(১)
শরতের আকাশ, তবুও তার মুখ ভার। বাইরে
অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারা, আজ টানা দুদিন ধরে এক মুহুর্তের জন্যও রোদের মুখ দেখেনি
কেউ। চালুনিতে আটা চালার মত করে গুঁড়ি গুঁড়ি
বৃষ্টি সমানে ঝড়েই চলেছে। বসে শুয়ে কতক্ষন আর মোবাইলের কাঁচে বুড়ো আঙুল বুলিয়ে সময়কে
ধাপ্পা দেওয়া যায়! টিভিও এই সময়গুলোতে ভালো লাগেনা। তারপরেও যদি একটু খবরের
চ্যানেল বা খেলা দেখার শখ যায় তারও উপায় নেই। ডিজিটাল সেটটপ বক্সের মহিমা অপার, আকাশে মেঘ ধরেছে কি সিগনাল ভাগলপুরে। ফোনে কারোর সাথে খেজুরে আলাপ জুড়বো তেমন কেউ ফাঁকা নেই,
জানলা দিয়ে লোক দেখতেও বড্ড বিরক্ত লাগছে। মোটকথা ঘরেতে মন বসছেনা মোটে-
এমন বালাইটা গেলে বাঁচি। কিন্তু
নিন্মচাপের মহিমা এতো সহজে যাবেনা। গোট
দীপাবলির আমেজটাই মাটি। মুর্তিমানেরই বা কি উপায় করি! সওয়া দায় হয়ে পরেছে। মানে
মানে ঠেকে গিয়ে তেলেভাজা আর চা সহযোগে টোয়েন্টি নাইনই অগতির গতি আপাতত।
-আপনি কোথাও যাচ্ছেন নাকি?
- (শ্রবণ গ্রন্থি নিষ্ক্রিয় সম)
- ফিরবেন এখনি তো?
জবাব না দিয়ে বর্ষাতিটা গায়ে
গলিয়ে শিরোস্ত্রান সহ বাইকে সাওয়ার হলাম।
আমি অতনু দত্ত, দিল্লির একটি
নামি ম্যানেজমেন্ট কলেজ থেকে স্নাতোকোতর ডিগ্রীধারী। পারিবারিক আমদানি রপ্তানির
ব্যাবসা, পিতা সেই কুলীন ব্যাবসার অধিপতি। তাঁর ব্যাক্তিত্ব গুণের জোরে রাজা
উজিরেও সম্ভ্রমের সাথে তাঁর অনুসঙ্গী হন। সেই অশোক দত্তকে যে আমাকে মেনে চলতে হবে
অক্ষরে অক্ষরে তাতে আর আশ্চর্যের কি! তবে আমার মা ই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র
ব্যাক্তি যার সামনে বাবাও ইতস্তত বোধ করেন।
গ্রীষ্মের ছুটিতে ওনারা ওনাদের
বয়স্ক বন্ধু দলের সাথে ডুয়ার্সের মুর্তি নদীর তীরে সরকারি টুরিষ্ট লজে ছুটি কাটাতে
গেছিলেন। সেখানেই ওনাদের সহযাত্রী তারকনাথ মিত্র
মহাশয়ের কন্যা অনন্যাকে দেখে মায়ের বৌমা বাৎসল্য জেগে উঠতেই সর্বনাশের শুরু। আমার
বিয়ে, অথচ সে বিষয়ে আমার মতামতকে কখনই মান্যতা দেবার মত গুরুত্বপূর্ণ ভাবেননি
তাঁরা। ফলাফল এই আজকের পরিস্থিতি। আজ ফুলশয্যার দ্বিতীয়দিন।
(২)
- এ্যাই শুনুন, আপনি কি আমার হাতটা ছুঁতে চাইছেন?
অনন্যার কথা শুনে চমক ভাঙল। ওর কাঁচা রূপে এতটাই মগ্ন ছিলাম
ওর প্রতি, যে খেয়ালই করিনি কখন ও জেগে গেছে। ওর কথা শুনে একটু থতমত আর অবাকই হলাম, কিভাবে ও জানল আমার মনের কথা! প্রায় আধা
ঘন্টা নাগাড়ে অনন্যার বিছানার পাশে বসে আছি, রুমে
আসা ইস্তকই ভারী ইচ্ছা হচ্ছিল ওর হাতটা একটু ধরি। কিন্তু একটা বিচিত্র
ধরনের সংকোচবোধ কাজ করছিল, নিজের
বিবাহিত স্ত্রীর হাত ধরতে এত সংকোচ কেন মাথায় আসছিল না? এখনো ওকে ভালবাসতে পারিনি বলে কি! নাকি ওকে ভালবেসে ফেলেছি তাই। আমাদের মধ্যে
যদিও পরিচয়টাই তেমন ভাবে হয়নি।
ও আরো অনেক কিছু বলে যাচ্ছে
বুঝতে পারছি, কারন গোলাপের পাপড়ির মত কোমল পাতলা ঠোঁট দুটি ঈষৎ উঠানামা করেই
চলেছে। আমার সকল ইন্দ্রিয় আঁক কেবলমাত্র চোখে আঁটকে, আজ আমার শুধুই দেখার দিন। দু চোখ মেলে দেখার দিন, প্রাণ খুলে দেখার দিন। বুঝতে
পারছিনা কিকরে এই পাহাড় প্রমাণ লজ্জাকে নিয়ন্ত্রণ করব। সেই কলেজ জীবন থেকেই একটা
ফ্লামবয়েন্স মার্কা ইমেজ ক্যারি করে যাবার দরুন এ যাবৎ প্রেমিকা সঙ্গ থেকে কখনই রিক্ত
ছিলামনা, না তাবলে চরিত্রহীন ছিলামনা। কিন্তু উপরওয়ালা শেষ পর্যন্ত কোনোটাই শেষমেশ
ক্লাইম্যাক্স পর্যন্ত পৌছাতে দেয়নি। কারনটা আজ পরিষ্কার হল; আসলে আমার নিয়তি বাঁধা যে এই হাতেই ছিল। যেটা ছুঁতে
হেব্বি মন চাইছে।
এ বিয়েতে আমার সে অর্থে তেমন মন
ছিলনা মোটে, কিন্তু বাবার মতের বাইরে যাব সে সাধ্যিও ছিলনা। বিয়ের আগে অনন্যার সাথে আমার কথা হওয়া তো দুরস্থান আলাপটুকুও করিনি। যারজন্য, যাকে চিনিনা জানিনা তার সাথে হঠাৎ করে কিভাবে
একঘরে থাকব ভেবেই পাচ্ছিলাম না। এই মুহুর্তে আমার কোনো প্রেমিকাও ছিলনা যে, হৃদয়ে
তার উপস্থিতি অনন্যার প্রবেশে অন্তরায়। অনন্যার সাথে সম্বন্ধটা আসার পর ফেসবুকে ওর
প্রোফাইলটা খুঁজে ছবিছাবা দেখেছিলাম। দেখে আমার খারাপও লাগেনি ভালও লাগেনি। তাই
হয়ত ভালবাসাটা জন্মানোর পরিসর পায়নি।
৩)
আমাদের চার পুরুষের নিবাস
ঢাকুরিয়া অঞ্চলে,
অনন্যাদেরও কোলকাতা শহরেই বাস। উত্তরে শিমলা অঞ্চলে, তাই চেনার কথাই নেই। আমার অফিসের ডিউটি বর্তমানে ওই
বিধানসরনী লাগোয়া হাতিবাগান অঞ্চলেই। অনন্যা মেধাবী ছাত্রী, নতুবা প্রেসিডেন্সীতে চান্স
পেতনা। লেখাপড়াটাকেই আমি প্রাধান্য দিয়েছি বাড়িতে, এবং আমার বাবা মা এটাতে আপত্তি
করেনি। এই বাহানা ও উদ্দেশ্যতে অনন্যা এখন ওর বাবার বাড়িতেই থাকে। বাস্তবিক অর্থেই
বাবার বাড়ি, শৈশবেই মাকে হারিয়েছে। তারকনাথ বাবু মানে শ্বশুরমশাই আর বিয়ে করেননি,
কচি মেয়েকেই হাতেপিঠে মানুষ করেছেন।
বহু চেষ্টা করেও আমরা সেই
রাত্রে স্বাভাবিক হতে পারিনি। ওর সাথে আমার বয়সের পার্থক্য ঠিক ১২ বছরের, মাত্র ১৯
বছর অনন্যার। আসলে আমিও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, সে আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে ঠিক কতটা
তৈরি। আমিও কোনো যৌনকাঙাল নই যে নারী শরীর দেখলেই ঝাঁপিয়ে পরব। তবে এ মেয়ে যথেষ্ট
ফরোয়ার্ড, আমার সসঙ্কোচ অবস্থার গোটাটা সে এঞ্জয় করেছে চুটিয়ে।
আমাদের সম্পর্ক যে ঠিক স্বামী-স্ত্রী
টাইপের নয় এটা আমাদের দুজনের পরিবারের কেউ জানেনা, কারন আমরাই জানাইনি। সবাই জানে, আমি দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি,
দিল্লি, বোম্বে করছি রোজ, তাই নতুন বৌকে বাপের বাড়িতেই রেখে আসা হয়েছে। তাছারা
পড়াশোনা, কলেজ, কোচিং তো রয়েছেই, সর্বপরি একই শহরের তো দুটো প্রান্ত ভারী; চাইলেই
যখন খুশি আসা যাওয়া করাই যায়। আমার ধান্দা অবশ্য অন্য, যতদিন না ওকে চিনছি ততদিন
একসাথে থাকার প্রশ্নই নেই। তাতে সারাজীবন হলে তাই ই সই। শুধু রূপ, যৌবন আর মেধাবীপনা
দিয়ে জীবন চলে? বন্ধুত্ব ছাড়া কিভাবে সংসার করা যায় আমি ভেবে কুল করতে পারিনি।
অনন্যা বহু বার চেষ্টা করেছিল
আমার কাছে থাকার, কিন্তু আমার শরীরিভাষা ওবে সম্ভবত উত্তর দিয়ে দিয়েছিল। তাই সে,
আমার সিদ্ধান্তকে ও “আমাদের” বলে সানন্দে মেনে নিয়ে ছিল সম্ভবত। টিনেজ মেয়ে হলেও
যথেষ্ট পরিণত সে।
গত কালকের একটা কথা বলি। সকাল সাতটা
মত বাজে, স্বাভাবিক ভাবেই ঘুম তখনো ভাঙেনি। শনিবার
ছিল তাই অফিস যাবার তাড়া নেই। বালিশে চাপা পড়ে থাকা ফোনের ভাইব্রেশনে ঘুমটা ভেঙে গেল।
বিরক্ত একটু লাগছিল ঠিকিই তবুও স্ক্রিনে নাম না দেখেই ফোনটা ধরলাম,
- হ্যালো
- (নিশ্চুপ)
এ কাজটা একমাত্র অনন্যাই করে। অনেকক্ষন পর কথা শুরু করে,
প্রতিবারই।
আমি আবার বললাম,
- কিছু বলবে
- হুম
- বলো
- তোমার...
- হ্যাঁ কি হয়েছে! আগেও কি কিছু বলবে! নাকি ওখানেই থেমে
থাকবে!!
- তোমার কি সময় হবে আজ দুপুরে
- কেন?
- না এমনি কিছুনা, তবে...
- কি তবে!
- মানে, আজ আমার জন্মদিন
- আরে বাহ। দারুণ ব্যাপার তো। শুভ জন্মদিন, শুভেচ্ছা নিও।
- শুধুই শুভেচ্ছা? দেওয়ার মত কি একটু সময় হবে! তাহলে
শুভেচ্ছার সাথে ওই সময়টুকুও নিতাম
- ইয়ে মানে, বুঝতেই তো পারছো, কটাদিন টানা ঝামেলা গেছে অফিসের
কাজে। আজ একটা প্রিপ্ল্যানড প্রোগ্রাম আছে বন্ধুদের সাথে। নেক্সট টাইম, শিওর।
প্লিজ মনে কিছু করো না।
- আরে ঠিক আছে, এতো প্লিজ বলতে হবেনা। আমারই ভুল। আগে বললে
হতত এটাই প্রি প্ল্যানড হত।
৪)
সময় যে ছিলনা তা মোটেই নয়, বন্ধুদের সাথে প্রোগ্রামটা
জ্যান্ত মিথ্যা। কেন জানিনা অনন্যাকে দূরে রেখেই একটা কষ্ট কষ্ট সুখ পাই। কাছে
গেলে, সকলকিছুতেই ওর ওই নিস্তব্ধ সম্মতি আমাকে দিশেহারা করে দেয়। যাই হোক গোটা
দিনটাই আর ঘর ছেরে বেড় হলামনা। সারাদিন ফেসবুকে আর ঘুমিয়ে ল্যাদ খেয়েই কাটিয়ে
দিলাম। বিকালের দিকে টিভিতে অনুর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে ফেবুতে বেখেয়ালে
টাইমলাইনে সাঁতরাচ্ছি। হঠাত টুং করে মেসেঞ্জারে শব্দ। মেসেঞ্জার খুললামনা, নোটিফিকেশন
প্যানেলেই দেখে নিলাম।
- সত্যিই কি খুব ব্যাস্ত ছিলে? সারা দিনিই তো অনলাইন দেখলাম।
সাথে একটা কান্নার ইমোজি।
আমি মেসেজ সিন করতেই, টুং করে আবার পরের মেসেজটা ঢুকলো।
- খুব কি কিছু বেশি চেয়েছিলাম আপনার কাছে! একটু সময় ছাড়া তো
আর কিছু চাইনি
আমি একটু ক্ষনিকের জন্য আপ্লুত হয়ে পরলাম ও সেই মত ভিডিও কল
করে বসলাম, সে রিসিভ করলনা। অদ্ভুত একটা বিষাদ আমাকে ক্রমশ গ্রাস করছিল। সারারাত অনন্যার
মুখটাই মননে ভেসে উঠছিল বারেবারে, সাথে উল্টোপাল্টা অজানা সব ভাবনারা ভিড়
জমাচ্ছিল।
আচ্ছা বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েরা তাদের স্বামীকেই প্রেমিক বলে
মেনে নেয়! কই ছেলেরা তো পারেনা। অথবা হতে পারে ছেলেরাও পারে, আর আমি হয়ত উন্মাদ।
তাই পারিনা। প্রেমিকাকেই তো সকলে বউ হিসাবে পেতে চাই, তাহলে বউকে প্রেমিকা করে
নিতে বাঁধা কোথায়? আমাদের সনাতনী ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থাতে এভাবেই তো সবসময় হয়ে
এসেছে।
নিশ্চিত আমি পারিনি অনন্যাকে ভালবাসতে, ভালবাসলে কাছে যেতে
এতো দ্বিধা থাকতনা। বিয়ের রাতেও ওর সাথে আমার ছোড়া
ছোড়া কথা হয়েছিল। সারাটা রাত বিছানায় ঘুমের অভিনয়
করেই কাটিয়ে দিয়েছিলাম। ওই রাতের পর আর সাকুল্যে তিন রাত আমরা এক ঘরে কাটিয়েছিলাম,
সেটাও তথৈবচ। আমি দুপুরে অফিস গেলে বা ভিনরাজ্যে গেলে ও নিয়ম করে আমাদের বাড়িতে
আসে, মায়ের সাথে রান্নাঘরে সময় দেয়। আমার ঘর ওর মনের মত করে সাজায়। শ্বশুর এখনও
রিটায়ার্ড করেননি, সরকারি উচ্চপদস্থ আমরা; তাই অনন্যার টাকার অভাব নেই। এটা আমি
জানি কিন্তু জেনেও ওর এই আসাটাকে চরমভাবে অগ্রাহ্য করে গেছি।
৫)
আজ সকালে অফিসেই ছিলাম, তখনি অনন্যার
বাবা ফোন করলেন। মৃদুভাষি এই ভদ্রলোককে আমার বেশ পছন্দ মানুষ হিসাবে। তিনিও তার একমাত্র জামাইকে
খাতির যত্ন আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি রাখেননা।
- অতনু বলছো তো!
- হ্যাঁ, নমস্কার আঙ্কেল। আমিই বলছি।
- সককিছু কুশল মঙ্গল তো!
- হ্যাঁ হ্যাঁ, কিছু জরুরী বিষয় বলার আছে কি!
- না তেমন কিছু নয়, আসলে অনন্যা...
- অনন্যা! কি হয়েছে ওর! অসুখ বিসুখ হল নাকি!
- না না, সে সব ঠিক আছে। আসলে গত দুদিন থেকে কেমন যেন মনমরা।
ঠিকঠাক খাওয়া দাওয়া করছেনা। সকালে মাথা ঘুরে বাগানে পড়ে গেছিল, কাজের মেয়েটা আমাকে
ফোন করতে আমি বাড়ি এলাম এই মাত্র। এমনিতে কিছু হয়নি, সামান্য কপালে চোট লেগেছে।
আসলে ওর মা নেই তো, বুঝতে পারছিনা তোমার সাথে কোনো খুনসুটি হল কিনা। কিছু মনে
কোরোনা বাবা।
- আচ্ছা আপনি চিন্তা করবেননা, আমি কাছাকাছিই আছি। মিনিট ১৫-২০
এর মধ্যেই আসছি
- আচ্ছা বাবা
আমি ভাবতেই পারিনি ওই জন্মদিনে আমার অবজ্ঞাটা ওর নিতে
পারবেনা মন থেকে। ভাবতে গিয়ে সময়নষ্ট না করে সোজা রাস্তায় নেমে এলাম। ড্রাইভাল এই
সময় ওদের দেশওয়ালি ভাইদের ঠেকে তাস খেলে, ডাকলে আসতে আসতে ঘন্টাখানেক লাগাবে। ওলা
ক্যাব বুক করব কিন্তু রাস্তার যা ট্রাফিকের হাল ভরসা হলনা। তাই হাঁটাই জুড়লাম, খুব
বেশি দুর তো নয় হাতিবাগান থেকে সিমলা। খানিক পরেই পৌছালাম, দেখি খাটে
শুয়ে আছে অনন্যা। আমাকে দেখে ধরপরিয়ে উঠে বসল। কাজের মেয়েটা চা করতে যাচ্ছি বলে
বেড়িয়ে গেল। এদিকে শ্বশুর মশাইও বললেন- “তোমরা কথা বলো বাবা, অফিসে না বলে এসেছি।
যাব আর আসব, এই তো ডালহৌসি। আমি এলে তুমি যেওক্ষণ”।
কি যে জবাব দেব বুঝে উঠতে উঠতেই শ্বশুর হাওয়া হয়ে গেলেন।
এতো বড় বাড়িতে একটা প্রায় অপরিচিতা সদ্য যুবতী, সাথে আমার মত উচ্চশ্রেনীর আঁতেল।
খেয়াল করলাম কপালের কাছটা একটা অংশে কালশিটে পড়ে গেছে। আর সেটা বেশ ফুলেও রয়েছে।
আমি কিছুটা অপ্রস্তুতভাবেই দেখছিলাম সেটা, হঠাৎ বলে উঠল-
- একটু ছুঁয়ে দেবেন!
- মানে
- মানে আর কি!, বলছি কতটা লাগল ছুঁয়ে দেখবেননা?
- আমি ছুলে সেরে যাবে?
- না তার গ্যারান্টি নেই। বলে বলাও তো যায়না, কার কখন কোন
সুপ্ত প্রতিভা খোলে ( সাথে একটা দুষ্টু হাসি)
- বাবা রামরহিম বানানোর তাল নাকি!
- তা আমি আর হানিপ্রীত হতে পারলাম কই। (বলে চোখ বুজল)
এদিকে আমি খেয়াল করলাম, আমি কখন যেন ওর শিয়রের গোড়াতে বসে
পড়েছি। আর ওর শরীরের উষ্ণতাটা পরিষ্কার অনুভব করছি ব্লেজারের পরত থাকা সত্বেও। দুম
করে আমার বাম হাতটা আনমনে নিয়ে দুহাত দিয়ে শক্ত করে ধরে জোর করে চোখ বুজে রইল।
কয়েক সেকেন্ড পর ছেরেও দিল।
- গেছে? না আছে?
- কি!
- জাত, আবার কি!
- মানে! মাথায় আঘাত খেয়ে কি ভুল বকতে শুরু করলে নাকি!
- না মশাই, ভুল বকিনি। বলছি এই যে আমি ছুলাম, তাতে আপনার জাত
অক্ষত আছে কিনা শুধাচ্ছিলাম। আমি অন্ত্যজ শ্রেনী কিনা...
- মস্করা হচ্ছে!
- আহারে, আমার ভাসুর ঠাকুর এসেছেন। থুক্কুরি ঘাট হয়েছে আমার
- ভাসুর হব কেন! তুমি তো আমার বিবাহিত স্ত্রী
- ওমা, এ কি অলুক্ষুণে কথা। মাথায় চোট আমার এলো, আর
বাবুসাহেবের মতি পরিবর্তন
একটু লজ্জাই লাগছিল, তবুও ‘আমার বৌ’ কথাটা বলতে পেরে যেন
বুকের উপরে চেপে থাকা দশমণ পাথরটা যেন সরে গেল।
- বাব্বা, লজ্জায় তো এক্কেবারে লাল হয়ে গেলেন দেখছি
- না না, লজ্জা পাবো কেন!
- তাহলে এমন ফাঁকা বাড়িতে হাত ধরছেননা যে, আমি কি বুড়ি?
কুৎসিত? কুলোটো? নাকি সতীন আছে!
কি জবাব দেওয়া উচিৎ বুঝতে না পেরে ফের চুপ করে রইলাম, দেখি
সে নিজেই আমার ডান হাতটা দুই তালুর মাঝে নিয়ে কচলাতে শুরু করে দিল।
- মিঃ টমাট্যোর রাঙা লাজ দেখে লজ্জাবতীও ঝামরে যাবে। মেয়ে
মানুষ হলে কি করতেন গো! আরে ছোঁয়া পেতে গেলে
কি কি যোগ্যোতা লাগে সেটাই নাহয় বোঝাননা।
এবারে আমি কেমন যেন নিজে থেকেই অন্য হাতটা দিয়ে ওর হাতটা
কষে চেপে ধরলাম। অদ্ভুত ভাবে সারা শরীরটা আমার শিথিল হয়ে গেল। বুঝতে পারছি, আমি
সম্মোহিত হচ্ছি ওই সদ্য যুবতীর উচ্ছল যৌবনের জাদুতে।
৬)
এই প্রথমবার অনন্যার চোখে চোখ রাখলাম। কি অপূর্ব ওর চোখের
পাতা গুলো। আধা অন্ধকার ঘরে ওর ফর্সা রঙের দ্যুতি, যেন আলোকের ঝরনা ঝড়াচ্ছে। সাথে
আত্মবিশ্বাসে ভরপুর দুটো চোখ।
-
কি হল
শক খেলেন নাকি।
-
উঁ
-
আমি
পরস্ত্রী নই
কথাটা বলতে বলতে আমার কোলের মধ্যে মাথাটা গুঁজে দিল।
বামহাতটা ওর হাতেই ধরা থকলো, আমার ডানহাতটা খানিকটা রোবটের মত ওর ঘাড়ের কাছটা
ছুঁয়ে রইল। পরিষ্কার বুঝতে পারছি, শরীরে বিদ্যুৎ শিহরন খেলে যাচ্ছে দুজনেরই।
অনন্যার সারা শরীর জুড়ে কাঁটা।
এই মেয়েটাকেই আমি আজকে ৭টা মাস ধরে প্রতি নিয়ত দূরে ঠেলে
রেখেছি ছুতো নাতাতে। অথত এতেই আমার চরম সুখ, যে উপলব্ধি জীবন থেকে ইচ্ছাকৃত ৭ মাস
মুছে ফেলেছি। বুঝলাম, অনন্যা ফোঁপাচ্ছে, আমারও বুকটা যেন কেমন করে কেঁপে গেল।
শরীরটা ক্রমশ কুন্ডুলি পাকিয়ে যেন আমার কোলের আশ্রয়ে নিজেকে বীলিন করে দিতে চায়।
কোনোক্রমে অনুভূতি লুকাতে, ঘুলঘুলি দিয়ে আকাশ দেবার বৃথা প্রচেষ্টা করতে লাগলাম।
ঠিক কতক্ষন পর জানিনা, অনন্যা এবারে উঠে বসল।
-
সরি,
নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। আসলে অসুস্থ শরীরতো...
-
কোথায়
অসুখ! এই তো পুরো মামনি মার্কা পোজ
-
তাহতে
তোমার এই আড়ষ্টতা কেন! ইচ্ছা করেনা আমাকে পুরোটা পেতে? জানো আমারটা কেমন সন্দেহ
হয়, আমি অদৌ মেয়ে তো?
-
চুপ
চুপ
-
দেখি থরথর করে ঠোঁটটা কাপছে, যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। নির্মেদ
বেতেত মত শরীর, বক্ষে সুউচ্চ হিমালয় সম স্ত্রীসত্তার অহঙ্কার। অনন্যা শুরু থেকেই
এমন মারাকাটারি সুন্দরী? যেটা আমাকে আতো ভীত করে রেখেছিল। টানা এতোগুলো দিন আমি ওর
ফোন ধরিনি, মেসেঞ্জারে জবাব দিইনি। পারতপক্ষে ওকে প্রতি পদক্ষেপেই অপমান করে গেছি।
যেটা ওর নারীসত্তার অস্তিত্বকে নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, নিজের মনে মনে। তার পরেও
কি চরম ক্ষুধা, আমাকে একটু খানি পাবার জন্য। একটু ছোঁয়ার জন্য। বেশ অপরাধি মনে হচ্ছিল
নিজেকে।
- আচ্ছা তাহলে চলি আজকে
- মানে! ভুল করলাম কি কিছু! বাবা যে বলল...
- না না, আমিও তো অফিসে কিছু বলে আসিনি, তাই ...। আসব তো আবার
দেখি সে উঠে দাড়িয়েছে, আর চোখের নজর পায়ের বুড়োআঙুলের দিকে।
থুতনিতে হাত দিয়ে মুখটা তুলে ধরতেই সে সটান আমাকে জড়িয়ে ধরল। আহ... আমিও যেন
সেটারই প্রতীক্ষাতে ছিলাম, অথচ বুঝতেই পারিনি। ছলছল চোখে আমার চোখের দিকে তাকাতেই,
কপালে ঠোঁটটা ছোঁয়ালাম আলতো করে। আলিঙ্গনের মুজবুতিটা এমন জোড়ের সাথে জেঁকে বসল,
যেন সে আমার ভিতরে সেঁধিয়ে যেতে চায়। এতক্ষণে অনুভব করলাম, সে আসলে আমারই একটা
অংশ।
হঠা করে কলিং বেলে আওয়াজ, বুঝলাম শ্বশুর বা পরিচারিকা
এসেছে। মধুর মিলনের আপাত সমাপ্তি ঘটল। বড্ড বিরক্ত লাগছিল এই বিজ্ঞাপন বিরতির মত
তৃতীয়জনের উপস্থিতি, সেটা অনন্যাও বুঝল।
- এতো উতলা হলে হবে বাবু! চলো আজ তোমার চরিত্র হনন করব
বলে ফিক করে দুষ্ট হাসি দিয়ে দরজা খুলতে চলে গেল। বেশ টের
পাচ্ছি, কোথাও একটা খিদের বন্ধ দুয়ারমুখ খুলে গেছে। আর সেই পথ দিয়ে ক্ষুধারা
ক্ষুধার্থ হায়েনার মত বেড় হয়ে আসছে। অনন্যা ফিরে আসতেই আবার ওকে বাহুডোরে আবদ্ধ
করতে চাইলাম
- উঁহু, মোটেই নয়। সবুর করো চাঁদু, বাবা আছে বাড়িতে
- তাহলে!
- তাহলে আর কি! তিষ্ঠ, আপাতত অফিস যাও। আমি কিছু ভাবছি।
- জো হুকুম রানী ক্লিওপেট্রা
৭)
অফিস পৌছাতে না পৌছাতেই মেসেঞ্জারে টুং
- আইডিয়া
- কি আইডিয়া
- আজ আমাদের ফুলশয্যা
হবে
- তা সেটা কোথায় হবে শুনি! আমার বাড়িতে বাবাকে বললে কচুকাটা
করবে, আর তোমার বাবার সামনে ...
- নেকু, বাড়িতেই কেন! বরং দুজনেই বাড়িতে বলি আমরা আমাদের
শ্বশুরবাড়িতে থাকব। না না বরং আমরা আমাদের শ্বশুরকে বলি । ক্রস চকিং করবে এমন
সম্ভাবনা নেই
- তা, যাওয়াটা কোথায় হবে শুনি!
- কেন হোটেলে! তুমি শুধু গ্রিন সিগন্যাল দাও। বাকিটা আমি
মেনেজ করছি।
- ওক্কে, সতীর ইচ্ছাই পতির ইচ্ছা, নইলে সোহাগ কমে।
- ওক্কে ডান। ঠিক সাতটার সময় বাড়িতে এসো। আমি ওয়েট করব।
- বেশ, আমি এখন বাড়ি ফিরছি। সন্ধ্যায় ড্রাইভারকে নিয়ে চলে আসব
- না, ড্রাইভার নয়। নিজে চালিয়ে এসো বা ক্যাব নিয়ে নিও।
- বেশ।
ঠিক সাতটা পাঁচ, অনন্যাদের
বাড়িতে প্ল্যানমত পৌছাতেই দরজা খুললেন সদাহাস্য শ্বশুরমশাই। আর তাঁর প্রায় বগলদিয়ে
গলে ধরপরিয়ে বেড়িয়ে এল শ্বশুরের কন্যাশ্রী। হাতে একটা ঢাউস ব্যাগ। চুপিচুপি
শুধালাম-
- পালিয়ে যাচ্ছি নাকি! ব্যাগে কি আছে!
- এতো কৌতুহল ভাল নয় মশাই
- আসছি বাবা। দরকার হলে ফোন করবে যত রাতই হোক
আমিও সেই অনুসারী হয়ে শ্বশুরকে বাই বলে গাড়িতে চড়ে শুধালাম,
তাহহলে এবার আমাদের গন্তব্য!
- চলো ফেয়ারলি। ফ্লোটেলে রুম বুক করেছি।
বলে মুখে একটা ক্যান্ডি গুঁজে দিল। যৌবনের প্রানচঞ্চল
উচ্ছলতা বোধহয় একেই বলে। আমার ওর ওর বয়সের ফারাকটা যেন ক্রমেই মিশে যাচ্ছে ওর
প্রাণশক্তির কাছে। সারাটা রাস্তা আমার একটা হাত ধরে বসে রইল, এ যে কি অকৃত্রিম
অনুভূতি বলে বোঝানো কঠিন। কোলকাতার এই জনঅরণ্যে গাড়ি চালানও কি এতো সুখের এর আগে
কখনো হয়েছে! ভাবতে ভাবতে কখন যেন মিলেনিয়াম পার্কের গেটের কাছে চলে এসেছে।
গাড়িটা পার্ক করে, নামতেই অনন্যার সেই বোঁচকার দায় নিজের
ঘাড়ে তুলে নিল একজন ওয়েটার। আমরা গিয়ে বসলাম উপরের ডেকে। মুখোমুখি চেয়ারে আমরা
দুজন। আমার সামনে অনন্যা আর ওর পিছনে বিদ্যাসাগর সেতু। ওর সামনেও শুধুই আমি আর
আমার পিছনে হাওড়াব্রীজ। হানিমুন প্যাকেজ নিয়েছে সম্ভবত। ওয়েলকাম ড্রিঙসের পর আমাকে
একটু বসতে বলে অনন্যা রুমে চলে গেল। চুপচার বসে আছি, একজন এটেডেন্ট এসে আমাকেও
অন্য একটা রুমে নিয়ে গেল। দেখি সে এক এলাহি কান্ড। রীতিমত রাজরাজরাদের মত
ব্যাপারস্যাপার। একটা পেশোয়ারি শেরওয়ানী পরিয়ে দিল তারাই, খানিক পড় এসে আবার ভাবতে
লাগলাম সেই ডেকে বসে। যে হচ্ছেটা কি!
বিয়েতো অনেকেই করে, কিন্তু এমন সুযোগ কজনে পায়! নতুন করে
বাসর সাজানোর সুযোগ! নিচে কুলুকুলু করে গঙ্গা বয়ে চলেছে। কত প্রেমিক-প্রেমিকার
যাবতীয় ক্ষোভ অপমান বঞ্চনা জ্বালাকে জলাঞ্জলি দিয়ে আজ এমন সুখ সন্ধ্যাতে উপনীত হয়।
আজ আমার প্রিয়াকে তীব্র সোহাগের আশ্লেষে বিদ্ধ করে নিজেকে রিক্ত করতে চাই, এই
ভাবনাতেই বিভোর হয়ে রইলাম। একটা শুধু খুঁতখুঁত লাগছে, শুরুটা কিভাবে করব!
আধাঘণ্টা পর হঠাত চোখে বিভ্রম হওয়ার মত ব্যাপার স্যাপার। এ
যেন সাক্ষাৎ পঞ্চদশ শতকের রাজপুত রমণী, এমন সাজপোশাকের বৈভব। বুঝতে বাকি রইলনা ওই
ব্যাগে এই সব কাপড়চোপর আর কসমেটিক্সই ছিল। বাকি ওর মেকাপ আর্টিষতকে এখানে ডেকে
নিয়েছে। প্রেসিডেন্সির মেয়ে বাবা, ঘোল খাইয়ে দেবে। এই একটা দিন নিয়ে মেয়েরা কতটা
প্যাশন রাখে অন্তরে, আমরা কজন ছেলে সেই খবর রাখি!
তারপর সারারাত কি হল? চরৈবেতি...
বাকিটা ব্যাক্তিগত।