শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১১

পুরুষেরা দীর্ঘজীবি হউক

 


নারীশক্তির জাগরণ হউক, নারীরা বিভবে ও বৈভবে সমৃদ্ধিশালী হউক, ইহাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু এই যে নারীগণ বর্তমানে পুরুষজাতির নিন্দাবাদ করেন, তাহাদের বিনাশ কামনা করেন, তাহা আত্মহননের সমতুল নয় কি? পুরুষদল সমূলে বিনাশ হইলে নারীর স্তুতিগান কে গাহিবে? যুগ যুগান্তরের ধারাকে অক্ষুন্ন রাখিয়া নারীকে প্রেম নিবেদন কে করিবে? নারীর মস্তকে বরাভয় আশীষ ও নিরাপত্তার ছত্রচ্ছায়া কে প্রদান করিবে?

কালিদাস, জয়দেব, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ হইতে শুরু করিয়া বর্তমানের কবিকুল কাহাদের রূপ বর্ণনায় কবি প্রতিভার বিকাশ ঘটায়, তাহা নারীগণ একবার ভাবিয়াছেন কি? অলঙ্কারে ব্যবহৃত হয় বলিয়াই স্বর্ণ এত মূল্যবান, নচেৎ উপযোগিতার বিচারে উহা লৌহ অপেক্ষাও শতগুণে নিকৃষ্ট। নারী পুরুষের অঙ্গভূষণ, তাই না নারী নিজেকে বহুবিধ প্রকারে সুসজ্জিত করিয়া, নানা বিহঙ্গে কবরী বন্ধন করিয়া, বহুবিধ চিত্রবিচিত্র পোশাক পরিধান করিয়া, নানা ভাব ভঙ্গিমার মাধ্যমে নিজেকে মেলিয়া ধরার প্রয়াস পায় চাতক পান করে বলিয়াই স্ফটিক জলের এত কদর, নয়তো ভূমিতে পতিত হইলে সে জল কর্দমে মিশিয়া মূল্যহীন হয়।

নারী পুরুষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ বিন্দু বলিয়াই যুগে যুগে নারীর এত কদর। নারীর রূপের প্রশংসা না করিলে সে রূপের কদর কোথায়? পুরুষে কবিত্ব করিয়া বলে মৃগনয়না, তাই না রমণী নয়নযুগল কজ্জ্বল শোভিত করিয়া পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টি প্রত্যাশা করে! পুরুষ মুগ্ধ হয় বলিয়াই না নারী ললাটে কুঙ্কুম বিন্দু, ওষ্ঠে ওষ্ঠরঞ্জনী, পদযুগলে অলক্তক ও কুন্তলে পুষ্পসুগন্ধী তৈল লেপন করে? জীবনানন্দ বলিয়াছেন বলিয়াই বনলতা সেনের চুল অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ শ্রাবস্তির কারুকার্য বলিয়া বন্দিত হয়। নচেৎ কোন মহিলা কবি প্রাণ বিয়োগের সম্ভাবনা থাকিলেও স্বেচ্ছায় বনলতা সেনকে ঐ প্রশংসায় ধন্য করিতেন না। বরঞ্চ অবকাশে পরনিন্দা ও পরচর্চার আসরে বিকৃত মুখভঙ্গী করিয়া কথ্য ভাষায় বলিতেন, “মাগীর মুখ না যেন রান্না ঘরের পাতিল, আর চুলগুলো যেন কালো পাটের ফেঁসো

আমার বক্তব্যে সন্দেহের অবকাশ মাত্র ঘটিলে নারীগণই প্রমাণ করুন, কোথায় এক রমণী অপর রমণীর প্রশংসা করিয়াছে? নারীই যে নারীর অশ্রদ্ধা ও লাঞ্ছনার কারণ এমন প্রমাণ কদাপি বিরল নহে

পুরুষের অকুন্ঠ ভালবাসা না পাইলে নারীজীবনের সার্থকতা কোথায়? পুরুষ পতঙ্গের ন্যায় নারীর রূপাগ্নিতে প্রজ্জ্বলিত হইয়া নারীর নিকটেই শীতলতা কামনা করে। তাই তো জয়দেব রচিত গীতগোবিন্দে দেখিতে পাই, লক্ষকোটি প্রেমিক পুরুষের প্রতিভু শ্রীকৃষ্ণ নিঃসঙ্কোচে রাধিকাকে আপন মান, অভিমান সর্বস্য বিসর্জনের গৌরবে বলিতে পারেনঃ

ত্বমসি মম ভূষণং ত্বমসি মম জীবনম্ ত্বমসি মম জলধিরত্নম্

ভবতু ভবতীহ ময়ি সততম অনুরোধিনী তত্র মম হৃদয়মতিযত্নম্।।

নীলনলিনাভমপি তন্বি তব লোচনম্ ধারয়তি কোকনদ রূপম্

কুসুমশর-বাণ-ভাবেন যদি রঞ্জয়সি কৃষ্ণমিদম এতদনুরূপম্।।

স্ফুরতু কুচকুম্ভয়োরুপরি মণিমঞ্জরী রঞ্জয়তু তব হৃদয়দেশম্

রসতু রসনাপি তব ঘন জঘনমণ্ডলে ঘোষয়তু মন্মথনিদেশম্।।

স্থলকমলগঞ্জনং মম হৃদয়রঞ্জনম্ জনিত-রতি-রঙ্গ-পরভাগম্

ভণ মসৃণ-বাণি করবাণি চরণদ্বয়ং সরস –লসদ অলক্তকরাগম।।

স্মর-গরল-খণ্ডনং মম শিরসি মণ্ডনমঃ দেহি পদ পল্লবম্ উদারম্

জ্বলতি ময়ি দারুণো মদনকদনানলো হরতু তদুপাহিত বিকারম।।

 

অর্থ্যাত তুমিই আমার অঙ্গের ভূষণ, তুমিই আমার জীবন, এই ভব সংসারে তুমিই আমার নিধিরত্ন। হে রাধে, তোমার প্রীতিলাভার্থে এই ভুবন মাঝে সতত কেবল তোমাকেই আমি হৃদয় ভরিয়া যত্ন করিতে সচেষ্ট। নীল নলিনী তুল্য তোমার নয়ন যুগল ক্রোধে ও অনুরাগে রক্তবর্ণের কমল তুল্য রূপ ধারণ করিয়াছে। যদি ঐ রক্ত আঁখি পল্লবে কৃষ্ণকে মুগ্ধ করিতে সক্ষম হও, তবেই কমলের সঙ্গে তুলনা সফল হয়। তোমার সুগোল কুম্ভের ন্যায় স্ফুরিত কুচ যুগলের উপরিভাগে শোভিত মণিখচিত মঞ্জরি তোমার হৃদয়দেশকে কি সুষমাতেই না রঞ্জিত করিয়াছে! তোমার ঘন জঘনমণ্ডলে মেখলার বারংবার নিনাদ যেন মদনদেবের কাম নির্দেশ ঘোষণা করিতেছে।  মধুর স্বরে শুধু একবার আদেশ দাও –‘স্থলকমলকেও গঞ্জনা দিতে সক্ষম, আমার হৃদয় রঞ্জনকারী তোমার ওই পদযুগলকে রতি রঙ্গে আমার হৃদয়ে ধারণ করতঃ আলতারাগে রঞ্জিত আমার শিরঃপীড়া নাশ করিয়া, কামযন্ত্রনার গরল নাশ করিয়া তোমার ঐ পদপল্লব কে মমতা ও উদারতায় প্রসারিত করো। মদনের দারুণ অনল জ্বালা নিবারণার্থে তোমার দেহবল্লরীতে সংযুক্ত হইয়া আমার সমস্ত বিকার নাশপূর্বক শীতল

হে স্বভাবমুখরা রমণী কুল, একবার আপন হৃদয়োপরি আপন হস্ত স্থাপন করিয়া সত্য কহ– ‘পুরুষের এমন আকুতি, এমন প্রেম নিবেদন, এমন সমর্পণের পরেও কোন নারী স্থির থাকিতে পারে কি? যদি কেহ পারে, তবে সে রমণী প্রস্তরবৎ নীরস বলিয়াই জানিবে। তাহার সংস্পর্শ ত্যাগ না করিলে পদার্থের পার্শ্বটানের ধর্মানুযায়ী তোমার হৃদয় রসকেও সেই শুষ্ক প্রস্তর শুষিয়া লইবে

নারী দ্বিবিধ উপায়ে পুরুষের নিকট সম্পুর্ণ বশীভূত হয়। যথা-

) উদ্যত তরবারির সন্মুখে  

) পুরুষের অকপট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে।

প্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু যুদ্ধপ্রিয় জাতি তরবারির সন্মুখে বহু নারীকে বশীভূত করিয়াছেন। কিন্তু ইহাতে বংশ বৃদ্ধি ঘটিলেও কোন গৌরব বৃদ্ধি ঘটে নাই। কারণ পরাজিতের ভীতিজনিত বশ্যতা স্বীকারে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের গৌরব বিলুপ্ত হয়। সেখানে পরাজিতের সন্মান হননপূর্বক বিজয়ীর মিথ্যা ইতিহাস রচিত হয় বলিয়া সুললিত কাব্যের সৃষ্টি হয় না। যে প্রেমে অনুরাগ নাই, উভয়ের চরম আত্মসমর্পণ নাই, সেই প্রেম পশুর পাশবিক শরীর সুখের সঙ্গেই তুলনীয়। আত্মসমর্পণে শতকরার হার হিসাব করার অর্থই বাকি শতকরার অংশ সেখানে ভেজাল। আমি হলফ করিয়া বলিতে পারি, যদি কবি জয়দেবের মতো এমন কাব্য সৃষ্টির সুযোগ পাই, তবে বারংবার জন্মগ্রহণের কষ্ট স্বীকারে প্রস্তুত আছি

অতএব হে রমণী কুল, এখন ও কি বলিবে– পুরুষ জাতির বিনাশ চাই? পশুর স্বভাব বিশিষ্ট যে কাপুরুষ অসহায় রমণীকে ধর্ষণ করে, ধন জনের শক্তিতে ক্ষমতাশালী যে নির্দয় পুরুষ নারী জাতির উপর নানা অত্যাচার করে, সুযোগ সন্ধানী যে কামাতুর পুরুষ আপন স্ত্রীকে অন্যায় পথে পরিত্যাগ করে, সেই অশুভ শক্তিরূপ অসুরের বিনাশ তো স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই চাহে। তাহাদের কারণে কেন তোমাদের জীবনের একান্ত কামনার ধন মহাপুরুষদের বর্জন করিবে?

তাই বলি, হে গান্ধারীর মত কৃষ্ণবস্ত্রে নয়ন আচ্ছাদনকারী অবলা নারীকুল, সময় থাকিতে সতর্ক হও। বৃক্ষের অবলম্বন ব্যতীত লতিকা সকল উর্ধগামী আলোকের সাক্ষাত পায় না। যে অহঙ্কারী লতিকা অহঙ্কার বলে বৃক্ষের সহায়তা গ্রহণ করে না, সেই লতিকা অবাঞ্ছিত জঙ্গল পরিবেষ্টিত অবস্থায় অন্ধকারে পশুদিগের পদ দলন সহ্য করিতে বাধ্য হয়। তোমরাও আপনার বাঞ্ছিত পুরূষের সন্ধানে সচেষ্ট হও। নূতন নুতন কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীর প্রেরণার উৎস হও। আইস, তোমাদের লইয়া আমরাও কালিদাস, জয়দেব, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ ও অন্যান্য প্রথিতযশা কবি সকলের মতো কাব্য রচনা করি। তোমরা একবার বলো, পুরুষের ভালবাসার তুল্য ভালবাসা নাই।

বারংবার বলো পুরুষেরা দীর্ঘজীবি হউক।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...