সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

উন্মাদ নামা ~ ১৬

কর্ম বা কার্য হইল জীবনিশক্তির বাহ্যিক প্রয়োগ। স্থবির ব্যাতিরেকে প্রতি প্রানশক্তি বিশিষ্ট বস্তু মাত্রই কিছু না কিছু কর্ম সম্পাদন করিয়া থাকে। তাহা সৎ কর্ম বা অসৎকর্ম উভয়ের সুযোগই সমান। জ্ঞান, মেধা, বিদ্যা, বুদ্ধি, অনুকুল পরিস্থিতি ও যোগ্য পারিপার্শ্বিক সহযোগিতার সঠিক সম্মেলন ঘটিলে কার্য সফলকাল বলিয়া ধার্য হইয়া থাকে।


সফল ব্যাক্তি বলিয়া আসলে দীর্ঘমেয়াদী কোন বন্দ্যবস্ত হইতে পারেনা, কারন 'সাফল্য' বস্তুটি প্রতিস্থাপন যোগ্য ও চুরান্ত আপেক্ষিক।


বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ধারাবাহিকভাবে সফলতার রেখাচিত্র অঙ্কনকৃত ব্যাক্তিকেই সফল ব্যাক্তি হিসাবে মান্য করা হইয়া থাকে।


আত্মপ্রিয় মনুষ্যপ্রজাতি অত্যন্ত তোষামোদপ্রিয়। সেই হেতু সেই ধারা বজায়রাখার নিমিত্ত কিম্বা গতানুগতিক একটা প্রবাহমান ধারার মাঝে রহিবার হেতু পশ্চাদগামী হইবার কোন কারন থাকে না। সুতরাং আত্মতুষ্টি ও অনুভব ক্ষমতার স্বল্পতার কারনেই বহুক্ষেত্রে অনেক কার্যই কাঙ্খিত লক্ষ্যভেদ করিতেতে সক্ষম হয় না, তাহা বলিয়া সেই সকল ব্যাক্তিবর্গের গরিমাও কোন অংশে কম হইতে পারেনা।

রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

***ছেলেবেলা***


*****ছেলেবেলা*****



সেটা নব্বই এর দশকের এক্কেবারে গোড়ার কথা।

বাড়ির অদুরেই ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। বাবার খুড়োতুতো এক বোন, মানে আমার এক পিসির বিবাহ উপলক্ষ্যে। সকলেই কমবেশি শশব্যাস্ত। বাড়িতে লোককুটুমে গমগম করছে। আমাদের সেই বৃটিশ কালের কড়িবরগার উঁচু উঁচু বাড়ি, বিয়ে উপলক্ষে কিছুদিন আগেই জানালা দরজায় আলকাতরার নতুন লেপ পড়েছে। জানালা ফাক গলে ফিনিকি দিয়ে ছিটকে পরা রোদ্দুর, নতুন এলামাটি করা দেওয়ালকে যেন আরো চকচকে করে তুলেছে।

তুতো ও সহোদরা ভাইবোনদের সাথে তখন নিয়মিত কানামাছি, বা কুমির ডাঙ্গা বা বিকালে গোল্লাছুট, হিঙ্গেডারি খেলা লেগেই থাকতো। তখন বাবা কাকারা সবে মাত্র আলাদা হয়েছে, হাঁড়িতে। কিন্তু কড়া-খুন্তির ওই সময় টুকু বাদ দিলে মেজকাকি মায়ের মাথায় প্যারাসুট নারকেল তেল লাগিয়ে দিতে দেখেছি, বা মা, কাকার ১ বছরের কন্যাটির জন্য রসুন পুড়িয়ে কাজললতায় নতুন কাজল পেরে দিতেন। শীতের সময় ঠাকুমা সহ মা কাকিমারা একসাথে আতপ চাল কুটতে যেতেন, একসাথেই পাড়ার ঢেঁকিতে। কাঁথা পাড়তেন, পরনিন্দা পরচর্চাও মন দিয়েই করতেন, একসাথে বসে। মাঝে মাঝেই ঝগড়াও হত, তবে সেটা ওই ২-৩ দিন স্থায়ী হতো, তারপর আবার... যে কে সেই। তাই আমাদের ভাইবোনেদের ভিতরে কখনোই নুন্যতম দুরত্ব ছিলো না।

সাতসকালে সক্কলের আগে ঠকুমাই নিদ্রাভঙ্গ করতেন, একে একে মা কামিমাদের পালা। তার পর বাবা কাকারা। এরপর আমরা ও সর্বশেষে দাদু। অনিদ্রা রোগের কারনে উনি ঘুমাতেনই ভোরের দিকটাতে।

ছোট বেলায় আমার অদ্ভুত অদ্ভুত শখ ছিল। যেমন কাঁচ ভাঙ্গা, ড্রেসিং টেবিল বা খরখরি যা ই বা হোক না কেন। নতুন পর্দা বা বিছানার চাদর কাটা। রাগ হলে, বাবার দাড়িকাটার রেজার দিয়ে পোষ্য মেনি বা ভুলোর লোম চেঁচে দেওয়ার মত বৈপ্লবিক কর্মকান্ডও ছিলো। নিজের হাত পায়েরও লোম চেঁচেছি বহুবার। সন্ধ্যাবেলা যতদিন না জলযোগ করেছি, তার থেকে বেশী প্রহারেনঃ ধনঞ্জয় হয়েছি। একবার তো আমাদের গাই টার লেজের লোমগুলোই কাঁচি দিয়ে জাষ্ট উড়িয়ে দিয়েছিলাম। বাবা খুব একটা মারধোর করতেন না, মা একাই যাথেষ্ট ছিলেন। সেই গাইয়ের বাছুর বাঁধার দড়ি দিয়ে বেধেই প্রহার হয়েছিল। তবে ত্রাতা হিসাবে ছিলেন আমার একমেদ্বিতীয় পিতামত- দাদু। ধুম্রপানের মত বহু স্পর্ষকাতর বিষয়েই যিনি আমার হাতে খড়ি দিয়েছিলেন সযত্নে।

চৈত্র বৈশাখ মাসে আকাশে কালো মেঘের দেখা দিলে, হাওয়া মোরগের মত আমাদের ও আবহাওয়া সেন্স বেশ বলে দিতো, ঝড় উঠবে কি না। সেই তখন মা এর মানা করার আগেই ভোঁ ভা দৌড়, আম বাগানের দিকে। কশি- আধপাকা-হড়হড়ে কাঁচা আর কোকিলে পাদা আমের দারুন ভোজ চলতো। বাড়িতে কিছু নিয়ে আসতাম, তবে তাতে পিটুনিটাই পিঠে পড়তো, বেয়াড়া পনার জন্য। কোকিলে পাদা আম গুলোর বিশেষত্ব ছিলো যে, ওগুলো বাকি সব আমের থেকে আগে পাকতো, এবং একটা অংশ কোন কারনে থেঁতলে কালো হয়ে যেত। বড় হবার পর সেই সব আম গুলোই মুখে নিয়ে দেখেছি, এত্তো টক... যে বাঁদরেও ছোবে না। অবশ্য সে সময় আমরা বাঁদরের বাড়াই তো ছিলাম। তাতে আর সন্দেহ কি!

স্কুলে অবশ্য একা একাই যেতাম, ভাই অন্যস্কুলে বোনেরা গার্লস স্কুলে পড়তো। সব্বাই বাসে বা সাইকেলে চড়ে যেত। স্কুল ২-৩ কিলোমিটারের মধ্যেই ছিল। আমি হেঁটেই যেতাম, কারন ক্লাস ৫ পর্যন্তই চারটে সাইকেলের বলি চড়িয়েছিলাম সুতরাং বাড়ির কথা মত “বুদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত আর নয়”। শুধু সাইকেলই বা কেন? জুতোজোড়াও আমার সাথে সমানে বিট্রে করে গেছে মাধ্যমিক পর্যন্ত। ক্লাস ৪ থেকে ক্লাস ৯ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় কমবেশি ৬ মাস খালি পায়েই স্কুল গেছি। বই খাতা পেন্সিল যে হারাই নি তা নয়, কিন্তু তাতে তো আমি চিরদিন খুশিই হয়ে এসেছিলাম।

স্কুল বাক্সে টিফিন থাকতো না। সাথে থাকতো একটা বাঁকা গাছের ডাল, চাঁচাছোলা ও সামনের মাথাটা সাপের ফনার মত একটু চওড়া ও বাঁকানো। ওটাই তো আমার বা আমাদের খেলার সরঞ্জাম ও অস্ত্র। তখন প্লাস্টিকের বলে ক্রিকেট খেলার খুব রেওয়াজ ছিল। যে বল গুলো আবার ওজনের হিসাবে বাজারে পাওয়া যেত। ১০০ গ্রাম, ৬০ গ্রাম, ৪০ গ্রাম ইত্যাদি নানা মাপের। ওই বলের আঘাতের দাগ এখনো শরীরের বহু স্থানে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। টিফিনের সময়টা আসতে যা দেরি ছিল, ব্যাস আমাদের সময় শুরু হয়ে যেত। কোন রকমে পঞ্চম পিরিয়ড টা শেষ করেই আবার শুরুহয়ে যেত। সন্ধ্যা না হওয়া পর্যন্ত স্কুল মাঠেই চলতো খেলা, এ্যালুমিনিয়ামের স্কুল বাক্স দিয়েই তো উইকেট হতো বেশিরভাগ দিন। এছারাও সবাই থাকলে কুমিরডাঙা, চোর-পুলিশ-ধাপ্পা, কানামাছি, ডাংগুলি, সামনে একজন নিল্ডাউন হয়ে তার পিঠের উপর দিয়ে জাম্প আর কত কি... আর একা একা থাকলে! সাইকেলের টায়ার চালানো, ঘুড়ি উড়ানো, অনির্দিষ্টকাল সাঁতার কাটা, ছিপ ফেলা, লাট্টু আর তার লেত্তিনিয়ে কেরামতি... সে এক এলাহি খেলার আয়োজন।

সন্ধ্যাবেলা পড়তে বসতাম সাধারনত পিসিদের ঘড়ে, আমরা সব তুতো ভাইবোন মিলে। পিসিদের ঘরটা আমাদের আর কাকাদের ঘরগুলোর মাঝে ছিল, ফুল পিসি আর ছোটোপিসির তখনো বিয়ে হয় নি। ওনাদের কাছেই ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছি। হ্যারিকেনের নরম আলো যেন চোখে সুড়সুড়ি দিতো, আধাঘন্টার মধ্যেই যাবতীয় শক্তি দিয়ে ঘুম, চোখের সাটার টেনে বন্ধ করে দিতে চাইতো, মায়ের পিটানির ভয়ে আমিও আলাদিনের জ্বিনের মত চোখ টেনে টেনে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করতাম। ওই জেগে থাকাই হতো, পড়াশোনা অশ্বডিম্ব। ভ্রাতা ভগিনীগণের ক্রম-নালিশ থেকে পরিত্রান পেতে, বুকে ভর দিয়ে, উবু হয়ে পড়তাম, মাথা নিচু করে। তাতে করে চোখটা আর দেখা যেত না। আবার কখনো কখোনো হ্যারিকেনের বাতিটা লম্বা করে দিতাম, স্বাভাবিক ভাবেই কালো ধোঁয়া কাঁচে কালির পোঁচ লেপে দিতো। তাতে আলোর উজ্জ্বলতাও কমত আর আমার চোখের দিয়ে নজর করতে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হত। এর পর একটু পাতলা পাতলা ঠ্যাঙানির সাথে সাইড ডিস হিসাবে মায়ের হাতে, অল্প ভাত খেয়েই দে ঘুম। একটু খানি প্যান্ট না ভেজা পর্যন্ত, হিসিও করতে যেতাম না।

ম্যারাপের ব্যাপার টা যখন ঘটেছিল, তখন ক্লাস ফাইভের হাফ ইয়ার্লি এক্সাম শেষ হয়েছে সবে। এই অনুষ্ঠানের দিন গুলোতে অবভাবকদের শাসনের নিয়মজাল প্রায় থাকতো না বললেই চলে। ওই সময় জেনারেটর আনা হত বড় অনুষ্ঠান হলে, আর ছোট হলে হ্যাজাক। গোয়ালের পাশে কলপাড়ের গা ঘেঁসে বিকট শব্দে সন্ধ্যা নামতেই জেনারেটর চালু। আমাদের পাকা রাস্তার ধারের বাড়ির একতলার ছাতেও ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে, বিবাহ অনুষ্ঠানে আগত আত্মীয় কুটুম্ব ও পারিবারিক পুরুষ সদস্যদের রাত্রি বাসের স্থান।আমিও পাড়াতুতো কয়েকজন সমবয়সীদের সাথী করে ওই খানেই রাত্রি বাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারন খুব পরিষ্কার। রাত্রে ভিডিও দেখানো হবে। কাকার দলই সেই বন্দব্যাবস্থা করেছিল। মায়ের তীব্র আপত্তি অবশ্য কাকাদের কাছে টেকেনি, তবে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছিল যে আমি ঘুমিয়ে গেলে ঘরে পৌছে দিতে হবে।

তখন আনন্দ আর দেখে কে!! সম্পূর্ন সঙ্গত কারনে। অন্যান্য বাড়িতে ব্যাটারি চালিত টিভি থাকলেও, ওই ব্যাপারটা আমাদের বাড়িতে? জাষ্ট অকল্পনীয়। ঘরে টিভি আছে, এ কল্পনা করার থেকে, শক্তিমান আর ডাঃ জয়কাল একসাথে বসে তাস খেলছে, সেটা কল্পনা করা বেশী সহজ ছিলো। বছরে ২-৫ বার মামা-মাসি বা পিসির বাড়ি গেলে ওই কদিন সারাদিন খেলা করার পাশাপাশি দুমারে চলতো টিভি ভক্ষন। ক্রিকেটে দেখার ভুত তখনো মাথায় চড়ে বসেনি। ঠাকুমা কাকিমা রা অবশ্য তখন চিত্রহার- শ্রীরামকৃষ্ণ, শুধু প্রিয়তমা আর শুধু তোমার জন্য বা জননী বা জন্মভূমির প্রেমে পাগল। হিন্দি সিরিয়াল বলতে মহাভারত ও অবশ্যই শক্তিমান। আর মুঙ্গলিকে অস্বিকার করি কি ভাবে? বা আলিফ লাইয়া। মাঝে মাঝে বাংলাদেশী চ্যানেল ধরলে “মিঠু-মীনা” কার্টুনও দেখার সুযোগ মিলতো। কিন্তু সিনেমা? নৈব নৈব চ। ছুটির দিনের দুপুর গুলোতে কাকার টিভির ঘর থেকে ভেসে আসা সেই আওয়াজ “ চুপি চুপি পাগল হাওয়া এসে বলে গেলো, প্রিয়তমা ফিরে আসবে আবার, বলবে কিছু কথা ভালোবসার”

তবে রেডিও টা চলত। কোলকাতা ক থেকে অল ইন্ডিয়া রেডিও বা বিবিধ ভারতী। সেটা সকাল সন্ধ্যে দাদুর ঘরের খোলা জানালা দিয়ে ভেষে আসতো, আর খুব গরম করলে আমাদের ওই একতলার ছাতে ক্যাম্প খাট বিছিয়ে দাদুর রেডিও চালু হয়ে যেত। আর তার সাথে সুর তাল হীন দাদুর স্বরচিত মাথামুন্ডুহীন গান।। “একটি তারা দুটি তারা, তারার ভাই বাঘমারা” এই গোছের। এটাই বিভিন্ন সুরে রোজ গাইতেন উনি। ওখানেই নানা ধরনের গান শুনতাম। এই গানটাও ওখানেই শোনা। “বাহো মে বোতল, বোতল মে...” হিন্দি মানে রাষ্ট্রভাষা জানতাম না, জানার প্রশ্নও ছিল না। তাই গানটার মানেও জানতাম না, চেষ্টাও করিনি, কোন সিনেমার গান সেটাও জানতাম না। কিন্তু বড্ড ভালো লাগতো ওই গান টা শুনতে। কেমন যেন নাচ পেয়ে যেত, শুনলেই। আরো বেশ কয়েকটা গান ছিলো, ওই ভালো লাগার লিষ্টে। পিসিদের মুখে কিছু গান অবশ্য ছিলো। আশিকী সিনেমার। সেই ধরনের ড্রেসও নাকি পড়তেন। আমার অবিশ্যি ওই গান ভালো লাগতো না। আজ বুঝি সেই বয়সে ওই ভালো লাগাটাই আশ্চর্যের ছিলো।

সেই রাত্রে ছাতের ম্যারাপের ভিতর রাত নটা নাগাদ ভিডিও চালু হলো। গায়ে হলুদের রাত, কাল বিয়ে। ওমা... শুরুতেই গোলমাল। অনেক প্রচেষ্টার পর সাথের ছেলেটি খান দুয়েক ভিসিআর মেসিন পালটে আধা ঘন্টা পর ফের চালু হলো। সবার সেকি উৎকণ্ঠা। একদম নতুন একটা সিনেমা এসেছে, মাত্র বছর তিনেকের পুরোনো। আমাদের মফঃস্বলে ওটাই যদিও শুভমুক্তি। ওই শুরু রাতে প্রথমে ভিসিআর মেসিনে চালু হলো “ছোটো বউ”। সে কি ভিড় মানে মা কাকিমা থেকে শুরু করে পাড়াতুতো বিভিন্ন বয়সী স্ত্রীলোকের। সে রাত্রে আমার ঘুমেরা যেন নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিলো। কান্নাকাটির সে এক মহাকুম্ভ। সকলের সাথে মিলে আমিও খানিক কাঁদলাম। যাক শেষ পর্যন্ত ওই সিনেমা শেষ হলো। এর পর হিন্দি সিনেমা চালানো হবে। মা কাকিরা সহ বেশিরভাগ স্ত্রীলোক শুতে গেলেন। আমি কিন্তু ঠায় বসে।

পরবর্তী সিনেমার নাম জানি না, যদিও সেটার দরকারও ছিলো না। যা ই হতো না কেন সেটাই তো দেখতাম। সিনেমা চালাতেই দেখলাম যুবক ছেলে ছোকরার দলের সে কি উল্লাস। সিটি ফিটি মেরে সে এক পরিস্থিতি। তার উপরে ওদিকে রাত প্রায় বারোটা। ছেলেদের ভীড়টা একটু বেড়ে গেলো। কয়েকজন তো গুরু গুরু বলে মাঝ রাত্রে এমন চেল্লানি জুড়ে বসলো যে , নিচেথেকে জ্যাঠার বাঁজখাই গলার আওয়াজকে প্রকট করে দিলো।

বেশ খানিক গনেশ বন্দনার পর সিনেমা শুরু হলো। প্রথমেই নাম দেখাবে। তাই হিসি করতে গেলাম। এসে বসতেই দেখি পর্দার আড়াল থেকে একটা মুখ বেড়িয়ে এলো। কপালে লাল টিপ, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, আর একটা অপার্থিব হাসি। চোখে ধাঁধাঁ লেগে গেলো। সেই প্রথম কাওকে দেখে বুকটা ধড়াস ধড়াস করে উঠলো। নাম জানিনা ওই মেয়েটির। মধুকাকাকে শুধাতে বললো ওটা নায়িকা, নাম মাধুরী। বেশ অনাগ্রহের সাথেই বললো। বললো একটু ওয়েট করতে, খানিক পরেই নাকি গুরু আসবে। আমার চোখ থেকে মন সবকিছুই অবশ্য ওই মাধুরিতেই আটকে ছিল। পরে অনেক নায়িকা দেখেছি ও দেখছি এবং দেখবোও। ওই প্রেম আর কারো সাথে হয়নি। লাভ এট ফার্ষ্ট সাইট, হে হে হে। হলুদ শিফন শাড়ি পরে, চুলের বিনুনি বুকের কাছে নিয়ে, আনমনে ওইভাবে খেলা করা, বা এ দাদ্দু বলে ডাক... বাস্তবেও কারো প্রতি ওটাই আমার প্রথম প্রেম। কতবার যে মাধুরির পোষ্টার দেখে, লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়েছি, তার ইয়াত্তা নেই।

সে যাই হোক গুরুকে দেখবো বলে অপেক্ষায় আছি, দেখি একটা বয়স্ক লোক এলেন আমার নায়িকার কাছে। কাকাকে শুধালাম – ইনিই গুরু? আবার গাঁট্টা খেলাম। হালকা করেই। চুপ মেরে গেলাম। এরপর দেখি একটা সব্জি বাজারের দৃশ্য, ছোটকা কাকা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমাটা দেখেছে, ও ই চেচিয়ে সব্বাই কে চুপ করে যেতে বললো। আমি তো আগে থেকেই চুপ ছিলাম। দেখি একটা মোটা কালো করে লোক সকলের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে, খানিক পর একজন একজন দিতে অস্বিকার করলো, ওই মোটাটাকে টাকা দিতে, এবং ঘাড় ধাক্কাও দিয়ে দিলো। এর পর সব্বাই চুপচাপ, সবারির নজর সামনের দিকে, টিভিতেও ম্যারাপেও।

টিগ ডিগ ঢুশ... ট্যারারারারারা......
টিগ ডিগ ঢুশ... ট্যারারারারারা......
টিগ ডিগ ঢুশ... ট্যারারারারারা......

বেশ কয়েকবার ওই আওয়াজের পর দেখলাম মুখের এক কোনে জলন্ত বিড়ি, মুখে চোখে কাঠিন্য, গোল সাদা গলা বেগুনি গেঞ্জি, উপরে বোতাম খোলা হালকা হলুদ রঙের জামা পরিহিত কাধ পর্যন্ত চুলের এক মানুষের আবির্ভাব। সাথে সাথেই জ্যাঠার শাসানী উপেক্ষা করে রাত্রির নিঃস্বব্ধতাকে বিদীর্ন করে গগনভেদি সমস্বরে উচ্ছাস...

গু..............................রু...........................

আমি খানিকটা ভিরমি খেয়ে আরো চুপ মেরে গেলাম। বুঝলাম ইনিই গুরু। এর পর মারামারি... রক্ত গরম করা সংলাপ ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মাঝে একটা গানও হয়ে গেলো, তবে আমার নায়িকাকে ওই রান্না বিক্রি করতে দেখে খুব কষ্টই হয়েছিল। দাদুটাকে মদ খেতে দেখে বেশ ঘেন্নাই লাগছিলো। কারন মা ওটাই শিখিয়েছিলেন, মদ খুব খারাপ বস্তু। মদের দোকানের সিড়ি দিয়ে যখন, নাভিকুন্তলের সামান্য উপরে কাঁচুলি পরিহিতা, প্রশস্ত বিভাজিকা উন্মুক্ত করে মাথায় এক বেনী খোপা করে রসিলি বাই যখন নেমে এলেন, কাকাদের মাঝে আমার সে কি লজ্জা। কপট ঘুমের ভান করে শুয়েই পড়লাম। মাঝে মাঝে আড় চোখে দেখছি। গুরু আবার সেই মিউজিকের সাথে এন্ট্রি নিলেন, ভিতরে লাল গেঞ্জি, সাদা প্যান্টের সাথে, স্বচ্ছ সাদা জামা, বোতাম খোলা। বুঝলুম ওটাই গুরুর সিগনেচার স্টাইল। হয়ত ঘুমিয়েই যেতাম, ঠিক তক্ষনি...

“বাহো মে বোতল...”। সব ঘুমের নেশা দৌড় লাগালো। ফের ঠারো হয়ে বসলাম। দেখি ওই রসিলি বাই এর হেলে সাপের মত শরীর এঁকে বেকে , সে কি নাচ। বুকের ভুতর টা যেন খামচে দিচ্ছিল। কমন গান। আগে বহুবার শোনা। নাচতে ইচ্ছা যাচ্ছিলো। বহু কষ্টে সেই ইচ্ছা অবদমিত হলো, দেখলাম গুরুর বিনা বেল্ট পরার ফ্যসন। সাথে ব্রেক ডান্স। খানিক পরে সবাই নাচতে শুরু করলো, আমিই বা বাদ যাই কেন!

খানিক পরেই ক্লান্ত হয়ে গেলাম, তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি খেয়াল নেই। বিয়ে মিটলো। আবাঁর আমার থোর বরি খাড়া জীবন শুরু হলো। তবে তখন থেকে গান শুনলেই সিনেমার নাম আর নায়ক নায়িকার নাম, সুযোগ সুবিধা মতন কাওকে ঠিক শুধিয়ে নিতাম। আর তক্কে তক্কে থাকতাম, পছন্দের গানের সেই সিনেমা কবে দেখা যাবে, তার জন্য।

আজও গানটা অনেক স্থানে পথ চলতি শুনতে পাই। শরীর নাচাতে না পারলেও , মনটা ঠিকিই নেচে উঠে। এটা তো এখন মাতালদের জাতীয় সংগীত সম, আর যে কোন আরঙে এই গান ছারা জৌলুশ অধরা সেটা বলাই বাহুল্য।

এখনো গুরু বললে মিঠুন কেই বুঝি, আর প্র্থম প্রেম??

হা হা হা..................

(উন্মাদীয় বানানবিধী অনুদৃত)
উন্মাদ হার্মাদ

শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

উন্মাদীয় আবেদন

একটি উন্মাদীয় আবেদন।


গরু কে গোয়ালে রেখে, শুয়োরকে খোয়ারেই চড়তে দিন। ওগুলোই ওদের প্রকৃত স্থান। গল্পের গরু ফ্রিজে এলেও, রক্তটা সেই মানুষেরই ঝরে।
মা কি কোন জাতের হয়?
পাঁচটা ভিন্নধর্মের বাঙালী জাতির বাচ্চা যখন স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে মা মা করে প্রথম স্কুলের দিনে কাদে,পারবেন তখন , কোনটা কো ধর্ম-জাতির বাচ্চা , সেই ফারাকটা করে দিতে। পারবেন না, কারন পারা যায় না। ওই বাচ্চারাও যানে না , বড় হলেই জাত নামের একটা জাঁতা কলে বাকি জীবনটা পিষতে হবে।। বড় হলে বুদ্ধি হবার সাথে সাথে আমরা বোধহয় নির্বোধ হয়ে যায়।
পূজা মানে আরাধনা করা, নামাজ মানেও তাইই হবে। কজন করছি? মসজিদে যায় ফতোয়া দিতে বা শুনতে। আর পুজো করি ছূটি পাওয়া যায়, আর আমোদ করার জন্য। এটাই নিশ্চই কোন তর্ক থাকবে না।
বিয়ের পরে আজকের সমাজ যেখানে নিজনিজ জন্মদাদা বাবা-মা কে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন সেখানে ... বাকিটুকু বুঝে নিন।
আমাদের দেশের সংখ্যলঘু মানুষের দল, তারাতো আর বিদেশ থেকে আসেননি, শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি যে, নির্লজ্জ ব্রাম্ভন্যবাদের অত্যচারের শিকার হয়ে তৎকালীন সমাজের নিম্ন(!)বর্গীয় মানুষের দল ধর্মান্তরিত হয়েছিল। সুতরাং তাদের মাঝে যে অশিক্ষা কুশিক্ষার হার বেশী থাকবে এটার মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই।
মানুষ যেখানে সহজে একটা আধুলি ত্যাগ করতে চায় না, সেখানে এই নিম্নশ্রেনির সমাজে ধর্ম ত্যাগের কারন বিশ্লেষণ করলে, থুথু টা আমাদের মত তথাকথিত উচ্চ বর্গীয়দের মুখের উপরেই এসে পড়বে।
সহিষ্ণু বা অসহিষ্ণুতা এগুলোর বিচার তাঁরাই করুক , যারা এর একক জানে। আমরা বাবা জানি না। তাই এগুলো মাথার উপর ডাক করে দেওয়াই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমরা যেগুলো করে চলেছি সেগুলো আসলে বন্ধ্যা আলোচোনা। এগুল থেকে কিছুই জন্মাবেনা।
আসুন না সকলে এই বিগত কিছু দিনকে একটা দুঃস্বপ্ন ভেবে আবার সবকিছু স্বাভাবিক করে নিই।
কুত্তার দল চেল্লাবে, তাদের কোন জাত নেই, হানাহানি লাগলে তো আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হই, স্বজন বিয়োগ আমাদেরই হয়, সম্পত্তির হরন ও আমাদেরই হয়, আমরা কেউ ই তো নেতা মন্ত্রী হবার তেমন স্বপ্ন দেখিনা, পন্মভূষণ বা বিভুষনে কি পেট ভরে, নিশ্চই না। তাহলে আমরা মর্কট সেজে নেচে লাভ কি?

উস্কিবাজের দল ফিকির খুজবেই।
তাদের মুখে জাষ্ট মুতে দিন।
হালকা হাসি, বাকা হাসি, এক চিলতে হাঁসি, পেট ফাঁপা হাঁসি, খিলখিলিয়ে হাঁসি, মিট্মিটিয়ে হাঁসি, অট্টহাসি, বোকা হাঁসি, সেয়ানের হাঁসি, মুচকি হাঁসি...... আরো কত রকমের যে হাঁসি আছে তাঁর কি আর লিখে শেষ করার য আছে।
আসুন না আমরা হাসতেই থাকি। বড়দার ভূমিকায় স্পাইক থাকুক। আরে সেই মোটা হোদকা কুকুরটা।
মোল্লা বললে মোল্লা ওমর কে না বুঝে মোল্লা নাসিরুদ্দিন কে বুঝি, বীর বললে হিন্দু বীর না ভেবে বীরবল কে ভাবি।
মারামারি করবো টম জেরির মত। প্রতিযগিতা থেকে খেয়ো খেয়ি সবই হবে, শুধু কেও মারা যাবো না, আর তৃতীয় শত্রু এলেই সমবেত ভাবে ঝাপিয়ে পরব।
আমরা উলুখাগড়া, রাম রহিমের বিতন্ডায় আমরা আখেরে কি পায় বলুন তো? হাতে রইলো পেনসিল... সেটুকুও থাকে না দিনের শেষে। হাভাতে না হলেও, আমাদের গতর না খাটালে পেটের ভাত হয়না। সেখানে ভাতার মেরে নাঙের গীত গেয়ে লাভটা কি? আমরা আকচা আকচি করে কাদা ছোরাছুরি করে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পরছি, অন্তত মানসিক ভাবে। আর দীর্ঘ মানসিক অসুস্থতা শরীরের উপর ছাপ ফেলতে বাধ্য।
অন্যকে সম্মান করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিদানে সেই সম্মান্টুকু পাওয়া যায়। যারা সেই মর্যাদা দেবেন না? সোজাকথা... সংস্রব ত্যাগ করেদিন। আমরা হলফ করে বলতে পারবো না যে, কাল থেকে একটা বিশিষ্ট জনগষ্ঠী কে বা জাতি গোষ্ঠীকে আমার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নাই। তাহলে ভাবের ঘরে কাঁঠাল ভাঙ্গা কেন।
আপনি না বলুন, দেখুন ধান্দাবাজের দল অন্য ব্যাবসা শুরু করবে।
দুষ্টু গরুর থেকে শূন্য গোয়াল ভালো। উফ এখানেও গরু। তবে থাক এ বড় ভালো গরু। সকলে ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন। আগামী শীতে কমলালেবু খেতে খেতে, পূরাতন খারাপস্মৃতি গুলো, ওই লেবুর খোসা ছারাবার মত ছাল ছারিয়ে ডাষ্টবিনে ছুরে ফেলে দিন। দেখবেন সুস্বাদু নির্যাসটুকুই অবশিষ্ট আছে।

রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কবিতার আধুনিকতা; ও বর্তমান পরিস্থিতি

 


কবিতার আধুনিকতা; ও বর্তমান পরিস্থিতি

 

কবিগুরুর কতগুলো লাইন ধার করে শুরু করি

আমরা সচরাচর কথোপকথনে যতটা অনুভাব প্রকাশ করি তাহারই চূড়ান্ত প্রকাশ করিতে হইলে কথোপকথনের ভাষা হইতে একটা স্বতন্ত্র ভাষার আবশ্যক করে। তাহাই কবিতার ভাষা- পদ্য। অনুভাবের ভাষাই অলঙ্কারময়, তুলনাময় পদ্য। সে আপনাকে প্রকাশ করিবার জন্য আঁকুবাঁকু করিতে থাকে -- তাহার যুক্তি নাই, তর্ক নাই, কিছুই নাই। চূড়ান্ত যুক্তির ভাষা গদ্য, চূড়ান্ত অনুভাবের ভাষা পদ্য

এমন যদি নিয়ম হইত যে, যে কবিতায় চতুর্দ্দশ ছত্রের মধ্যে, বসন্ত, মলয়ানিল, কোকিল, সুধাকর, রজনীগন্ধা, টগর ও দুরন্ত এই কয়েকটি শব্দ বিশেষ শৃঙ্খলা অনুসারে পাঁচ বার করিয়া বসিবে, তাহারই নাম হইবে কবিতা বসন্ত-- ও যদি কবিতাপ্রিয় ব্যক্তিগণ কবিদিগকে ফরমাস করিতেন, “ওহে চণ্ডিদাস, একটা কবিতা বসন্ত, ছন্দ ত্রিপদী আওড়াও ত! অমনি যদি চণ্ডিদাস আওড়াইতেন-

 

বসন্ত মলয়ানিল, রজনীগন্ধা কোকিল,

দুরন্ত টগর সুধাকর--

মলয়ানিল বসন্ত, রজনীগন্ধা দুরন্ত,

সুধাকর কোকিল টগর

 

ও চারি দিক হইতে "আহা আহা" পড়িয়া যাইত, কারণ কথাগুলি ঠিক নিয়মানুসারে বসানো হইয়াছে -- তাহা হইলে কবিতা কতকটা আধুনিক গানের মত হইত। ঐ কয়েকটি কথা ব্যতীত আর-একটি কথা যদি বিদ্যাপতি বসাইতে চেষ্টা করিতেন, তাহা হইলে কবিতাপ্রিয় ব্যক্তিগণ "ধিক্ ধিক্" করিতেন ও তাঁহার কবিতার নাম হইত "কবিতা জংলা বসন্ত।" এরূপ হইলে আমাদের কবিতার কি দ্রুত উন্নতিই হইত! কবিতার ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী বাহির হইত, বিদেশবিদ্বেষী জাতীয়ভাবোন্মত্ত আর্য্যপুরুষগণ গর্ব্ব করিয়া বলিতেন, উঃ, আমাদের কবিতায় কতগুলা রাগ রাগিণী আছে, আর অসভ্য ম্লেচ্ছদের কবিতায় রাগ রাগিণীর লেশ মাত্র নাই

এমন লোকও আছেন যাঁহারা ভাবিয়া পান না যে, ভাবগত কবিতা বস্তুগত কবিতা অপেক্ষা কেন উচ্চ শ্রেণীর ! তাঁহারা বলেন ইহাও ভাল উহাও ভাল। আবার এমন লোকও আছেন যাঁহারা বস্তুগত কবিতা অধিকতর উপভোগ করেন। উক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে সুরুচিবান লোকদের আমরা জিজ্ঞাসা করি যে, ইন্দ্রিয়সুখ ভাল না অতীন্দ্রিয় সুখ ভাল? রূপ ভাল না গুণ ভাল? ভাবগত কবিতা আর কিছুই নহে, তাহা অতীন্দ্রিয় কবিতা। তাহা ব্যতীত অন্য সমুদয় কবিতা ইন্দ্রিয়গত কবিতা

কবিতাটি কবির সন্তানের স্বরুপ। সন্তানের জন্মোপলক্ষে ঘটিত সুখের চেয়ে একটা কবিতার জন্মে কবির কম সুখ অনুভূত হয়না। কচি মুখ, মিষ্ট হাসি, আধো-আধো কথা ইহার বিষয় নহে। একটি ক্ষুদ্রকায়া সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে মিষ্টভাব কচিভাব ব্যতীত আরেকটি ভাব প্রচ্ছন্ন আছে, তাহা সকলের চোখে পড়ে না কিন্তু তাহা ভাবুক কবির চক্ষে পড়ে। সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে একটি অপরিসীম মহান ভাব, অপরিমেয় রহস্য আবদ্ধ আছে, যেমনটি কবিতায় থাকে

সভ্যতার সমস্ত অঙ্গে যেরূপ পরিবর্তন আরম্ভ হইয়াছে কবিতার অঙ্গেও যে সেইরূপ পরিবর্তন হইবে ইহাই সম্ভবপর বলিয়া বোধ হয়। কবিতা সভ্যতা-ছাড়া একটা আকাশকুসুম নহে। কবিতা নিতান্তই আশ্মানদার নয়

এখনকার সভ্য সমাজে দশটাকে মনে মনে তেরিজ কষিয়া একটাতে পরিণত কর। কবিতাও সে নিয়মের বহির্ভূত নহে। সভ্য দেশের কবিতা এখন যদি তুমি আলোচনা করিতে চাও তবে একটা কাব্য, একটি কবির দিকে চাহিও না। যদি চাও ত বলিবে "এ কি হইল! এ ত যথেষ্ট হইল না! এ দেশে কি তবে এই কবিতা?

পূর্বে একজন পণ্ডিত না জানিতেন এমন বিষয় ছিল না। লোকেরা যে বিষয়েই প্রশ্ন উত্থাপন করিত, তাঁহাকে সেই বিষয়েই উত্তর দিতে হইত, নহিলে আর তিনি পণ্ডিত কিসের? এক অ্যারিষ্টটল দর্শনও লিখিয়াছেন, রাজ্নীতিও লিখিয়াছেন, আবার ডাক্তারিও লিখিয়াছেন। তখনকার সমস্ত বিদ্যাগুলি হ-য-ব-র-ল হইয়া একত্রে ঘেঁষাঘেঁষি করিয়া থাকিত। বিদ্যাগুলি একান্নবর্ত্তী পরিবারে বাস করিত, এক-একটা করিয়া পণ্ডিত তাহাদের কর্ত্তা। পরস্পরের মধ্যে চরিত্রের সহস্র প্রভেদ থাক, এক অন্ন খাইয়া তাহারা সকলে পুষ্ট। এখন অবশ্য সর্বজ্ঞ পন্ডিত না থাকিলেও সর্বজ্ঞ কবির অন্ত নাই, তাহাতে কাব্য থাকুক আর নাই বা থাকুক, কাগজের উপরে কলম চালাইতে পারিলেই নিজেকে কবিবর ভাবিয়া লইতে অসুবিধা কি”

শুরুর ভুমিকাটাই অনেক বড় হইয়া গেল, আসলে কবিগুরুর লাইন তো , সুতরাং অল্পেতে কি ভাবে হইবে!

শেষ লাইন দিয়েই শুরুকরি। আজিকাল সকলেই কবি, তাহাতে কাব্যরস থাকুক বা না থাকুক। গুরুদেব ইন্টারনেটের কথা কল্পনাও করিয়া যাইতে পারেন নাই, যদি কোনক্রমে তাহার নিকট বর্তমান কোন ফেসবুক গ্রুপের একটা দিনের পাতা খুলিয়া দেখানো সম্ভব হইত, নিশ্চিত তিনি সিলিং ফ্যানে গলায় গামছা বাধিবার পূর্বে অবশ্যই সুলালিত দাড়িটি “কবিতার” অন্ত্যেষ্টির জন্য কামাইয়া ফেলিতেন নিশ্চিত

বাঙালী ও কবিতা নাকি সমার্থক, আমি নিজেও তার বাহিরে নই। স্কুল কলেজে যতবার প্রেমে পড়িয়াছি ততবারই অন্তরের কবিত্ব জাগিয়া উঠিয়াছিল সন্দেহ নাই। অতঃপর প্রতিটি প্রেমকাহিনি সমাপ্তের সাথে সাথেই কবিতা বমনও আশ্চর্যজনক ভাবে স্তব্ধ হইয়া যাইত। আধুনা দুই এক বৎসর কাল এই পীড়া আপাতকালীন ভাবে দূরীভুত হইয়াছে

কিন্তু যেহেতু ইহা আমার মতে একটি পীড়া, সেই হেতু বহু মানবসন্তানই পোলিওর ন্যায় এই প্রকারের ছোঁয়াচে পীড়ার শিকার। বিশেষত যাহারা অন্তর্জালের পাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত করিয়া থাকেন। তাহা অভ্যন্তরে আমার অত্যন্ত নিকট বন্ধুবাসরের সখার সংখ্যাও নেহাত কম নহে। এই বিষয় চয়ন করার অর্থ শত্রু সংখ্যা না বাড়লেও, বন্ধু যে কমিবে তাহার জন্য রকেট বিজ্ঞানি না হইলেও চলিবে। সুতরাং গালি খাইবার নিমিত্ত, যে আন্তরিক ভাবে প্রস্তুত থাকিতেই হইবে, ইহাও বলাই বাহুল্য

কবিতা কি? কবিতা হইল মনের ভাবধারার অন্তিম মন্থিত নির্যাস। যাহা আনন্দে ফল্গুধারার মত নির্ঝরিনির মত প্রবাহিত হইয়া অন্যকেও সেই সুখামৃত পান করাইয়া তৃপ্ত লভিয়া থাকে, অথবা তীব্র বিষাদসিন্ধু গরলের মত বক্ষে চাপিয়া যাবতীয় দুঃখবোধকে কাব্যিক সরলতায় প্রকাশ করে, কিছুটা উপশমের চেষ্টা

কবিতা কে লেখেন? কবিতা তিনিই লিখিয়া থাকেন যাহার মনের অভ্যন্তরের ভাবনাকে কাব্যের আকারে প্রকাশ করিবার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। আর যিনি এই কর্মটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করিতে পারেন, তাহাকেই সেই কাব্যের জনকস্বরুপ কবি নামে অভিহিত করিতে পারি। কবিগুরু বলিয়াছেন, কবিতা আসলে কবির সন্তান স্বরুপ। কিন্তু আধুনিক এই কবির মেলাতে কজন সুস্থ সন্তানের জন্মদান করিয়াছেন বলিয়া দাবি করিতে পারেন? দু একটি ব্যাতিরেকে প্রায় সকলই পঙ্গু ও নিরেট। যাহার না আছে ধড় না পুচ্ছ

পৃথিবীর অধুনা সঙ্কট বিশ্বউষ্ণায়ন প্রথম হইলে দ্বিতীয়টা অবশ্যই তৃতীয় বিশ্বের জনবিষ্ফোরন। আর সাহিত্যের সঙ্কট হইল এই দ্রুত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকাশিত প্রচারিত অপুষ্ট কঙ্কালসার ও বিষাক্ত শব্দগুচ্ছের তুমুল বিষ্ফোরনকে “কবিতা” নাম দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার কুৎসিত প্রচেষ্টা, আসলে আমাদের সাহিত্যকলার ঐতিহ্য আর ইতিহাসের পাশাপাশি যুবসমাজকেও সম্পূর্ন ভ্রান্তপথে বাধিত করিতেছে

জীবনানন্দের অমোঘ বানী- “ সকলেই কবি নয়, কেও কেও কবি” এই সার সত্যকে উপেক্ষা করেই ঘটে চলেছে, কাব্যকে গন বলাৎকার। সীমাবদ্ধ জীবনের ব্যাকুলতা কে ভাষা যোগানোর পরিবর্তে, এই সাহিত্যহন্তা শব্দব্রম্ভের স্রোত সমাজকে আলো দেখানোর পরিবর্তে মরিচিকার প্রহেলিকায় আচ্ছন্ন করিয়া দিচ্ছে। ব্যক্তির নিজস্ব সময়বোধ যখন তার একান্ত ব্যক্তিগত হইতে পারেনা, সেখানে কবিতা তো পাঠককুলের পরিশীলিত মনন বোধকে জাগ্রত করার অনুঘটক রুপে কার্য করিয়া থাকে, কবিতার দায় রহিয়াছে শিল্পোবোধএর ঐতিহ্যকে রক্ষা করার। সুতরাং কবি সেই দায় হইতে মুক্ত নন

এক্ষণে যদি বোদ্ধাদের প্রশ্নে আসা হই, তাহা হলে সকলের জন্য সকল কবিতা হয়, ইহা সত্য। আধুনিক কবিগনকে সসম্মানে উহ্য করিয়াও, জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে বা নির্মলেন্দুর সকল কবিতা কি সর্বসাধারনের বোধগম্য? নিশ্চই তাহা নহে। সকল কবিতা কি কালজয়ীই হইবে! না মোটেই তাহা নয়। কারন কবির ভাবনা আর পাঠকের সেই মুহুর্তের মনস্তত্বের টানাপোড়েনের উপরে অনেকটা নির্ভর করিয়া থাকে, বাকিটা ব্যক্তিগত রুচি। যদিও কিছু কিছু লাইন এতোটাই যুগান্তর যে, সেটা কালজয়ী হতে সময় নেয় না

পাঠকের সমাদর ব্যতিত কাব্যে প্রানের সঞ্চার হয়না। কিন্তু কবি কি পাঠকের কথা ভাবিয়া রচনা করেন? মোটেই না, সুতরাং কাব্যের অন্তর্নিহিত ভাবনা, শব্দচয়ন ও সমকালের প্রভাব কাব্যকে পাঠক মনের কাছাকাছি এনে দেয়। বাস্তব ঘটনামালার ভিন্নতাকে কাব্যিক ভাবে জারিত করে , কবির নিজস্ব চেতনার রঙে রাঙিয়ে যদি পাঠকের সম্মুখে পরিবেশন করা সম্ভবপর হয় তাহা হইলে সেই কবিতার মৃত্যু নেই। শুধু মাত্র লেখার জন্য কবিতা হয় না বা কবিতার জন্ম দশটা পাঁচটা চাকুরির মত নহে, যে খাতা আর কালি নিয়ে বসিলেই কবিতার জন্ম হইবে। কাব্যিক সাধনা প্রয়োজন। প্রখর বাস্তববোধ প্রয়োজন। সাথে নিষ্ঠা আর অধ্যাবসায়

কবিতার কোন নির্দিষ্ট সূত্র নেই, নেই কোন চমক সৃষ্টির তাৎক্ষনিক দুর্দান্ত পন্থা। সর্বপ্রথম প্রয়োজন কাব্যপাঠের নেশা, যাহা বিনা কবিতার জন্ম দেওয়া অসম্ভব। লেখনির সময় পাঠককে উপেক্ষা করা নিতান্ত প্রয়োজন, কিন্তু অবজ্ঞা নহে। কারন কবিতায় বহু মানুষ আশ্রয় গ্রহন করিয়া থাকেন, কিন্তু কবিতা কেবলমাত্র তাহার বরপুত্রদের উপরেই ভর করিয়া থাকে, অবশ্যই তাহারা ক্ষণজন্মা। লৌকিক জগতের যাবতীয় উপলব্ধির সহিত কল্পনার মাধুরীর সংমিশ্রণ ঘটানো সকলের কর্ম নহে। যিনি নিজেকে কবি বলিয়া প্রকাশের ইচ্ছা করেন, তাহার অনুভূতি জগতের সকল প্রতীকি চেতনা, তাহার সৃষ্টির প্রতিটি ছত্রে উপস্থিত থাকিতেই হবে, তবেই না কবি

আজিকালের আধুনিক কবিদের মধ্যে, বিশেষত এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাদের মূলত প্রকাশ, তারা ঠিক উদ্দেশ্যে কবিতা লেখেন , অধিকাংশ জনেই তার ব্যাখ্যা দিতে অপারগ। কাজ নাই, চলো কবিতা লিখি এই গোছের। কেবলমাত্র, বন্ধু বৃত্তে আরো অনেকেই যেহেতু এই চর্চা করিয়া থাকেন, সেই হেতু “আমি” না লিখিলে কেমনে প্রশংশা পাইব? এই ভাবনা থেকেই বেশিরভাগ জনেই কবিতার নামে মল-মুত্র ত্যাগ করিয়া থাকেন। আর প্রশংসা শুনিবার জন্য যত জনকে সম্ভবপর ততজনকে সাথে বেঁধে নেন। জোর করে কি কবিতা শোনানো সম্ভব? সেই সুকুমারি ছড়ার একুশে আইন ন্যায় একটু পরিবর্তন ঘটাইয়া, সেথায় যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের ধরে ট্যাগের বলে, কানের কাছে নানার স্বরে, কবিতা শোনায় লক্ষ ড্যাস

কবিতা তো কবির আবেগ। তাহা জোর করিয়া একপ্রকার ঘাড় ধাক্কা দিইয়া শোনাইবার অপচেষ্টা আজিকাল শিল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হইয়াছে। একটা সত্য ওনারা বুঝতে চাহেননা, যে তার কবিতা যদি সত্যিই উৎকর্ষতার মান অতিক্রম করিতে পারেন, পাঠককূলই তাহাকে সমাদরে মাথায় তুলিয়া রাখিবেন, ও তাহার পুনঃপুনঃ প্রচার করিতে থাকিবেন। একটা বিষয় মনে রাখিতে হইবে, সাফল্যের কোন হ্রস্বতর পথ হইতে পারেনা। সমালোচোনা সহিবার অসীম শক্তির সহিত নিরলস প্রয়াসের দীর্ঘ যুগলবন্দিই সফলতার বৃত্তের প্রবেশপথ দেখাইতে সক্ষম

কাব্য চর্চার সহিত প্রতিষ্ঠার আত্মীয়তা অত্যন্ত দুর্মূল্য। কারন সফলতার যে পথে প্রতিষ্ঠার মঞ্চ প্রস্তুত হয়, তাহা অত্যন্ত বন্ধুর। সাহিত্য জ্ঞান আমার মতে সর্বাধিক পাঠককুলের কাছেই সঞ্চিত। বাকি যারা সাহিত্যচর্চাটা দু কলম লেখালখির মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ করিয়া থাকেন তাহারা কেহই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নন, কারণ সাহিত্য সৃষ্টির নির্দিষ্ট পাঠ নেই, কবিত্ব আরো মারাত্বক, ইহা প্রায় সম্পূর্নটাই আত্মগত ও স্বাভাবিক পরিস্ফুটন। কবিগুণ একপ্রকারের স্বভাবগুণ, কোন গুরু ধরিয়া কবি হওয়া অসম্ভব

সমকালীন খ্যাতিমান কবিগনের কবিতাতেও, যাহাকে আমরা আধুনিক কবিতা বলিয়া জানি, সেই সকল কবিতার অভ্যন্তরে একটা গল্প থেকে থাকে, যদিও অধিকাংশ কবিতাতেই ছন্দের প্রভাব মুক্ত। কিন্তু সেগুলি বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনার সোনালী ফসল। কিন্তু সেই সকলকে অনুকরণ করিয়ে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্বঘোষিত কবির দল, কবিতার নামে যে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খল অত্যাচারে বিদ্ধ পাঠককূলকে খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া কাব্যগরল পানে বাধ্য করিয়া থাকেন, তাহা হইতে নিষ্কৃতি কোথায়? আরে বাবা কবিতা অনুভব করিতে হয়, আত্মস্থ করিতে হয় উপলব্ধি করিতে হয়।

শুধু মাত্র “ বাহ, অপূর্ব, অনবদ্য, দারুন, সুন্দর, অবিশ্বাস্য ইত্যাদি” রোজ ব্যবহৃত ভোঁতা ভাষাগুলি শোনার অভিপ্রায়ে? আর কিছু হউক বা না হউক, এই কবিদের পাল্লায় পড়িয়া এই কতিপয় শব্দবন্ধগুলি তাহার কার্যকারিতা হারাইয়াছে নিঃসন্দেহে। কারণ আসলে কোনটা অপূর্ব? কোনটা অনবদ্য? কোনটা অবিশ্বাস্য? বনলতা সেন? নাকি দেবতার অভিষাপ? না কি ওই “রেচন পদার্থ “ গুলো। যাহারা প্রতিষ্ঠিত বা মহান তাহাদের কথা ছাড়িয়া দিন , বাকি যাহারা অধ্যবসায়ের সহিত প্রতিদিনিই চেষ্টা করিতেছেন, তাদেরও যে গুটি কয়েক সুন্দর সৃষ্টি, সেগুলিই বা কি ভাবে ই গনপ্রশংসার ভীড়ে আলাদা করিবেন হে কবিবর? একবার পরখ করে দেখুন আপনার সৃষ্টপদটি কি আদৌ খাদ্য তো? অখাদ্য বা সুখাদ্যের বিচার নাহয় পাঠক করিবেন পড়িবার পর। অন্যের কথা ছাড়িয়া দিন, নিজের তৈরি কান্ডকারখানায় কি মুড়ি মিছরি একই দড় হইয়া যায়নি আপনি নিজেও?

কবিতার শরীরে কাব্যালঙ্কার থাকতেই হবে, ইহাই কবিতার প্রাথমিক শর্ত। কবিতা পাঠের সময় পাঠকের মনে যদি কোন চিত্রকল্প না জাগ্রত হয়, কোন গল্প, বা চরিত্র, বো জীবনবোধ বা দর্শন খুঁজিয়া না পায়, তাহলে সেটা কি কবিতা? না কি কবিতার নামে আসলে কবিতার শ্রাদ্ধবাসর। কবিতার প্রথম শ্রোতা বা পাঠক তো আসলে যিনি লিখিতেছেন তিনিই। তিনি কি বলিতে পারিবেন যে তিনি ঠিক কি পরিমান কাব্যালঙ্কার- রুপক-অনুপ্রাশ-ছন্দ বা দর্শন জীবনবোধের দ্বন্দ্ব মশালা স্বরুপ মিশাইয়াছেন!! না, তিনি পারিবেন না, তিনি শুধু ট্যাগ নামক অস্ত্রের অপব্যবহার করিয়া, ঘাড় ধরিয়া আপনাকে পড়িতে বাধ্য করাইতে পারেন মাত্র। একটা নমুনা পরিবেশন করিলাম,

কবিতাটি নিম্নরূপ

ওগো আমার প্রেমিকা

কাল চুমেছিনু তব ললাটে

আজ তুমি নেই সাথে

তাই পাদিতেছি খাটে।

মানে ছন্দ মিলাইবার জন্য যা ইচ্ছে তাই কিছু একটা দিলেই হইল। অথবা নিন্মরূপ

গোরোস্থানে আসার আগে

টাটা করেছিলাম সকলকে,

সকলেও আমায় টিটকিরি করেছিল

তারপর বহুদিন আর খোঁজ নেয়নি কেউ

একা অন্ধকারে আছি রোজ বিড়ি খাই

ডিগবাজি ও খাই,

শুধু ভাত খাইনা, কারন আমার সুগার

তবে গালি খাই, কারন পাওনাদারদের ধার শোধ করতে পারিনি

আমি মাতালদের সর্দার ছিলাম

তাদের বউয়েরা আমার গুষ্ঠিদ্ধার করে আজও

এই নির্জন গোরোস্থানে বসে আমি রোজ সকলকে করি টাটা

ইহাও নাকি একটি আধুনিক কবিতা। ভাবিতে কষ্ট হয়, কেহ লেখে তিনি হাগেন, কেহ লেখেন তিনি গালিখান আর ডিগবাজি। ইহাদের কি কারাগারে অবরুদ্ধ করিবার প্রয়োজন নয় অবিলম্বে ,সুস্থ স্বাভাবিক মস্তিষ্কে যাহারা এগুলোকে জাহির করিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করিতে পারেন, তাদের মানসিক সুস্থতা লইয়া প্রশ্ন রহিল

কুমোর যেমন কাঠের কাঠামোর উপরে কাদামাটি লেপনের মাধ্যমে একটু একটু করিয়া মূর্তির মধ্যে সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করিয়া থাকেন, তেমনই কবিকেও তার চেতনার রঙে রাঙানো পাঁপড়ি দিয়া একটি একটি করিয়া কবিতার শব্দমালা গাঁথিতে হয়, তবেই না সেই কবিতা হয় কাব্যিক সৌন্দর্যের প্রেমময় মুর্তি। সামান্যতম বিচ্যুতিও যেখানে কবিতার অপঘাত মৃত্যু ঘটায় বলেই শিল্পরসিকদের অভিমত, সেখানে এমন কাব্যচর্চা একধরনে সামাজিক গর্হিত অপরাধ, যাহা অন্তত কবিতারই স্বার্থে আইন প্রনয়নের মাধ্যমে বন্ধ করা উচিৎ।প্রয়োজন গন প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধ

এর পর আসিবে কবির কাব্যচর্চার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতা এক নহে। গোলাপ চাষ, বা ধানের চাষ আর গাঁজার চাষের সামাজিক মূল্য কি এক? সুতরাং যত্রতত্র খোলা স্থানে মলমুত্র ত্যাগ করিবেন না যেমন সত্য, তেমনই খোলা মঞ্চে যত্রতত্র কবিতার নামে রেচন ত্যাগিবেন না। অনেকেই ভাবিয়া নেন যে, তিনি ঢেকুর তুলিলেই একটি কবিতার জন্ম হয়, তাহাদের অনুরোধ, সেই সকল বদহজমের ফসলকে নিজস্ব সংগ্রহের রাখিয়া দিন দয়া করিয়া, সামাজিক ভদ্রতার খাতিরে প্রকাশ্যে আপনার এই ঢেঁকুরের বদনাম না করিলেও নিজস্ববৃত্তে আপনাকে লইয়া খোরাক পরিবেশন করিয়া থাকে আপনারই নিকট বন্ধুস্বজন।। কারন আপনার নিজস্ব রচনা (রেচন হইলেও) আপনার নিকটে অবশ্যই ভাল, কারন স্বিয় ত্যাগকৃত গন্ধবায়ুতে দুর্গন্ধের পরিমাপ নিরুপন করা সকল সময় সম্ভবপর হয়না নিজের দ্বারা। সামাজিক মাধ্যমেও বিভিন্ন মঞ্চ রহিয়াছে , যাহা উঠতি প্রতিভাদের জন্যই সংরক্ষিত। জল মাপিতে হইলে ওই স্থানই সর্বত্তোম

সময়ের তাড়নাতেই সময়োপযোগী কবিতার জন্ম হইয়াছে, এখনও হইতেছে, আগামীতেও হইবে। বাস্তবের প্রেক্ষিত হোক বা কল্পনার পটভূমিতে অঙ্কিত, প্রগতিশীলতা বা আধুনিকতার নামে যেন শৈল্পিক নান্দনিকতা না হারাইয়া যায়। সৎ চেষ্টা সফল হইতে বাধ্য, ইতিহাস সাক্ষী। পাঠকের চৈতন্যের প্রতি অবশ্যই সৃষ্টির দায় বর্তাইয়া থাকে। ফাঁপা শব্দবন্ধের মেকি গড্ডালিকাপ্রবাহে ভাষিয়া না যাইয়া সমালোচোনার জন্য আহ্বানও জরুরী।

মেদ যেমন সুন্দরী নারীর আবেদনকে কুশ্রী করিয়া দেয়, তেমনি কবিতারও অতিরিক্ত শব্দ কবিতাকে গুরুত্বহীন করিয়া তোলে, সমালোচোনার অনুশীলনই পারে আগামীর কবিতাকে মেদবর্জিত ঝরঝরে আকর্ষনীয় রুপ দিতে

কবিতা কবি বিনে জন্মলাভে অক্ষম। আর সেই পতাকা থাক যোগ্যের হাতে, আর নিজেকে যোগ্য বানাতে প্রয়োজন কাব্যবোধ, সাথে প্রচুর অনুশীলন, আর প্রতিষ্ঠা লিপ্সা। কবিতা হউক সাবলীল আর প্রাঞ্জল। মোটের উপর কবিতা মানুষ ও মানবতার কথা বলুক। তাহার জন্য কবি শিক্ষিত হউক বা না হউক, কাব্যজ্ঞানরহিত যেন না হন। কবিতা মাথা উঁচু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারের সামাজিক চিন্তায় চিন্তিত হয়ে, অন্ধকার দূর করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, সমাজ বদলের অঙ্গীকারে উৎসাহ জোগাবে মানুষের হৃদয়কে। নিয়ে যাক রুপকথার অন্তরে, শোনায় সুখ দুখঃখের গীতমালা।

শুধু শব্দের খেলা নয়, সমকালীন কবিতায় থাক শব্দের সঙ্গে শব্দের মেলবন্ধন বা গাঁথুনি, প্রয়োজনে ছন্দও স্থান পাক অন্ত্যে। বাক্যবিন্যাসে থাকুক মজবুত ভিত, যা সমাজ ও কালকে স্পর্শ করার ক্ষমতা রাখবে, এই বিশ্বাসটা আগে নিজের মধ্যে জন্মাক। আর সেটা সম্ভব হইলে তবেই কবিতার শরীরে ধরা পড়িবে ভালোবাসা ও মমতার প্রলেপ


 

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...