পেপার লিক বা প্রশ্নপত্র ফাঁস কোন বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়। এটা একটা পরিকল্পিত অর্থনৈতিক মডেল যেটা সরাসরি নাগপুর থেকে পরিচালিত হয়। এটার পেছনে একটা পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কাঠামো কাজ করে, যা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলাফল নয়।
পেপার লিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে একটা বড় অংশ ইচ্ছাকৃত আঁধারে রেখে দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো, যে বিষয়ে আলোকপাত হওয়া অত্যন্ত জরুরী। গদি মিডিয়া এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করবে না এটা স্বাভাবিক কিন্তু তথাকথিত নিরপেক্ষ youtube সাংবাদিক কুলও নিম্নলিখিত বিষয়ের উপর কোনো ধরনের আলোকপাত করতে সক্ষম হয়নি। স্বভাবতই রাহুল গান্ধী থেকে দীপকে অব্দি কারও মুখে কোনো রা নেই।
বর্তমানে যে পেপার লিক বিষয়টা নিয়ে এত আন্দোলন, সেটার হুইসেল ব্লোয়ার হিসাবে রাজস্থানের সিকর জেলার রসায়নের শিক্ষক শশীকান্ত সুতার প্রথম বিষয়টি সামনে আনেন। সেখানেই প্রথম FIR হয়। তদন্তে দেখা যায় কয়েকজন বিহারের বাসিন্দা যারা দিল্লি লাগোয়া হরিয়ানার গুরগাঁও থেকে গোটা বিষয়টা অপারেট করত। প্রশ্নপত্র ছাপা হতো রাজস্থানের প্রেসে, সেখান থেকে দিল্লির বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে অবিশ্বাস্য মোটা দামে বিক্রি করা হতো। এই অব্দি দেখে মনে হবে- মোটামুটি সবকিছুই একটা দুষ্ট দুর্নীতি চক্র জড়িত - যেমনটা প্রতিটি দুর্নীতিতে হয়ে থাকে।
কিন্তু এই প্রশ্ন ফাঁস করেছিল কারা? যারা করেছিল তারা প্রত্যেকে মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা, পেশায় অধ্যাপক। লাতুরের অধ্যাপক পি. ভি. কুলকার্নি ও প্রফেসর শিবরাজ রঘুনাথ মোটেগাঁওকর, পুনের মনীষা গুরুনাথ মান্ধারে এবং মনীষা হাভালদার, মনীষা বাঘমারে, নাসিকের শুভম খায়রনার ও ধনঞ্জয় লোখান্ডে। এরা প্রত্যেকে মহারাষ্ট্রের। এদের আরো বড় পরিচয় হচ্ছে এরা প্রত্যেকে হয়- অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ (ABRSM), কিম্বা ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল (BSM) অথবা বিদ্যা ভারতী (Vidya Bharati) সংগঠনের সাথে যুক্ত। এই তিনটে সংগঠনই নাগপুরের গোয়াল ঘরের নিজস্ব সংস্থা।
অর্থাৎ প্রশ্নপত্র ফাঁস দুর্নীতিতে যুক্ত প্রত্যেকে আরএসএস এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এমনকি রাজস্থানের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কে যেসব ছাত্র এবং কাউন্সিলর নামের দালালেরা এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তারাও অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP) এর সাথে সম্পৃক্ত।
প্রতিটা সাংবিধানিক পদ সেটা বিচারব্যবস্থা হোক কিংবা নির্বাচন কমিশন, প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য পদে সরাসরি RSS এর প্রচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং যারা প্রশ্নপত্র তৈরি দায়িত্বে ছিল, তারা সেই দায়িত্ব পেতই না- যদি না তারা সরাসরি নাগপুরের আস্থাভাজন হতো। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বলি দেওয়ার আড়ালে মহারাষ্ট্র সরকার আর আরএসএস নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে চাইছে।
এই পেপার লিক থেকে প্রাপ্ত দুর্নীতির আর্থিক লাভের একটা বড় অংশ সরাসরি আরএসএস এর হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে যেত বা যায়। বরং বলা ভালো নাগপুর থেকে সরাসরি এই দুর্নীতিটাকে সঞ্চালন করা হতো। যে কারণে এই কেলেঙ্কারিতে ধরা খাওয়া প্রতিটা 'কিংপিন' মহারাষ্ট্রের। অথচ মহারাষ্ট্রের শিক্ষামন্ত্রী, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাড়নবীসের নাম একবারও শুনেছেন এ বিষয়ে? শোনেননি, কারণ ব্যথা জায়গায় হাত পড়লেই সেই হাত সরাসরি নাগপুরের গোয়াল ঘরে পৌঁছে যাবে। এই কারণেই পেপার লিক হওয়ার পর দেবেন্দ্র ফড়নবীসকে রাজস্থানে ডেকে পাঠিয়েছিল। তাকে ধমকাতে কিংবা তদন্তে সহযোগিতা করতে নয়, কেন ফাঁস হলো সম্ভবত এই বিষয়ে জানার জন্য।
ধর্মেন্দ্র প্রধান বলি গেছে, সেটা যাওয়ারই ছিল অপদার্থ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু মূল মাস্টারমাইন্ড মহারাষ্ট্র সরকার এবং আরএসএস সরাসরি এই দুর্নীতিতে জড়িত। নতুবা এটা কখনও সম্ভব হতো না। একটা ধর্মেন্দ্র গিয়ে আরেকটা নতুন চোর চলে আসবে, কিন্তু নাগপুরের গোয়াল ঘরের যারা মাস্টারমাইন্ড তারা বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যতক্ষণ না এদের কান ধরে আইনের সামনে দাঁড় করানো হবে ততদিন এরকম প্রশ্নপত্র ফাঁস চলতেই থাকবে।
২০১৫ সালের 'ব্যাপম' কেলেঙ্কারিতে ৪০ জনের রহস্য মৃত্যু আমরা কেউ ভুলিনি, কে জানে এবারে কতজন সাক্ষী এবং অপরাধী রহস্য মৃত্যুর শিকার হয়। ব্যাপম কেলেঙ্কারির নায়ক শিবরাজ সিং চৌহানের সাজা হওয়া তো দূরস্থান, ন্যূনতম তদন্ত টুকু হয়নি। মহারাষ্ট্র সরকার এবং সেই সরকারের মাথা এবং দেবেন্দ্র ফড়নবীশকেও তদন্তের আওতায় আনা হবে বলে মনে হয় না। যে সমস্ত কিংপিন ধরা পড়েছে, সেই অপরাধীরা যে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, সেই RSS এর শিক্ষক সংগঠনগুলোকে কেন তদন্তের আওতায় আনা হবে না?
মোহন ভাগবত এমনি এমনি জেন-জি কে সার্টিফিকেট বিলি করতে বসে যায়নি কিংবা মাঝরাতে হ্যালো ফ্রেন্ডস বলে বিশ্বভাঁড় মিছিমিছি ভাঁড়ামি করতে আসেনি instagram এ, RSS কে আড়াল করতে যাবতীয় এইসব ফন্দিফিকির।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন