শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বন্ধুপ্রীতিঃ পরিণাম
জীবনে সব মানুষেরই কিছুনা
কিছু অপূর্ণতা রয়ে যায়। অনেকের তা নিয়ে আক্ষেপের শেষ থাকেনা যে কেন ‘ওটা’ পেলামনা
বা পারলামনা, এক্ষেত্রে আমার
কোনো আক্ষেপ নেই। বিষয়টা হল শিক্ষকতা। মাসের শেষে ‘সরকারী’ টিচার বা টোলের
পন্ডিতমশাই নয়, পাতি গৃহশিক্ষক
হওয়ার একবার বাসনা জেগেছিল বন্ধুদের দেখে ও অভাবের মরুভূমিতে মরুদ্যানের খোঁজে।
মাধ্যমিকের পর থেকে উপমহাদেশের বহু ছাত্রই চাকুরিজীবী বা পেশাদার হয়ে যাওয়ার আগের
মুহূর্ত পর্যন্ত, ‘হাতখরচার টাকা
তো আসবে’ নূন্যতম এই অজুহাতে ‘প্রাইভেট টিউশনি’ শুরু করে দেয়।
তখন গড়িয়ার মেসে থাকি, সস্তার মেস ও এক বন্ধুর- বন্ধুর দাক্ষিণ্যে
সেখানে উঠেছি। শ্রীনগর রোডে বেশ কিছুটা উত্তরে হেঁটে একটা বাড়ির তেতলায় আমার
নিবাস। ১৮ জনের বাড়ির পাঁচজন ছাত্র, বাকিরা অন্য
পেশার মানুষ। পাঁচ জন ছাত্রের আমি বাদে বাকি চারজনই মাসে দু-আড়াই হাজার টাকা করে
কামাই করে মূল কোলকাতায় টিউশনি পড়িয়ে। ওদিকে আমার তখন সম্বল বলতে প্রাণটুকু, বাকি সবই অন্যের। কিন্তু পরাণটুকু বাঁচাবার
জন্যও খাওয়া দরকার, যার জন্য চাই
টাকা। এই মেসে যার সাথে এসে উঠেছিলাম,
সে
একসাথে অনেকগুলো কোর্স করতো, নাম কুবের।
হুগলীর গুপ্তিপাড়াতে বাড়ি। সে ঠিক আমার বন্ধু ছিলনা, বলা ভাল বন্ধুর রেকমেন্ডেড বন্ধু। আমার বন্ধুটিকে কুবের ‘না’ করতে না পারার
দরুন, আমি তার গলার গাব
হয়েছিলাম। সম্যক জানতাম, একআধ মাসের
বেশি সেখানে টেকা মুশকিল। আমার কিছু পুরাতন বন্ধুরা যাদবপুরে থাকে, কিন্তু সেখানে থাকার রেঁস্তো অনেকটা।
অগত্যা টিউশনির বন্দোবস্ত
করার জন্য স্মরণাপন্ন হলাম যাদবপুরের মেসের সিনিয়র দাদা, বহরমপুরের মানুষ সীতাদার। অমায়িক মানুটি
অঙ্কের ছাত্র, তাও মাস্টার্স
শেষে গবেষণা করছেন। বহুদিন কোলকাতায় থাকার সুবাদে পরিচিত মহল থেকে নিজেদের
বালবাচ্চাদের অঙ্ক শেখাবার জন্য ওনার কাছে মিছিলের মত ছেলেপুলেদের বাবা মায়েরা
আসতো। এনাদের মাঝে মাধ্যমিক থেকে সদ্য ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়া ছেলেপুলের
গার্জেনরাই বেশি। কিছু জন তাদের কিন্ডারগার্ডেনের বাচ্চাদের নামতা শেখানোর আব্দার
নিয়ে আসতো। সীতাদাকে বললাম- “আমাকে তোর ওই কিন্ডারগার্ডেনের এক আধটা সূর্যমুখী
জোগাড় করে দে বাপ, আমার যে আর
চলছেনা। “
সিজনের মাঝেও সীতাদার
কল্যাণে একটা বাড়িতে নিযুক্ত হলাম, তাদের সন্তানকে
পড়ালেখা শেখাতে। প্রথমদিন রীতিমত একটা গোটা রজনীগন্ধার বোতলের প্রায় পাঁচভাগের
একভাগ সারা গায়ে ঢেলেছিলাম, যেটা ক্যানিং
লোকাল থেকে নগদ ১৫ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম,
হকার
বলেছিল ইমপোর্টেড পারফিউম।
তা সে যাই হোক, পৌঁছালাম রাসবিহারী পোস্টঅফিস অঞ্চলের একটা
বহুতলের চতুর্থ তলে, সীতাদার লিখে
দেওয়া ঠিকানা মিলিয়ে। বেশ সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট। ভেবেছিলাম, একটা মিনি সম্বর্ধনা পাবো। ওমা কোথায় কী, বাড়ির পরিচারিকা- ‘আপনি
ক্যা!’ বলে পরিচয় শুধালেন। আমি শিক্ষক পরিচয় দিতে সে
আমোদের সাথে চেঁচিয়ে উঠে অন্তঃপুরের উদ্দেশ্যে- ‘বৌদি, ম্যাস্টোর এয়েচে’ হাঁক
দিতেই আমার যাবতীয় উত্তেজনায় ঠান্ডা জল পড়ে গেল।
একটা হাত পাঁচেক লম্বা
গ্রীল ঘেরা বারান্দা চওড়াতে দুহাত, একটা মানুষ
বসার পর সামান্য কয়েক ইঞ্চি জমি ফাঁকা থাকে। তার
উপরের দিকে অসংখ্য দড়িতে বাড়ির জামা কাপড় শুকাবার স্থান, পিছনে তোলাবাসি জুতো রাখার র্যাক, কিছু পলিথনের গুচ্ছ, ভাঁজ করা কাগজের পেটি, পুরাতন
খবরের কাগজ, একটা বাচ্চাদের সাইকেল, ঝুলঝাড়ন ও ফুলঝাড়ু। পোষা কুত্তার
থালা ও খেলার একটা ছোট কাঠের ব্যাটও দেখলাম ওই জুতোর র্যাকের ফাঁসে রয়েছে।
একটা চট নিয়ে বসতেই, একজন বৃদ্ধ আমার সামনে এসে বসলেন। কী মুশকিল, ইনিই ছাত্রী নাকি,
চোখে কী গন্ডগোল হলো আমার! বুঝলাম ইনি অভিভাবকের অভিভাবক। তিনি
আমার ঠিকুজি কোষ্ঠী নিতে শুরু করলেন,
সন্তুষ্ট
হয়ে ফিরে যেতে এবারে ওনার স্ত্রী এলেন। তিনি অবশ্য কড়াভাবে বলে গেলেন যে, এই বারান্দার বাইরে, ফ্ল্যাটের ভিতরে যেন কখনও না যাই। গ্রাউন্ড
ফ্লোরে পায়খানা বাথরুম আছে ওটাই যেন ব্যবহার করি ইত্যাদি। সেদিন থেকে আজ, একটা জিনিস যেটা আমি উপলব্ধি করেছি- অন্ত্যজ
শ্রেনীদের সাথে খাওয়া শোয়া সব করা গেলেও হাগার স্থান শেয়ার করা যায়না, এটাই অলিখিত নিয়ম। খেয়াল করবেন, বাড়ির কাজের লোকেরা সকল সময়েই আলাদা টয়লেটেই
যায়।
অতঃপর সেই ভদ্রলোক এলেন, যার ঠিকানাতে এসেছি। বেটেখাটো হলেও ফর্সা ও
সুপুরুষ। ইনিই আমার ছাত্র/ছাত্রীর বাবা। প্রথমে তিনি নিজের পরিচয় দিলেন, পেশা কর্পোরেশনের স্বীকৃত কন্ট্রাক্টার। তিনি
এও বললেন যে ওনার মা একটু শুচিবায়গ্রস্থ,
তাই
বাইরের লোকের বাড়িতে আসা নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট; আমি যেন ওনার কোনো কথাতে কিছু মনে না করি ও বারান্দার পেরিয়ে কখনও ঘরে না
ঢুকি। বলে সীতাদার বলে দেওয়া কথা মতো আমাকে এক মাসের অগ্রিম ৪০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে
অন্তঃপুরে বিলীন হলেন।
খানিক পরে একজন এলোমেলো
রকমের মোটা, চাপা গাত্রবর্ণের কুতকুতে
চোখবিশিষ্ট ভদ্রমহিলা, ঠিক ওনারই একটা
মিনি ভার্সনকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে হাজির করলেন। আমার বয়স একুশ, সেই ‘বাল গনপতির’ পাঁচ, কিন্তু আমাদের দুজনেরই কবজি সমান। চর্বি যদি
আলাদা করে মাপার সিস্টেম থাকতো, নির্ঘাত ওইটুকু
বিটলের শরীরে আমার দ্বিগুন পরিমাণে চর্বি ছিল। দুঁদে দারোগা যেমন দাগী আসামীকে
দেখে, সে মাল এসেই আমাকে ওইভাবে
দেখতে লাগলো। আমি নিজেকে যতটা কোমল স্বভাব করা যায়, ততটা আদর করে ডেকে পড়তে বসালাম।
আধা ঘন্টা সব ঠিকঠাক ছিল, এবারে ছড়া পড়ানোর পালা। আমি শুরু করলাম –
‘পাঁচ পেয়ালি প্যাঁচার মা, কচি কাঁচা
পাঁচটা ছা’।
- কাকু কাকু পেঁচা কী?
- এক ধরনের পাখি বাবা
- আমি দেখবো
- সে তো রাত্রে দেখা যায়
- না আমি এখনই দেখবো
অচিরেই সাইলেন্ট আবহাওয়াকে
বদলে দিয়ে আমার ছাত্র ভায়োলেন্ট হয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই ছোট্ট ব্যাট
দিয়ে আমার উপরে দুমাদুম প্রহার শুরু হয়ে গেল। পরের ছেলে, তার উপরে ছাত্র, তাই প্রথমটা সয়ে
যাচ্ছিলাম। আমি যত কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম,
তার
কাঠের ব্যাটের বর্ষণ তত তরান্বিত
হচ্ছিল।
অগত্যা প্রাণ নিয়ে সোজা অন্তঃপুরে, কারণ সদরে
তালা। আর যায় কোথায়, সেই বুড়িকে যেন
ফুটন্ত তেলে কেউ ছেড়ে দিয়েছে, এমন চিল চিৎকার
শুরু করে দিল। ছাত্রের মা মহিলাটি এসে ছেলেকে বাগে আনতে, আমি বারান্দার সেই এক চিলতে স্থানে খানিকটা দম
নিতেই মূর্তিমান বজরঙ্গবলি ফের হাজির। ব্যাট চালানোটা সে এটা একটা খেলা পেয়েছে।
আমিও রেডি এবারে, এলেই কষে কান
মুলে দেব ব্যাটা নচ্ছারের। আমাকে ব্যাটানো শুরু করার সাথে সাথেই তার মা এসে হাজির, আমার কানমোলা প্রোগ্রাম স্থগিত হলেও ব্যাটানো
চলতেই থাকলো।
মাঠে খেলার সময় ফুটবলের ডিফেন্ডারদের অত্যাচারে আমার সিনবোন তখন রোমের কলোজিয়ামের মত ভঙ্গুর, ওর উপর পলকা ব্যাটের বাড়িই আত্মারাম খাঁচা করে
দিচ্ছিল। অগত্যা ওই মোটা মহিলার পিছনে লুকাবার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। উৎফুল্লিত
মহিলা ছেলেকে আটকাবার নূন্যতম চেষ্টা না করে চরম হাসিতে ফেটে পড়লো, ছেলের খেলা দেখতে দেখতে বলতে থাকলেন- “ও একটু
এমনই, রেগে গেলে মারু
মারু করে”। এক আধটা ব্যাট এবারে মহিলার গায়েও লাগছিল। তবে ওই ১২ ইঞ্চি চর্বির
স্তর ভেদ করে মর্মস্থলে ব্যথা-বেদনা কীভাবে পৌঁছাবে সেই অঙ্ক না কষে ভাবলাম, না পালালে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছাড়া
কোনো গতি নেই, সেখানেও
ইঞ্জেকশনের বিভীষিকা।
প্রাণভয়ে চিৎকার করে বললাম, ‘হিসি করবো’। ওষুধে কাজ হলো। বৃদ্ধা
ততোধিক চিল চিৎকার করে নির্দেশ দিল- “সুলতা সদরের তালা
খুলে দে, নাহলে অচ্ছুতটা
স্নানঘরে ঢুকে পড়বে”। সুলতা দরজার তালা খুলতেই, প্রায় উড়ে গিয়ে মেন রাস্তায় পৌঁছে, খেয়াল হলো পায়ে জুতো নেই। নিকুচি করেছে জুতোর।
পকেটে তখনও ওই বিষ বাচ্চার বাপের দেওয়া ৪০০ টাকা।
একবার ওটা ফেরত দেবার সতীত্ব মাথায় এসেছিল বটে, কিন্তু ঐ ক্যালানির দাম অন্তত ৪ হাজার টাকা হওয়া উচিত ভেবে ও পথে পা মাড়াইনি আর। “তোকে নিয়ে চারজন হল, ওখানে আর যেতে হবে না”। এবারে বুঝলাম কেন সীতাদা এডভান্স বেতন নিতে বলেছিল। সিনবোন টনটন করে উঠলো সীতাদার আঙুলের চাপে, বললো- “যা শালা দু প্লেট বিরিয়ানি নিয়ে আয়, একটা শান্ত শিষ্ট মেয়ে সন্তানের খোঁজ করছি”। পাক্কা তিন সপ্তাহ লেগেছিল সেই ব্যাথা সারতে। পরে আরো দু’দুবার চেষ্টা করেছিলাম শিক্ষক হওয়ার, একবার ৯ দিন, অন্যটি ১৭ দিনের মাথায় শেষ হয়ে আমার শিক্ষক জীবনের অকাল রিটায়ারমেন্টে পার্মানেন্ট সিলমোহর মেরে দিয়েছিল।
(২)
মেস জীবনের শেষ লগ্নটা ছিল
আমার কাছে অনেকটা ঊনিশ শতকের জমিদারদের মতো। শুয়ে-বসে-খেয়ে টাকা রোজগার হতো তখন।
‘জগৎগৌড়ি ভাতের হোটেলে’ আমারই মতো নিয়মিত এক মাসকাবারে খরিদ্দারের সাথে সখ্যতাটা
দিনে দিনে, নিজ নিজ জীবনের
ব্যথা-বেদনা শেয়ার করার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তিনি ছিলেন কোলকাতা পুলিসের রিজার্ভ
ফোর্সে কর্মরত, বেতন ও ডিউটি
দুটোই পাতে দেওয়ার মতো ছিলনা। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী, বাড়ির এক ভাড়াটের সাথে ভাগলভা হওয়ার দরুণ, ভাড়াটেদের উপর থেকে বিশ্বাসই উবে গেছিল ওনার।
বাড়ির দোতলার একটা অংশ ও
নীচ তলাটা ওনার ভাগে ছিল। তেতলাটা ও বাকি দোতলাটা ছোট ভাইয়ের অংশ, বৃদ্ধা মা ছোটোর কাছেই থাকতো। সিঁড়ি সেপারেট
ছিল। আমার ছিল পয়সার প্রয়োজন, যেটা জন্ম দিত
নানান তিলে খচ্চড় মার্কা হিরফুতি বুদ্ধি,
আর
ওই পুলিস দাদার ছিল বাড়ি। এর পর যেটা হয়েছিল,
বহু
আলাপ আলোচনার পর মেস খুলে ফেলেছিলাম। দাদাকে মাসিক একটা থোক টাকা, ফ্রিতে দুবেলা ঘরের খাবার ও মন চাইলেই রাত্রে
টিভিতে ‘ভক্তিমূলক’ সিনেমা দেখার দেদার ফুর্তির বিনিময়ে। নিজের ঘরে টিভি থাকলেও
‘ঐসব’ ক্যাসেট কে এনে দেবে? বয়স্ক মানুষ
তাই লজ্জা লাগতো লোকালের দোকানে ক্যাসেট চাইতে। খরচাও একটা ব্যাপার ছিল বৈকি, সুতরাং আমার কপাল খুলে গেল।
তিনটি ঘর ও একটি
বারান্দাতে, মোট ১২ জনের থাকার
ব্যবস্থা হলো। কিচেন ও কমন টয়লেট। কেন আমাদের মেসে ছেলেপুলে আসবে! এর জবাবে- দাদার
থেকেই সুলভে কিছু নগদ ধার নিয়ে একটা সিডি সমেত টিভি সেট, ও সেকেন্ড হ্যান্ড একটা ফ্রিজ কেনা হলো।
ঠান্ডা জল, ফূর্তির দিনে ঠান্ডা দারু
আর ফি ছুটির দিন রাত্রে- সমবেত ‘নিঃশব্দ’ সিনেমা দেখতে পাওয়ার সুখ। ১২ জনের কোটা
ভর্তি হতে গুণে গুণে মাত্র ২৫ দিন লেগেছিল। এর পর ওয়েটিং এ চছিলো আরো কমপক্ষে ১ ডজন। খাইয়ে দাইয়ে ও নিজে থেকে খেয়ে, মাসে ৩-৪ হাজার টাকা থাকত হেসেখেলে। আমি ও দাদা দুজনেই খুশি।
শুভঙ্কর এ্যনিমেশন নিয়ে
পড়তো, অয়ন অঙ্কে অনার্স, প্রদীপ বাঁকুড়ার ছেলে আমার সহপাঠী, পার্থ নদীয়ার বেথুয়াডহরীর, সকলেই জয়েন্টে কোচিং নিত। বাকি সীতাদা, পরিতোষ,
বাবাই, শীর্ষেন্দু প্রমুখেরা থাকতো। পারিবারিক ও
ব্যক্তিগত অশান্তির জন্য আমার একবছর গ্যাপ হয়ে গেছিল ইতিমধ্যে, তাছাড়া মেসের ব্যাবসার জন্য বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, আমি ডে কলেজ থেকে নাইট কলেজে সিফট হওয়ার মতো
অসাধ্য সাধন করেছিলাম। সারাদিন অফুরন্ত সময়,
শখের
বশে নানা ধরনের আগামীর পেশা ট্রাই করছি। একটা সিরিয়াস প্রেম, সদ্য তার নটেগাছটি মুড়িয়েছে, তাই প্রেমের বাসনা ছিলনা। পড়াশোনা আর
ঘোরাঘুরি।
এরই মাঝে শুনলাম শুভঙ্কর
এক মহিলার প্রেমে পড়েছে। দুজনেই দমদম মতিঝিল কলেজে সাইন্স পাশকোর্সে পড়ে। মেয়েটি
নাকি দারুণ দেখতে, দোষের মধ্যে
বয়সটা একটু বেশি। শুধাতে শুভঙ্কর বললো- “ওই ২৩-২৪ হবে আর কী”! শুভঙ্কর তখন সবে ১৯ ছুঁয়েছে। পিছন থেকে টিপ্পনি কেটে সমীরণ দা বললেন-
“প্রেমে পড়ার আগে মেপেছিলি না পরে? পরে হলে এগোস না, নির্ঘাত ও তোর মাসির বয়সী, প্রেমের কানা চোখে কোনো দোষই ধরা পড়ে
না”।
এরপর সে বেশ কিছুদিন আর
উচ্চবাচ্য করেনি, কিন্তু
মাসখানেক যেতে না যেতেই ওর রাঙা প্রেমের রস চোঁয়াতে শুরু করলো। ছুতোনাতায় সারাক্ষণ শুধুই মল্লিকার
গল্প, গুণগুণ করে গান গাইছে, নাচছে। পার্থ আমাকে দাদা বলতো, সে বললো- ওর কিছু একটা করো গুরু, পুরো হাবুডুবু খাচ্ছে, এবারে পাশ করলে হয়! মেসের প্রত্যেকেই কোনো না
কোনো পরিচিতের লিঙ্ক ধরে এসেছে, তাই পারিবারিক
হিষ্ট্রি নেওয়ার চল ছিলনা। শুভঙ্করের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল, কিন্তু এবারে সব ঠিকুজি কোষ্ঠী চাইতেই হলো।
তাতে যা জানা গেল, ওদের বেশ
সম্পন্ন পরিবার। মা স্কুল টিচার, গ্রামে বিস্তর
জমিজামাও আছে, বাবা চাষাবাদ
করে। সে সবেধন নীলমণি, তাই ও যা করবে, বাড়িতে সেটাই নাকি মেনে নেবে। এটার মৌখিক
সম্মতি নাকি তার রয়েছে।
দিনে দিন সেই মেয়ে নিয়ে ওর
পাগলামি বেড়েই চললো, বললো ওকে না
পেলে নাকি আর সে বাঁচবেই না। আমরা এড়িয়ে গেলেও, বাড়িওয়ালা
দাদার তখন নতুন সাথী হয়েছে সে। বাড়িওয়ালা দাদার স্ত্রী বিরহ এই শেষ যৌবনে ছোকছুকানিতে পৌঁছেছে। শুভঙ্করের পড়াশোনা শিকেয় উঠেছিল তাতে আমাদের সমস্যা ছিলনা, কিন্তু যখন নাওয়া খাওয়া লাটে উঠার যোগাড় তখন
আমাদের টনক নড়লো।
বাড়িওয়ালা দাদা আমাদের
অনেক সিনিয়র, ৫০ ছুঁইছুঁই
হলেও নিজেকে আমাদের সমবয়সীই মনে করতেন। ওনার সাথে আমরা চার পাঁচ জন সিনিয়র ‘হনু’
রামটেবিল বৈঠকের শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে, কলেজে গিয়ে মেয়েটিকে দেখে আসা ও তার সম্বন্ধে যতবেশি সম্ভব তথ্য যোগাড় করা।
যথারীতি বাবাই, প্রদীপ ও দাদা
নিজে দেখতে গেলেন। ফিরে, দুজন
বিপরীতধর্মী মন্তব্য করল। বাঁকুড়ার প্রদীপ ট্রেডমার্ক স্থানীয় ভাষাতে বলল, সে নাকি নায়িকাদের মতো দেখতে! যদিও পৃথিবীর সকল
মেয়েমানুষকেই সে ঈশ্বরের অপূর্ব সৃষ্টি বলে মনে করতো। বাবাই অনেকটা বাস্তববাদী, বললো- মোটেই সুন্দর নয় ও বয়স্কা।
এদিকে মতিঝিল কলেজ থেকে
ফেরা ইস্তক, দাদা সব ভুলে শুধু তার
পালিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে নিয়ে বিলাপ শুরু করে দিল। মল্লিকাকে দেখে নাকি সাধনার কথা
মনে পড়ে গেছে ওনার, যথারীতি ২২ বছর
আগের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা চাগার দিয়ে উঠেছে। আমরা ওনার ওষুধ জানতাম, হালকা মাল খাইয়ে একটু ওই ভক্তিমূলক সিনেমার
প্রদর্শনী, ব্যাস। চাঙ্গা হয়ে যাবেন।
ইউনিভার্সিটির ৪ নং গেটের পাশের একটা গুমটিতে ‘ছবি হবে, কথা হবেনা’ সিনেমার ক্যাসেট পাওয়া যেত, দৈনিক ৭ টাকা ভাড়া টাকা হিসাবে। ৩০ টাকায়
কনসেশন করে ৫টা দিত। তাতে করে মাঝরাত্রে আসর শুরু হলে, সকলে ক্লান্ত ও ভোর এক সাথে হয়ে যেত।
আমরা অঙ্কের নিয়মে
সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম, শুভঙ্কর ও
প্রদীপ দুজনের মতে সুন্দরী। দাদার নিজের বৌয়ের কথা মনে পড়েছে, অতএব আগে যাওয়া যাক। গোল বাঁধলো এর পরে, যখন শুধালাম- মেয়েটির সাথে কী কী কথা হলো, তার সম্বন্ধে বাদবাকি তথ্য কই? প্রদীপ বাবাই দুজনেই আমতা আমতা করে সিলিঙের
ঝুলের কারুকার্য দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে গেল। জোরালো কয়েকটা খিস্তির পর, শুভঙ্কর বিষয়টা ক্লিয়ার করলো। মল্লিকার সাথে
শুধু হান্ডশেক করেই ওরা বিরিয়ানি ট্রিট চেয়েছিল, সেটা খেয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত মল্লিকা কলেজ ছেড়ে চলে গেছিল। তে’এঁটের
দল; তেড়ে খিস্তি দিয়েই বা লাভ
কি এখন, আবার কে যাবে
দেখা করতে। তখন কি আর জানতাম, তথ্যের অভাব
আমাদের কপালে কী পরিমাণ শনি সাজিয়ে রেখেছিল! উফ...
আগামী আরো মাস খানিক ওই
একই কীর্তন চললো। দাদাও বিলাপ করেন, বাঁয়া শুভঙ্কর।
নিপাতনের শুরুটা হলো এই ভাবে, দাদা শুভঙ্করের
কথায় বাড় খেয়ে মালের ঘোরে শপথ নিয়ে ফেললো- যে করেই হোক শুভঙ্করের সাথে সাধনা মানে
ওনার বৌয়ের মত দেখতে মেয়েটির মিলন ঘটিয়েই ছাড়বে। প্রয়োজনে মেয়েটিকে তুলে এনে বিয়ে
দেবে, ভদ্রসন্তানের এক কথা।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ, এক রাত্রে ঠিক হলো সেই মেয়েকে তুলে আনতে হবে।
আমাদের সকলেই নিমরাজি থাকলেও, আমার মেস ব্যাবসা বাঁচাতে ও সিনেমা-পানাহারের
যতেচ্ছ সুখের বাড়ি বজায় রাখতে দাদার কথায় রাজি হয়ে যেতেই হলো। ভাবলাম, সাথে তো শুধু যাওয়া, যা করার দাদা আর শুভঙ্কর করুক। বিপদ দেখলে সময় বুঝে পিঠটান দেওয়া
যাবে। এর সাথে ছিল দাদার অভয়বাণী- “আহ,
তোরা
না সদ্য যুবক। তোদের বয়সে আমার রক্তে বারুদ জ্বলতো, নকশাল করতাম....” ইত্যাদি ইত্যাদি। “তাছাড়া এটা ভুলছিস কেন, আমিও কিন্তু পুলিস।” এই শেষের লাইনটাতে বেশি
ভরষা পেয়েছিলাম।
যথারীতি প্ল্যান প্রোগ্রাম
সব ঠিক হয়েও বার তিনেক, দিনের দিন
ভেস্তে যাওয়ার পর গান্ধী জয়ন্তীর দিন যাওয়া ঠিক হলো। আমরা ৭ জন মিলে যাবো এমনটাই
নির্ধারিত ছিল। দাদার পেট খারাপ ও অয়ন সময় মতো এসে না পৌঁছানোর দরুণ আমরা ৫ জনই
রওনা দিলাম। ঝমঝম করে সেদিন সমানে বৃষ্টি,
ঢাকুরিয়া
স্টেশনে জল জমে ট্রেন স্তব্ধ, হেঁটেই চলে
এলাম শেয়ালদা লাইন বরাবর আরো অনেক যাত্রীর সাথে। সেখান থেকে বারাসাত লাইনের দুর্গানগর ষ্টেশন। বিশ্বনাথ মন্দির এলাকাতে মল্লিকাদের বাড়ি, উত্তেজিত শুভঙ্কর পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো।
সদ্য যৌবনের উচ্ছ্বাসে
ভাসছি আমরা, মানে আমি, পার্থ,
প্রদীপ
আর বাবাই চারজনেই তখন অকুতোভয়, বন্ধুর জন্য
নিবেদিত প্রাণ। নির্ভিক উদ্দীপনাতে লোহা চিবিয়ে হজম করে নেবো এমন প্রত্যয়। যথারীতি
বাড়ির সামনে পৌঁছালাম, এবারে কেমন যেন
আমাদের একটু আশঙ্কা হলো। একটা বাড়ি থেকে তাদের মেয়েকে কিডন্যাপ করতে এসেছি, অজানা একটা বিপদাশঙ্কার বলয়ে ঢেকে যেতে
লাগলাম। পাড়ার মাঝখানে বাড়ি, সঠিক ভাবে
প্ল্যানমতো পালাতে না পারলে প্রহারেণ ধনঞ্জয় করে ছাড়বে।
পরিচারিকা শ্রেনীর এক
মহিলা দরজা খুলতে ভিতরে ঢুকে এলাম। একতলা,
কিন্তু
অনেকটা জায়গা নিয়ে বাড়িটা। মধ্যিখানে খোলা উঠোনকে রেখে তার চারি ভিতে ঘরগুলো।
খানিকক্ষণ পর একজন টাকমাথা, পুরু গোঁফ
বিশিষ্ট বেঁটে মত গাঁট্টাগোট্টা মানুষ এসে বললেন- কী চাই? শুভঙ্কর কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই লম্বু বাবাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, ইউনিয়ন রুমে বক্তৃতার ঢঙে শুরু করলো- “আমরা
আসলে মল্লিকার ক্লাসমেট, ওর সাথে
গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা ছিল। ওকে একটু ডেকে নিয়ে আসুন কাকু, আপনাকে বললে সমস্যা মিটবেনা।” ভদ্রলোককে দেখে
মনে হচ্ছিল ভিতরে ভিতরে তিনি ফুঁসছেন,
শুধালেন-
“শুভঙ্কর কার নাম?” শুভঙ্কর কিছু
বলে ওঠার আগেই প্রদীপ আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখালো – ‘ও’, শুভঙ্কর আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। গৃহস্বামী
বুঝলো আমিই শুভঙ্কর। তিনি ক্ষনিকের জন্য ভিতরে চলে গেলেন।
বাড়ির ভিতর ও পড়শি
মহিলারাদের কৌতূহলের শেষ নেই, উঁকিঝুঁকি
মারছে এদিক ওদিক থেকে। বাবাই বললো- “এটা ওর বাবা।” শুভঙ্কর বললো- “মনে হয়, আমি দেখিনি আগে।” এতক্ষণে একজন মুস্কো মতন লোক
ওদের চারজনকে ভিতরে ডেকে নিয়ে গেল। আমি মনে ভাবছি মল্লিকা বাবাকে রাজি করিয়ে
ফেলেছে বোধহয়, তাই ওদের আলাদা
খাতির, আমার আলাদা জলোযোগ
পানাহারের ব্যবস্থা প্রদীপের ভুল ইশারাতে। ভালমন্দ খাওয়া হবে ভেবেই মনটা
প্রশান্তিতে ছেয়ে রইলো, সাথে বন্ধুকে
সাহায্য করতে পারার সুখ -আহা! খানিক পর সেই বাবা ভদ্রলোক সহ আরো চারজন সটান ঘরে
ঢুকে খিল দিয়ে শুরু করলো বেদম মার। সাথে খিস্তির গোটা অভিধান মন্ত্রের মতো পড়ে
যেতে লাগলো। গন্ডগোল কিছু হতে পারে শুরুতেই আন্দাজ করেছিলাম, কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত এমন ধোলাই শুরু
হয়ে যাবে ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।
ভদ্রলোকের কথার সাথে তাল
রেখে, “আমি প্রাণপণ চিল্লিয়ে বলে
যাচ্ছি আমি আপনার স্ত্রীকে চিনিনা। এই দেখুন কলেজের আইকার্ড, আমার নাম শুভঙ্কর নয়।” যত বেশি বলি তত বেশী
মার, লাথি চড় ঘুসির বৃষ্টি আসে।
ওনারা যতক্ষণে হাঁফালেন ততক্ষণে আমি কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই, মুস্কোদের একজন বললো- “স্যার ছেড়ে দিন, মরে যেতে পারে।” ক্রুদ্ধ ভদ্রলোক তখনও বলে
চলেছে- “গুলি করে মেরে দেব, সব কটাকে। আগে
এটাকে তারপর ওই মহিলাটিকে। “
ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালের
ওয়ার্ডে যখন নিজেকে আবিষ্কার করি, নার্সকে শুধাতে জানালো আমি
পুলিসের ভ্যানে করে এখানে এসে পৌঁছেছি, খানিক পর বাকি চারজনেরও সন্ধান মিললো সেই ওয়ার্ডেই। সবচেয়ে বেশি ঠ্যাঙানি
খেয়েছে প্রদীপ, হামানদিস্তায়
আদা ছেঁচা করেছে। যদিও এক্স-রে র রিপোর্ট সেটাকে প্রত্যাখ্যান করে বাবাই এর পক্ষ
নিল, ওর গোটা তিনেক হাড়ে
ফ্রাকচার। সকলেরই সারা গায়ে কালশিটের চাকাচাকা দাগ, চোখের নীচে পুরু কালি। তারপর প্রায় দেড় দিন বেঘোরে জ্বরযাত্রা শেষে তৃতীয়
দিন সকালে ছুটি পেলাম সকলে। একটা হলুদ ট্যাক্সি করে মেসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, সমগ্র পথ জুড়ে আশ্চর্য নীরবতা।
ফিরে আসতে দাদা ভীষণ
উৎকণ্ঠিত ও যারপরনাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে শুধালো- “কোথায় ছিলি এ তিনদিন, কোনো খোঁজখবর টুকু নেই। আর এ দশা কী করে হলো? এক্সিডেন্ট হয়েছিল নাকি?” প্রদীপ হাউমাউ করে কঁকিয়ে বললো- “হারামি বুড়ো তোমারও আমাদের সাথে থাকা
দরকার ছিল।” আমি বললাম- “তোমরা কলেজে গিয়ে বিরিয়ানি খেয়েছিলে, ধোলাই খেলাম আমরা।”
দাদা বললেন- “আরে, আরে হয়েছে কী সেটা বলবি তো?” পার্থ আমাদের মাঝে সবচেয়ে ছোটো, সে কেঁদে বললো- “আমি কিছু জানিনা। আমরা চারজনে
ভিতরে গিয়ে মাঝবয়সি ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়াতে প্রদীপদা বললেন, শুভঙ্কর মল্লিকাকে ভালোবাসে, পাক্কা সাড়ে তিনমাসের ‘রিয়েল’ প্রেম। আপনাকে
আজ কথা দিতে হবে আপনি মল্লিকাকে শুভঙ্করের হাতে তুলে দেবেন, নতুবা আমরা ওকে তুলে নিয়ে যাবো। এর পর
কোত্থেকে যেন কয়েকটা লোক ডান্ডা নিয়ে এসে আমাদের আলাদা আলাদা ঘরে বেঁধে, গরুর মত মেরে অজ্ঞান করে দিল।” আমি বুঝলাম, এরাও সত্যটা জানে না।
শুভঙ্কর এতক্ষণ চুপ
মেরেছিল, সে বললো- “আমি কিন্তু এর
শেষ দেখে ছাড়বো।” দাদাও ওর সাথে সাথ লাগাচ্ছিলেন, কিন্তু আমি শুভঙ্করের উপরে ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো গলা টিপে ধরার চেষ্টা করতে
সকলে মিলে আমাকে নিরস্ত্র করলো। রাগত স্বরেই বললাম- “হ্যাঁরে চার অক্ষরের বোকা।
প্রেম মারিয়েছো, ভিক্টোরিয়া
গেছো, নলবনের ঘাসের আড়ালে
মুচুমুচু করেছো- সবটা না জেনেই?”
বাবাই বললো, “সবটা জানার আগে আবার কী! লোকের মেয়েকে তুলতে
গেলে এমন হতেই পারে, তবে চরম শিক্ষা
হয়েছে আর নয়।” বাকিরাও হাঁ হাঁ কর ওকে সাপোর্ট করলো। এবার আমার মাথা ঠোকার পালা।
এতো মার খেয়েও ব্যাটাচ্ছেলেরা কিচ্ছু জানলো না? এ কাদের সাথে বাস করি আমি?
আমি ভীষ্মলোচনের মত
ক্রুদ্ধিত হয়ে চিৎকার করে বললাম- “ওরে হতভাগার দল, তোদের পিটিয়ে মেরে ফেলা উচিত ছিল। পুলিসের বৌ হাইজ্যাক করতে গিয়ে আমরা
গনধোলাই খেয়ে বেঁচে ফিরেছি, এটুকুও খোঁজ
রাখো না। মল্লিকা বুড়োর মেয়ে নয় বউ...”
পিন পড়লে শোনা যাবে, ঘরে এমন নিস্তব্ধতা। আমি বলে চললাম- “আমাদের
সকলকেই পুলিসের টাটাসুমো হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। সেখানেই কনস্টেবলদের মুখে শোনা
কথাগুলো সাজালে এমন হয়ঃ- নকুলদেব মল্লিক পুলিস; মল্লিকার স্বামী। বয়স দাদার চেয়েও বেশি। বাচ্চা হয়নি বলে দ্বিতীয় পক্ষ ঘরে
আনেন। স্ত্রীর নাম সাগরিকা মল্লিক, বর্তমানে ত্রিশোর্ধো। গরীব বাবা চাকুরিজীবী
দোজবেঁড়ের সাথে মেয়ের বিয়ে দিলেও, বয়সে অর্ধেক
সাগরিকা বুড়ো বর মেনে নিতে পারেনি। বিয়ের ৫ বছর পরেও সন্তানাদি না হওয়ায়, সাগরিকার একাকিত্ব দূর করতে আবার কলেজে পাঠায়
পড়াশোনা করতে। কচি শুভঙ্করের প্রেমে পড়ে যায় অতৃপ্ত সাগর, আসল নাম বললে যদি ধরা পরে যায় তাই মল্লিক
পদবীকে মল্লিকা বানিয়ে নেয়। সে নিজেও ওই বুড়োর হাত থেকে হয়তো বাঁচতে চেয়েছিল, সাগরিকা ধোঁকা দিয়েছে নিজের পরিচয় লুকিয়ে।”
এদিকে সদ্য নাভিকুন্তল গজানো শুভঙ্কর,
মল্লিকার
মধ্যে শুধু মেয়েছেলে দেখেছিল, বাকি আর কিছুই
খোঁজেনি।
এবার দৃষ্টি দাদার দিকে, বললাম- “তোমার পরিকল্পনাতেই পুলিসের ঘরে ঢুকে, পুলিশের বউ কিডন্যাপ করতে গিয়ে, বাছা বাছা মুস্কো কনস্টেবলদের হাতে গণপিটুনি
খেয়ে মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছি। তোমারও...”
কথা শেষ হলনা, দাদা বেগতিক বুঝে বললেন- “আমার না পায়খানা
পেয়েছে, আসছি।” বলেই, দোতলাতে অদৃশ্য হওয়ার আগে করুণ বিলাপ কানে
এলো- “সাধনার শোকে উন্মাদ না হয়ে ওদিন,
আমিও
যদি নকুলবাবুর মত, ভাড়াটেটাকে
রামধোলাই দিতাম, আজ আমাকে একা
থাকতে হতো না। “
বাকিরা থ...
