাৎ যাও তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়'। সেই কবিঠাকুরের ক্ষুধিত পাষাণ বাদে, মণিহারা,  কঙ্কাল কিম্বা মাস্টারমশাই, কোথাও ভুত সেভাবে মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠেনি যারা রক্ত মাংসের মানুষের সাথে প্রভেদ ঘুচিয়ে দিয়েছে। 

আমাদের বাঙালী শিশুর জন্মই হয় জুজু নামের ভুতের সাথে, এর সাথে রাক্ষস খোক্কসের গল্প দিয়ে শৈশবের যাত্রা শেষ হতে না হতে, কৈশোরে ব্রহ্মদৈত্তি আর মামদোর পাল্লায় পড়ি। প্রথম যৌবনের প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে সবাই শাঁকচুন্নি দর্শন করি। আমাদের বাঙালী জীবনটাই ভুতময়, কিন্তু বড্ড রুগ্ন আর অধিকাংশই আদর্শবান সব ভুত, সবাই পার্শ্বচরিত্র। 

সে যাই হোক, কোন সাহিত্য বড় সেটা আলাপের বিষয় নয়, সকলে তার স্থানে সুমহান। বিষয় হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি কোমলমতি ভুতেদের নিয়ে, আদুরে পোষ্যের মত কিছুটা, যেখানে শিরশিরানি ভয়ও আছে আবার এ্যাডভেঞ্চারও আছে। এটাই 'আমাদের' নিজস্বতা।

তাই আজকের এই ভূত চতুর্দশীর সাঁঝবেলাতে এটাই নাহয় থাকুক। এটা যাদের ধর্মীয় উৎসব, তাঁরা ধর্ম হিসাবে পালন করুক, আমরা নাহয় এটা আমাদের ছেলেবেলার ভয়কাতুরে সন্ধ্যা গুলোকে উদযাপন করি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...