তৃতীয় পর্ব
সিপিএমের কী করা উচিত আর কী নয়। রইল ব্যাক্তিগত মতামত।
বেলা দুপুর গড়িয়ে ঘড়িতে ২টো অতিক্রান্ত, রাজ্যের ভোটের ফলাফল পরিষ্কার। রাজ্যের প্রতিটি কেন্দ্রে বামপ্রার্থীরা সহ জোট কার্যত কোথাও লড়াইয়ে নেই। খুব কষ্ট করে একটা আধটা দ্বিতীয় স্থান পেলেও বাকিগুলোতে জামানত বাঁচানো সম্ভব কিনা সেটাই প্রশ্ন। কোথাও কোথাও ভোট শতাংশ সামান্য বৃদ্ধি হলেও সেটাও প্রাপ্তি নয়, এই মুহূর্তে ২০১৯ লোকসভার চেয়েও ২% ভোট কম পেয়েছে। আমার অনুমান- এটা মূলত মোদী বিরোধী ভোট, লকডাউনে নাজেহাল মানুষের ভোট, পাশাপাশি NRC এর ভয়ে ভীত সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় সবটাই তৃণমূলের ঝুলিতে গেছে। মিডিয়াতে একতরফাভাবে বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা প্রোপাগান্ডা প্রচার, আর তৃণমূলের ‘দানের রাজনীতি’- এই পর্যায়ে সফল, দুটোরই লাভ তৃণমূল পেয়েছে।
যে সকল তথাকথিত বামপন্থী গর্বের সাথে বলেন- আমরা ভোটের জন্য রাজনীতি করি না, আমরা রাস্তায় থাকি- তাদের মনোস্কামনা পূর্ণ হয়েছে। যারা ভোটের রাজনীতি করে তারাই ভোট পেয়েছে, মানুষ তাদেরই বিকল্প বেছে নিয়েছে। রাস্তায় থাকা আপনার গর্ব, আপনাকে সেখানেই স্থান দিয়েছে- উল্টে আপনার হাতে জুটেছে একটা ফুটো বাটি। এইবার ন্যূনতম লাজলজ্জা থাকলে ওই হেজে যাওয়া আঁতলামো-মাতলামো ভক্তমার্কা ডায়লোগ কপচাবেন।
একজন পার্টি কর্মী হিসাবে- এই পর্যায়ে কিছু পরিষ্কার কথাবার্তা বলি, যা মনে এল। কেউ আবার বলবেন না যেন- ভিতরে আলোচনা করতে হয়, প্রকাশ্যে নয়। গোটা সিস্টেমটাই যেখানে ন্যাংটা হয়ে গেছে যেখানে, সেখানে কীসের ভিতর আর কীসের বাইরে! তাই আপনাদের জন্য জন্য ছোট্ট টিপস- আপনারা বিশাল মাতব্বর, চেকা গিরি ঘরে বসে দেখান, নতুবা গণধোলাই এর শিকার হবেন।
১) কোনোভাবেই কোনো অজুহাত সৃষ্টি করা যাবে না। নীতিগতভাবে এই নির্বাচনে রাজ্যের সাধারণ মানুষ বিপুলভাবে বামপন্থীদের প্রত্যাখ্যান করেছেন৷ কোনো বাম প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করে নিজেদের খিল্লি করা যুক্তিহীন। তারা নিজেদের মতো চেষ্টা করেছে, বাকিটা জনতা জনার্দন।
২) মানুষের রায় সার্বিকভাবে মেনে নিতে হবে। রাজ্যের মানুষ সঠিক অর্থে বামপন্থীদের বিরোধী দলের মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। মানুষ বামপন্থীদের ন্যূনতম যোগ্য বলে মনে করেনি। বামেদের বিকল্প বার্তা এই পর্যায়ে কোনো কাজে আসেনি, সেটা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। ফেব্রুয়ারীর ব্রিগেডে আসা মানুষ ও তাদের পরিবার গুলোও সকলে ভোট দেননি।
৩) ‘আমরা মানুষকে বোঝাতে পারিনি’ এসব ছেঁদো গল্প নয়, আসলে আমাদের মধ্যে মানুষকে বুঝতে পারার শক্তি আদৌ অবশিষ্ট আছে কি- এটা নিয়ে ভাবনা দরকার, আমার ব্যক্তিগত হিসাবে এটা নেই। তাই আদ্যিকালের ভাবনা ছেড়ে আরও সংস্কার আসুক দলে।
নিজেরা শ্রমিকের ৭০০ টাকা নুন্যতম দৈনিক মজুরীর জন্য আন্দোলন করব, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা ভাষনে শোনাবো- "মাসে নুন্যতম ২১ হাজার টাকা আয় না থাকলে একটা সংসার চলেনা"। আর পার্টির সর্বক্ষণের কর্মীদের ৪-৫ হাজার টাকা দেবো। জানি এটা বেতন নয়, এটা ভাতা; কিন্তু একজন হোলটাইমার তো অন্য কোনো পেশার সাথে যুক্ত নন, তাহলে তার সংসার কীভাবে চলবে? হোলটাইমার বলে তার পরিবার থাকবেনা বা তার খিদে অন্যের তুলনায় কম লাগবে এমন তো নয়। ভাতা হোক বা যা খুশি, হোলটাইমার রাখতে হলে তাকে নুন্যতম সাম্মানিক দিন, যাতে তার প্রয়োজন মেটে। ভাঁড়ারে চালের পরিমান বুঝে নিমন্ত্রণ করুন, ৩৪১ ব্লকে ১টা করে হোলটাইমার থাক প্রয়োজনে, কিন্ত তারা যেন সাম্মানজনক একটা ভাতা পাক। দরকারে গ্রেড সিস্টেম হোক। নতুবা এ পদ তুলে দিন। বিকল্পের কথা মুখে বলব আর নিজেদের দলের পার্টিজানদের জন্য সেই আদ্যিকালের রদ্দি মার্কা নীতি- এটা স্পষ্ট দ্বিচারিতা। এগুলো ত্যাগ করতে হবে।
৪) ২০১১ নির্বাচনের পর থেকে দলের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সিনিয়র নেতাদের মানুষ ন্যূনতম বিশ্বাস করছে না, এটা আবারও প্রমাণিত, তাদের মুখ দেখলেই জনগণ তেড়ে বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সেই নেতারা সহ তাদের আশেপাশে থাকা সকলে একযোগে সরে না গেলে এটাই স্বাভাবিক পরিণতি হতে থাকবে। প্রার্থী তরুণ দিয়ে লাভ হয়নি, কারণ ভাবনাতে তারুণ্য নেই। পার্টির ভিতরে সংস্কার আনতে হলে ওই প্রত্যাখিত নেতাদের সামনে রেখে করা অসম্ভব। আপনারা যথেষ্ট মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন, এবারে ছাত্রযুবদের স্ট্রোক দিতে দিন। এটা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির বিষয় নয়, সংসদীয় গণতান্ত্রিক পশ্চিমবঙ্গে বামেদের নিজেদের আগামীর অস্তিত্বের প্রশ্ন।
৫) এখন আর কোনো অজুহাত নয়, না পরবর্তী সম্মেলনের অপেক্ষা। ন্যূনতম চক্ষুলজ্জা থাকলে- যত দ্রুত সম্ভব রাজ্যের সমস্ত জেলা সম্পাদক, জেলা কমিটি এবং রাজ্য কমিটির সদস্যরা পদত্যাগ করুন। অধিকাংশ জেলা কমিটি, এরিয়া কমিটি কার্যত ঘুঘুর বাসা, অধিকাংশ জনই কাজকর্ম করে না মাটিতে, কবে ঘি দিয়ে ভাত খেয়ে বিপ্লব করে ছিল- সেইটার গল্প বলে ‘কোটায়’ রয়ে গেছে। সারাক্ষণ লবিবাজি করে, পদ বাঁচিয়ে রাখতে। কেউ কেউ তো সরকার পোষিত বামপন্থী।
সংগঠনকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে দিন তরুণ প্রজন্মকে, তারা এর চেয়ে বেশি কীই বা খারাপ করবে যেখানে আপনারা ছেড়ে গেলেন (যদি ছেড়ে যান তবেই)? তার সাথে অবশ্যই বিভিন্ন গণ সংগঠনগুলির মুখগুলিও পদত্যাগ করুন। এখানে বাস্তুঘুঘুদের বাস অধিকাংশ ক্ষেত্রে। চেকা গুলোকে চিহ্নিত করে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হোক।
৬) পার্টির কিছু নেতাদের ছেলে, মেয়ে, আত্মীয়, চামচা এমন বহু প্যারাসাইট অযোগ্য সদস্য থিকথিক করছে দলে- যারা এই নির্বাচনে প্রচার সামলানো সহ নানান গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে- যথারীতি দায়িত্ব নিয়ে ডুবিয়েছে দলকে। তারাও ব্যর্থতার দায় নিয়ে, সম্মান বজায় থাকতে থাকতে নিজেরাই পদত্যাগ করুন নতুবা পার্টিকর্মীরা ঘাড় ধরে আপনাদের নামিয়ে দেবে এবং সেটা ভীষণ অসম্মানজনকভাবে। লেভির টাকায় এসব অপুষ্যি পোষা বন্ধ করতে হবে।
৭) রেড ভলেন্টিয়ার্স নামের হুজুগে আঁতলামো বন্ধ করুন। মানুষ সরকার বেছে নিয়েছে, পরিষেবা দেওয়া সরকারের কাজ। আমাদের কাজ আমাদের পার্টি কর্মী কমরেডদের বিপদে-আপদে পাশে থাকা আর সংগঠন বাড়ানো, সরকারের ব্যর্থতার জায়গাতে গিয়ে NGO বা প্যারালাল সরকার চালানো নয়। এটা রাজনৈতিক দল, কোনো সেবাশ্রম বা ক্লাব নয়। সোস্যাল মিডিয়াতে বহু স্থানে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছে- একশ্রেনীর ছদ্মবেশী বামপন্থী ভেক ধরে থাকা দুর্বৃত্তরা, পার্টি শীর্ষ নেতৃত্বের বিশ্বাস ও সরলতার সুযোগ নিয়ে এই গোটা পরিকল্পনাটা PK এর কাছে টাকা খেয়ে তৃণমূলের অপদার্থতা ঢাকার জন্য করেনি তো? এটা অন্তর্ঘাত নয় তো? ভোটের ফলে পরিষ্কার, আমরা মানুষের পাশে থাকতে গেলেও-
মানুষ আমাদের পাশে রাখার যোগ্য মনে করেনি। অনেকে ব্রিটিশ জামানার বিপ্লব কিম্বা তেভাগার সাথে তুলনা করছেন, তারা ইতিহাস জানে না- ব্রিটিশ জামানাতে সংসদীয় গণতন্ত্র তথা ভোটের রাজনীতি ছিল না, ছিল বাঁচার লড়াই। তেভাগা ছিল নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াই! ভলেন্টিয়ার্সের নামে এই শ্রম ফেরি করা কোন অধিকারের লড়াই?
৮) পার্টির ছাত্র যুবদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে, এই মহামারীকালে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া তাদের রাস্তায় নামিয়ে, কোভিডে আক্রান্তদের বাড়ি বা সংস্পর্শে পাঠিয়ে দিয়েছে। যেখানে পলিটব্যুরো সদস্য মহঃ সেলিম বিবৃতি দিয়ে মিটিং-মিছিল করব না বলে ঘোষণা দিলেন, যখন আংশিক লকডাউন চলছে, ইস্কুল-কলেজ, হাটবাজার সব বন্ধ, আক্রান্তের সংখ্যা রোজ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে, এলোপাথাড়ি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, সেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ- ছাত্রযুবরা শুধুমাত্র একটা কাপড়ের মাস্কের ভরসা করে রাস্তায় ছুটে চলেছে। কাল এদের কিছু হয়ে গেলে কে তার দায় নেবে? কিছু ফেসবুক বিপ্লবী ও আলিমুদ্দিনে থাকা কোটার প্যারাসাইট এই কাজগুলো করছে, যাদের সাথে মাটির যোগাযোগ নেই। এটা অবিলম্বে বন্ধ করুন, আমাদের প্রতিটি কমরেড আমাদের সম্পদ, তাদের জীবন এভাবে বিপন্নতার মুখে ঠেলে দেওয়া- আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এটা বিপ্লব নয়, তা যদি হতো- সেক্ষেত্রে গত লকডাউনে রাজ্য জুড়ে পাশে থেকেও ভোটবাক্সে এই দশা হতো না। রাজনীতিটা করুন গুছিয়ে স্বল্প শক্তি নিয়েই এবং করতে দিন মন দিয়ে যারা এটা করছে।
১০) সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন করে একটা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তরুণ মুখের দল পার্টির মধ্যেও উঠে আসুক, নেতৃত্বের হাল ধরুক। সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে হারতে হারতে তারাও নিজেদের তৈরি করে নেবে, যাদের নিয়ে আগামী ২০২৪ ও ২০২৬ নির্বাচনের আগে মানুষের কাছে একটা স্পষ্ট সুভদ্র মুখের বার্তা দেওয়া যাবে। দলে আইনের ছাত্রদের, অর্থনীতি জানা কমরেডদের সামনে নিয়ে আসা হোক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে।
১১) খেতমজুর সংগঠন এর উপর জোর দেয়া হোক। এই নির্বাচনে পার্টির সর্বাধিক সদস্য ABTA থেকে এসেছিল৷ সবচেয়ে বেশি দ্বায়ভার নিশ্চিত ভাবেই তাদের নিতে হবে। গত এক বছর ধরে লকডাউনে বেশিরভাগ শিক্ষক- সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, তারই একটা ভার একটা নির্বাচনে দলকে বইতে হলো। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয়ভাবে নয় সরাসরি স্পষ্ট করে কেরলের মত কর্মের দিকে তাকাতে হবে। তারুণ্যের দিকে তাকাতে হবে।
সুদীর্ঘ পথে আমাদের জন্য নিশ্চিত ভালো কিছু অপেক্ষা করে আছে ৷
১২) তথ্য, বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা ও রূপায়ন- এটা নিয়ে আলাদা সেল খোলা হোক। আগামীর নির্বাচন নিয়ে দ্রুত কর্মশালা করে প্রস্তুতি নেওয়া হোক, সেই মতো দায়িত্ব বণ্টন করে সেখানেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের এখন থেকে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হোক। সোশ্যাল মিডিয়া টিম পেশাদারভাবে চালানো হোক, পার্টি লাইনের মধ্যে থেকে। রাজ্য জুড়ে জেলা ওয়ারি ভৌগোলিক পরিবেশ অনুযায়ী ডেমোগ্রাফি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা, পরিচ্ছন্ন ধারণা থাকা মানুষদের সামনে আনুন। তরুণেরা অনেকেই ভোট বোঝে না, তাদের জন্য কর্মশালা হোক, ভোট ম্যানেজারেরা সারা বছর মাটিতে থেকে প্রার্থীদের জন্য ডেটা রেডি করুক।
১৩) শরিক দলগুলোকে আর কতদিন ও কেন বইবে এই নিয়েও আলোচনা হোক। কারোর কোথাও কোনো সংসঠন নেই সেই অর্থে। CPIM থাকলে তবে তারা আছে, এখন নিজেরাই সমস্যাতে, সেখানে কীসের শরিক আর কীসের বামফ্রন্ট? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মূল্যায়ন করুন।
১৪) কংগ্রেস নিয়ে মোহভঙ্গ কবে হবে সেটা নিয়ে ভাবতে বসুন।
১৫) শহুরে সস্তা প্রচারের রাজনীতিতে না গিয়ে সিটু, কৃষকসভা এগুলোতে জোর দেওয়া হোক। এখানে খোলনাচলে নেতৃত্ব বদল হোক। SFI ও DYFI তৈরি আছে যোগ্য সঙ্গত দেওয়ার জন্য। দলের ব্যাটনটা তাদের হাতেই যাক এবারে।
আমাদের সময় লাগতে পারে কিন্তু বামপন্থীরা নিশ্চিত ভাবে ঘুরে দাঁড়াবেই। ইতিহাস সাক্ষী।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন