রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

নেপো কিড ও ক্রিকেটে


 

আমার মত বহু মানুষ ক্রিকেটে বেঁচে থাকি, ক্রিকেট খায়, ক্রিকেটে শ্বাস নিই। কিন্তু ছেলেবেলার অন্ধ আবেগ আর আজকের বাস্তবতা এক নয়। আজও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা বা প্রেমের ঘাটতি নেই, আমৃত্যু সেটা একই রয়ে যাবে অভ্যাসের কারনে। কিন্তু বর্তমান তথ্য উপাত্ত গুলো মগজে ধাক্কা দেয়, অন্ধ আবেগকে প্রশ্ন করে। বর্তমান ক্রিকেটটা আসলে কয়েকটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি মিলে চালাচ্ছে, একান্তই নিজেদের প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি।

আমাদের ক্রিকেট বোর্ড তথা BCCI আবার একটি সমবায় সমিতি, ১৯৭৫ সালে ‘তামিলনাড়ু সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন আইনের অধীনে নিবন্ধিতএশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (ACC) মালয়েশিয়াতেও একটি কোম্পানি হিসাবে রেজিস্টার্ডযেমন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা ইত্যাদি গভর্নিং বডি গুলো ‘কোম্পানি’ হিসাবে রেজিস্টার্ড রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল লিমিটেড (ICC), কর ফাঁকির স্বর্গ ‘ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস (BVI)‘কোম্পানি বডি’ হিসাবে রেজিস্টার্ড রয়েছে। অথচ সমজাতীয় অন্যান্য স্পোর্টসের বৈশ্বিক নিয়ামক সংস্থা গুলো যেমন FIFA, International Hockey Federation (FIH), International Olympic Committee (IOC) ইত্যাদি গুলো NPO/NGO হিসাবে রেজিস্টার্ড রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংস্থা FIFA যেখানে তাদের আইন-কানুন সবটা উন্মুক্ত স্বচ্ছ করে রেখেছে, সেখানে ICC এর অধিকাংশ নিয়ম কানুন যথেষ্ট ধোঁয়াসা যুক্ত। FIFA সুইজারল্যান্ডে নিবন্ধিত একটি নন প্রফিটেবল অর্গানাইজেশন, তাই রোজগারের উপরে TAX তাদেরও দিতে হয়না। কিন্তু টুর্নামেন্ট আয়োজন করলে সেই দেশের নিয়ম অনুসারে ফিফাকে হিসাব কষেই TAX দিতে হয়

জয় শাহ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আইসিসির নেতৃত্বে রয়েছে, বোর্ডের সুবাদে ২০১৯ সাল থেকে আইসিসির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কংগ্রেসের বড় নেতা রাজীব শুক্লা আবার বোর্ডের বড় নেতা, ACC-এর নির্বাহী সদস্য। এখানে সেই অর্থে রাজনৈতিক দলাদলি ততটা নেই, ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধি বেশী থাকে, এটুকুই। তার পরেও সকলে মিলেমিশে ক্ষমতা ভোগ করে এখানে।

২০২২ সালে ৪৮,৩৯০ টাকায় আইপিএল মিডিয়া স্বত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল BCCI। শুধুমাত্র আইপিএল থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫,৭৬১ কোটি টাকা আয় করেছে বোর্ড, যার গোটাটা করমুক্ত। বর্তমান আর্থিক বর্ষে BCCI-এর রোজগারের উপরে ট্যাক্সের পরিমান দাঁড়াবে ,৩৬২ কোটি টাকা, কিন্তু BCCI আদালতে গিয়েছে এই ট্যাক্স থেকে তাদের অব্যাহতির দেবার জন্য। সরকার সেটা দিয়েও দেবে। বিসিসিআইকে শুধু প্রফিট এর উপরে ইনকাম ট্যাক্স দিলে হবে না, প্রতিটি ম্যাচের টিকিটের উপরে অ্যামিউসমেন্ট ট্যাক্স দিতে কেন বাধ্য করা হবেনা, যেখানে ভারতীয় ফুটবল লীগ তথা ISL কে গুণেগুণে TAX দিতে হয়

অর্থাৎ ICC, ACC এমনকি BCCI দ্বারা আয়োজিত এই সকল বাণিজ্যিক টুর্নামেন্ট একান্তই ব্যক্তিগত কোম্পানি ভিত্তিক আয়োজন। কোনো মিউজিক্যাল শো, সার্কাস, কিম্বা থিয়েটারের সাথে এর ফারাক কোথায়? তবু তো এরা রোজগারের উপরে সরকারকে TAX দেয়, BCCI সেটাও দেয়না। ক্রিকেট বোর্ডে রাষ্ট্রের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, দেশের ক্রীড়া আইন এদের উপরে লাগু হয়না, এদের আয় ব্যায়ের হিসাব একান্তই এদের নিজশ্ব, জনগণ চাইলেও তা জানার অধিকার রাখেনা। মোদ্দাকথা এই ক্রিকেটের সাথে ‘দেশ’ ভারতের তথা জাতির কোনো সম্পর্ক নেই, না সরকারের সাথে কোনও সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং কিসের জাতীয় সম্মান এবং আর কীভাবে জাতির গর্ব হতে পারে ক্রিকেট?

আসলে পৃথিবী জুড়ে সমস্যা হচ্ছে নেপো-কিড। কোন যোগ্যোতার বলে এই নেপো কিড গুলো ক্ষমতার চেয়ারে বসে তার পৃষ্ঠপোষকতা করছে কেউ জানেনা। BCCI এর পদে থাকা ‘সিদ্ধান্ত নেওয়া’ ব্যক্তিদের অধিকাংশই ক্রিকেটের সাথে কখনও জড়িত ছিলোনা। বাকি যারা রয়েছে তাদের প্রশাসনিক দক্ষতাও পরীক্ষীত নয়, আর এমন সব অযোগ্য ব্যাক্তিদের খুঁজে খুঁজে এনে চেয়ারে বসানো হচ্ছে পুতুল হিসাবে, যাতে অবৈধ ভাবে পর্দার পিছন থেকে তৃতীয় কেউ ছড়ি ঘোরাতে পারে

বাংলাতে একটা প্রবাদ রয়েছে- নেপোয় মারে দই। বর্তমানে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সেই নেপো অর্থাৎ নেপো-কিড দের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। অনুরাগ ঠাকুর, বিজেপি নেতা প্রেম মুকার ধুমলের ছেলে। অনুরাগের ছোট ভাই অরুন ঠাকুর, হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। তার চেয়েও বড় পরিচয় সে IPL এর চেয়ারম্যান। মধ্যপ্রদেশে মহানারায়ণ রাও সিন্ধিয়া জ্যোতিরাদিত্যের ছেলে, অরুন জেটলির ছেলে রোহন জেটলি দিল্লি বোর্ডের মাথায়।

প্রাক্তন সচিব নিরঞ্জন শাহের ছেলে জয়দেব সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি চেন্নাই এর শ্রীনিবাসনের মেয়ে রূপা গুরুনাথ তামিলনাড়ু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিগোয়াতে বিনোদ ফাড়কের ছেলে বিপুল ফাড়কে চেয়ারে বসে পরেছে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। চিরায়ু আমিনের ছেলে প্রণব আমিন বরোদা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিল। প্রাক্তন বিসিসিআই সভাপতি রণবীর সিং মহেন্দ্রের ছেলে, অনিরুদ্ধ চৌধুরী বিসিসিআই কোষাধ্যক্ষ ছিল। বাংলাতে অভিষেক ও বৈশাখী ডালমিয়ারাও ক্ষমতায় বসেছিলো। আসলে সবটাই বিজেপির স্বজনপ্রীতি

ই নেপো গুলো শুধু পদে বসে ক্ষমতার ওম নিচ্ছেনা, চেয়ারকে ব্যবহার করে, হোল্ড করা পজিশনের অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল হারামের অর্থ উপার্জন করেছে প্রত্যেকে। নতুবা এতো লালায়িত হতোনা পদে বসার জন্য। উদাহরণ হিসাবে জয় শাহ’কে দেখুন, গত পাঁচ বছরে এর ১৪০০ শতাংশ সম্পদ বৃদ্ধি হয়েছে এই পাপ্পুর। আজ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পত্তির মালিক। এর বাইরে বিদেশে কতটা আছে কে জানে! পৃথিবীর কোনো চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কোনও বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল, কোনো ব্যবসা এই অগ্রগতি দেখাতে পারবেনা এর মত গুণীজনকে ICC এর চেয়ারম্যানের মত নগণ্য পদে আঁটকে রাখা কী ভারতের মেধা বিনষ্ট করা হচ্ছেনা? দেশের অর্থমন্ত্রকের উপদেষ্টা কিম্বা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর, নিদেনপক্ষে সকল IIM মুখ্য পদ সৃষ্টি করে সেখানে কে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছেনা কেন!

এশিয়া কাপের এই ভারত পাকিস্তান ম্যাচের আয়োজন থেকে রোজগারকৃত অর্থ দ্বারা আমাদের দেশ ‘ভারত’ কীভাবে উপকৃত হবে? যারা রোজগার করবে, তারা তো TAX দেবেনা। বর্তমানে ACC এর চেয়ারম্যান পাকিস্তানের বর্তমান স্বরাষ্ট্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী মোহসিন নকভি। জয় শাহ মোহেন নকভি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত- BCCI, ACC এবং ICC দ্বারা পরিচালিত ভারত পাকিস্তান’ ম্যাচ না হওয়ার দরুন সত্যিই যদি বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হয়- রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের জনগণের বা ভারত সরকারের কী যায় আসে?

মোদী সরকারের কোন দায় ছিল BCCI এই বানিজ্যিক ধান্দাবাজিতে- দেশের মানুষের আবেগ, সেনার আত্মবলিদান, এতো গুলো লাশ ডিঙিয়ে খেলার অনুমতি দেওয়ার? আসলে ম্যাচ বন্ধ হলে বিজেপির ‘নেপো কিডস’ এর দলের পেশাদার জীবন ঝুঁকির মুখে পরততাদের মুনাফা কমে যেতো। তাই রাষ্ট্রের স্বার্থের আগে নেপোকিডদের স্বার্থকে অগ্রাধিকারের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। পাকিস্তানের সাথে একই সাথে রক্ত ও বল গড়াচ্ছে।

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...