রাশিয়া নিজেদের দেশে সৈন্য মহড়া করে, তাই সে যুদ্ধবাজ।
কিন্তু এই অজুহাতে আমেরিকা মাতব্বরি করে অন্য দেশে 8500 সৈন্য পাঠিয়ে দিয়ে- সে মানবতার পক্ষে দন্ডায়মান।
ইউক্রেন নিজেই জানেনা তারা আক্রান্ত হতে চলেছে, সেভাবে কোথাও মড়াকান্না কাঁদেনি- অথচ তাদের দেশ থেকে কূটনীতিক অফিসিয়াল দের তুলে নিয়ে এসে চরম আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে ইউক্রেনের অর্থনীতি ধসিয়ে দিয়েছে আমেরিকা ও ন্যাটো জোট। অস্ত্র কিনতে বাধ্য করছে ইউক্রেনকে। এটা খোদ ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ‘ভলোদিমির জেলেন্সকি’ ও প্রধানমন্ত্রী ‘ড্যেনিস স্মিহ্যাল’ এ কথা জানিয়েছে সাংবাদিক সম্মেলন করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই- আমেরিকার মাতব্বরি ও অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি, সাথে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রেসার সৃষ্টি করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের জন্য নিন্দা প্রস্তাব এনেছে।

কিন্তু, যুদ্ধ একটা না লাগালে আমেরিকার যে আর হাঁড়ি চলেনা, অস্ত্র বিক্রি নেই বা থাকলেও তলানিতে। ‘সফটলোনের’ ছিপে উঠা দেশগুলোর কাছে চীনা পটকা বিনে আর গতি নেই, সেই সব দেশগুলোর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে ‘কমিউনিস্ট’ লাল চীন। সস্তার অস্ত্রে অস্ত্রবাজারের একটা বেশ বড় অংশে জাঁকিয়ে বসে বাজিমাৎ করছে চীন। ড্রোন প্রযুক্তিতে তুরস্ক আর ইজরায়েল সর্বাগ্রে। দামী ট্যাঙ্ক বা অন্যান্য মিশাইল জাতীয় সমরাস্ত্রে রাশিয়া তো মার্কিনীদের মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী। এদিকে ব্রিটেন, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স ইত্যাদির মত দেশগুলো তাদের এককালের উপনিবেশ গুলোতে এখনও অস্ত্রশস্ত্র বিক্রির একটা বাজার ধরে রেখেছে। বাকি ছিল মধ্যপ্রাচ্য, তাদের মাঝেও সেভাবে বড় কোনো যুদ্ধ নেই এক দশকে- উপরন্তু সকলের গুদামেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত মারণাস্ত্র জং ধরে নষ্ট হচ্ছে বা উৎসবে হাউই-তুবরির মত করে মিশাইল ছুড়ছে শূন্যে। তার উপরে গত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বহীন করে প্রায় গায়েব করে দিয়েছে তুরস্ক-রাশিয়া জোট। গত আর্মেনিয়া যুদ্ধেও মার্কিনী গন্ধ টুকু ছিলনা, এমনকি কাজাকিস্তান যুদ্ধেও আমেরিকা অন্তত কোথাও নেই।
যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা বদ- তার মানে কি রাশিয়া দুধে ধোয়া পূত পবিত্র! মোটেও তা নয়, কয়েক বছর আগেই ক্রিমিয়া জবর দখল করেছিল- আজব উপসাগরের কের্চ প্রনালির উপরে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে। ইতিহাস ঘাঁটলে শেষ ৫০০ বছরে এই ক্রিমিয়া অঞ্চলের কের্চ প্রনালির দখলকে কেন্দ্র করে অন্তত ৫টা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেখেছে বিশ্ব। কারন রাশিয়া ভূখণ্ডের মোট ব্যবসার ৬৮%ই সমুদ্রপথের উপরে নির্ভরশীল, আর রাশিয়ার মূল বন্দর কৃষ্ণসাগরের নভোরোসিয়স্ক বন্দর- কারন বছরের অর্ধেক সময় অগভীর আজব সাগর বরফ জমে থাকে, বাকি বন্দরগুলো দিয়ে আফ্রিকা বা এশিয়ার বাজার ধরা ভীষণ ব্যায় সাপেক্ষ। সুতরাং ইউক্রেনের দু-একটা সমুদ্র বন্দর যুক্ত অংশকে দখল করে নিলেই যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেকটাই উন্নতি হবে- সুতরাং রাশিয়াও ‘জোর যার মুলুক তার’ সাম্রাজ্যবাদী নীতিতেই চলছে।
কিন্তু এই যুদ্ধ হবো হবো করেও হয়না বা হচ্ছেনাটা কেন? এর কারন বিশ্লেষণ করে আরেকটা গোটা প্রবন্ধ লিখব এরই ধারাবাহিকতায়।
রাশিয়াকে টাইট দিতে গেলে কৃষ্ণসাগরে মার্কিনী নৌবহর ঢোকাতেই হবে, সেটা করতে গেলে তুরস্কের থেকে ১৫ দিন অন্তর অন্তর অনুমতি নবায়ন হবে কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে বেড়িয়ে এসে ১০ দিন ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে থেকে তারপর- আজব শর্তের কল।
ইউরোপের অধিকাংশ দেশ জ্বালানী- বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য কেউ কেউ ১০০% রাশিয়ার উপরে নির্ভরশীল, যেমন জার্মানি। সুতরাং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নেরও অলআউট আক্রমণের সুযোগ নেই- তাই ন্যাটোও ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ নীতি নিয়ে চলে রাশিয়া প্রসঙ্গে।
ওদিকে দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলে মার্কিনীরা এমন সেঁকে রয়েছে যে তাইওয়ানের আকাশে চীন ফাইটার জেট পাঠালেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে তাইওয়ানের সামরিক অংশীদার আমেরিকা। বুক ফাটলেও মুখ ফাটছেনা চীন জুজুতে। এদিকে চীনা সস্তা পণ্য ইউরোপের বাজারজাত করতে ‘ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলের’ বিকল্প নেই, তাই চীন ব্যবসায়িক কৌশলগত ভাবে রাশিয়ার দিকেই ঝুঁকে রয়েছে- ফলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একপ্রকার একঘরে হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে।
আচ্ছা গত ৩ দশকে আমেরিকার হয়ে পাড়ায় পাড়ায় যুদ্ধ লাগিয়ে মোড়ল সেজে যে ব্যক্তি গুলো দৈনিক আলোচনার টেবিলে থাকত- তাদের একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছাড়াও আরেকটা নাম সংবাদের শিরোনামে থাকত- সেটা ‘সেক্রেটারি ওফ স্টেট’ পদাধিকারী। হেনরি কিসিঞ্জারের মত সেলিব্রিটিকে বাদ দিলেও- ওয়ারেন ক্রিস্টোফার, কলিন পাওয়েল, কন্ডোলিজা রাইস, হিলারি ক্লিন্টন, জন কেরি থেকে ট্রাম্প জামানার মাইক পম্পেও কেও গোটা বিশ্বজুড়ে মোড়লগিরি করতে দেখা গেছে। এরাই অশান্ত দেশগুলোতে গিয়ে অস্ত্র বেচে বেড়াতো, আর লম্বা চওড়া ভাষণ দিতো।
আজকের এই বাইডেন জামানার সেক্রেটারি অফ স্টেট এর নামটুকু আপনি জানেননা গ্যারান্টি, গুগুল করে তবে বলতে পারবেন- ‘এ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন’ বলে কেউ একজন আছে এই পদে, যার কাজ ছিল দেশে দেশে অশান্তি লাগিয়ে বেড়ানো- কিন্তু সে সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ। মোদ্দাকথা, ‘ব্লিঙ্কেন-বাইডেন’ জুটি চরম ভাবে ফ্লপ অস্ত্র বিক্রির বাজার তৈরি করতে। ট্রাম্প তার চার বছরে যুদ্ধ না লাগালেও অস্ত্র বিক্রিতে বেশ দড়ের ছিল। বাইডেন ঠনঠন গোপাল-
এখনও তিন বছর যদি আমেরিকায় এই বাইডেন থাকে, ‘ইউনাইটেড স্টেট’ আর কতদিন ‘ইউনাইটেড’ থাকবে সেটা যথেষ্ট গবেষণার বিষয়।
৮০ বছরে অতিবৃদ্ধ বাইডেনকে কি ক্ষমতায় রাখবে পুঁজিবাদী অস্ত্র ব্যবসায়ী জায়োনিষ্টরা? নাকি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ইহুদী কমলা হ্যারিসকে পুতুল সরকার বানিয়ে একটা মরিয়া চেষ্টা চালাবে এই অস্ত্র ব্যবসায়ীর দল?
উত্তর অবশ্যই সময়ের গর্ভে, কিন্তু বিশ্ব রাজনীতিতে শেষ সাত দশকে আমেরিকা কখনও এতটা গুরুত্বহীন, পঙ্গু তথা অবাঞ্ছিত হয়ে যায়নি। বস্তুত মার্কিন পেট্রো-ডলার অর্থনীতি না থাকলে আমেরিকার নুন্যতম গুরুত্ব নেই আজকের 'সফট লোন সাম্রাজ্যবাদী' চৈনিক দুনিয়াতে।
তাহলে কি অচিরেই পেট্রো ডলারের যুগের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে?
পেপার কারেন্সি আবার সেই নব্বই এর দশকের ‘সোভিয়েতের রুবেলের’ মত কেজি দড়ে বিকোবে?
ব্যাঙ্কের জমা পুঁজি রাতারাতি ‘নেই’ হয়ে যাবে?
এর জন্যই কি আমাদের কেন্দ্র রাতারাতি বিল আনছে- ‘ব্যাঙ্ক দেউলিয়া’ হলে গ্রাহক কত পাবে?
কাকে বাঁচাতে করোনা ভাইরাসের আড়ালে ধনীদের সুদি পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে ভেন্টিলেটর দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে গরীব মেরে?
২০২২ উত্তর না দিলেও ২০২৩ কিন্তু অনেক কিছুর জবাব দিয়ে যাবে। কারন লুসার্ণ চুক্তি উত্তর তুরস্ককে রুখতে ইজরায়েল মরণ কামড় দেবেই- আর সেটা সুপার পাওয়ার হওয়ার লক্ষে।
বাকিটা ক্রমশ প্রকাশ্য....
সময় জবাব দেবে।
তবে ‘ইউনাইটেড স্টেট অফ আমেরিকাকে’ বাঁচতে গেলে একটা বড় যুদ্ধ খুব প্রয়োজন, ইজরায়েলকেও সুপার পাওয়ার হতে গেলে ঠিক ততটাই যুদ্ধ প্রয়োজন- যেভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুপার পাওয়ার ব্রিটেনের থেকে নিঃশব্দে মার্কিনীদের কাছে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছিল।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে, আমরা যুগ সন্ধিক্ষণে। অবশ্য ফেসবুকে বুঁদ ও xhamster বা ইউটিউব শর্টস সর্বস্ব প্রজন্মের কাছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে পড়া বা ভাবার সময় কোথায়!