শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১১

উন্মাদের প্রিয় কবিতা



আমার প্রিয় কবিতাঃ কবি বিষ্ণুজ্যোতি রায় মহাশয়


মাগো আমায় লাইক দিতে বল ,
সকাল থেকে পোষ্ট দিয়েছি মেলা -
এখন আমি চ্যাটবক্সে বসে
করবো শুধু প্রেম পিরিতির খেলা ।

তুমি বলছো নেট ভরেছি সবে-
ঘরে কী তোর নেইকো ওয়াইফাই !
এক দিনও কী নেট প্যাক শেষ হলে
ফোন করে কি খবর নিতে নাই ?

আমিতো বেশ ভাবতে পারি মনে
পৌঁছে গেলাম কলকাতাতে শেষে -
হটসিনেমা করছি ডাউনলোড
চুপটি করে পার্কস্ট্রিটেতে বসে ।

আঁধার হলো মাদার চোখের তলা ,
কালি হয়ে ঝরছে চোখের জল -
সুন্দরীরা চ্যাট করেনা কেও
যতই কেন করি না ফ্রীকল !

মনে কর না জ্বলল সবুজ বাতি,
মনে কর না পিং করলি যেনো ,
আসল লোকের ফেক আইডি হলে
ফেক আইডি আসল হয়না কেন !

শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১১

পুরুষেরা দীর্ঘজীবি হউক

 


নারীশক্তির জাগরণ হউক, নারীরা বিভবে ও বৈভবে সমৃদ্ধিশালী হউক, ইহাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু এই যে নারীগণ বর্তমানে পুরুষজাতির নিন্দাবাদ করেন, তাহাদের বিনাশ কামনা করেন, তাহা আত্মহননের সমতুল নয় কি? পুরুষদল সমূলে বিনাশ হইলে নারীর স্তুতিগান কে গাহিবে? যুগ যুগান্তরের ধারাকে অক্ষুন্ন রাখিয়া নারীকে প্রেম নিবেদন কে করিবে? নারীর মস্তকে বরাভয় আশীষ ও নিরাপত্তার ছত্রচ্ছায়া কে প্রদান করিবে?

কালিদাস, জয়দেব, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ হইতে শুরু করিয়া বর্তমানের কবিকুল কাহাদের রূপ বর্ণনায় কবি প্রতিভার বিকাশ ঘটায়, তাহা নারীগণ একবার ভাবিয়াছেন কি? অলঙ্কারে ব্যবহৃত হয় বলিয়াই স্বর্ণ এত মূল্যবান, নচেৎ উপযোগিতার বিচারে উহা লৌহ অপেক্ষাও শতগুণে নিকৃষ্ট। নারী পুরুষের অঙ্গভূষণ, তাই না নারী নিজেকে বহুবিধ প্রকারে সুসজ্জিত করিয়া, নানা বিহঙ্গে কবরী বন্ধন করিয়া, বহুবিধ চিত্রবিচিত্র পোশাক পরিধান করিয়া, নানা ভাব ভঙ্গিমার মাধ্যমে নিজেকে মেলিয়া ধরার প্রয়াস পায় চাতক পান করে বলিয়াই স্ফটিক জলের এত কদর, নয়তো ভূমিতে পতিত হইলে সে জল কর্দমে মিশিয়া মূল্যহীন হয়।

নারী পুরুষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ বিন্দু বলিয়াই যুগে যুগে নারীর এত কদর। নারীর রূপের প্রশংসা না করিলে সে রূপের কদর কোথায়? পুরুষে কবিত্ব করিয়া বলে মৃগনয়না, তাই না রমণী নয়নযুগল কজ্জ্বল শোভিত করিয়া পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টি প্রত্যাশা করে! পুরুষ মুগ্ধ হয় বলিয়াই না নারী ললাটে কুঙ্কুম বিন্দু, ওষ্ঠে ওষ্ঠরঞ্জনী, পদযুগলে অলক্তক ও কুন্তলে পুষ্পসুগন্ধী তৈল লেপন করে? জীবনানন্দ বলিয়াছেন বলিয়াই বনলতা সেনের চুল অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ শ্রাবস্তির কারুকার্য বলিয়া বন্দিত হয়। নচেৎ কোন মহিলা কবি প্রাণ বিয়োগের সম্ভাবনা থাকিলেও স্বেচ্ছায় বনলতা সেনকে ঐ প্রশংসায় ধন্য করিতেন না। বরঞ্চ অবকাশে পরনিন্দা ও পরচর্চার আসরে বিকৃত মুখভঙ্গী করিয়া কথ্য ভাষায় বলিতেন, “মাগীর মুখ না যেন রান্না ঘরের পাতিল, আর চুলগুলো যেন কালো পাটের ফেঁসো

আমার বক্তব্যে সন্দেহের অবকাশ মাত্র ঘটিলে নারীগণই প্রমাণ করুন, কোথায় এক রমণী অপর রমণীর প্রশংসা করিয়াছে? নারীই যে নারীর অশ্রদ্ধা ও লাঞ্ছনার কারণ এমন প্রমাণ কদাপি বিরল নহে

পুরুষের অকুন্ঠ ভালবাসা না পাইলে নারীজীবনের সার্থকতা কোথায়? পুরুষ পতঙ্গের ন্যায় নারীর রূপাগ্নিতে প্রজ্জ্বলিত হইয়া নারীর নিকটেই শীতলতা কামনা করে। তাই তো জয়দেব রচিত গীতগোবিন্দে দেখিতে পাই, লক্ষকোটি প্রেমিক পুরুষের প্রতিভু শ্রীকৃষ্ণ নিঃসঙ্কোচে রাধিকাকে আপন মান, অভিমান সর্বস্য বিসর্জনের গৌরবে বলিতে পারেনঃ

ত্বমসি মম ভূষণং ত্বমসি মম জীবনম্ ত্বমসি মম জলধিরত্নম্

ভবতু ভবতীহ ময়ি সততম অনুরোধিনী তত্র মম হৃদয়মতিযত্নম্।।

নীলনলিনাভমপি তন্বি তব লোচনম্ ধারয়তি কোকনদ রূপম্

কুসুমশর-বাণ-ভাবেন যদি রঞ্জয়সি কৃষ্ণমিদম এতদনুরূপম্।।

স্ফুরতু কুচকুম্ভয়োরুপরি মণিমঞ্জরী রঞ্জয়তু তব হৃদয়দেশম্

রসতু রসনাপি তব ঘন জঘনমণ্ডলে ঘোষয়তু মন্মথনিদেশম্।।

স্থলকমলগঞ্জনং মম হৃদয়রঞ্জনম্ জনিত-রতি-রঙ্গ-পরভাগম্

ভণ মসৃণ-বাণি করবাণি চরণদ্বয়ং সরস –লসদ অলক্তকরাগম।।

স্মর-গরল-খণ্ডনং মম শিরসি মণ্ডনমঃ দেহি পদ পল্লবম্ উদারম্

জ্বলতি ময়ি দারুণো মদনকদনানলো হরতু তদুপাহিত বিকারম।।

 

অর্থ্যাত তুমিই আমার অঙ্গের ভূষণ, তুমিই আমার জীবন, এই ভব সংসারে তুমিই আমার নিধিরত্ন। হে রাধে, তোমার প্রীতিলাভার্থে এই ভুবন মাঝে সতত কেবল তোমাকেই আমি হৃদয় ভরিয়া যত্ন করিতে সচেষ্ট। নীল নলিনী তুল্য তোমার নয়ন যুগল ক্রোধে ও অনুরাগে রক্তবর্ণের কমল তুল্য রূপ ধারণ করিয়াছে। যদি ঐ রক্ত আঁখি পল্লবে কৃষ্ণকে মুগ্ধ করিতে সক্ষম হও, তবেই কমলের সঙ্গে তুলনা সফল হয়। তোমার সুগোল কুম্ভের ন্যায় স্ফুরিত কুচ যুগলের উপরিভাগে শোভিত মণিখচিত মঞ্জরি তোমার হৃদয়দেশকে কি সুষমাতেই না রঞ্জিত করিয়াছে! তোমার ঘন জঘনমণ্ডলে মেখলার বারংবার নিনাদ যেন মদনদেবের কাম নির্দেশ ঘোষণা করিতেছে।  মধুর স্বরে শুধু একবার আদেশ দাও –‘স্থলকমলকেও গঞ্জনা দিতে সক্ষম, আমার হৃদয় রঞ্জনকারী তোমার ওই পদযুগলকে রতি রঙ্গে আমার হৃদয়ে ধারণ করতঃ আলতারাগে রঞ্জিত আমার শিরঃপীড়া নাশ করিয়া, কামযন্ত্রনার গরল নাশ করিয়া তোমার ঐ পদপল্লব কে মমতা ও উদারতায় প্রসারিত করো। মদনের দারুণ অনল জ্বালা নিবারণার্থে তোমার দেহবল্লরীতে সংযুক্ত হইয়া আমার সমস্ত বিকার নাশপূর্বক শীতল

হে স্বভাবমুখরা রমণী কুল, একবার আপন হৃদয়োপরি আপন হস্ত স্থাপন করিয়া সত্য কহ– ‘পুরুষের এমন আকুতি, এমন প্রেম নিবেদন, এমন সমর্পণের পরেও কোন নারী স্থির থাকিতে পারে কি? যদি কেহ পারে, তবে সে রমণী প্রস্তরবৎ নীরস বলিয়াই জানিবে। তাহার সংস্পর্শ ত্যাগ না করিলে পদার্থের পার্শ্বটানের ধর্মানুযায়ী তোমার হৃদয় রসকেও সেই শুষ্ক প্রস্তর শুষিয়া লইবে

নারী দ্বিবিধ উপায়ে পুরুষের নিকট সম্পুর্ণ বশীভূত হয়। যথা-

) উদ্যত তরবারির সন্মুখে  

) পুরুষের অকপট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে।

প্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু যুদ্ধপ্রিয় জাতি তরবারির সন্মুখে বহু নারীকে বশীভূত করিয়াছেন। কিন্তু ইহাতে বংশ বৃদ্ধি ঘটিলেও কোন গৌরব বৃদ্ধি ঘটে নাই। কারণ পরাজিতের ভীতিজনিত বশ্যতা স্বীকারে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের গৌরব বিলুপ্ত হয়। সেখানে পরাজিতের সন্মান হননপূর্বক বিজয়ীর মিথ্যা ইতিহাস রচিত হয় বলিয়া সুললিত কাব্যের সৃষ্টি হয় না। যে প্রেমে অনুরাগ নাই, উভয়ের চরম আত্মসমর্পণ নাই, সেই প্রেম পশুর পাশবিক শরীর সুখের সঙ্গেই তুলনীয়। আত্মসমর্পণে শতকরার হার হিসাব করার অর্থই বাকি শতকরার অংশ সেখানে ভেজাল। আমি হলফ করিয়া বলিতে পারি, যদি কবি জয়দেবের মতো এমন কাব্য সৃষ্টির সুযোগ পাই, তবে বারংবার জন্মগ্রহণের কষ্ট স্বীকারে প্রস্তুত আছি

অতএব হে রমণী কুল, এখন ও কি বলিবে– পুরুষ জাতির বিনাশ চাই? পশুর স্বভাব বিশিষ্ট যে কাপুরুষ অসহায় রমণীকে ধর্ষণ করে, ধন জনের শক্তিতে ক্ষমতাশালী যে নির্দয় পুরুষ নারী জাতির উপর নানা অত্যাচার করে, সুযোগ সন্ধানী যে কামাতুর পুরুষ আপন স্ত্রীকে অন্যায় পথে পরিত্যাগ করে, সেই অশুভ শক্তিরূপ অসুরের বিনাশ তো স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই চাহে। তাহাদের কারণে কেন তোমাদের জীবনের একান্ত কামনার ধন মহাপুরুষদের বর্জন করিবে?

তাই বলি, হে গান্ধারীর মত কৃষ্ণবস্ত্রে নয়ন আচ্ছাদনকারী অবলা নারীকুল, সময় থাকিতে সতর্ক হও। বৃক্ষের অবলম্বন ব্যতীত লতিকা সকল উর্ধগামী আলোকের সাক্ষাত পায় না। যে অহঙ্কারী লতিকা অহঙ্কার বলে বৃক্ষের সহায়তা গ্রহণ করে না, সেই লতিকা অবাঞ্ছিত জঙ্গল পরিবেষ্টিত অবস্থায় অন্ধকারে পশুদিগের পদ দলন সহ্য করিতে বাধ্য হয়। তোমরাও আপনার বাঞ্ছিত পুরূষের সন্ধানে সচেষ্ট হও। নূতন নুতন কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীর প্রেরণার উৎস হও। আইস, তোমাদের লইয়া আমরাও কালিদাস, জয়দেব, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ ও অন্যান্য প্রথিতযশা কবি সকলের মতো কাব্য রচনা করি। তোমরা একবার বলো, পুরুষের ভালবাসার তুল্য ভালবাসা নাই।

বারংবার বলো পুরুষেরা দীর্ঘজীবি হউক।

 

বুধবার, ৮ জুন, ২০১১

রীতিকার কথা

 


রবিকাহন

প্রেম প্রেম খেলা

সম্পর্কের টানাপোরেন আনেক দিনের, শেষমেশ যেটা ভেঙেই গেল। হঠাৎ করেই কাল বৈশাখি যেন সব কিছু ওলঠ পালট করে দিল। সুদীপ্তর জীবনে এটাই ছিল সব চাইতে বেশি হারানোর যন্ত্রণা, কারন রীতিকাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে ছিল সে। জীবনের প্রথম ভালো লাগা, প্রথম প্রেম। এভাবে সব কিছু শেষ হয়ে যাবে কোনো দিন কল্পনাও করেনি সুদীপ্ত । শ্রাবনে অঝোর ধারা যেমন বৃষ্টি ঝরে তেমনি প্রতি রাতেই বালিশ ভিজে যেত কান্না, দুচোখ বাঁধ মানেনি। রীতিকার হঠাৎ করে এই পরিবর্তনের মানে খুঁজতে গিয়ে বারবার জড়িয়ে পরেছে স্মৃতির অন্তরালে। মনে পরে যায় সেই সব দিন গুলোর কথা, একদিন রীতিকা সুদীপ্তকে না দেখলে থাকতে পারতো না। আজ ভাবলে অবাক লাগে সুদীপ্তর।

কী সেই রীতিকা যে সুদীপ্তর মুখে একবার “এই শোনোনা” শোনার জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকত। হ্যাঁ, সত্যিই সব কিছুর পরিবর্তন হয় সময়ের সাথে, তাই আজ সব কিছু নকল লাগে, নকল ভালোবাসা, মনে হয় সব অভিনয়! কাছে আসা, হাজার প্রতিশ্রুতি আর ভালোবাসা। তবু তো চলতে হবেই, জীবন থেমে থাকেনা। সুদীপ্তও তাই ব্যাথাকে সঙ্গী করেই আইন পড়া শেষ করে। দেখতে দেখতে অনেক গুলো বর কেটে যায়, শুনেছে রীতিকার বিয়ে হয়ে গেছে এ শহরেরই এক বড় শিল্পপতির সাথে। সেটাও নাকি আবার লভ ম্যারেজ।

সুদীপ্ত ভালবাসাকে তার জীবনের অভিশাপ মেনে নিয়ে দ্বিতীয়বার আর কাউকে আনতে চাইনি জীবনে, কিম্বা বলা ভাল আনতে পারেনি। অবশ্য মনে মনে স্ত্রী জাতির প্রতি কেমন যেন একটা বিতৃষ্ণা। দেখতে দেখতে আরো তিনটে বর কেটে যায়। আজও স্মৃতির কপাট গলে থেকে ঝরে পরে অতীতের টুকরো টুকরো মান, অভিমানে জড়ানো কথার দলেরা। এখনো মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়, অজান্তেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে। সে রাতে আর ঘুম আসেনা। মোবাইলে আজগুবি জিনিস খুঁজতে থাকার বাহানাতে ডুবে যায়

সুদীপ্ত বড় আইনজীবি আজ, সুনামও করেছে আনেক। লক্ষীর কৃপায় ধন সম্পদ উপচে পরেছে। হাজারো বস্তু সুখের ভিড়েও মানসিক সুখ যেন চাতক পাখি, আজও প্রথম প্রেমকে ভুলতে পারেনি। মাঝে মাঝে ককিয়ে ওঠে মনের অন্তঃকোনে লুকিয়ে থাকা নিষ্পেষিত যন্ত্রণারা। তাই কাজের ব্যাস্ততার মধ্যে জোর করে ভুলে থাকার চেষ্টা

সেদিন সুদীপ্ত তার বৈঠকখানায় বসে মক্কেলদের সাথে কথা বলছিল, হঠাৎ চমকে ওঠে একটা চেনা গলার স্বর শুনে। আতে পারি সুদীপ্ত বাবু? পক্ককেশ এক বৃদ্ধ দ্বারপ্রান্তে, রীতিকার বাবা। যিনি এক সময় সুদীপ্তকে নিজের সন্তানের থেকে কম স্নেহ করতেননা, সুদীপ্তও তাঁকে বাবামশাই বলে ডাকতো। তাই নাম ধরে ডাকা মানুষটার কন্ঠে বাবু ডাক শুনে সুদীপ্ত একটু চমকেই উঠেছিল। সে উঠে গিয়ে প্রণাম করে, তাঁকে নিয়ে অতিথিশালায় গেল। সোফা বসে অমল বাবু সুদীপ্তর দিকে কাষ্ঠল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তাঁর চোখ এড়াইনা সুদীপ্তর পরিপাটি করে সাজানো গোছান ঘরবাড়ি। সুদীপ্তর কথাতেই ধ্যান ভাঙার মতো চমকে ওঠে,

~কেমন আছেন বাবামশাই,

~তোমার কিছুই পাল্টাইনি সুদীপ্ত, তুমি সেই আগের মতই আছো

সুদীপ্ত এবার তার আবেগ আর ধরে রাখতে পারেনা, হ্যাঁ বাবা মশাই আমি সেই আগেরই সুদীপ্ত। শুধু মনের গভীরে একটা বিরাট এক জ্বালাময় ক্ষত জীবনের গতিপথটাই পরিবর্তন করে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হল সেটা আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় না। অমল বাবু মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে যান।

সুদীপ্ত- ছাড়ুন সে সব কথা, বলুন আজ এতো গুলো বৎসর পর!

চোখের কোনায় তখন জল অমল বাবুর। জানো সুদীপ্ত, “জীবন বড় বৈচিত্রময়, কখন আলো আবার কখন আঁধার, কখনো ভালো কখনো মন্দ, আবার কখনো জোয়ার তো কখনো আবার ভাটা, অসহিষ্ণু সময়ে আজ আমরা বড় অসহায় সুদীপ্ত। পেনশানের সঞ্চয় বেঁচে আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকায় তোমার মাসিমার চিকিৎসা করা হয়, তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি

মাসিমা ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই- রোড এক্সিডেন্টে রীতিকাও বিধবা হয়। শেষের দিকে ব্যাবসা ভালো যাচ্ছিল না, মোটা টাকার লোন নিয়েছিল রমেশ। এক্সিডেন্টের পর ওর সব সম্পত্তি নিলাম করিয়ে নেয় ব্যাঙ্ক কতৃপক্ষ। রীতিকা এখন আমার কাছেই থাকে, পেনশানের সামান্য টাকায় কোনোমতে চলে যাচ্ছে

সুদীপ্তর মনে হল- যেন মথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, এই পরিস্থিতির জন্য ও মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। ঠিক কি উত্তর দেবে, বা কি উত্তর হওয়া উচিৎ সেটা ভুলে খানিক ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে থাকল। আনন্দ হচ্ছে, নাকি করুণা হচ্ছে, নাকি প্রিয়জন বিয়োগের বেদনা- নাহ সুদীপ্ত কিছুই মনে করতে পারলোনা

ভৃত্য মন্টুর ডাকে সুদীপ্তর সম্বিৎ ফিরল। কল্পনার জগত এক লহমায় বাস্তবের রুক্ষ জমিতে আসতেই সে ভাবল- এই রীতিকাই একদিন তাকে অপমান আরস্বীকার করে চলে গেছিল, কারন সেদিন তার কাছে আয়েশ করার মত যথেষ্ট ধনসম্পদ ছিলনাসেদিনের বাগদত্তা দীর্ঘ দিন বিয়েটা ঝুলিয়ে রেখেছিল স্থায়ী রোজগার আসার বাহানা দেখিয়ে। সেদিন দোষ ছিল বেকারত্বের, ওর সরকারি চাকুরে বাবার তুলনায় বড্ড গরীব ছিলাম, অসহায়ও বটে। সেদিন সকলেই দায় এড়িয়েছিল। সামনে বসা বাবামশাইও......

সুদীপ্ত কেমন যন্ত্রের মত বলে ফেলল, এখন আমি কী করতে পারি বাবা মশাই! আমার কাছে কী ধরণের প্রত্যাশা রাখেন!

~ রীতিকা ভীষন ভেঙে পরেছে। কারোর সাথে কথা বলেনা, ঘর থেকে বাইরে বের হয়না নিতান্ত প্রয়োজন না হলে। তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে তার সে সাহই বা কোথা। নিয়তির মারে সব হরিয়ে আমাদের শেষ সম্বল রমেশের করা ইন্সুরেন্সের এর টাকা টুকু। কিন্তু ইন্সুরেন্স কোম্পানি নানা আজুহাত আর কাগজ পত্র চেয়ে ক্রমাগত হয়রান করাচ্ছে, যদি আমাদের একটু আইনি সাহায্য করো, চিরজীবন ঋণী হয়ে থাকব।

সুদীপ্ত আমতা আমতা করে শুধাল,

~ সব কগজ পত্র এনেছেন।

~ না বাবা সবতো আনা হয়নি, তবে কাল যদি তুমি একবার আমাদের বাড়িতে আসো তাহলে ভালো হয়। এটা আমার অনুরোধ।

সুদীপ্ত আজান্তেই হারিয়ে যায় পুরানো স্মৃতির সরণীতে, এমন কত শত বিকালেই সে রীতিকার সাথে দেখা করতে যেত ওদের বাড়িতেমনে পরে সেদিন বিকালের কথা, যেদিন আকাশে কালো মেঘে ছেয়ে ছিল। মুলধারে বৃষ্টি শুরু হলে সুদীপ্ত ভেবেছিলো আজ বিকালে আর গিয়ে কাজ নেই, বৃষ্টি থামলে দেখা যাবে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছিলো, তবু সেদিন বৃষ্টি চছিলো নাছোড়বান্দা মেজাজেমোবাইলে রীতিকার নাম ভেসে উঠল, হ্যালো বলতেই -সোনা তুমি আজ এলেনা যেদেখনা মা -বাবা নেই বাড়িতে, শপিং করতে গিয়ে বৃষ্টির জমা জলে আঁটকে পরেছে, ছোট মাসির বাড়িতে রয়ে যেতে পারে

কাতর কন্ঠে রীতিকা বলে- আমার ভীষন ভয় করছে, তারাতারি এসো না প্লিজ। সুদীপ্ত আর কিছু ভাবতে পারেনা, রীতিকার কাতর মায়াভরা কন্ঠে বশ হয়ে যাওয়া সুদীপ্ত ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পরে। আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ, সারা শহর যেন একটা বিশাল দিঘী। সুদীপ্ত ডোর বেল বাজাতেই ত্রস্তপদে বেরিয়ে আসে রীতিকা, সুদীপ্তর জন্য সে অপেক্ষায় বসে ছিল। বিদ্যুৎহীন শহরের এই বাড়ির চতুর্দিক ঘন অন্ধকারে ঠাসা

মোমবাতির নরম আলো তুলে ধরে রীতিকা শুধালো- এমা তুমি তো একদম ভিজে গেছো

সুদীপ্ত মুচকি হাসি হেসে মুখে- তুমিও তো ভিজে রয়েছো

বাইরের বজ্রপাত রীতিকা আর সুদীপ্তকে আলিঙ্গন বদ্ধ করার জন্য অনুঘটকের কাজ করল। দুজনের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলা করেএই প্রথম এতো কাছে আসা, বৃষ্টিতে ভেজা শীতল শরীরে সুদীপ্ত তপ্তদিনের সুর্যের উষ্ণতা খুঁজে পায় এক আজানা শিহরনে। রীতিকার চিবুক তুলে ধরে কম্পিত ওষ্ঠে এঁকে দেয় প্রথম চুম্বনের রেখা

সুদীপ্তকে উন্মত্তের মত আঁকড়ে ধরে রীতিকা, আন্ধকার ঘরে দুজনেই চুপ। সলজ্জ আকুতি তাকে সাহষী হতে তখনও বাঁধা দিচ্ছে। আরেকটা বজ্রপাত... তার পর আর কোন বাধা মানেনি দুটি ঘামে ভেজা শরীর। জীবনের প্রথম আলিঙ্গনে হয়ে ওঠে যৌবনের আদিম খেলা। থরথর করে কাঁপা উষ্ণ ঠোঁট, প্রতিটা রোমকূপ বিন্দু বিন্দু যৌনতার মধু শুষে নিচ্ছে। শৃঙ্গার ভালোবাসার আজানা সুখের পরশ, উত্তেজিত মাংসপেশীর আঘাত করাঘাতের পর, দুজনেই দুজনকে আরো মোহিত করে, শৈথিল্য সুখের সাগরে ভেসে যায়। বিছানার চাদর সাক্ষী থেকে যায় সেই মধুর সন্ধ্যার... কারন চাঁদ তারা কেউ ছিলনা সেদিন।


 


বুধবার, ৪ মে, ২০১১

মৌলবাদী

 


সাতদিন না খেয়ে থাকুন, তারপরে কোন হিন্দুকে গিয়ে বলুন- আমি রামভক্ত, আমি হিন্দু, শুধু এই কারনে আমাকে দুটো ভাত দিন। দেখি কয়জন আপনাকে খেতে দেয়। একই ব্যাপার আমি ধর্মান্ধ মুসলীম বা অন্য সম্প্রদায়কেও করে দেখতে বলি। দরিদ্র মুসলমান যদি পয়সাওয়ালা মুসলিমকে বলে আমি আল্লাহর একনিষ্ঠ মুমিন, আমায় শুধু এই কারনে সারা জীবন ভাতকাপড় দিন, তাকে দেবে?

যতক্ষন ভরাপেট ততক্ষনই ধর্মের জিগির তুলতে মজা লাগে। সমস্ত দাড়িওয়ালা, টিকিওয়ালা, জোব্বা আর নামাবলীধারীদের খাওয়া পরা বন্ধ করে দিয়ে জিজ্ঞাসা করুন পেট আগে না ধর্ম? যদি কোথাও কাজ করেন তাহলে সেখানকার হিন্দু মালিককে গিয়ে বলুন আমি হিন্দু, তাই আমার মাইনে বাড়ান, যদি মুসলমান হয়ে কোন মুসলিম মালিকের অধীনে কাজ করেন, তাহলে তাকে গিয়ে বলুন আমি পাঁচবেলা নামাজ পড়ি, আমাকে বছরে পাঁচবার বোনাস দিন, দেখুন তো দ্যায় কিনা? বাড়িতে রাজমিস্ত্রী, প্লাম্বার আর কুয়ো কাটার লোক ঢোকানোর আগে জাত জিজ্ঞাসা করে নেবেন।

রাস্তায় কিছু খাওয়ার আগে, কাপড় সেলাই করাবার আগে দোকানী বা দর্জির জাত জেনে নেবেন। ডাক্তার দেখানোর আগে আর গাড়িতে চড়ার আগে ডাক্তার আর ড্রাইভারের জাতধর্ম জেনে নেবেন। তিনিদিন এইভাবে সমাজে চলাফেরা করুন- যদি পাগল প্রতিপন্ন হয়ে কোথাও গনধোলাই না খান, তাহলে তিনদিন পরে আমার ঠিকানাতে লিখবেন। সমস্ত ধর্মের মৌলবাদীদের উদ্দেশ্য করে লিখলাম

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১১

একটা প্রেমের জন্ম


লুঙির নীচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আন্ডারপ্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করল লোকটা, পুলিশকে ফোন করছে।

আমি ক্লরোমিন্ট চিবোচ্ছি। এখানে একটা সত্যি কথা বলা প্রয়োজন; আমার মুখ দিয়ে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বেরোয়, বিশেষত যেদিন আমি আলুভাজা দিয়ে ডালভাত খাই। আমার এই বুড়ো বয়সেও ব্যাচেলর অবস্থার জন্য কিছুটা মুখের দুর্গন্ধ অবশ্যই দায়ী। নামীদামী কোম্পানির মাউথওয়াশ থেকে শুরু করে মুখে দারুচিনি রাখা, দিনে পাঁচবার দাঁত ব্রাশ করা, অতিমাত্রায় তেলেভাজা না খাওয়া, গরম দুধ আর ঠান্ডা জল পান থেকে নিজেকে বিরত রাখা..... প্রায় সমস্ত প্রচেষ্টা যখন বিফলে, আমি পাড়ার পীর বাবার কাছে গেলাম, একটা ঘোড়া দিয়ে মানত করলাম আল্লাহ্‌ বা ভগবান, তুমি যাই হও, পরের জন্মে এই মুখে দুর্গন্ধ থেকে আমায় নিস্তার দিও।
লোকটার আন্ডারপ্যান্ট নীল রঙের। নীল রঙের আন্ডারপ্যান্ট সচরাচর চোখে পড়েনা। এখনকার মডার্ন যুগে এক বুড়ো দাদু ছাড়া সবাই জাঙ্গিয়া পরে। যা দু-একটা আন্ডারপ্যান্ট চোখে পড়ে তা সাদা রঙের।

জগৎসংসারে কিছুকিছু লোকজন আছে যাদের চোখমুখ মায়াভরা, মারাত্মক অপরাধ করলেও চোখমুখ দেখে বিশ্বাস করা যায়না এই প্রকৃত দোষী, এক লোকটা তাদের মধ্যে একজন। আমি নিজেও আয়নার সামনে কয়েকবার দাঁড়িয়ে নিজেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি, চোর ছ্যাঁচড় ছাড়া কিছুই মনে হয়নি কোনওদিন। নিজেকে দেখে একেক সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মনে হয়, কিংবা পূর্বজন্মে পোলিও রোগাক্রান্ত ছিলাম, ইহজন্মেও তা পূর্ণরূপে আরোগ্যলাভ করতে পারেনি। বারকয়েক এরকমও ভেবেছি নিজেই একজন নারী হলে আমার পুরুষ সত্তার সঙ্গে প্রেম করার ইচ্ছে প্রকাশ করতাম না কখনও। নিজেকে কেমন মুড়ি-চানাচুর খাওয়া উচ্চিংড়ে মনে হয়, অথচ অনেকবার চেয়েছি সন্দেশ খাওয়া বীর পুরুষ হতে।
লোকটি ফোন করল...
- হ্যালো পুলিশ! শীঘ্রই স্টেশনে আসুন, শম্ভু মাতাল জব্বর এক কেস ঘটিয়েছে, মেয়েছেলে ঘটিত কেস।
প্রত্যেকজন মানুষ জীবনে কিছু মহান স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়। একেক সময় স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায়, অথবা রাত পেড়িয়ে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভেঙে যায়। এরকম ঘুমের ঘোরে আমিও দীর্ঘদিন কাটিয়েছি। ছোটবেলাতে যখন বাড়ির সামনের হাসপাতালে ভিন গাঁয়ের লোক এসে লাইন দিত, দাক্তার বাবু টেথিস্কোপের একপ্রান্ত কানে লাগিয়ে হৃতস্পন্দন পরিমাপ করত, আমার দাক্তার হতে ইচ্ছে করত। দাক্তার হয়েছিও বার কয়েক। শরীরের কোনও রোগ দেখা দিলেই ওষুধের ঘর থেকে অ্যান্টি চারটে, প্যারা চারটে নিয়ে খেয়ে নিয়েছি। রোগও সেরে গিয়েছে।

মাথায় হলুদ রঙের হেলমেট দেখে ইঞ্জিনিয়ারও হয়েছি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কালবৈশাখীর ঝড়ে যখন লোকজনের রান্নার চালা উড়ে যেত, আমি বাঁশ কেটে নতুন চালা বানিয়ে দিয়েছি, দর্মার বেড়া বানিয়েছি। সেই অর্থে লোকজন এখনও আমায় ইঞ্জিনিয়ার বলেই ডাকে।
একটা সময় ভাবলাম দাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সব হওয়া কমপ্লিট, এবার জীবনমুখী কোনও কোর্স করার প্রয়োজন। তার পর থেকেই আমার ট্রেনে ট্রেনে যাতায়াত। অবনী ঘোষের ডবল অ্যাক্সন বিদ্যুৎ বাম।

আমার হাতে একটা স্ক্রিপ্ট আছে। পড়ে শোনায়.....
মাথার যন্ত্রণা, দীর্ঘদিনের চোট লাগা ব্যথা, মচকা লাগা ব্যথা, বাতের ব্যথা, গিটেগিটে ব্যথা, জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা মালিশ করবেন, অবনী ঘোষের ডবল অ্যাক্সন বিদ্যুত্ বাম।

আমার জীবনের বিখ্যাত স্বরচিত রচনার মধ্যে এটি শ্রেষ্ঠ। সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট লিখতে আমার সপ্তাধীক সময় লেগেছে।

শম্ভু মাতালের চারিদিকে লোকজন জড়ো হয়েছে। আমার পাড়াতেই বাড়ি শম্ভুর। সারাদিন বৌয়ের সঙ্গে ঝগড়া লেগেই আছে। আজ বাড়ি থেকে আসবার সময় দেখলাম শম্ভু চিনি দিয়ে মুড়ি ভিজিয়ে খাচ্ছে। এই দরিদ্র সংসারে এমন শান্তি দেখলে মাঝেমধ্যে আমার চোখে জল আসে। শম্ভুর দুঃখের কথাও শুনেছি বারকয়েক, বৌ শিক্ষিত, আশাকর্মী। নিরক্ষর স্বামীর শিক্ষিত বৌ হলে স্বামীর স্বায়ত্তশাসন থাকেনা। শ্বশাসনের অজুহাতে রাজ্যগ্রাসের একতরফা অধীকার থাকে স্ত্রীর হাতে। তেমনই অধীকারে শম্ভুর পারিবারের পারিবারিক প্রধান ওর স্ত্রী। শম্ভু কাঁদছিল। হয়তো নেশার ঘোড়ে। বৌ চায় হিসেব করে চলতে, দুধের হিসেব, গ্যাসের খরচ, বিদ্যুতের বিল, মাসে ক'কেজি চাল লাগছে, সপ্তাহে দুদিন আমিষ, তিনদিন নিরামিষ। সবই ভাল লাগে শম্ভুর, শুধু রাতবিরেত বৌ আর তার জামাইবাবুর নিষিদ্ধ ফোনালাপ কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারেনা। ছেলেটাও বড় হচ্ছে, সেও তো মায়ের সঙ্গে পরপুরুষের সম্পর্কের কথা টের পাবে একদিন। শম্ভুর ভাবতে ভাল লাগেনা এসব। মানুষের যখন কোনও কিছু ভাল লাগেনা, সে মুক্তি চায়, নিস্তার চায়। শম্ভুর বিশ্বাস ওর মুক্তি দেশী মদ এ।

পুলিশ এসেছে, মেলা লোক জড়ো হয়েছে।
বিদ্যুত্ বাম বিক্রি করে রোজকার রুটিরুজি হয়ে যায়। সমস্যা হয় হঠাৎ কোনওদিন শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলে। একটু জ্বর এলে গা ম্যাজম্যাজ করে, উঠতে ইচ্ছে করেনা। অথচ একদিন কাজে না গেলে চুলোয় হাঁড়ি চাপেনা। আর তাছাড়াও কাজে যাওয়াতেই আমার আগ্রহ বেশি, রোজ আট' টা পঞ্চাশ এর ব্যান্ডেল লোকালের লেডিস কামরার তিন নম্বর সিট। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার বেঁচে থাকার উৎস ওই তিন নম্বরি সিট টা। হলুদ চুড়িদার, কানে দুটো গোলাকার দুল, কুচফলের পাতার মত ছোট্ট নাকের নথ,
আর ভ্রুবিভঙ্গের মাঝখানের ছোট্ট সাদা টিপ, এই টিপের নামে আমি লিখেছি আমার জীবনের দস্তাবেজ।

শম্ভুর আসল বাড়ি কোথায় আমার জানা নেই, তবে বিয়ের পরপরেই আমাদের পাড়াতে চলে আসে। তখন সংসারের চাহিদা কম ছিল, শান্তি ছিল। বিয়ের প্রথম প্রথম সব স্বামী স্ত্রী একে অপরকে পেয়ে পূর্ণপরিতৃপ্ত হয়, তারপর ধীরে ধীরে শারীরিক, মানসিক আকর্ষণ কমতে থাকে। এক সময় মনে হয় সংসারে অশান্তি ছাড়া আর কোনও কিছু অবশিষ্ট নেই। শম্ভুর এখন সেই অবস্থা।
আজ বাজার খারাপ, ভাল বিক্রি হয়নি। কিছুটা মন মরা হয়ে বসে আছি। কাল চাল কিনতে হবে, মুসুরির ডাল, হলুদ, সর্ষের তেল, চা, চিনি সবই ফুরানোর মুখে। মুখের ক্লরমিন্ট সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে, ফেলার জন্য এগিয়ে গেলাম।
ওভারব্রিজে হইচই শুরু হয়েছে। কেউকেউ বলছে ব্রিজ থেকে ছুড়ে ফেলে দাও মাল টাকে, শালা মাতাল কোথাকার!

না! ব্যাপারটা আসলে কী জানা দরকার। বিদ্যুত্ বামের ব্যাগটা হাতে নিয়ে আমি ওভারব্রিজের দিকে এগিয়ে গেলাম।

শম্ভুকে সবাই মিলে ধরে 'যেমন খুশি মারো' খেলছে। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে একজন কম বয়সী যুবা শম্ভুর নাকে ঘুষি চালালো, হয়তো কোনও পুরনো শত্রুতার প্রতিশোধ অথবা কাউকে মেরে হাতের সুখ পাওয়া যায় তাই মারা। নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে টুপটাপ করে মাটিতে পড়ছে। আমি বাঁচানোর চেষ্টা করতে গেলে দু-এক ঘা আমার পিঠেও পড়লো। শম্ভু সত্যিই মহাপাপী, সে মহা অপরাধ করেছে। দুর্গার ভিক্ষার থালা থেকে পয়সা চুরি করেছে। দুর্গা দীর্ঘদিন ভিক্ষা করছে এই স্টেশনের ওভারব্রিজে, শেষমেশ ওর বাটি থেকে পয়সা চুরি করল শম্ভু মদ খাওয়ার জন্য!

মারতে মারতে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়। শম্ভু স্টেশনে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, চোখ মুখ দিয়ে গড়গড় করে রক্ত বেরোচ্ছে। একটা কুকুর এল, শম্ভুর নাকমুখ শুঁকে চলে গেল। কুকুরও জানে শম্ভু ঘৃণার কাজ করেছে, ওর প্রতি সমবেদনা জানানোর কোনও মানে হয়না। একমাত্র দুর্গা কষ্টে থাকতে পারলো না বোধহয়। মেয়েদের মনে মা বাস করে।
- দাদাবাবু! শম্ভুকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
মানুষ তখনই বেশি আদরযত্ন পায়, যখন সে অসুস্থ অথবা মৃতপ্রায়। আমি নিজের কথা ভুলে শম্ভুর জন্য এক গ্লাস দুধ, দুটো পাউরুটি আর একটা ডিম কিনে নিয়ে গেলাম। ওর বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে।
রাত তখন আট টা, আমি হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে একটা মেজদার বিড়ি ধরিয়েছি, শম্ভুর বৌ এসে হাউমাউ করে কান্না করছে, মা কাঁদছে দেখে ওর ছেলেও সুর মিলাচ্ছে।
- দাদাকে বাঁচানোর জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
হাসপাতালের আলো হলুদ রঙের চুড়িদারের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সাদা টিপটা চকচক করছে, কখনও মনে হচ্ছে তারাখশা। এই মুহূর্তে একটাই প্রার্থনা করতে ইচ্ছে করছে......
"চির সখা হে, ছেড়োনা মোরে ছেড়োনা।"

হাসপাতালে অনেক শিশুর জন্ম হয়, অথচ একটা প্রেম কিভাবে জন্মাতে পারে? নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা। তবে কী স্বপ্ন দেখছি। নিজের গালে ঠাটিয়ে এক থাপ্পড় মারলাম, প্রচণ্ড লাগল সাথেসাথে হলুদ চুড়িদার - সাদা টিপ খিলখিল করে হেসে উঠল। মেজদার বিড়ি সচরাচর খাইনা আমি, মেজদার বিড়ি বড্ড কড়া, আজ নেশা হয়ে গিয়েছে বোধহয়।

বৃহস্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

Missing Goat Syndrome


 
অনুপস্থিত ছাগল সিন্ড্রোম বা অনুপস্থিত টাইলস সিন্ড্রোম (Missing Tiles Syndrome)


পড়ন্ত বিকেলে ক্লাস শেষে, কয়েকজন ছাত্র স্কুলের খেলার মাঠে খেলছিল। শেষ বিকেলে হঠাৎ তারা আবিষ্কার করল, খেলার মাঠের অন্য দিকে তিনটি ছাগল ঘাস খাচ্ছে। দলের নেতার মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে অন্যান্য ছেলেদের বোঝাল, "ছাগলগুলোর মাথায় নম্বর লিখে দিলে কেমন হয়?" তিনটি ছাগলকে ধরা হোল, রং এবং ব্রাশের ব্যবস্থাও হয়ে গেল।
ছাগলগুলিকে নম্বর দেওয়া হল; ১, ২, ৪, উদ্দেশ্যমূলকভাবে তারা “৩” নম্বরটি লিখল না। এরপর তারা তিনটি ছাগলকে সারা রাতের জন্য পর্যাপ্ত ঘাস এবং ঝোপঝাড়ের পাতা সমেত স্কুল ভবনের ভিতরে ঠেলে দিল। ততক্ষণে বিকেল শেষ, ছেলেগুলি নিজেদের বাড়ি চলে গেল।
পরের দিন সকালে স্কুল খোলার জন্য চাবি নিয়ে পিওন ঠিক সময়ে হাজির। তালা খুলতে গিয়ে নাকে এল তীব্র প্রস্রাব এবং বিষ্ঠার গন্ধ। তিনি অনুমান করতে পারলেন, নিশ্চয়ই কোন গবাদি পশু, স্কুল ভবনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তালা না খুলে, অন্যদের আসার জন্য কিছু সময়ের জন্য অপেক্ষা করল। কয়েক মিনিট পরে, প্রিন্সিপাল, সমস্ত শিক্ষক, ছাত্র, অফিস স্টাফ ধীরে ধীরে স্কুল-ভবনের গেটে জড়ো হয়ে গেল। যথারীতি, প্রিন্সিপাল নেতৃত্ব দিলেন এবং তালা খোলা হল।
একজন অতি উৎসাহী ছাত্র গেটের কাছে সিঁড়িতে ছাগলের বিষ্ঠা দেখে চেঁচিয়ে উঠল। বোঝা গেল, যে ভাবেই হোক স্কুল-ভবনে ছাগল প্রবেশ করেছে।
প্রিন্সিপালের নির্দেশে অনুসন্ধান শুরু হয়ে গেল। বারান্দা, শ্রেণিকক্ষ, অফিস এবং এমনকি ওয়াশরুম পর্যন্ত খুঁজে শেষ পর্যন্ত তিনটি ছাগল আবিষ্কার করা গেল। ছাগলগুলিকে অধ্যক্ষের ঘরে নিয়ে আসা হল। দেখা গেল, প্রত্যেকটি ছাগলের মাথায় একটি করে সংখ্যা লেখা আছে। অবাক কান্ড, সংখ্যা গুলি ১, ২ এবং ৪; সমস্যা হল যেহেতু ৪-নম্বরের ছাগল পাওয়া গেছে, তা হলে ৩-নম্বরের ছাগলটি গেল কোথায়?
প্রিন্সিপাল, সিনিয়র শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করলেন এবং আরও একবার গভীর অনুসন্ধানের নির্দেশ দিলেন।
কৃতিত্ব নিতে প্রত্যেকে, পাগলের মত, ৩-নম্বর ছাগল খুঁজতে লাগল। আশ্চর্যভাবে ৩-নম্বর ছাগল সন্ধানকারীদের মধ্যে কেউই ৫-নম্বর ছাগলের সম্ভাবনা ভেবে দেখল না। যেহেতু ৪-নম্বর ছাগল পাওয়া গেছে, তাই তারা নিশ্চিত ছিল, ৩-নম্বর ছাগল নিশ্চয়ই আছে।
সারাদিন অনুসন্ধান চলতে থাকল। ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হল। সবাই ক্লান্ত। ধীরে ধীরে আতঙ্ক ও হতাশার সৃষ্টি হল। অনিবার্যভাবে ৩-নম্বর ছাগলটি খুঁজে পাওয়া গেল না। কারণ এটির কখনও অস্তিত্ব ছিল না।
গল্পটি খুবই ছোট এবং মজার। তবে এটি এক গভীর শিক্ষা দেয় এবং তা সমস্ত মানব সমাজের জন্য প্রযোজ্য।
আমাদের মধ্যে অনেক আছেন, যারা একটি ভাল জীবন এবং তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই থাকা সত্ত্বেও, সবসময় একটি "তৃপ্তির অভাব" বোধ করতে থাকেন। করুণভাবে, হন্যে হয়ে খুঁজছেন সেই ছাগল নম্বর-৩, যেটি বাস্তবে অনুপস্থিত বা অধরা। মনস্তত্ববিদরা এটিকে বলেন "মিসিং গোট সিনড্রোম" বা " মিসিং টাইলস সিনড্রোম"। এটি হল যা আছে তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে, সোনার হরিন খুঁজে বেড়ানো। সব জিনিসের উপস্থিতি সত্বেও যা নেই তার জন্য বিলাপ করা। নিখোঁজ ছাগল নম্বর-৩ এর বিলাপ এড়ানোর সর্বোত্তম উপায় হ'ল ওইসব ব্যক্তিদের দিকে তাকানো, যারা বিলাসিতা তো দূর, তাদের প্রাথমিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
একটু ভেবে দেখুন:
  • “যদি আপনার ফ্রিজে খাবার থাকে, আপনার পরনের কাপড় থাকে, আপনার মাথার উপর একটি ছাদ থাকে এবং ঘুমানোর একটি জায়গা হয় তবে আপনি বিশ্বের ৭৫ শতাংশের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ।
  • যদি আপনার ব্যাঙ্কে টাকা থাকে, আপনার মানিব্যাগ এবং কিছু খুচরো থাকে, তবে আপনি বিশ্বের ৮ শতাংশ ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন।
  • যেহেতু, সুস্থ শরীরে আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেছেন, তবে আপনি এক মিলিয়ন লোকের চেয়ে বেশি ভাগ্যবান যারা এই সপ্তাহে বেঁচে থাকবে না।
  • আপনি যদি কখনও যুদ্ধের ঝুঁকি, কারাবন্দি বা নির্যাতনের যন্ত্রণা বা অনাহারে ভয়াবহ যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা না পেয়ে এখন ও বেঁচে আছেন তাহলে আপনি ৫০০ মিলিয়ন মানুষের চেয়ে বেশি ভাগ্যবান।
  • যদি আপনি এই লেখাটা পড়তে পারেন, আপনি বিশ্বের ৩ বিলিয়ন মানুষের চেয়ে যারা এ সব পড়তে পারে না তাদের চেয়ে বেশি ভাগ্যবান।
কোনরকম উদ্বেগ ছাড়াই জীবনটি অনেক বেশি সুখী হবে, যদি আমাদের যা আছে তা উপলব্ধি করি, জীবনের রঙগুলির প্রশংসা করি, আমাদের জীবনে প্রতিটি ব্যক্তির অনন্য গুণাবলীর প্রশংসা করি। সুতরাং, সুখ বা সাফল্যকে তাড়া করবেন না। এটি পৌঁছনোর কোনও গন্তব্য নয়, কেবলমাত্র হয়ে ওঠার যাত্রা। আপনার যে কোন অবস্থায়, পছন্দ করার অধিকার আছে একটি সুখী ও সফল জীবনের। কারণ ৩-নম্বর ছাগল কখনই খুঁজে পাবেন না, কারন এর বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই।
জীবন যেমনটি আছে, সেইভাবে উপভোগ করুন। আপনার যা আছে তা দিয়ে আপনার জীবন উপভোগ করুন। প্রথমে আপনার পরিবারের সাথে এটি শুরু করুন, আপনার স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ির দুর্দান্ত গুণাবলী দেখুন এবং তারপরে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং সহকর্মীদের কাছে যান।
কাল্পনিক, অস্তিত্ববিহীন সোনার হরিন বা ৩-নম্বর ছাগল খুঁজে, আর আপনার সময় এবং সুখ নষ্ট করবেন না।
@

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...