#রবিবাসরীয়
একটা হলিউডি টাইম ট্রাভেল সিনেমা দেখেছেন! ১৯৮৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটির নাম ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’। সিনেমাটির প্রেক্ষাপট হচ্ছে একটি শীতকাল, যাকে ‘যুগান্তকারী শীত’ নামে উল্লেখ করা হয়েছিল কাহিনীতে। সেই সিনেমাতে দেখানো হয়েছিল এক মহা ধনকুবের ভিলেনের অনুগামীদের সশস্ত্র বাইক বাহিনীর দাপট ক্যাপিটাল বিল্ডিং এলাকায় চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। যারা সিনেমাটা দেখেছেন তারা জানেন, ভিলেনের অবয়বের সাথে ট্রাম্পের কী আশ্চর্য মিল, ট্রাম্পের মত সেই ভিলেনেরও একটা ক্যাসিনো ছিল। সিনেমাটিতে একটা বাড়ি দেখানো হয়েছিল ‘হোম অফ টুমোরো’ নামে, প্রসঙ্গত ট্রামের বাড়ির সাইনবোর্ডেও সেই বাক্যই হুবহু লেখা আছে, যা IKEA নামের আসবাবের ব্যান্ড তাদের ট্যাগলাইন হিসাবে ব্যবহার শুরু করে পরবর্তীতে। সিনেমার জনপ্রিয় সংলাপ ছিল ‘এনাফ ইজ এনাফ’, কাকতালীয়ভাবে বর্তমান আমেরিকা প্রেসিডেন্ট বাইডেন থেকে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ওবামা- সকলেই ‘এনাফ ইজ এনাফ’ মন্ত্র জপে গেছে ভোট প্রচার কাল ও তদপরবর্তী সময়ে।
আমাদের এই ‘টু ডাইমেনশনাল’ লজিকের পৃথিবীতে যেটা দেখছি বা জানছি- সেটাই একমাত্র ধ্রুব সত্য নয়; এর বাইরেই অধিকাংশটাই অজানা রয়ে যায়, জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে সেগুলোর কিছুকে যদি ছুঁয়ে আসা যায়, দেখা যাবে পাশের সামান্য জিনিসটি অসামান্য হয়ে উঠেছে। আমরা যারা ইলুমিনাতি, ফ্রি ম্যাসনারি বা গুপ্ত সংগঠনের বিষয়ে চর্চা করি, যারা ১৩ রয়্যাল ব্ল্যাডলাইন নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা করেছি, যারা One world Order তত্ত্ব নিয়ে নিয়মিত খবরাখবর রাখি শখের বসে, তারা জানি ও মানি যে- কোনো কিছুই কাকতালীয় হয়না, সবটাই ‘প্রোগ্রাম’ করা আছে। যারা জানেননা তারা এই অনুচ্ছেদটি দায়িত্ব নিয়ে উপেক্ষা করুন, নতুব বহু পড়তে হবে।
গত পরশু অর্থাৎ ২০ই জানুয়ারি ২০২১ তারিখে বাইডেন মন্ত্রীসভা শপথ নিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে। সেই বাইডেন, যার প্রত্যক্ষ যাজকতায় আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেই যুদ্ধবাজের ঘরেই এখন যুদ্ধ ঢুকেছে। ট্রাম্প ছিল মুখে মার পালোয়ান, মুখেই তম্বি করে গেছে, যুদ্ধ করেনি একটাও। বাইডেন কিন্তু যুদ্ধ বাঁধাবে তুরস্কে, যদি তার পূর্ণ প্রেসিডেন্সিয়াল মেয়াদকাল উত্তীর্ণ করতে পারে- তবেই।
গত ৬ই জানুয়ারি ট্রাম্প ভক্তদের রক্তক্ষয়ী আক্রমণের দরুন এমনিতেই সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন প্রশাসনের ভিত টলিয়ে দিয়েছে। সেই কারনেই মার্কিন ইতিহাসে নজিরবীহিন ভাবে প্রথমবারের জন্য নিশ্ছিদ্র সামরিক নিরাপত্তার ঘেরাটোপে তাদের নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের অভিষেক হলো মসনদে। বিদেশী হানাদার বা জঙ্গি গোষ্ঠীর নামে নির্বিচারে মানুষ খুন করা মার্কিন রাষ্ট্রনেতারা- নিজ দেশেরই উন্মাদ ও গোঁড়া ধার্মিক গোষ্ঠীর ভয়ে সুড়ঙ্গে লুকিয়েছিল। এমনই কিছু একটা যে ঘটতে চলেছে তা গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০২০তে বেশ কয়েকটা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলাম এই ফেসবুকেই। এমনিতেই উস্কানিমূলক মন্তব্যের জেরে ন্যাক্কারজনকভাবে ট্রাম্পকে সাসপেন্ড করে দিয়েছিল টুইটার বা ফেসবুকের মত জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রের ‘গদিতে আসীন’ প্রেসিডেন্টকে এইভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাটা এককথায় স্বপ্নাতীত ছিল কিছুদিন আগেও, আজ সম্ভব- এটাই চুম্বকে আভ্যন্তরীণ মার্কিন রাজনৈতিক চালচিত্র।
ওয়াসিংটন ডিসিতে ২৫ হাজার ন্যাশানাল গার্ড মোতায়েন করে সম্পন্ন করা হয়েছে এই ‘ঐতিহাসিক’ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। গত ১০ দিন ধরে লাগাতার সশস্ত্র টহলদারি করছে সাঁজোয়া গাড়ি সহযোগে, যেন আমেরিকা নয়- উপদ্রুত সিরিয়ান কোনো অঞ্চল। ক্যাপিটাল বিল্ডিং এর ৬ কিলোমিটারের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থকদের ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল অলিখিত কমান্ডে, পাশাপাশি সড়কে ও বসত বাড়িগুলোতেও ছিল চিরুনি তল্লাশি- পাছে ট্রাম্প সমর্থকেরা লুকিয়ে না থাকে সেখানে। গোটা হোয়াইট হাউজের বাউন্ডারিতে ৩ ফুট দূরত্বে মেসিনগানধারী মার্কিন সেনারা রণসাজে সজ্জিত হয়ে প্রহরা দিচ্ছে- এ দৃশ্য তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি অত্যাচারিত জনগণের মুখে হাসি ফুটিয়েছে বৈকি। আজ রক্তচোষক যুদ্ধবাজের ঘরে যুদ্ধ ঢুকেছে।
‘ভার্জিনিয়া সিটিজেন ডিফেন্স লিগ’ নামের একটা রক্ষনশীল প্রোটেস্ট্যান্ট ট্রাম্পভক্ত সংগঠনের নেতৃত্বে- ওয়াসিংটন ডিসির পাশের রাজ্য ভার্জিনিয়াতে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কমপক্ষে ১৫ হাজার সদস্য জড়ো করেছিল হোয়াইট হাউস দখলের লক্ষ্যে। ওহিয়ো অঙ্গ রাজ্য থেকে ওয়াসিংটন পর্যন্ত বিপুল সমাবেশ করেছে ট্রাম্পের সমর্থকেরা, প্রতিটি ক্ষেত্রে রীতিমত অস্ত্রপ্রদর্শনীর মিছিল করেছে ন্যাশানাল গার্ডদের নিরাপত্তায়। নির্বাচন পরবর্তী এমন সশস্ত্র মহড়া আমেরিকার ইতিহাসে ইতিপূর্বে কখনও ঘটেনি। এদের উপরে রাজ্য পুলিস গুলোর সেভাবে নিয়ন্ত্রণ নেই, কারন এদের উপরে হামলা হলেই তা ‘ধর্মের উপরে হামলা’ বলে উস্কানি দিয়ে সমাজে আগুন লাগিয়ে দেবে; বস্তুত এরা এটাই চাইছে যে পুলিস প্রশাসন এদের উপরে হামলা করুক- তাহলেই অরাজকতা শুরু।
এই গোঁড়া সংগঠনগুলোর সমন্বয় মঞ্চ গত ১৮/০১/২১ তারিখ প্রকাশ্য সমাবেশের মঞ্চ থেকে অস্ত্র মহড়া সহ একগুচ্ছ কর্মসূচীর আগাম ঘোষণা দিয়েছে, যা সমমতাদর্শী ৩৭টা গণসংগঠন সমন্বয়মঞ্চের পাশে থাকার সম্মতি দিয়ে রেখেছে। অন্য আরেকটি শহর ‘রিচমণ্ড হিল’ এলাকাতেও প্রায় ২ হাজার সশস্ত্র ট্রাম্প সমর্থকেরা বিশাল বাইক মিছিল করে প্রাশসনের বুকের উপরে তান্ডব চালিয়েছে। ট্রাম্প সমর্থকদের কাবুতে রাখার জন্য ১৯টি রাজ্যে আরো ৪৭ হাজার সেনা নামিয়েছিল বাইডেন প্রশাসন, বেশি কিছু শহরে আংশিক কার্ফু জারি করে রাখা হয়েছিল। ট্রাম্প নিজে তার সকল অনুগামীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছে, তার নৈতিক সমর্থন ও সহানুভূতি রআছে বিক্ষোভকারীদের প্রতি। এই ছিল সামগ্রিক পরিস্থিতি।
ট্রাম্প সেভাবে বাইডেনের উপর মন্তব্য করেনি গদি ছাড়ার আগে, কিন্তু কমলা হ্যারিসকে নিয়ে তার মন্তব্য হচ্ছে অত্যন্ত রহস্যজনক। তার ভাষ্যমতে- “এই মহিলা অত্যন্ত ধুরন্ধর, একে কখনোই আগামীতে প্রেসিডেন্ট হতে দেওয়া যাবেনা। এর উপরে কঠোরভাবে নজর রাখা আমাদের জাতীয় কর্তব্য”। বিদায়ী ভাষণে ট্রাম্প দৃশ্যত পরাজয় স্বীকার না করে দৃঢ়তার সাথে বলেছে- “আবার ফিরে আসব”; যা মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল ইতিহাসে প্রথম কেউ এমন বলেছে প্রকাশ্যে। এটা যে ভোটে জিতেই আসার কথা বলেছেন- তেমন কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা, কারন ট্রাম্প মানেই আবেগ আর নিয়ম ভাঙার মিছিল, স্বভাবতই অশান্তির আশঙ্কা জিইয়ে রেখে এই আপত বিদায়ের পালা সাঙ্গ হলেও রণেভঙ্গ পড়েনি।
কিছু কন্সপিরেশি থিয়োরিস্টদের দাবী, এক শ্রেণীর ‘এ্যান্টি-ক্যাথোলিক’ গোঁড়া প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানদের মতে- আমেরিকার ৪০০ বছরের দাসত্বের মুক্তি ঘটেছে। ১৬১৯ সালে ২০ বন্দী নিয়ে একটি জাহাজ ভার্জিনিয়ার পয়েন্ট কমফোর্টে পৌঁছে আমেরিকার মাটিতে ‘দাসত্ব’ যুগের যাত্রা শুরু করেছিল। প্রাচীন ব্যাবিলনীয় পৌরাণিক কেচ্ছা কাহিনী মোতাবেক- ৪০০ বছরের শেষে এই দাসেরাই নাকি ‘সাদাদের’ উপরে রাজত্ব করবে- ২০১৯শে সেই ৪০০ বছর শেষ হয়েছে। প্রসঙ্গত, কমলা হ্যারিসকে সেই আফ্রিকান দাসেদেরই প্রতিভূ হিসাবে দেখছে এই প্রটেস্ট্যান্ট বাহিনী। গোঁড়া প্রটোস্ট্যান্টরা ইস্টার ডে’তে ডিমের প্রদর্শনী করে- দেবী আইসিসের উদ্দেশ্যে নৈবদ্য সাজিয়ে। ব্যাবিলনীয় পুরাণের রাজা নিমরোদ বা নমরুদের স্ত্রী আইসিসেরই অপর নাম ইস্তার, তার নামেই দিনটি নামেই পালিত হয়- যিনি উর্বরতার ও পুনরোজ্জীবনের প্রতীক ছিলেন। এ সবই ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী প্রটেস্টান্ট খ্রীষ্টীয় বিশ্বাস, ক্যাথোলিকদের মত এরা নিউ টেষ্টামেন্টকে মানেনা। এখানেই শেষ নয়, প্রটেস্ট্যান্টরা ২৫শে ডিসেম্বর ‘সান’ গডেরও উপাসনা করে, যা প্রাচীন ব্যাবিলনীয় দেবতা। মোদ্দাকথা ৪৯% প্রটেস্ট্যান্ট আমেরিকান- প্রাচীন ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয় সভ্যতার সময়কার একটা ‘ককটেল’ ধর্মবিশ্বাসের উপরে ভিত্তি করেই ১৬% ‘সংখ্যালঘু’ ক্যাথোলিকদের ভয়ঙ্কর শত্রু হিসাবে মনে করে।
এই সব নানা হিসাব নিকেশের মাঝে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হচ্ছে ক্যাথোলিক বাইডেনও না ক্যাথোলিক কেনেডির মত ‘বিক্ষুব্ধ’ নামধারী কিম্বা ‘ট্রাম্প সমর্থকের’ ছদ্মবেশে গোঁড়া প্রোটোস্ট্যান্ট দলের হাতে পরিকল্পিত খুনের শিকার হয়ে যায়। ভঙ্গুর গণতন্ত্র, বিপর্যস্ত অর্থনীতি, বিভ্রান্তিমূলক পররাষ্ট্র নীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ধস, বেকারত্ব ও অভিবাসন সমস্যা ছাপিয়েও আমেরিকার সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরির নাম বর্ণবাদ সমস্যা। এই মুহূর্তে বাইডেন ৭৮, শারীরিক বা মানসিক ভাবে যদি অক্ষম হয়ে যায় কিংবা দুর্ঘটনায় বয়স জনিত অসুখের দরুনও মৃত্যু ঘটে- স্বাভাবিকভাবে প্রেসিডেন্ট হবে কমলা হ্যারিস। রুজভেল্টের মৃত্যুর পর হ্যারি ট্রুম্যানও এভাবেই ক্ষমতা পেয়েছিল। ট্রাম্প কী এই কারনেই হ্যারিসের উপরে বিশেষ নজর রাখার কথা বলেছেন?
সুতরাং আগামীর আমেরিকা ভয়ঙ্কর এক গৃহযুদ্ধের দিয়ে এগোচ্ছে যার পরিণতি হিসাবে বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা, ডলারের পতন, ব্যাঙ্কিং দুরবস্থা, ইলেকট্রিক্যাল ব্ল্যাক আউট, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পরিসেবা সাময়িক স্তব্ধতা, শিল্প সঙ্কট, শেয়ার বাজার ধস, নতুন ভাইরাস মহামারী, কৃত্রিম ভূমিকম্প, সুনামি, মিশরের পিরামিড ধ্বংস থেকে কী কী যে ঘটবেনা সেটাই বলা দুস্কর। মার্চ ২০২১ পরবর্তী সময় থেকেই এই অশুভ সময়ের মূল পালাগান শুরু হবে হয়ত, যার ট্রেলার ছিল গত ৬ই জানুয়ারি। সমসাময়িক ঘটনা পরম্পরা ও ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করে- এ সবই আসলে অনুমান ভিত্তিক সম্ভাবনা মাত্র; আসল সত্যটা কেবল ভবিষ্যতই বলতে পারবে।
কিন্তু, এসবে লাভ কার হবে?
একমদ্বিতীয় ইজরায়েল। ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ অশান্তি মানেই তা থেকে ইজরায়েল ভরপুর মুনাফা কামিয়েছে। সদ্যনিযুক্ত মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনেই ‘জেরুজালেম একমাত্র ইহুদিদের’ ঘোষণার পরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির পারদ উচ্চ গ্রামে চড়তে শুরু করে দিয়েছে। পিতাকে হত্যা বা গুম করে ক্ষমতা দখলের পরম্পরা তো ইতিহাসে ভুড়িভুড়ি, ইজরায়েলও তো আমেরিকারই বরপুত্র। আমি ভাবনার সুতো খুলে দিলাম মাত্র, বাকিটা জেনে নেওয়ার দায় আপনার- যদি আগ্রহ থাকে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন