শুক্রবার, ২১ মে, ২০২১

শহীদের শোক কদিনে ভোলে জনগন?



আজ বড় শোকের দিন, গাইঘাটা সহ গোটা রাজ্য হারালো একজন বামযোদ্ধাকে, যিনি নিজ জীবন বাজি রেখে ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ স্বরূপ অসুস্থ রোগীদের সেবা দিতে দিতে, না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। কমরেড- শ্রীবাস হালদার অমর রহে।

ঝকঝকে তরুণ, শিক্ষাকর্মী ও পার্টিজান এই কমরেডের প্রাণশক্তি ছিল তারিফ যোগ্য। পার্টির মিটিং মিছিলে লাল পতাকা কাঁধে সর্বদা হাসি মুখে নিরলস শ্রম দান করে গেছেন অবিরাম, আজ পতাকাটা পড়ে রইল- করোনা এই ভরসার যোগ্য বিনয়ী কাঁধটাকেই কেড়ে নিল চিরতরের জন্য।
শহীদ কমরেড হালদারের পরিবারের কাছে এই ক্ষতি অপরিসীম, যা কোনো কিছুর দ্বারাই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। আমরা একবার আধবার, কিম্বা ১-২ দিন তাঁকে স্মরণ করব, ‘অমর রহে’ স্লোগান তুলব- তারপর?
চতুর্দিকে টুকটাক খবর পাওয়া যাচ্ছিল- রেড ভলেন্টিয়াররা আক্রান্ত, তাদের কেউ কেউ অসুস্থ, কেউ করোনা পজিটিভ, কেউ বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু ভীষণ উদ্বেগে ছিলাম- তাদের চিকিৎসার খরচ কে বা কারা যোগাচ্ছে! তবুও সুখের কথা হচ্ছে, তারা সকলেই হাসিমুখে ঘরে ফিরে এসেছিলেন সুস্থ হয়ে। কিন্তু শ্রীবাস হালদারের সম্বন্ধে কোনো তথ্যই সোশ্যাল মিডিয়াতে উপলব্ধ নয়, তাঁর লড়াই এর খবর সম্বন্ধে আমরা কেউ কিচ্ছু জানতে পারিনি, শুধুমাত্র মৃত্যুর পরই খবরটা সামনে এসেছে। আমরা সকলে আজ দীর্ঘ ৩ সপ্তাহ ধরে এমন একটা ভয়াবহ আশঙ্কাই করছিলাম, তাদের ন্যুনতম কোভিড বিধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তো? তারা PPE কিট সহ যথেষ্ট সুরক্ষা পাচ্ছে তো? আমাদের কমরেডদেরই কেউ যদি আক্রান্ত হয় তার যথাযথ চিকিৎসা হবে তো? তার উপরে বিমা করানো হয়েছে তো?
সামান্য কিছু ক্ষেত্রে খুবই অল্প পজিটিভ রেসপন্স পাওয়া গেছিল প্রশিক্ষণে, সুরক্ষা পোশাকের ব্যবহার বাড়লেও তা পর্যাপ্ত ছিল না, বিমা হয়েছে এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এই মৃত্যু সংবাদ এবিপি দেখাবে না, ২৪ ঘন্টা জানাবে না, ‘এই সময়’ ছাপবে না, ব্রিটেনের সেই সংবাদ পত্রটিও জানবে না প্রথম শহীদ ‘রেড ভলেন্টিয়ার’ শ্রীবাস হালদারের কথা। ফেসবুকেও এক দু’দিন হা হুতাস করে ভেসে থাকার পর ফেসবুকের লক্ষ পোস্টের ভিড়ে কালের অতলে হারিয়ে যাবে- শহীদ কমরেড শ্রীবাস হালদারের নামটি। ভুলবে না শ্রীবাস বাবুর মা, যিনি জন্ম দিয়েছিলেন সন্তানকে, আজ ‘অসুরক্ষিত’ জনসেবা করতে গিয়ে তিনি সন্তানহারা হলেন।
আমরা জানিই না তাঁর স্ত্রী-সন্তান আছে কিনা বা অন্যান্য কোনো পরিজন সংক্রান্ত ন্যুনতম তথ্যটুকু নেই। তাঁর অন্তিম সংস্কারের সময় লাশের উপরে একটা লাল পতাকাটুকুও জুটেছে কিনা সে নিয়ে কেউ কোনো হ্যাশট্যাগ নামায়নি। তিনি আদৌ পার্টির কোনো গণসংগঠনের কর্মী বা সমর্থক ছিলেন- সেটুকুও জানা যাচ্ছে না।
রাজ্য সিপিএমের মুখ্য ফেসবুক পেজে রেড ভলেন্টিয়ার্স নিয়ে নানান পোস্টের ভিড়ে- শহীদ কমরেড শ্রীবাস হালদার এখনও জায়গা পাননি। আগামীকালের গণশক্তিতে জায়গা পাবে নাকি তাও জানা নেই।
কমরেড শ্রীবাস বাবুর পরিবার আজ দিশেহারা, স্বজনেরা অভিভাবক হারাল। তাঁর সুরক্ষা পোশাক পরিহিত ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ এর ছবি এখনও সোশ্যাল মিডিয়া দেখেনি। তিনি পার্টিজান ছিলেন, ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মানুষের বিপদে। আজ যদি তাঁকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, শুরু থেকেই তাঁকে উপযুক্ত পোশাক দিয়ে রাস্তায় নামানো হতো- হয়ত বা আজ এই দিন দেখতে হতো না- নিয়তির নামে দোষ চাপিয়ে।
আজ যদি তাঁর জন্য বিমা করানো থাকত, তাঁর পরিবার কিছুটা আর্থিক সুরক্ষা পেত। আজ যদি পার্টির তরফে কোনো ভলেন্টিয়ারি আইডেন্টিটি কার্ড দেওয়া থাকত, সেটা তাঁর পরিবারের কাছে শহীদের গর্ব ‘স্মৃতি চিহ্ন’ হিসাবে থাকত, অফিসিয়ালি দলীয় স্বীকৃতি থাকত।
শহীদ কমরেড শ্রীবাস হালদারের প্রাথমিক চিকিৎসা, যথাযথ চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল কি? তা হলে সেটা সরকারি ছিল না বেসরকারি ছিল তা জানি না। তাঁর চিকিৎসার আর্থিক দায়ভার কে বহন করেছিল? আজকে সোশ্যাল মিডিয়াতে বলা হচ্ছে- নিয়তির কাছে আমরা অসহায়। সত্যিই কি আমরা নিয়তির কাছে অসহায়? নাকি পরিকল্পনাহীন ভাবে পার্টির ছাত্রযুবদের মাঝে একটা অসুরক্ষিত গণ হিস্টিরিয়ার কাছে আমরা শহীদ কমরেডকে হারালাম? এর দায় কে নেবে?
আজ অবধি জানা যায়নি, রেড ভলেন্টিয়ার্স কর্মকাণ্ডের জন্য CPIM দলের কেন্দ্র বা রাজ্য পার্টির অফিসিয়ালি কোনো লিখিত অনুমোদন আছে কিনা। যদি পার্টির তরফে এটা অফিসিয়াল প্রোগ্রামই হয়, তাহলে অন্যান্য গণসংগঠনগুলোর মতো এর রেজিস্ট্রেশন আছে কিনা জানা নেই। রেড ভলেন্টিয়ারের তরফে এর রাজ্য সম্পাদক, সভাপতি ও ক্যাশিয়ার কারা জানি না। এর রাজ্যকমিটির সদস্যমণ্ডলী, জেলা কমিটির সম্পাদক ও সম্পাদকমণ্ডলীতে কারা আছেন জানা নেই। দলের তরফে এই ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ সংগঠনের দায়িত্বে কে বা কারা আছে তাও জানা নেই। সর্বোপরি, ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ হওয়ার প্রাথমিক সদস্যপদ কীভাবে পেতে হয় তাও জানা নেই।
একটা সেন্ট্রালি ওয়েবসাইটের উল্লেখ হয়েছে ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ নামের ফেসবুক গ্রুপে, যাদের এন্ড্রয়েড এপসও রয়েছে। যেখানে একটা ডিসক্লেমার দেওয়া আছেঃ- “কোভিড মোকাবিলায়, দলমত নির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সহায়তা করার জন্য একদল তরুণ-তরুণী অনবরত ছুটে বেড়াচ্ছে, অক্সিজেনের খোঁজে, হসপিটাল বেডের খোঁজে, ওষুধের খোঁজে...। এঁরা মূলত সিপিআই(এম), এসএফআই, ডিওয়াইএফআই ও অন্যান্য বামপন্থী দলের কর্মী, সদস্য ও সমর্থক। তবে এই মুহূর্তে তাঁদের পরিচয়- 'রেড ভলান্টিয়ার্স'!” এর সাথে মূলত বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু ব্যক্তির ফোন নং দেওয়া আছে। গোটা ওয়েবসাইটটিতে একটা কমিউনিস্ট লোগো পর্যন্ত নেই। পুরো বিষয়টাই একটা হাঁসজারু মার্কা ধোঁয়াশা।
শহীদ কমরেড হালদারের পরিবারের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, পরিবারের একজনের সরকারি চাকরি ও একটা উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণের জন্য নাগরিক সমাজের সর্বস্তর থেকে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানানো হোক। পার্টি নেতৃত্ব আগামীকাল অসহায় পরিবারটির বাড়িতে গিয়ে তাদের এই চরম দুর্দিনের দিনে পাশে দাঁড়াক। শহিদ মইদুল আলম মিদ্যার পরিবারের পাশে যেমন দাঁড়ানো হয়েছিল, ঠিক সেইভাবে সমস্ত গণসংগঠনগুলি- শহীদ কমরেড হালদারের পরিবারের পাশে আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিক।
আপনারা যারা রাস্তায় আছেন, ও রাস্তায় থাকা ছাত্র যুবদের অভিভাবক যারা ঘরে আছেন- আপনারা সুরক্ষা বিষয়ে সচেতন হোন ও সন্তানদের সচেতন করুন। কেউ একজন শহিদ কমরেড হালদারের মতো হারিয়ে গেলে, সকলে সাময়িক হা হুতাশ করলেও- চিরস্থায়ী ক্ষতিটা আপনার পরিবারেরই হবে। শহীদ কমরেড সেই শিক্ষাই দিয়ে গেলেন আমাদের।
কমরেড- শ্রীবাস হালদার লাল সেলাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নাগপুর ও শিক্ষা দূুর্নীতি

পেপার লিক বা প্রশ্নপত্র ফাঁস কোন বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়।  এটা একটা পরিকল্পিত অর্থনৈতিক মডেল যেটা সরাসরি নাগপুর থেকে পরিচালিত হয়। এটার পেছনে...