মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

PM Cares Fund


 

স্বাধীন ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মত ঠগ, প্রবঞ্চক, নিকৃষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারেনি, আগামীতেও পারবে কিনা সন্দেহ আছে। জাতিদাঙ্গা, আদানি, আম্বানি, করের টাকায় মোচ্ছব করে বিদেশভ্রমণ সে সব একদিকে, আর PM কেয়ার ফান্ডের নামে প্রকাশ্য রাহাজানি অন্যদিকে। এলেকটোরাল বন্ডের মত এটাও সমমানের দুর্নীতি, যার গোটাটাই প্রায় কালো টাকা, সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে দিনে ডাকাতি করছে মোদী সরকার। পাশাপাশি মানুষের স্মৃতি থেকে এই দুর্নীতিটা ক্রমশ গায়েব করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

২০২০ সালে করোনার সময়, নাগরিক সহায়তা ও জরুরি অবস্থা তহবিল এবং অন্যান্য উচ্চ জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ এবং ত্রাণের কাজে ব্যবহারের জন্য ‘পাবলিক ফান্ডিং’ উদ্দেশ্যে- মাননীয় নরেন্দ্র মোদী তার PM CARES’ তহবিল গঠনের ঘোষণা করেছিলেন। সেখানে সরকারী .gov ডোমেইন এবং ভারতের জাতীয় প্রতীক সহ একটি ওয়েবসাইট ব্যবহার হয়েছিলো ও হয়ে চলেছে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা তহবিল এবং রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল থাকা সত্বেও সেগুলোকে উপেক্ষা করে এই নতুন ফাঁদ পাতা হয়েছিলো। বিভিন্ন বেসরকারি তথ্যমতে মোদীর ব্যক্তিগত PM-CARES তহবিল মাত্র ৩ বছরে ৩০,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে জনগণের থেকে।

সরকারের নাম, সরকারী প্রচারযন্ত্র, সরকারী পরিচয়বাহক ওয়েওসাইট ব্যবহার করা সত্ত্বেও, RTI আইনের অধীনে যতবার তথ্য জানতে চেয়ে ‘নিয়ম মেনে’ আবেদন করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়ে বিষয়টিকে প্রতিবার নস্যাৎ করে দিয়েছে- এটা প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত তহবিল’, যা কোনও সরকারি সম্পত্তি নয়। ভোটচোর জ্ঞানেশ কুমারের- “ক্যায়া আপনি মাতাও, বহুও, বেটিও সহেত কিসি ভি মতদাতা কি CCTV ভিডিও চুনাও আয়োগ কো সাঁঝা করনা চাহিয়ে ক্যা?” এই স্ক্রিপ্টেড ডায়লোগের সাথে পুরোপুরো মিলে যাচ্ছেনা কী!

ই PM কেয়ার তহবিলের চেয়ারম্যান হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য ট্রাস্টিরা হলেন অমিত শাহ, রাজনাথ সিং এবং নির্মলা সীতারমন। সমস্ত রকম আইনকে কাঁচকলা দেখিয়ে কোন অনুমতি ছাড়াই কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মীদের ১ দিনের বেতন জবরদস্তি ভাবে কেটে নিয়েছিল PM Care এর নামে। ফলত এর উপরে দিল্লি কোর্টে মামলা দাখিল হয়, সুপ্রিম কোর্টেও একটি পৃথক মামলা দায়ের হয় প্রশান্ত ভূষণ কর্তৃক। সরকারের স্বচ্ছতা বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে, আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলে যে- কোনো ব্যক্তিগত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে জাতীয় প্রতীক ব্যবহার করতে পারে? ফাঁদে পরা সরকার তখন একে ‘পাবলিক তহবিল’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

তবে এর সাথে একটা আইন জুড়ে দেয় যে, PM কেয়ার তহবিল- ২০০৫ সালের তথ্যের অধিকার আইনের অন্তর্ভুক্ত নয়। এমনকি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG) আওতাধীন অডিটের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এক্ষেত্রেও কেন্দ্রের অদ্ভুত যুক্তি ছিল- যেহেতু কাউকে জবরদস্তি টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছেনা, তাই এটা জনগণের পাবলিক সম্পত্তি হতে পারেনা। কার থেকে কী লুকাতে এই লুকোচুরি তা কেউ জানেনা। লক্ষ লক্ষ মামলার মত এই মামলাও ঝুলে রয়েছে আদালতে, বিজেপি সরকার থাকা অবধি এই মামলা কখনই যে দিনের আলো দেখবেনা তা বলাই বাহুল্য।

PM CARES-কারা দান করেছে, তাদের নাম কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি আজ অবধি। কিছু মোদী ঘনিষ্ট কোম্পানি নিজেরা তাদের প্রদেয় দানের অঙ্ক ঘোষণা করেছে, যেমন রিলায়েন্স গ্রুপ ৫০০ কোটি, আদানি গ্রুপ ১০০ কোটি, পেটিএম ৫০০ কোটি, জেএসডব্লিউ গ্রুপ ১০০ কোটি, BCCI ৫১ কোটি, ভারতীয় রেল ১৫১ কোটি ইত্যাদি। সরকারের মালিকানাধীন এবং পরিচালিত কমপক্ষে ৩৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা PMCARES তহবিলে ২,১০৫ কোটি টাকার বিশাল অনুদান দিয়েছেরাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কর্মচারী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী ৪৮৭ কোটি টাকা এসেছে তাদের ১ দিনের কাটা বেতন থেকে। যেটুকু তথ্য এসেছে সবটাই অনুদান দাতাদের থেকে, হিসাবনিকেশের এখানেই শুরু আর এখানেই শেষ।

যেহেতু বিদেশী অনুদান অনুমোদিত ছিল, সেখান থেকে কতটা এসেছে কেউ জানেনা। কোম্পানি আইনের অধীনে এই অনুদানকে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যয় (CSR)’ হিসাবে বিবেচনা করার যোগ্য করা হয়েছিল। এই বাবদ কত এসেছে কেউ জানেনা। বেশ কিছু চীন ভিত্তিক চীনা মালিকানাধীন সংস্থা PMCARES তহবিলে অনুদান দিয়েছে। TikTok এর দাবি অনুযায়ী তারা ৩০ কোটি টাকা দিয়েছিলো, Xiaomi দিয়েছে ১০ কোটি টাকা, Huawei ৭ কোটি টাকা এবং OnePlus ১ কোটি টাকা দেয় ওই সময়। বাকি হিসাব কেউ কিচ্ছু জানেনা, যা একই সাথে সন্দেহজনক ও উদ্বেগজনক।

এই তফবিল ব্যবহার করে কিছু হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সিস্টেম পাঠিয়ে ছিলেন মাননীয় ‘অমৃতকালের কসাই’। সেই সকল হাসপাতাল এর রিপোর্ট দেখুন, প্রতিটি মেসিন অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ার দরুন ১ বছরের মধ্যে সেগুলোকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে হয়েছে। বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশ সরকারের স্করপিও গাড়ি কেনার মত পুকুরচুরির ঘটনার সাক্ষীও তো আমরাই। সুতরাং, এই ভেন্টিলেশন মেসিন কেনার মধ্যেও নিশ্চিত ভাবে কাটমানি ছিল।

এ অবধিও ঠিক ছিল, আরো নির্লজ্জ ভাবে ২০২৩ সাল থেকে PM CARES তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট পাবলিক্যালি প্রকাশ করার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এটা কোনো আশ্চর্য নয় যে মোদী এমনটা করবে, তার অতীত কর্মকান্ডের সাথে এটা একদম খাপেখাপে বসে যায়। প্রথম তিন বছরে যারা ৩০,০০০ কোটি টাকা পেয়েছে, পরবর্তী আড়াই বছরে কত পেয়েছে, কেউ জানেনা। কোনো অডিট নেই, কে টাকা পাঠাচ্ছে আর কোথায় খরচা হচ্ছে তার কোনো জবাবদিহি নেই। অথচ এখানে কেউ দান করলে সেই টাকা সম্পূর্ণ করমুক্ত। 100% tax deduction under Section 80G of the Income Tax Act, 1961.

করোনার ভ্যাক্সিন কেনার জন্য মোদী সরকার Asian Development Bank থেকে বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লোন নিয়েছিলো, Asia Pacific Vaccine Access Facility programme এর নামে। সিংহভাগ ভ্যাক্সিন কেনা হয়েছিলো ব্রিটেনের অ্যাস্ট্রাজেনেকা তৈরি কোভিশিল্ড, সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া’ সংস্থার ভায়া হয়ে। অল্প কিছুটা কেনা হয়েছিলো ভারত বায়োটেকের’ থেকে যার নাম ছিল কোভ্যাক্সিন। আজকের দিনে সকলেই জানে অ্যাস্ট্রাজেনেকাতে বিল গেটসের লগ্নি ছিল, আর বকলমে ভ্যাক্সিনের সব টাকা তার পেটেই ঢুকেছিলো- হুজুরের ৭৫তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা মাগনা আসেনি।

প্রশ্ন বিল গেটস বা তার শুভেচ্ছা নয়, প্রশ্ন হচ্ছে PM CARES-এ ৩০,০০০ কোটি টাকা জমা থাকা সত্ত্বেও, ভ্যাক্সিন কেনার জন্য মোদী সরকার ২৭,০০০ কোটি টাকার বিদেশী ঋণ কেন নিয়েছিলো? দ্বিতীয় প্রশ্ন- ২০২১ সালের সেই লোনের দরুন এখনও ১০ হাজার কোটি টাকার উপরে বাকি, যার দরুন বার্ষিক ১৫০০ কোটি টাকা সুদ গুনে চলেছে দেশের জনগণ- অথচ পিএম কেয়ারের কোনো হিসাব নেই।

যে ব্যাঙ্কে PM CARE এর একাউন্ট রয়েছে, সেখানকার এক ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ ব্যাক্তির তথ্য অনুযায়ী- গত আড়াই বছরে আরো প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ঢ়ুকেছে, অর্থাৎ সব মিলিয়ে ৫৫ হাজার কোটি টাকার উপরে। অপ্রকাশিত ২৫ হাাজার কোটির কথা ভুলে যান, প্রথম ৩ বছরের প্রকাশিত ৩০ হাজার কোটি টাকায় কী কী করা যেতে পারত! ত্রিশ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে বহু মেগাপ্রকল্প করা সম্ভব। জাতীয় স্তরে অবকাঠামো তৈরি, পরিবহন, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতি প্রয়োজন। এই জাতীয় প্রকল্পগুলি গুলিই তো একটা জাতিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি এনে দেয়।

এই টাকাতে ২০টি নতুন AIIMS হাসপাতাল, ২০ টা নতুন IIT বানানো সম্ভব। চারটে মেট্রো শহরে অন্তত চারটে আধুনিক AI ভিত্তিক ডিজিটাল গবেষণা কেন্দ্র বানানো সম্ভব, ১০টা IT সংক্রান্ত গবেষণা কেন্দ্র বানানো সম্ভব। নতুন ২টো ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোর বা আধুনিক রেলওয়ে এক্সপ্রেস-ওয়ে বানানো সম্ভব। চারটে অত্যাধুনিক নবায়নযোগ্য শক্তি কেন্দ্র বানানো সম্ভব। আধুনিক মানসম্পন্ন নতুন ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বানান সম্ভব, ২০০টি আধুনিক ITI তথা বৃত্তিমূলক কারিগরি প্রতিষ্ঠান বানানো সম্ভব। দেশের প্রত্যন্ত জেলাগুলিতে ১০০ টি আধুনিক মেডিকেল কলেজ বানানো সম্ভব। তামিলনাড়ুতে পরিকল্পিত দুটি গ্রিনফিল্ড বাণিজ্যিক শিপইয়ার্ড নির্মাণের আনুমানিক বাজেট ওই ৩০ হাাজার কোটি টাকা, যেখানে ৫৫,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে- এমন আরও দুটো বন্দরে বানানো সম্ভব ছিল।

কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি, হবেওনা; কারন এটা মোদীর ব্যক্তিগত তহবিল, জানিনা কোন দামোদরদাস মোদী ওনাকে গিফট করেছিল এই ৫৫ হাজার কোটি টাকা। আজও এই PM Care স্কিম চালু রয়েছে। সেখানে টাকা ঢুকছে নিয়মিত। কারা দিচ্ছে, তার বিনিময়ে কোন অনৈতিক সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে তা কেউ জানেনা। আমার প্রশ্ন, মোদিজীর হঠাৎ এই ,০০০ কোটি টাকার ব্যক্তিগত তহবিলের প্রয়োজন হলো কেন? আর এই টাকা দেশেই থাকবে, নাকি অচিরেই সুইস ব্যাঙ্কে চলে যাবে? গদি টলোমলো হলে পালানো ছাড়া মোদীর কোনো দ্বিতীয় উপায় আছে হিটলারের মত আত্মহত্যা ছাড়া!

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...