বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ এটা সমাজের একটা অংশের বিরুদ্ধে খাপ বসানো, যাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
মাঝে মাঝে বড্ড আত্মশ্লাঘায় ভুগি আমাদের এই জাতিটার জন্য, হলোটা কি আমাদের!
ভ্রমণ শিল্পের সাথে যুক্ত
থাকার সুবাদে ভারতের প্রায় প্রতিটা প্রদেশের মানুষেরই সাথেই প্রতক্ষ্যভাবে
যোগাযোগের সুযোগ নিয়মিতভাবে ঘটে। এছাড়া বাংলাদেশ, নেপাল, এবং ইংল্যান্ড
সহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশের নাগরিকদের
সাথেও আলাপচারিতা হয় নিয়মিত অবসরে।
হলফ করে বলতে পারি- ধাপ্পাবাজি করা, কীভাবে ফাঁকি দিয়ে আর্থিক লাভবান হবো, কীভাবে তথ্য গোপন করে ‘বিনা মাশুল’ এর অনৈতিক মুনাফা নেবো- এই মানসিকতা সবচেয়ে বেশী ভারতীয় বাঙালীদের
মধ্যে, আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে-
গোটা মধ্যবিত্ত সমাজের মহিলাদের মধ্যে। অবশ্য এটার জন্য আমার এই পোষ্ট দিয়ে সেটা
প্রমান করার কিছু নেই- ৫০০ টাকার লক্ষীর ভান্ডারের জন্য যে জাতি হত্যে দিয়ে লাইনে
পরে থাকাতে পারে, তারা এই
চিটিংবাজি করবেনা তো কারা করবে। বিনামূল্যে পাওয়াটা তো জন্মগত অধিকার ভেবে নিয়েছেন
অনেকেই।
সস্তার জন্য দর কষাকষি করাটা অন্যায় নয় বরং এটা উপভোক্তার অধিকার। বাজেট অনুযায়ী গোটা ভ্রমণকে একটা
সুষ্ঠু পরিকল্পনা দিতে- দামদস্তুর করাটা অতি স্বাভাবিক বিষয়। আমরা সারাদিনে যে
পরিমান ফোন বা মেসেজ পায়- তার ৩০%ও যদি ফাইনাল হয়, আমাদের
রেভিনিউ তাজ হোটেল গোষ্ঠীকেও ছাপিয়ে যাবে, আমাদের সাফল্যের হার মাত্র ৩-৪ % কখনও একটু বেশী, অত্যন্ত সফল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সেটা কখনই ১০% এর
উপরে নয়। আর এটাই স্বাভাবিক।
গ্রাহক দামদড় জিজ্ঞাসাবাদ করবেই, তার পোষালে বা পছন্দ হলে, ভরসা পেলে তিনি নেবে না হলে নেবেনা। আমি দোকান খুলে বসে আছি মানে দাম বলতে বাধ্য, এটাই ন্যায্য অনুশীলন। এখানে বিরক্তি বা অধৈর্য্যের
নুন্যতম জাইগা নেই। তাবলে কেউ চালাকি করে অন্যায্য লাভ পেতে গেলে তাকে সমুচিত জবাব
দেওয়াও ন্যায্য অনুশীলনেরই অঙ্গ বলে আমি বিশ্বাস করি।
সম্প্রতি এক ভদ্রমহিলা নিজেকে একটা স্কুলের শিক্ষিকা হিসাবে পরিচয় দিয়ে- শুরু
থেকেই ফোনে হিন্দিতে কথা বলছিলেন, যদিও আমি বাংলাতেই কথোপকথন চালিয়ে গেছি, উনার হিন্দি কষ্ট করে উচ্চারিত ও বাংলা উচ্চারণশৈলী যুক্ত, তবুও হিন্দিতেই চালিয়েই গেলেন আত্মবিশ্বাসের সাথে। মেসেজেও প্রথমে হিন্দি
ও পরে ইংরেজি ও তারও পরে রোমান হরফে বাংরেজিতে আলাপচারিতা চালিয়ে গেলেন।
ওনারা মোট কতজন আছে উনি কিছুতেই বলবেননা, শুধু ওনার ডাবল এ্যাকোমোডেশন বেডরুম হলেই হবে সেটাই জানালেন ফোনে বা মেসেজে
লিখিত।
সমস্যা হয়- বাচ্চাদের বয়স না জানলে খাটে হবে কিনা সেটা নিয়ে; শীতের দেশ-
এক্সট্রা বালিশ - কুইল্টের বিষয় আছে। খাবার দাবারের পরিমানের বিষয় আছে। পাহাড়ে জল
কেনা,
তার খরচা আছে। সুতরাং সাথে বাচ্চা আছে কিনা বা
থাকলে কত বছর বয়সের সেটা জানা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক।
বড়দের থেকে বাচ্চাদের নিয়ে ঝামেলা সবচেয়ে বেশী, এটা আমাদের মত হোটেলিয়ার বা ট্রাভেল কোম্পানি চালানো
মানুষেরা কমবেশী সকলেই জানি। বাচ্চা বলে তো আর তাকে ডিম বা মাছের পিস কেটে আর্ধেক
দেওয়া যায়না, মাংসও ১ পিস দেওয়া যাবেনা। বাচ্চা খায় কম নষ্ট করে বেশী, প্রসঙ্গত- আজকালকার বাবা মায়েরা কখনও আক্ষেপ করেনা বাচ্চার দরুন নষ্ট হওয়া খাবারের জন্য।
প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বাচ্চাদের পরিষেবা বেশী দিতে হয়। গরম জল দাও বারে
বারে,
প্রেসারকুকারে গলানো খাবার দাও, ঝাল ছাড়া তরকারী দাও ইত্যাদি সহ নানান গল্পকাহিনী থাকে।
এগুলো করতে তো খরচা লাগে, কিন্তু অধিকাংশ
বাঙলী বাবা মা বাচ্চার খাবারকে হিসাবেই ধরেনা- ও তো আমাদের পাতেই খেয়ে নেবে। আমরা
পালটা শুধাতে পারিনা- ঐ পাতে খেয়ে নেবার খাবারের দামটা তাহলে দেবেননা? কিম্বা বাচ্চার জন্য গাড়িতে সিট দরকার, কোলে কেউ আনেনা বা সেটা সম্ভবও নয়- কিন্তু তার জন্য
অর্থব্যয় করতে নারাজ।
এছাড়াও, রুমের বিছানায় খাবার ফেলে বিছানা
বালিস কম্বল নষ্ট করা, অর্ধেক সময় যা
আর ব্যবহারের যোগ্য থাকেনা, হলুদের ছোপ পরে যায়। বমি বা পায়খানা করা, রুমে দেওয়ালে আঁকিবুঁকি, পর্দা ছেঁড়া, বাথরুমের কল নষ্ট করা, বেসিনে বমি করে নালি বন্ধ করা, কমোডে ন্যাপকিন ফেলে পয়ঃপ্রনালী
জ্যাম করা নিত্য দিনের ঘটনা। টিভি বা ইলেকট্রনিক গেজেট নষ্ট এগুলোও আছেই।
তাবলে কী বাচ্চা আসবেনা? অবশ্যই আসবে, সবটা নিয়েই তো একটা ফ্যামিলি। বাচ্চা আমার আপনার প্রতিজনের ঘরেই আছে।
বাচ্চার জন্য পরিষেবা সবটা নেবো, শুধু তার জন্য
কোনো অর্থ খরচা করবোনা- এটা নিকৃষ্ট ধরণের নোংরামি। আমার বাচ্চা ক্ষয়ক্ষতি করলে সেটা আমাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, আমার বাচ্চা কেন হোটেলওয়ালার টাকায় খাবে?
অথচ এই টুরিষ্টরা রেলকে বা বিমান কোম্পানিকে কেউ শুধায়না ১৩ বছরের বাচ্চার জন্য কেন টিকিট
নেবেন? চকোলেটের দোকানে বা দুধের দোকানে
কেউ বাহানা জোড়েনা- এ তো বাচ্চায় খাবে, কেন দাম নেবেন!
বাচ্চা বাড়িতে বাবামায়ের পাতে যে খাবারটা খায়, সেই চাল, ডাল, আটা, সব্জি বা মাংসটা
কী দোকানদার ফ্রিতে দিয়েছিলো বাচ্চার
জন্য? স্কুলবাসের সিটের জন্য কিন্তু
এনারাই পুরো পয়সা দেয়, সেখানে বলেনা-
বাচ্চার বসার জাইগার জন্য আবার পয়সা নেবেন? বাচ্চার জামাকাপর কী কেউ ফ্রিতে
দেয় বাচ্চার বাপমায়ের কাপড় কিনলে?
এরাই ঘুরতে এলে যেনতেন প্রকারে বাচ্চাটার ভ্রমণের জন্য পয়সা না দেবার- সব
ধরনের অপচেষ্টা করবেই, সেটা যত নিকৃষ্টই হোকনা কেন; কিছু সফল হয়, অধিকাংশ হয়না। কিন্তু চেষ্টার ঘাটতি থাকেনা মধ্যবিত্ত বাঙালী মায়ের। ভাবখানা
এমন- যেন বাচ্চাটার যাবতীয় আর্থিক দায়ভার হোটেলের বা ট্রাভেল এজেন্সির। কিম্বা আমরা বেড়াতে এসে হোটেলিয়ার বা
ট্রাভেল এজেন্সির উপরে দয়া করেছি, তাই বাচ্চার কোনো দায়িত্ব আর অভিভাবকের নয়।
কিছুজন অসাধারণ নির্লিপ্ততা সহ আশ্চর্যের সপ্তমাকাশে চড়ে বিহ্বল হয়ে শুধান-
বাচ্চার খরচাও লাগবে? আচ্ছা, আমাকে বলুন- বাচ্চাটাকে দুনিয়াতে আনা ইস্তক আপনার ব্যয় রোজই
বেড়ে চলেছে পাল্লা দিয়ে। দৈনন্দিন জীবনে কোনটা ফ্রিতে পান বাচ্চার অজুহাতে? কোথায় তার জন্য খরচা লাগেনা, যে ভ্রমণে গেলে ট্রাভেল এজেন্ট বা হোটেলওয়ালা বাচ্চার খরচের কথা বললে- আকাশ থেকে পরেন? অবশ্য হাতে বাটি নিয়ে অনেকেই বাচ্চার অজুহাতে
মাধুকরীবৃত্তি করে- সেটা হলে আলাদা।
সত্য বলতে ৯৯% হোটেলিয়ার ৪-৫ বছরের বাচ্চার কোনো খরচা নেয়না, কিন্তু ৬ বছরের উপরে গেলে খাবারের দরুন একটা খরচা যোগ
করে যেটা একটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অর্ধেক খরচা বা তারও কম। তবে ৯-১০ বছরের বা
তার বেশী হলে খাবারের খরচা পুরোটাই লাগে, ১২ বছরের বাচ্চার জন্য লজিং এর খরচাও লাগে বৈকি।
উপরোক্ত ভদ্রমহিলা মোনোভাবেই বলবেননা কতজন আছেন। শেষে
আমি আর এন্টারটেইন না করাতে উনি বললেন “হাজব্যান্ড ওয়াইফ
এন্ড কিড”। কজন কিড আর কতবছরের কিড সেটাও বলবেননা- প্রায়
৭ দিন পর জানালেন। ১৫ বছরের কিড। মেসেজ করতেই পুরো সত্যটা জানা গেল, ৩টে বাচ্চার মধ্যে ১টি পূর্ণ এডাল্ট ও ২ জনের জন্য
আধা-আধা করে একজন পূর্ণ বয়সের খরচা যুক্ত হবে। অর্থাৎ ২ জনের ৫-৬ দিনের খরচা মোটামুটি ১৫-২০ হাজারের কমে হবেনা কোনোভাবেই। সেটাকেই ইনি চেপে গিয়ে বুকিং করতে সচেষ্ট ছিলেন।
বাইচান্স এমন নোংরা গেষ্ট চলে এলে কী হয়? এনারা আসা ইস্তক সপ্তম মুডে থাকে, মানে অফেন্স ইজ দ্য বেষ্ট ডিফেন্স। হোটেলিয়ার কিছু বলবে কি, গেষ্ট শুরুটাই এমন রেঞ্জে করে- যেন মধ্যযুগীয়
ক্রীতদাসদের উপরে জমিদারের আচরণ। মোদ্দা কথা- বাচ্চাদের লুকিয়ে যাওয়াটা যেন কথোপকথনের মধ্যেই না আসে চেক-আউটের আগে অবধি।
হোটেল ওয়ালারাও বদমায়েশি শুরু করে, নিম্নমানের রুম দেয়, খাবারের মান
কমিয়ে দেয়। মানে টুরিস্ট ৪ জনের
হিসাবে পেমেন্ট করেছেন বা করবেন, কিন্তু ৪ জনের বদলে
৬ জনে খাবে। স্বভাবতই ৪ জনের জন্য
প্রদেয় অর্থতেই ৬ জনের জন্য বানিয়ে দেওয়া হয়, তাতে যেমনটা হওয়া উচিৎ তেমনই হবে পরিমান
ও মানের নিরিখে।
আর তখনই আসে- আমি কেন ছবিতে দেখানো রুম পেলামনা? কেন প্রতিশ্রুতি মত পরিষেবা পেলামনা! অথচ এরা কোথাও উল্লেখ করবেনা, ৬ জন বলে আন্ডা বাচ্চা সহ ১১ জন হাজির হয়েছি। অনেকে আবার
পার্সোনাল ড্রাইভার বা বাচ্চাধরার জন্য maid নিয়ে আসেন, যাদের উপস্থিতি
একমাত্র জানা যায়- এসে পৌছাবার পর। এদের জন্যও গেষ্ট কোনো ধরনের অর্থ দিতে রাজী
থাকেনা সিংহভাগ ক্ষেত্রে।
সুতরাং, অবধারিত একটা ক্যাঁচালময়
পরিস্থিতি উদ্ভুত হয়। হোলেটিয়ার কেন সে থাকা খাওয়ার দাম ছাড়বে ২ জনের, এরাও দেবেনা। অনেক ক্ষেত্রেই থানা পুলিশে দৌড়ায়।
এবারে এনারা ঘরে ফিরে, সোস্যালমিডিয়াতে
ইয়া লম্বা লম্বা পোষ্ট দিয়ে হোটেল, গাড়ি বা ট্রাভেল এজেন্টের নামে খাপ বসিয়ে বিকৃতকাম মস্তিষ্ককে আরেকটু
পুষ্টি দেয়।
আবারও বলি, বাঙালী ছাড়া এই
রোগ অন্য প্রদেশের গরীবস্য গরীবদের মাঝে যেটা দেখা যায়, সেটা শতাংশের বিচারে ১ অঙ্কেই থাকে।
আফশোস হয়- পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীর এই অংশটার জন্য।