শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৫

ভাইপো ইন, পিসি আউট


 খুব ভুল না হলে মমতা ব্যানার্জী তার শেষ নির্বাচন লড়ে ফেলেছেন।

একটা ট্রেন্ড খেয়াল করছেন কি, SIR ও এই সংক্রান্ত যাবতীয় খবরের শিরোনামে তৃনমূল দলের হয়ে কিন্তু মমতা ব্যানার্জী সেই অর্থে আর নেই, গায়েব হয়ে গেছে। উনি কেবল পুজো উদ্বোধন করছেন। আনন্দবাজার, এই সময়, সংবাদ প্রতিদিন, আজকাল, বর্তমান সর্বত্র শুধুই ভাইপো ব্যানার্জি। হাগো বাংলা বা খবর ৩৬৫ কে হিসাবে ধরলামনা, এগুলো বাড়ির ছোট বাচ্চাকে কাগজে বসিয়ে হাগাবার কাজেই লাগে, তোলামুলের সরকার থেকে এরা রসদ পায় বলে টিকে আছে, নাহলে এদের গণেশ কবেই উলটে যেতো। কোলকাতার টিভি চ্যানেলগুলো, ইংরেজি প্রিন্ট মিডিয়া, ইউটিউব চ্যানেল, তথাকথিত স্বাধীন মিডিয়া, সোস্যাল মিডিয়ার ফেসবুক, টুইটার, রেডিও- এমন প্রতিটি গণমাধ্যমে শুধুই ভাইপো ব্যানার্জি। 

নিত্যদিন ভাট বকা কাঁথির মেজো খোকা অস্তিত্বের সংকটে, আরেক বাতেলা বাজ দিলীপ ঘোষের গণেশ উল্টেছে। দেবাংশু নিজের দলেই খোরাক, কুনালের খিস্তি হজম করা ছাড়া কাজ নেই, বর্তমান পদ্মপাল বাজারে হিট হয়নি। টিকে থাকা সুকান্ত, শমীক কিংবা শিয়ালদার ওয়েটিং রুম থেকে মুক্তি পাওয়া জগন্নাথ অথবা দিশেহারা অসীম বা সুব্রত বা উন্মোচিত হয়ে যাওয়া পলাশ কিম্বা দীপ্সিতা সবাইকে ছাপিয়ে গিয়ে, SIR রঙ্গমঞ্চে মিডিয়া বৃত্তে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা গত চার দশক ধরে, রাজ্যের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব মমতা ব্যানার্জিকে কয়েক ক্রোশ পেছনে ঠুসে দিয়ে, ব্যানার্জি মিডিয়ার চটিচাটা আলোকে উদ্ভাসিত ভাইপোর নতুন অভিষেক।


ভাইপো ইন, পিসি আউট। 


চুম্বকে এটাই বঙ্গীয় রাজনীতির তোলামুলি দর্পন। আপনি বলতেই পারেন, ইন আর আউটের খেলা তো তোলামুলের আভ্যন্তরীন বিষয়। আজ্ঞে না, যেহেতু এই দলটাই আজ অবধি ক্ষমতায় ও আগামী বিধানসভা নির্বাচনের ফল বের হওয়া অবধি এরাই থাকবে, তাই ততদিন এটা- আমার আপনার সহ প্রতিটা বাংলাবাসীর জন্য গুরুত্ব দিয়ে ভাবার মত আখ্যান। আপনি মিডিয়ার বাইনারি দেখুন, BLO কে ম্যান মার্কিং করুন গল্প ফাঁদা থেকে পানিহাটিতে আত্মহত্যা করা বৃদ্ধের বাড়ি যাওয়া- সবেতেই ভাইপো ব্যানার্জি। তৃনমূল দলের নতুন যে রাজ্যকমিটি তৈরি হয়েছে তাতেও চিত্র খুব পরিষ্কার, কয়েকজন চটিপন্থী সেখানে রয়ে গেলেও, ফাইনাল রেসে তারা ছিটকে যাবেই। 


কিছুদিন আগেই দীপাবলির সময় বাংলার প্রায় সকল ‘চাঁটা’ মিডিয়াকে ডেকেছিলো ভাইপো, ধমকাতে চমকাতে নাকি ডোল উৎকোচ দিতে সেটা তারাই বদলতে পারবে, যারা উপস্থিত ছিলো। কিন্তু সেখানে কী হয়েছে না জানলেও একটা বিষয় পরিষ্কার, চাঁটার দলকে ‘চোষা’তে মাইগ্রেট করার পাঠ পড়ানো হয়েছিলো। বরুণ সেনগুপ্ত, সুমন চট্টোপাধ্যায়, হলধর পটল বা রন্তিদেব অথবা হাল আমলের পল্টুরাম অশোক দাশগুপ্ত কিংবা ২৪ ঘন্টা অথবা কেস খেয়ে ফেরত আসা ঘন্টাখানেক, 'যা গেছে তা গেছে' এর দৈববানীর টাকায় তৈরি অগুন্তি বাংলা চ্যানেল কিংবা তাদের ডালপালা চ্যানেলগুলো দীর্ঘ তিন দশকের 'রোদ জল বর্ষা মমতায় ভরসা', বন্দনা ভুলে, নাঙ এর নতুন বাবু ধরার প্রজেক্ট লঞ্চ করে, তখন ব্যাপারটা সিরিয়াসলি চিন্তাভাবনা করতেই হয়। স্বভাবতই, মিডিয়ার সৌজন্যে পাব্লিককে আপাতত উদয়াস্ত ভাইপোকেই হজম করতে হবে নতুন সরকার আসা অবধি। 

আসলে প্রত্যেকটা শুরুর একটা শুরু থাকে, একটু পিছন ফিরে দেখি। আপনি যদি সিঙ্গুর গিয়ে থাকেন, তাহলে সেখানে যে দিকটায় টাটা জমি অধিগ্রহণ করেছিল, ঠিক তার উল্টোদিকে একটা বড় ফ্যাক্টরি আছে যেটার নাম হিমাদ্রি কেমিক্যাল। বর্তমানে হিমাদ্রি কেমিক্যালসের কমান্ডিং ডিরেক্টর (CMD) অনুরাগ চৌধুরী। 'এই সময়' নামের পত্রিকার মালিকানা এখন সঞ্জয় বসু এবং অনুরাগ চৌধুরীর মালিকানাধীন 'টাইডিংস মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেডের’, পূর্বের মালিক: বেনেট কোলম্যান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড (টাইমস গ্রুপ)। সঞ্জয় বসু কে, তার টাকার উৎস কী?  সঞ্জয় বসু ভাইপোর আইনজীবী, আর পরিচয় দরকার আছে কি? সবার অলক্ষে ২৪ ঘন্টা কিংবা আজকাল অথবা এনডিটিভি অস্তিত্ব বিপন্ন হবার পরিস্থিতি তৈরি হতেই বশ্যতা স্বীকার করেছিল।

২০১১ তে তোলামুল সরকার আসার পর, শুরু থেকেই পুলিশ-প্রশাসন দপ্তরটা মূলত মুকুল রায় দেখতো, মমতার বিশ্বস্ত হনুমান হয়ে। এরপর ঢালাও চুরিচামারিতে মন দিয়ে মুকুলের বিপুল হারামের অর্থ কামায় হয়, সেই বেহিসেবি বিপুল টাকা ও প্রফেশনাল মাতাল ছেলে হাঁপনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে ‘আনন্দ বাজারের চাণক্য’ মুকুলের বিজেপির জামা পড়ে নেওয়া। আরো পরে মুকুল পাগলের অভিনয়ে ঢুকে যায়। ফলত, রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন চালকের আসন খালি হয়ে যায় ২০১৭ এর নভেম্বররের শুরুতে। এর পর কিছুদিন মমতা নিজেই সামলায় দপ্তরটা। মজা হলো এই সময় কাঁথির মেজো খোকা এই দপ্তর চেয়ে বসে ও অশান্তির মুষল পর্ব শুরু হয়। ততদিনে পিসির স্নেহ ও ছত্রছায়ায় সোনা পাচার, বালি, কয়লা, গরু, কাটমানি, চাকরি ইত্যাদি, এমন নানান ধরণের চুরি শিল্পকলাতে উস্তাদ হয়ে উঠেছে দুই খোকাই। দুজনেই তোলামুলী চৌর্য সাম্রাজ্যের পরবর্তী রাজাধিরাজ হওয়ার দৌড়ে সামিল। ক্ষমতার অলিন্দে বড় হওয়া ভাইপো ততদিনে বুঝে গেছে ক্ষমতার উৎস বন্দুকের নলে, অতএব সে কেন ছাড়বে পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতা, তারই তো উত্তরাধিকার! ব্যাস আর কি, মেজো খোকা বেঁকে বসে, অবশেষে খাকি হাফ প্যান্টুলুনটা প্রকাশ্যে পরে নিয়ে ২০২০ এর ডিসেম্বরে গোয়ালঘরে আশ্রয় নিয়ে নেয়। 

বর্তমানে বাংলা জুড়ে বিভিন্ন স্থানে একটা বিষয় ঘটছে, অনেক পঞ্চায়েত/পুরসভার সদস্য নিজে থেকেই পদত্যাগ করছে। সম্প্রতি হাওড়া পুরসভাতেও ২ জন প্রশাসক বিনা কারনে পদত্যাগ করেছে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সম্প্রতি গুজরাতে সমস্ত মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলো, এরপর নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয় কোনো ধরণের ট্যাঁ ফুঁ ছাড়াই। এটা কোনো ‘গুজরাত মডেল’ নয়, এটা বিশুদ্ধ RSS মডেল।

২০২১ বিধানসভা ভোট পরবর্তী গোটা বাংলা জুড়ে তোলামুলের যত এজেন্ট রয়েছে বিভিন্ন সরকারী ও রাজনৈতিক পদে, তারা পাঁচ বছর ধরে যে যেমন ভাবে পেরেছে চুরি, রাহাজানি, বাটপারি, চিটফান্ড ও কাটমানি তুলেছে ভাইপো পরিচালিত প্রশাসনের নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপে। এখন নতুন ভোট আগত প্রায়, হালখাতা করতে হবে, অতএব আগে বয়েকা ভাগা পরিশোধ করে শান্তিনিকেতনে পাঠাও। দীর্ঘদিন পঞ্চায়েতে টাকার খরা চলছে, তৃনমূল স্তরে টাকার উৎস শুকিয়ে গেছে। পঞ্চায়েতে পঞ্চায়েতে বিপুল সরকারী দেনা স্থানীয় ঠিকেদারদের কাছে, ইমারতি দ্রব্যের ব্যবসায়ীরা আর কেউ ধারে মাল দিচ্ছে না পঞ্চায়েত পুরসভার কাজে। ‘উন্নয়ন’ এর কাজ বন্ধ হয়ে আছে, অথচ শিয়রে ভোট- টাকা আসবে কোত্থেকে! যে টাকা দিয়ে ভোটের বাজারে মাতাল, চোর ও গুন্ডা বাহিনীকে ফুল ফোর্সে কাজে লাগাবে, মোচ্ছব হবে। অতএব, শুধু বকেয়া পরিশোধ করলেই হবেনা- এডভান্সও দাও, কোথায় পাবে জানিনা। অগত্যা পদত্যাগ।

এটাই হচ্ছে ভাইপো পন্থী তোলামুল দলের নতুন সংবিধান। চটিপন্থী পুরাতন তোলামুলকে টিকে থাকতে গেলে, পরে চুরিচামারি করে তার বখরা দিলে হবেনা, শুরুতে ‘ডেভলপমেন্ট ফিজ’ জমা দিলে, তবেই ভাইপোর লিষ্টে আসা যাবে; তবে পঞ্চায়েত প্রধান, পুরসভার মেয়র, সভাধিপতি, বিধায়ক, সাংসদ বা ওই জাতীয় ‘কামাই ওয়ালা’ পদের যোগ্য হিসাবে প্রাথমিক ভাবে সিলেক্ট হবে, নতুবা সরাসরি আউট। 

আপনারা মিলিয়ে নেবেন, বর্তমানে তোলামুলের ২২২ জন ল্যাম্পপোষ্ট বিধায়কদের অধিকাংশই চটিপন্থী, যাদের ৮৫% আর কেউ টিকিটই পাবেনা ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে। আমাদের পূর্ব বর্ধমান জেলার এতদিন যারা নেতা ছিলো, যেমন আদি তোলামুল স্বপন দেবনাথ কিম্বা নব্য তোলামুল কাটোয়ার রবি চ্যাটার্জি- এনারা সকলেই চটিপন্থী। ভাইপোর কোনো দায় নেই এদেরকে জিইয়ে রাখার, একই ভাবে নবদ্বীপের নন্দ সাহা বা বীরভূমের আশিষ চ্যাটার্জি, হুগলীর তপন দাসগুপ্তের মত সমস্ত ঝানু তোলাবাজকে বাণপ্রস্থে পাঠিয়ে দেওয়ার নীল নক্সা আঁকা হয়ে গেছে। নতুন তাজা চোর ছ্যাঁচোর, গুণ্ডা, মস্তান নিয়ে এসে জনগণকে বোকাচন্দ্র বানাবার একটা প্রয়াস করবে। পাতি বাংলা কথা, যে রাস্তায় নেমে ক্যালাক্যেলি করে, বুথ দখল করে, পেটো মেরে, ধমকিয়ে, চমকিয়ে, বিরোধীদের রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে পারবে, সে টিকিট পাওয়ার যোগ্য। এর পাশাপাশি রাজ্য জুড়ে ১২০ টার আশেপাশে বিধানসভা আসনে মুসলমান নাম ধারীদের টিকিট দেবে ভাইপো ব্রিগেড, কারন SIR এর পর ‘পোলিং ভোটের’ গণিত আমরা গণনা করতে পারলে, পিকের টিক তো আর ফিডারে দুদু খায়না।

অনেকেই বলবেন, মমতা ব্যানার্জী ছাড়া তৃনমূল দলের ইকোসিস্টেমটা ভেঙে পরবে। তৃনমূল দল আদি বা নব্য দিয়ে চলেনা, চলে চোর চামার ও করে খাও বাহিনী দিয়ে, এদের নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় থানার OC/IC ও BDO/SDO রা। দলের আসল নেতা এই পুলিশ আর প্রশাসনের অংশটা। মন্তেশ্বরের সৈকত পাঁজা যেদিন শোয়া এক লাখ ভোটে জিতেছিলো, সেদিন মমতার ইকোসেস্টেম অলিখিত বিসর্জন হয়ে গিয়েছিলো। মমতা ইকোসিস্টেম মিথ, ওটাকেই ‘রামচন্দ্রের’ জুতোর মত সাজিয়ে রাখবে ভাইপো। মমতাকে রাজনৈতিক ভাবে বাঁচিয়ে রাখার কোনো কারন নেই অভিষেকের। নতুবা এর পর আর সে সুযোগই পাবেনা কোনো অর্থে। ইতিমধ্যের ১৫ বছরে চুরিচামারির এ্যান্টি ইঙ্কাম্বেন্সি চুড়ান্ত পর্যায়ে, ২০২৬ টার্মেও তৃনমূল জিতলে- মমতাই যদি মুখ্যমন্ত্রীতে ফেরে, অভিষেকের কেরিয়ার শুরুর আগেই ফিনিশ। বাকি জীবনটা জেলে থাকুক বা বেলে, প্রাক্তন MP পদবী টুকুই থাকবে। তাই সে কোনো সুযোগ দেবেনা আর।

অতএব, বঙ্গ রাজনীতিতে পিসি পন্থী হাটিয়ে, কয়লা ভাইপো ইন। ভাইপোর PR টিম এখন সর্বক্ষণ কাঁসি নাগাড়া খোল-করতাল সহ অষ্টপ্রহর ভাইপো সংকীর্তন শোনাতে থাকবে আপনাকে। অপসৃয়মান চটিপিসি দিনে দিনে আরো বিবর্ণ মলিন ম্লান হতে হতে ক্রমশ শেষ বয়সের সুচিত্রা সেনের মত গায়েব হয়ে যাবে মিডিয়া থেকে। আদবানির মত একটা মার্গদর্শক মণ্ডলীর পদও পেতে পারে, হাত জোর করে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। হয়ত বাকি জীবনটা শিল্পকর্মে নিজেকে সঁপে দেবেন ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকাতে, কিম্বা সাহিত্য ক্ষেত্রে হাম্বা হাম্বা আব্বার পরবর্তী শিকুয়্যেল রচনাতে ব্রতী হবেন। কয়লা চোরের নতুন সাম্রাজ্যের খুঁটি পুজোর পর, তাদের পালাগানের সুরও বাঁধা হয়ে গেছে। এরপর যতদিন গড়াবে, তোলামুলের সমগ্র যাত্রাপালা ভাইপো কেন্দ্রিক বিকশিত হতে থাকবে। আপনি কী করবেন? সিদ্ধান্ত নেবেন, নতুন চোর গুলোকে আবার নির্বাচিত করবেন, নাকি বাংলাকে সাম্প্রদায়িক RSS ও চোরমুক্ত করে অতীতের পাপ খন্ডাবেন!  


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...