শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২২

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৫


পঞ্চম পর্ব


বিহারের ফলাফলে ফিরি।

১১ নভেম্বর ২০২০ তারিখে The Quint অনলাইন পোর্টালের দেওয়া তথ্য বলছে চিরাগ পাশোয়ানের দল LJP, নীতিশ কুমারের JDU এর ভোট অনেকটাই কেটে তাদের আসন কমিয়েছে ‘ভোট কাটার’ হিসাবে। আলাউলি, দরভাঙ্গা পল্লী, ধৌরাইয়া, দিনারা, ইসলামপুর, সমস্তিপুর, সুরজগড় ইত্যাদি এমন ৩২ টি বিধানসভা আসন আছে যেখানে JDU এর হারের ব্যবধানের চেয়ে LJP এর প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা অনেকটাই বেশি। মহাগঠবন্ধনের মোট ৩৮টা আসনে জয়ী প্রার্থীর ব্যবধানের চেয়ে LJP এর পক্ষে ভোট বেশি পড়েছে।

কিন্তু বিষয়টা কি এতটাই জলবৎ তরলং! যতই JDU ও LJP দুটি দলের ভোটব্যাঙ্ক একই হোক জাতপাতের নিরিখে! তাহলে মাঝি-মাল্লাদের সম্প্রদায়ের VIP পার্টি- বনিয়াপুর, মধুবানী, সিমরি বখতিপুর ও সুগৌলি এই ৪টে; জিতিনরাম মাঝির ‘হাম’ পার্টিও কসবা আসনে হেরেছে কীভাবে, এই সব আসনেও LJP ফ্যাক্টর হয়েছে দৃশ্যত। খোদ বিজেপির হারা ভাগলপুর আসনে হারের ব্যবধান চেয়ে LJP এর প্রাপ্ত ভোট অনেকটাই বেশি। তথ্য বলছে JDU গত বারের চেয়ে মাত্র ১.৪৪% ভোট কম পেয়েছে, আর LJP ০.৭৭% ভোট বেশি পেয়েছে। সাধ করে কি বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক নেভিল কার্ডাস বলেছিল যে- “স্কোরবোর্ড আসলে একটা গাধা”।

এই ছিল ভোট কাটুয়ার আসল হিসাব, তাহলে বিহার ভোট পরবর্তী মাত্র ৫টি আসনে জেতা মিমকে নিয়ে এমন প্রচারণা কেন বা কাদের স্বার্থে? সত্যিই কি ‘ভোট কাটার’ এর ভূমিকাতে ছিল মিম, যা বিজেপির পক্ষে গিয়েছে! তথ্য কী বলছে?

মিম মোট ২০টা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, ২৪৩ আসনের নিরিখে ৮.২৩ শতাংশ আসনে। এর মাঝে তারা জেতে ৫টি আসনে। লোকসভার নিরিখে কিষাণগঞ্জ লোকসভারই ৫টি আসন।

(i) নেপাল লাগোয়া আরারিয়া জেলার জোকিহাট বিধানসভা কেন্দ্রে ৩৪.২২% ভোট পেয়ে জিতেছে মিম, RJD (২৯.৯৮%) এর মুসলমান প্রার্থীকে হারিয়ে। বিজেপি এখানে তৃতীয় ২৮.১% ভোট পেয়ে। এর লাগোয়া কেন্দ্র কিষাণগঞ্জ জেলায় দুটো আসনে জিতেছে মিম।
(ii) কিষাণগঞ্জের বাহাদুরগঞ্জ আসনে মিমের প্রাপ্ত ভোট ৪৯.৭৭% যেখানে দ্বিতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী VIP পেয়েছে ২৩.৫৬%, আর তৃতীয় কংগ্রেসের ঝুলিতে ১৭.৫১% ভোট। এখানে VIP ও কংগ্রেস সম্মিলিভাবেও মিমের চেয়ে ৮ শতাংশের নিচে।
(iii) আমাদের উত্তরবঙ্গ যাবার পথে যে অংশটা রেল ও সড়কপথ বিহারের মাঝে ঢুকে যায় সেই কিষাণগঞ্জ জেলার ‘কোচধামন’ বিধানসভা কেন্দ্রটি জিতেছে মিম। এখানে RJD ভোট পেয়েছে ১৬.১৮%, JDU ২৭.০৮% ও LJP পেয়েছিল মাত্র ১৬০৬টি ভোট। কিন্তু এদের সম্মিলিত ভোটের চেয়েও বেশি ৪৯.৪৫% ভোট পেয়ে জিতেছে।
(iv) ডালখোলার পশ্চিম দিকটাই পুর্নিয়া জেলা। কিষাণগঞ্জ লাগোয়া এখানে দুটো সিটে জিতেছে মিম। তার একটা ‘আমোর’ বিধানসভা কেন্দ্র। এখানেও মিমের প্রাপ্ত ভোট বাকিদের সম্মিলিত ভোটের চেয়েও বেশি।
(v) এই জেলারই ‘বৈশি’ কেন্দ্রে মিম ৩৮.২৭% ভোট পেয়ে বিজেপিকে (২৯.১১%) হারিয়েছে ১৬ হাজার ভোটে, এখানে RJD পেয়েছে ২১% ভোট।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যেখানে মিম জিতেছে, নিরঙ্কুশ ভাবেই জিতেছে। কংগ্রেস, আরজেডি, বিজেপি, কমিউনিস্টেরা কোনো ফ্যাক্টর ছিলনা।

বাকি ১৫টি সিটের হিসাব দেখা যাক, যার মধ্যে ৯টা কেন্দ্রে মহাগঠবন্ধন জিতেছে।

(i) আরারিয়া কেন্দ্রে কংগ্রেস জিতেছে জেডিইউকে ৪৮ হাজার ভোটে হারিয়ে, মিম পেয়েছে ৮৯২৪টি ভোট।
(ii) কিষাণগঞ্জ সিটে কংগ্রেস ৬১ হাজার ভোট পেয়ে জিতেছে বিজেপিকে হারিয়ে, তাদের প্রাপ্ত ভোট ৫৯ হাজার। মিম পেয়েছে ৪২ হাজার ভোট।
(iii) মনিহারী (উপজাতি সংরক্ষিত) কেন্দ্রে কংগ্রেস জিতেছে ১২ হাজার ভোটে, মিমের জামানত জব্দ হয়েছে মাত্র ২৪৫৮টি ভোট পেয়ে।
(iv) কসবা কেন্দ্রে কংগ্রেস জিতেছে এলজেপিকে হারিয়ে, মিম পেয়েছে ৫৩১৬টি ভোট।
(v) ফুলবাড়ি কেন্দ্রে কমিউনিস্টরা জিতেছে জেডিইউকে হারিয়ে, এখানেও মিমের জামানত জব্দ হয়েছে ৫০১৯টি ভোট পেয়ে।
(vi) সাহেবপুর কামাল কেন্দ্রে আরজেডি জিতেছে জেডিইউকে হারিয়ে, মিম পেয়েছে মাত্র ৭৯৩৩ ভোট।
(vii) শেরঘাটি বিধানসভায় আরজেডি জিতেছে জেডিইউকে হারিয়ে, ব্যবধান ১৬ হাজার, মিম ভোট টেনেছে ১৫ হাজার।
(viii) শিক্তা কেন্দ্রে কমিউনিস্টরা জিতেছে জেডিইউকে হারিয়ে, মিম পেয়েছে ৮৫১৯ ভোট।
(ix) ঠাকুরগঞ্জ কেন্দ্রে আরজেডি জিতেছে নির্দলকে হারিয়ে, মিমের প্রাপ্তি ১৮৯৯০ ভোট।

NDA জিতেছে ৬টি আসনে।

(i) বারাড়ি কেন্দ্রে জেডিইউ জিতেছে প্রায় ১০ হাজার ভোটে, মিম পেয়েছে ৬৫৯৮ টি ভোট।
(ii) ছাত্তাপুর কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছে ২০ হাজার ভোটে, এখানে মিমের জামানত জব্দ হয়েছে ১৯৯০টি ভোট পেয়ে।
(iii) নরপতগঞ্জ কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছে ২৯ হাজার ভোটে আরজেডিকে হারিয়ে, মিম পেয়েছে ৫৪৯৫টি ভোট।
(iv) প্রাণপুরে বিজেপি প্রায় ৩ হাজার ভোটে জিতেছে কংগ্রেসকে হারিয়ে, মিমের জামানত জব্দ হয়েছে মাত্র ৫০৮টি ভোট পেয়ে।
(v) রানিগঞ্জ কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছে প্রায় আড়াই হাজার ভোটে আরজেডিকে হারিয়ে, এখানে মিমের জামানত গেছে ২৪১২টি ভোট পেয়ে।
(vi) সাহেবগঞ্জ কেন্দ্রে VIP জিতেছে প্রায় ১৬ হাজার ভোটে আরজেডিকে হারিয়ে, মিম পেয়েছে মাত্র ৪০৫৫টি ভোট।

এই হল তথ্যপঞ্জী। মিম ভোট পেয়েছে ১.২৪%, যা নোটার (১.৬৮%) চেয়েও কম। বরং প্রায় সমসংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা CPI(ML) বরঞ্জ ১৯টি আসনে প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

...ক্রমশ

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...