“গঙ্গাগর্ভোস্থিত দ্বীপ দ্বীপপূঞ্জৈবর্হিধৃত। প্রতিচ্যাং যস্য দেশস্য গঙ্গাভাতি নিরন্তরম”।
আমাদের এই সুপ্রাচীন অঞ্চল নিজগুণেই প্রসিদ্ধ। মধ্যযুগের হেন কোনো কবি নেই যিনি সেন রাজাদের রাজধানী- গাঙ্গেয় এই ছোট্ট শহর নবদ্বীপকে নিয়ে সূক্ত বা পদাবলী বাঁধেননি। কবি কর্ণপুর, নুলো পঞ্চানন কিম্বা এডু মিশ্রের বর্ণনায় নদীয়া ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে তার সমৃদ্ধির নিশান রেখে দিয়েছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে নরহরি চক্রবর্তীর বৈষ্ণব সাহিত্য, সর্বত্র নবদ্বীপের উল্লেখ রয়েছে। গোটা মধ্যযুগে বিদ্যালাভ ও সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান ছিল আমাদের এই অঞ্চল; এখান থেকেই স্মার্ত রঘুনন্দন, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, বুনো রামনাথের মতো মণীষীরা সমাজকে দিশা দেখিয়েছেন। এই সব কিছুর উপরে প্রেমসাগর মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জন্ম ও লীলাভূমি হওয়ার দরুন এতদ অঞ্চলে কখনও সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ছিল না, বরং এক আশ্চর্য মিথোজীবীয় সৌভাতৃত্বময় সহাবস্থান দেখা যেত আদিবাসী, দেশীয় হিন্দু ও মুসলমানেদের মাঝে। নতুন শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে এই অঞ্চলে পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুর ভিড় বাড়তে বাড়তে দেশীয় হিন্দু, আদিবাসী ও মুসলমানেরা জনসংখ্যার ২০ শতাংশে এসে দাঁড়াবার দরুন অঞ্চলের চরিত্র বদলে গেল, পুরাতন ঐতিহ্য আজ তলিয়ে গেছে বর্ণময় অতীতের গর্ভে। এই স্বীকারোক্তির গল্পটা খুবই ছোট্ট, তাই একটা ভণিতা দিয়ে শুরু করি- এটা সেই আশির দশকের গ্রামবাংলার সমাজব্যবস্থার একটা ক্ষুদ্র চিত্রকল্পও বটে।
আমার তখন বছর আষ্টেক বয়স, সারাদিন দম ফেলার ফুরসত থাকে না, এত খেলার ব্যস্ততা। এক সংসারের বিশাল হেঁসেলের জোয়াল বইতে বইতে মায়ের সুযোগই ছিল না দস্যি ছেলেকে দু’দণ্ড নজরে রাখে। জমিদারী প্রথা বহু আগেই গত হয়েছিল, অপারেশন বর্গার পর জমির পরিমাণও কমে গিয়েছিল, কিন্তু জমিদারী মেজাজের ঘাটতি ছিল না। দাদুদের চার ভাইয়ের মধ্যে একজন শহরে চাকরি করলেও তিনজন এখানেই থাকতেন এক পেল্লাই ইমারতের মাঝে যৌথ সংসারে। আমরা ভাইবোনেরা অবশ্য সেই বাড়িতে আংশিক বড় হয়েছি, বাবা-কাকার বিয়ের পরেই পুরাতন বালাখানার পশ্চিমে পিচরাস্তার ধারে নতুন বাড়িতে উঠে আসে, মা সেখানেই নতুন বউ হয়ে এসেছিলেন। তবে নতুন বাড়িতে কেবলমাত্র রাত্রিবাস, খাওয়া-দাওয়া সহ বাকি সকল কিছু পুরানো বাড়ির খানকাতেই হতো, দুপুরের বিশ্রাম বলতে খানিক খানকার রোয়াকের সামনে পুকুর ও বাড়ির উত্তর দেহলির মাঝখানে কয়েক একরের বাচরা মতো স্থানটিতে বসে গল্পগাছা। বড়ি দেওয়া, আচার শুকানো, পিঠেপুলির জন্য প্রাকপ্রস্তুতি, চুলে চিরুনি দেওয়া, কাঁথায় ফুলেল নক্সা আঁকা কিম্বা সোয়েটার বোনা- সবই দ্বিপ্রাহরিক বাচরাতেই অনুষ্ঠিত হতো।
গোটা বাড়িটার চর্তুবেড়ে বাঁশবাগান, তারই মাঝে মাঝে ধানের মড়াই, ভূষিমালের গোলা। বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁশ ঝাড়ের নিচেই হাঁস-মুরগির খুলডো, গরুর গোয়াল, সারগর্ত আর ছাগলের মাচা। বাড়ির রান্নাঘরও ওই বাঁশবাগানের মধ্যে, তার চালে লাউ, কুমড়ো, শশার লতা। বাচরার শেষে প্রশস্ত হামাম মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ঘাট, চারকোণা পুকুরের উত্তরপাড়ে পারিবারিক গোরস্থান। পূর্বপাড়ে বিস্তীর্ণ খেলার মাঠের শুরুতেই বেশ কয়েক কুঠুরি দালান বাড়ি ছিল, তার মধ্যে একটা বৈঠকখানা, হাকিমের দাওয়াখানা, একটা নহবতখানা, একসার টানা মুসাফিরখানা। এর ঠিক পিছনে একটা ক্যাম্পবাড়ি। ক্যাম্পবাড়িতে দেশ স্বাধীনের পূর্বে নাকি পুলিসের ফাঁড়ি ছিল, নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি সময় অবধি ২-৩ জন কনস্টেবল থাকতেন। বাড়ির দক্ষিণে কয়েকশো মিটার দূরে ছিল অভিলাষের বাগান, বড় বড় ফল গাছের পারিবারিক বাগান। এই বাগানের শুরুতে দরগাতলা, তারপর একটা সাহেবকুঠি, এরপর পাঁচিলে ঘেরা বিস্তীর্ণ নীলকুঠির মাঠ ও তার দরদালান। ইস্কুলবাড়ির মতো এই সাহেবকুঠির নির্মাণ ব্রিটিশেরাই করেছিল, রেললাইন পাতার সময়। একপাশে তাদের ইঞ্জিনিয়ারেরা থাকত, অন্যদিকে কুলিবস্তি। তারা চলে গেলে দাদুর বাবা সেগুলো সস্তায় কিনে নেয়। এই বাড়িটাই কালক্রমে হয়ে উঠে মিস্ত্রীবাড়ির জাইরামঞ্জিল। এই ছিল তৎকালীন সময়ের আমাদের বাড়ির সুদীর্ঘ ভিটের বর্ণনা।
এই সমস্ত বাড়ি তৈরি ছিল ইয়া মোটা মোটা দেওয়ালের, পাটকেল রঙের বেলে পাথরের সাথে চুনসুরকির পেটাই করা মেঝে, লম্বা থাম, ছোট ক্যাসেজ, কড়িবরগা, জাফরি আর খিলানের মাথায় অর্ধবৃত্তাকার জানালা দরজা দিয়ে ইরানি-ফরাসি স্থাপত্যের এক মিশ্র নক্সার স্থাপত্য। কিছু কিছু ইমারতে ফিনিয়াল আর গম্বুজও ছিল। আমাদের পরিবারের ঊর্ধ্বতন কোনো পুরুষ পামির অঞ্চলের কোনো এক স্থান দেশ থেকে বাংলার ভূমে এসেছিল ‘মিস্ত্রী’ হয়ে, আমার ঊর্ধ্বতন তৃতীয় পুরুষ পর্যন্ত সেই পদবীই ছিল- যদিও মূল পদবী ছিল সেখ। আগেই বলেছি এটা নবদ্বীপ অঞ্চল, তবে ঠিক নবদ্বীপ নয় যা আজকের পুরসভা শহর।
“দ্বীপ নাম শ্রাবণে সকল দুঃখ ক্ষয়। গঙ্গা পূর্ব-পশ্চিম তিরেতে দ্বীপ নয়।পুরবে অন্তদ্বীপ, শ্রীসীমন্তদ্বীপ হয়। গোদ্রুমদ্বীপ, শ্রীমধ্যদ্বীপ চতুষ্টয়।কোলদ্বীপ, ঋতু, জহ্নু, মোদদ্রুম আর।রুদ্রদ্বীপ এই পঞ্চ পশ্চিমে প্রচার”।
এই ন’টা দ্বীপের মধ্যে আমাদের বসবাস মোদদ্রুম দ্বীপে, যা কালক্রমে গড়ে পরিণত হয়েছিল শ্রীচৈতন্য দেবের কল্যাণে। নবদ্বীপের এই মিশ্র সংস্কৃতির কল্যাণে বাড়িতে সেই অর্থে কোনো হার্ডকোর ইসলামিক নিয়মের বন্ধন ছিল না, তবে বাড়ির বৌ-শ্রেণীর মহিলারা সাধারণত সেভাবে বাইরে পরপুরুষের সামনে যেত না। বোরখার চল না থাকলেও সাত হাত ঘোমটা টানাটা বাধ্যতামূলক ছিল। পুরুষেরা জুম্মার নামাজে অধিকাংশই হাজিরা দিত, ব্যাস; এখানেই নামাজ পালনের ইতি। রমজান মাসে মহিলারা হায়েজের দিনগুলো বাদে সব রোজা রাখলেও, শেষ সাতদিন তথা শেষ তিনদিনে হৈহৈ রৈরৈ ব্যাপার হতো, কারণ বাড়ির অভিভাবক স্থানীয় পুরুষেরা এই কটাদিনই রোজা রাখত। বাড়ির বাচ্চারাও উৎসাহে জোহর পর্যন্ত রোজা রাখত। স্বাভাবিক ভাবেই ইফতারির দস্তরখানে খানাপিনার জুলুশ বসাতে খানদানি বাবুর্চিরা আসতেন। পঞ্চাশের দশকের আগে নাকি লক্ষ্ণৌ থেকে বাবুর্চিরা আসতেন, এখন মুর্শিদাবাদের লালবাগ কিম্বা কোলকাতার মেটিয়াবুরুজ থেকে আসে। অগুন্তি মেহমান, দরবেশ, পীর, ফকির, মাওলানা, মুয়াজ্জিন কতই না মুরুব্বিরা দরগাতলায় মেহফিলের রুহানিতে দোয়া, দরুদ পাঠ করতেন, সালাম-আসগর দিতেন- যাতে আল্লাহর রহমত নাজিল হয়।
ঈদ, মহরম, ঊরুষ, মিলাদের জশনের পাশাপাশি রথযাত্রা, দোলযাত্রা, রাসযাত্রা, অম্বুবাচীর হরেক আচার পালন হতো সমোৎসাহে। তবে মহাশিবরাত্রি পালনে হতো সবচেয়ে বেশি ধুমধামের সাথে। বিশ-পঁচিশ ক্রোশ দূরের গাঁ শান্তিপুর, ধুবুলিয়া, কাটোয়া থেকে, এদিকে রাঢ় ও দখিনা ভেল অঞ্চল থেকে লোক আসত উৎসব পালন করতে, বাড়তি হিসাবে পাওনা ছিল নবদ্বীপে গঙ্গাস্নান, এই সময় দরগাতলায় ম্যারাপ বেঁধে অন্নকূট উৎসব পালিত হতো। যদিও শ্রীকৃষ্ণের অন্নকূট উৎসবের সাথে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না, আগত পুণ্যার্থীদের খাওয়া-দাওয়া করানোর নামটাই ছিল অন্নকূট। এনাদের মহিলারা অধিকাংশেই গাদাগাদি করে উপরোক্ত জাইরামঞ্জিল, বৈঠকখানা, ক্যাম্পঘর, হামাম, নহবত, মুসাফিরখানা, নতুনবাড়ির বারান্দাতে থাকতেন। পুরুষেরা খানকা ও বাচরাতে মাথায় শামিয়ানা টাঙিয়ে, চটের পাতলা শতরঞ্জির নিচে খড় বিছিয়ে শুতেন।
মোট কথা উৎসব ছাড়াও সারা বছর বাড়িতে মেলা বসে থাকত আত্মীয় কুটুম্বে- কারণ মেহমানখানা ও জাইরামঞ্জিল নামের দুই সরাইখানার নিঃশুল্ক অন্ন ব্যঞ্জন; শুধু একটু কসরত করে বিপুল সাইজের এই ভিটের কোনো একটা ইমারতের কোনো একটা কোণে মাথা গোঁজার স্থানটা করে নিতে পারলেই নিশ্চিন্তি। মুসাফিরখানা একটু উচ্চাঙ্গের খাবার-দাবার থাকত, মানে রোজ দুপুরে মাছের পদ আর একটা অম্বল। কুলকুচি ও হাত ধোয়ার জন্য থাকত চিলিঞ্চি। জাইরামঞ্জিলের খাতকদের জন্য সপ্তাহে একদিন মাছ, নিজে যোগাড় করতে পারলে ডিম, বাকি ডাল সব্জি আর ভাজা- এই ছিল বারমাস্যা বরাদ্দ। রাত্রে এই দুই স্থানের জন্যই আটার রুটি আর কিছু একটা ভাজি বা ডাল, কোনোদিন একটু গুড় দেওয়া জাউ এর পায়েস- ব্যাস। পালে-পরবে মাংস হতো।
ঠাকুমাদের ভাইয়ের শালা থেকে দাদুর বোনপোদের ফুফুশাশুড়ির ননদাই এর মতো নিকটাত্মীদের ভিড়ের সাথে বাবা-কাকাদের বন্ধুর বন্ধু, তস্য বন্ধুতে গোটা অঞ্চল গমগম করত। দাদুদের মূল ব্যবসা ছিল ফসল মজুদ করে বজরায় করে কোলকাতায় চালান দেওয়া, তাই পাইকের, মহাজন, ফড়েদের সাথে মুন্সী, খাজাঞ্চি, সরকার, চৌধুরী, ধোপা, নাপিত, জেলে, রোজমুনিষ, রাখালবাখাল, চাকরবাকর মিলিয়ে দৈনন্দিন ভিড় মেলার চেয়ে নেহাত কম ছিল না। অনেকেই বছরের পর বছর এখানেই থাকত, তাদের মেয়েরা হেঁসেলে আর খামারে স্বেচ্ছাকর্মী হিসাবে কাজ করতেন, পুরুষেরা ব্যবসায়িক ও চাষাবাদী দেখভাল করত ফাইফরমাইসে। এই ভাবেই মাসের পর মাস দিব্ব্যি গড়িয়ে যেত, কেউ কাউকে মানা করত না। কেউ কাউকে সেভাবে নিমন্ত্রণও করত না, কেউ চলে যেতেও বলত না। প্রথমত জমিদারী মেজাজ বজায় রাখা, চাকরবাকর ছাড়াও কয়েকশো লোক কত্তাবাবু বলে কারণে-অকারণে মাথা ঝুঁকিয়ে থাকাটা বেশ উপভোগ করতেন দাদু ও তদুর্ধ্ব ঊর্ধ্বতন পুরুষেরা। দ্বিতীয়ত, লেঠেল না পুষেও এক হাঁকে একশত লাঠি সড়কি বেরিয়ে আসার জোরের জন্য এই বিপুল আয়োজন চালিয়ে যেত ধুরন্ধর পূর্বপুরুষেরা- বিনা বেতনে, শুধুমাত্র পেটেভাতের বিনিময়ে। সুতরাং, এই বাড়ির বড় বৌমা হিসাবে মায়ের শ্বশুরবাড়ির শুরুর দিনগুলোর অবস্থা কল্পনা করতে খুব একটা কষ্ট হয় না।
আমি তখন আইডিয়াল ইস্কুলে স্ট্যান্ডার্ড টু’তে পড়ি, এক শীতকালে কোনো এক আত্মীয়ের কিছু একটা লতাপাতা সূত্রে খান দুয়েক পরিবার এসে মিস্ত্রীবাড়ির আশ্রিত হলেন। এনাদের সূত্রেই কিছুদিন পর নিগারও এলো। নিগার মাসোনি আর তার ছোট বোন মেহের গুল তাদের বাবাব সাথে দাদুর কিসমাতে এসে আতুরাশ্রম প্রার্থনা করলেন। কোনো একটা স্থানে দাঙ্গাতে নাকি তাদের মা ও ভাই মারা গেছে, সহায়সম্বলহীন হয়ে চেনা এক বাঙালি পড়শি ব্রজ মোদকের সাথে এখানে এসে জুটেছেন। এখন বুঝি সেটা ছিল ৯২ এর বোম্বে দাঙ্গা। সময়ের পলি তাদের ভুলিয়েই দিয়েছিল প্রায়, স্বীকারোক্তি লিখতে বসে আবার স্মৃতির সাগরে ডুবুরি নামাতে ভেসে উঠল নিগার, নিগার মাসোনি।
নিগারকে কখনও বুবু-আপা-দিদি বা ফুফু-খালা কোনো নামে সম্বোধন করিনি, কেন করিনি তা অজানা। আমি যখন আট, তখন সে ষোল। বাবা কয়লা আমদানি ও পাটের চালানের দায়িত্বে ছিলেন, স্বভাবতই মাসের অধিকাংশ দিন তিনি বিদেশ বিভূঁইতে রাত কাটাতেন। আমি আর আমার ছোট বোন মায়ের সাথে নতুন বাড়িতে থাকতাম। নিগার মায়ের সাথে সেই রাত্রিগুলোতে আমাদের ঘরে থাকত মাকে সঙ্গ দিতে, তার ভাই মায়ের জন্য বিলাপ করত। আমার দুই খুড়তুতো বোন আছে, আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট, তারা দেখতে পুরো পুতুলের মতো ছিল।
এদের সাথে আমার বোন- সারাদিন বিদঘুটে কাজকর্ম করে বেড়ানো বেয়াড়া বাচ্চা- স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির দুজন ঝি এই কন্যা সন্তানদেরই আগলাত, আর আমি একটু বড় হয়ে যাওয়াতে সেভাবে আমার কেউ খোঁজ রাখত না, আগানে-বাগানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম স্কুল থেকে এসে। মাস খানেকের মধ্যেই নিগার মায়ের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল, কারণ এনাদের দুজনের মাঝে একটা কমন মিল ছিল, কেউ কারও ভাষা বুঝত না। মা আদ্যোপান্ত শহুরে মেয়ে, গ্রাম্য বিদ্যুৎহীন পরিবেশে শুরুতে কষ্ট হতো। সে সম্বন্ধে কিছু বললেই আমার ফুফু-দাদিরা মাকে উন্নাসিক বলত, এ নিয়ে একটা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও ছিল তাদের মাঝে- খুব সম্ভবত এই কারণেই মা ও নিগার একটা শহুরে আত্মীয়তার বন্ধনে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য নিগারের ভাষা এ বাড়ির হাতে গোনা এক আধাজন সদস্যের বাইরে কেউই বুঝত না।
নিগারের আব্বার নাম ডোংরিওয়ালা, অবশ্য পুরো নাম তৌফিক আগা, বোম্বে শহরের অদূরে ডোংরি নামে একটা স্থানে থাকত বলে নামের শেষে ডোংরিওয়ালা জুড়ে গিয়েছিল। দাদু রেগে গেলে বরাবর হিন্দি বলতেন, আগাসাহেবকে পেতেই উর্দু শিক্ষার ক্লাসও শুরু করে দিলেন সন্ধ্যার দিকে, সে এক কমিক অধ্যায় ছিল- কারণ এরপর হরকথায় দাদুর ভুলভাল উর্দু লফজ-লতিফার চোটে সকলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। অল্প দিনেই দাদুর ভীষণ আস্থাভাজন হয়ে উঠলেন আগা সাহেব। বোম্বের কোনো একস্থানে বা একাধিক স্থানে তাদের গালিচা, মখমল, মলমল পর্দা, বিছানার চাদরের ব্যবসা ছিল, এনার অন্য এক ভাইয়ের কাঁচের থালাবাসনের ব্যবসা ছিল। দাঙ্গার সময় সব কিছুতে লুঠপাঠ ভাঙচুর চলে, বহু আত্মীয়স্বজন খুন হয়ে যায়। এনাদের কথ্য ভাষা ফার্সি, প্রত্যেকেই উর্দু জানতেন অল্পবিস্তর। সময়ের তাড়নাতে হোক বা বিশেষ কোনো এলেম, নিগার অতিদ্রুত বাংলা ভাষা করায়ত্ত করে নিল, বছর দেড়েকের মধ্যে সে কলেজেও ভর্তি হয়েছিল ক্লাস ইলেভেনে, অনর্গল বাংলা বলতে শিখে গিয়েছিল। নিগারের বাবাও দাদুর দেওয়া পুঁজিতে মেটিয়াবুরুজ থেকে কাপড় এনে হাটে-ঘাটে বিক্রি করে সম্মানের রুজি রোজগার করতেন, যদিও থাকা-খাওয়া করতেন জাইরামঞ্জিলে।
মা বড় বাড়ির হেঁসেলে সাংসারিক কাজের তদারকি করতেন। নিগার তার ভাবির ছেলে অর্থাৎ আমাকে নিয়েই সারাদিন খেলা করত, মা নিজেও নিগারের কাছে আমাকে ছেড়ে বড় নিশ্চিন্তে থাকত। সোনালি কোঁকড়ানো চুল, কটা সাদা চামড়া, ছিপছিপে দীর্ঘাঙ্গী, টিকালো নাক, প্রশস্ত কপাল আর নীল চোখের এই পার্সিয়ান জিনের মেয়েটির মুখশ্রী মারাকাটারি সুন্দরী না হলেও উপরোক্ত বৈশিষ্টের কারণে আমাদের দক্ষিণ গাঙ্গেয় অঞ্চলের শ্যামবর্ণ তামাটে মানুষের ভিড়ে আলাদা করে চেনা যেত। এদের সম্ভাষণ রীতিতে হাত ও কপাল চুম্বনের প্রথা ছিল, যেটাকে আমাদের সমাজে সবাই শুরুতে খুব হাসাহাসি করত। নিগারের কাছে আমরা ভাইবোনেরা কতশত ইরানি গল্প শুনতাম, ডাকাতের গল্প, বোম্বে শহরের গল্প, আরব সাগরের গল্প। আরব্য রজনীর গল্প, বাগদাদ, তেহরান, জ্বিন, পরী, শাহেনশা, বাদশাদের দেশের ওস্তান, মার্কাজ, বাখ্শে পাড়ি জমাতাম নিগারের গল্পের উড়ন্ত গালিচাতে চড়ে। প্রথমদিকে নিগার জাইরামঞ্জিলের একটা ঘরে আরো অনেক মহিলাদের সাথে ঠাসাঠাসি করে থাকলেও পরবর্তীতে মায়ের উদ্যোগে গুমঘরের এককোণে পাটকাঠির বেড়া দিয়ে একটা স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল বাড়ির অন্দরে। প্রথমদিকে ফুফুদের পুরাতন সালোয়ারগুলো পরলেও পরের দিকে তাদের দেশীয় স্টাইলের খাটো কুর্তি, আজারি চুড়িদার আর জরিদার কুর্দি ওড়নায় বড় মোহময়ী লাগত তাকে। আমাকেও কয়েক পিস গিলান জোব্বা ও পিরান গড়িয়ে দিয়েছিল আগা সাগেব।
সমস্যাটা শুরু হলো কিছুদিন পর থেকে, ফুফুদের বিয়ে-শাদির জন্য ঘটকে যখন ভাল ভাল সম্বন্ধ আনে, সকলেই নিগারকে পছন্দ করে। কারণ, বাঁধা বাঁদির মতো নিগারই শরবত, বরফি, মিষ্টি, শোনপাপড়ি সাজিয়ে যেত বারকোশে সাজিয়ে। সিউড়ির বড় খানেদের বাড়ি থেকে ন’ফুফুর জন্য একটা সম্বন্ধ এলে তারা নিগারের বোন মেহের গুলকে নিকাহ পড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে তখন বিষয়টা অসহ্যের পর্যায়ে পৌঁছাল। সেই থেকেই দাদির চোখের বালি হয়ে গেল নিগার, যথারীতি তার ঠাঁই হলো জাইরামঞ্জিলের গাদাগাদিতে। কয়েকদিন পর মা- দাদির বিরোধিতা করে আমাদের নতুন বাড়ির সিঁড়ির নিচেটা খানিকটা মেরামত করে সেখানেই নিগারের পাকা আস্তানা করে দিলেন। সেই থেকে নিগার আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠল। আব্বা শুরুতে কিছুটা আপত্তি করলেও নতুন বাড়িতে দুটো বাচ্চা নিয়ে মায়ের অসুবিধার কথা ভেবে রাজি হয়ে গেলেন। ফলত দাদির সাথে মায়ের বিরোধ তুঙ্গে উঠল ছুতোনাতাতে, এই সময়েই গত কয়েক শতাব্দীর যৌথ সংসার থেকে হাঁড়ি আলাদার বীজ বপন হয়ে গেল। দাদি-পিসিরা শলা করে নিগারের নামে হরেক রকমের চারিত্রিক অপবাদ কুৎসা দিতে শুরু করল।
আমাদের ঘরে থাকার জন্য নিগারের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম, ক্রমশ সে যেন মিস্ত্রী বাড়িরই মেয়ে হয়ে গেল। একটা কেমন যেন অযাচারী অধিকারবোধ জন্মে গিয়েছিল ওর প্রতি। সে নিয়মিত তাদের দেশে বা অন্য কোথাও কাউকে চিঠি লিখত, পাল্টা চিঠি আসতও। হয়ত কোনো প্রেমিক বা পত্রমিতালী- ভাষা ফার্সি হওয়ার দরুন তা আমার অবোধ্য ছিল। নিগার আমাকে আদর করে বুল্লা নামে ডাকত, কারণে-অকারণে আল্লাকে শুকরানা দিয়ে আমাকে স্নেহ, আদর, চুমুতে ভরিয়ে তুলত সর্বক্ষণ। একা একাই বলত, হসলা জিততা হ্যাঁয়, হাতিয়ার নেহি। আমার হসলা আছে, আমরা আবার ডোংরি ফিরে যাব। বুঝতাম তার রুহতে শুকুন নেই স্বদেশ ছেড়ে এসে, শরীরটা এখানে থাকলেও আত্মা সেই ডোংরিতেই পড়ে থাকে।
নিগার দারুণ দারুণ সব রান্না করত, আমার নানি, মামারা এলে মাকে সাহায্য করত। ডালিমের রস দিয়ে মাংসের এক চমৎকার সুরুয়া বানাত- ফেসেঞ্জান বা ঐ ধরনের কিছু একটা নাম ছিল। মাংসের কিমা দিয়ে নানা ধরনের সবজি সিদ্ধ বানাত- এর নাম ছিল বাদেমজান। এছাড়া কাসেমি পুলাও, খাসবু মাহি, কোরমাহ, খোশ কারাফ এমন নানা ধরনের খাবারে খুশবুতে বাড়ি ম ম করত যখন সানকি বা খঞ্চাতে করে দস্তরখান সাজত। জন্মদিনে আমাকে একটা অনুবাদিত বাংলা বই দিয়েছিল নিগার- ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’। পাওলো কয়েলহো নামের এক লাতিন লেখকের রাখাল নায়কের গুপ্তধন প্রাপ্তির কাহিনী, নায়িকার নাম ফাতিমা। আমি নিজেকে সান্তিয়াগো মনে করতাম, আর নিগারকে ফাতিমা। সর্বক্ষণ বলত, মাওলাকে বলেছি- তুই আমার মুরসিদ, আমি তোর মুরিদ হবো- ভাল করে লেখাপড়া কর বুল্লা। তুই বড় হলে আমি তো তোকেই শাদি করতাম, তুই আমার মির্জা আর আমি তোর বেগম; আ মেরে আউলিয়া। বলেও নিপুণভাবে গালে, কপালে, ঠোঁটে চুমু এঁকে দিত। সুন্দর সুন্দর ফার্সি গজল, আলাপ, কাওল, রুবাইয়াৎ ভীষণভাবে মন ছুঁয়ে যেত। বোল না বুঝলেও সুফি ঘরানার সুরগুলো কিশোর মনে পুলক জাগাতো, খিলখিলিয়ে বিষয়গুলো উপভোগ করতাম।
আমাদের ঘরে থাকাকালীন তার ইবাদতে পাবন্দেগী এল, চেহেরাতেও নূর এল- কিন্তু বিরহাপনা বেড়ে যেতে লাগল, কারণ ফুফুরা তার সাথে কেউ কথা বলত না- মাতৃ ও ভাতৃ বিয়োগের যন্ত্রণা তো ছিলোই, বোনটাও চলে গিয়েছিল শ্বশুরবাড়ি । একদিন মা সত্যিই আর সকালে ও’বাড়ি গেল না, ভেঙে গেল সংসার। মালার একটা পুঁতি খুলে গেলে বাকিগুলো চোখের পলকে ঝরে যায়, এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হলো না। চার দাদু সহ তাদের অধিকাংশ বিবাহিত ছেলেপুলেরাই আলাদা হয়ে গেল বছর ঘুরতেই। এর ফলে যারা লাভবান হয়েছিল তারা নিজেদের ক্রেডিট দিল, আর যাদের লোকসান হলো তারা গালিগালাজের জন্য নিগারকে বেছে নিল। ভূসম্পত্তি বা ব্যবসা ভাগ না হলেও হাঁড়ি আলাদা হয়ে যেতেই বারোয়ারি খানার চাষ উঠে গেল, কারণ তখন সকলের জন্য নির্দিষ্ট মাসিক মাসোহারার বন্দোবস্ত হলো, কে আর নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ভূতভোজন করাবে! ভেলকিবাজির মতো লতায় পাতায় জড়িয়ে থাকা আত্মীয়েরা পাততাড়ি গুটাল মিস্ত্রীবাড়ি থেকে।
কিন্তু যাদের হাতে কাজ ছিল না, এ বাড়িতে খেয়েদেয়ে ব্যোম ব্যোম করে ঘুরে বেড়াত তেমন কিছু আত্মীয়ের মাথায় বাজ পড়ল, খুব মনে আছে ক্লাস সিক্সের হাফইয়ার্লির রেজাল্ট এনে নাচতে নাচতে বাড়িতে ঢুকে দেখি লোকজন গিজগিজ করছে। সবটা না বুঝলেও যেটা বুঝলাম, সেটা হলো- নিগার নাকি পতিতাবৃত্তি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। ফজল নামের একজনের সাথে ভরদুপুরে ছাদের চিলেকোঠায় নাকি মন্দ কাজ করেছে, আর সেটা দেখেছে বাড়ির এক ঝি আশিরন আর দাদির ভাইপো নাতি শাবাব। বিচার হলো, যেহেতু হাতেনাতে ধরা পরেছে তাই পঞ্চাশ ঘা কাড়ার হুকুম দিলো দাদু, নিগার কিছুই বলার সুযোগ পেল না আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য। সেদিন সারারাতই প্রায় কাঁদল সে, মায়ের কাছে কোরান পাক হাতে নিয়ে বারে বলতে থাকল- এই কালামে পাকের কসম ভাবি, আমি মন্দ কিছু করিনি। আগা খান তখন কোলকাতায়, তিনি ফিরে এসে কান্নাকাটি করে মেয়ের হয়ে মাফ চেয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার আর্জি করলেন।
নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌনতার বিষয়ে সবটা না বুঝলেও ভাসা ভাসা একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল সেই সময়, কেমন যেন ঘৃণা তৈরি হয়ে গেল নিগারের উপরে। যদিও মা বিশ্বাস করল না নিগার অন্যায় কিছু করেছে বলে, কিন্তু চারিপাশের সকলের মুখের কথা শুনে আমার কেমন একটা হতে লাগল। যদিও অনেক পরে দাদি বিলাপ করে সত্য উগরেছিল, স্বীকার করেছিল যে নিগারের সাথে অন্যায় করা হয়েছিল- যখন আমার ছোট ফুফা ২৩ বছরের ফুফুকে বিধবা করে জান্নাতে চলে যান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। যাইহোক, ক্রমশই আমি কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠতে লাগলাম নিগারের উপরে। সারাক্ষণ তাকে তাড়াবার চেষ্টায় মত্ত হয়ে উঠলাম, সে শুধু বলত- এখানে আমার কেউ নেই বুল্লা, বাপটাও দেশে চলে গেল। এমনই একদিন কাছে ডেকে হাসতে হাসতেই বলল- শর কলম কিয়া যায়ে, হুজুর! উর্দু আমিও কিছুটা বুঝি, বিরক্তির সাথে উপেক্ষা করে টিভি খুলে বসে গেলাম। সেদিনের কথাগুলো আজও কানে বাজে- “এটা জাজমেন্টাল সোসাইটি বুল্লা, তুইও ভুল বুঝলি! শোন আমার কথা- যে শোনে, সেই কেবল বুঝতে পারে, যে বুঝতে পারে তার পক্ষেই ভাল কিছু করা সম্ভব”। আমার এই আচরণ তাকে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দিয়েছিল, যা সে মেনে নিতে পারেনি। হয়ত, আমার প্রতি তার ছিল এক অকৃত্রিম সন্তান বাৎসল্য- কিম্বা, কে জানে কী ছিল!
এরপর একদিন সকালে উঠে দেখি নিগার নেই, বিকাল পর্যন্তও ফিরে এল না, মা খোঁজ শুরু করল, আমাকে শুধাল। আমি মিথ্যা বললাম, বিল পাড়ার পরীক্ষিতের সাথে তাকে যেতে দেখেছি বলে মাকে মিথ্যা বললাম। সন্ধ্যার পর কাকিমার সাথে সে বাড়ি ফিরতে কিছু না শুনেই মা ভীষণভাবে তাকে অপমান করল, তারপর সে নিজেও কিছু তর্কে জড়িয়ে যায়- আমি সেসব আর খেয়াল করিনি। পরদিন ভোরে আর কেউ তাকে দেখেনি এ তল্লাটে। সেদিন গেল, আজও গেল। ২০১৫ সালে মুম্বই গিয়েছিলাম, ডোংরিতে গিয়ে দেখি তৌফিক আগা সাহেবের ধান্দা আবার জমে উঠেছে, খাতিরের কোনো ত্রুটি হলো না। নিগারের কথা শুধাতে তিনি মৌন হয়ে গেলেন, চোখ মুছে বললেন- ইতনা বড়া দেশমে শোয়া’শ কড়োর লোগ- উসে কাহা ঢুঁন্ডু বেটা।
একটা জলজ্যান্ত অনূঢ়া মেয়ে জাস্ট হারিয়ে গেল আমাদের পরিচিত সমাজ থেকে, শুধুমাত্র অবহেলা আর কুৎসার কারণে। হারিয়ে গেল নিগার মাসোনি।
“ভালবাসা হলো এমন একটি পর্যায়, যা দুঃখের মধ্যেও মানুষকে সুখী রেখে দেয়”
পাওলো কোয়েলহোর অমর উক্তির মাঝে আজও নিগারকে খুঁজে পাই, আমার ছেলেবেলার ক্রাশ ছিল হয়ত বা- যার জন্য আজও নিগার নামটা শুনলে সবার আগে একটা অনাবিল খুশির উদ্রেগ হয়, তারপরেই একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা ঘিরে ধরে- ভরসার মর্যাদা রাখতে না পারার যন্ত্রণা। সে যেখানে আছে নিশ্চিত সুখেই আছে।
সেকেন্দ্রাবাদী শায়র সন্তোষ আনন্দের একটা শায়েরী দিয়ে তাকে অক্ষম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ছাড়া আজ কিছুই করার নেই-
“কুছ পা কর খোনা হ্যাঁয়কুছ খো কর পানা হ্যাঁজীবন কা মতলব তোআনা অউর জানা হ্যাঁয়জিন্দেগী অউর, কুছ ভি নেহিতেরি মেরি কাহানি হ্যাঁয়”।