বাংলায় সন্তজলীয় রাজনীতির অনুপেক্ষনীয় জনক
মুকুল রায়, যিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন, শুধু এমনটা নয়; তিনি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতেন ছলে বলে কৌশলে। কেউ তাকে চাণক্য বলেন কেউ বলে চোর, যে যা খুশি বলুক তার নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে, আমি তাকে ‘মুকুল রায়’ই বলব। বাংলার বুকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক পান্ডিত্যের উর্ধ্বে প্রণব মুখার্জির সমমানের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক যদি কারো হয়ে থাকে, সেটা মুকুল রায়। চাণক্য তোপ বা পরমাণু বোমা ছিলেন হয়তবা, সেখানে মুকুল রায় সামান্য সূচ; কিন্তু সেই প্রায় অক্ষম সূচই এতটা বিষাক্ত হয়ে তার বিরোধী রাজনীতির শরীরে মনে গেঁথে গিয়েছিল, যেখান থেকে আজও কংগ্রেস ও বামেরা বের হতে পারেনি।
মমতা ব্যানার্জী তৃণমূল দল তৈরি করেননি, দল অজিত পাঁজা বানিয়েছিলেন। মুকুল রায় সেই সদ্য ভূমিষ্ঠ তৃণমূলেরর সমস্ত ব্যাক অফিস পিঠে করে বয়ে নিয়ে একটা দল বানিয়ে তুলেছিলেন নেপথ্যে থেকে। মুকুল রায়ের ৩০% রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতা, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, রিস্ক নেওয়ার সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যদি আজকের বামেদের সবকটা নেতা মিলিয়েও থাকতো, দলটা কবে দাঁড়িয়ে যেতো। লোকে এটা ভুলে গেছে, মুকুল রায় ২০১৬ সালে তৃণমূল থেকে চলে যেতে আইপ্যাককে আসতে হয়েছিল মমতার পরামর্শদাতা হিসাবে।
অত্যন্ত লো-প্রোফাইল, ভীষণ ডিসিপ্লিন, সাথে আন্তরিকতা- এটাই তাকে দক্ষ সংগঠক করে তুলেছিলো। যে মানুষ রাগে না, তার চেয়ে ডেডিকেডেট ত্রাস কম জনই হতে পারে, মুকুল রায় ছিল সেই ব্যতিক্রমী চরিত্র, যাকে রাগানো একপ্রকার অসম্ভব ছিল। একটা মানুষ কখন এগিয়ে যায় জানেন? না, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী কাউকে ধড়াচূড়া শিক্ষিত বানালেও জ্ঞানী বানাবে তার নিশ্চয়তা নেই। জ্ঞানী সেই লোক যিনি শুধু নিখুঁত পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত বিশ্লেষণ করে ফেলতে পারেন পরিস্থিতি বা ঘটনাকে। জ্ঞানী সেই লোক, যে বলে কম, শোনে বেশি- মুকুল রায় দ্বিতীয় ক্যাটেগরির লোক ছিলেন, যিনি নিজে হামবড়া না সেজে, রাজ্যের প্রায় প্রতিটা হামবড়াদের পথে বসিয়ে দিয়েছিল। এমনকি শেষ কালেও বিজেপি আর তৃণমূলে যে কোনো প্রভেদ নেই, এটাও তিনিই প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন অফিসিয়ালি, এটাই মুকুল রায়। সৌজন্যবোধ আর শালীনতা তাকে অহংকারী আর অতিচালাকি করে তোলেনি, তাই তিনি তার রাজনৈতিক লক্ষ্যে অবিচল ও সফল ছিলেন।
তিনি শৈল্পিক ঘরানায় এসরাজ বেহালা তবলা বাজাতেননা, এক উদাসীন ভঙ্গিমায় প্রিলিউড ইন্টারলিউড গাইতেন কথ্য ভাষায়, তাতেই তার বিরোধী রাজনৈতিক মহলে হাহাকার পরে যেত। এটাই শিল্পী মুকুল রায় স্টাইল। মুকুল রায়ের মতন প্রোফাইল প্রতিটা রাজনৈতিক দলে হাজারে হাজারে আছে তারপরেও লোকটা 'স্বতন্ত্র' মুকুল রায় হয়ে বঙ্গীয় রাজনীতিতে অনন্য নিজস্ব ধারা সেট করে যেতে সক্ষম হয়েছে। আপনি ডানধারায় থাকুন কিংবা বামধারায়, মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিকে উপেক্ষা করার উপায় নেই আপনার। আজকের পশ্চিমবঙ্গে যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ফর্মটাকে আমরা দেখছি, তার ইঞ্জিনিয়ারিং মুকুল রায়ের হাতে তৈরি করা। বঙ্গীয় রাজনীতিতে ঘোড়া কেনাবেচা মুকুল রায়ের তৈরি। চিটফান্ডকে সরাসরি দলীয় ফান্ড হিসেবে ব্যবহার করা, প্রশাসন আর দলকে গুলিয়ে দেওয়া- অত্যন্ত দক্ষতা ও কনফিডেন্টের সাথে প্রতিটা দুষ্কর্ম করেছেন।
এথিক্সহীন নোংরা রাজনৈতিক জামানার জননী মমতা ব্যানার্জী হলে, মুকুল রায় তার সুযোগ্য পালকপিতা। এটার সুচারু শুরু বা এটার গুরুও এই মুকুল রায়ই। তারপরেও একটা সুক্ষ পার্থক্য রয়ে গেছে উভয়ের মাঝে, প্রায় একই নামগোত্রহীন সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উঠে আসা মুকুল রায়ের তথাকথিত শিক্ষাগত যোগ্যতার অস্তিত্বকে জাহির করতে কোন অসততা তঞ্চকতার পথ নিতে হয়নি। কথায় কথায় মিথ্যাচার করতে হয়নি, নিজেকে শিল্পী কবি সাহিত্যিক বানাবার চেষ্টা করতে হয়নি, তার এক ও অকৃত্রিম পরিচয় ছিলো- রাজনীতিবিদ। সেই অর্থে মিডিয়ার ব্লু-আইড বয় ইমেজও কখনও ছিল না। মুকুল রায়ের মূল কৃতিত্ব তার ভাবলেশহীন মুখের অসাধারণ ফ্লেক্সিবিলিটি এবং গোপনীয়তা রক্ষা করার এক অনন্য সাধারণ দক্ষতা। একই পার্টির দুই লবি বা গোষ্ঠী বানানো এবং সেখান থেকে জন্মানো দ্বন্দ কীভাবে মেটাতে হয়, এটার উপরে তার মাস্টার্স করা ছিল।
পশ্চিমবঙ্গের এত বছরে বাম লেগাসিকে কেলিয়ে লাট করে, নৈতিকতার মুখোশ খুলিয়ে আর্থিক লোভের ফাঁদে ফেলে, যাকে যেভাবে পেরেছে ন্যাংটা করে হাতে বাটি ধরিয়ে, তাদের তীব্র অহং আর ঔদ্ধত্যকে দেওয়াল ধরিয়ে, পিঠের চামড়া গুটিয়ে পোঁদে নামিয়ে দিয়েছিল যে লোকটা- তার নাম মুকুল রায়। শুধু তাই নয়, গোটা বাম সমাজ আজ বাম রাজনীতির নামে যে ‘পার্লামেন্টারি আর জুডিশিয়ারি প্র্যাক্টিসের’ নাগপাশে বন্দি, সেই বৃত্তে তাদের গোলগোল ঘুরিয়ে বেরাবার যে ব্লুপ্রিন্ট তা মুকুল রায়ের তৈরি, মমতার নয়। নকশাল, কংগ্রেস, অতিবাম, এসোসুই, NGO, সিদ্দিকুল্লাহ, রাজবংশী, গোর্খা বিচ্ছিন্নতাবাদী, সিমি, জামাত, বিজেপি থেকে মাওবাদী- সমস্ত আলবালছাল এই সকলকে এক ছাতার তলায় আনার ক্রেডিট মুকুল রায়ের, সূচ হয়ে এদের সকলকে এক চাদরের নিচে সেলাই করেছিলেন তিনি। মমতার অগ্নিকন্যা আর সততার প্রতীক ইমেজ ছিল, সেই ইমেজের পারফেক্ট ব্যবহার মুকুল রায় করেছিল।
ওই যে তাৎক্ষণিক মারপ্যাঁচ ও সেই মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সকলকে যোগাড় করে এনে একটা চাদর বোনা- এটা বিরল কৃতিত্ব ছিল বাম বিরোধী রাজনীতিতে। না তিনি ভাল মঞ্চের বক্তা ছিলেন, না ক্যারিশ্ম্যাটিক উপস্থিতি, না ব্লু-ভেইন বংশমর্যাদা, না হাইফাই শিক্ষাগত যোগ্যোতা, তার পরেও একটা ৩৪ বছরের ক্যাডারভিত্তিক ক্ষমতাসীন আদর্শবাদী পার্টিকে সরাতে এই লোকটা কৃষ্ণের মতো যোগ্য সারথির মতো কাজ করে গেছেন। যিনি জানতেন তার সেই উজ্জ্বল ক্যারিশ্মা নেই, না তার পিছনে জেভিয়ার্স, যাদবপুর বা JNU ট্যাগ রয়েছে, না তিনি আইনজীবি বা অর্থনীতিবিদ, গায়ক, নায়ক ছিলেন। অনেকে বলেন তিনি নাকি ওয়াগান ব্রোকার বা সাট্টা দলের চাঁই ছিলেন- সত্যিও হতে পারে মিথ্যা হতে পারে। ধরে নিলাম এটাই সত্যি, তাহলে সেই নর্দমা থেকে উঠে এসে, কোলকাত্তাইয়া রাজনীতির বৃত্তে ঢুকে পড়ে, একটা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের দলকে পথে বসিয়ে দিয়েছিল, CPIM বাদে বাকি দলগুলোকে সাইনবোর্ড বানিয়ে দিয়েছিল তার কুৎসিত দুর্বুদ্ধি দিয়ে। তিনি তার সমস্ত লিমিটেশন ঢেকে দিয়েছিলেন ক্ষুরধার শয়তানি বুদ্ধি দিয়ে। মমতার ইমেজকে ব্লেডের মতো ব্যবহার করে সর্বত্র ফালাফালা তিনি করেছিলেন।
শত্রুকে ঘৃণা করতেই হবে, কিন্তু রাজনীতি করতে এসে রাজনৈতিক ব্যক্তিকে যে শুধু ঘৃণার বসে যারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য উপহাস করে, তার মতো হতচ্ছাড়া মূর্খ গাম্বাট আর কেউ হয় না। সমালোচনা হতে পারে তীব্র ভাবে কিংবা প্রশংসা করতে পারেন, উপেক্ষা করতে পারেন না। তার সময়ে তাকে নিয়ে কেউ কেউ আশায় থাকত, কেউ আবার আশঙ্কায়। কিন্তু, এটা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই, যে তিনি যদ্দিন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সুস্থ শরীরে ছিলেন- তাঁর নিজের মতো করেই ছিলেন।
এটা হচ্ছে মুকুল রায়ের সম্বন্ধে আমার মূল্যয়ন। আমি তার রাজনৈতিক আদর্শকে ঘেন্না করি, কিন্তু উপহাস করতে পারি না, কারণ সে চোখে আঙুল দিয়ে তার বিরোধী প্রতিটা রাজনৈতিক দলের ফাঁকফোঁকর দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। দম্ভ অহমিকার হাড়ে মজ্জায় জন্মানো ক্যান্সার খুঁচিয়ে দিয়ে তাসের ঘরের মতো একটা নীতি আদর্শবাদী দলকে প্রায় ডোডো পাখি করে দিয়ে গেছেন তার সময়ে। মরে যাওয়ার পর তাকে গালিগালাজ দিয়ে নিজের অপরাগতার ঘায়ে উপশম দেওয়ার ছলনা করা যায়, নিজেদের ব্যর্থতাকে জাস্টফাই করা যায় না। আগামীকাল আপনি সফল হবেন তখনই, যখন মুকুল রায়কে পর্যালোচনা করে দেখবেন যে, সে কোন পথে বাম সাম্রাজ্যকে ধ্বসিয়ে দিয়েছিল। যারা অতীতকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে উন্মত্ত ভাবে কেবল ঘৃণা করতে শেখে, সেখান থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা কখনও সোজা মানুষ হতে পারে না।
নদী যদি তার স্রোত হারায় তাকেও নর্দমায় পরিণত হতে হয়, শেষ জীবনে মুকুল রায়েরও সেটাই হয়েছিলেন। মৃত্যুর পর একটা মানুষকে সবাই মিলে শ্রদ্ধা দেখাতে হবেই বা কেন? কেনই বা তাকে সবাই মিলে মূল্যায়ন করতে হবে, প্রয়োজন নেই তো, যোগ্যতাই বা কজনের আছে? যারা রাজনীতির ছাত্র, তারা তথ্যগতভাবে ও সময়ের নিরিখে সুক্ষ বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার মন্দ রাজনৈতিক দিকগুলো নিয়ে মূল্যায়ন করবে, প্রয়োজনে তীব্র আক্রমনাত্বক হলেও তাতে দোষ নেই। কিন্তু ২ পয়সার জ্ঞান নিয়ে আপনি তাকে উপহাস তাচ্ছিল্য করতে পারেন না, কারণ এই ব্যাক্তিই আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শকে তার ক্ষমতা দিয়ে দুর্বল করার সাথেসাথে, আপনাকেও তুচ্ছ হাসির পাত্র বানিয়ে যাবার কারিগর। আজ সোস্যাল মিডিয়ার সর্বত্র যে সব নপুংসক, ঘরে বসে জাতীয় কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট রাজনীতির নামে বিশ্বজয় করে ফেরে, সেই সব কঙ্গু বা বাম্বাচ্চা যাদের প্যাকাটির মতো মেরুদন্ড, এদের প্রত্যেকের জন্ম মুকুল রায়ের বীর্যে। কারণ এদের বাপেদের ধরে ধরে মুকুল রায় খোজা করে দিয়েছিল তার সময়ে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন