সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২০

রাত জাগানিয়াঃ একটি সুখের ডাকনাম

 


বন্ধু শুভঙ্করদা সেদিন আমাদের আড্ডায় শুধিয়েছিল যে- কেন তুমি রাত্রে জেগে থাক, কীভাবে?
আসলে আমরা অনেকেই সারারাত বা প্রায় সারারাত জেগে থাকি, প্রত্যেকের নানান আলাদা আলাদা কারন৷ আমার কিন্তু জেগে থাকা সম্পুর্ণ অকারণে, যার বস্তুগত কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই, সেই অসামাজিকতার কথাই আজ কিছুটা শোনাবো যদি ধৈর্য থাকে।
অনেকে বলে শিল্প কেউবা বলে প্রতিভা, কিন্তু ভীষণ ঘুম ধরা চোখ নিয়েও মোবাইলের কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় আলো জ্বালিয়ে রাখটা কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার নয় মোটেও। কি মনে হয়, রাত জেগে কারো সাথে কথা বলি কিম্বা প্রেমালাপ? ম্যাসেজের টুংটাং কিম্বা ভাইব্রেটারের গোঙানি শব্দে ফোনের কম্পন… নাহ এসবের প্রতীক্ষা করিনা, পরোয়াও করিনা। তবুও জেগে থাকি, শুধুই জেগে থাকি রাতভর- জেগে থাকার আতিসায্যে। রাতের একাকিত্ব যখন অন্তরের সবচেয়ে আপন হয়ে যায় তখন সেই চরম সুখের মূহুর্তগুলোকে উপভোগ করার জন্য নিজেকে জাড়িত করে তার শেষ রস বিন্দু টুকু আস্বাদন করার জন্যই তো এই জাগরণ।
সমগ্র চরাচর যখন নিস্তব্ধ, নিশ্চিন্ত ঘুমের পরিরম্ভে মত্ত, দিকচক্রবালে গ্রহ নক্ষত্রেরা নিজেদের ক্লান্ত একঘেয়ে পরিক্রমায় ব্যাস্ত, শ্বাপদেরা অরণ্যে শিকারের জন্য বেরিয়ে পরেছে- তখনই জাগা শুরু হয়। পূর্নিমা রাত্রিতে আকাশের দিকে চেয়ে থাকার যে অপার্থিব সুখ তা ঘুমের মাঝে কোথায়? অমাবস্যার সীমাহীন অন্ধকারের মাঝে দিকচক্রবাল জুড়ে কালো কালো প্রেতসম ছায়া, এক আকাশ তারাদের মাঝে নিজেকে ওই তাদেরই একজন হিসাবে কখনও কি ভাবতে পারতাম যদিনা রাত্রিতে জেগে থাকতাম?
এই জেগে থাকতে থাকতেই তো নিজেকে চিনেছি, কখনও রবি ঠাকুরের লেখায় ডুবে গেছি তো কখনও বঙ্কিমের সাথে বাংলা ভাষা শিখেছি। শরৎচন্দ্রের ইন্দ্রের সাথে তো আমার রাত্রেই পরিচয়, কিছুক্ষণ সেক্সপিয়ার হাতড়ে আবার পরক্ষণেই জীবনানন্দের শঙ্খ চিল হয়ে নবান্নের স্বাদ চেখেছি। অপুর পাঁচালী হোক বা ফেলুদার সাথে মগজাস্ত্রে শান সবই এই রাত্রির আঁধারেই ঘটা। কখনও বিভূতিভূষণের ইছামতিতে ভেসে চলা তো কখনও আবার বিমল মিত্রের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের চড়াই উৎরাই পেরানো- জেগে থাকার জন্য আর কোন বাহানা প্রয়োজন!
এই রাত্রিতেই কী অনায়াসে আতালান্তিক পেরিয়ে হাজির হয়ে যায় লাতিন আমেরিকার মানুষখেকোদের ডেরায়, আফ্রিকার উপজাতিদের মাঝে কিম্বা আরবের রঙিন রজনীগুলোতে। কখনও ব্রোঞ্চ যুগে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ছুটে বেড়ায় ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেঁষে, দেখি ইউরোপের আধুনিকতা, ক্লান্ত হয়ে সাঁতার কাটি কৃষ্ণ সাগরের বন্দি জলে। কখনো হেঁটে চলি ইবনে বতুতার সাথে, চলে যায় স্ক্যান্ডেনেভিয়ানদের ভাইকিং রাজ্যে, গোবি মরুভূমির গিরগিটিদের সাথে কিছুক্ষণ সময় লুকোচুরি করে ফিরে আসি গঙ্গার উৎসমুখে, হিমালয়ের কোলে।
ভূগোলের ম্যাপে থাকা সরু সরু শিরা উপশিরা বেয়ে চলতে থাকি জ্ঞানের অন্বেষণে, যত জানি ততই স্তব্ধ হয়ে যায় নিজের অজ্ঞানতা দেখে, পাছে লোকে জেনে যায় এই মূর্খতার কথা, তাই তো রাত্রের আঁধার বেয়ে পাড়ি দিই শান্ত নদী বেয়ে কখনও চীনে, কখনও মিশরে কখনও বা মস্কোর অলিতে গলিতে। বিপুলা এই ভারতের কত সভ্যতা, কত সংস্কৃতি কত ভাষা- লতার মতো চেপে ধরে রাত্রিকে অবলম্বন করে। বিস্মৃতির চোরাবালির আড়ালে একান্ত গোপনে তারা নিজের মধ্যে আপাদমস্তক টেনে নেয় আমাকে রাত্রির আঁধারে।
ভাবনার মাঝে কতশত দ্বন্দ্বেরা যখন নিজেদের মাঝে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে রাখে, তখন তাকে কাছ থেকে পরখ করা জন্য রাত্রির নির্জনতা ভিন্ন আর সময় আছে? বাষ্পীয় আত্মার পরিভ্রমণের পথে মুক্ত প্রাণের স্লোগান লেখা চিঠি গুলো তো এই রাত্রের ডাকেই এসে পৌঁছায় হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে। ব্যাঙাচির জীবনচক্রে নীতি গ্রন্থের অসহায় আত্মসমর্পন ঘটলে লেজ খসে পরে, মৃত্যুর দূতেরা বার্তা দিয়ে যায় তির্যক দীর্ঘশ্বাসে, পরিচিত গন্ধেরা কুড়ে খায় মগজের ধন- এসব কি জানতে পারতাম রাত্রি না জাগলে?
অপ্রাপ্তিকে হাতড়িয়ে হা হুতাশ না করে নৈঃশব্দকে যারা আপন করতে পারে তাদের কাছে অবসাদই প্রিয়ার বেশে ধরা দেয় আলুথালু বেশে, কালের খাতায় লিপিবদ্ধ হয় ঘড়ির নির্বাক পরিযায়, অভিমানের সীলমোহরে থাকা কলঙ্কেরা ধরা দেয় রঙিন স্বপ্নের বসনে। রাত্রি জেগে থাকার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ লাগেনা, দুঃখ সুখ হাসি কান্না ব্যথা আনন্দ বেদনা- এসব কিছুকে বস্তুগত ভাবে স্পর্শ করে তাদের সাথে কিছুটা সময় একান্তে কাটানো যায়না দিনের কোলাহলে।
ব্যার্থ প্রেম, প্রিয় মানুষের ছেড়ে চলে যাওয়াতে যারা কাঁদতে পারেনা, রাত্রির আঁধারই তো তাদের শুশ্রূষা করে পরম মমত্বে, সমৃদ্ধ হয় উপলব্ধির ঝুলি। পুরোনো স্মৃতির সরণীতে পিছলিয়ে না চলে, মাকড়সার ঝুল সরিয়ে সিঁড়ি পথে স্যাঁতস্যাঁতে জমিতে নামার জন্য রাত্রির গভীরতাই যে আদর্শ, আঁধারের আঁধার চোখকে সইয়ে দেয়। তাইতো জেগে থাকি রাতের নিস্তব্ধতার মোড়কে থাকা যত্নেকে অনুভব করতে৷
মুখোশের আড়ালে থাকা বিরহের আগুনকে দীর্ঘদিন ধরে লালনের রমণ আসলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেশা, কবিরা কাব্যে তার বিষ্ফোরন ঘটাতে পারেন, কিন্তু আমাদের মতো যারা অকবি তারা রাতের পাহারাদার হয়ে বিরহের সূচ দিয়ে জীবনের কাঁথা সেলাই করে ফুলকারি নক্সা আঁকে। শরতের আকাশে ভেসে যাওয়া সাদা মেঘের মতো অনিশ্চিত এই জীবনে কখন যে কে কোথায় টুক করে ঝরে পড়বে তার ঠিকানা কে রাখে, ব্যর্থতার কালো মেঘ হয়ে জমে থাকা অপ্রিয় স্মরণিকাদের সাথে একান্তে কিছুটা সঙ্গম সুখ নিশীথের একাকিত্বে যার শীৎকারে রোমকূপে শিহরণ জাগে, ঝরে পড়ার ঠিক আগে।
বিরাট এই বিশ্বের মাঝে নিজে যে কি সামান্য ক্ষুদ্র অস্তিত্ব তা রাত্রির আরসির মুখোমুখি হলে তবেই উপলব্ধি করা সম্ভব। আলোকের আনন্দে উল্লসিত প্রাণ, তুচ্ছ আমিত্বকে উপেক্ষা করে শোকসর্বস্ব পৃথিবীর জন্মজন্মান্তরের যে নিগুঢ় রহস্য- তার স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। জীবনের পথে চড়াই কম উৎরাই বেশি, বিপদেরা ঝাঁক বেঁধে ওৎ পেতে বসে থাকে জোনাকির মতো, যা অমাবস্যার রাত্রিতে আবিষ্কার করা যায়। ভীরুতা, শঠতা, কাপুরুষতাকে অন্ধকার কখনও দৃশ্যমান করেনা লোকসমাজে, দেখনদারির ঝুলন উৎসবে সামাজিক বর্ম পরিহিত ‘আমি’ কে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য আঁধারের চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ নেই।
নিজের মাঝে ইশ্বরের খোঁজ পেতে হলে, ভেঙে যাওয়া মুহুর্ত গুলোর প্রতিটি টুকরো খুঁজে আবার নতুন করে বানিয়ে, অলীকের সাথে আবার নতুন করে শুরু করে সেই ভুল শুধরে নেওয়ার মাঝেই তো ঈশ্বরের বাস। দিনের আলো জীবনকে শুষে নিয়েই তো সে উজ্জ্বল হয়, রাত্রি আবার সেই পরমায়ু ফিরিয়ে দেয়।
সকলের মাঝে থেকে সম্পূর্ন একটা নিঃসঙ্গ জীবন যাপন আসলেই একটা কলা, জেদ না থাকলে শিল্পী হওয়া যায়না, প্রয়োজন অধ্যাবসায়। মানবীয় সম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়ে থাকা সাংসারিক সদস্য- মা, ভাই, বোন, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধু, আত্মীয় স্বজনেরা জীবনের অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু তার জন্য নিজেকেও প্রয়োজন, আর নিজেকে জানতে কিছুটা অধিকার নিজের জন্যও সংরক্ষণ করতেই হয়, আর তার জন্যই রাত্রির প্রহর গুলোকে কারোর সাথে ভাগ করতে মন সায় দেয়না।
মাঝরাতে খুব প্রিয় মানুষ ছাড়া বাকি সকল কিছুকেই যেন অনাহূত মনে হয়, কেউ যদি নতুন করে জীবনে আসতে চায়- বস্তু হোক বা জীবন; মনটা শিউরে উঠে, ভয়ে পেয়ে চমকে যায়- যদি সেই সম্পর্ক সেই ভালোবাসা নিজেকে ভালবাসার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়, তখন আমি তো আর আমার সাথে বাঁচতে পারবনা। তাই ভয় পায়, সম্পর্কেরা হারিয়ে যায় সীমান্তে বিলীন হয়ে নিজ কক্ষপথে...
হারিয়ে যাওয়া সকল কিছুই আর কখনও ফিরে আসেনা, এটাকে নগ্ন ভাবে আঁকার জন্য একটা বিস্তৃত ক্যানভাস দরকার হয়, রাত্রের গাঢ় অন্ধকারের চেয়ে মসৃণ ক্যানভাসের বিকল্প আর কিছু আছে কি অদৌ? পোড়া বুকের মাঝে তাজা ফুসফুস বড় বেমানান জুটি, এদের মাঝে সন্ধির জন্য প্রয়োজন সীমাহীন কল্পনার প্রলেপ, যে কল্পনা জন্ম দেয় দুর ভবিষ্যতের, জন্ম দেয় নব নব সৌন্দর্যের- যাকে পুঁজি করে আগামীর সকল রাত্রে জেগে থাকার জন্য রসদ সংগ্রহ হয়।
একা থাকাটা আসলেই ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ ভালবাসার জন্য অখন্ড অবকাশ প্রয়োজন যেখানে কেউ শান্তিভঙ্গ করবেনা৷ সারারাত জেগে রাতের নির্জনতাকে উপভোগ করতে শিখে গেলে অবশিষ্ট প্রার্থিব সকল কিছুকেই অত্যন্ত সস্তা বলে মনে হয়। রাতজাগা অস্বস্তির নয়, বরং সুখের- অনন্ত সুখের পরশ; তাই তো বছরের পর বছর ধরে রাত্রিগুলো সুখের ওমেই কাটিয়ে দেওয়া যায় জেগে জেগে।

প্রতিদিন একটা নতুন ভোরের জন্ম দেবার সুখ কেবলমাত্র সে ই জানে যে রাত্রি জেগেছে শখ করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...