“মানুষ যা করে, আর বানর যা করে না, তারই নাম সংস্কৃতি” ।
এটা কোন মনিষীর উক্তি জানা নেই, কিন্তু এটা সময়ের মতই ধ্রুব সত্য। এর সাথে যদি বিবর্তনবাদকে জুড়ে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করা যায়- তাহলে সংস্কৃতির চর্চাই কিছু মানুষকে আরো বেশী সভ্য ও আধুনিক করে তোলে। হার্বার্ট স্পেন্সারের “যোগ্যতমের উদবর্তন” তত্ত্ব অনুযায়ী, যারা আধুনিক তারাই শুধুমাত্র টিকে থাকে, বাকিরা ক্রমশ অবলুপ্ত হয়ে যায়। ল্যামার্কের মতে প্রতিটি জীব তার জীবনকালে অর্জিত সকল বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত করে এবং কোন অঙ্গ ক্রমাগত ব্যবহৃত হলে সেটি সবল, কার্যক্ষম ও সুগঠিত হতে পারে, পাশাপাশি ক্রমাগত অব্যবহৃত কোন অঙ্গ অব্যবহারের দরুন নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে অবশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
না না, এটা জীবন বিজ্ঞান বিষয়ক কোনো নিবন্ধ নয়, এটা পাতি রাজনীতি বিষয় একটা লেখা। আমাদের বঙ্গীয় রাজনীতি।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রকৃতিতে “Dwarfism and Gigantism”, মানে বামনাবাদ ও দৈত্যবাদ বিষয়গুলো অভিযোজনের নিয়ম মেনে ঘটে চলে। আমাদের যে চলমান রাজনীতি, সে sখানে এই তত্ত্ব এক্কেবারে অনুতে পরমানুতে মিলে যায় প্রকৃতির এই নিয়ম অনুযায়ী। শিক্ষিত, নিষ্ঠাবান, বিশ্বস্ত মানুষের সংখ্যা রাজনীতিতে কমে এলে, অশিক্ষিত, অকর্মন্য ও বাটপারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবেই। উল্টটাও সঠিক। মানে যে দলটাই সমাজের বুকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠুকনা কেন, তার জন্য পরিবেশ পরিস্থিতিকে উপযুক্ত হতে হয়। তৃনমূল নামের পচা সারগর্তের পুষ্টি না পেলে কীভাবে সন্দীপের মত ডাক্তার রূপী ছত্রাকেরা সমাজের বুকে নিজেদের বিস্তার করে? তৃনমূল নামের দলটা আসলে দুষ্কৃতীদের লালন পালনের জন্য গ্রিনহাউস। নীলসাদা শাড়ীর আঁচলের সুরক্ষাতে যেকোনো নবিশ দুষ্কৃতী নিজের খেয়ালে বেড়ে উঠে নিজেদের যাবতীয় অপকর্ম করে যাচ্ছে, এবং তার আর্থিক ভাগা দিচ্ছে পোষককে। মিথোজীবী সম্পর্কের আদর্শ উদাহরণ, যার গোটাটাই বিজ্ঞান।
কোনো এলাকায় যদি মননশীল সাহিত্য, মহান দর্শন, উচ্চাঙ্গের শিল্পকলা, আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিন্তা, উচ্চমানের রাজনীতিক ভাবনা, ইত্যাদির সমঝদার কমে যায়, এগুলোর কদর-সমাদর উধাও হয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ওই এলাকায় প্রতিভাবান গুণী মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। ফলত, যা কিছু অত্যুন্নত ও মহৎ, তার আকার ও প্রভাব আস্তে আস্তে খর্বাকায় হতে হতে বামনরূপ ধারন করে। একসময়ের অভিজাত, উচ্চকূলশীল, মহিমান্বিত বিষয় গুলো প্রতিস্থাপিত হয় নিম্নমানের মেঠো-নাচনকোঁদন আর খেউর-সংস্কৃতি দ্বারা। সংস্কৃতির রসদ মূলত সাধারণ মানুষ, তাদের কর্মকাণ্ড পছন্দ অপছন্দের ভিত্তিতেই সংস্কৃতি বেঁচে থাকে।
শিল্পকলা, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি এগুলোর বিকাশ ও বিস্তারের পুরোটাই সাধারন জনগন নির্ভর। কালজয়ী সাহিত্য, উঁচুমানের দর্শন, উঁচু শিল্পকলাকে বুঝতে গেলে মানুষের উঁচু রুচিবোধ জরুরী। একটা সমাজে মানুষের গড় রুচিবোধ নিচে নেমে গেলে, অপ্রয়োজনীয় গৌণ বিষয়াদি তখন সমাজের সর্বত্র বিরাজ করতে থাকে মুখ্য রূপে। স্বভাবতই কুরুচিপূর্ণ নিম্নজাতের অপসংস্কৃতিগুলো আভিজাত্যের চাদর গায়ে সংস্কৃতির নামে মহিয়ান হয়ে উঠে।
শিক্ষা আসল বুদ্ধিজীবি তৈরি করে, ব্রিটিশরা সেই মেধা তৈরির কারখানার পরিসর ছোট করে শ্রমিক তৈরির খারকখানা করে দিয়েছিল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে। রুচিকে ধ্বংস করতে গেলে সবার আগে শিক্ষাকে ধ্বংস করতে হয়, তৃনমূল সরকার সেটাই করেছে। অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য দলদাসকে শিক্ষক বানিয়েছে। শিক্ষক হিসাবে জন্মই যার দুর্নীতির পাঁকে, তার কাছে অর্থই হল শিল্প, অর্থই সংস্কৃতি, অর্থই দর্শন, অর্থই বিজ্ঞান। এই লোকটি ছাত্রদের কী শেখাবে? বাকি যারা শিক্ষাগতভাবে যোগ্য, তারা রোজ চাকরি ভিক্ষা করছে শহরের রাজপথে ধর্নামঞ্চে, হাতেপায়ে পরছে সরকারের, পুলিশের লাঠিপেটা খাচ্ছে। কিশোর প্রজন্ম দেখছে, মেধাবী হলে ভিক্ষা করতে হয়, অরাজনৈতিক হতে হয়। শিরদাঁড়া শক্ত করে বুক ঠুকে বলা যায়না আমি তৃনমূল নই, আমি তোমার অপশাসনের বিরোধী। এর পরেও সম্মান বেঁচে থাকে শিক্ষকদের? ডাক্তারদের মত একজোট হয়ে এই চাকুরীপ্রার্থীদের উপরে অবিচারের কারনে, কেন এতো দুর্নীতি শিক্ষাক্ষেত্রে- এই প্রশ্নে চাকুরীরত শিক্ষকেরা পথে নেমেছে- দলবেঁধে? নামেনি, কারন এই প্রজন্মের শিক্ষকদের মাঝে দু-একজন ব্যতিক্রমী ছাড়া প্রত্যেকেই নিকৃষ্ট মানের আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। আপন বাপন চৌকি চাপন, কে অহেতুক ঝামেলা নেয়, আমার তো বেতন এসে যাচ্ছে মাস পহেলাতে। নূন্যতম সামাজিক দায়বদ্ধতা টুকু নেই আগামীর সহকর্মীর প্রতি।
রাজনীতিতে অশিক্ষায়নের
জন্য মমতা ব্যানার্জী বাংলার ইতিহাসে নিকৃষ্ট শাসক হিসাবে অমর হয়ে থাকবেন। ‘ক-অক্ষর
গোমাংস’ গায়ক নায়কদের এনে রাজনীতিতে নামিয়ে দিয়েছে, বুদ্ধিজীবি সাজিয়ে। সমাজে এদের
অবদান কতটুকু? মানুষের হিতে কতটুকু এরা সমাজসেবা করেছে বা প্রান্তিক ভাষাহীন মানুষের
জীবন সংগ্রামে কোন সুখ দুঃখের সমব্যাথী অংশীদার হয়েছে? দু’দিন টিভিতে নাম কামিয়েই বিকল্প
ও নিশ্চিত রোজগারের ধান্দায় ক্ষমতাসীন দলে নাম লিখিয়েছে। এরাই তো দেশের আগামীর নীতি
নির্ধারন করতে গেছে আইনসভাতে। যাদের নিজেদের নীতি নৈতিকতা নেই, তাদের নেতৃত্বে কীভাবে
একটা রুচীশীল সমাজ গঠিত হতে পারে? পাগলামোকে রাজনীতি নাম দিয়েছে,
অসভ্যতামোকে ডাকে কৃষ্টি নামে। থ্রেট কালচারই যাদের দর্শন, উমেদারির নাম বিজ্ঞান, চাটুকারিতার
নাম বিপ্লব, খেউরের নাম সাহিত্য- চুরিকে এরা শিল্প বলবেনা তো কাকে বলবে?
দ্বিতীয়
মানুষ তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেই নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করে দেয়, যতক্ষণনা উপলব্ধি করে ঠকে গেছে। এবং বুদ্ধিমান সেজে থাকার দায়ে, ঠকে যাওয়াটা লুকাতে আরো বেশি বেশি তার সেই ভুল ‘সিদ্ধান্তকে’ সঠিক প্রমানের জন্য শক্তিক্ষয় করে। এর পর অবসন্ন হয়ে গেলে, সেই ‘সিদ্ধান্ত পরবর্তী ফলাফল’ তাকে চেপে ধরে- বুকের উপরে বসে। নাভিশ্বাস উঠে গেলে যখন চেঁচাতে যায়, দেখে- যার পক্ষে সেই ‘সিদ্ধান্ত’ গিয়েছিল, সে মুখ বন্ধ করে দিয়েছে আতঙ্কের ন্যাকরা গুঁজে। অতিচালাকের দল মজন্তালি সরকারের মত ডুবে গিয়েও হাত তুলে বলে জল মাপছি। বস্তুত, মজন্তালির পরিনতি আমরা জানি।
একদিকে ৩৪ বছরের Anti-incumbency, অন্য দিকে ১০ বছরের। ২০১১ সালে আমাদের রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর, সেই মধুচন্দ্রিমা শেষ হওয়ার আগেই কেন্দ্রেও নতুন সরকার চলে আসে। তৃণমূলের সাথে “পরিবর্তন চাওয়া” বঙ্গবাসী আসলে- পাতি ঠকে যায়। এতে কেউ ভয়ে মুখে কুলুপ আঁটলো, কারো মুখে ন্যাকরা গুঁজে দেওয়া হলো, তো কেউ মজন্তালি সরকারে বদলে গেলো। যে লোকটা ঠকেনি বলে দাবী করছে, তাকে নেহাত দলটা করে পেট চালাতে হয় বলে স্বীকার করছেনা, নতুবা সত্যটা সে নিজেও সম্যকভাবে জানে। সুস্থ সমাজব্যবস্থাকে Tekken for granted নেওয়া বঙ্গবাসী যতক্ষণে বুঝতে পেরেছিল ঠকে গেছি, ততক্ষণে সারদা-নারদার মেগা পর্ব পার করে আচ্ছেদিনের চক্রব্যূহে ঢুকে পরেছে, দোনো হাত মে লাড্ডু।
৩৪ বছরের বাম সরকার ১০০% নিখুঁত ছিল তা অতিবড় বাম সমর্থকও দাবী করেনা, কিন্তু দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত এই তৃণমূল রাজত্বের চেয়ে যে উন্নত ছিল, তা মমতা ব্যানার্জীও হয়ত আয়নার সামনে স্বীকার করে। বাম আমলে সমাজে ধর্ষক ছিল, চোর ছিল, পকেটমার ছিল, গুণ্ডা ছিল, দুষ্কৃতী ছিল, পাচারকারী ছিল, তোলাবাজ ছিল, টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রি ছিল, বিচ্ছিন্নতাকামী ছিল, দুর্নীতিবাজ পুলিশ, আমলা ইত্যাদি ছিল- মানে একটা সমাজে যা যা ধরণের অপকর্ম থাকে সবই ছিল। পরিবর্তনের বাংলাতে মমতা ব্যানার্জী এইসবগুলোকে একছাতার তলায় আনার অসাধ্যসাধন করতে পেরেছে। আগে দুষ্কৃতী সমাজবিরোধীরা রাজনৈতিক দলের আশ্রয় খুঁজতো, এখন সেই তারা গোটা একটা রাজনৈতিক দল খুলে ফেলেছে।
কালীঘাট ও নাগপুরী এই দ্বৈত শাসনব্যবস্থার চক্করে মানুষ, চোর-চামার গুলোকে, তাদের সীমাহীন চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, লাম্পট্য, গুম, হত্যা, আইনের শাসনকে ধর্ষণ, সংবাদমাদধ্যম ও বিচারব্যবস্থাকে অসাধু উপায়ে নিয়ন্ত্রণ, নিজেদের স্বার্থের জন্য সাম্প্রদায়িক বিভাজন, এবং পাড়ায় পাড়ায় থ্রেট কালচারের মাধ্যমে গড়ে উঠা তোলাবাজি শিল্পের সাথে আপোষ করতে শুরু করল ও একসময় অভ্যস্ত হয়ে পরলো। সুশীল সেজে ভদ্রসমাজ রাজনীতিকে অচ্ছুৎ মনে করে অরাজনৈতিকতার ঘোমটা পরতেই, দুষ্কৃতীরা রাজনীতির রাশ নিয়ে নিলো, যোগ্যতমের উদবর্তন ঘটল চোরেদের সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের রাজ্যের শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রশাসন, সীমান্ত চোরাচালান সহ, যেকোনো দুষ্কর্ম ঘটুক, সেখানে রাজ্যের শাসক দলের কারো না কারো মুখের ছবিতে উজ্জ্বল। এরাই দলের কোনো না কোনো পদে রয়েছে বা ছিল। এর বিরুদ্ধে আইন-প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলেই সর্বোচ্চ নেত্রী নিজে রাস্তায় ঝাপিয়ে পরেন তার সমস্ত মেসিনারি নিয়ে। এটাই দল তৃণমূল ও মমতা ব্যানার্জীর সাফল্য, যার বড় অংশীদার পরিবর্তনকামী জনগণ ও ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর দল।
আজকে পশ্চিমবাংলার মানুষের জন্য আহাজারি করার কেউ নেই। আইনসভায় সংখ্যার নিরিকে যারা নাকি বিরোধী, তারা সিংহভাগই প্রাক্তন তৃণমূলী অথবা দীলিপ ঘোষের মত সার্কাসের বৃদ্ধ জোকার। টিভির পর্দার বাইরে যাদের না আছে সংগঠন, না জারিজুরি। তাহলে ভোট পায় কীভাবে? ছাপ্পা-রিগিং এর কবলে না পরলে, বোবা, কালা, মুখে সেলটেপ সকলেই ভোট দেয় এই বাংলায়, এমনকি মজন্তালী সরকারও ভোট দেয়- ঠকে যাওয় পাবলিক তৃণমূলের বিপক্ষে ভোটটা দেবে কাকে? বিজেপিকে দেবে বা দেয়। কারন পেইড মিডিয়া ন্যারেটিভের দৌলতে, প্রতিটা ভোটের আগেই বিজেপি প্রবলভাবে ভোটের রাজনীতিতে বিরোধী পরিসরে মূলত সে একাই বিরাজ করে, বিগত ১২ বছরের হিসাবে। আসলে এ রাজ্যে বিরোধী নামের যে শরীরটা রয়েছে, তাতে একটা পোশাকি মাথা ঠিকিই আছে। বাইরে থেকে দেখতে সেটা মাথার মতই, কিন্তু ভেতরটা গড়ের মাঠ, ধু ধু ফাঁকা। ফাঁকা মাঠ তৃণচাষের জন্য আদর্শ, আর লকলকে কচি ঘাস খেতে বলদের দল যে ঘাঁটি গাড়বে, সেটা বলাই বাহুল্য।
কেন্দ্রে RSS এর যে
সরকারটা চলছে মোদী-শাহ নেতৃত্বাধীন, এর কৃতিত্ব যত না সঙ্ঘ পরিবার ও তাদের রাজনৈতিক
শাখা গুলোর, তার চেয়েও বেশী খোদ কংগ্রেসের। RSS ও বিভিন্ন দেশীবিদেশী কায়েমী গোষ্ঠী
গুলোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে কংগ্রেসকে ভিতর থেকে সমূলে নির্বংশ করার কাজটা
শুরু হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারির কোন এক সন্ধ্যায়, কেমব্রিজের এক রেস্তোরাঁতে। তারই
ধারাবাহিকতায় ইন্দিরা ও রাজীব গান্ধী প্রকাশ্য খুন হয়। সঞ্জয় গান্ধীও একই পথের যাত্রী।
ইন্দিরা-রাজীব জামানার যে সকল প্রতিশ্রুত নেতারা ছিলেন, এক প্রণব মুখার্জী ছাড়া প্রায়
সকলেই দুর্ঘটনার কবলে অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে। মাধব রাও সিন্ধিয়া, রাজেশ পাইলট, বিয়ন্ত
সিং, ওয়াই এস আর রেড্ডী প্রমান ভুড়ি ভুড়ি। প্রিয়রঞ্জনের মত কেউ কেউ চির কোমাতে চলে
গিয়েছিল। মোদ্দা কথা গোটা দলটা প্রতিবন্ধী হয়ে গেল ধীরে ধীরে, ধারে ভারে মগজে। ওদিকে
বিজেপিতেও যে এমন ঘটনা ঘটেনি তা নয়, প্রমোদ মহাজন বা গোপিনাথ মুন্ডের কুৎসিত প্রকাশ্য
মার্ডারের কোনো তদন্ত হয়েছে আজ অবধি? গত মাসে আগষ্টে, কাশ্মীরে কংগ্রেসের এক নির্বাচনী
সভায়, যেখানে মল্লিকার্জুন খাড়গে থেকে রাহুল গান্ধী উভয়েই উপস্থিত ছিলেন, সেখান থেকে
ফেরার পথে রাজ্য নেতৃত্ব শাদী লাল পণ্ডিত বেঘোরে মারা গেলেন গাড়ি এক্সিডেন্টে। সবটাই
কাকতালীয়? আসলে আমরা সেটাই দেখি, যা আমাদেরকে দেখানো হয়।
তৃতীয়
এই রাজ্যেও অসহায় কংগ্রেস ক্রমে ক্রমে মমতার কাছে আত্মসমর্পন করে বসে, সাথে নিয়ে যায় ৩৫% কংগ্রেসী পারিবারিক ভোটার, যারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বংশানুক্রমে কংগ্রেসের সাথে ছিল। তৃনমূলের জন্মলগ্নে অজিত পাঁজা, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, পঙ্কজ ব্যানার্জী আর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আর বড় কোনো নেতা মমতার সাথে আসেনি। এবং জন্মের কয়েকমাসের মধ্যেই দ্বাদশ লোকসভাতে ২৯টা আসনে প্রার্থী দিয়ে ৭টিতে জয়লাভও করেছিল তৃনমূল। রাতারাতি এই সাফল্য এবং কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের আভ্যন্তরীন কোন্দল ও নেতৃত্বের দৈন্যতার সুযোগে মমতাও একে একে বড় বড় নেতাদের খেতে শুরু করেছিল। ২০০৪ লোকসভাতে মমতা মাত্র ১টি আসন পায়, আর এই সময়েই মমতা সম্পূর্ণভাবে RSS এর বৃত্তের মধ্যে পরে যায় ও নিজেকে সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যে দ্রবীভূত করে তোলে। এর পর কংগ্রেস মমতাকে বিজেপির থেকে ছিনিয়ে নেবার প্রচেষ্টাতে সম্পূর্ণভাবে মমতার পায়ে সমর্পিত হয়ে যায় ও বঙ্গীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের সাইনবোর্ড হয়ে যাওয়ার ঢাকে কাঠি দিয়ে দেয়।
শুরুটা করেছিল কোলকাতা ভিত্তিক ওয়ার্ডের নেতাদের গ্রাস করে, যাদেরকে পরবর্তীতে রাজ্যের নেতা বানিয়েছে। অতীন ঘোষ, ববি হাকিম, জল শোভন, অরুপ বিশ্বাস, ইকবাদল আহমেদ, পরেশ পাল, প্রদীপ ঘোষ, দেবাশীষ কুমার, মালা রায়, বৈশ্বান্বর চ্যাটার্জী, রঞ্জিত শীল প্রমুখ কংগ্রেসী কাউন্সিলারদের একে একে দলে টেনে নিতে সক্ষম হয়। এর পর রাজ্য জুড়ে কংগ্রেসী রাঘবোয়ালদের ধরে নিজের দলে ঢোকাতে সক্কষম হয় ‘সাম, দম, দণ্ড, ভেদ’ যার উপরে যে মন্ত্র প্রযোজ্য হয়েছিল। একে একে সুব্রত মুখার্জী, সোমেন মিত্র, মানস ভূঁইয়া, অশোক দেব, মিহির গোস্বামী, সৌগত রায়, সুলতান আহমেদ, তাপস রায়, সাধন পান্ডে, সঞ্জয় বক্সী, পরেশ পাল, জটু লাহিড়ী, শীতল সর্দার, গোবিন্দ নস্কর, সাবিত্রী মিত্র, মৈনুল হক, শিশির অধিকারী, কাশীনাথ মিশ্র, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, মানিক উপাধ্যায়, উজ্জ্বল চ্যাটার্জী, সবুজ দত্ত, অসিত মিত্র, শান্তিরাম মাহাতো, ভুপেন্দ্রনাথ শেঠ, তারক ব্যানার্জী, রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জী, অসিত মাল, সুদীপ্ত রায়, মোহিত সেনগুপ্ত, শঙ্কর সিং, আনন্দমোহন বিশ্বাস, সত্যরঞ্জন বাপুলি, নির্মল ঘোষ, খালেক মোল্লা অজস্র নামের মাঝে কিছু জনের উল্লেখ করলাম।
মমতা কখনই হামবড়া বাম এলিটদের মত আমিই সর্বজ্ঞ ও বাকি তোমরা সকলে অশিক্ষিত নিরেট- এমনটা করেনি। সে জানে আমার দলে সকলেই চোর চামার নিরেট ইয়েসম্যান। কিন্তু বিপক্ষ দলের কূটনীতি ও রাজনীতির সাথে লড়তে গেলে মেধা চাই, যার জন্য সে পিকে-কে নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। ২০১১ পূর্ববর্তী এই মেধাভিত্তিক কাজগুলোই করে দিত দীপক ঘোষ, দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়বা উপেন বিশ্বাসের মত আমলারা। বরং বিজেপি সরকারে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন, নানা ধরণের এঁঠো কাঁটা কমিটির মাধ্যমে বামমনষ্ক বুদ্ধিজীবী প্রজাতির বড় অংশকে দখল করে নিয়ে সক্ষম হয়েছিল। রিজওয়ানুর কান্ডের পর অবাঙালী মুসলমান ভোটব্যাঙ্কে মমতা ঢুকে যায়, এরপর ফুরফুরার পীরের ছানা গুলো আর ‘জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ’ নামের শতাব্দীপ্রাচীন সংগঠনের ধান্দাবাজ নেতা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীকে কিনে নিতেই বঙ্গীয় দুধেলগাইদের হেঁশেলে ঢুকে পরে।
শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠিত দুধেলগাই রাজনৈতিক নেতাগুলোকে মমতা খেতে পারেনি। রাজ্যে রাজনৈতিক পালা পরিবর্তনের পর, প্রশাসন যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে, কাউকে লোভ দেখিয়ে হোক বা ভয় দেখিয়ে, একে একে করিম চৌধুরী, হামিদুর রহমান, মহঃ সোহরাব, মোজাম্মেল হক, মান্নান হোসেনের মত জেলার নেতাদের হাতে তৃণমূলের ঝান্ডা ধরিয়ে দিয়ে সক্ষম হয় মমতা ব্যানার্জী। এরপর শুরু হয় দল ভাঙানোর নোংরা অসভ্য খেলা, যার শুরুটা হয়েছিল ধুলিয়ান পুরসভা দখলের মাধ্যমে। ২০১৪ সালের পঞ্চায়েৎ নির্বাচনে জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদ বামেদের দখলে গিয়েছিল, কিন্তু রাজ্য সরকার ততক্ষণ অবধি জেলা পরিসদের বোর্ড গঠন করেনি- যতক্ষন অবধি বিজয়ী বাম সদস্যেরা দল পালটে তৃণমূলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আজকে যারা আলিমুদ্দিনের চেয়ারে, সেদিনও দলের ক্ষমতাতে এনারাই ছিলেন অধিকাংশ। বামেদের এই স্থবির নেতৃত্ব কী সেই দল বদলুদের বাড়ি বা রাস্তা ঘেরাও করতে পেরেছিল? কোন সেটিং এর জন্য এনারা সেদিন একপ্রকার বসেছিল। আজকের সেটিং তাত্ত্বের ফেরিওয়ালারা তখন কেজি ইস্কুলে বর্ণ পরিচয় পড়ত, তাই সেটিং এর ইতিহাস জানেনা।
মজার বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে তাবড় মিডিয়াকুল সবসময় শাসকের বিপক্ষে থাকে। এমনকি গোদী মিডিয়ার কালেও রবীশ কুমার ও এনাদের মত অনেকেই বিধোধী আওয়াজকে প্রধান্য দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বামেরা হল সেই বিরল প্রজাতি, ১৩ বছরের বিরোধী ভূমিকা ১টি মিডিয়াকে নিজেদের ফেভারে করতে পারেনি, না নিজেরা কোনো বিকল্প মিডিয়া করতে পেরেছে কেরল বা ত্রিপুরার মত। এমনই অপদার্থ তারা।
কংগ্রেসে সফলতা পেয়ে বাম শরিক দলগুলোকে টার্গেট করে মমতা। একমাত্র সিপিএমকে মূল বিরোধী ও গণশত্রুর পর্যায়ে নিয়ে যায় প্রচার কৌশলে। ক্রমে, RSP আর ফরোয়ার্ড ব্লককে খেতে শুরু করে। পরেশ অধিকারী, চাঁদ মহম্মদ, পীযুশ তিরকে, দশরথ তিরকে, জোয়াকিম বাক্সলা, উদয়ন গুহ, হাফিজ আলম সৈরানী, মোর্তাজা হোসেনের মত নেতাদের দলে ভিড়িয়ে নেয়। কোনো ক্ষেত্রে নেতা সরাসরি না গেলেও বউ, ছেলে বা মেয়েকে পাঠিয়ে দেয় তৃণমুলের টিকিটে লড়তে। মুর্শিদাবাদের আগে অবধি সিপিএম দল সেভাবে ছিলনা উত্তরবঙ্গে। সেখানে মূলত দাপট ছিল শরিক বাম দলগুলোর। শিলিগুড়ি শহর কেন্দ্রিক সিপিএমের ভালো দাপট ছিল, তার বাইরে শুধু জলপাইগুড়িতে ছাড়া। শরিক বামেদের প্রায় গোটাটাই বিজেপিতে রুপান্তরিত হয়েছে ভায়া তৃনমূল। ফলত আজও যে উত্তরবঙ্গে বামেরা দুর্বল, তার কারন সিপিএম এর দুর্বল সংগঠন।
২০১১ এর আগে যারা মমতার সাথে গিয়েছিল, তারা অবশ্যই বামশাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।
২০১১ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে যারা তৃণমূলের ঝান্ডা ধরেছিল, তাদের সিংহভাগই ভয়ের তাড়নাতে
গিয়েছিল অস্ত্র মামলা, গাঁজা কেস বা নানা ধরণের মিথ্যা মামলাতে ফেঁসে যাওয়ার চেয়ে তৃনমূল
করা ভালো, কারন ততদিনে গুন্ডা কন্ট্রোল শুরু করে দিয়েছে তিনি।
২০১৬ এর পরে যারা দলবদল করে তৃনমূল হয়েছে, তারা শুধুমাত্র চুরি করবো বলেই গিয়েছে। কারন ধীরে ধীরে মমতার বহু কাছের লোক
লাথি খেয়েছে, কেউ মরে বেঁচে গিয়েছে।
চতুর্থ
সিপিএমের সদ্য গোফ গজানো, হোয়াইট কলার সোস্যালমিডিয়া বিপ্লবীরা ভীষণ ভাবে আদর্শের গল্প শোনায়। বর্তমান অযোগ্য নেতৃত্বের অধীনেই তো অবক্ষয়ের শুরু। রাজক্ষমতা চলে যেতেই ক্ষমতালোভী নেতৃত্ব একে একে তৃণমূলে ভিড়তে শুরু করে। দলে থাকাকালীন এদের অবক্ষয় ধরার মত দৃষ্টি ছিলোনা নাকি সাহস ছিলোনা? রাধিকা রঞ্জন প্রামানিক, আবু আয়েস মন্ডল, লগন দেও, আব্দুল রাজ্জাক, শওকত মোল্লা, তাপস চ্যাটার্জী- এই তালিকা লিখতে বসলে শেষ হবেনা। মোদ্দা কথা, ৩৪ বছরে একটা পোক্ত ভিত রাতারাতি ধসে যায়নি, একটু একটু করে আদর্শচ্যুতি, অন্তর্কলহ, অন্তর্ঘাত আর পাল্লা দিয়ে ‘সেটিং’ করে নিষ্কর্মা লোকগুলোর শীর্ষপদে আহরণ দলটাকে শুণ্যতে নামিয়ে এনেছে।
গান্ধীজীর তিন বাঁদরের একজনের মুখে হাত, একজনের কানে হাত, শেষের জন্যের চোখে হাত ছিল। কিছু ৩টি বাদঁরের ২ জন চোখে দেখত, ২ জন কানে শুনতো, আর ২ জন মুখে বলতেো পারত। মমতার গান্ধীবাদি আদর্শ এখন এই ফর্মুলাতে কাজ করছে। যে কু দেখছেনা, সে কু শুনছে ও কু বলছে। যে কু বলছেনা সে কু শুনছে ও দেখছে। এভাবেই গোটা সিস্টেমটা চলছে, এক চমৎকার মিথোজীবীয়তা চোর আর প্রশাসনে। এরই ধারাবাহিকতায়, ২০১৪ সালে প্রথম ভাইপোকে ইন্ট্রিডিউস করা হয়। ভাইপোর উত্থান আসলে মমতা কালেকশন এজেন্ট হিসেবে, প্রথমে অর্থনৈতিকভাবে, তারপর দলের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করেছে আর আজকের দিনে প্রশাসনের উপরে বসিয়ে দিয়েছে। এই হচ্ছে ২ লাইনে ভাইপোগাথা।
আমার এক বন্ধু দাবী করেছিল, বামেরা নাকি সফট টার্গেট। ভেবে দেখলাম ঠিকিই, সফট টার্গেটই বটে। তবে সেটা শিকারীদের নয়, অবোধ বালকদের মনোরঞ্জনের পাত্র হিসাবে এরা সত্যিই সফট টার্গেট। আজ অবধি কোনো প্রখ্যাত শিকারীকে বলতে শুনেছেন- কেন্নো শিকারে যাচ্ছে, অথবা বিশ্ববিখ্যাত মুরগি শিকারীর নাম জিম করবেট? কিম্বা চালকুমড়ো কাটার মধ্যে বীরত্ব আছে? বামেরা ভাবে আন্দোলনের রাস্তা তাদের হিসাব মত চলবে, অন্য কেউ যে কোনো যুক্তি বা বুদ্ধি ধরে এটা বাম শিবির মানতেই চাইনা অন্তর থেকে। নতুবা ডাক্তার কিঞ্জলের নামে এরা কখনও খাপ বসাতে পারে? একজন কোথায় লিখলে, বাকিরা কোরাসে সুর লাগায়। এদের নিজেদের দমে মুরোদ নেই একটা টানা আন্দোলন করার, হয় সংগঠন নেই, কিম্বা পুলিশ উদোম ক্যালাবে সেই ভয়ে যায়না, বাকিটা নিচুতলায় তৃনমূল চোরগুলোর সাথে সেটিং করে শিতঘুমে। দেড়খানা সাহসী তরুনী মুখ ছাড়া গোটা বাম শরীর পক্ষঘাতগ্রস্থ। এই হচ্ছে এ বাংলার বামধারার বিনোদান্দোলন।
বিনোদনের নানা ধারা রয়েছে, এ বাংলাতে সিনেমা সিরিয়ালের পাতি অভিনেতাটিকেও তৃণমূল দলে ভিড়িয়েছে- ফলত চলচিত্র শিল্পে মন্দা। মানুষ বিকল্প বিনোদন খুঁজে নিয়েছে, চোরের ভূমিকাতে রোজ তৃণমূলের কোনো না কোনো নেতা ধরা খাচ্ছে, পরিচালকের ভূমিকাতে বিভিন্ন বিকৃত সংবাদমাধ্যম, যারা মূলত ন্যারেটিভ রচনা করে দেয়। বিবেকের ভূমিকাতে খ্যামটা নেচে সোস্যালমিডিয়ার বাম্বাচ্চারা দায়িত্ব নিয়ে বিনোদনের ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছে। নিত্যদিনের চরম খোরাক, কোনোদিন টানটান উত্তেজনা, তো কখনও গতানুগতিক মেলোড্রামা। বিজেপির সার্কাস, বামেদের বিবেক সাজা ও তৃণমূলের চুরি- সব মিলিয়ে রোজজীবনে ব্লকবাস্টার লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট এর যোগানে ঘাটতি নেই।
এর মাঝে কি প্রতিবাদ, অবরোধ হয়না! হয় বৈকি, কিন্তু অধিকাংশই দানা বাঁধেনা, যেটা বাঁধে সেটাও পিটিয়ে তুলে দেয় পুলিশ। প্রতিবাদ করা একটা রোজকার অভ্যাস। জিমে অনুশীলন করার মতো ব্যাপার। একদিন ঢিলে দেওয়া মানেই আপোষের চর্বি জমতে দেওয়া। তখন অন্যায়ের সঙ্গে সন্ধি সহাবস্থান করে চলা অনিবার্য হয়ে পরে। আমি আমার প্রায় প্রতিটা লেখাতেই বলি, বিজেপি আর তৃনমূল আলাদা নয়, একই পরিবারের- সঙ্ঘ পরিবার। সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে যে আন্দোলন সংগঠিত করেছিল মমতা ব্যানার্জী, তাতে RSS এর তরফে পূর্ণ সহযোগিতা ছিল, সর্বভারতীয় স্তরে প্রচারের ব্যবস্থাটা এরাই করেছিল। বিজেপির তরফে সিঙ্গুর কান্ডে এক্সপ্রেসওয়ে ধর্ণামঞ্চে রাজনাথ সিং এর উপস্থিতি বিজেপির অবস্থানও পরিষ্কার করে দেয়। একই কোম্পানির দুটো ব্রান্ড, পশ্চিমবাংলার মুসলমান ভোট ফ্যাক্টর বলে, এখানে তৃণমুল নামের ‘হালাল’ সংস্করণ দল বানিয়ে রেখেছে উভয় দলের মালিক সঙ্ঘ পরিবার। সুতরাং এদের মাঝে যেকোনো বিবাদ বা আন্দোলন, সবটাই লোকদেখানো। মালিকের নির্দেশে অধিকাংশটাই গটাপ-ম্যাচ, বাকিটা পারিবারিক অন্তর্কলহ। সুতরাং, “খেলা হবে” এর চেয়ে আদর্শ রাজনৈতিক স্লোগান কী আর কিছু হতে পারত?
বিজ্ঞান টেনেছিলাম, ল্যামার্কের সেই সুত্রানুযায়ী- প্রতিটি জীব তার জীবনকালে অর্জিত করা সকল বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত করে। বর্তমানে এই ২০২৪ সালে এসে প্রতিটি নেতৃস্থানীয় বামেরা, কবে কোন বিপ্লবটা করেছে, যার সুবৈশিষ্ট এই যুব প্রজন্মে আসবে? যে বামেরা লড়াই এর ময়দান থেকে উঠে এসেছিলেন তারা গত হয়েছেন। বরং, বর্তমানের ষাঠোর্ধরা তাদের যুবা বয়সে ক্ষমতাসীন পার্টিকে পেয়েছিল, আন্ত-পার্টি সংগ্রামের নামে সেটিং করে দলীয় পদ পেয়েছিল, কেউ শাঁসালো সরকারী চেয়ার। এনাদের নেতৃত্বে থাকা যুব নেতৃত্ব কীভাবে সেটিং তত্ত্বের বাইরে অন্য কিছু শিখতে পারে? বরং শিখলে তা বিজ্ঞান ও প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ হতো।
ল্যামার্কই বলেছেন - ক্রমাগত কোন অঙ্গ অব্যবহারের দরুন নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে অবশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আত্মবিশ্বাস, সাহস, ও সংগঠন- রাজনীতির এই তিন অঙ্গের ক্রম অব্যবহারের দরুন ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হতে হতে বিলুপ্তের পর্যায়ে চলে গেছে বামেদের। কংগ্রেসের সাথে জোট এতে আইনত সিলমোহর দিয়েছে। নতুবা এনাদের উদভ্রান্ত সোস্যালমিডিয়া সেনাদের পোষ্ট করতে হয়- “আমরাও কিন্তু রাস্তায় আছি তিলোত্তমা কান্ডে, এটা ভুলোনা”। কিম্বা ঘাটালের বন্যায় ত্রাণ শিক্ষক সংগঠনের ত্রাণ বিলির ছবিতে লিখতে হয়- এগুলো রেখে দিও যত্ন করে, কে কখন চেয়ে বসে। আসলে অভাবের সংসারে লজ্জা থাকতে নেই, এদের অবস্থাও তাই। অসহায়তা, অসুস্থতা আর গরীবির বিজ্ঞাপন দেখিয়ে রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি করে মানুষের ভরষা আদায় করা যায়না। ভিক্ষুককে মানুষ আহা করে দুটো টাকা দেয় বড়জোর, আত্মীয় বানায়না।
বাজারে নতুন টার্ম এসেছে – অরাজনৈতিক আন্দোলন। পোল্ট্রি মুরগির চাষ যারা করেন, তারা জানেন এ ফসল ৪০ দিনের, এর পরেই এর মেয়াদ শেষ। ৪০ দিনের বেশী যদি মুর্গি রয়ে যায়- তার খোরাক যোগাতে গিয়ে চাষীকে দেউলিয়া হতে হবে। এই অরাজনৈতিক আন্দোলনও আসলে পোল্ট্রি মুগরি চাষের মতই, বিশ্বজুড়ে এর নমুনা দেখুন, কমবেশী ৪০ দিনের মধ্যেই এই আন্দোলনের আয়ু ফুরিয়ে গেছে। আর যেটা টিকে গেছে সেটা মালিককে, মানে সরকার বা কতৃপক্ষকে উচ্ছেদ করেই ছেড়েছে। তিলোত্তমা কান্ডেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। জুনিয়র ডাক্তারেরা ‘তাদের’ দাবী আদায়ে আন্দোলন করছিল, রাস্তায় ছিল ও আছে। তাদের ৯০% দাবী আদায় এর প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল, সেটা রীতিমত কালীঘাটের গলায় গামছা দিয়ে।
সেই দফায় সল্টলেকের
রাস্তা থেকে তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ফিরে যায় এবং যথারীতি মমতা ব্যানার্জী ও তার
সরকার প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যার্থ হতে, ঠকে যাওয়া জুনিয়ার ডাক্তারেরা আবার অনশনে। এবারেও
সেই কাঁঠালের আমসত্ত্ব- অরাজনৈতিক। মাঝে এমন হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে- পরিবারের
কর্তা মোহন ভাগবতের নির্দেশে বিজেপি তার সহোদরার সরকারের প্রতি আন্দোলন থেকে সরে যেতেই
অরাজনৈতিক আন্দোলনের কঙ্কাল বেরিয়ে পরেছিল। আন্দোলনের নামে ‘নিখোঁজ’ এর পোষ্টার পরা
শুরু হয়ে গিয়েছিল যত্রতত্র। অথচ, আন্দোলনকে টেনে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র দায় ছিল ও আছে
বামেদের, কারন তারা ছাড়া আর কেউ অন্তত এ রাজ্যে ‘বিরোধী’ দল বলে কেউ নেই, শূন্য হলেও।
অহেতুক ফুটেজ ও সর্বত্র স্টেকের দাবী করতে গিয়ে তারাও কোনঠাসা, স্বতস্ফুর্ত জনগণের
অংশগ্রহণের চাপে। অথচ কেউ প্রশ্ন করেনি নিজেদের SFI নেতৃত্বকে- কেন এতোদিন মেডিকেল
কলেজগুলোতে ভোট হয়নি, এই নিয়ে কোথাও কোন আন্দোলনের উড়ো খবর কেউ দিতে পারবেনা। এটাই
বাস্তবতা অধিকাংশ গিটারবাদক বাম যুব নেতৃত্বের।
পঞ্চম
চুরি, ডাকাতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি সহ যাবতীয় দাবিদাওয়া আন্দোলনকে জিইয়ে রাখা রাজনৈতিক দলের কাজ, গণতন্ত্রে এই কাজ বিরোধীদের দায়িত্ব। ক্ষমতার পালাবদল হলে কোনো অরাজনৈতিক ডাক্তার, কোনো সিনেমার নায়িকা, কোনো গায়ক বা কোনো আম মানুষ মসনদে বসেনা, বড়জোর এদের কেউ কেউ যৎসামান্য অংশীদার হতে পারে ক্ষমতাসীন দলের, কিন্তু মূল চালিকাশক্তি রাজনৈতিক নেতাদের হাতেই থাকে। আর এই পালাবদলের জন্য দরকার মানুষের ভরষা অর্জন করা।
বিরোধী মমতা ব্যানার্জী তার সময়ে সরকারকে বিব্রত করে প্রায় প্রতিটা অঘটনে সংশ্লিষ্ট পরিবারের ভরষা অর্জন করেছিল, আর এভাবেই মানুষের কাছে বার্তা দিয়েছিল, দেখো যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি আর আমিই হচ্ছি নির্যাতিতের আশ্রয়স্থল। মমতা পেরেছিল রিজওয়ানুরের মা কিম্বা তাপসী মালিকের বাবার ভরষা অর্জন করে, তাদেরকে ‘অরাজনৈতিক’ মুখ বানিয়ে তুলতে বাম সরকারের বিরুদ্ধে। আজকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কে সেই ভরষা আদায়ের কাজটা করতে পারেছে? মইদুল ইসলাম মিদ্যার বাবা ছাড়া সেই অর্থে কারোর ভরষা আদায় করতে পারেনি, যারা তৃণমূল দল ও সরকারের দ্বারা অত্যাচারিত। সারদা, নারদা, কামদুনি, কান্ডের কাউকে অত্যাচারিতের মুখ করে তুলতে পেরেছে? এমনকি তিলোত্তমার পরিবারও ১টি শব্দ খরচা করেনি বিরোধী রাজনৈতিক দলের জন্য। এটা কাদের ব্যর্থতা?
সেটিং তত্ত্বের গবেষণায় মত্ত বাম বিপ্লবীরা আর কিছু পারেনি, জানেওনা কীভাবে পারতে হয়। কিছু একটা বলে নিজেদের শিশুতোষ প্রবোধ দিতে হবে, এটারই নাম সেটিং তত্ত্ব, যার আড়ালে নিজেদের যাবতীয় ব্যর্থতাকে লুকিয়ে ফেলা যায়- নিজেদের বৃত্তে। আবার হার্বার্ট স্পেন্সারের “যোগ্যতমের উদবর্তনে” ফিরে আসতে হয়, সেটিং তাত্ত্বিক ‘যোগ্যতমদের’ ভিড়ে স্পষ্ট কথা বলা ‘অযোগ্যেরা’ ক্রমশ সংখ্যালঘু হয়ে পরেছে দলে। অবস্থা এমন ভয়াবহ যে- ওহে বিপ্লববাদী দলের কাণ্ডারীরা, এটা ভুল হচ্ছে, বলার সাহসটুকু নেই। বস্তুত নেতাদের মতে তাঁরা ভুলের উর্ধে। কিন্তু মানুষ এদের যোগ্যোতা বোঝে, তাই ফুটো পয়সার ভরষাও করেনা। অথচ এই সেটিং তত্ত্বের নাম হওয়া উচিৎ ছিল- পরিবার তত্ত্ব, সঙ্ঘ পরিবার। এটাকে পাড়ায় পাড়ায় প্রতিটি বক্তব্য ভাষণে ফাটা ক্যাসেটের মত বাজানো উচিৎ ছিল , যাতে মানুষের মর্মে গেঁথে যায়।
উচিৎ ছিল, তৃনমূলের দ্বারা অত্যাচারিত পরিবার গুলোর ভরষা আদায়ের। দরকার ছিল প্রতিটা ঘরছাড়া বা খুন-জখম হওয়া দলীয় কর্মীদের পাশে থাকা, উলটে রেড ভলেন্টিয়ার নাম দিয়ে যুব বামকর্মীদের ‘বার খাইয়ে’ সমাজসেবায় নামিয়ে, সরকারের প্রতিটি ব্যর্থতার জাইগাতে জনরোষ কমিয়ে নবান্নকে স্বস্তি দিয়েছে। সেটা করোনার সময় বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে হোক বা হালের ঘাটাল বন্যায়, কিম্বা আসন্ন ‘ডানা’ ঘুর্ণিঝড় এর সতর্কতাতে। আসল সেটিং তো এখানে, আসল তত্ত্ব এখানে। নতুবা তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদের স্বামী কীভাবে একটা বাম নামধারী ক্যান্টিনের অভিভাবক হতে পারে, কাকে তুষ্ট করতে এমন মহতি আয়োজন, যেখানে আজও জেলায় জেলায় ঘরছাড়া পার্টি কর্মী সমর্থকের সংখ্যা লক্ষাধিক। বিদ্যুৎ মণ্ডলের বাড়িতে প্রতিনধি অবধি পাঠাতে পারেনি, এমন সব পালোয়ান। মানে ওটা ভাইপোর এলাকা, তাই সব চুপ। যারা নিজেদের দলের কর্মীদের সুরক্ষা দিতে পারেনা, তাদেরকে কেন সাধারণ মানুষ ভরষা করবে? ২০১৬ পরবর্তী রাজ্য সিপিএম বয়েলিং ফ্রগ সিনড্রোমে পরে গিয়েছিল, এই প্রজন্মের যুবদের আত্মিক প্রচেষ্টা সত্বেও, নেতৃস্থানীয় নির্জীব এলিটবুড়োদের সৌজন্যে যে তিমিরে ছিল, সেখানেই পরে রয়েছে। পরিকল্পনার চেয়ে এরা প্রার্থনাতে বিশ্বাসী।
এরা জানেনা কোন প্রশ্নটা আদালতকে করতে হয়, কোনটা জনগণকে, কোনটা দলের ফসিল নেতাদের আর কোনটা নিজেকে। ঘরের বৌ এদের রাজনৈতিক পরিচয়কে চার পয়সা দিয়ে পোঁছেনা, ফলত যাদের বিরুদ্ধে বললে পাল্টা জবাব আসবেনা- সেই তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দিকে হাওয়াতে তির ছুড়ে পালোয়ান সাজে নিষ্ফলা আক্রোশে। মমতার দলদাস পুলিশের বিরুদ্ধে বলুক, না না না না সেই মুরোদ নেই, পিছনে রুল গুঁজে দিলে অন্ডকোষ শুকিয়ে কিসমিস হয়ে যাবে যে, তাই জুজুর ভয়ে ওসব কথা বলা যাবেনা। বিপ্লব শুধুমাত্র টিভির পর্দায় আর সোস্যাল মিডিয়াতে। আগেকার দিনে রাজা বিদূষক পুষে রাখত, যে মজারচ্ছলে কথার মারপ্যাঁচে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রাজার দোষ ধরে দেখাতো। নীলসাদা সরকারও কিছু বাম্বাচ্চা পুষে রেখেছে, বিদূষকের বামা-ক্ষ্যাপা ভার্সন। বাকিটা আপনি রোজ দেখেন। সেটিং আসলে এখানে।
এরপর রয়েছে মমতা ব্যানার্জীর কুখ্যাত থ্রেট কালচার ও ব্ল্যাকমেলিং
রাজনীতি। প্রায় প্রত্যেকটি সিপিএম নেতাকে ধরে ধরে
ব্ল্যাকমেইল করে বসিয়ে রেখেছে। হয় তুমি তৃণনমূলের ঝান্ডা ধরো, কিম্বা ধীরে ধীরে রাজনীতি ছেড়ে দাও। একান্তই যদি রাজনীতি করো, সেক্ষেত্রে তিথি নক্ষত্র দেখে নির্দিষ্ট লগ্নে আমাদের বিরোধিতা করো কিন্তু ভোট যেন আমাদের বাক্সে আসে
সেই গ্যারান্টি নিতে হবে। নতুবা কোনো নেতার
বউকে এই স্কুল থেকে ৫০০ কিমি দূরে অন্য জায়গায় ট্রান্সফার
করে দেবো, কার বউ এখানকার নার্স তাকে দূরে
ট্রান্সফার করে দেবো। কাউকে মেয়ে ছেলে কেস দেওয়ার ভয়, কাউকে গাঁজা কেস, কাউকে অস্ত্র কেস, এই ধরণের মোটা দাগের প্রতিহিংসা থেকে বাঁচার
ভয়ে সিপিএমের অধিকাংশ নেতারা জুজু হয়ে বসে আছে। এখানেই আসল সেটিং তত্ত্ব। প্যাম্পার্স
পরিহিত স্যারেলাক বেবি আজকের ফেসবুক বাম বিপ্লবীরা এই সবের খবর রাখেনা।
ষষ্ঠ
এবারে আসি দুধেল গাই প্রজাতিতে। একটা জাতি কখন পিছিয়ে পরে, যখন মা হয় অশিক্ষিত বা অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী। এই রাজ্যের দুধেল গাই সমাজের ৯৮% মহিলা বাচ্চা পয়দা করার বাইরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেনি। বড়জোর কেউ কেউ গৃহপরিচারিকার কাজ বা বিড়ি বাঁধার কাজ করেন, এই হচ্ছে দুধেল গাই সম্প্রদায় মহিলাদের পেশা। এ রাজ্যের সরকারী চাকরিতে দুধেল গাই মাত্র ৫% চাকরি করে, মহিলার সংখ্যা শতাংশের বিচারে আসেনা। অথচ জনসংখ্যার শতকরা ২৭ জন দুধেল গাই। মূল তো গরীবি আর শিক্ষাহীনতা, তাহলে কেন এরা দুধেল গাই হয়ে থাকবেনা, সেই বিজ্ঞান- যোগ্যতমের উদবর্তন।
SNAP, Guidance Guild and Pratichi Trust সংস্থার জরিপ মতে, এ রাজ্যের মাত্র ৩ শতাংশ দুধেল গাই পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাাজার টাকা বা তার উপরে। প্রায় ৪০ শতাংশ দুধেল গাই পরিবারের মাসিক আয় ২৫০০ টাকা বা তারও নিচে। বাকি ৪০ শতাংশ মেরেকেটে মাসে ৫০০০ টাকা রোজগার করে। স্বভাবতই, মাসে মাসে যদি লক্ষীর ভাণ্ডারের নামে ফোকেটে ৫০০/১০০০ টাকা একাউন্টে ঢোকে, সেই পরিবারের কাছে মমতা ব্যানার্জী তো ফেরেস্তা। সেটিং, চোর, স্বৈরাচার এই ধরণের এলিট শব্দের কোনো অর্থ আছে এই দুধেল গাই পরিবারগুলোর কাছে? অথচ সংখ্যার বিচারে, এদের ভোটেই তৃনমূল সরকার ক্ষমতায়। ভোট লুঠ, ধমকানি, চমকানি, যাবতীয় অপকর্ম দুধেল গাইদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় সামান্য কয়েক হাজারের বিনিময়ে। ফলত মারেও এরা, মরেও এরা। উপর তলার নেতারা লক্ষ কোটি কামাই করে চুরি চামারি করে, এই দুধেল গাই নামের আধুনিক দধীচির হাড়ের তৈরি সাম্রাজ্যে।
বিজেপির কাছে অবশ্য এরা দুধেল গাই নয়, এরা প্রত্যেকে পাকিস্তানি এজেন্ট, টুকরে টুকরে গ্যাং, দেশদ্রোহী, উগ্রপন্থী, কাটুয়া ও শান্তির ধর্মের ছেলে। উল্টোদিকের নজরে বিজেপি শব্দটাই হারাম, শয়তানের দোসর। ভোট বাক্সে দুধেল গাই আর যাকে খুশি ছাপ দিক, বিজেপিকে দেবেনা। তুলনামূলক শিক্ষিত দুধেল গাই গুলোর কাছে আজও তৃনমূল সেই ‘সাচার কমিটির রিপোর্ট’ দেখায় কুমির ছানার মত। তৃণমুল আমলে দুধেল গাইদের হাল - পরিসংখ্যানগত ভাবেই আরো তলানিতে গেছে, তার খোঁজই রাখেনা বামেরা, তারা পণ করেছে সেটিং তত্ত্বের বাইরে যাবেনা। তারও পরে, দুধেল গাই দের পক্ষ নিয়ে কিছু বেশী বললে সুশীলেরা ‘বামৈশ্লামিক’ শব্দের যোগার করে রেখেছে, এর ছোঁয়াচ না বাঁচাতে পারলে এলিটত্ব প্রগতিশীল তকমা খসে যাবে। বাস্তবিক উভয়সঙ্কট, ফলত দুধেল গাই সম্প্রদায়ের কাছেই যায়না তাদের হিতার্থে। ধান্দাজীবী পীরের নেপোকিড গুলোকে সেকুলার পরিচয় দিয়ে বকলমে ‘দুধেল গাই’ সম্প্রদায়কে লাভ লেটার পাঠায়। দুধেল গাই সম্প্রদায়ের আধুনিক শিক্ষা কম থাকতে পারে, তার মানে তো নির্বোধ নয়, এরা বুঝে যায়, সেটিং তত্ত্বজীবীরা পরকিয়ার সম্পর্ক চাইছে। মাঝখান থেকে ক্ষীর খেয়ে যায় ভাইপো সিদ্দিকি। মোদ্দাকথা, দুধেল গাই সম্প্রদায় বামেদের আপন ভাবেনা, এদিকে তস্য গরীব দুধেল গাই দের কাছে মমতা ফেরেস্তা। কারন এরাজ্যে দুধেল গাই দের ভোটই মূল ফ্যাক্টর, ফলত, বামেরা জিরো।
অরাজনৈতিক আন্দোলন দিয়ে
মমতা ব্যানার্জীকে টলানো যাবেনা, কারন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গুরুঠাকুরেরা তার উপাস্য।
সেই নাগপুরী আশির্বাদ সদা সর্বদা তার বিপদে আপদে পাশে থাকে, রণে বনে জলে জঙ্গলে। তবে, সবেরই একটা শেষ হয়, কালের নিয়মেই। অধিক স্থুলতা মৃত্যুর কারন। লাগামহীন দুর্নীতি,
চুরিচামারি ও স্বৈরাচারী শাসনের ভারে ভেতর থেকে এই সরকার ফাঁপা হয়ে গেছে, ভেন্টিলেশনে
চলে গেছে। তৃনমূল দলটা চলছে তোলাবাজ সংগঠনের কর্তৃত্বে। যেখানে একটা কেষ্টা
জেলে গেলে, ঠিক আরেকটা সমমানের দাগী কাজল তোলামূলকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ভার নিয়ে নেয়।
যার কেউ নেই, সে ভাগ্যের হাতে সঁপে দেয় নিজেকে। পশ্চিমবঙ্গবাসীও নিজেদের সঁপে দিয়েছে নিয়তির হাতে। নিয়তির পরিহাস অতি রুক্ষ। জাল গুটানো হচ্ছে একটু একটু করে। লক্ষ্য মাথা। আমরা গোয়েন্দা গল্পের ভক্ত, কিন্তু গোয়েন্দা গল্পে একটা মারাকাটারি রোমহর্ষক প্লটের শেষে সাফল্য হচ্ছে অপরাধীকে শনাক্ত করা। এখানেই গোয়েন্দার বীরত্ব। গল্পে কখনও দেখায়না সেই অপরাধীর কি শাস্তি হলো, কারন শাস্তি দেবার বিধান গোয়েন্দাদের হাতে থাকেনা, সেটা আদালতের কাজ। বাস্তবের গোয়েন্দারাও কিন্তু অপরাধী সনাক্তকরনের কাজটুকুই করে, এবং শাস্তির জন্য আদালতে তুলে দেয়। আর আমাদের গণতন্ত্রের বড় প্রহসনই হল বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রীতা, এরই ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে মানিক-কেষ্টা-কুণাল ঘোষেরা।
আরো দ্বিচারিতা আছে, যে অপরাধে উমর খালিদ বিনা বিচারে জেলে, সেই মামলাতেই কানাইহা কুমার বেলে। যে সুপ্রিম কোর্ট অর্ণব গোস্বামীর মামলাতে রায় দেয় – বিনা বিচারে ১ দিন কাউকে জেলে রাখা গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর অপমান, সেই সুপ্রিম কোর্টই শার্জিল ইমামকে কারাগারে রেখে দেয় বছরের পর বছর- বিনা বিচারে। দ্রুত বিচার করো, নির্দোষ হলে মুক্ত করো, দোষী প্রমান হলে যাবজ্জীবন বা ফাঁসি যেটা উত্তম সেটা করো। কিন্তু তা করলে তো রাজনীতি হবেনা।
আজ অবধি যে যে তৃনমূল নেতারা জেলে গিয়েছিল, কুণাল ঘোষ বাদে কেউ কী আর স্বমুর্তিতে ফিরতে পেরেছে? সুদীপ ব্যানার্জী ঢোঁড়া সাপ, মদন মিত্র জোকার। এরা নিজেরাও জানে তারা কী অপরাধ করেছে, পরিবারের সদস্য তাই কখনও দিদি তো কখনও দাদা- আপাতভাবে এদের মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু যেদিনিই আবার পালাবদল হোক, বেঁচে বর্তে থাকলে পুনরায় জেলযাত্রা অবধারিত। লালুপ্রসাদ সবচেয়ে বড় উদাহরণ, দেরি হয়েছিল, কিন্তু জেলের ঘানি আজও টানছে এই সিবিআই এর তদন্তেই। এভাবেই একদিন তৃনমূল দলটা বিলুপ্ত হবে নিজের দূর্নীতির ভার বইতে না পেরে। অগত্যা এটাই আশার আলো, নতুবা ফেসবুকের meme পার্টির মত সফট টার্গেট এলিট দের দিয়ে আর কিছু হবেনা, গূঢ় সেটিং তত্ত্বের ‘কালচার’ ছাড়া।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজ বিজেপি আসলে সম্পর্কে তৃণমূলের ভাসুর। মমতা খানিকটা রাখাঢাকা দিয়ে সম্পর্কটাকে মেন্টেন করে। কিন্তু উভয় ঘরের ছেলেপুলেরা মাঝেমধ্যেই নিজেদের মাঝে ঘর অদলবদল এর খেলা খেলে স্বাদ পরিবর্তন করে। আন্দোলন বা বিপ্লবের সংজ্ঞা হচ্ছে- সাভারকরের আদর্শে ‘মুচলেকা’ ক্ষমা ভিক্ষা করা, এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রী সভার শ্যামাপোকার ধান্ধাবাজি কিম্বা গডসের মত আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়োগ। কোনোটাই সভ্যভব্য নয়, বরং কাপুরুষতা, স্বার্থপরতা এবং ইতরতার সঠিক মিশ্রনে মানব সদৃশ মানবেতর যে সকল প্রাণী গুলো জন্ম নেয়- তারাই আসলে বিজেপি। আপনি বলুন বিজেপি- RSS এর কোনো বিপ্লবের ইতিহাস আছে, গাদ্দারের মত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্রিটিশ প্রভুদের কাছে ধরিয়ে দেওয়া ছাড়া?
সুতরাং বিজেপি পিছন থেকে ছুড়ি মারতে পারে, কিন্তু সম্মুখ সমরের অউকাত এদের নেই।
কংগ্রেস তার দত্তক পুত্রের অবৈধ উপপত্নীর সৎ ছেলের মাঝে বংশধর রক্ষার ব্রতে মগ্ন হয়ে রয়েছে। গ্যালন গ্যালন জাপানী তেলেরও ক্ষমতা নেই কংগ্রেসকে দাঁড় করায়, বিপ্লব বা আন্দোলন তো অন্য গ্যালাক্সির বিষয়াদি। নাগপুরি শাসন যন্ত্রের কলে পরে কেন্দ্রে মোটা ভাই আর রাজ্যে চটি পিসি - এই ঘানিতেই পিসে তেল বের করে দিচ্ছে রাজ্যের জনগণের।
ব্যার্থ হলেও প্রতিবাদটা জরুরী, বিরোধী পরিসরে শত দল বা উপদল থাকুক, নানা মত থাকবেই তাদের সমন্বয়টা জরুরী। ঠিক বা ভুলের উর্ধ্বে গিয়ে প্রতিবাদ আন্দোলনের নিরবিচ্ছিন্ন ধারাটা বহমান রাখাটাই একমাত্র কাজ। আন্দোলনেরও একটা রুচি থাকতে ও রাখতে হবে, অরুচিকর অস্বাস্থ্যকর তৃণমূল অপসংস্কৃতি তাড়াতেই তো আন্দোলন বা বিপ্লব। সুতরাং আন্দোলনকারীদের ভাষা যদি তৃণমূলের মুখপত্রের সাথে একই ধারায় হয়- তাহলেই এই আন্দোলন তার কৌলিন্য হারাবে।
যারা ভাবছেন, কী দরকার বাবা ঝামেলাতে যাবার, বেশ তো গা বাঁচিয়ে রয়েছি। ভুলে যাবেননা, আপনাদের প্রতিটি বিষয়ের সিদ্ধান্ত কিন্তু এই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা নেত্রীরাই নিয়ে থাকেন। তাছাড়া, যে সমাজ বারোয়ারি ভাবে বিনষ্ট হয়ে যায়, তাদের সাজা ভোগের বিষয়টাও বারোয়ারী ভাবেই হয়। এখানে কে শিক্ষিত আর কে ভক্ত, কে পক্ষে, কে বিপক্ষে, কে বিপ্লবী আর কে তোলামূল- তার বিচার হয়না
রাস্তায়
মানুষ আছে, রাস্তায় সিপিএম আছে। ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে সিপিএম মানে অস্পৃশ্য, তেমনি তৃনমূল
মানেই জনগণের গণশত্রু। সুতরাং, আন্দোলন তুতো সম্পর্কের জালে জনগণ এবং সিপিএম
আত্মীয়তায় জড়িয়েছে। এখন পারস্পারিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে একে অন্যের হাত শক্ত করে না ধরলে কারোরই পরিত্রাণ
নেই।