এবারের ইজরায়েলি আক্রমণের শুরুতেই হামাস জানিয়ে দিয়েছিল- ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে পাথর মারার দিন শেষ, এবার বারুদের জবাব- বারুদ দিয়েই দেওয়া হবে।
গত পর্বেই বলেছি ইজরায়েলি সেনাবাহিনী পৃথিবীর অন্যতম দুর্বলতম সেনাদল। তবে এদের সেনাবাহিনীর কাছে যেসকল আধুনিক সমরাস্ত্রগুলো রয়েছে তা যথেষ্ট উন্নত ধরনের। ইজরায়েলি সেনার ‘এরিয়েল কমান্ডে’ থাকা রকেট, হেলিকপ্টার, ড্রোন, মিসাইল কিম্বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইত্যাদি সমস্ত প্রযুক্তিগত যুদ্ধাস্ত্র পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী বললেও অত্যুক্তি হবে না। স্বভাবতই, তারা আল আকসা মসজিদে ইচ্ছাকৃত অশান্তি তৈরি করে সেখানে নির্বিচারে গুলিগোলা চালিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে- এর পরেই একতরফা যুদ্ধ শুরু করে দেয় নেতানিয়াহু। ইজরায়েল শুরুতেই তার শ্রেষ্ঠ শক্তি আকাশ পথে ‘এরিয়াল আক্রমণ’ শুরু করে দিয়েছিল নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের উপরে। শেষ রমজান মাসে রোজাদার ও অপ্রস্তুত ফিলিস্তিনিরা শুরুতেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে যায়। একতরফা সাফল্য জমা হয় ইজরায়েলের খাতায়। কিন্তু রমজান শেষ হতেই ওই একতরফা খেলার মোড় ঘুরতে শুরু করে।
ইজরায়েল তাদের মিশাইল প্রতিরোধী ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম টেকনোলজি’ নিয়ে মারাত্মক পর্যায়ের আত্মবিশ্বাসী ও অহংকারী ছিল। ২০২১ এর মে মাসের আগে পর্যন্ত এই প্রযুক্তিতে দারুণভাবে সফলও ছিল, ফলত দুনিয়ার নানান দেশ থেকে এই প্রযুক্তি বিক্রির জন্য অর্ডার নেওয়াও শুরু করে পাইকারি হারে। শত্রুপক্ষের থেকে কোনো রকেট বা মিশাইল হামলা হলে, তা মাটিতে ছোঁয়ার আগে আকাশেই পাল্টা অন্য একটা রকেট দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিনষ্ট করে দেওয়া হতো- আইরন ডোম সিস্টেম ব্যবহার করে। সুতরাং নিজেদের ঘর সুরক্ষিত রেখে দখলদার ইজরায়েল ‘মালিকের’ ঘরের উপরে বোমা বর্ষণ করছিল নিশ্চিন্তে।
কিন্তু ঈদ মিটতেই PIS, AAMB, PRC, DFLP, PFLP-GC, Harkat এমন কয়েক ডজন ছোট ছোট মিলিট্যান্ট গ্রুপ নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার্থে জীবনপণ লড়াইতে সামিল হয়ে যায়, যাদের সকলের উপরে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল ‘হামাস’। হামাস একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘উদ্দীপনা’। ১৯৮৭ সালে জন্ম নেওয়া ‘হামাস’ নামের বৈপ্লবিক রাজনৈতিক দলটি ২০০৭ সাল থেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দ্বারা অন্য দল ফাতাহ’কে পরাজিত করে এরাই বর্তমানে ফিলিস্তিনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শাসনভার সামলাচ্ছে। হামাসের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার নাম ইসমাইল হানিয়া। হামাস পরিচালিত মিলিটারি গ্রুপের নাম ‘আল-কাসসাম’ ব্রিগেড, ইজরায়েলের লাগামহীন ফিলিস্তিনি ভূমি দখল কার্যত এই ব্রিগেডের প্রতিরোধের কারণেই শেষ দেড় দশকে থমকে গেছে। স্বভাবতই, ইজরায়েল সহ তাদের মিত্রগোষ্ঠী ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা- হামাসকে ‘মোস্ট ওয়ান্ডেট’ জঙ্গি সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করেছে। যদিও বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ইরান, রাশিয়া, তুরস্ক বা চীন হামাসকে বন্ধু হিসাবেই দেখে।
ঈদ পরবর্তী দিনে আশ্চর্যজনকভাবে পড়শি জর্ডন, লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তে বিপুল পরিমাণে ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুরা ভিড় জমায়। সীমান্ত পেরিয়ে নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার উদ্বাস্তু শিবিরের আশ্রয় ছেড়ে যুদ্ধের ময়দানে যাবার জন্য তারা অনড় ভাবে সীমান্তের স্বদেশীয় মিলিটারির সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পরে। কিছুজন মরুভূমির বালির নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজও শুরু করে দেয়- যা ইজরাইলের জন্য বিপুল পরিমাণে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে একটা কথা পাঠকের মাথায় রাখা দরকার যে, ইজরায়েলের পদাতিক বাহিনীকে- নেপাল রাষ্ট্রের সেনা দল ‘রাজকীয় নেপালি সেনা’র থেকেও যদি অযোগ্য বলা হয়, কম বলা হবে; কারণ ইজরায়েল এমন একটা দেশ যারা সারাজীবনে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা ছাড়া অন্য কোথাও কোনো যুদ্ধ করেনি, যতই তারা মিডিয়াতে নিজেদের সেনাকে বিশাল রঙ চড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করুক। আমেরিকা কিম্বা ন্যাটো যদি তাদের সেনা সাহায্য না করে, পদাতিক বাহিনীর যুদ্ধে ইজরায়েল একটা বেলা টিকে থাকারও অযোগ্য। ফিলিস্তিনিরা লড়াই করছে নিজেদের অস্তিত্বে রক্ষার জন্য, অপরদিকে ইজরায়েলি সেনারা রাষ্ট্রের ভাড়াটে দাস। ফিলিস্তিনিরা লড়াই করছে নিজেদের বালবাচ্চার জন্য, আগামী ভবিষ্যৎকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত করার জন্য। তাদের সামনে যুদ্ধ ছাড়া পথ নেই, যুদ্ধ করে জিততে পারলে ‘জীবন’ কিছুটা সময় পাবে, নতুবা ইজরায়েলি বোমার আঘাতে মরবে অথবা আজীবন দাসত্ব করতে হবে।
দীর্ঘদিন একতরফা মার খেতে খেতে অধিকাংশ ফিলিস্তিনি বিপ্লবী গেরিলা যুদ্ধে ভীষণভাবে দক্ষ হয়ে উঠেছে, আমরা যদি সাত বছর আগে ২০১৪ সালে ফিরে যায়, দেখব ঠিক একই রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছিল ইজরায়েল। সেবারও তারা পদাতিক সৈন্য নামাতে বাধ্য হয়েছিল, সেই যুদ্ধ ৫০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ফলাফল কী ঘটেছিল তা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে, রীতিমতো লেজেগোবরে হয়ে খোলসের মধ্যে ঢুকে যেতে বাধ্য হয়েছিল ইজরায়েল।
গতবারে হামাস সহ বাকি মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীগুলো একজোট ছিল না, না ছিল তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষেপণাস্ত্র। এবারে ফিলিস্তিনের স্বার্থে তারা একজোট হয়ে ইজরায়েলের বিভিন্ন সেনা ছাউনি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে রকেট বর্ষণ করতে শুরু করে। হামাসের হাতে সামান্য কিছু আধুনিক রকেট বা মিশাইল থাকলেও, তাদের অবশিষ্ট অস্ত্রশস্ত্র সহ অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর সব রকেটই ‘বাবা আদম’ জামানার গাদা প্রযুক্তির। রকেটগুলো একবার লঞ্চার থেকে বেড়িয়ে গেলে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকত না। কোথায় গিয়ে পড়বে কেউ জানত না। এমন আনাড়ি অস্ত্র ও অস্ত্র চালনাতে প্রায় অশিক্ষিত একটা সেনাদল জীবনপণ মরিয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো বিচিত্র একটা রণকৌশল নিয়ে।
ইজরায়েলের সরকারি সংবাদপত্র ‘হারেৎজ’ এ প্রকাশিত ১৫ই’মে এর একটা প্রতিবেদন অনুযায়ী- গাজা থেকে নিকটবর্তী ইজরায়েলি শহরগুলোর নানান সামরিক ও রাষ্ট্রীয় স্থাপত্যগুলোকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে আসতে থাকে, যা তাদের কাছে কল্পনারও অতীত ছিল। ১৬ই মে তারিখ ভোরে, ১ মিনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩৭টি মুহুর্মুহ হামলার রেকর্ড নথিবদ্ধ করে ইজরেয়ালি সেনা।
ইজরায়েলের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ টেকনোলজির ওপর নির্ভরশীল ছিল ২০০১ সাল থেকে ২০২১ ঈদের আগে পর্যন্ত, ফিলিস্তিনিরা যা টুকটাক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছিল ইজরায়েলকে লক্ষ্য করে, তার সবকটাকে সাফল্যের সাথে আঁটকে দিয়েছিল ‘আইরন ডোম’। পরীক্ষাগারেও এই ‘আইরন ডোম’ সিস্টেম ছিল ৯৯% সফল। কিন্তু মিনিটে এত বিপুল পরিমাণে ‘আনগাইডেড রকেট’ হামলার জন্য ইজরায়েলিরা প্রস্তুত ছিল না। তাদের তথাকথিত বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ ঘুণাক্ষরেও অনুমান করতে পারেনি ঠিক কী পরিমাণে ক্ষেপনাস্ত্র তথা যুদ্ধাস্ত্র হামাস সহ অন্যান্য মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর কাছে মজুত রয়েছে। স্বভাবতই ২৫শে মে তারিখে দীর্ঘ ৬ বছর ধরে চেয়ারে থাকা মোসাদের প্রধানকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে পদচ্যুত করানো হয়েছে।
মোসাদের আরও বড় ব্যর্থতা হচ্ছে- প্রায় অবরুদ্ধ করে রাখা ওইটুকু গাজা ভূ-খণ্ডে এত বারুদ, অস্ত্র পৌঁছালো কীভাবে, তারও কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এদিকে মিনিটে বিপুল পরিমাণ রকেট হামলাতে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) পরিচালিত ‘আইরন ডোম’ সিস্টেম ফেল করে দেয়- ৯০% ফিলিস্তিনি আক্রমণ সাফল্যের সাথে রুখে দিলেও বাকি ১০% আনাড়ি রকেটের দাপটেই ইজরায়েলের ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে যায়। আরও লজ্জাজনক বিষয় হচ্ছে ‘ইয়া-মোরাই’ ও ‘শিরট’ অঞ্চলের দু’দুখানা আয়রন ডোমের উপরেই আনাড়ি রকেট পতিত হয়ে ইজরায়েলের গর্বকে মৃত সাগরে জলসমাধি ঘটিয়ে দেয়। ইজরায়েল সহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমেই এই ছবি দেখা গেছে, বিশেষ করে আলজাজিরা সেগুলোর ডাইরেক্ট ফুটেজ দেখিয়েছে। ফলস্বরূপ, ব্যর্থ ক্রোধে গাজার ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সেন্টারটাই বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় ইজরায়েলী সেনা।
…ক্রমশ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন