শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫

SIR- একটি মানবিক বিপর্যয়


বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সমস্যার প্রায় গোটাটাই হচ্ছে SIR এর কারনে, অন্তত রাজ্যের শাসক শিবিরের মতে সেটাই। প্রায় লক্ষাধিক BLO গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে কাজ করছেন নৈপুন্যতার সাথেই; তবে, প্রত্যেকের অতীতে শারীরিক অসুস্থতা হয়েছিলো, আগামীতেও হবে। কিন্তু এই মুহুর্তে অসুস্থ হওয়া মানেই সেটা ‘কাজের প্রেসার’। আচ্ছা, এই SIR এর সাথে যুক্ত না হলে এই ১ লক্ষ মানুষের কারো কোনো রোগজ্বালা হতোনা এই সমসাময়িক কালে? হাঁচি, কাশি, গ্যাস, অম্বল, আমাশা, মাথাব্যাথা, দাম্পত্য কলহ, পথ দুর্ঘটনা- যে কারো যখন খুশি মৃত্যুও তো হতেই পারত বা পারে! কিন্তু না, যেহেতু কালিঘাট অফিসিয়ালি SIR এর বিরোধী, তাই সব দোষ একা SIR এর।

SIR বিষয়টা ঠিক না ভুল, প্রসেসটা সঠিক নাকি বেঠিক, উদ্দেশ্য সাধু না অসাধু তা আলাদা ও বিষদ আলোচনার বিষয়, আজ আমরা সেখানে ঢুকবোনা। আজ একটু অন্য দিকটা দেখি।

একটা পোলিং বুথ মানে এলাকাটা একটা পাড়ার একটু বেশী। আজকাল একটা বুথে সর্বোচ্চ ভোটার সংখ্যা ১০০০ এর নিচে, ব্যাতিক্রমী ছাড়া, কমবেশী ২৫০টি পরিবার। ৮ ঘন্টা কর্ম দিবসের মধ্যে ৬ ঘন্টা করেও যদি ফর্ম বিলি ও জমা নেওয়ার প্রসেস চলে, সব মিলিয়ে সেটা ১৪ দিনও লাগেনা। ফর্ম ফিলাপের দায় BLO এর নয়, না সেখানে ভুল আছে কিনা তা অরিজিনাল নথির সাথে মিলিয়ে দেখার দায় রয়েছে। এরপর রইল এই ১০০০ ফর্ম অনলাইনে তুলে দেওয়া ঘরে বসে। আমাদের মত যাদের কোনও এ্যাকাডেমিক ডিগ্রি নেই কম্পিউটার বিষয়ে বা ডেটা এন্ট্রিতে, তারাও দিনে ৮০/১০০টা ফর্ম আপলোড করেই দেবো সারাদিনে- যখন এটাই আমার একমাত্র পেশাজনিত ডিউটি। এই কাজের মধ্যে সেই মহামারী ‘প্রেসার’টা কোথায়?

আমরা যারা ব্যবসা করি তারা সকাল ৭টার আশেপাশে দোকান খুলি, কেউ দুপুরে বন্ধ করি, কেউ করিনা। আবার রাত ৯টা অদধি ঝাঁপ খুলে প্রতীক্ষা করতে থাকি খরিদ্দারের। যারা গতরে খাটি, তাদেরও সামান্য অবসর বাদে বাকি কর্মদিবসের সময়টা শরীরের ঘাম রক্ত নিংড়ে নেয়। আমার নিজের বর্তমান পেশা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের, হোটেলে থাকলে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা অবধি সমানে টহল মারতে হয় যখন যে লোকেশনে থাকি। এর সাথে মার্কেটিং এর জন্য ৩টে ফোনে ৫টা সিম, একটা ট্যাব একটা ল্যাপটপে সমানে কল-মেসেজের জবাব, রেট দেওয়া, বার্গেনিং, আইটিনিনারি বানানো সবটাই একপ্রকার নিজেকে করতে হয়। যতই ম্যানেজারেরা থাকুক, রানিং টুরিষ্টদের নানান সুবিধা অসুবিধার একটা অংশ আমাকেই সামলাতে হয়।

তাতে রাত ১২টা না ভোর ৫টা বাজে সেই গণনা করার সুযোগই নেই! কাস্টমারকে রেট/আইটিনিনারি দিতে লেট করলে সে অন্যত্র পালাবে, আমার ভাগে ফক্কা। ভোটের ট্রেনে নেমে ড্রাইভারকে খুঁজে না পেলে ফোনটা আমাকেই রিসিভ করতে হয়। এরপর যেদিন যে কর্মচারী আসেনি, নিজেকে সেই পদে বহাল হতে হয়। ধোপা, কুক, হাউজ কিপিং, সুইপার, রিসেপসনিষ্ট, ক্যাশিয়ার, বাজার সরকার, দারোয়ান সব পদে স্বনিয়োজিত হতে হয়, কারন আমি জানি আমি গাফিলতি করলে লোকসান একমাত্র আমার। লোকের অভাবে পরিষেবায় ঘাটতি হলে টুরিস্ট সেটা বুঝবেনা, গুগুলে নেগেটিভ রিভিউ খেলে আমারই ব্যবসা ঝাড় খাবে। এরপর ব্যাঙ্ক, GST সহ অন্যান্য সরকারী অফিসিয়াল কাজ রয়েছে, সব কাজ এক সমান্তরালে চলতে থাকে, এবং বিষয়টাকে দারুন এঞ্জয়ও করি। অভিযোগ কিছু থাকলেও শুনছেটা কে?

আমি আমার তথ্যটা দিলাম, প্রতিটা বেসরকারি চাকুরে, ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসাদার, শ্রমিক, কৃষকের একই হাল। প্রত্যেককে একই সাথে একাধিক ঝক্কি এক সমান্তরালে পোয়াতে হয়, এটাই জীবন, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ জানতে বাধ্য হতে হয়। যেহেতু আমাদের মাসিক মাইনের সুরক্ষা নেই, PF নেই, DA নেই, গ্রাচুইটি নেই, পেনশান নেই- তাই আমাদের কখনই প্রচণ্ড ‘প্রেসার’ সেভাবে অনুভূত হয়না জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে। আসলে BLO লেভেলের কর্মীদের ‘আসল’ কাজের দায়িত্ব কতটুকু থাকে? হয় তাঁরা প্রাথমিক শিক্ষক/শিক্ষিকা বা গ্রুপ ডি কর্মী। তাদের কাজকে সম্মান জানিয়েই বলছি, তাদের চেয়ে একজন প্রাইভেট টিউটরকে অনেক বেশী শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হয়, অনেক বেশী দায়িত্ব আর অনেক বেশী জবাবদিহিতা করতে হয়, আর এটা রোজকার বিষয়। অনেক বেশী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত হয় যেকোনো বেসরকারী কর্মী বা ব্যবসায়ীদের। তাই SIR এর ১ মাসের প্রেসারে যে কর্মীরা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন, তাদের সরকারী চাকরি থেকেও অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা হোক। শরীরের সমস্ত ব্যাথা বেদনা পর মুহুর্তে গায়েব হয়ে গিয়ে আরবি ঘোড়ার মত মাঝরাত্রেও দেখবেন দৌড়াবে। এনারা বাস্তবিকিই আনফিট অকর্মন্য। ভাবুন একজন যেকোনো পদের আমলা, একজন পুলিশকর্মী, একজন ডাক্তার তাহলে কী পরিমান প্রেশার নেন রোজ!

কখনও ভেবে দেখেছেন যারা দিনমজুর, যারা পরিযায়ী তাদের কথা? যারা বৈধ হয়েও SIR এর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তাদের কথা? যারা তথাকথিত ‘অবৈধ’- এদের না আছে কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, না আছে কোন সেভিংস, না আছে কোন পিছুটান। মরলে কোথায় কি নামে পোড়ানো হবে, নাকি কবর দেওয়া হবে কেউ কিছু জানে না। এবেলা কামিয়ে না আনলে ওবেলা কি খাবে তার কোন হিসাব নেই। সেখানে পরের দিন কি খাবে সেই ভাবনা তো বাহুল্যতা। তবুও স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে আগলে রাখে, তাদের সন্তানকে আগলে রাখে। যাদের বাবা-মা আছে, তাদেরকেও নিজেদের পাশে পাশে রাখে।

গরীব যে সকল মানুষ সামনের মাসে ‘অবৈধ নাগরিক’ হয়ে যাবে, সেই লোকটা কোথায় জন্মেছিল তার কোন ঠিক ঠিকানা রইবেনা। কোথায় কার সাথে কি ভাবে বিয়ে হইয়েছি তার কোন লেখাজোখা নেই, আদৌ কে তার নাম রেখেছিল, কি কারণে নাম রেখেছিল, কি ধর্ম, কি করেই বা তার ধর্ম ঠিক হয়েছিল তার কোন হদিশ পাওয়া যাবে না। কার সন্তান কার গর্ভে কবে জন্মগ্রহণ করছে, কি তাদের বয়স, কোথায় শিক্ষা হবে, কিভাবে শিক্ষা হবে, কি তাদের মাতৃভাষা হবে, কি তাদের শিক্ষার মাধ্যম হবে- কারোর কাছে কোন কিছুর হদিস থাকবে কী? পুঁজিবাদের কাছে শুধু এদের একটাই পরিচয়- কম পয়সায় লেবার। এদের কতজনের স্ট্রোক হয়েছে? কতজনের ‘প্রচন্ড প্রেসার’ নিয়ে মিডিয়া সরগরম হয়েছে? কেউ কি তার খবর রেখেছে?

কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে যখন নাৎসিরা ইহুদিদের ধরে এনেছিল তখনও তাদের একটা নাম ছিল, সংখ্যা ছিল, একটা অস্তিত্ব ছিল, আজকে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন বর্ডারের ধারে ভিড় জমিয়েছে তাদের অধিকাংশের সেটুকুও নেই। আপনি হয়ত মিডিয়ার পড়ানো চসমাতে দেখে ওদের মুসলমান বা হিন্দু হিসাবে দেখছেন, আসলে তো তারা আমার আপনার মত রক্তমাংসের মত মানুষ। অথচ কী নির্লিপ্ত। একজন অবলীলায় বলে চলেছে- আমাকে আবার মায়ানমারের ওই রিফিউজি ক্যাম্পে ফেরত যেতে হবে। সাথের মহিলাটা অনেক বেশি সজাগ, সে বলছে- ওখানে যাওয়া যাবে কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা ঘোষিত যাযাবর জাতি তাদেরও একটা চলার ছন্দ ছিলো বা আছে, এদের ক্ষেত্রে সেটুকু খুঁজে পাওয়া গেল না, এটাই চরম আফসোস।

আগামীতে SIR কেন্দ্রিক শয়ে শয়ে মহাকাব্য লিখবেন সাহিত্যিকেরা, কিন্তু আমরা চোখের সামনে যেগুলো দেখছি দু-একটা, যদি সেখান থেকে কিছু তুলে রাখা যেত আগামী প্রজন্মের জন্য, তাহলে তারা সিনেমা উপন্যাস কিংবা অন্য কোন মাধ্যমের কাছে আদান-প্রদানের জন্য গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে পারত। এই ‘নেই’ মানুষদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা স্বাভাবিক, শুধু সেই কামনার বসেই হয়তো অনেক মানুষের জন্ম হয়ে গেছে- সেই দোষের দোষী এই নব প্রজন্মটা, সে জানেইনা কোন দোষে তার কোনো দেশ নেই। পাল ছিঁড়ে যাওয়া নৌকাটা কোনদিকে যাবে সে জানেনা, কিন্তু এটুকু অন্তত জানে যে আমি নদীর বাইরে যাব না। এর ক্ষেত্রে সেইটুকু নিশ্চয়তাও নেই।

আমাদের মত স্থায়ী বাসিন্দা হবার সৌভাগ্য যাদের জুটেছে, তাদের সবচেয়ে গরিব যে মানুষটা দিন আনে দিন খায়- তারও কিন্তু একটা নিজের ঠিকানা রয়েছে। খেয়াল করে দেখবেন, আপনার হয়ত শরীর চলছে না, হয়তো ব্যবসা বা পেশা আপনাকে সেভাবে সহায়তা করছে না, কিন্তু আপনি জানেন যে আমার একফালি জমি আছে গাঁয়ে, যেখান থেকে ফসল ফলিয়ে অন্তত বেঁচে যাব, কিম্বা দিনমজুরি করে খাবো। দুর্ঘটনাতে বা অপঘাতে মৃত্যু হলেও শব যাত্রায় অন্তত চারটে লোক যাবেই, যদিনা দূর বিদেশ বিভূঁইতে বেওয়ারিস হয়ে মারা যায়। এখানে যারা ‘অবৈধ’, তার জাত যা খুশি হোক, সেই লোকটা মরলে তার হয়ে কাঁদার মত কেউ থাকছে না। একটা দল এগিয়ে চলেছে অজানার দিকে, এতদিনের চেনা পরিচিত পরিবেশ, পাশের লোককে ফেলে দিয়ে। তার জন্য অনুশোচনা করার সময়টুকু অবধি কারো নেই। ছিন্নমূল শব্দটা শুনেছিলাম, এভাবে চোখে দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলামনা মোটেও।

কটাদিন ধরে আমি কিছুই লিখতে পারছি না, মানে কিরকম একটা করছে শরীরের ভেতরটা। পলায়নরত মানুষের ইন্টারভিউ গুলো দেখছি আর শুনছি, ভাবলেশহীন শূন্য চোখ গুলো দেখে বুকের ভেতরটা কি রকম কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই পরিবেশ পরিস্থিতিতে কে তৃণমূল কে বিজেপি কে সিপিএম, এই সব ছাপিয়ে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা বড় হয়ে উঠেছে। ৩০ বছর পর যারা আজকের দিনকে পিছন ফিরে দেখবে, তারা আজকের এই অসহায় পরিস্থিতি নিয়ে, মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করবে। তৃণমূল বা বিজেপি কেউ কোথাও থাকবেনা সেদিন। তৃণমূল নামটারই অস্তিত্বই হয়ত মুছে যাবে। সেদিন আলোচনার বিষয়বস্তু থাকবে শুধু কম পয়সার লেবার, অর্থনীতি, মানবিক বিপর্যয় এবং মানুষের অসহায়ত্ব।


হিন্দু, মুসলমান, বিজেপি, তৃনমূলের বাইরে গিয়ে আপনি কীভাবে দেখছেন গোটা প্রক্রিয়াটাকে?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...