রবিবার, ২ মে, ২০২১

ফিলিস্তিন ২০২১- প্রথম পর্ব



পর্ব-১
অবৈধ দখলকারী টিউমার ‘ইজরাইল’, নিরপরাধ ফিলিস্তিনি সাধারণ জনগণের ওপর নতুন করে আবার যে হামলা শুরু করেছে তা আজ একাদশতম দিনে পড়েছে। একছত্রভাবে এরিয়াল রকেট হামলায় ভূমি দখলের পুরাতন খেলার ছক মেনেই- বেশ কয়েকশ লাশ আর হাজারে হাজারে মানুষকে বিকলাঙ্গ বানিয়ে দিয়েছে নতুন করে। ইজরায়েলের নিশানার তালিকায় সবার আগে থাকে অসুরক্ষিত নারী ও শিশুরা। কেন এই হামলা বা কী কারণে হামলা অনেক বড় একটা চ্যাপ্টার, বছর ২-৩ আগে আমি সিরিজ করে ১৪-১৫ পর্বের বিপুল বড় প্রবন্ধ নামিয়েছিলাম নানা তথ্য-উপাত্ত সহ, সেটা পড়ে নিতে পারেন। তাই সে বিষয়ে আপাতত যাচ্ছি না, শুধু কিছু বেসিক বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব।
একটা বিষয় পরিষ্কার, খেলা এখন একতরফা হচ্ছে না। ফিলিস্তিনিদের পক্ষেও চূড়ান্ত প্রতিরোধ শুরু হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে পাল্টা আক্রমণ শানানো হচ্ছে। এবারের এই ইচ্ছাকৃত হামলাতে ইজরায়েল চরম ভুল করেছে, এবারে মাশুল গুনতে হবে চড়া মূল্যে। পরবর্তী পর্বগুলোতে এর বিশদে ব্যাখায় যাব।
আমাদের দেশের মিডিয়া সহ, জায়োনিস্ট পরিচালিত সকল মিডিয়াই ইজরায়েলি সেনাবাহিনীকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আর পারদর্শী বলে সর্বত্র প্রচার করে, ফলে এদেশের ভক্ত সম্প্রদায় এক চরম আত্মরতিময় সুখ অনুভব করে- ‘আরবের মোল্লা ক্যালানো’ যোদ্ধাদের জন্য। কিন্তু বাস্তবতা, তথ্য ও ইতিহাস কী বলছে? ইজরায়েল এমন একটা দেশ যারা আজ পর্যন্ত কোনো দেশের সাথে সরাসরি যুদ্ধ করেনি, সুতরাং জেতা বা হারার প্রশ্নই নেই। ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৮২, ১৯৯৫, ২০০০, ২০০৩, ২০০৮, ২০১২ ও ২০১৪- মোটামুটিভাবে এই ক’বার তাদের সেনাবাহিনীর লড়াইয়ের রেকর্ড রয়েছে। প্রতিবারই এরা কেবল নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি জনগণকে খুন করেছে, এক আধাবার মিশরীয়, জর্ডনীয়, সিরিয়ান কিম্বা লেবাননী অধিবাসীদের খুন করেছে। যখন ফিলিস্তিনিদের হয়ে কোনো দল পাল্টা আক্রমণে গেছে, প্রতিবারই হেগেমুতে কাপড়ে-চোপড়ে করেছে। প্রতিবারই ইজরায়েলের অবৈধ পিতা আমেরিকা ও বৈধ পিতা- ন্যাটো এসে ইজরায়েলকে বাঁচিয়ে নর্দমা থেকে তুলেছে। অতএব, বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও কাপুরুষ সেনাবাহিনীর নাম ‘ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্স’ এতে কোনো সন্দেহ নেই।
অনেকেই জানেন ইজরায়েল-ফিলিস্তিনের মূল দ্বন্দ্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের উপরে স্থাপিত, যা ৫ হাজার বছরেরও বেশি পুরাতন। নৃতত্ত্ববিদ্যা অনুযায়ী জাতি হিসাবে আরবিয়ানরা ‘সেমেটিক গোষ্ঠীর’, তাতে তাদের ধর্মবিশ্বাস ইহুদি, খ্রিস্টান, মুসলমান কিংবা মূর্তিপুজারক প্যাগানও হতেই পারে। এছাড়াও আরো অন্যান্য যদি ছোট কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী থাকে, তার নিশ্চিত ভাবেই সেমেটিক। কিন্তু এই মুহূর্তে ইজরায়েলের মাটিতে যারা নিজেদেরকে ইহুদি বলে দাবি করছে, তারা ওই আরবিয়ান ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির ‘সেমেটিক’ জিনের উত্তরাধিকারী নয়। তারা নিজেরাও সে দাবী করে না, বরং নিজেদের অ্যান্টিসেমেটিক-জায়োনিস্ট বলেই পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করে। এরা প্রায় সকলেই দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী, ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ‘খাজার ককেশীয় জিনের’ উত্তর পুরুষ। খাজার কারা ও কেন, তা নেট ঘাঁটলেই পেয়ে যাবেন, আমি শুধু ক্লু দিলাম।
অর্থাৎ, আজকে যারা ফিলিস্তিনের ভূমিকে নিজেদের পিতৃপুরুষের ভূমি দাবী করে জবরদখল করে ‘ইজরায়েল’ রাষ্ট্র বানিয়ে- অবাধে লুঠতরাজ ও হত্যালীলা চালাচ্ছে, এদের পূর্বপুরুষের সাথে কখনও ‘আরব’ যোগ ছিল না। আরবের অন্যান্য বহু দেশ- সৌদি, সিরিয়া, মিশর এমন কি ইরানেও ইহুদিরা বেশ ভাল সংখ্যাতে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বাস করে, যারা অন্যান্য আরবিয়ানদের মতো দেখতে, অর্থাৎ তারাও সেমেটিক। এরা কিন্তু নানান ইজরায়েলি প্রলোভন স্বত্বেও ইজরায়েলে যায়নি। ইজরায়েলের খাজার ইহুদিরা ‘কটা’ চামড়ার, ‘কটা’ চুল, টিকালো নাক, নীল রঙের চোখের মণি যুক্ত, এবং অধিকাংশই রুক্ষ মেদহীন চেহারা বিশিষ্ট। সেখানে আরবিয়ানরা কালো চুলের, ইজরায়েলিদের তুলনাতে ভোঁতা নাক, কালো চোখের মণি, পেলব মেদযুক্ত শরীরের অধিকারী। নৃতত্ত্ববিজ্ঞানের হিসাবে কোনোভাবেই দুটো জাতি এক নয়, এরা একে অন্যের জাতিগত আত্মীয় নয়। তাহলে কোন হিসাবে এই ইহুদিদের পিতৃভূমি হতে পারে ফিলিস্তিনের ঊষর মরুপ্রান্তর?
বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে কীভাবে ইজরায়েলের জন্ম সেটার জন্য আপনাকে ‘জায়োনিস্ট’ মতবাদ নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, এই পর্ব পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনই ছিল মূল কুশীলব, নেপথ্যে রথচাইল্ড পরিবার। কিন্তু সুয়েজে দাদাগিরি কেন্দ্র করে- মিশরীয় নাসেরের কাছে হেরে নীলনদে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সলিল সমাধি ঘটলে, মূলত আমেরিকার একটা স্থায়ী সেনাঘাঁটি হিসেবে ইজরায়েলের অভ্যুত্থান ঘটে ষাটের দশকে। আমেরিকা ইজরায়েলের পিতৃত্বের দাবী নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবির্ভূত হয়। অবশ্য, ১৯৩৮ সালে আরবে খনিজ তেলের আবিষ্কার না হলে আদৌ সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, ইজরায়েলকে এভাবে পুত্রস্নেহে লালন করত না, তা বলাই বাহুল্য। ইজরায়েল আদপে আমেরিকার একটা সেনা ঘাঁটি, যেখান থেকে ‘অশিক্ষিত-মূর্খ’ আরবিয়ান রাজাদের ‘মদ-মেয়েমানুষের’ টোপে ডুবিয়ে রেখে, তাদের দিকে অজস্র বোমাবারুদ তাক করে রেখে- তাদের খনিজ সম্পদ কুক্ষিগত করে লুঠ করছে।
বর্তমান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু- নিজ দেশের রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত নড়বড়ে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, ঠিক তেমনি গত নির্বাচনে নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল- গাজা ভূখণ্ড দখল করে দেশের জনগণকে উপহার দেবে। সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, এবং এই বিষয়টা নিয়ে এই মে’২০২১ এর প্রথম সপ্তাহের শুরুর দিকেই বিশ্বজোড়া শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থাগুলো একজোটে নেতানিয়াহুর নামে বিষোদ্গার শুরু করে দেয়। লিঙ্ক রইল-
বর্তমান ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এর নিজ দেশে রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত নড়বড়ে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, ঠিক তেমনি গত নির্বাচনে নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল- গাজা ভূ-খণ্ড দখল করে দেশের জনগণকে উপহার দেবে। সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, এবং এই বিষয়টা নিয়ে এই মে’২০২১ এর প্রথম সপ্তাহের শুরুর দিকেই বিশ্বজোড়া শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থাগুলো একজোটে নেতানিয়াহুর নামে বিষোদগার শুরু করে দেয়। লিঙ্ক রইল-
এমনিতেই এই নেতানিয়াহু বিপুল পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতি, জালিয়াতি, স্বজনপোষণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে অভিযুক্ত, ক্ষমতায় আছে বলে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যায়নি। কিন্তু গত দু'বছরে চারটে নির্বাচনে তার দল ‘লিকুদ পার্টি’ গোহারা হেরে ধুঁকছে, তার প্রতিপক্ষও বিপুল ক্ষমতাধর দেশজ রাজনীতিতে, তিনি দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি- ‘রেউভেন রেভলিন’। এমতাবস্থায় নেতানিয়াহুর পক্ষে সরকার টিকিয়ে রাখাটাই দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সরকারের পতন মানেই তার জেলযাত্রা অবধারিত- অতএব লাগাও যুদ্ধ।
নেতানিয়াহু সরকার গত নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে এবং তাকে বাধ্য হয়ে জোট সরকার চালাতে হচ্ছে, ফলে ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না, এবং এই কারণেই গোলমাল পাকিয়ে নতুন নির্বাচন চাইছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মানুষ সব ভুলে যাবে, দেশপ্রেমের আবেগকে কাজে লাগিয়ে আবার ক্ষমতায় থেকে যাওয়াও যাবে বা নির্বাচনে জেতা যাবে। আসলে প্রতিটি অপদার্থ শাসকের, নিকৃষ্ট পদ্ধতিগুলোও বিশ্বজনীনভাবে ঠিক মিলে যায়। আমরা জানি ২০১৯ সালের পুলওয়ামা ভুলিনি, নিজেদের সেনা হত্যা করে করে দেশপ্রেমের আবেগে ভাসিয়ে ক্ষমতায় আসার সুফল আজ করোনাকালে মানুষ প্রতিটি শ্বাসে টের পাচ্ছে। যাই হোক, বিষয়ে ফিরি-
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কতটা ইজরাইলপন্থী ছিল তা আমরা জানি, কিন্তু তার পরেও তার শাসনামলে গোটা বিশ্বে আমেরিকা কোথাও যুদ্ধে জড়ায়নি, না ইজরায়েলকে জড়াতে দিয়েছিল। এই কারণেই সম্ভবত তার বিদায় ঘটল এবং বাইডেন এল। ১৯৯৬ পরবর্তী সময়ে থেকে ২০১৬ ট্রাম্পের জমানা অবধি, বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস যদি ঘাঁটাঘাঁটি করা যায়, দেখতে পাওয়া যাবে- এ যাবৎ কালে পৃথিবীতে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে- তার প্রতিটিতে আমেরিকা যুক্ত ছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হচ্ছে- প্রতিটা যুদ্ধের উপদেষ্টামণ্ডলীতে কোনো-না-কোনোভাবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উপস্থিতি অত্যন্ত জোরালোভাবে ছিল।
সুতরাং সেই যুদ্ধবাজ ব্যক্তিটি যখন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট, তখন ইজরায়েলের নতুন করে বাড়াবাড়ি করাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। ক্ষমতায় আসার সময় দেশে করোনা ও বেকারত্বের পাশাপাশি সাদা-কালো দ্বন্দ্বটা আড়াআড়ি ছিল, স্বভাবতই শুরুতে বাইডেন নিজেকে ততটা প্রকাশ করতে পারেনি। কিন্তু গত মার্চ থেকে লাগাতার তার প্রতিটি বক্তৃতাতে ইজরাইলকে নিয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছিল, এবং যুদ্ধের জন্য প্রকাশ্য উস্কানি দিতেও কুন্ঠা বধ করেনি। স্বাভাবিকভাবেই দুর্নীতিবাজ নেতানিয়াহুর পতনের দেওয়াল লিখন স্পষ্ট হতেই, বাইডেনের উস্কানির সূত্র ধরে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ইজরায়েলি নপুংশক সেনার দল।

~ক্রমশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...