পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের ৩৬০ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেল খুলে গেছে
(১)
শিয়রে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। যেখানে কমপক্ষে ৬টা আলাদা আলাদা ফ্রন্টে লড়াই হতে চলেছে সম্মুখ সমরে- যারা যেকোনো মুহূর্তে হিসাবনিকেশ ফলাফল উলটে দিতে পারে। ফলত, CPIM তথা বা বাম জোটের কাছে একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছে নিজেদেরকে বেশ কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে, সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে, যাতে আগামী দিনে কমিউনিস্ট রাজনীতির আদর্শে আবার জনগণকে একটা উন্নত সরকার উপহার দিতে পারে।
তৃণমূল, বিজেপি, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস, হুমায়ূন ও সমগোত্রীয় এবং SIR; নূন্যতম এই ছ'টা আলাদা আলাদা ফ্রন্টে লড়াই হতে চলেছে। প্রথমেই প্রশ্ন জাগবে SIR কেন ষষ্ঠ সত্ত্বা বা entity? আসলে SIR হলো সেই মিস্ট্রি স্পিনার, যার স্পেলে বাদ যাওয়া ভোটারেরা কার ঘর কতটা ভেঙেছে সেটাই সবচেয়ে বড় রহস্য, যা নির্বাচনের অভিমুখ ও বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে। আজকের দিনে কটা আসন যে মার্জিনাল, তা অতি বড় ভোট বিশেষজ্ঞও বলতে পারেনি। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী খসড়াতে মোট বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯। মানে প্রতিটা বিধানসভায় গড়ে ২০ হাজার ভোটার নেই হয়ে গেছে। মিথ্যা নথি জমা দিলেই জেল- এই তথ্য জানতে পারার পর, বাগদা বিধানসভায় শুনানিতে ডাক পাওয়া ৬০,৯২৮ জনের মধ্যে মাত্র ২১,৬২৮ জন হাজিরা দিয়েছে। বনগাঁ উত্তরে ৫৪,৪৯৩ জনের মধ্যে ১০,০৬৩ জন হাাজির হয়েছে। বনগাঁ দক্ষিণে ৪৭,৮৮৯ ডাক পাওয়ার মধ্যে ১২,১০৩ জন এসেছিল, গাইঘাটায় ৫৪,৪০৪ জনের মধ্যে ১৬,০৮১ জন হাজির হয়েছে। সুতরাং বিজেপির বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এই পরিসংখ্যান কি যথেষ্ট নয়! ফাইনাল লিস্ট প্রকাশিত হলে প্রতিটা বিজেপি তৃণমূলের নেতামন্ত্রীদের ঘর থেকে মরাকান্নার গোঙানি ওঠা সময়ের অপেক্ষা।
তৃণমূলের হালের দিকে চেয়ে দেখুন, যেমন কোলকাতা পোর্ট কেন্দ্রে তৃণমূলের ফিরহাদ হাকিম ৬৮০০০ ভোটে জিতেছিল ২০২১ সালে, ওই কেন্দ্রে SIR এ বাদ গেছে ৭৪ হাজার নাম। অনুরূপ, বালিগঞ্জ কেন্দ্রে বাদ গেছে ৬৪ হাজার নাম, সেখানে বাবুল সুপ্রিয় ২০ ভোটে জিতেছিল। নন্দীগ্রামে হেরে এসে বাই ইলেকশনে ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জী জিতেছিলেন প্রায় ৫৯ হাজার ভোটে, সেই কেন্দ্রে SIR এ বাদ গেছে ৪৪ হাজার নাম। আর এ সবই প্রাথমিক খসড়া তালিকা অনুসারে, ফাইনাল তালিকাতে আরো কতটা কী বাদ যাবে কেউ জানে না। এই তিনটে তো স্যাম্পেল হিসাবে দিলাম, সবচেয়ে বেশী ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার নিরিখে প্রথম ১০টি বিধানসভা কেন্দ্র জোড়াসাঁকো, চৌরঙ্গী, হাওড়া উত্তর, কলকাতা পোর্ট, শ্যামপুকুর, কাশীপুর-বেলগাছিয়া, বেলেঘাটা ইত্যাদির মতো সবকটা তৃণমূলের জেতা আসন। গোটা পশ্চিমবাংলা জুড়েই এই এক চিত্র, ২৯৪ টা আসনের কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে এটা আমাদের কনফার্ম আসন। এই কারণেই আইপ্যাক শহর কলকাতা সহ কোথাও এখনো প্রার্থী ঠিক করেই উঠতে পারেনি, ঘোড়ার মুখের খবর ববি হাকিমের রাজ্যসভায় পালিয়ে যেতে চাওয়ার কারণও নাকি এই ঘোলাটে পরিস্থিতি।
এদিকে বামকর্মী সমর্থকদের প্রবল অনিচ্ছা জ্ঞাপনের দরুনই হোক বা শুভঙ্কর সরকারের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেসের একলা চলো নীতি- বাম কংগ্রেস বিচ্ছেদ ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের মাঠটাকেই শুধু বড় করে দেয়নি, বাম ও কংগ্রেস উভয়কেই বিবিধ এক সম্ভাবনাময় পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করে দিয়েছে; যেখানে RSS তাদের পোষ্য মিডিয়া সৃষ্ট ‘তৃণমূল-বিজেপি’ বাইনারির হেজিমনি হাজারো চেষ্টাতেও দাঁড় করিয়ে রাখতে পারছে না ‘জাপানি তেল’ দিয়েও।
SIR এ একমাত্র নিশ্চিন্ত কংগ্রেস এবং বামেরা, এদের হারাবার কিছু নেই। কিন্তু তৃণমূল ও বিজেপির নাভিশ্বাস উঠে গেছে, আগেও লিখেছি ৯৩ টা এমন আসন রয়েছে যেখানে তৃণমূলের জয়ের মার্জিনের চেয়ে, খসড়া তালিকাতেই বাদ যাওয়া ভুতুড়ে ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি। পাশাপাশি SIR প্রক্রিয়ার দরুন বিজেপি তার কোর ভোটারদের কাছেই অবিশ্বাসের পাত্র হয়ে উঠেছে।
দেশজ রাজনীতিতে জাতীয় কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে কখনও মুলায়ম, কখনও লালুপ্রসাদ, কখনও শিবু সোরেন, শরদ পাওয়ার, দেবগৌড়া, কিম্বা পশ্চিমবঙ্গে কখনও মমতা কখনও সিপিএম জাতীয় অসম জোটের মধ্যে থেকে- কংগ্রেস কোথাও শক্তি খুইয়েছে আবার পশ্চিমবঙ্গের মতো কোথাও একেবারে সাইনবোর্ডে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন পরে রাহুল গান্ধীর ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’র দরুন বাংলার প্রতিটা প্রান্তের কংগ্রেসি ভোটারেরা অন্তত ২০ বছর পরে নিজের বুথে হাত চিহ্ন দেখতে পাবেন।
কিন্তু কংগ্রেসের সাথে বামেদের জোট হচ্ছে না, তার জন্য সোশ্যালমিডিয়া জুড়ে তৃণমূল পোষিত বিশ্বমাচাদো বুদ্ধিজীবী, আইপ্যাক, মিডিয়া হাউস, এমনকি বিজেপি অবধি মরাকান্না জুড়েছে, কেন?
শুরুতে কংগ্রেসী ভোটাররাই মূলত তৃণমূলে কনভার্ট হয়ে গিয়েছিলো বাম বিরোধীতার নামে। পরবর্তীতে তৃণমূল যখন জাতীয় কংগ্রেসকে গ্রাস করে নিঃস্ব করে দিল, তখন পিছন ফিরে আদি কংগ্রেসী ভোটারেরা দেখেছে- আমরা প্রতারিত হয়ে ফেঁসে গেছি, ফেরার পথ নেই। শুরুতেই বলেছি এরা বামেদের ভোট দেবে না কোনও ভাবেই, বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে এনারা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ঘেন্না করেন, পড়ে রইল তৃণমূল। গত ১০ বছরে কংগ্রেসের নিজস্ব সিম্বল না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে, যা এবারে হবে না। এটা তৃণমূলকে একপ্রকার উন্মাদ করে দিয়েছে। ১০ বছর আগের অগ্নিকন্যা দুর্নীতির আগুনে পুড়ে, আপাদমস্তক চোরের দলের মাথা হিসাবে ঘুগনি কন্যায় রুপান্তরিত হয়েছেন; তাই ‘হাত সিম্বল’ পেলে' এই তৃণমূল আর নয়” জপতে জপতে আদি কংগ্রেসী ভোটার ঘরে ফিরে যাবেই যাবে।
কংগ্রেসের ভোট কীভাবে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, সেটার দিকে তাকানো যাক। উপরেই বলেছি, নিজের দলকে ভোট দেওয়ার সুযোগ। তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভোট, যারা তৃণমূলের নিপাত চায়, মুক্তি চায়। যারা বিজেপিকে কখনই গ্রহণযোগ্য মনে করে না এবং সাইলেন্ট কংগ্রেস ভোটার। গ্রামগঞ্জে এখনো অনেক বয়স্ক মানুষ আছে, যিনি নিজে ও তার পরিবার আদপেই কন-ম্যান, শাসক বিরোধী কোনো দলের সভায় যায় না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে চরম কংগ্রেসপন্থী- এরা হাত চিহ্ন পেলে, ভোটটা তাতেই দেবে। দেশে বহু মানুষ এমন আছেন যারা ঐতিহ্যগত ভাবে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ ও সংবিধানভিত্তিক শাসন চান, তারা কংগ্রেসে ছাপ মারবে। আরেকটা জটিল মনস্তত্ত্বও রয়েছে, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি অংশ যারা কেন্দ্রে বিজেপির পতন চায়, তারা কংগ্রেসকে শক্তিশালী করতে হাতে ছাপ দেবে, যাতে ভবিষ্যতের জন্য দলকে শক্ত করা যায়। অনেকের ভাবনা, তৃণমূলের পতন হলেই রাজ্যে ডানপন্থী বিজেপি বিরোধী শক্তি হিসাবে কংগ্রেসই আবার উঠে আসবে, যে ট্রেন্ড অন্য অনেক রাজ্যেই হয়েছে, সেটার নান্দীমুখ হিসাবেও অনেকে কংগ্রেসে ভোট দেবে।
এই বহুমুখী লড়াই এর ময়দানে কংগ্রেস কালো ঘোড়া, তারা কটা আসন জিতবে সেটার চেয়ে বড় হচ্ছে তারা কত শতাংশ ভোট পাবে যদি অবাধ ও লুঠ মুক্ত নির্বাচন হয়। SIR পরবর্তী বাংলাতে অন্তত ১০০ টির বেশি বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসের ভোট আশ্চর্যজনক ভাবে বাড়বে, আর এই ভোটের প্রতিটাই যে তৃণমূল ও বিজেপির ঘর কেটে বেরিয়ে আসবে সেটা বলাই বাহুল্য। আর কিছুদিন গেলেই মিডিয়া জুড়ে ‘বিজেপি আসতে চলেছে’ এই প্রচারে ঢেকে যাবে। প্রতিটা মৌলবাদী শক্তি এভাবেই বাইনারি তৈরি করে, সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশী নির্বাচনে জামাতের ফেসবুকীয় আমির- পিনাকী ভট্টাচার্য মন্ত্রীসভা অবধি গঠন করে দিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়াতে। বাস্তবের ফলাফল চোখের সামনে, সোশ্যাল মিডিয়া ন্যারেটিভ তৈরি করে, ভোটটা মাটিতে হয়- যেটা করাতে হয় ময়দানে উপস্থিত থেকে। মিডিয়ার বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকাটাও এবারে জনগণের বড় পরীক্ষা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন