১. হিন্দুত্ববাদের তাত্ত্বিক পটভূমি রচনার কৃতিত্ব বিনায়ক দামোদর সাভারকারের উপরই বর্তায়। তার ‘হিন্দুত্ব’ নামের বইটিই আজকের হিন্দুত্ববাদীদের কাছে একমাত্র ‘ধর্মগ্রন্থ’।
২. সাভারকার ছিলেন অন্ধভাবে মুসলিম ও খ্রীষ্টান বিরোধী। ‘ভারতীয়ত্ব ও হিন্দুত্ব’ সমার্থক- এই বাক্যটিকে মন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘হিন্দুত্ব’ নামের বইটির অবদানই সাভারকরকে ইতিহাসের আস্তাকুর থেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
৩. গান্ধীর অহিংসা নীতি ও নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক উদারমনস্কতার তিনি আজীবন বিরোধিতা করেছেন সাভারকর। ভারতভাগের প্রথম প্রবক্তা ‘হিন্দু মহাসভার’ মাধ্যমে নিজে যুক্ত থেকে- কৌশলে জাতীয় কংগ্রেসের ঘাড়ে দায় চাপিয়েছে দেশভাগের। একবিংশ শতকের ভারতে এই ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি রাজনৈতিকভাবে অতি প্রয়োজনীয়।
৪. কংগ্রেসের কাছে যেখানে শতশত দেশপ্রেমিক বিপ্লবী, সেখানে স্বাধীনতার সময়ে একমাত্র জেলখাটা কেউ যে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী ছিল তিনি সাভারকর, তাই তাকে নিয়ে RSS ‘নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল’ তত্ত্ব প্রভার করে দেশপ্রেমিকের নতুন সংজ্ঞায়ন করেছে।
৫. হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুত্ববাদকে এক ঘটিতে ভরে- ‘মুসলিম এবং খৃষ্টানদের’ বাদ দিয়ে বৃহত্তর হিন্দুস্তানী সমাজ গড়ে তুলতে পারলেই একমাত্র ক্ষমতা দখল করা সম্ভব- এটা ছিল তার ভাবনা। অযোগ্যদের ক্ষমতায়নের সোজা পথ যে ধর্ম, সেটা সাভারকর দেখিয়েছিল। আধুনিক ভারতে ধর্মের জিগির তুলে রাজনৈতিক ক্ষমতাদখলের প্রাণভোমরা সাভারকারের তত্ত্বেই নিহিত রয়েছে।
৬. আন্দামান সেলুলার জেলে বারবার বৃটিশের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা এবং শেষে মুক্তি – তার যুক্তি হিসাবে ভক্তেরা বলে- সাভারকর ছত্রপতি শিবাজির বিপ্লবীধারার অনুসারী ছিলেন, সেই পটভূমিতেই ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করে যার প্রমাণাদি নেই- কেবলই বিশ্বাস আছে। শিবাজি ১৬৬৬ সালে আগ্রায় কৌশলে আওরঙ্গজেবের বন্দীশিবির থেকে পালিয়ে যান; তার সাযুজ্য রয়েছে ১৯১০ সালে সাভারকারের ব্রিটিশ জাহাজ এসএস মোরিয়া থেকে সমুদ্রে ঝাঁপানো এবং ফরাসী বন্দর মার্সাই-এর কাছে ধরা পড়ার সঙ্গে। সাভারকরকে যখন ভারতে আনা হয়েছিল তখনও তিনি ব্রিটিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
শিবাজী তাঁর বন্দীদশাকালে আওরঙ্গজেবের কাছে চারটি ক্ষেত্রে ক্ষমা চেয়েছিলেন। চারটি ক্ষমার ভিত্তিতে মোগল এবং শিবাজির মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। এবং ছত্রপতি শিবাজী কূটনৈতিক এবং সামরিক কৌশলের অংশ হিসাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন বলে নিজেই পরে এই চুক্তিগুলির মধ্যে তিনটি ভেঙেছিলেন।
সাভারকার হিন্দু পরিচয়, হিন্দু সংহতি এবং হিন্দু ঐক্যের উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি মৌর্য, গুপ্ত, চোল, মারাঠা প্রভৃতি হিন্দু নেতাদের প্রতিমূর্তি পুনর্নিমাণ করেছিলেন। সাভারকারের মতে, এঁরা এবং আরও অনেক রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক যেমন পুরু, পৃথ্বীরাজ চৌহান, রানা প্রতাপ, শিবাজী, মহারাণী লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ, যাঁরা বিদেশী হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের কাহিনীই জনগণকে অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর মতে বৈদিক যুগ থেকে পৃথ্বীরাজ চৌহানের শাসনের শেষ অবধি হিন্দু রাজাদের শাসন ছিল ভারতের হিন্দুদের স্বর্ণযুগ। ১৫৫৭ সালে দিল্লির সুলতানি আমলের সময় থেকে ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত ইসলামিক বিজয়ীদের যুগ, যা ছিল হিন্দুদের অন্ধকার যুগ।
সাভারকর অনুভব করেন যে, ব্রিটিশরা হিন্দুদের পক্ষে অনেক কিছু করতে পারত, কিন্তু তা করেনি। তিনি নিজেও ব্রিটিশদের কাছে হিন্দু সমাজের উন্নতি কল্পে কখনও কোনো প্রস্তাবনা বা চিঠিপত্র দেননি, বরং মাসিক ভাতা নিতেন ব্রিটিশ সরকারের থেকে। সাভারকরের বইতে হিন্দুদের উপর মুসলমান অত্যাচারের গল্প ফাঁদলেও, কীভাবে ৬০০ বছরের মুসলমান শাসনের পরেও মোট জনসংখ্যা ৮৭%ই হিন্দু রয়ে গেছিল তার কোনো ব্যাখ্যার ধারেপাশে যাননি। মুসলমানেদের বিপক্ষে এমন রগরগে কেচ্ছা গল্পের লেখক যে RSS এর নায়ক হবে সেটা বলাই বাহুল্য।
গান্ধী অহিংসার বিষয়ে কথা বলেন এবং সাভারকার হিংসার প্রচারক। এটা সত্য যে গান্ধী মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না, কিন্তু সাভারকার ছিলেন- নতুবা বারে বারে ক্ষমা ভিক্ষা চাইতনা। গান্ধী যেমন কংগ্রেসের পক্ষে অহিংস বীর সাহসী, সাভারকার তেমনি হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষের বীর হতে চেয়েছিলেন- তাই স্বঘোষীতভাবে নিজের নামের সামনে বীর জুড়ে নিয়েছিলেন। মনে রাখতে হবে, গডসেকে দিয়ে এই সাভারকরেরাই গান্ধীহত্যার মত নিকৃষ্ট বর্বর ষড়যন্ত্র রচনা করেছিল, গডসে সাভারকারের শিষ্য ছিলেন। গডসে যে আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করছিল, গান্ধীহত্যার জন্য প্রশিক্ষিত জঙ্গি ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল আজকের তালিবান বা IS দের মত, সেই আদর্শ সাভারকর দ্বারা পরিচালিত ছিল। সাভারকরের সেই মতাদর্শগত লড়াই আজও চালাচ্ছে সঙ্ঘপরিবার ও তাদের রাজনৈতিক দল BJP।
গান্ধী দ্বারা প্রচারিত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ দেশকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল, আর সাভারকারের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ছিল ধ্বংসাত্মক উস্কানিমূলক, বিভাজনের রাজনীতির জন্মদাতা। গান্ধীর জাতীয়তাবাদ অহিংস, ফলতঃ ‘ইনক্লুসিভ’। সাভারকারের জাতীয়তাবাদ উত্তেজক ও বিপজ্জনক, ‘এক্সক্লুসিভ’। সেই জাতীয়তাবাদে জীবনের কোনও সম্মান নেই। হেডগেওয়ার, গোলওয়ারকার মোহন ভাগবত থেকে শুরু করে, বাজপেয়ী, আদবানী অমিত শাহ পর্যন্ত এই বিভাজনের রাজনীতির প্রচারক। এই জাতীয়তাবাদের শিকড় এই দেশে নেই, এটি আমদানিকৃত। জার্মানিতে এই জাতীয়তার শিকড় রয়েছে এবং ইতালিতে মুসোলিনি দ্বারা প্রভাবিত, যা বিরোধী শক্তিকে চূর্ণ করার কথা বলে।
সাভারকার ও গান্ধীর প্রতিতুলনা সাম্প্রতিক সময় আসতে বাধ্য, নইলে বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয় না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মৃদু ও সাত্ত্বিক মুখভাবের পরিবর্তে আমরা দেখতে পাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রগলভ ও রাজসিক মুখ, অনন্ত মিথ্যার অধিকারী এক রাজেনেতা যার সবটাই ফাঁপানো। ‘শ্রী অনন্তমূর্তি’ যিনি সাভারকারের হিন্দুত্ব আর গান্ধীর হিন্দু স্বরাজের তুলনা করেছেন খোলাখুলিভাবে- তিনি আবার মোদীকে সাভারকরের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে বর্ননা করেছেন। মোদী দ্বারা চালিত দেশ আসলে ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবদমিত লোভের বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচনের সময় এই মুখটি মিডিয়ার প্রিয় হয়ে ওঠে, তাই হাজার হাজার ভক্ত মোদীকে মুখোশ জেনেও উদ্বেল হন। সমগ্র মানব ইতিহাসে মানুষ বিজয়ীর বিজয়কে অনিবার্য হিসাবে গ্রহণ করেছে। এই গ্রহণযোগ্যতা আত্মতুষ্টির মধ্যে থেকেই জন্মগ্রহণ করে, একটি আরামদায়ক জীবনের নিশ্চয়তার জন্ম দেয়।
মনে রাখতে হবে গডসের পুরুষত্ব বা নিজেকে বিজয়ী প্রমাণ করার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। গডসে প্রথমে তার হাত জোড় করে প্রণাম করে এবং তারপরে জাতির পিতাকে – এক উন্মুক্ত বক্ষের বৃদ্ধকে – গুলি করেছিল। গান্ধীর পুলিশ সুরক্ষাটুকুও ছিল না। চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতাকামী ঠাণ্ডা মাথায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি গডসের এই পদক্ষেপ ছিল- আজকের মোদীয় রাষ্ট্র গঠনের যজ্ঞে উৎসর্গীকৃত নৈবেদ্য। আর এই যজ্ঞের মন্ত্র ছিল সাভারকার আদর্শ। গণতান্ত্রিক ভারতে, আমাদের সকলের মধ্যে সুপ্ত এই শীতল নৃশংস অনুভূতিই পবিত্র গঙ্গায় আরতি উৎসর্গ করার সময় মোদী এবং ভক্তদের মধ্যে প্রকাশ পায়।
মূল লেখাঃ পার্থ প্রতিম মৈত্র।সম্পাদনা ও সংযোজনাঃ হককথন
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন