প্রতিটি জীবই তার মনের ভাব বিনিময় করে থাকে নিজস্ব উপায়ে, আর এভাবেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ- তার অন্তরের ভাব বিনিময়ের জন্য ‘ভাষার’ সূচনা করেছিল সভ্যতার আদি লগ্নেই।
প্রতিটি ভাষা কোনোনা কোনো আদি মূল ভাষা হতে জন্ম নিয়েছে, এরপর সময়ের সাথে সাথে হরেক সংস্কৃতি, জাতি, গোষ্ঠী, ব্যাক্তির সংস্পর্শে এসে সেই ভাষায় অল্প অল্প করে সংমিশ্রণ ঘটতে থাকে; ভাষা ঋদ্ধ হয়, উদবর্তীত হয়।
ভারতীয় পুরাণের কাহিনী থেকে ভাষার ইতিহাস খুঁজতে গেলে সেই আর্যদের ইতিহাসের গভীরে যেতে হয়। নর্ডিক(!) জাতিগোষ্ঠীর মানুষ আর্যরা ছিল ককেশাস ও স্তেপ অঞ্চলের বাসিন্দা, উত্তর-পশ্চিম ইউরেশিয়া অঞ্চল থেকে আর্যরা তৎকালীন আনাতোলিয়া, পারস্য, খোরাসান, মেহেরগড়, হরপ্পা হয়ে আজকের ভারতীয় মূল ভুখন্ডে প্রবেশ করেছিল বলে অনুমান করা হয়।
আজকের পৃথিবিতেও কমবেশি ৭০০০ এরও বেশি ভাষা রয়েছে, যদিও কয়েকটি ভাষার দাপটে প্রতিমাসেই একাধিক ভাষা কালের অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছে বলে দাবী করেছে ইউনেস্কোর এক বিশেষজ্ঞের দল। মন্দারিন (১১.৯০%), হিস্পানিয় (৬%), ইংরাজি (৫%), ও হিন্দির (৪.৫০%) পরেই আমাদের বাংলা ভাষা- যা প্রায় ৩ শতাংশ মানুষের প্রাণের ভাষা এই বিপুলা পৃথিবীর সর্বমোট জনসংখ্যার নিরিখে।
সুদীর্ঘ ইসলামিক শাসনের সুবাদে বাঙলাতে প্রভূত পরিমাণে আরবি ও ফার্সি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। প্রশাসনিক ও আইন-আদালত সম্পর্কীয় শব্দে- ‘আর্জি, আলামত, উকিল, এজলাস, কসম, কানুন, খারিজ, মৌজা, মহকুমা, রায়, হাজত’ ইত্যাদি আরবি শব্দ বাংলা শব্দকোষে ঢুকে গেছে। ধর্মগত শব্দ গুলো ছাড়াও, শিক্ষা সংক্রান্ত বহু শব্দ আরবি জাত, যেমন- ‘উস্তাদ, কলম, কিতাব, কুর্সি, খাতা, তর্জমা, দাখিল, দোয়াত, মুন্সি’ ইত্যাদি। ‘গরীব, খেয়াল, খবর, জমা, জিনিস, দুনিয়া, ফকির, বাতিল, সাহেব, জবাব, খালি, ওজন, আসল, গায়েব, নগদ, বাকি, হাজির’ ইত্যাদি বিবিধ শব্দের সাথে সংস্কৃতি বিষয়ক শব্দ- ‘আক্কেল, আদব, আদাব, আতর, কবর, কিসমত, খাস, তাজ্জব, তালিম, দুনিয়া, বিদায়, মজলিস, মঞ্জিল, মাহফিল’ শব্দগুলো বাঙলাতে বহুল ব্যবহৃত। এছাড়া আম (আমজনতা), গড় (গড় হাজির) ইত্যাদি উপসর্গ শব্দগুলোও আরবি।
‘হুঁশিয়ার, চশমা, মেজাজ, রকম, হজম, নাগাদ, লাগাম, লোভ, নতুন, নজর, রসদ, হালনাগাদ, হল্লা, তোষক, আদমি, হুজুকে, আমদানি, রফতানি, জানোয়ার, জিন্দা, নমুনা, বদমাস, হাঙ্গামা,’ ইত্যাদি শব্দগুলোর সাথে বিভিন্ন প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও ফার্সি শব্দেরা নিজেকে বাঙালী করে নিয়েছে, যেমন- ‘দপ্তর, তারিখ, দস্তখত, নালিশ, মেয়াদ, হুজুর, জবানবন্দি, দরবার, মোর্চা’ ইত্যাদি। আবার ‘দোকান, খরিদ্দার, দড়, দাম, রেজকি, মুনাফা, কারখানা, মেহনত, ধন-দৌলত, বাদশাহ, বান্দা, বেগম, মেথর’ শব্দগুলোও ফারসি থেকে আমদানিকৃত।
‘আয়না, কাগজ, গরম, পর্দা, বাগান, আস্তে, রাস্তা, বদ, মতলব, খুব, পছন্দ, রোজ, আন্দাজ, আওয়াজ, আরাম, হারাম’ এর পাশাপাশি ইসলামিক ধর্মবিষয়ক শব্দে গোটা ভারত উপমহাদেশে যেগুলো আরবি শব্দ নামে পরিচিত আসলে সেগুলো খাঁটি ফারসি শব্দ, যেগুলো কোরান হাদিশে উল্লেখই নেই, কিন্তু ‘জরথুস্ট্রীয়’ জিন্দা-আবেস্তায় বিলকুল রয়েছে। যেমন- ‘খোদা, গুনাহ, দোজখ, নামাজ, পীর, পয়গম্বর, ফেরেশতা, বেহেশত, রোজা’ ইত্যাদি। প্রসঙ্গত মাথার ফেজ টুপি ও পুঁতির তসবিও এই পারস্য সভ্যতার স্মারক, ইসলামিক সভ্যতার নয়।
বিভিন্ন রঙের নাম যেমন- ‘লাল, সাদা, আসমানী, বাদামি, সবুজ, গোলাপী’ শব্দগুলো খাঁটি ফারসি শব্দ। এগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রত্যয় যুক্ত শব্দ, বাংলার সাথে জুড়ে একধরণের যৌগিক শব্দ তৈরি করেছে, যথা- দার (তালুকদার, জমাদার, হাবিলদার, চৌকিদার ইত্যাদি), বাজ (জাঁহাবাজ, দুর্নীতিবাজ, ধোঁকাবাজ ইত্যাদি), বন্দী (নজরবন্দী, জবানবন্দী, কারাবন্দী ইত্যাদি), সই (মানানসই, চলনসই, টিপসই ইত্যাদি), চি (কলমচি, তবলচি ইত্যাদি), নবীশ (শিক্ষানবীশ, নকলনবীশ ইত্যাদি)
এছাড়া কিছু শব্দ আছে যেগুলো আরবি ফার্সি দুই ভাষাতেই রয়েছে, যেগুলো বাংলাতে কৃতঋণ ভাষা হিসাবে ঢুকে গেছে, যথা- ‘পোলাও, অছিলা, জ্যান্ত, দেওয়াল, জবরদস্তি, পাঁজা, তরফ, ফতুর, জমি, প্যাঁইতাড়া, জাইগা, খতম, মিহি, খ্যাসারত, ক্যাদ্দানি, কয়াল, জৌলুস, গরজ, মিছরি, কারচুপি, দানা, পোস্ত, উয়ার (লেপ কাঁথার), পেঁয়াজ, আদায়, ফারাক, দেমাক, পয়মাল, কাতার, আলবাৎ, বস্তা, বোড়া, বুজরুগি, খবিশ, আলিশান, দেদার, খয়রাত, আসান, লাট্টু, সবক, ফ্যাসাদ, কিল, জরুরী, খানকা, দেদার, ফানুস, কারচুপি, জেদ, তোড়া, কুলুপ, তামাম, পয়দা, গোস্ত, শাদি, সানাই, কেচ্ছা, খানকি, খামোখা, ব্যাজার, খিল, খেয়াল, খঞ্চা, চুপ, কাছারি, তবক, তৈরি, দোহায়, নাকাল, তরফ, মুরোদ’ ইত্যাদি।
তৎকালীন আনাতোলিয়া বা আজকের তুরস্কের কিছু তুর্কি শব্দও বাংলায় ঢুকে গেছে, যথা- ‘বাবুর্চি, দাদা, বাবা, বেগম, চকচকে, উজবুক, কাঁচি, বোঁচকা, কোর্মা, বিবি, তাগড়াই, চমকা, কল্কে, চাকু, ভাগাড়, মুচলেকা, তোপ, আলখাল্লা, খাতুন, চাকর, বারুদ, সুলতান, শিকার, দারোগা’ ইত্যাদি।
বর্তমানে নাগপুরী গেরুয়া ভক্তের দল আরবি সংস্কৃতি বাদ দিয়ে স্বদেশী সংস্কৃতি আনতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের সুবিধার্থে এই প্রবন্ধটা কাজে আসতে পারে, যে- ঠিক কোন কোন শব্দগুলোকে বাদ দিলেই চলবে। অবশ্য এই বাদ দেওয়াদেয়ীর গপ্পো নতুন কিছু নয়।
‘জয়গোপাল তর্কালঙ্কার’ (১৭৭৫-১৮৪৬) তার জীবনের এক্কেবারে শেষ লগ্নে এসে উপলব্ধি করতে পারেন যে, দীর্ঘ ইসলামিক ‘কু’শাসনে- কুলীন বাংলা ভাষায় যতেচ্ছ পরিমাণে আরবি-পারসি ভাষার ‘যবন’ অশুদ্ধি ঢুকে গেছে, যেগুলো বাংলার মর্যাদা ও মাহত্ব্যকে হানি করছে। এভাবে চললে বাংলার বুক থেকে সনাতনী হিন্দু ঐতিহ্য অচিরেই বিলুপ্ত হবে। যথারীতি এই নিয়ে তিনি বই ও লেখেন।
তার আপন ভাষ্যে- “…ভারতের পবিত্র ভূমিতে ‘যবনসঞ্চার’ রোধ করতে হলে সর্বাগ্রে ‘যাবনিকভাষা’ পরিত্যাগ করতে হবে,… আমি বহু পরিশ্রম ব্যায়ে ক্রমে ক্রমে সংকলন করিয়া সেই বিদেশীয় ভাষার স্থলে স্বদেশীয় সাধুভাষা পূনঃস্থাপন করিবার হেতু অভিধানটি রচনা করিয়াছি। স্বকীয় ভাষার মাঝে বিদেশী ভাষা লুক্কায়িত হইয়া চিরকাল বিহার করতে পারেনা, পরকীয় বস্তুর ব্যবহারে যে লজ্জা ও গ্লানি তাহা হইতে আমাদের মুক্ত হইতে হইবে…”।
সেইকালে ইংরাজি আমজনতার মাঝে ততটা জনপ্রিয়তা লাভ করেনি, তাই তাঁরা এই ‘জয়গোপাল’ পণ্ডিতের ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করার পর কি বলেছিল তা অনুমান করা খুব কষ্ট; আজকের দিনে হলে যেকোনও ভাষাবিদ, বিশুদ্ধ বাংলায় বলে উঠবেন- “ওহ সিট”
-সংক্ষেপিত