শুক্রবার, ২ মে, ২০২৫

বঙ্গে গাঁজা

 


 ১) “ডলার এবং মেমসায়েবের লোভে সুকণ্ঠ ভেকধারী বাউলরা ক্রমে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। বাউল-ফকিররা গাঁজা খান। বাউলদের গাঁজা যৌনাচার হিপি ঐতিহ্যের স্মারক। অতএব ওই পথের পথিক মেমসায়েব বাউলের সঙ্গ ধরবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই

সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, দৈনিক আজকাল, ৩০শে মে, ২০০৪; সুধীর চক্রবর্তীর বই নানা মনের চোখে, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, পৃ ১১৪

২) বিদ্যাসাগর জিজ্ঞাসা করলেন, "কি হারান, শুনলাম তুমি নাকি কাশীবাসী হয়েছ? গাঁজা খেতে শিখেছ কি?” হারানবাবু উত্তর দেন, "কাশীবাসী হওয়ার সঙ্গে গাঁজা খাওয়ার কি সম্পর্ক' বুঝতে পারলাম না।" বিদ্যাসাগর বলেন, "এত সহজ ও সোজা সম্পর্ক'টা বুঝতে পারলে না? জান তো, লোকের বিশ্বাস কাশীতে যাঁর মৃত্যু হয় তিনি সাক্ষাৎ শিব হন। শিব হলেন পাঁড় গাঁজাখোর। কাশীতে মৃত্যুর পর যখন শিব হবে তখন তোমাকেও তো গাঁজা খেতে হবে। তাই বলছিলাম, মৃত্যুর আগেই যদি একটু প্র্যাকটিস করে রাখতে, তা হলে শিব হওয়ার সুবিধে হত

কেদারনাথ ভট্টাচার্য, প্রবন্ধ: শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনন্য পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিস্যাসাগর, 'বঙ্গীয় নবজাগরণের অগ্রপথিক' বইয়ে সংকলিত, পৃ ১৭৪, নবপত্র প্রকাশন, ১৯৫৯, কলকাতা

৩) ৩০ নং পদে প্রধান প্রধান হিন্দু সমাজের সম্প্রদায়গুলির বৈশিষ্ট্যসহ পরিচয় পাওয়া যায়। বৈষ্ণবেরা বিষ্ণুরূপ ধ্যান করত, মালা-তিলক ব্যবহার করত। শাক্ত করত শক্তির সাধনা। পঞ্চতত্ত্বজ্ঞানী পঞ্চোপাসনা করতেন। সপ্তপন্থী ব্যাখ্যা করতেন সপ্তরূপ। আগম-নিগমের উল্লেখ আছে গানে; আছে জটা, লোহার ত্রিশূল, গাঁজা প্রভৃতি ব্যবহারকারী শৈব, শাক্ত সাধুদের ছবি। অনেকে গাঁজা খেয়ে "ব্যোম কালী" ধ্বনি দিতেন। মদ খেয়েও মাতাল হতো অনেকে। নানারকম মালা, মড়ার মাথার খুলি, হাড় ও হাড়ের মালা এরা ব্যবহার করত।

শক্তিনাথ ঝা, ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল ও শিল্প, পৃ ২৫৮, সংবাদ প্রকাশ, কলকাতা, ১৯৯৫

৪) গাঁজা খাওয়ার ব্যাপারে আমাদের সরকার মনে হয় নমনীয়। মাজার মানেই গোল হয়ে গাঁজা খাওয়া। লালনের গান শুনতে কুষ্টিয়ায় লালন শাহর মাজারে গিয়েছিলাম। গাঁজার উৎকট গন্ধে প্রাণ বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। এর মধ্যে একজন এসে পরম বিনয়ের সঙ্গে আমার হাতে দিয়ে বলল, 'স্যার, খেয়ে দেখেন। আসল জিনিস। ভেজাল নাই।' সিগারেটের তামাক ফেলে গাঁজা ভরে এই আসল জিনিস বানানো হয়েছে।

হুমায়ুন আহমেদ, হিজিবিজি, প্রবন্ধ: নিষিদ্ধ গাছ, পৃ ৬৫, প্রিন্ট: ২০১৩ 

৫) তবে গাঁজা মহালের প্রজাদের সঙ্গে মিশে আমার একটা শিক্ষা হয়েছিল। ওরা হাতে কলমে শিখেছিল কেমন করে গণতন্ত্র চালাতে হয়, সমাজতন্ত্রের জন্যে এগিয়ে থাকতে হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামে গ্রামে সমবায় পদ্ধতিতে চাষবাস প্রবর্তন করতে যান। এর জন্যে ভিত পাতা হয়েছিল পঞ্চাশ বছর আগে নওগাঁয়। এখন তার কী অবস্থা জানিনে। কারণ গাঁজা যারা কিনত তারা প্রধানত হিন্দু ও তাদের বাস প্রধানত আজকের দিনের ভারতে। বাংলাদেশ এখন তার গাঁজার বাজার হারিয়েছে। খান সাহেব মোহাম্মদ আফজল লিখেছেন বর্তমানে গাঁজা চাষ ১০০ বিঘা জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আগেকার সীমা ছিল ৯০০০ একর।

অন্নদাশংকর রায়, যুক্তবঙ্গের স্মৃতি, পৃ ১১, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা

৬) অভীষ্ট বস্তুর অনুসন্ধানে অভয়াচরণ সতের বৎসর পাহাড়-পর্বত পরিভ্রমণ করিলেন। বহু সাধু সন্ন্যাসীর সঙ্গে তাঁহার ( অভয় ব্রহ্মচারীর ) সাক্ষাৎ হইল। গঞ্জিকা-সেবন তাঁহার সাধন-ভজনের সহায়ক মনে করিয়া, তিনি ইহা অভ্যাস করিয়াছিলেন। সতের বৎসর পর তিনি পুনরায় ময়মনসিংহে ফিরিয়া আসিয়া নেত্রকোণা মহকুমায় মালনী গ্রামে একটি আশ্রম স্থাপন করিলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁহার আশ্রমটির সংবাদ চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল, এবং তিনি "অভয় ব্রহ্মচারী" নামে অভিহিত হইলেন। নানা শ্রেণীর বহু লোক তাঁহার শিষ্য ও ভক্ত হইতে লাগিল।

শ্রী রমেশ চন্দ্র সরকার বি. এ. বি. টি. ; গ্রন্থ: বারদীর শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, পৃষ্ঠা নং ৯৯; প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী, কলিকাতা-১২; প্রকাশ: ১৮৯০ সাল

৭) অভয়াচরণ প্রায় প্রতি মুহূর্তেই গাঁজা খেতেন। কিন্তু শিব চতুর্দশীর দিন জীবন্ত শিবের দর্শন পাবেন বলে গাঁজার পিপাসা অতি কষ্টে দমন করে আছেন। অভয়াচরণ আশ্রমে আসার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্যামী বাবা লোকনাথ তাঁর গাঁজার পিপাসা মেটান তাতে অভয়াচরণের মনে হয়েছিল, বাবার কৃপা অবশ্যই তিনি লাভ করবেন। কিন্তু তিনি যখন বাবার কৃপা প্রার্থনা করেন, তখন বাবা তাঁকে বলেন, তুই নিজেই ত ব্রহ্মচারী। আমার কাছে কৃপা প্রার্থনা করছিস কেন?

পরমপুরুষ শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী, পৃষ্ঠা নং ১৬৫

৮) শ্রীযুত তারাকিশোর চৌধুরী মহাশয়ের একবার খুব জ্বর হয়। তখন তিনি কলিকাতার "হাইকোর্টে" ওকালতি করেন। তাঁহার মনে হইল, শ্রীযুত বাবাজী মহারাজ গাঁজা খান, তাঁহাকে গাঁজা ভোগ দিয়া যদি সেই প্রসাদ পান, তাহা হইলে তাঁহার জ্বর ছাড়িয়া যাইবে। এই মনে করিয়া তিনি শ্রীযুত বাবাজী মহারাজকে গাঁজা ভোগ দিলেন এবং নিজে সেই গাঁজা খাইলেন। গাঁজা খাওয়া তাঁহার কখনও অভ্যাস ছিল না; কিন্তু সেই প্রসাদী গাঁজা যথেষ্ট পরিমাণ খাওয়া সত্ত্বেও তাঁহার কিছুই হইল না, জ্বর ছাড়িয়া গেল

কয়েক মাস পরে তিনি বৃন্দাবনে যান। তাঁহার সেখানে থাকিবার সময় শেষ হইলে তিনি কলিকাতায় ফিরিবার দিন স্থির করিলেন। রওয়ানা হইবার কিছু সময় পূর্ব্বে শ্রীযুত বাবাজী মহারাজ গাঁজার কল্কি হাতে দিয়া বলিলেন-"এ প্রসাদী গাঁজা, তুমি খাও।” সেখানে কয়েকজন ব্রজবাসী বসিয়াছিল, এত সময় শ্রীযুত বাবাজী মহারাজ তাঁহাদের সঙ্গেই গাঁজা খাইতেছিলেন। তন্মধ্যে একজন জিজ্ঞাসা করিল -"বাবু কি গাঁজা খান?" শ্রীযুত বাবাজী মহারাজ-“না, বাবু গাঁজা খান না বটে; তবে জ্বর হ'লে আমাকে ভোগ দিয়ে প্রসাদ পান।” ভাবিয়া দেখ, প্রকৃত সদ্গুরুর শক্তি কি অসীম!

শিশিরকুমার সাহা, কাঠিয়া বাবা, (শ্রীযুক্ত রামদাস কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের জীবনী), পৃ ৮২-৮৩, প্রিন্ট ১৯৩০, কলকাতা

৯) ওরশের সময়ে এখানে হিন্দুয়ানী কায়দায় মেলা বসে। মেলায় নারী-পুরুষ সকলেই আসে। গান-বাজনা, মদ-গাঁজা, জুয়ার আড্ডা কিছুই বাদ যায় না। এখানকার খাদেমরা বেশরাহ ফকির। এদের ইংগিতে এখানে অনেক বেশরাহ কার্যকলাপ চলে। হযরত শাহজালালের নামে লেখা বহু গান প্রচলিত আছে। মারেফতী গান গাইলে সওয়াব মিলে, এমন একটা ধারণা অজ্ঞ মুসলমানদের মধ্যে এখনও রয়েছে। তাই নারী-পুরুষে সমস্বরে মারেফতী গান গায়। এ-রকম একটি গান:-

'তুমি রহমতের নদীয়া

দয়া করো মোরে হযরত

শাহজালাল আউলিয়া।'

এই গান যারা গায়, তারা জানে না যে, রহমত একমাত্র আল্লাহর এক্তিয়ারে।

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান, কিতাব: হযরত শাহজালাল (রহ.), পৃ ৪১, জয় প্রকাশন, ঢাকা, প্রিন্ট: ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

১০) উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলায় কৃষকদের এক আঞ্চলিক ঠাকুর আছেন, যাঁর নাম 'কাণ্ডী'ইনি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে তাঁদের গবাদি পশুসমূহের রক্ষাকর্তা এবং ঐ সমস্ত পশুদের যন্ত্রণাদায়ক রোগের পরিত্রাতারূপে গণ্য হন। এখন এই দেবতাকেও প্রসন্ন করার জন্য গাঁজা দেওয়া হয় এবং যাতে তিনি ধূমপান করতে পারেন তার জন্য হুঁকা এবং ছিলিমও নিবেদন করা হয়।

— 'উত্তরবঙ্গের গ্রাম্য দেবতা-সমূহ': 'হিন্দুস্থান রিভিয়্যু' ফেব্রুয়ারি ১৯২২; পৃ. ১৫৩-৫৪; বাঘ ও সংস্কৃতি, সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত, পৃ ১৬, পুস্তক বিপণি, কলকাতা, প্রিন্ট ১৯৮০

 

১১) সমস্ত বাউল গাঁজা খায় না। বাউলদের একাংশ গাঁজার ভক্ত কিন্তু মদের বিরোধী। সাঁই এবং রাঢ়ের বহু গায়ক মদ্য-মাংসের একনিষ্ঠ সেবক

লালনের গান থেকে তাঁর সময়ের বহু তথ্য ও ইতিহাসের বহু উপাদান সংগ্রহ করা যেতে পারে। সেকালে তামাক, গাঁজা এবং মদ মাদকদ্রব্য হিসাবে সমাজে প্রচলিত ছিল। লালন নিজে গাঁজা খেতেন কি? তাঁর শিষ্য দুদ্দু গাঁজার তীব্র বিরোধী ছিলেন। প্রবাসীতে লালনের রচিত 'হুকার গান' নামে একটি পদ প্রকাশিত হয়েছিল। এ পদটি থেকে মনে হতে পারে যে তিনি 'হুকা' খেতেন।

শক্তিনাথ ঝা, ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল ও শিল্প, পৃ ১৫৭ ও ২৪১, প্রিন্ট: ১৯৯৫, সংবাদ প্রকাশ, কলকাতা

 

১২) হালিশহর কোনা মোড় ছাড়িয়ে বিশালাক্ষ্মী ঘাট পেরোলেই শীতলাতলার সম্মুখে পূর্ণ সাধুর আশ্রম। লোকমুখে তিনি ফক্করবাবা। আশ্রম বলতে গঙ্গার কিনারায় বন-জঙ্গলে ঘেরা খানিকটা পরিত্যক্ত জমি, জমির আসল মালিক শুনেছি শ্যামদাস গুপ্তবাবুরা। পূর্ণ তার উপরে ঘর বেঁধে আছে বহুকাল ধরে জমিটার মাঝ বরাবর। মাথায় চালা ঠ্যাকে। হাত ছয় সাত প্রস্থে দৈর্ঘ্যে ছোট, বারান্দাসহ মাটির দেয়াল দেওয়া ঝুপড়ি ঘরখানিতে পূর্ণ থাকে। উত্তর সীমানায় আর একটু বড় আকারের প্রায় অনুরূপ বেড়া দেওয়া টালির ছাউনি ঘর। ওখানেই থাকেন মহেশ বাবা। সঙ্গে আছেন ওঁর সাধনসঙ্গিনী লীলা মা। নিভৃত নিলয়। পশ্চিমে গা ঘেঁষে গঙ্গা বইছে

বর্ষাকালে সীমানার ভাঙন পেরিয়ে উঠে আগে আসত গঙ্গা। এখন প্রতিরোধ পেয়েছে। সরকারি ওয়াল। এর ধারেই অন্য আর এক মালিকের একখণ্ড জমি। সেখানে ইট বাঁধানো দুর্গামাতার আশ্রমবাড়ি। মূর্তি নেই। ঘটে পুজো হয়। লীলা মা পুজো সারেন। মহেশ বাবার দুর্গামূর্তিতে বিশ্বাস নেই। বললে বলেন, শরীরের ভেতরই দুর্গা রয়েছেন। আলাদা করে আর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করার দরকার কী? মহেশ বাবা তাহেরপুরের বয়সের গাছ-পাথর পেরোনো সাধক দয়াল বাবার শিষ্য। কেউ বলেন, বাবার বয়স একশ বিশ, কেউ বা একশ তিরিশ। আমি গেছি ওঁর ওখানেছিন্নমস্তার উপাসক। বহাল তবিয়তে বেঁচেবর্তে আছেন দিনে একবার গাঁজা সেবা।


সুধাসুন্দরীর কাছ থেকে কোনওমতে পালিয়ে বেঁচেছি আমি। তিনি আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন কথা কিছুদূর এগোতে তাঁর বুকে হাত রাখতে। তাতেই না কি আমি বুঝতে পারব যে, সেখানে কেমন নদী বইছে। তিনি আমাকে এও বলেছিলেন যে, বীর্যধারণ আমাকে তিনি নিজে হাতে শিখিয়ে দেবেন। এতে যার-তার সঙ্গে যখন-তখন শোয়া যাবে। বাচ্চা হওয়ারও ভয় থাকবে না। একসময় তিনি চরম হতাশায় বললেন, 'বিন্দু ধরতে দম লাগে। এ ভৈরব এখন পারেন না। শালার দম নেই। সাধনে আসবেন। সব শেখায়ে দেবো আপনেরে। চলেন পালাই। আশ্রম বানাই।' একবার এক ভৈরব-ভৈরবী দুজনেই আমাকে শেষে বলে বসলেন, 'আপন শক্তিরে এখানে নিয়ে আসবেন। মা আপনার শক্তির দম-শ্বাস শেখাবেন। আমি আপনারে। কত লোকে শিখতে আসে।' বুঝতে আমার একটু অসুবিধে হল না শেখার নামে এখানে শরীর ব্যবসা আসলে চলে রমরমিয়ে। আর এক ভৈরবী আমাকে আরও অবাক করে বলেছিলেন, তাঁদের দেহমিলনের ছবি পর্যন্ত তুলে নিয়ে যায় অনেকে। এ ছবি নাকি ভালো বিক্রি হয়। লোকে দেখেদুখে শেখে। এভাবেই যুগল সাধনায় শরীরী ব্যবসা, নীল ছবির ব্যবসা চলছে রমরম করে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে। অনেক সময় নিজে দেখেছি প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা পর্যন্ত গিয়ে উঠেছেন তান্ত্রিকদের ডেরায়। মদ-গাঁজা-চরসের প্রাপ্য হিস্যা বুঝে নিতে, আবার মেয়েমানুষের লোভে। তন্ত্রসাধনার এও এক দিক। যেদিকে বিন্দুধারণের নামগন্ধে ম ম করছে কামগন্ধ, ব্যভিচার, যৌনবৃত্তি আর চোরাকারবার। তবে তার আলোর দিকটি গ্রীষ্মজীবনের বাইরে নক্ষত্রে নক্ষত্রে আকাশ ঝিকমিক

হালিশহর শাশানঘাটে বসে মূলাধার চক্রের ব্যাখ্যা এভাবেই আমাকে শোনাচ্ছিলেন তান্ত্রিক আলো সাধু। শ্মশানঘাটে মা ছিন্নমস্তার মন্দির বহুদিন ধরে সামলাচ্ছিলেন তিনি। প্রাজ্ঞ মানুষ তিনি। শাস্ত্রজ্ঞ। আমার সঙ্গে অনেকদিনেরই পরিচয়। আমার কৌতুহলকে তিনি মাঝে মাঝেই নিশ্চিহ্ন করতে সহায়ক হয়ে ওঠেন। আসতে বলেন। বিশেষত অমাবস্যায়। নিজে হাতে ভোগ রান্না করে তিনি তিনি প্রতি অমাবশ্যাতে মা-কে দেন। আমাকে বলেন প্রসাদ নেওয়ার জন্য। আমাকে তিনি তন্ত্রের নানা আয়োজন সম্পর্কে মাঝেসাজেই পাঠ দেন। তবে আমি জিজ্ঞাসা করলেই। না হলে তিনি সদাই ভাবমগ্ন। চুপ করে থাকেন। ভক্ত-শিষ্য আসেন। মদ-গাঁজা আনলে জোরাজুরিতে তিনি একটু প্রসাদ করে দেন।

সোমব্রত সরকার, কাপালিক তান্ত্রিক যোগী কথা, পৃ ১৩, ১০৬, ১৭০

১৩) এ গোকুলে শ্যামের প্রেমে কেবা না মজেছে সখি

কারো কথা কেউ বলে না আমি একা হই কলঙ্কী

অনেকে তো প্রেম করে

এমন দশা ঘটে কারে

গঞ্জনা দেয় ঘরে পরে

শ্যামের পদে দিয়ে আঁখি

তলে তলে তল গাঁজা খায়

লোকের কাছে সতী বলায়,

এমন সৎ অনেক পাওয়া যায়

সদর যে হয় সেই পাতকী

অনুরাগী রসিক হ'লে,

সে কি ডরায় কুলশীলে

লালন বেড়ায় কুছি খেলে

ঘোমটা দিয়ে চায় আড়চোখি ॥

লালন সাঁইয়ের গান, পূর্ণদাস বাউল সম্পাদিত, বই: বৃহৎ বাউল সঙ্গীত, পৃ ৫১, প্রিন্ট: জুলাই, ১৯৫৫, কলকাতা; লালন-গীতিকা, মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র সম্পাদিত, ৩৬৪ নং গান, পৃ ২৫০, প্রিন্ট: ১৯৫৮, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত

১৪) বাসার সামনে এলে হারান ফকির আমার আগ্রহ দেখে আরও কয়েকটা গান শোনাল। প্রশ্ন করে জানতে পারলাম- গানগুলো লালন সাঁইজির। ছেউড়িয়া গ্রামে তাঁর আখড়া। এটা শুনবার পর, পরদিন সেখানে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। তখন কেউই লালন ফকির এবং তাঁর গান সম্বন্ধে জানে না। ছেউড়িয়ার বন্ধু ইসমাইল বলল- তাদের গ্রামেই লালনের আখড়া। বললে, -তুই যাসনে। ওরা গাঁজা খায়। মেয়ে ছেলে একসাথে থাকে। সারারাত গান করে। তুই নামাজ পড়িস। ওখানে গেলে তোকে তুকতাক করে ফেলবে।

ড. সুজিতকুমার বিশ্বাস, বাংলার লোক ঐতিহ্যের অধিকারী যতীন্দ্রনাথ রায়, পৃ ৪২, প্লাসেন্টা পাবলিকেশন্স, নদীয়া, কলকাতা বইমেলা ২০২৪

১৫) "গাঁজা খোর গাঁজার মর্ম বুঝে মান্য করে মারে

বাদশা উজির নেশার ঘোরে

যখন গাঁজা খায় নবাবী ভয়পায়-দমে দম লাগায়

নেশায় ইস্তি কোন খোন্ডা দেবে

তালের আঁটি বানিয়ে খোলা বলে ব্রহ্মার কমণ্ডুল

বলে কৃষ্ণের হাতে বাঁশি

ডুমুরের ডাল লয়েছে করে; এক ছিলিম পুরে

চারইয়ারে লক্ষটাকার মজা মারে

নেশাতে হয় বিদগ্ধ, বলে পেলাম ব্রহ্মপদ যেমন ধারা চতুষ্পদ

কলুর ঘানি আছে ঘাড়ে, গাঁজার পাতা ভাসিয়ে জলে

ধূয়া কলের জাহাজ চলে

বসে থাকে নোঙর ফেলে অকূল পাথার সমুদ্দরে

গোঁসাই চরণ-চাঁদে বলেন কুবির, ভবির কথায় ভুলিসনারে"।

কুবির গোঁসাইয়ের রচিত লোকগীতি, 'সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে নদীয়ার গ্রাম' বইয়ে রণজিৎ কুমার বিশ্বাস কর্তৃক উদ্ধৃত, পৃ ১৯৯, ইন্দিরা প্রকাশনী, কলকাতা, ২০০২

 

   -তাহসিন আরাফত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...