পটভূমিকাঃ- দীর্ঘ মধ্যযুগীয় ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যাবে- ইউরোপীয় দেশগুলোর মাঝে যুদ্ধবিবাদ এ এক অতি স্বাভাবিক ঘটনা। তাইতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মাঝের সাতটা দশকে কোনোরকমে নিজেরা সুস্থ থাকার চেষ্টা করে যুদ্ধ, রক্তপাত আর হিংসার সবটা এশিয়া আর আফ্রিকাতে স্থানান্তর করেছিল।
➤ মরালঃ যুদ্ধবাজ শ্বাপদদের চরিত্র বদলায়না।
বর্তমান পরিস্থিতিঃ ক্রুসেডারদের সময় থেকেই তথাকথিত আধুনিক ইউরোপীয়দের যে সাম্প্রদায়িক চরিত্র প্রকাশ পেয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে টিভি গণমাধ্যম গুলোতে সেই ন্যাংটা বর্ণবাদী নিকৃষ্টপনার আবার স্বরূপ দেখা যাচ্ছে প্রতিটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রনেতাদের আচরণ কথাবার্তাতে। খোদ রাষ্ট্রপুঞ্জ তথা জাতিসংঘের প্রধান তথা সাবেক পর্তুগাল প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক তম মন্তব্যের নিরিখে ধরে নেওয়াই যায়- তিনি সাদা চামড়া, নীল চোখের খ্রীষ্টানদের প্রতিনিধি।
আমাদের দেশ কোথায়ঃ- নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর বিপক্ষে গিয়ে ভোটদানে বিরত থাকার কারনে- ভারতের উপরে পশ্চিমা অবরোধ আসতে পারে। কূটনৈতিক ভাবে আমাদের দেশের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ এটা, শ্যাম রাখি না কুল রাখি দশা।
ভাঁড় দিয়ে ভাঁড়ামো চলে, রাষ্ট্র চলেনা। ইউক্রেনের জনগন জান-মাল দিয়ে আজ বুঝছে। আমরা অবশ্য সেই ২০১১/২০১৪ থেকেই রাজ্য-রাষ্ট্রগত ভাবে বুঝে চলেছি, মূল্যও দিচ্ছি।
ইতিহাস বলছে, পশ্চিমা শক্তি জোট ন্যাটো এবং বিশেষকরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটাও যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস নেই। বরং সর্বত্র লেজেগোবরে হয়ে পলায়নের ন্যাক্কারজনক অতীত 'গৌরব' রয়েছে। অতএব, দৃশ্যত রুশপন্থী হওয়াটা আমাদের মত কৃষিভিত্তিক দেশের জন্য সেরা পন্থা। সেক্ষেত্রে চীনের সাথে সম্পর্কের উন্নতি সাধন প্রয়োজন, যা ভাঁড় রাষ্ট্রনেতা দিয়ে হবেনা।
এটা মোটেই আশ্চর্যের নয় যে মধ্যপ্রাচ্যের তথা আরো স্পষ্ট করে বললে ইসলাম অধ্যুষিত দেশগুলো মার্কিনীদের বিপরীতে অবস্থান করে রাশিয়াকে সমর্থন করেছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া তো প্রকাশ্যে রাশিয়াকে সমর্থন দিয়েছে, তুরস্ক ও ইজরায়েল নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেও অবশ্যই রাশিয়া ঘেঁষা। সবচেয়ে আশ্চর্যের হলো- সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারিকে জাষ্ট পাত্তা না দিয়ে রাশিয়ার সাথে পেট্রোলিয়াম চুক্তি বহাল রেখেছে।
এতোটা দুরবস্থা এর আগে মার্কিনীদের শেষ সাত দশকে কখনও হয়নি। শুধু মৌখিক হম্বিতম্বির বাইরে আসল কাজ জাষ্ট শূণ্য।
ইউক্রেন আক্রমণের মধ্যেই ইজরায়েলী রাষ্ট্রনেতা নাফতালি বেনেটের মস্কো সফর- পশ্চিমাদের কপালে ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। এটাকে রাশিয়া এনক্যাশ করবেই।
ইজরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সাম্রাজ্যের দখল নিয়ে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা করবে, যেটা গত ছয় দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করে চলেছে। আর এটা হলেই মার্কিন ও তাদের মিত্রদের শুইয়ে দেওয়া যাবে। এটাই ঘটতে চলেছে সম্ভবত।
ইরাণকে বেশ কিছুটা তোল্লা দেবে পশ্চিমা শক্তি, সম্ভবত পরামানু গবেষণা বিষয়ে ছাড়পত্র দেবে। এতে ইজরায়েলকেও কড়া বার্তা দেওয়া হবে।
সৌদি আরবের সঙ্কট বাড়বে, আমেরিকা অধিক উৎপাদনের জন্য প্রেসার দেবে- ওদিকে ইজরায়েল ও চীনের মদতপুষ্ট রাশিয়াও উলটো চাপ দেবে। খুন হয়ে যেতে পারে সৌদি প্রিন্স মুহাম্মদের বৃদ্ধ পিতা- কিং সালমান।
বিগত দেশ দশকে সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা ছিল। তেল বেচে প্রাপ্ত ডলারের বিনিময়ে আমেরিকা সৌদিকে বিপুল পরিমানে অস্ত্র কিনতে বাধ্য করেছে, যা গিত দেশ দশকে মোট বিক্রিত অস্ত্রের প্রায় 70%. এই বিপুল অস্ত্র হস্তগত বা দখল করতে এখন কে ঝাঁপায় সেটাই দেখার। তুরস্ক সবার আগে থাকবে, বাকি রইলো মিশর, আফগানিস্তান, পাকিস্তান সহ ইরাকি ও সিরিয়ান মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো। মোদ্দাকথা পশ্চিমাদের পোষ্য কুত্তা সৌদি রাজের নিশ্চিন্ত ঘুমের দিন শেষের পর্যায়ে, নিরপরাধ ইয়েমেনীয় নাগরিকেরা যদি এবারে একটু শ্বাস নেওয়ার অধিকার পায়।
রাশিয়া থেকে বিপুল ক্রুড পেট্রোলিয়াম আমদানি করতো ভারত, আরো নির্দিষ্ট করে বললে ইন্ডিয়ান ওয়েল, সেটা সম্ভবত ইরাণ থেকে করবে বা করতেই হবে।
ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে চীনের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ- ইউরোপীয় বাজারের জন্য। তাই কৌশলগত কারনেই রাশিয়ার বিপক্ষে যাবেনা চীন, অন্তত ইউক্রেন প্রশ্নে। উলটে উত্তর কোরিয়ার পাগলাকে লেলিয়ে দিয়ে মার্কিন পুতুল সরকার যুক্ত দক্ষিন কোরিয়া ও জাপানকে অশান্ত রেখে দেবে।
অদূর ভবিষ্যতে NATO জোট ভেঙে যাবেই, কারন তুরষ্ক বেঁকে বসলো বলে- জাষ্ট সময়ের অপেক্ষা। তাছাড়া ইউরোপের তেল-গ্যাসের দাম রাতারাতি চতুর্গুণ বেড়ে আকাশ ছুঁয়েছে, স্বভাবতই মুদ্রাস্ফীতির কবলে পরবে গোটা ইউরোপ। কয়েকটা বড় অর্থনীতির দেশ কোনোমতে সামলালেও নর্ডিক, ইষ্টব্লক ও বাল্টিক দেশগুলোর অর্থনীতি তাসের ঘরের মত ভেঙে পরবে।
ফ্রান্স ও ইতালি আবার আফ্রিকাতে অত্যাচার চালাবে সম্পদ লুঠের জন্য, সুতরাং গোটা আফ্রিকা জুড়ে আবার গৃহযুদ্ধ ভয়াল আকার ধারন করবে। এই সুযোগে সেয়ানে লুন্ঠন করবে।
CIA জাষ্ট ফিনিস, তবে MI6 আবার নব কলেবরে প্রকাশ পাবে।
নেতৃত্বাধীন ইউরোপে সবাই মোড়ল- নিজেদের মাঝে খেয়োখেয়ি চরমে উঠবে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও বাক্যবাণের ফাঁপা বেলুন ফোলানো ছাড়া কারো কিচ্ছুটি করার মুরোদ নেই আক্ষরিক অর্থে। ভোগবাদী ন্যাংটা সমাজব্যবস্থার চরম দৈন পরিনতি দেখছে ও দেখবে তৃতীয় বিশ্ব।
রাশিয়ার ক্রিমিয়া বা ইউক্রেন দখল, চীনের তাইওয়ান দখল সহ নানা দেশের দখলনীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে- তুরস্ক তাদের অটোমান আমলের মত মক্কা-মদিনার দখল নিতে চাইবেই, তাদের উপরে থাকা লুসার্ণ চুক্তি উঠে গেলে। ন্যাটো সহ পশ্চিমাদের উভয় সঙ্কট হলেও- যেহেতু দুটোই মুসলমান অধ্যুষিত দেশ- তাই তারা এটাকে অস্ত্রের বাজার হিসাবেই দেখবে।
ক্রমবর্ধমান ইজরায়েলি আগ্রাসনের ফলে ফিলিস্তিনের কতটুকু কি বাঁচবে বলা মুশকিল। তবে সৌদিতে পট পরিবর্তন হলে ইজরায়েল থামতে বাধ্য। এক্ষেত্রে ইরান-ইজরায়েল আজকের বৈরিতা সেদিন থাকবেনা, তারা মিত্র হয়ে উঠবে এলাকার দখলদারিত্ব করতে।
এদিকে আফগানিস্তান আবার তালিবানের মুক্তাঞ্চল, যাদের কাছে বিপুল পরিমানে মার্কিন অস্ত্র রয়েছে যেগুলো তারা ইচ্ছাকৃত ফেলে রেখে গিয়েছে। এগুলোর অপব্যবহার কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধেই হবে। হতেই পারে এই লাভ ফিলিস্তিন পাবে- আর সাজা পাবে সৌদি।
মার্কিন ডলারের বিপক্ষে বিশ্ব মুদ্রা হিসাবে 'Yuan' কে তুলে ধরার প্রচেষ্টা হবে যতদিন না ইজরায়েল তাদের One Order World এর অংশ হিসাবে কোনো বৈশ্বিক মুদ্রা বাজারে নিয়ে আসছে।
বিশ্বযুদ্ধ বা পরমানুযুদ্ধ কোনোটাই হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে- অন্তত দুটো খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী দেশের মাঝে। একটা মুসলমান অধ্যুষিত দেশ না থাকা কালীন বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা সেভাবে নেই। তুরস্কের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধ ঘটতে পারে।
ভূমধ্যসাগরের কতৃত্বপূর্ণ দখলদারিত্ব নিয়ে তুরস্কের সাথে ন্যাটো ও রাশিয়ার সাথে একযোগে বিবাদ লাগবে। এবং তুরস্ক এই দুই এর হামলার স্বীকার হয়ে ছাড় খার হয়ে যেতে পারে- যার প্রভাব ভীষণভাবে পরবে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
অদূর ভবিষ্যতে হয় রাশিয়া নিশ্চিহ্ন হবে ইউরোপের মানচিত্র থেকে যেমন সোভিয়েত নিশ্চিহ্ন হয়ে 15টা আলাদা মানচিত্র জন্মেছিল। অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে 50টা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। এক্ষেত্রেও ইউরোপের মানচিত্র বদলে যাবে, রাশিয়া সাবেক সোভিয়েতের অংশগুলোকে দখল করবে।
➤বর্তমান যা পরিস্থিতি, তাতে দ্বিতীয়টার সম্ভাবনা 95%
ভারত তথা সাবেক কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর ব্যাঙ্কিং সিস্টেম এক্ষেত্রে ভেঙে পরবে। যেহেতু এই দেশগুলোর সেন্ট্রাল রিজার্ভ- পেট্রোডলার, তাই মুদ্রার মান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরে না যাওয়াটাই আশ্চর্যের।
➤ এক্ষেত্রে চাষী, শ্রমিক, মুটে মজদুরদের তেমন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা না হলেও, যারা অর্থ মজুদ রেখেছে ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে- সেই অর্থগুলো শুধু সংখ্যা হয়ে যাবে।
এগুলো সবই সম্ভাবনা ও ব্যক্তিগত মতামত মাত্র।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন