প্রিয় প্রাক্তন,
পত্রের শুরুতেই আমার ভালোবাসা নিও। অন্তরের অন্তরস্থল থেকে পাঠানো একগুচ্ছ গন্ধরাজের শুভেচ্ছা গ্রহণ করলে আনন্দিত হবো। আজ তোমাকে
লিখতে বসেছি, তুমি ভাবতেই পারো- আজ হঠাৎ কি এমন হলো! জানিনা কি হলো, তবে আমার
বিচিত্র খেয়ালের কথা তো তুমি জানো, তবে আজ তোমাকেই লিখতে বসেছি। বিলাপী বৃষ্টি তান
ধরছে জানালার বাইরে, বর্ষার সাথে অকৃত্রিম যুগলবন্দি। এই মুর্চ্ছনাতে আমি আজ তোমায় বিষাদের গল্প শোনাবোনা, তোমার উদ্দেশ্য কিছু
কথা বলতে চেয়ে আমার এই লেখা।
আচ্ছা, আজকাল তুমি কি প্রেম কর কারো
সাথে?
সে করতেই পার, তবে যুগ-জামানা ভালো নয়, একটু বুঝে শুনে, একটু সাবধানী…। এখন আবার কমপক্ষে খান দু’চার খানা ছাড়া নাকি চলেনা ‘আধুনিক’ সমাজে। শুধুই কী প্রেম করো? ভালোবাসোনা তাকে? ভালোবাসা ছাড়া প্রেম হয়?
তার চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা পাওয়া, চুম্বনে কঠোর নিষিদ্ধতা, আজও কী তোমার কাছে শুরুর
প্রেমের এমনই মানে! তার সাথে নিয়মিত দেখা করো? কেমন লাগে তার আলিঙ্গণে নিজেকে সঁপে দিতে! তুমি নির্জনতা উপভোগ করো,
নাকি তাকে? মগজে উত্তেজনা, হৃদয়ে কম্পন আর শরীরে শীতলতার সেই অসাধারণ সম্মেলন নিয়ে আসতে পারো আজকাল?
আজও তার সাথে একান্তে সময় কাটাও, হাতে হাত, কাঁধে মাথা রাখো! আজও কি এলোমেলো
চুলগুলো ছুঁয়ে গেলে জানান দেয় তোমার হৃদয়ের আকুলতা! আজও কি কোনো
নদীর ঘাটে, পার্কের কোনে, নিরিবিলি রাস্তায়, সিনেমা হলের অন্ধকারে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে
দেখো- তার নিঃশ্বাসে বিষ আছে কিনা! কথা বলো রাত জেগে? অজস্র খুনসুটির সৌরভ
মুখরিত করে তোমার সারাদিন? আসও ভালোবাসার
প্রতিটা মূহুর্ত বসন্তের বিকালের মত অনুভূত হয়? আজও
তার বুকে
বিলীন হতে চায় বেহায়া মন? আদিম উন্মাদনার প্রলোভনে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারো আজও? আজও কী তার পাশে বসে নিঃশব্দে ধ্রুবতারা থেকে স্বপ্ন পেড়ে আনো?
আজও কি বলো ‘বহিরঙ্গের
রূপ নয়, আমি গুণের প্রেমে পরেছি’, আজও
কি ‘জীবনের প্রথম’ খুঁজে ফিরছো- যে
তোমাকে ভালোবাসে! আজও আলিঙ্গনের ইঙ্গিতেই তোমার গভীর অনুভূতিরা বাঙ্ময়
হয়ে উঠে? আজও কি শরীরকে উদযাপন করো? করলে কীভাবে সান্ত্বনা দাও প্রতিটা কলঙ্ককে, কীভাবে
নিজেকে মানসিক সমর্থন করো? আজকে তোমার
কাছে স্নেহের সংজ্ঞা কি বদলে গেছে? সুযোগ
নেওয়ার পরিভাষাই বা কী? আজ কীভাবে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো
জীবনে, আজও কি তোমার নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব হয়?
তাকে অনুভব করো প্রতিটা মুহুর্তে, প্রতিটা নিশ্বাসে। তার হাসির মিষ্টতা তোমার দৃষ্টিতে মিশে মায়াবী চাহনি তৈরি করে? সেই পুড়িয়ে দেওয়া দৃষ্টি দিয়ে শরীর জুড়ে
ভালোবাসার উষ্ণতা ছিটিয়ে পারো? লক্ষ কোটি বছর ধরে পলকহীন চেয়ে আজও কী হৃদয়ের সবচেয়ে শীতলতম স্থানটিতে ভালোবাসার চাষাবাদ হয়। আজও কি তার
চোখের দিকে তাকিয়ে দিগন্ত জোড়া সোহাগের ময়দানে অবুঝ শিশুর মত ছুটে বেড়াও! আহ্লাদের স্পর্শরা কি সকল বাঁধ ধ্বসিয়ে
দিয়ে
লজ্জায় মুখ নীল করে চোখ বন্ধ করে দেয়?
নাহ, কোনো বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের উপরে জবাবদিহি চাইছিনা, সামগ্রিকভাবে
বদলে যাওয়া সময়ে তোমার আচরণ বিবেচনা করতে সাহস সঞ্চয়
করতে পারার তাগিদও দিচ্ছিনা। জানো তো, পালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো কিছুই অপরিহার্য নয়। শুধু থেকে যেতে, বহু কিছু
লাগে, বহু কিছু।
আমি কী করছি? জানি তুমি জানতে চাইবেনা, তবুও
বলি- আমি দেখি, কেবল দেখি। দেখতে দেখতে লিখি, লিখতে লিখতে দেখি।
দেখি, রাস্তার ধারের
কোনো ছাওয়াতে বুড়ো কুকুরটা ক্লান্তিতে জিভ বের করে নিজেকে ঠান্ডা করছে। দুপুরের রোদে
বিতৃষ্ণ পথিকের মুখে বিরক্তের বলিরেখা, মোছার ব্যার্থ চেষ্টা
করছে জামার আস্তিন দিয়ে। উদাস এলোমেলো হাওয়া সমস্ত দুর্গন্ধ শুষে
নিচ্ছে কি যেন মন্ত্রবলে। ঢেউহীন নির্ভীক নদী নিঃশব্দে বয়ে চলেছে অন্তহীন,
যুগযুগান্ত ধরে নিঃস্ব, নিরাসক্তভাবে একই অভিমূখে, কখনও যার উল্টোপথে হাঁটার সাধ জাগেনা। তার বয়ে যাবার জন্য জমিকে জঞ্জালমুক্ত করতে হয়নি কখনও।
শাশ্বত সভ্যতা রোজ বদলে যাচ্ছে সংস্কৃতির পথ বেয়ে, মানবতার স্বল্পায়ত
জীবনসীমায় কিছু মহৎ শব্দেরা গদ্য এঁকে যায় আপন মনে।
তবু ঘেঁটু, কলমি, হেলেঞ্চার মত আদুরে শিকড়ের বলে টিকে থাকা লতারা
চেয়ে দেখে বাঁশবন, হিজলের ছায়া, আমবন, পুরোনো বটের শিকড়ে ঘিরে ধরা পোড়ো ভিটে, গুঁড়ি-মোটা পাকুরের ডালে গাংচিলের বাসা। কে জানে আজও কেন নিষ্ঠুর পৃথিবীটা
শুধু ঘুরে চলে অক্লান্ত মোহে, কে জানে কোন উদ্দেশ্যে, কার টানে।
ছায়াচ্ছন্ন গুমোট প্রাণে খুঁজে ফিরি কর্মখালির বিজ্ঞাপন, প্রেমিকের কাজ জানা ‘লোক’ চাই। আমি অবসরে যাওয়া
পরিত্যাক্ত প্রেমিক, যে নির্জলা ‘আদরের’ উপবাস করছি।
পার্থিব হৃদয়ের পবিত্র
বাসস্থানে বসে নগ্ন জীবনের ব্যর্থতাকে উপভোগ করছি চুটিয়ে। আনন্দঘণ শহরের পথে
পথে নিপুনতার মুখোস,
উপশিরা জুড়ে ক্রোধ আর ভাবনাতে ধর্মঘট। আতঙ্কের ফাঁসি কাঠে ঝুলতে থাকা কারো কাছে, ভ্রমণের গল্পের
চেয়ে বড় নির্যাতন আর হয়না। তাই মিলেমিশে চেয়ে থাকি অপেক্ষার সাথে, এক অস্থির কলহাস্যে
অপেক্ষার মুখেও প্রশান্তি খেলে যায়, আবার হৃদয়ে গিঁট দিই সজোরে। মরমে আগুন জ্বালিয়ে
এক দুর্বোধ্য অজুহাতে, সমস্ত লণ্ডভণ্ড হওয়ার প্রতীক্ষাতে
বসে থাকা আমার হৃৎস্পন্দনেও হরতাল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন