সম্পূর্ণ সিডিউল
শেষ কয়েক বছরের পরম্পরা মেনে করোনাকাল-২০২০ সালে অকপট চড়ুইভাতির আয়োজন করতে পারেনি টিম ‘অকপট’। ২০২১ এর শুরুর লগ্নে যখন প্রায় সকল কিছু আবার ছন্দে ফিরেছে, অকপটও সেই তালে পা মিলিয়ে কিছুটা মুক্তির স্বাদ পেতে মরিয়া।
অকপট চড়ুইভাতি মানে- শুধুই তো আর খাওয়াদাওয়া নয়, বরং এটা বাৎসরিক পারিবারিক মিলনোৎসব। অকপটুরা নিজ নিজ পরিবারের সাথে ৩টে দিন একসাথে থেকে, ভ্রমণ করে নিজেদের হৃদয়ের উষ্ণতা ভাগ করে নেয় এমন একটা সম্মিলনীতে। এটাকে যেমন শুধুই পিকনিক বলা যায়না তেমনই একে শুকনো ভ্রমন ও বলা চলেনা, এ আসলে অকপট চড়ুইভতি, এখানে ভ্রমণ ও চড়ুইভাতির সম্মিলনী ঘটে অন্তরের টানে।
এ বছর আমাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে আগামী ২৯শে জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২১। ঠেক- গিধনি।
গিধনি, এটি হল পশ্চিবঙ্গের অন্তিম রেলস্টেশন। মাইলের পর মাইল খাঁ খাঁ ঢাড় জমির ওপর দিয়ে হুমহাম শব্দে তীর ধনুক নিয়ে এখান দিয়েই শিকারে যেত আদিবাসীরা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। বাজার দোকান সবই এই শেষ কয়েক দশকের দান, একটা সময় ড্যাঞ্চি বাবুদের চেঞ্জে আসার নিশ্চিন্ত আস্তানা ছিল এই গিধনি। লাল মোটা ধানের ভাত আর স্থানীয় বুনো কপির তরকারি দিয়ে হাউহাউ করে গোগ্রাসে গিলতো- পাথুরে হজমি জল পেটে পড়তেই। সপ্তাহান্তের হাট থেকে আনা মাছ কিংবা বনমুরগি দিয়ে স্বল্প মশলার আমিষান্ন- সে এক পরম সুখের দিন ছিল।
সেই গিধনি আজ জমজমাট মফঃস্বল। বেশ বড় বাজার, টোটো গাড়ির ভিড়ের সন্ধ্যা যেন জনঅরণ্য। কিন্তু লোকালয় ছেড়ে দু’পা এগিয়ে গেলেই শ্যামল গ্রাম, উঁচুনিচু মাঠ, তেপান্তরের সীমা অবধি ছড়িয়ে থাকা পাথুরে জমির বুকে সারি সারি তাল আর খেজুরের সারি; আরো দূরে মহুয়া, শাল, পিয়াল, সোনাঝুরি, শিরিষ, ইউক্যালিপটাসের সবুজের সমারোহ- আর নাম না জানা ছোট্ট নদীর তিরতিরিয়ে বয়ে যাওয়া- হাজার বছর আগেও যেমন ছিল, আজও তেমনই রয়েছে- হয়ত অবিকল। মস্ত দীঘি ভরা শালুক ফুলেল জলে স্নানরত ছেলেপুলের দল।
রওনা- ২৯শে জানুয়ারি, শুক্রবার, ২০২১। সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটে হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা হওয়া “12813 - স্টিল এক্সপ্রেসে” চড়ে বসবে অকপট পরিবার- যারা উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও কলিকাতা সংলগ্ন অঞ্চল থেকে আসবেন। রাত্রি ৭টা ৫৫ মিনিট নাগাদ ট্রেনটি আমাদের নামিয়ে দেবে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে, সেখানে ‘অকপটের টিম বাস’ অকপটুদের রিসিভ করে ‘গিধনি’র নৈশ আবাসের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাবে। সেদিন রাত্রে দুটো মরশুমি সব্জির তরকারির সাথে মুরগির মাংসের পাতলা ঝোল দিয়ে দুটি ভাত খেয়ে গল্পগাছা করতে করতে ঘুমের দেশের পাড়ি দেওয়া হবে ক্লান্ত শরীরে।
সকল পুরুষদের জন্য এক বা একাধিক স্থানের বন্দোবস্ত থাকবে, যেখানে পর্যাপ্ত টয়লেট ফেসিলিটির সাথে, পরিচ্ছন্ন বালিশ, বিছানা, বিছানার চাদর, কম্বল, তোষক ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণ মজুত থাকবে শীত নিবারণের প্রয়োজনে। মহিলা ও শিশুদের রাত্রিনিবাসের স্থানটি এলাকার অন্যতম সুরক্ষিত স্থানে করা হয়েছে, যেখানে উপরোক্ত পরিমাণে শীতবস্ত্র, বিছানা কম্বল ও পর্যাপ্ত বাথরুম থাকবে।
৩০শে জানুয়ারি, শনিবার, ২০২১। এটি আমাদের ভ্রমণ দিবস। সকালে প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদন করে প্রস্তুত হওয়া মাত্রই, জলখাবারের ব্যবস্থা থাকবে। যেখানে, পুরী-সব্জি, ইডলি-সাম্বর, ধোসা-বড়া-সাম্বর ইত্যাদি বিকল্প ধরনের প্রাতঃরাশের ঢালাও ব্যবস্থাপনা থাকবে।
এরপর আমাদের টিমবাস বেড়িয়ে পড়বে বাংলার জঙ্গলরানী জামবনী ব্লকের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিরতির করে বয়ে চলা ড়ুলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে মহারাজা গোপীনাথ সিংহের তৈরি- ঐতিহাসিক ‘চুয়াড় বিদ্রোহের’ সাক্ষী বহন করে চলা ‘চিল্কিগড় রাজবাড়ী’ প্রাঙ্গণ। বৃহৎ তোরণ দ্বার পেরিয়ে গবুজ ঘাসের গালিচা বেছানো পথে উন্মুক্ত প্রান্তরের বামদিকে সুপ্রাচীন অশ্বত্থ গাছ আপনাকে সেই ১৭৬৯ সালের গল্প শোনাবে ফিসফিসিয়ে। অদূরে মন্দির, পরিত্যাক্ত কর্মীআবাস, আউটহাউসকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদের মূল অংশ। অপুর্ব সুন্দর মনোরম পরিবেশে কিছুক্ষণ থিতু হয়েই আমরা রওনা দেব অদূরের কনকদুর্গা মন্দিরের উদ্দেশ্যে।
মালভূমির উপর দিয়ে বয়ে চলা নামটির মত জলতরঙ্গ খেলিয়ে বয়ে চলা নদী ডুলং। কিছুটা জঙ্গলে ঢাকা কংক্রিটের পথ পেরিয়ে যেতে হবে মন্দিরে, এই জঙ্গলটির নাম ভূষণ। সরকারি হিসাবে প্রায় ৪৩৩ ধরনের বিরল উদ্ভিদের দেখা মেলে এই জঙ্গলে, যার অনেকগুলিই ভেষজ হিসাবে দুষ্প্রাপ্য। নিম, বাবলা, বাঁদরলাঠি, অর্জুন, শিরীষ, গুলঞ্চ, পিপুল, সঞ্জীবনী সহ কতধরনের অজানা বনানীর যে সমাহার রয়েছে তার গণনা করা ভীষণ কঠিন। হরেক ফুল, প্রজাপতি, বাঁদর আর পাখীর ডাকের আলোআঁধারি পরিবেশটাই যেন শতাব্দী প্রাচীন মন্দির চত্বরটিকে একটা আশ্রমের মেজাজ দিয়েছে। কিছুটা এবড়োখেবড়ো পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে মিষ্টি ডুলং নদীর পাড়ঘেষা কনকদুর্গা মন্দির চত্বরের জঙ্গলটিতে। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল ভ্রমণ শেষে আমরা রওনা দেব গদরাশোল গ্রামের উদ্দেশ্যে, এটি আদিম উপজাতি লোধা ও শবরদের গ্রাম, দেখে নিতে পারব আমাদের আদিম ভারতের জনজাতির নিজস্ব সংস্কৃতি।
ততক্ষণে বেলা অনেকটাই হয়ে গেছে, কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি। গদরাশোল হাটচালাতে আমাদের মধ্যাহ্নভজন পৌঁছে যাবে অন্য গাড়িতে, ‘ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন’। ভরপেট খেয়ে দেয়ে আমরা বাসে বিশ্রাম করতে করতে রওনা দেব ২৭ কিমি দক্ষিণে সুবর্নরেখা নদীর তীরবর্তী গোপীবল্লভপুর ইকোপার্কের উদ্দেশ্যে। প্রসঙ্গত, এই ভ্রমণে পার্কের এন্ট্রি ফি, বা কেউ যদি কোনো রাইড (নৌকা বা প্যাডেল বোট) নিতে চায় সেক্ষেত্রে খরচা অতিরিক্ত ও ব্যাক্তিগত।
চোখজোড়ানো মনভোলানো উদ্যানটি ঘুরে ফিরে দেখে নিয়ে রওনা দেব ‘ঝিল্লি পাখিরালয়’ এর উদ্দেশ্যে। ঘন প্রাকৃতিক জঙ্গলের মাঝে এক অপূর্ব মনোরম সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঝিল্লি পাখিরালয়, যা মূলত পরিযায়ী পাখীদের নিশ্চিন্ত শীতকালীন আবাসস্থল। উড়ে বেড়ানো বান্টিকের ঝাঁকের সাথে দেখা মিলবে চাঁদি ঠোঁট, বালি হাঁস, নিরল পরিনা, নীলকণ্ঠী ফিদ্দা, চুনী কন্ঠী, শিলাফিদ্দা, ছোট সারস, ছোটন ভোমরা, ভরত পাখী কিম্বা হরেক ক্যামফ্লেজে আপনাকে টুকি দেওয়া মুনিয়ার ঝাঁক। এই পাখিরা এখানে খাদ্য আহরন করে, বাসা বাঁধে এবং ছানা ফুটিয়ে বড় করে; অতঃপর শীতকাল কাটিয়ে বসন্তে আবার উত্তরে উড়ান দেয়। পর্যটকদের জন্য ঝিলের একপাড়ে বেশ সাজানো গোছানো ছোট্ট পার্ক মতন করা রয়েছে। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা পাড়ি দেব আমাদের রাত্রিযাপনের স্থান গিধনির উদ্দেশ্যে, কিন্তু তার আগে আমরা একবার ঢুঁ মেরে নেব ‘হাতিবাড়ি অরণ্যের’ মাঝে।
গ্রামছাড়া রাঙামাটির পথ পেরিয়ে প্রাকৃতিক শাল-পিয়ালের অরণ্যের মাঝখান দিয়ে, পটে আঁকা ছবির মত শান্ত স্নিগ্ধ বয়ে চলা সুবর্ণরেখা নদীর সাথে লুকোচুরি খেলার স্থানটির নামই হলো 'হাতিবাড়ি অরণ্য'। লাল বালির পাড় বেয়ে নেমে শান্ত স্থির সুবর্ণরেখার বুকে, অস্তগামী সুর্যকে সাক্ষী করে পানসীতে খানিকটা ভেসে বেড়াবার সুখের মত নৈসর্গিক সুখ কমই আছে বাংলার ভূমিতে। অবশেষে সুর্য যখন গাছপালার মাঝে অস্ত যাবে- আমাদের বাসও রওনা দেবে তখন।
সন্ধ্যায় ফিরে হাতমুখ ধুয়েই গরম কফির সাথে বেগুনী বা বিউলি ডালের বড়া দিয়ে নৈশভোজের ফিতে কাটা হবে। মহুলের জঙ্গল থেকে যখন হিম পড়ার আওয়াজ আসবে টিপিটুপটাপ করে, দূর হতে রেলগাড়ির হুইসেল ছাড়া কেবল মাত্র রাতচড়া পাখী আর ঝিঁঝিঁ পোকাদের কলতান শোনা যাবে তখনই আমাদের ‘ক্যাম্পফায়ার’ শুরু হবে। স্তূপীকৃত শুকনো কাঠের আগুনের ‘ওম’ নিতে নিতে, ‘ইয়েল’ এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া আড্ডা, গান, খুনশুটির ছলে নিজেদের মাঝের বন্ধনকে মজবুত করে নেওয়ার পালা। সাথে থাকবে ঢালাও চিকেন পকোড়া আর উষ্ণ কফি। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে আগামীকালের জন্য প্রাণকে সতেজ রাখার তরে ক্যাম্পফায়ারের মত নির্মল চিত্তবিনোদনের কোনো বিকল্প নেই।
রাত্রি একটু গভীর হলে ডাইনিং হল থেকে ডাক আসবে পাচকের, জামবাটি ভরে উঠবে দিশি মুরগি কিম্বা হাঁসের মাংসের ঝোলে। আপনি যদি চালের আটার রুটি বিলাসী হন, তাহলে তো কথাই নেই, এদিন সেই ব্যবস্থাই থাকবে, আর নিতান্তই যদি ভেতো বাঙালী হন তাহলে গরম ভাত আর যাচ্ছে কোথায়, হাতে বেলা আটার রুটির সাথে সেও থাকবেই পাতে- যদি আপনি তা একান্তই বলে রাখেন আগে ভাগে। এর পর আর কী, ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়া…
৩১শে জানুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এই দিনটি আমাদের বাৎসরিক চড়ুইভাতির দিন। যদি কোনো বন্ধু কেবলমাত্র এই দিনেই অংশগ্রহন করে চলে যেতে চান, তেমনটাও করতে পারেন।
এদিনও সকালটাও শুরু হবে গত দিনের মতই চা/কফি বিস্কুট দিয়ে। তার পরেই আমরা তৈরি হয়ে রওনা দেব গিধনি থেকে ৩২ কিমি দূরে বেলপাহাড়ি ব্লকের জঙ্গলঘেরা ‘আমলাশোল’ গ্রামে। হ্যাঁ, ২০০৪ সালের সেই আমলাশোল, যে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল। এখানেই রয়েছে ‘খাড়ারানী সরোবর’, এবড়োখেবড়ো মেঠো আলপথ বেয়ে, এর বাড়ির উঠোন- তার বাড়ির গোয়ালের ছাঁচতলা দিয়ে পৌঁছাতে হবে এই সরবরের তীরে। তারপর?
আর কী, পরিস্কার ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশ, সবুজ জঙ্গলময় টিলায় ঘেরা নীল জলের বিশাল জলাধার, যা মূলত বৃষ্টির জলে পুষ্ট। স্বচ্ছ, টলটলে সরোবরে একটি বাঁধ রয়েছে, বাঁধের লকগেট খুলে জল সরবরাহ হয় আশেপাশের গ্রামগুলিতে। বাঁধের উপরের সরু কংক্রিটের রাস্তার ওপারে যতদূর চোখ যায় শুধুই জঙ্গলে ঢাকা। নীলাকাশের নীচে সবুজ অনুচ্চ পাহাড়ে ঘেরা টলটলে কালো জলের বিশাল জলাধারের দৃশ্য এক কথায় অতুলনীয়।
দৃশ্য সুখের অপ্রার্থিব সুখ পুরোটা ঠিকমতো আত্মস্ত করার আগেই হালুইকর হাজির করবে গরম ফুলকো রাধাবল্লভি আর চানা মশালা, সাথে থাকবে ডিমসিদ্ধ আর সন্দেশের টুকরো। দ্রিমিদ্রিমি মাদলের তালের মত বয়ে চলা বাতাসের খেলে বেড়ানো- খঞ্জনা, শামুকখোল, দেশী বক, শ্যামসুন্দর, পানকৌড়ি, বেনে বৌ, মাছরাঙা বা কিম্ভূত ভাবে উড়তে থাকা সায়োলোরের খেলা দেখতে দেখতে বুঝে উঠার আগেই বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাবে যদি না কেউ ডেকে দেয় আপনাকে। এখানে কিছু পাখী নাচে, কিছু পাখী গায়, কেউ শান্ত তো কেউ চঞ্চল, কেউ ওৎ পেতে থাকে আবার কেউ স্বশব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দেবে চড়কি কেটে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন