শনিবার, ২৬ মার্চ, ২০২২

একমাস পর কোথায় দাঁড়িয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ!

 

পশ্চিমা মিডিয়ার গণ প্রোপাগাণ্ডা মূলক মিথ্যাচারের বাইরে গিয়ে তুলনামূলক নিরপেক্ষ কিছু সংবাদমাধ্যম এর দ্বারা প্রচারিত সংবাদ ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটা প্রাথমিক ধারনার উপরে ভিত্তি করে চলমান ঘটনাপ্রবাহের উপরে এই লেখা। আমাদের গোদি মিডিয়ারও বাপ এই পশ্চিমা মিডিয়া, যার পেটে ছেলে নেই তাদের কোলে ছেলে করে দিতে এরা উস্তাদ। কিন্তু মজা হল, প্রোপ্যাগান্ডা দিয়ে যুদ্ধে জেতা যায়না, গেলে হি’টলার ও তার প্রোপ্যাগান্ডা মন্ত্রী গোয়েবলস জিততো।
যদিও ঠান্ডা ঘরে বসে গলায় পাউডার, মুখে স্নো লাগিয়ে বুদ্ধিজীবী সেজে বসা কিছু আবাল, আর ইজেরে মগজ রাখা একাংশ ফেসবুকীয় বিশ্লেষক, সোস্যাল মিডিয়ার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে সর্বজ্ঞ পন্ডিত সাজার ভান করলেও বাস্তব পরিস্থিতি মোটেও তেমন নয়। প্রাক্তন KGB চর ও পরে তাদের সার্বিক প্রধান ভ্লাদিমির পুতিন- সাদ্দাম হোসেন বা মুয়াম্মার গাদ্দাফি নয়। প্রতিপক্ষের প্রতিটি সম্ভাব্য চাল কী হতে পারে সেই সম্বন্ধে সম্যক ধারনা রেখে ক্যালকুলেটেড রিস্ক নিয়েই যুদ্ধে নেমেছে- যা রাশিয়ার পরিভাষায় “বিশেষ সামরিক অভিযান”।
১) আজদের দিনে দাঁড়িয়ে রাশিয়া তার লক্ষ্যে ৯০% সফল, কাল কী হবে জানিনা তবে রাশিয়ার বিপক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীন। ইউরোপের খোঁজা রাষ্ট্রপ্রধানগুলো সবকটা কাগুজে বাঘ, সিরিয়া-ইরাক-লিবিয়া-আফগানিস্থানের মানুষদের উপরেই যত কেরামতি ছিল। পুতিনের রাশিয়া যেই একটা করে হুমকি দিচ্ছে, অমনি লেঙ্গুর গুটিয়ে আরো চারটে বাক্যবাণ ছুড়ে ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ প্রকল্পের অধীনে ‘অবরোধ অবরোধ’ খেলায় ছক্কা-পুট গুনছে।
রাশিয়ার লক্ষ্য কখনই গোটা ইউক্রেনের দখল নেওয়া ছিলনা, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিপার নদীর উত্তর-পূর্ব অংশটা। ইউক্রেনের মোট উর্বর কৃষিক্ষেত্রের ৭০% এই অঞ্চলেই অবস্থিত, যেখানে উৎপাদিত গম বিশ্বের ১৭% চাহিদা মেটায় ও সূর্যমুখী তেলের ৬৫% এর চাহিদা মেটায়। এর বাইরে আরো যে সব অন্যান্য কৃষিজাত ফসল রয়েছে সেগুলো নাহয় উহ্যই থাকুক।
ইউক্রেনের প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডারের ৭৭% এই নিপার নদীর উত্তরপূর্ব প্রান্তেই অবস্থিত। সেটাকেও প্রায় নিজেদের দখলে করে এনেছে রাশিয়া। এই প্রান্তেই ইউক্রেনের ৬০% তেলের কূপ গুলো রয়েছে। পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে সুপেয় জলের দরকার হওয়ার দরুন প্রায় সবকটি ইউক্রেনীয় পারমানবিক চুল্লি এই প্রান্তেই অবস্থিত। এর জন্যই ইরপিন নদী লাগোয়াও অঞ্চলও রাশিয়া দখল করে নিয়েছে।
ইতিহাস বলছে, হি’টলারের অজেয় বাহিনী যখন রাশিয়া আক্রমণ করেছিল, এই নিপার নদী অতিক্রম করে করে যাওয়া অধিকাংশ জার্মান সৈন্য বেঁচে ফেরেনি। সুতরাং ভূপ্রকৃতিকগত ভাবেই এই নদীর সীমানা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ইউক্রেনের সাথে কৃষ্ণসাগরের একমাত্র সম্পর্ক ছিল মারিওপোল সমুদ্রবন্দর, সেটাও রাশিয়ার করায়ত্ত হয়েছে বা দু-এক দিনেই হবে বলে ধারনা করাই যায়। সব মিলে রাশিয়ার জন্য ১০১% ‘উইন উইন সিচুয়েশন’ না হলেও ক্ষতিতে অন্তত নেই।
২) রাশিয়া বা বলা ভালো পুতিন- পশ্চিমা জোট ন্যাটোকে এমন আব্বুলিশ দুদুভাতের দলে ফেলে রেখেছে যে তারা নিজেদেরই নিজেরা চিনতে পারছেনা। এতোদিন তারা নিজেদের বিশ্বের মড়ল ভাবতো ও সেটা অন্তর থেকে বিশ্বাসও করত, পুতিনের এক ইউক্রেন আক্রমন রাতারাতি তাদের নেড়িকুত্তার দশাতে পরিনত করে দিয়েছে। পুতিন ন্যাটোর সাথে যে আচরণ করছে তার নিরিখে- 'চল ফোট' বা কুত্তা তাড়ানো ‘ছেই’ তার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানের। অবরোধের ফাঁপা বুলি আউরানো কয়েকটা ইউরোপিয়ান জোকারকে অনেক বেশি হাস্যকর মনে হতো- কিন্তু রোজ পুতিনের হাতেপায়ে ধরা আরো বড় ভাঁড় জেলেনস্কি এদের ভাঁড়ামো গুলোকে একাই অনেকটা ঢেকে দিয়েছে।
সুতরাং গতকাল রাশিয়ার দাবী করা প্রথম মিশন সফলের যে দাবী করা হয়েছে, তা অনেককাংশেই সফল। উল্টো দিকে পশ্চিমা জোট সকাল বিকেল কিছু অশ্বডিম্ব প্রসব করে- শীৎকার করে যাচ্ছে রাশিয়ার রমণ সুখের চরম সুখানুভূতির পালে হাওয়া দিয়ে। এটাও রাশিয়ার নৈতিক জয়, কারন রাশিয়া ন্যাটোকে বাধ্য করেছে মুখ দিয়ে নিয়মিত বাতকর্ম করতে।
৩) ইউক্রেনের দক্ষিন পশ্চিম প্রান্ত নিয়ে রাশিয়ার সামান্যতম মাথা ব্যাথা নেই, অথচ এই দিকের পোল্যান্ড সীমানা দিয়ে আমেরিকা সহ ন্যাটোর বৃহন্নলারা অস্ত্রসহ পাঠাচ্ছেল, রাশিয়া চাইলেই বেলারুশ সীমান্ত দিয়ে সেনা পাঠিয়ে এটাকে আঁটকাতে পারত অতি সহজে। কিন্তু ন্যাটোকে খাটো করে বাঁদরনাচ নাচাবার জন্যই সম্ভবত- এই প্রান্ত অবাধে খুলে রেখেছে। ভাবখানা এমন, "পারলে লড়ে দেখা"। পুতিন তথা রাশিয়া, ৩০ দেশের জোট ন্যাটোকে চুড়ান্ত অপমান করে উলঙ্গ করে দেওয়ার খেলাতে এই যাত্রায় চুড়ান্ত সফল। ন্যাটো যেটুকুও চুড়ুং ফুরুং করছিল- রাশিয়া পরমানু অস্ত্রের গল্প শোনাতেই ‘জোঁকের মুখে নুনের’ মত ন্যাটো আবার পাড়ার বাইড়ে গিয়ে ঘেউ ঘেউ শুরু করেছে।
৪) যুদ্ধে যদি কেউ লাভবান হয়, দৃশ্যত সেটা অস্ত্র বেচে মুনাফা করা আমেরিকা- যাদের প্রেসিডেন্ট গতকাল ইউরোপে গিয়ে গ্যাস বিক্রির একটা অবাস্তব মুলো ঝুলিয়ে দিয়ে এসেছে। কিন্তু যার লাভটা খালি চোখে দেখা যাচ্ছেনা তার নাম হল চীন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থা "SWIFT" থেকে রাশিয়াকে বাদ দিতেই, মার্কিন বিরোধী দেশগুলো সবাই চীনের CIPS এর দিকে ঝুঁকে গেছে। এই সুইফট মূলত মার্কিন ডলার ভিত্তিক একটা সিস্টেম, চীনা বিকল্প অবশ্যই চীনা মুদ্রা দ্বারা পরিচালিত।
সুইফট থেকে বাদ তো দিয়ে দিয়েছে মার্কিন বাবার চাপে, কিন্তু রাশিয়ান তেল গ্যাস বন্ধ করলে তো রাতারাতি ইউরোপে লালবাতি জ্বলবে। সুতরাং, এই সুযোগে রাশিয়া কি করেছে, ইউরোপীয় সমস্ত দেশ গুলোকে আত্মলিঙ্গম পশ্চাদপূরম দশাতে এনে- বাধ্য করছে নিজেদের মুদ্রা রুবেলের বিনিময়ে তেল, গ্যাস ও কয়লা কিনতে। এখানেও ডলারের ঘরে লালবাতি। এ যেন যেই গ্রাম্য প্রবাদের মার্কিন সংস্করণ- “ভাতার মরলে মরুক, সতীন যেন বিধবা হয়”।
সাধে কি আর বাইডেন তড়িঘরি ব্রাসেলসে উড়ে এসে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছে। কিন্তু সে গুড়ে বালি, এক্ষেত্রেও হম্বিতম্বি টুকুই সার। রাশিয়ার উপরে দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার যা ক্ষতি হয়েছে, ইউরোপের ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে কয়েকগুন বেশি। তবে যেহেতু হানিমুন পিরিয়ড শেষ, তাই মুখ ফোটার পাশাপাশি- বুক ও পেছন একসাথে ও স্বশব্দে ফাটছে সকলের। বেলজিয়াম সাফ জানিয়ে- যুদ্ধ আমাদের দেশে বাঁধেনি, তাই রাশিয়ান তেল-গ্যাস তারা বন্ধ করবেনা। জার্মানি, অষ্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, লাটাভিয়া, এস্তোনিয়া সহ ২৪টা ন্যাটো ভুক্ত দেশ কাগজে কলমে নিষেধাজ্ঞা দিলেও বস্তুত রাশিয়া থেকেই গ্যাস আনছে। তবে আগে লেনদেন হতো ডলারে, এখন হচ্ছে রুবেলে বা চাইনিস ইউয়ানে।
তাহলে আসলে ফাটলো কার! মারছে ইউক্রেনে, লাশ পরছে আমেরিকায়। তবে সবচেয়ে শকিং বিষয়টা পোল্যান্ডের, তাদের রাষ্ট্রপতি- বাইডেনের সাথে দেখা করার জন্য যে প্রাইভেট প্লেনে রওনা দিয়েছিল- কোনো এক অজানা কারনে সেটা জরুরী অবতরন করেছে ও রাষ্ট্রপতি অন্তর্ধানে চলে গেছেন। কেউ জানেনা এর কারন কি! পুরো ঘ্যেটে ঘ...
বাইডেন তার ছেলে হান্টার বাইডেনের ব্যবসা বাঁচাতে এসেছে, আর তার মাঝে যদি একটা অবাস্তব শর্তে ইউরোপে কিছু গ্যাস বিক্রি করা যায় চড়া দামে- সেটা তো চাঁদমারি। কিন্তু ইউরোপের চাহিদা যদি একটা কুমড়োর সাইজের হয় সেখানে আমেরিকার গ্যাসের সাপ্লাই বড়জোর একটা আঙুরের মাপের। অতএব, রাশিয়া বিনে গতি নেই। গোটা ইউরোপ যতই তম্বি আর মুখে ও খাতায় বাঘ মারুক, তাদের মিডিয়া যতই রাশিয়ার অর্থনীতিকে আতালান্তিকে তলিয়ে দিন- রোজ পয়সা দিয়ে তেল গ্যাসটা রাশিয়া থেকেই কিনছে ও কিনবে। G-20 থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা মাত্রই চীন যেভাবে রে রে করে বিরোধিতা করেছে, বাকি একটা সেয়ানাও আর টুঁ শব্দটি করেনি। তাহলে দাঁড়ালো কি! ন্যাটো আসলে হাতির দাঁত মাত্র, যাদের আগামী অস্তিত্ব সঙ্কটে।
ডুবছে আসলে ডলার, বিশ্ববানিজ্যের লেনদেনগত স্থিতাবস্থা ঘ্যেটে গেছে, নতুন বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার আগমন আসন্ন আর সেটা কখনই ডলার নির্ভর না, হবে এটা লিখে দিয়ে গেলাম।
গল্পটা কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
<<<<><<>>>>>>>>>><<>>>
আরব আমিরাত বা বলা ভালো দুবাই যে দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী, যাদের OPEC এর বাইরে অস্তিত্ব পোস্তদানার সাইজের, তারাও গত দু-এক দিনের মধ্যে মস্কো সফর করে এমন তম্বি করছে - যেন সেও কিম জং এর মত একটা মিনি সুপার পাওয়ার। প্রশ্ন হচ্ছে, এরা তো এতোদিনের মার্কিন রক্ষীতা, আজ সেই "বাবু" আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবার সাহসটা কে দিল বা কোথা থেকে পেলো?
ওদিকে গত সপ্তাহে মার্কিন বিদেশমন্ত্রী এ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন সৌদি সফর করেছিল, সেখান থেকে ঠনঠন গোপাল হয়ে ফিরেছে। ইরাণ, ভেনেজুয়েলা, কাতার সহ অন্যান্য তেল সমৃদ্ধ দেশ গুলোও যুক্তরাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দর্শন করিয়ে রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে একপ্রকার।
মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বদলে যাওয়ার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইজরায়েল কখনই রাশিয়াকে চটাবেনা, সেক্ষেত্রে সিরিয়ান বিদ্রোহীদের যদি রাশিয়া অস্ত্র সরবরাহ শুরু করে, ইজরায়েলের দখলে থাকা গোলান মালভূমি সহ অনেকটা জমি খুইয়ে ফেলবে। নিজের ভালো ক্ষ্যাপাতেও বোঝে, সেখানে ইজরায়েল তো মহা সেয়ানা।
এদিকে বাকসর্বস্ব আমেরিকার ফাঁপা দশা আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকেরা দেখে নারকীয় সুখ অনুভব করলেও- দাদা হওয়ার নেশায় বুঁদ ইজরায়েল কিন্তু বসে থাকবেনা। সে আমেরিকাকে মেরেই উত্থান ঘটাবে, এই মার হাতে নয়, ভাতে হবে।
সৌদি, মিশর, বাহারাইন, জর্ডন, সুদান, আমিরাতের মত দেশ গুলোকে নিয়ে যদি কোনো নতুন একটা গোষ্ঠী বানিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়- দাঁওটা ইজরায়েলই মারবে দিনের শেষে। প্রযুক্তিগতভাবে তেলসমৃদ্ধ ইসলামিক দেশগুলো বস্তুত "ক অক্ষর গোমাংস", উলটো দিকে ইজরায়েলই আজকের দিনে প্রযুক্তিগত ভাবে বিশ্বের টপ বস। সুতরাং উপরোক্ত দেশগুলো সহ- ইরাক, সিরিয়া, ওমান বা কাতারের মত দেশগুলোর সাথে দৌত্য করে রাতারাতি কোনো আঞ্চলিক গ্রুপ বানিয়ে না ফেলাটাই এখন আশ্চর্যের হবে। এমন একটা অসম্ভব ‘আঞ্চলিক মিত্র গ্রুপ’ তৈরি হয়ে গেলে মরোক্কো থেকে সুদান কেউ ই কিন্তু যোগ দিতে বাদ থাকবেনা। অচিরেই আমরা এমনই কিছু একটা অসম্ভব দেখতে চলেছি সম্ভবত।
এতে অনেক পাখি একসাথে মরবে। প্রথমত মার্কিন যুগের অফিসিয়াল পরিসমাপ্তি ঘটবে। রাশিয়াকে সুইফটে ব্যান করার মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের তৈরি ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে রুবেলে তেল কিনছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এখন তেল কেনা দেশ গুলো যদি ডলারে লেনদেন না করে, তাসের ঘরের মত রাতারাতি ধ্বসে যাবে ঋণে জর্জরিত মার্কিন অর্থনীতি। সোনা সম্পদ লুঠ করে কাগজকে বৈশ্বিক মুদ্রা বানানো ভুঁয়ো অর্থনীতির সলিলসমাধি ঘটতই, সেটা এখন দিনের আলো দেখবে।
চীনেরও সামরিক অগ্রগতি রুখে দেওয়া যাবে। কারন চীনের ৯৫% জ্বালানি তেল বাইরে থেকে আনতে হয়, যার ৭০% সরবরাহ করে মধ্যপ্রাচ্য। সুতরাং ইজরায়েল যদি এমন একটা জোট বানাতে সক্ষম হয়, সেক্ষেত্রে চীন যতবড় অর্থনীতিই হওক আর যত অস্ত্রেরই মালিক হোকনা কেন, তেলের জন্য ইজারেয়েলের মাথায় কখনই চড়তে পারবেনা চীন।
গোদা বাংলায় মোদ্দা কথা হচ্ছে, খনিজ তেলের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে আগামীর বিশ্বের দাদা সে হবে।
আর মুর্খ ইসলামিক দেশগুলোর গাণ্ডু বাদশা সুলতানগুলোর ঘটে সেই বুদ্ধি নেই যে নিজেরা জোট বেঁধে এই মুহুর্তে পূর্ব পশ্চিমের সব ব্যাটাদের জুতো চাঁটতে বাধ্য করে।
উপসংহার
++++++
গত শতকের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতিটি যুদ্ধ থেকে একটা দেশই লাভবান হয়েছে- তার নাম ইজরায়েল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে ফিলিস্তিনের ভূখন্ডের সনদ পেয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে সেই সনদপ্রাপ্ত দখলি ফিলিস্তিনি জমিতে বসতি স্থাপন করে হলোকাস্টের জুজু দেখিয়ে। তাই, এই ইউক্রেন যুদ্ধ শেষে কে হারলো- রাশিয়া না ন্যাটো সেই গল্প ভুলে যান।

কারন এখানেও জিতবে ইজরায়েল।
মিলিয়ে নেবেন, উত্তর ২০২৩ ই দিয়ে দেবে।

বুধবার, ৯ মার্চ, ২০২২

নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার দ্বারপ্রান্তে পৃথিবী

 



পরিষ্কার বাংলায় যদি প্রশ্ন করা হয় এই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা কে বা কারা লাগিয়েছে, তাহলে এর একটাই উত্তর- আমেরিকা লাগিয়েছি।
Complete Conflict Analysis না করলে এই জটিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিন্দুবিসর্গ বোঝা যাবেনা। তাই যারা টু’লাইনারে স্বচ্ছন্দ্য এ পোষ্ট প্লিজ তাদের জন্য নয়।
এক দশক আগে শুরু হওয়া সিরিয়া যুদ্ধের সাথে একই তারে বাঁধা এই ইউক্রেন সঙ্কট। কেন? তাহলে গোটা নিবন্ধটা পড়তে হবে।
অনেকেই ভাবে ইসলামী ‘মৌলবাদীদের’ শায়েস্তা করতে ছিল সিরিয়ান যুদ্ধ। কেউ বলে রাশিয়া ত্রাতা হিসাবে দাঁড়িয়েছে মুসলমানেদের পাশে, কেউ বলে মার্কিনীদের উচিৎ শিক্ষা হয়েছে, কেউ আবার হরেক ধরনের জটিল জিও-পলিটিক্স খুঁজে পায়। কিন্তু আসলে যে বিষয়টা- চরম স্বার্থান্বেষী পুঁজিবাদী পশ্চিমাদের গ্যাসের পাইপলাইন সংক্রান্ত দ্বন্ধ সেটা ভুলিয়ে দেয়- সিয়া-সুন্নীর মিথ্যা প্রচারনা দিয়ে। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের সর্বজ্ঞ সার্টিফায়েড মুর্খদের কাছে পশ্চিমা মিডিয়াই একমাত্র সত্য - তাই গ্যাসের দুর্গন্ধ আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাছে অধরাই রয়ে যায়।
আজ ইউক্রেন-রাশিয়া সঙ্কটে ‘ইসলামী মৌলবাদ’ নেই, সেখানে জঙ্গিবাদ নেই, তবে যুদ্ধ আছে, মৃত্যু আছে, বিভীষিকা আছে, মিথ্যা প্রচারনা আছে, স্বার্থ আছে, গ্যাস আছে, তেল আছে, ন্যাটো আছে, আমেরিকা আছে, রাশিয়াও আছে। তবে, এটাই সম্ভবত এদের একত্রে শেষ থাকা। এর পরেও যুদ্ধ থাকবে, মিথ্যা থাকবে, গ্যাস থাকবে, স্বার্থ, দম্ভ, রাজনীতি, অর্থনীতি সব থাকবে- শুধু আমেরিকা আর রাশিয়া নামদুটো একসাথে সাথবেনা, পক্ষে বা বিপক্ষে। একটা পক্ষের রাজনৈতিক ভাবে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হওয়ার মাঝখান দিয়েই নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হবে।
বাইডেন পূর্ববর্তী বিগত ৪ বছরে ট্রাম্পের জামানাতে একদিকে জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর মার্কেল যেমন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর বর্তমান যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, ঠিক তেমনই ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ বা হালের ম্যাঁকোও প্রশ্ন তুলেছিল- কেন আমরা মার্কিন সেনাদের জামাই আদর করে নিজেদের দেশে পুষবো ন্যাটোর নামে। ইতালির প্রেসিডেন্ট নাপোতালিনো একধাপ এগিয়ে- ইউরোপের জন্য এক্সক্লুসিভ একটা শক্তিশালী সেনা জোট বানাবার প্রস্তাব দেয়, যেখানে আমেরিকা থাকবেনা। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ন্যাটোর রেজুলেশনকে উপেক্ষা করে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রতিপত্তি বিস্তারে বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছে। করোনার সঙ্কটে থাকাকালীন দুটো বছর ন্যাটোর ভবিষ্যত ভূমিকা নিয়েই গবেষণা চলছিল ইউরোপের রাষ্ট্র নেতাদের মাঝে, প্রমাদ গোনে আমেরিকা।
ট্রাম্প আদতে ছিল একজন ব্যবসায়ী, বাইডেনের মত ‘I love war’ বলা টিপিক্যাল মার্কিনী নয়। স্বভাবতই ইউরোপ সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে, তাদের নিজ দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটাতে উদ্যোগী হয়েছিল। ট্রাম্প তার আমলে একটাও নতুন যুদ্ধের সূচনা করেনি।
মার্কিনীদের নেতৃত্ব নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে গোটা বিশ্বজুড়ে, তারই মাঝে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত ও প্রবল সাংস্কৃতিক ভাববোধক শক্তিকে পুজি করে বিশ্ব পরাশক্তি হিসাবে চীন আবির্ভূত হয়েছে। আসলে সোভিয়েতের পতনের সময় রাশিয়া ছিল নিতান্তই শিশু রাষ্ট্র, চীনও তখন আভ্যন্তরীণ সংস্কারে ব্যস্ত ছিল। এরই মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমুখী আধিপত্যের শীর্ষে পৌছে- ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া সহ একাধিক যুদ্ধ বাঁধিয়ে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে দুটো দশক ধরে এবং ন্যাটো ভুক্তদেশগুলোর মাঝেও বখরার ভাগ বিলিয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমা জোটকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান, ভেনেজুয়েলা সহ একাধিক দেশ মিলিতভাবে বা কখনও এককভাবে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। স্বভাবতই মার্কিনীদের সেই আশি-নব্বই এর দশকের ক্ষমতায় ভাটা আসতেই শুরু হয় বাইডেনের ইউরোপ সফর, অতীতকে পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা।
মার্কিন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ওসামা-বিন-লাদেনের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের মাধ্যমে আমেরিকার যে পতন শুরু হয়েছিল, তা ২০২২শে এসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে। আমেরিকার অবস্থা বুড়ো সিংহের মত, এককালে শিকারের জন্য নিজেই যথেষ্ট ছিল, এখন আর সেই বল নেই। অথচ দাপট না থাকলে বিশ্ব মুদ্রা ব্যবস্থার অচিরেই পতন ঘটবে, যা মার্কিনীদের দাদাগিরির প্রাণভোমরা। ডলারের পতন ঘটলে কোনো পরমানু বোমাই আর দাদাগিরি টিকিয়ে রাখতে পারবেনা, কারন ঐ বোমা আরো ৮টি দেশের ভাড়ারে মজুদ আছে। অতএব নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনতে একটা যুদ্ধ বাঁধাও।
ভৌগলিকভাবে যেহেতু আমেরিকা সম্পূর্ণ অন্য ভূখণ্ডে যেখানে কানাডা ছাড়া ইম্মিডিয়েট কোনো পড়শি নেই যাদের সাথে বিস্তীর্ণ সীমান্ত রয়েছে। তাই এশিয়া, ইউরোপ বা আফ্রিকাতে যুদ্ধ বাঁধালে সরাসরি তার কোনো প্রভাব পরেনা মার্কিন ভূখণ্ডে। তাই অন্যের ঘরে যুদ্ধ বাঁধাতে আমেরিকার শখের অন্ত নেই। কিন্তু সেই সুখের ঘরেও জুজু ঢুকেছে দূরপাল্লার মিশাইল গুলোর মাধ্যমে, মিথ্যা প্রচারনার বুদ্বুদ দিয়ে যে ভয় ঢাকা সম্ভব নয়।
যুগে যুগে ইতিহাস ভাঁড়েদের ভাঁড়ামোর সাক্ষী থেকেছে, ইউক্রেনও থাকল বা বলা ভালো রক্ত দিয়ে মুল্য চোকালো। এই ভাঁড় জেলেনস্কিকে বাবা-বাছা করে লেজে হাত বোলাতেই, রাজনীতি ও কূটনৈতিক জ্ঞানে মূর্খ ভাঁড় নিজেকে মহান ও গুরুত্বপূর্ণ ভেবে বসে ঠিক ততটা বাড়াবাড়ি শুরু করে দিল, যতটা করলে রাশিয়া আক্রমণ করতে বাধ্য হয়। জেলেনস্কি ভেবেছিল, তার জন্য গোটা ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঝাঁপিয়ে পরবে।
মূর্খ জেলেনস্কি ইতিহাস পড়েনি, মার্কিনীদের গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়ার ন্যাক্কারজনক ঐতিহ্য হয় জানতনা বা আমল দেয়নি কিম্বা নিজেকে সর্বোচ্চ বুদ্ধিমান বিচক্ষণ ভেবে ধরে নিয়েছিল- যে ইতিহাস বদলে দেব। আসলে রুপোলী পর্দা আর বাস্তবের মাঝে মোটা দুরত্বটা অনুধাবন করতে পারেনি। প্রতটি মূর্খের ক্ষেত্রে এটাই ঘটে।
ইউক্রেনের মাঝখান দিয়ে পাইপলাইন দ্বারা ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠাবার জন্য রাশিয়াকে ভীষণ চড়া মূল্যের ট্রানজিট ফি দিতে হয় বা হতো। কিন্তু ইউক্রেন প্রতিবছর প্রায় কয়েক লক্ষ ঘন মিটার গ্যাস চুরি করা শুরু করে, যা ২০০৬ সালের ১লা জানুয়ারি রাশিয়া ধরে ফেলে। ইউক্রেন ভেবেছিল রাশিয়া ধরতে পারবেনা, কিন্তু ররা পরতেই গা-জোয়ারী করা শুরু করে, পশ্চিমা মিত্ররা চোরের সাথ দেয়। কিন্তু রাশিয়া বেঁকে বসে, হুমকি দেয় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেবে এবং ইউক্রেনের উপরে শোধ নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করে।
ইউরোপ প্রমাদ গুনলো, রাশিয়া বেঁকে বসলে গোটা ইউরোপ শীতে জমে যাবে, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার তুষারসমাধি ঘটবে। তারা বিকল্প জ্বালানী উৎসের সন্ধান করতে লাগল। মার্কিন উপনিবেশ কাতার প্রস্তাব দিল, হরমুজ প্রনালীর নিচে থাকা গ্যাস- তারা ইরাক, সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপে গ্যাস পাঠাবে। এদিকে ইরান দাবী করলো, ঐ গ্যাসের এক তৃতীয়াংশের মালিক আমি, সুতরাং আমি এই পাইপলাইন বিছাবো। ইরান তুরস্ককে বললো আমি তোমার দেশের মাধ্যমে এই লাইন নিয়ে যাব, তুরস্ক ইরানের দোসর হয়ে গেল। ইরানের গ্যাসের ভান্ডার অল্প, তাতে রাশিয়ার একচেটিয়া ব্যবসা মার খাবেনা তেমন, তাই রাশিয়া ইরানের পক্ষ নিল। স্বভাবতই দুটো যুযুধান পক্ষ লেগে গেলো ছায়া যুদ্ধে। ইরাক নিয়ে সমস্যা ছিলনা, কারন ২০০১ থেকে বোমা মেরে মেরে তাকে আগেই ধ্বংস করে দেওয়া গেছে, বাদ সাধলো সিরিয়া।
ব্যাস, সিরিয়ার বাসারের কাছে একদিকে কাতারের হয়ে মার্কিন দৌত্য শুরু হয়ে গেল, অন্যদিকে ইরানের হয়ে রাশিয়ান দৌত্য। সুন্নি অধ্যুষিত কাতার চায় সিয়া বাসারের উচ্ছেদ, কারন সে রাশিয়ার পক্ষে সিয়া ইরানকে পাইপলাইন বসাতে অনুমতি দিয়েছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়- কাতারের পাইপলাইন এর মাধ্যমে রাশিয়াকে ইউরোপের গ্যাসের বাজার থেকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে। বিষয়টা ছিল গ্যাসের সাপ্লাই লাইন, পশ্চিমা মিডিয়া বানিয়ে দিল সিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব, সুক্ষ সুচারুভাবে।
শুরু হয়ে গেল সিরিয়ান যুদ্ধ। কাতারের প্রতক্ষ্য সহযোগিতায় মার্কিন সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ISIS নামের মিলিশিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী বাসারকে উচ্ছেদে ধ্বংস যজ্ঞ শুরু করে দিল। আর তাদের ঠেকাতে রাশিয়া ও ইরাণ পালটা অস্ত্রের সাপ্লাই দিলো বাসারকে। কে জিতলো বা কে হেরেছে সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু সিরিয়ান মানুষেরা শেষ হয়ে গেলো। সেই পাইপলাইন আজও কেউ সম্পূর্ণ করতে পারেনি। ইউরোপেও গ্যাসের বাজার থেকে রাশিয়াকে নামাতে পারেনি মার্কিনীরা। আজও গোটা ইউরোপ রাশিয়ার মুখাপেক্ষী গ্যাস সাপ্লাই এর জন্য, মাঝখান থেকে সিরিয়া কবরের দেশে পরিনত হলো।
সুতরাং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া- কেউ মসিহা নয়। গুয়ের এপিঠ-ওপিঠ। তবে বন্ধু হিসাবে মন্দের ভালো রাশিয়া, অন্তত প্রয়োজনের সময় একা ছেড়ে পালায়না।
সুতরাং, সিরিয়া নিয়ে ন্যাটো বা রাশিয়ার এতো যুদ্ধ প্রীতির বিষয়টা নিশ্চই এবারে বোধগম্য হয়েছে পাঠকের। নিজেদের অন্ধ স্বার্থে এরা কেউ সাধারন সিরিয়ান নাগরিকদের কথা ভাবেনি। না পোপ কোনো বিবৃতি দিয়েছে, না পশ্চিমা মিডিয়াতে সিরিয়ান শিশু মহিলাদের দুর্দশার কথা উঠে এসেছিল। বরং তাদের জঙ্গি দাগিয়ে দিয়ে মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ করে ছাড়খার করে গণকরবে পরিনত করে দিয়েছে দেশটাকে।
আজ ইউক্রেন সেটারই মূল্য দিচ্ছে, পাপের সাজা। কাল অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকেও মুল্য চোকাতে হবে, কাওকে দুদিন আগে কাওকে দুদিন পরে। নিয়তির ভবিতব্য এভাবেই সংসারে সাম্যতা বজায় রাখে।
বস্তুত আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, আমেরিকা বা ন্যাটো কিম্বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন কারোরই ইউক্রেনকে বাঁচাবো বা যুদ্ধ বন্ধ হোক- এ নিয়ে নুন্যতম মাথাব্যাথা নেই। কমপ্লিট সিরিয়া প্ল্যান। বরং এই যুদ্ধ থেকে কে কীভাবে লাভবান হতে পারে সেই নিয়ে নিজেদের মাঝে তৎপরতা তুঙ্গে। সকলে হিসাব কষতে ব্যস্ত- স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী লাভের।
জেলেনস্কি দৈনিক নিয়ম করে ন্যাটোকে হাতেপায়ে ধরছে যাতে ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষনা দেয় বা অস্ত্র ও সেনা পাঠায় ন্যাটো সহ পশ্চিমা মিত্ররা। আসলে এর মাধ্যমে দুটো সম্ভাব্যতা খুলে রাখছে কূটনৈতিকভাবে-
১) নো ফ্লাই জোন ঘোষনা মানে সেখানে রাশিয়ান বিমান উড়লেই তাকে গুলি করবে ন্যাটো, অর্থাৎ রাশিয়া ও ন্যাটো সম্মুখ সংঘাত। না ন্যাটো এটা কখনই করবেনা। আমেরিকারও সেই মুরোদ নেই- রাশিয়ার সাথে সম্মুখ সমরে যাবে এই মুহুর্তে।
২) এদিকে ন্যাটো ইউক্রেনকে সাহায্য না করলে রাশিয়ার পায়ে ধরার একটা সম্মানজনক অজুহাত দিতে পারবে জেলেনস্কি।
দ্বিতীয়টি ঘটার সম্ভাবনা ৯৯.৯৯%, এক্ষেত্রে জেলেনস্কিকে ন্যাটোই খুন করে দিয়ে রাশিয়ার নামে দোষ চাপাবে। মার্কিন বিদেশ সচিবের ইঙ্গিতে এটা স্পষ্ট, আসলে ভাঁড় জেলেনস্কিকে চাপে রাখার এটা একটা কৌশলও বটে।
এদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধাচারণ এর প্রেক্ষিতে পোল্যান্ড আগেই বেঁকে বসেছে, রাশিয়ার তেল-কয়লা রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় জার্মানি, নেদারল্যাণ্ড, পোল্যান্ড সহ ১৪টি ন্যাটো তথ্যা ইউরোপীয় দেশ সম্মতি দেয়নি। কারন রাশিয়া ঘোষনা দিয়েছে, তেলে নিষেধাজ্ঞা দিলে তারা গ্যাস বন্ধ করে দেবে। গোটা ইউরোপে অন্ধকারময় এক চরম অরাজকতা সৃষ্টি হবে। শিল্প উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে, কারন ইউরোপের ৩০% কয়লা ও অর্ধেক গ্যাস সাপ্লাই এর একমাত্র উৎস সেই রাশিয়া।।
নেতৃত্বাধীন ইউরোপে এই চুড়ান্ত দৈন্য দশা সৃষ্টি করাই আমেরিকার মূল লক্ষ্য ছিল, এবং তাতে চুড়ান্ত সফল। এবারে ভেনেজুয়েলা ও ইরানের তেল মার্কিন কোম্পানি গুলো চড়া দাবে ইউরোপে বিক্রি করবে এমনটা মার্কিনিদের ধান্দা। কিন্তু রাশিয়াকে টাইট দিতে গিয়ে মার্কিনিরা উলঙ্গ হয়ে গিয়েছে, ইউরো দেখতে ও বুঝতে পারছে- তারা নিজেরাই মার্কিনী লালসার শিকার হয়ে গেছে। মার্কিনী জায়োনিষ্ট মিডিয়ার মিথ্যা সম্প্রচার দিয়েও রাশিয়ার বাজারে বা সাধারণ জনজীবনে তেমন সামান্যতম অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারেনি গত ১৩ দিনের যাবতীয় অবরোধ সত্বেও। উল্টে ইউরোপের জনজীবনে চুড়ান্ত ভয় ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পরেছে, বিশ্ব বাজারে তেল-গ্যাস ক্রমেই মহার্ঘ্য পয়ে পরেছে- যার শিকার বিশ্বের প্রতিটি দেশ।
আসলে, সাবেক সোভিয়েত আমল থেকেই রাশিয়া যে অর্থনীতির প্রাক্টিস করে, সেটা অনেক বেশি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। ইরান, ভেনেজুয়েলা, কিউবা বা চীনের মত মার্কিন বিরোধী প্রায় সকল দেশগুলোতে এমন অর্থনীতির চাষ বহু দিন থেকেই। আমাদের ভারতে ঠিক যেভাবে পেট্রোলিয়াম দ্রব্য বিক্রি হয় ওই সব দেশের সমস্ত অর্থনীতিটাই সেভাবে চলে, একটা কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রাধীন সংস্থা দ্বারা। তাই রাতারাতি কোনো নিষেধাজ্ঞা চালু করে এই সব দেশের সাধারন জনজীবনে সেভাবে কোনো প্রভাব ফেলা যায়না, ফলত রাশিয়াতেও পরেনি। বরং রাশিয়া পশ্চিমাদের মূল প্রোপ্যাগান্ডা অস্ত্র- মিডিয়াকে বন্ধ করে দিয়েছে। CNN, BBC, Facebook, Twiter, Google সহ ডয়েচে ভেলে সহ বহু সংবাদ মাধ্যমকে জাষ্ট তাড়িয়ে দিয়েছে দেশ থেকে। লোক খ্যাপানো বন্ধ রাশিয়াতে, ঠিক যেভাবে গত ১৩ দিন যুদ্ধের আবহে করোনা গায়েব মিডিয়া থেকে, আমাদের স্বাভাবিক জনজীবনেও করোনা গায়েব হয়ে গেছে এই ভরা ফাগুনে।
উলটে মার্কিনীদের ফাঁদে পা দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটো এখন চুড়ান্ত সঙ্কটের সম্মুখীন। একে ইউরোপের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো নেতা নেই, তার উপরে পেট্রোলিয়াম সঙ্কট- রাশিয়াকে প্যাঁচে ফেলতে গিয়ে ইউরোপকে অন্ধকারে ঢোকাবার পাকা প্ল্যানে ঘিরে ফেলেছে মার্কিনীরা।
রাশিয়া অতীত যুদ্ধ কৌশলই হলো- ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করে চিবিয়ে খাওয়া। হিটলারও এই নীতির কাছে তলিয়ে গিয়েছিল, তবু সে অন্তত সম্মুখ সমরে গিয়েছিল। বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু মার্কিনী শক্তি বা নেতৃত্ব, ও দিশাহীন ছন্নছাড়া ইউরোপীয় দেশগুলো তো ‘মুখে মারিতং জগত’ এর মাঝেই সীমাবদ্ধ।
চর্মচক্ষুতে আমরা দেখছি লড়াইটা রাশিয়া ও ইউক্রেনের মাঝে হচ্ছে- আসলে লড়াইটা আমেরিকার প্রতিপত্তির জমি রক্ষার লড়াই। আসলে লড়াইটা ন্যাটোর প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখার লড়াই। আসলে লড়াইটা- বিশ্বের দাদাগিরিতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখা অন্তিম লড়াই।
প্রদীপ নেভার আগে দপ করে শেষ বারের মত জ্বলে উঠে। ইউক্রেন তো ‘বোরে’ মাত্র, মরার জন্যই যাদের জন্ম। আমেরিকা ন্যাটোকে জিইয়ে রেখে ইউরোপের মাথায় বেল ভেঙে দীর্ঘদিন খাওয়ার সিস্টেম চালিয়ে যেতে পারবে কিনা এ যুদ্ধ তার জবাব দেবে।
সবচেয়ে হাস্যকর হলো, আজ মার্কিন বিদেশ সচিব এ্যন্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছে, “ফলাফল যা ই হোক, তাদের কাছে ইউক্রেনই বিজয়ী”। ঘোড়াতেও হাসবে এসব কথায়। আজকের ফেসবুক লাইভের যুগে এই সব চড়া মেলোড্রামা যাত্রাতেও চলেনা সেটা ভুলে গেছে মার্কিনীরা। ২০১১ সালে ইরাক যুদ্ধের ৩ মাসের মধ্যেই বিজয়ী হওয়ার ঘোষণা দিয়েও, ১০ বছর পর লেজে গোবরে হয়ে পালাতে পথ পায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
আমরা এশিয়ানরা, বরাবর পশ্চিমাদের চোখে বাজার হসাবে ছিলাম। আমাদের উপরে এরা সারাবছর যুদ্ধ ভীতি বজায় রেখে অস্ত্র ব্যবসাইয় বিপুল মুনাফা কামিয়েছে। এখন এশিয়া যুদ্ধে যুদ্ধে মোটামুটিভাবে সম্পৃক্ততা অর্জন করেছে।
তবে যে যা খুশি করুক, ইজরায়েল কিন্তু ইউক্রেনীয় ইহুদিদের পুনর্বাসন দেওয়ার জন্য বিমান পাঠিয়ে, দখলকৃত ফিলিস্তিন ভূমিতে ঘর বানিয়ে দিচ্ছে। নিজেদের সংখ্যা বাড়ানোর সামান্যতম সুযোগ ছাড়তে তারা রাজি নয় ইহুদিরা। আর আপনি ভাবছেন- RSS বা জামাতিরাই একমাত্র ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে, এরাই সাম্প্রদায়িক দল। ইজরায়েল বা ইহুদিদের চেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক আর কেউ নেই তার প্রমান আলাদা করে দেওয়ার দরকার নেই এই প্রেক্ষাপটে।
গোটা মধ্যপ্রাচ্যে দুটো দশক জুড়ে পশ্চিমারা হত্যাযজ্ঞ চালালেও পোপের মুখের ছিপি কখনও খোলেনি ভুলক্রমে। অথচ একটা খ্রীষ্টান দেশ আক্রান্ত হতেই রোজ ‘মুখ-পায়ু’ সহ শরীরের সমস্ত ছিদ্রপথ দিয়ে পোপের গোঙানী আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এমনকি পশ্চিমা সাংবাদিকদের অভিবাসন নীতির প্রশ্নে লাইভ টিভিতে- সোনালী চুল, নীল চোখের সপক্ষে যেভাবে বর্ণবাদী মন্তব্য শোনা গেছে ও যাচ্ছে, তাতে তাদের তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক ও আধুনিকতার মুখোশ খসে পরছে।
একটা যুদ্ধ অনেকের মুখোশ খুলে দিয়েছে। একটা যুদ্ধ ভারত-পাকিস্তান-চীনের মত নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করা তিন পরমানু শক্তিধর রাষ্ট্রকে একযোগে মার্কিনীদের বিপক্ষে থাকার শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দেখাতে পেরেছে। ওদিকে তুরস্ক মার্কিনীদের বিরুদ্ধে চলে গেছে ন্যাটোতে থেকেও।
কিন্তু সারাবছর অবরোধ দিয়ে রাখা মাদুরোর ভেনেজুয়েলা কোন মন্ত্রে মার্কিনী ফাঁদে পা দিলো, সেই বিষয়টা বেশ ধোঁয়াসার। অবশ্যই এর জন্য চড়া মুল্য দিতেই হবে যদি তারা মার্কিনীদের সাথে সাথ দেয়। সাপের সাথে ঘর করা গেলেও মার্কিনীদের সাথে যায়না। কারন মার্কিনীরা যাদের বন্ধু, তার শত্রুর দরকার নেই- জেলেনস্কি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এটা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যে তেল অর্থনীতি দিয়ে ডলারকে বিশ্বমুদ্রায় নিয়ে গিয়ে বৈশ্বিক সম্পদ লুন্ঠন করেছে দশকের পর দশক। সেই তেল সঙ্কটই আমেরিকার নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। আসলে আমেরিকা 'অবরোধ-অবরোধ' খেলতে গিয়ে নিজেরাই একটা চক্রব্যুহে আঁটকা পরে গেছে। যেখানে বাঁচতে গেলে দম্ভ ও ভয় টিকিয়ে রাখতে হবে। যেখানে কোনো বন্ধু নেই, স্বার্থই একমাত্র সত্য।
এই যুদ্ধ কতদিন চলবে জানা নেই, তবে নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই যুদ্ধপরিস্থিতি। একটা নতুন নেতৃত্বের হাতে অর্পিত হবে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও সামরিক রাশ। সে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা জোট হোক কিম্বা রাশিয়া কিম্বা তৃতীয় কেউ। চলমান বিশ্বব্যবস্থার এখানেই মোটামুটি ইতি ঘটতে চলেছে যা গত সাত-আট দশক থেকে চলে আসছে।
কালচক্র এখন অস্তাচলের পথে, সে কোনো একটাকে সাথে নিয়েই ডুববে। কে সেই অমিত ক্ষমতাধর শক্তি? রাশিয়া? ন্যাটো? নাকি যুদ্ধবাজ আমেরিকা?

সোমবার, ৭ মার্চ, ২০২২

কি ঘটতে পারে অদূর ভবিষ্যতে?

 


পটভূমিকাঃ- দীর্ঘ মধ্যযুগীয় ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যাবে- ইউরোপীয় দেশগুলোর মাঝে যুদ্ধবিবাদ এ এক অতি স্বাভাবিক ঘটনা। তাইতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মাঝের সাতটা দশকে কোনোরকমে নিজেরা সুস্থ থাকার চেষ্টা করে যুদ্ধ, রক্তপাত আর হিংসার সবটা এশিয়া আর আফ্রিকাতে স্থানান্তর করেছিল।

➤ মরালঃ যুদ্ধবাজ শ্বাপদদের চরিত্র বদলায়না।

বর্তমান পরিস্থিতিঃ ক্রুসেডারদের সময় থেকেই তথাকথিত আধুনিক ইউরোপীয়দের যে সাম্প্রদায়িক চরিত্র প্রকাশ পেয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে টিভি গণমাধ্যম গুলোতে সেই ন্যাংটা বর্ণবাদী নিকৃষ্টপনার আবার স্বরূপ দেখা যাচ্ছে প্রতিটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রনেতাদের আচরণ কথাবার্তাতে। খোদ রাষ্ট্রপুঞ্জ তথা জাতিসংঘের প্রধান তথা সাবেক পর্তুগাল প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক তম মন্তব্যের নিরিখে ধরে নেওয়াই যায়- তিনি সাদা চামড়া, নীল চোখের খ্রীষ্টানদের প্রতিনিধি।
আমাদের দেশ কোথায়ঃ- নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর বিপক্ষে গিয়ে ভোটদানে বিরত থাকার কারনে- ভারতের উপরে পশ্চিমা অবরোধ আসতে পারে। কূটনৈতিক ভাবে আমাদের দেশের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ এটা, শ্যাম রাখি না কুল রাখি দশা।

ভাঁড় দিয়ে ভাঁড়ামো চলে, রাষ্ট্র চলেনা। ইউক্রেনের জনগন জান-মাল দিয়ে আজ বুঝছে। আমরা অবশ্য সেই ২০১১/২০১৪ থেকেই রাজ্য-রাষ্ট্রগত ভাবে বুঝে চলেছি, মূল্যও দিচ্ছি।

ইতিহাস বলছে, পশ্চিমা শক্তি জোট ন্যাটো এবং বিশেষকরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটাও যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস নেই। বরং সর্বত্র লেজেগোবরে হয়ে পলায়নের ন্যাক্কারজনক অতীত 'গৌরব' রয়েছে। অতএব, দৃশ্যত রুশপন্থী হওয়াটা আমাদের মত কৃষিভিত্তিক দেশের জন্য সেরা পন্থা। সেক্ষেত্রে চীনের সাথে সম্পর্কের উন্নতি সাধন প্রয়োজন, যা ভাঁড় রাষ্ট্রনেতা দিয়ে হবেনা।

এটা মোটেই আশ্চর্যের নয় যে মধ্যপ্রাচ্যের তথা আরো স্পষ্ট করে বললে ইসলাম অধ্যুষিত দেশগুলো মার্কিনীদের বিপরীতে অবস্থান করে রাশিয়াকে সমর্থন করেছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া তো প্রকাশ্যে রাশিয়াকে সমর্থন দিয়েছে, তুরস্ক ও ইজরায়েল নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেও অবশ্যই রাশিয়া ঘেঁষা। সবচেয়ে আশ্চর্যের হলো- সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারিকে জাষ্ট পাত্তা না দিয়ে রাশিয়ার সাথে পেট্রোলিয়াম চুক্তি বহাল রেখেছে।

এতোটা দুরবস্থা এর আগে মার্কিনীদের শেষ সাত দশকে কখনও হয়নি। শুধু মৌখিক হম্বিতম্বির বাইরে আসল কাজ জাষ্ট শূণ্য।

ইউক্রেন আক্রমণের মধ্যেই ইজরায়েলী রাষ্ট্রনেতা নাফতালি বেনেটের মস্কো সফর- পশ্চিমাদের কপালে ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। এটাকে রাশিয়া এনক্যাশ করবেই।

ইজরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সাম্রাজ্যের দখল নিয়ে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা করবে, যেটা গত ছয় দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করে চলেছে। আর এটা হলেই মার্কিন ও তাদের মিত্রদের শুইয়ে দেওয়া যাবে। এটাই ঘটতে চলেছে সম্ভবত।

ইরাণকে বেশ কিছুটা তোল্লা দেবে পশ্চিমা শক্তি, সম্ভবত পরামানু গবেষণা বিষয়ে ছাড়পত্র দেবে। এতে ইজরায়েলকেও কড়া বার্তা দেওয়া হবে।

সৌদি আরবের সঙ্কট বাড়বে, আমেরিকা অধিক উৎপাদনের জন্য প্রেসার দেবে- ওদিকে ইজরায়েল ও চীনের মদতপুষ্ট রাশিয়াও উলটো চাপ দেবে। খুন হয়ে যেতে পারে সৌদি প্রিন্স মুহাম্মদের বৃদ্ধ পিতা- কিং সালমান।

বিগত দেশ দশকে সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা ছিল। তেল বেচে প্রাপ্ত ডলারের বিনিময়ে আমেরিকা সৌদিকে বিপুল পরিমানে অস্ত্র কিনতে বাধ্য করেছে, যা গিত দেশ দশকে মোট বিক্রিত অস্ত্রের প্রায় 70%. এই বিপুল অস্ত্র হস্তগত বা দখল করতে এখন কে ঝাঁপায় সেটাই দেখার। তুরস্ক সবার আগে থাকবে, বাকি রইলো মিশর, আফগানিস্তান, পাকিস্তান সহ ইরাকি ও সিরিয়ান মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো। মোদ্দাকথা পশ্চিমাদের পোষ্য কুত্তা সৌদি রাজের নিশ্চিন্ত ঘুমের দিন শেষের পর্যায়ে, নিরপরাধ ইয়েমেনীয় নাগরিকেরা যদি এবারে একটু শ্বাস নেওয়ার অধিকার পায়।

রাশিয়া থেকে বিপুল ক্রুড পেট্রোলিয়াম আমদানি করতো ভারত, আরো নির্দিষ্ট করে বললে ইন্ডিয়ান ওয়েল, সেটা সম্ভবত ইরাণ থেকে করবে বা করতেই হবে।

ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে চীনের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ- ইউরোপীয় বাজারের জন্য। তাই কৌশলগত কারনেই রাশিয়ার বিপক্ষে যাবেনা চীন, অন্তত ইউক্রেন প্রশ্নে। উলটে উত্তর কোরিয়ার পাগলাকে লেলিয়ে দিয়ে মার্কিন পুতুল সরকার যুক্ত দক্ষিন কোরিয়া ও জাপানকে অশান্ত রেখে দেবে।

অদূর ভবিষ্যতে NATO জোট ভেঙে যাবেই, কারন তুরষ্ক বেঁকে বসলো বলে- জাষ্ট সময়ের অপেক্ষা। তাছাড়া ইউরোপের তেল-গ্যাসের দাম রাতারাতি চতুর্গুণ বেড়ে আকাশ ছুঁয়েছে, স্বভাবতই মুদ্রাস্ফীতির কবলে পরবে গোটা ইউরোপ। কয়েকটা বড় অর্থনীতির দেশ কোনোমতে সামলালেও নর্ডিক, ইষ্টব্লক ও বাল্টিক দেশগুলোর অর্থনীতি তাসের ঘরের মত ভেঙে পরবে।

ফ্রান্স ও ইতালি আবার আফ্রিকাতে অত্যাচার চালাবে সম্পদ লুঠের জন্য, সুতরাং গোটা আফ্রিকা জুড়ে আবার গৃহযুদ্ধ ভয়াল আকার ধারন করবে। এই সুযোগে সেয়ানে লুন্ঠন করবে।
CIA জাষ্ট ফিনিস, তবে MI6 আবার নব কলেবরে প্রকাশ পাবে।

নেতৃত্বাধীন ইউরোপে সবাই মোড়ল- নিজেদের মাঝে খেয়োখেয়ি চরমে উঠবে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও বাক্যবাণের ফাঁপা বেলুন ফোলানো ছাড়া কারো কিচ্ছুটি করার মুরোদ নেই আক্ষরিক অর্থে। ভোগবাদী ন্যাংটা সমাজব্যবস্থার চরম দৈন পরিনতি দেখছে ও দেখবে তৃতীয় বিশ্ব।

রাশিয়ার ক্রিমিয়া বা ইউক্রেন দখল, চীনের তাইওয়ান দখল সহ নানা দেশের দখলনীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে- তুরস্ক তাদের অটোমান আমলের মত মক্কা-মদিনার দখল নিতে চাইবেই, তাদের উপরে থাকা লুসার্ণ চুক্তি উঠে গেলে। ন্যাটো সহ পশ্চিমাদের উভয় সঙ্কট হলেও- যেহেতু দুটোই মুসলমান অধ্যুষিত দেশ- তাই তারা এটাকে অস্ত্রের বাজার হিসাবেই দেখবে।

ক্রমবর্ধমান ইজরায়েলি আগ্রাসনের ফলে ফিলিস্তিনের কতটুকু কি বাঁচবে বলা মুশকিল। তবে সৌদিতে পট পরিবর্তন হলে ইজরায়েল থামতে বাধ্য। এক্ষেত্রে ইরান-ইজরায়েল আজকের বৈরিতা সেদিন থাকবেনা, তারা মিত্র হয়ে উঠবে এলাকার দখলদারিত্ব করতে।

এদিকে আফগানিস্তান আবার তালিবানের মুক্তাঞ্চল, যাদের কাছে বিপুল পরিমানে মার্কিন অস্ত্র রয়েছে যেগুলো তারা ইচ্ছাকৃত ফেলে রেখে গিয়েছে। এগুলোর অপব্যবহার কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধেই হবে। হতেই পারে এই লাভ ফিলিস্তিন পাবে- আর সাজা পাবে সৌদি।

মার্কিন ডলারের বিপক্ষে বিশ্ব মুদ্রা হিসাবে 'Yuan' কে তুলে ধরার প্রচেষ্টা হবে যতদিন না ইজরায়েল তাদের One Order World এর অংশ হিসাবে কোনো বৈশ্বিক মুদ্রা বাজারে নিয়ে আসছে।

বিশ্বযুদ্ধ বা পরমানুযুদ্ধ কোনোটাই হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে- অন্তত দুটো খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী দেশের মাঝে। একটা মুসলমান অধ্যুষিত দেশ না থাকা কালীন বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা সেভাবে নেই। তুরস্কের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধ ঘটতে পারে।

ভূমধ্যসাগরের কতৃত্বপূর্ণ দখলদারিত্ব নিয়ে তুরস্কের সাথে ন্যাটো ও রাশিয়ার সাথে একযোগে বিবাদ লাগবে। এবং তুরস্ক এই দুই এর হামলার স্বীকার হয়ে ছাড় খার হয়ে যেতে পারে- যার প্রভাব ভীষণভাবে পরবে বিশ্ব অর্থনীতিতে।

অদূর ভবিষ্যতে হয় রাশিয়া নিশ্চিহ্ন হবে ইউরোপের মানচিত্র থেকে যেমন সোভিয়েত নিশ্চিহ্ন হয়ে 15টা আলাদা মানচিত্র জন্মেছিল। অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে 50টা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। এক্ষেত্রেও ইউরোপের মানচিত্র বদলে যাবে, রাশিয়া সাবেক সোভিয়েতের অংশগুলোকে দখল করবে।
➤বর্তমান যা পরিস্থিতি, তাতে দ্বিতীয়টার সম্ভাবনা 95%

ভারত তথা সাবেক কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর ব্যাঙ্কিং সিস্টেম এক্ষেত্রে ভেঙে পরবে। যেহেতু এই দেশগুলোর সেন্ট্রাল রিজার্ভ- পেট্রোডলার, তাই মুদ্রার মান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরে না যাওয়াটাই আশ্চর্যের।

➤ এক্ষেত্রে চাষী, শ্রমিক, মুটে মজদুরদের তেমন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা না হলেও, যারা অর্থ মজুদ রেখেছে ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে- সেই অর্থগুলো শুধু সংখ্যা হয়ে যাবে।
এগুলো সবই সম্ভাবনা ও ব্যক্তিগত মতামত মাত্র।

মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০২২

সাধারণ ইউক্রেনীয় জনগণের হাতে অস্ত্র

 


ইউক্রেন বাসী স্বদেশ রক্ষায় অস্ত্র তুলে নিচ্ছে হাতে, গোটা বিশ্বের সংবাদমাধ্যম ইউক্রেনীয় 'ভাঁড়' জেলেনুক্সিকে ধন্য ধন্য করছে। তবে আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক কিম্বা ফিলিস্তিনিরা স্বদেশ, প্রাণ ও অবৈধ দখলদারির বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিলেই তারা জ'ঙ্গী। এটা মাথায় আছে...
কারন সন্ত্রা'সবাদের কোনো ধর্ম হয়না- ইসলাম ছাড়া।
ভাগ্যিস পুতিন অর্থোডক্স খ্রীষ্টান- ইউক্রেনও, ন্যাটো বা ঘ্যেটোও।
ইয়ে, এই তালে কী সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজ দামড়া সৌদি রাজাকে ভোগে পাঠাবে- জায়োনিষ্টরা! নাকি আগে বাইডেন তারপর আল-হাবিবি-সৌদ?
কমপ্লিট প্যাকেজ-

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...