বুধবার, ৯ মার্চ, ২০২২

নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার দ্বারপ্রান্তে পৃথিবী

 



পরিষ্কার বাংলায় যদি প্রশ্ন করা হয় এই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা কে বা কারা লাগিয়েছে, তাহলে এর একটাই উত্তর- আমেরিকা লাগিয়েছি।
Complete Conflict Analysis না করলে এই জটিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিন্দুবিসর্গ বোঝা যাবেনা। তাই যারা টু’লাইনারে স্বচ্ছন্দ্য এ পোষ্ট প্লিজ তাদের জন্য নয়।
এক দশক আগে শুরু হওয়া সিরিয়া যুদ্ধের সাথে একই তারে বাঁধা এই ইউক্রেন সঙ্কট। কেন? তাহলে গোটা নিবন্ধটা পড়তে হবে।
অনেকেই ভাবে ইসলামী ‘মৌলবাদীদের’ শায়েস্তা করতে ছিল সিরিয়ান যুদ্ধ। কেউ বলে রাশিয়া ত্রাতা হিসাবে দাঁড়িয়েছে মুসলমানেদের পাশে, কেউ বলে মার্কিনীদের উচিৎ শিক্ষা হয়েছে, কেউ আবার হরেক ধরনের জটিল জিও-পলিটিক্স খুঁজে পায়। কিন্তু আসলে যে বিষয়টা- চরম স্বার্থান্বেষী পুঁজিবাদী পশ্চিমাদের গ্যাসের পাইপলাইন সংক্রান্ত দ্বন্ধ সেটা ভুলিয়ে দেয়- সিয়া-সুন্নীর মিথ্যা প্রচারনা দিয়ে। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের সর্বজ্ঞ সার্টিফায়েড মুর্খদের কাছে পশ্চিমা মিডিয়াই একমাত্র সত্য - তাই গ্যাসের দুর্গন্ধ আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাছে অধরাই রয়ে যায়।
আজ ইউক্রেন-রাশিয়া সঙ্কটে ‘ইসলামী মৌলবাদ’ নেই, সেখানে জঙ্গিবাদ নেই, তবে যুদ্ধ আছে, মৃত্যু আছে, বিভীষিকা আছে, মিথ্যা প্রচারনা আছে, স্বার্থ আছে, গ্যাস আছে, তেল আছে, ন্যাটো আছে, আমেরিকা আছে, রাশিয়াও আছে। তবে, এটাই সম্ভবত এদের একত্রে শেষ থাকা। এর পরেও যুদ্ধ থাকবে, মিথ্যা থাকবে, গ্যাস থাকবে, স্বার্থ, দম্ভ, রাজনীতি, অর্থনীতি সব থাকবে- শুধু আমেরিকা আর রাশিয়া নামদুটো একসাথে সাথবেনা, পক্ষে বা বিপক্ষে। একটা পক্ষের রাজনৈতিক ভাবে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হওয়ার মাঝখান দিয়েই নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হবে।
বাইডেন পূর্ববর্তী বিগত ৪ বছরে ট্রাম্পের জামানাতে একদিকে জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর মার্কেল যেমন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর বর্তমান যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, ঠিক তেমনই ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ বা হালের ম্যাঁকোও প্রশ্ন তুলেছিল- কেন আমরা মার্কিন সেনাদের জামাই আদর করে নিজেদের দেশে পুষবো ন্যাটোর নামে। ইতালির প্রেসিডেন্ট নাপোতালিনো একধাপ এগিয়ে- ইউরোপের জন্য এক্সক্লুসিভ একটা শক্তিশালী সেনা জোট বানাবার প্রস্তাব দেয়, যেখানে আমেরিকা থাকবেনা। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ন্যাটোর রেজুলেশনকে উপেক্ষা করে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রতিপত্তি বিস্তারে বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছে। করোনার সঙ্কটে থাকাকালীন দুটো বছর ন্যাটোর ভবিষ্যত ভূমিকা নিয়েই গবেষণা চলছিল ইউরোপের রাষ্ট্র নেতাদের মাঝে, প্রমাদ গোনে আমেরিকা।
ট্রাম্প আদতে ছিল একজন ব্যবসায়ী, বাইডেনের মত ‘I love war’ বলা টিপিক্যাল মার্কিনী নয়। স্বভাবতই ইউরোপ সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে, তাদের নিজ দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটাতে উদ্যোগী হয়েছিল। ট্রাম্প তার আমলে একটাও নতুন যুদ্ধের সূচনা করেনি।
মার্কিনীদের নেতৃত্ব নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে গোটা বিশ্বজুড়ে, তারই মাঝে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত ও প্রবল সাংস্কৃতিক ভাববোধক শক্তিকে পুজি করে বিশ্ব পরাশক্তি হিসাবে চীন আবির্ভূত হয়েছে। আসলে সোভিয়েতের পতনের সময় রাশিয়া ছিল নিতান্তই শিশু রাষ্ট্র, চীনও তখন আভ্যন্তরীণ সংস্কারে ব্যস্ত ছিল। এরই মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমুখী আধিপত্যের শীর্ষে পৌছে- ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া সহ একাধিক যুদ্ধ বাঁধিয়ে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে দুটো দশক ধরে এবং ন্যাটো ভুক্তদেশগুলোর মাঝেও বখরার ভাগ বিলিয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমা জোটকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান, ভেনেজুয়েলা সহ একাধিক দেশ মিলিতভাবে বা কখনও এককভাবে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। স্বভাবতই মার্কিনীদের সেই আশি-নব্বই এর দশকের ক্ষমতায় ভাটা আসতেই শুরু হয় বাইডেনের ইউরোপ সফর, অতীতকে পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা।
মার্কিন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ওসামা-বিন-লাদেনের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের মাধ্যমে আমেরিকার যে পতন শুরু হয়েছিল, তা ২০২২শে এসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে। আমেরিকার অবস্থা বুড়ো সিংহের মত, এককালে শিকারের জন্য নিজেই যথেষ্ট ছিল, এখন আর সেই বল নেই। অথচ দাপট না থাকলে বিশ্ব মুদ্রা ব্যবস্থার অচিরেই পতন ঘটবে, যা মার্কিনীদের দাদাগিরির প্রাণভোমরা। ডলারের পতন ঘটলে কোনো পরমানু বোমাই আর দাদাগিরি টিকিয়ে রাখতে পারবেনা, কারন ঐ বোমা আরো ৮টি দেশের ভাড়ারে মজুদ আছে। অতএব নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনতে একটা যুদ্ধ বাঁধাও।
ভৌগলিকভাবে যেহেতু আমেরিকা সম্পূর্ণ অন্য ভূখণ্ডে যেখানে কানাডা ছাড়া ইম্মিডিয়েট কোনো পড়শি নেই যাদের সাথে বিস্তীর্ণ সীমান্ত রয়েছে। তাই এশিয়া, ইউরোপ বা আফ্রিকাতে যুদ্ধ বাঁধালে সরাসরি তার কোনো প্রভাব পরেনা মার্কিন ভূখণ্ডে। তাই অন্যের ঘরে যুদ্ধ বাঁধাতে আমেরিকার শখের অন্ত নেই। কিন্তু সেই সুখের ঘরেও জুজু ঢুকেছে দূরপাল্লার মিশাইল গুলোর মাধ্যমে, মিথ্যা প্রচারনার বুদ্বুদ দিয়ে যে ভয় ঢাকা সম্ভব নয়।
যুগে যুগে ইতিহাস ভাঁড়েদের ভাঁড়ামোর সাক্ষী থেকেছে, ইউক্রেনও থাকল বা বলা ভালো রক্ত দিয়ে মুল্য চোকালো। এই ভাঁড় জেলেনস্কিকে বাবা-বাছা করে লেজে হাত বোলাতেই, রাজনীতি ও কূটনৈতিক জ্ঞানে মূর্খ ভাঁড় নিজেকে মহান ও গুরুত্বপূর্ণ ভেবে বসে ঠিক ততটা বাড়াবাড়ি শুরু করে দিল, যতটা করলে রাশিয়া আক্রমণ করতে বাধ্য হয়। জেলেনস্কি ভেবেছিল, তার জন্য গোটা ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঝাঁপিয়ে পরবে।
মূর্খ জেলেনস্কি ইতিহাস পড়েনি, মার্কিনীদের গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়ার ন্যাক্কারজনক ঐতিহ্য হয় জানতনা বা আমল দেয়নি কিম্বা নিজেকে সর্বোচ্চ বুদ্ধিমান বিচক্ষণ ভেবে ধরে নিয়েছিল- যে ইতিহাস বদলে দেব। আসলে রুপোলী পর্দা আর বাস্তবের মাঝে মোটা দুরত্বটা অনুধাবন করতে পারেনি। প্রতটি মূর্খের ক্ষেত্রে এটাই ঘটে।
ইউক্রেনের মাঝখান দিয়ে পাইপলাইন দ্বারা ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠাবার জন্য রাশিয়াকে ভীষণ চড়া মূল্যের ট্রানজিট ফি দিতে হয় বা হতো। কিন্তু ইউক্রেন প্রতিবছর প্রায় কয়েক লক্ষ ঘন মিটার গ্যাস চুরি করা শুরু করে, যা ২০০৬ সালের ১লা জানুয়ারি রাশিয়া ধরে ফেলে। ইউক্রেন ভেবেছিল রাশিয়া ধরতে পারবেনা, কিন্তু ররা পরতেই গা-জোয়ারী করা শুরু করে, পশ্চিমা মিত্ররা চোরের সাথ দেয়। কিন্তু রাশিয়া বেঁকে বসে, হুমকি দেয় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেবে এবং ইউক্রেনের উপরে শোধ নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করে।
ইউরোপ প্রমাদ গুনলো, রাশিয়া বেঁকে বসলে গোটা ইউরোপ শীতে জমে যাবে, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার তুষারসমাধি ঘটবে। তারা বিকল্প জ্বালানী উৎসের সন্ধান করতে লাগল। মার্কিন উপনিবেশ কাতার প্রস্তাব দিল, হরমুজ প্রনালীর নিচে থাকা গ্যাস- তারা ইরাক, সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপে গ্যাস পাঠাবে। এদিকে ইরান দাবী করলো, ঐ গ্যাসের এক তৃতীয়াংশের মালিক আমি, সুতরাং আমি এই পাইপলাইন বিছাবো। ইরান তুরস্ককে বললো আমি তোমার দেশের মাধ্যমে এই লাইন নিয়ে যাব, তুরস্ক ইরানের দোসর হয়ে গেল। ইরানের গ্যাসের ভান্ডার অল্প, তাতে রাশিয়ার একচেটিয়া ব্যবসা মার খাবেনা তেমন, তাই রাশিয়া ইরানের পক্ষ নিল। স্বভাবতই দুটো যুযুধান পক্ষ লেগে গেলো ছায়া যুদ্ধে। ইরাক নিয়ে সমস্যা ছিলনা, কারন ২০০১ থেকে বোমা মেরে মেরে তাকে আগেই ধ্বংস করে দেওয়া গেছে, বাদ সাধলো সিরিয়া।
ব্যাস, সিরিয়ার বাসারের কাছে একদিকে কাতারের হয়ে মার্কিন দৌত্য শুরু হয়ে গেল, অন্যদিকে ইরানের হয়ে রাশিয়ান দৌত্য। সুন্নি অধ্যুষিত কাতার চায় সিয়া বাসারের উচ্ছেদ, কারন সে রাশিয়ার পক্ষে সিয়া ইরানকে পাইপলাইন বসাতে অনুমতি দিয়েছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়- কাতারের পাইপলাইন এর মাধ্যমে রাশিয়াকে ইউরোপের গ্যাসের বাজার থেকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে। বিষয়টা ছিল গ্যাসের সাপ্লাই লাইন, পশ্চিমা মিডিয়া বানিয়ে দিল সিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব, সুক্ষ সুচারুভাবে।
শুরু হয়ে গেল সিরিয়ান যুদ্ধ। কাতারের প্রতক্ষ্য সহযোগিতায় মার্কিন সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ISIS নামের মিলিশিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী বাসারকে উচ্ছেদে ধ্বংস যজ্ঞ শুরু করে দিল। আর তাদের ঠেকাতে রাশিয়া ও ইরাণ পালটা অস্ত্রের সাপ্লাই দিলো বাসারকে। কে জিতলো বা কে হেরেছে সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু সিরিয়ান মানুষেরা শেষ হয়ে গেলো। সেই পাইপলাইন আজও কেউ সম্পূর্ণ করতে পারেনি। ইউরোপেও গ্যাসের বাজার থেকে রাশিয়াকে নামাতে পারেনি মার্কিনীরা। আজও গোটা ইউরোপ রাশিয়ার মুখাপেক্ষী গ্যাস সাপ্লাই এর জন্য, মাঝখান থেকে সিরিয়া কবরের দেশে পরিনত হলো।
সুতরাং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া- কেউ মসিহা নয়। গুয়ের এপিঠ-ওপিঠ। তবে বন্ধু হিসাবে মন্দের ভালো রাশিয়া, অন্তত প্রয়োজনের সময় একা ছেড়ে পালায়না।
সুতরাং, সিরিয়া নিয়ে ন্যাটো বা রাশিয়ার এতো যুদ্ধ প্রীতির বিষয়টা নিশ্চই এবারে বোধগম্য হয়েছে পাঠকের। নিজেদের অন্ধ স্বার্থে এরা কেউ সাধারন সিরিয়ান নাগরিকদের কথা ভাবেনি। না পোপ কোনো বিবৃতি দিয়েছে, না পশ্চিমা মিডিয়াতে সিরিয়ান শিশু মহিলাদের দুর্দশার কথা উঠে এসেছিল। বরং তাদের জঙ্গি দাগিয়ে দিয়ে মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ করে ছাড়খার করে গণকরবে পরিনত করে দিয়েছে দেশটাকে।
আজ ইউক্রেন সেটারই মূল্য দিচ্ছে, পাপের সাজা। কাল অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকেও মুল্য চোকাতে হবে, কাওকে দুদিন আগে কাওকে দুদিন পরে। নিয়তির ভবিতব্য এভাবেই সংসারে সাম্যতা বজায় রাখে।
বস্তুত আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, আমেরিকা বা ন্যাটো কিম্বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন কারোরই ইউক্রেনকে বাঁচাবো বা যুদ্ধ বন্ধ হোক- এ নিয়ে নুন্যতম মাথাব্যাথা নেই। কমপ্লিট সিরিয়া প্ল্যান। বরং এই যুদ্ধ থেকে কে কীভাবে লাভবান হতে পারে সেই নিয়ে নিজেদের মাঝে তৎপরতা তুঙ্গে। সকলে হিসাব কষতে ব্যস্ত- স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী লাভের।
জেলেনস্কি দৈনিক নিয়ম করে ন্যাটোকে হাতেপায়ে ধরছে যাতে ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষনা দেয় বা অস্ত্র ও সেনা পাঠায় ন্যাটো সহ পশ্চিমা মিত্ররা। আসলে এর মাধ্যমে দুটো সম্ভাব্যতা খুলে রাখছে কূটনৈতিকভাবে-
১) নো ফ্লাই জোন ঘোষনা মানে সেখানে রাশিয়ান বিমান উড়লেই তাকে গুলি করবে ন্যাটো, অর্থাৎ রাশিয়া ও ন্যাটো সম্মুখ সংঘাত। না ন্যাটো এটা কখনই করবেনা। আমেরিকারও সেই মুরোদ নেই- রাশিয়ার সাথে সম্মুখ সমরে যাবে এই মুহুর্তে।
২) এদিকে ন্যাটো ইউক্রেনকে সাহায্য না করলে রাশিয়ার পায়ে ধরার একটা সম্মানজনক অজুহাত দিতে পারবে জেলেনস্কি।
দ্বিতীয়টি ঘটার সম্ভাবনা ৯৯.৯৯%, এক্ষেত্রে জেলেনস্কিকে ন্যাটোই খুন করে দিয়ে রাশিয়ার নামে দোষ চাপাবে। মার্কিন বিদেশ সচিবের ইঙ্গিতে এটা স্পষ্ট, আসলে ভাঁড় জেলেনস্কিকে চাপে রাখার এটা একটা কৌশলও বটে।
এদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধাচারণ এর প্রেক্ষিতে পোল্যান্ড আগেই বেঁকে বসেছে, রাশিয়ার তেল-কয়লা রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় জার্মানি, নেদারল্যাণ্ড, পোল্যান্ড সহ ১৪টি ন্যাটো তথ্যা ইউরোপীয় দেশ সম্মতি দেয়নি। কারন রাশিয়া ঘোষনা দিয়েছে, তেলে নিষেধাজ্ঞা দিলে তারা গ্যাস বন্ধ করে দেবে। গোটা ইউরোপে অন্ধকারময় এক চরম অরাজকতা সৃষ্টি হবে। শিল্প উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে, কারন ইউরোপের ৩০% কয়লা ও অর্ধেক গ্যাস সাপ্লাই এর একমাত্র উৎস সেই রাশিয়া।।
নেতৃত্বাধীন ইউরোপে এই চুড়ান্ত দৈন্য দশা সৃষ্টি করাই আমেরিকার মূল লক্ষ্য ছিল, এবং তাতে চুড়ান্ত সফল। এবারে ভেনেজুয়েলা ও ইরানের তেল মার্কিন কোম্পানি গুলো চড়া দাবে ইউরোপে বিক্রি করবে এমনটা মার্কিনিদের ধান্দা। কিন্তু রাশিয়াকে টাইট দিতে গিয়ে মার্কিনিরা উলঙ্গ হয়ে গিয়েছে, ইউরো দেখতে ও বুঝতে পারছে- তারা নিজেরাই মার্কিনী লালসার শিকার হয়ে গেছে। মার্কিনী জায়োনিষ্ট মিডিয়ার মিথ্যা সম্প্রচার দিয়েও রাশিয়ার বাজারে বা সাধারণ জনজীবনে তেমন সামান্যতম অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারেনি গত ১৩ দিনের যাবতীয় অবরোধ সত্বেও। উল্টে ইউরোপের জনজীবনে চুড়ান্ত ভয় ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পরেছে, বিশ্ব বাজারে তেল-গ্যাস ক্রমেই মহার্ঘ্য পয়ে পরেছে- যার শিকার বিশ্বের প্রতিটি দেশ।
আসলে, সাবেক সোভিয়েত আমল থেকেই রাশিয়া যে অর্থনীতির প্রাক্টিস করে, সেটা অনেক বেশি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। ইরান, ভেনেজুয়েলা, কিউবা বা চীনের মত মার্কিন বিরোধী প্রায় সকল দেশগুলোতে এমন অর্থনীতির চাষ বহু দিন থেকেই। আমাদের ভারতে ঠিক যেভাবে পেট্রোলিয়াম দ্রব্য বিক্রি হয় ওই সব দেশের সমস্ত অর্থনীতিটাই সেভাবে চলে, একটা কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রাধীন সংস্থা দ্বারা। তাই রাতারাতি কোনো নিষেধাজ্ঞা চালু করে এই সব দেশের সাধারন জনজীবনে সেভাবে কোনো প্রভাব ফেলা যায়না, ফলত রাশিয়াতেও পরেনি। বরং রাশিয়া পশ্চিমাদের মূল প্রোপ্যাগান্ডা অস্ত্র- মিডিয়াকে বন্ধ করে দিয়েছে। CNN, BBC, Facebook, Twiter, Google সহ ডয়েচে ভেলে সহ বহু সংবাদ মাধ্যমকে জাষ্ট তাড়িয়ে দিয়েছে দেশ থেকে। লোক খ্যাপানো বন্ধ রাশিয়াতে, ঠিক যেভাবে গত ১৩ দিন যুদ্ধের আবহে করোনা গায়েব মিডিয়া থেকে, আমাদের স্বাভাবিক জনজীবনেও করোনা গায়েব হয়ে গেছে এই ভরা ফাগুনে।
উলটে মার্কিনীদের ফাঁদে পা দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটো এখন চুড়ান্ত সঙ্কটের সম্মুখীন। একে ইউরোপের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো নেতা নেই, তার উপরে পেট্রোলিয়াম সঙ্কট- রাশিয়াকে প্যাঁচে ফেলতে গিয়ে ইউরোপকে অন্ধকারে ঢোকাবার পাকা প্ল্যানে ঘিরে ফেলেছে মার্কিনীরা।
রাশিয়া অতীত যুদ্ধ কৌশলই হলো- ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করে চিবিয়ে খাওয়া। হিটলারও এই নীতির কাছে তলিয়ে গিয়েছিল, তবু সে অন্তত সম্মুখ সমরে গিয়েছিল। বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু মার্কিনী শক্তি বা নেতৃত্ব, ও দিশাহীন ছন্নছাড়া ইউরোপীয় দেশগুলো তো ‘মুখে মারিতং জগত’ এর মাঝেই সীমাবদ্ধ।
চর্মচক্ষুতে আমরা দেখছি লড়াইটা রাশিয়া ও ইউক্রেনের মাঝে হচ্ছে- আসলে লড়াইটা আমেরিকার প্রতিপত্তির জমি রক্ষার লড়াই। আসলে লড়াইটা ন্যাটোর প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখার লড়াই। আসলে লড়াইটা- বিশ্বের দাদাগিরিতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখা অন্তিম লড়াই।
প্রদীপ নেভার আগে দপ করে শেষ বারের মত জ্বলে উঠে। ইউক্রেন তো ‘বোরে’ মাত্র, মরার জন্যই যাদের জন্ম। আমেরিকা ন্যাটোকে জিইয়ে রেখে ইউরোপের মাথায় বেল ভেঙে দীর্ঘদিন খাওয়ার সিস্টেম চালিয়ে যেতে পারবে কিনা এ যুদ্ধ তার জবাব দেবে।
সবচেয়ে হাস্যকর হলো, আজ মার্কিন বিদেশ সচিব এ্যন্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছে, “ফলাফল যা ই হোক, তাদের কাছে ইউক্রেনই বিজয়ী”। ঘোড়াতেও হাসবে এসব কথায়। আজকের ফেসবুক লাইভের যুগে এই সব চড়া মেলোড্রামা যাত্রাতেও চলেনা সেটা ভুলে গেছে মার্কিনীরা। ২০১১ সালে ইরাক যুদ্ধের ৩ মাসের মধ্যেই বিজয়ী হওয়ার ঘোষণা দিয়েও, ১০ বছর পর লেজে গোবরে হয়ে পালাতে পথ পায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
আমরা এশিয়ানরা, বরাবর পশ্চিমাদের চোখে বাজার হসাবে ছিলাম। আমাদের উপরে এরা সারাবছর যুদ্ধ ভীতি বজায় রেখে অস্ত্র ব্যবসাইয় বিপুল মুনাফা কামিয়েছে। এখন এশিয়া যুদ্ধে যুদ্ধে মোটামুটিভাবে সম্পৃক্ততা অর্জন করেছে।
তবে যে যা খুশি করুক, ইজরায়েল কিন্তু ইউক্রেনীয় ইহুদিদের পুনর্বাসন দেওয়ার জন্য বিমান পাঠিয়ে, দখলকৃত ফিলিস্তিন ভূমিতে ঘর বানিয়ে দিচ্ছে। নিজেদের সংখ্যা বাড়ানোর সামান্যতম সুযোগ ছাড়তে তারা রাজি নয় ইহুদিরা। আর আপনি ভাবছেন- RSS বা জামাতিরাই একমাত্র ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে, এরাই সাম্প্রদায়িক দল। ইজরায়েল বা ইহুদিদের চেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক আর কেউ নেই তার প্রমান আলাদা করে দেওয়ার দরকার নেই এই প্রেক্ষাপটে।
গোটা মধ্যপ্রাচ্যে দুটো দশক জুড়ে পশ্চিমারা হত্যাযজ্ঞ চালালেও পোপের মুখের ছিপি কখনও খোলেনি ভুলক্রমে। অথচ একটা খ্রীষ্টান দেশ আক্রান্ত হতেই রোজ ‘মুখ-পায়ু’ সহ শরীরের সমস্ত ছিদ্রপথ দিয়ে পোপের গোঙানী আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এমনকি পশ্চিমা সাংবাদিকদের অভিবাসন নীতির প্রশ্নে লাইভ টিভিতে- সোনালী চুল, নীল চোখের সপক্ষে যেভাবে বর্ণবাদী মন্তব্য শোনা গেছে ও যাচ্ছে, তাতে তাদের তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক ও আধুনিকতার মুখোশ খসে পরছে।
একটা যুদ্ধ অনেকের মুখোশ খুলে দিয়েছে। একটা যুদ্ধ ভারত-পাকিস্তান-চীনের মত নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করা তিন পরমানু শক্তিধর রাষ্ট্রকে একযোগে মার্কিনীদের বিপক্ষে থাকার শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দেখাতে পেরেছে। ওদিকে তুরস্ক মার্কিনীদের বিরুদ্ধে চলে গেছে ন্যাটোতে থেকেও।
কিন্তু সারাবছর অবরোধ দিয়ে রাখা মাদুরোর ভেনেজুয়েলা কোন মন্ত্রে মার্কিনী ফাঁদে পা দিলো, সেই বিষয়টা বেশ ধোঁয়াসার। অবশ্যই এর জন্য চড়া মুল্য দিতেই হবে যদি তারা মার্কিনীদের সাথে সাথ দেয়। সাপের সাথে ঘর করা গেলেও মার্কিনীদের সাথে যায়না। কারন মার্কিনীরা যাদের বন্ধু, তার শত্রুর দরকার নেই- জেলেনস্কি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এটা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যে তেল অর্থনীতি দিয়ে ডলারকে বিশ্বমুদ্রায় নিয়ে গিয়ে বৈশ্বিক সম্পদ লুন্ঠন করেছে দশকের পর দশক। সেই তেল সঙ্কটই আমেরিকার নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। আসলে আমেরিকা 'অবরোধ-অবরোধ' খেলতে গিয়ে নিজেরাই একটা চক্রব্যুহে আঁটকা পরে গেছে। যেখানে বাঁচতে গেলে দম্ভ ও ভয় টিকিয়ে রাখতে হবে। যেখানে কোনো বন্ধু নেই, স্বার্থই একমাত্র সত্য।
এই যুদ্ধ কতদিন চলবে জানা নেই, তবে নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই যুদ্ধপরিস্থিতি। একটা নতুন নেতৃত্বের হাতে অর্পিত হবে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও সামরিক রাশ। সে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা জোট হোক কিম্বা রাশিয়া কিম্বা তৃতীয় কেউ। চলমান বিশ্বব্যবস্থার এখানেই মোটামুটি ইতি ঘটতে চলেছে যা গত সাত-আট দশক থেকে চলে আসছে।
কালচক্র এখন অস্তাচলের পথে, সে কোনো একটাকে সাথে নিয়েই ডুববে। কে সেই অমিত ক্ষমতাধর শক্তি? রাশিয়া? ন্যাটো? নাকি যুদ্ধবাজ আমেরিকা?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...