কোনো এক অজানা কারনে হঠাৎ করে ভাবনাস্থল গর্ভবতী হওয়ার কারনে অক্ষরের রূপে প্রসবিত কিছু প্রলাপের সংকলন এই ঠেক। গুনী লেখকের সমৃদ্ধশালী লেখনি পড়তে পড়তে, অক্ষমের প্রয়াসে কম্পিউটারের কিবোর্ডে হাত চলে যায়। ফল স্বরূপ, ঘটে চলা রাজনীতি, সমকাল, মানবিক বিকার, সময়চর্চা, ছ্যাঁচোর এর মত রিকেটগ্রস্থ লেখনীর জন্ম হয়। এরই রেশ ধরে সময়চর্চা, রবিবাসরীয়, সমকাল সহ রম্য, রচনা, গল্প ইত্যাদি ভুলভাল গুলোকে সংরক্ষিত করা হয়েছে এই টোলে। এটা সমমনষ্ক মানুষদের ভাব বিনিময়ের স্থান। উন্মাদের টোলে সকলকে স্বাগতম জানাই।
শুক্রবার, ১৬ জুন, ২০১৭
শুভেচ্ছা বাংলাদেশ।
তোমাদের বোলারা নি:সন্দেহে বিশ্বমানের। সাকিব, মুস্তাফিজুররা
ভাল সঙ্গত পেলে কি করতে পারে IPL বড় প্রমান। দু একজন ব্যাটসম্যানও
তাই। ফিল্ডিং অনেক উন্নত ও বেশ ভাল কিছু অলরাউন্ডার রয়েছে।
বড় কষ্ট হয়, ওদের কিছু ছোটলোক সাপোর্টারেরা অশ্লীলতা শুরু করে।
নাচনকোঁদন দেখে ঝাঁট জ্বলে যায় আর কি।
সুতরাং, সেই ভাষাতে বাধ্য হলেও খিল্লি করতেই হয়। কারন
জাত্যভিমান ও ক্রিকেটীয় গর্ব আমাদেরও কিছু কম নেই। ম্যাচ শেষ খিল্লি শেষ।
তবুও বলব-
সাবাস বাংলাদেশ। অষ্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ড ওয়েষ্ট ইন্ডিজের মত কুলীন
দল গুলোকে টপকে শেষ চারে থাকাটা গর্বের বইকি।
বেষ্ট অফ লাক।
শুক্রবার, ৯ জুন, ২০১৭
।। কালিম্পং ভ্রমণ - ১ ।।
চলতে চলতে
পঞ্চম পর্ব-১
..................
"স্যারজি, ই তো হামারা হোটেল নাই হেই, ঘর আছে। থোরা এডজাষ্ট কিজিয়ে, আপ মেহমান হ্যায়
হামারা, কাষ্টমার নেহি"
খানিকক্ষন
আগে মনোসভাই যখন ডিনার সার্ভ করতে করতে কথাগুলো বলছিল, তখন
একবারের জন্যও মনে হয়নি এই মানুশটি আমার আত্মীয় নন। অদুরেই রান্নাঘরে ওনার স্ত্রী
দাঁড়িয়ে, স্টাটারের সাবুর বড় পাঁপড়ে কামর দিয়ে চোখাচোখি হতেই
দেখি, তাঁরও নির্বাক চোখে সেই একই কথার জোরালো প্রতিধ্বনি।
এই
প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড় সুলভ কঠিন পেটানো চেহারা ও মুখমন্ডলে যতটা সম্ভব
হাসি আর উজ্জ্বল্য আনা যায়, তার চেয়েও একটু বেশি এনে, সত্যিই
এনারা যেন মেয়ের শ্বশুরবাড়ির কুটুম্ব সদৃশ্য খাতিরতোয়াজ করছেন। বসুধৈব কুটুম্বকমের
সাক্ষাৎ বিজ্ঞাপন, এটাই ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া, আমার স্বদেশ আমার বাংলা।
গতকাল
যখন শিয়ালদা থেকে ট্রেনটা দুপুরে ছাড়ল, গনগনে জৈষ্ঠ্যের বেলা তখন
গামছা নিচরানোর মত গতর থেকে ঘাম বের করে চলেছে। চালু টিকিটে ট্রেনে উঠে ভ্রমণ এ
আমাদের ভবঘুরে বন্ধু কজনের অনেক দিনের রোগ। যথারীতি টিটিকে ম্যানেজ করা গেল।
খাগড়াতে এসে স্থায়ী একটা সিট পাওয়ার আগে পর্যন্ত বেদের দলের মত কাঁধে রুকস্যাক আর
হাতের ঝোলা ব্যাগ নিয়ে আর্ধেক ট্রেন চষে ফেললাম। পিঠের ব্যাগে সেই চিরাচরিতভাবে
নির্দিষ্ট কিছু জরুরী জিনিস। আর হাতের ঝোলাতে মায়ের গুছিয়ে দেওয়া ভাতের টিফিন,
তরকারির কৌটো আর জলের জার। কে ওনাকে বোঝাবে যে আজকাল অনলাইনে রাস্তা
জুড়েই খাবার পাওয়া যায়, আর জল? অন্তত
শখানেক হকার বোধহয় 'ঠাণ্ডাপানি" বিক্রি করে চলেছে।
সিটটা
জুটলো ৭১ নং এ বাথরুমের এক্কেবারে কাছেই। বসেই যেতে হবে গোটা রাস্তাটা, আরেকজনের
সাথে। তিনি মাঝবয়সী কোচবিহারী মহিলা, সাথে একটি কিশোর ছেলে ও
স্বামী। উল্টোদিকে ৬ টা সিট গোটাটাই আলিপুরদুয়ারের একটা পরিবারের দখলে, সাথে একটা কচি বাচ্চা। ব্যাগপত্তর সিটের নিচে চালান দিয়ে টিশার্ট টা খুলে
বসেবসে যেই গা টা এলিয়ে দিয়েছি, ওমনি নিদ্রাদেবী ঢুলুনির
প্রোমো চালিয়ে দিয়েছে।
কতক্ষন
পর জানিনা,
বাঁজখাই গলায় 'উঠুনতো মশাই' আওয়াজ সহ কাঁধে একটা মৃদু ধাক্কা অনুভুত হতেই, মেজাজটা
চিড়বিড়িয়ে গেল। কাঁচা ঘুম ভাঙলে যা হয় আর কি। শকুনিমামা স্টাইলে একটা চোখ খুলেই
মুখ ফসকে যথারীতি খাঁটি বাংলা উবাচ নির্গত হল- ধুর ওয়ারা, খোঁচাচ্চেন
কেনে!!
-কি, আমাকে খিস্তি? টিটি কোথায়
টিটি, টিটি.... পুলিশ...
- কি কেলো, আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম, কি কেলো হল?
ব্যাগ গুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখলাম, ওরা
এই ঝামেলার আঁচ পাইনি, শান্তিতেই ঘুমাচ্ছে।
- আপনি জানেন আমি কে? অভদ্র চুয়ার....
এবারে একটু হাসিই পেয়ে গেল, বললাম-
- আপনার পরিচয় পেয়ে পেয়ে ভালই লাগল। তা বলুন কি সাহায্য করতে পারি!
- ওঠ আমার সিট থেকে, আমাকে কিনা খিস্তি! উঠ
আমার সিট থেকে
পাশ
থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, আহা মাস্টারমশাই অপেক্ষা
করুন, এই জাতের লোকজনে আজকাল দেশ ছেয়ে গেছে, আমি রেলের হেল্পলাইনে কল করে দিয়েছি, পুলিশ এলো বলে।
উল্টোদিক থেকে একজন মহিলা বলে উঠলেন ক্ষ্যাপা পাগল নয়ত আবার! কেজানে বাবা
ভদ্রলোকের মতই কাপড় জামা... আরো বহুকিছু বলছিলেন।
মজাটা হল এর পর, আমি কানে হেডফোন লাগিয়ে আবার
চক্ষু মুদিতেই, ওদের আক্রোশ ফেটে পড়ল। পুরুষটি পুলিশ খুঁজতে
গেছে, মহিলাগুলো রীতিমত উচ্চশ্রবে চেঁচিয়ে আমার চোদ্দগুষ্ঠি
উদ্ধার করার দরুন কম্পার্টমেন্ট মাথায় তুলে বকি যাত্রিদের বিনোদন যোগাচ্ছেন। আমিও
আজন্ম বেয়াড়া ত্যাঁদড়, শিব সেজে জানালাপানে মুখ করে বসে আছি,
কারণ টিটি বাবাজী স্বয়ং নিয়মমাফিক চালান কেটে আমার সিট কনফার্ম করে
এখানে বসিয়েছেন। তাই সে ব্যাটা না আসা পর্যন্ত এই বান্দর বন্দর ছেড়ে নড়ছেনা।
গাড়ি
নিউ ফারাক্কা স্টেশনে পৌছাতেই কিছু হকার উঠল, এক ঝালমুড়ি ওয়ালার থেকে
আমতেল মিশ্রিত ঝালমুড়ি আমেজ নিয়ে খাওয়া দেখে ওই ঝিমিয়ে যাওয়া মহিলারা আবার নতুন
উদ্যোমে সিরিয়াল শুরু করেদিলেন। ট্রেন এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকঠাকই চলছিল, এখানে প্রায় টানা ২৮ মিনিট পর হুইসেল দিয়ে চাকা গড়াতেই দেখি সেই ভদ্রলোক
গোটা দুই RPF আর খান তিনেক TTE নিয়ে
হাজির আমাকে সবক শেখাতে। তারপরে সব কিছু চেকচাক করে কিছু না বলেই এক RPF বাবু আচমকা সেই "আমি কে জানিস" ভদ্রলোকের গালে সটান চড়।
ফারাক্কা ব্রিজের ঝনঝনা আওয়াজকে ছাপিয়ে পুরো ইয়র্করের মত সকলের কানের পাতায় ধাক্কা
খেয়ে বগিময় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সেই সুমিষ্ট আওয়াজ।
যেটা
জানলাম,
ওই ভদ্রলোকেরও ৭১ নং সিট, কিন্তু S5, আর এটা S4। আর যেটা
বুঝলাম যে,
হামবড়া ব্যাক্তিটি নির্ঘাত এতো পরিমাণ হম্বিতম্বি করে এনাদেরকে
এনেছিল, সেটারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এই ঊনআশি শিক্কার চড়।
মহিলাগুলো হঠাৎ করেই যেন লজ্জাবতী লতার মত কেমন নেতিয়ে গিয়ে সঙ্গী বীর পুরুষটির
প্রতি কটাক্ষপাত করতে লাগলেন। যথারীতি রাত নটার কাঁটা পার হতেই ট্রেন মালদা টাউনে
ঢুকলো। অতএব খাওয়াদাওয়া শুরু, ৫-৭ মিনিটেই আমার পর্ব শেষ হয়ে
গেল। এদিকে সামনের সেই বৃহদ পরিবারে আরো বেশ কিছু সদস্য জুটেছে খাবার সময়ে,
যারা হয়ত এদিকওদিক ছিটিয়েছড়িয়ে বসেছিল।
মজাটা
আরো দীর্ঘায়িত হল এবারে; মালদা স্টেশন এক্কেবারে হকার শুন্য। বন্ধু Debesh
নিশ্চই আসল কারনটা বলতে পারবে। অতএব জলওয়ালারা ট্রেন থেকে হাপিস।
এদিকে ওই পরিবারের সঞ্চিত জল শেষ। সেই মাঝবয়েসী ভদ্রমহিলা আমাকে অমন একটা পঞ্চাশের
দশক মার্কা বেঢপ জারে করে জল বইতে দেখে বেশ মুখ টিপে হেসেছিলেন, তার মাথাতেই এলো কথাটা।
- বলছিলাম কি দাদাভাই, জল আছে?
জল বলে জল! সেই অবাক জলপানের মত, চোখের জল
নাকের জল, ঘামের জল, ট্রেনের ট্যাঙ্কির
জল... কত জল চাই! নাহ এ কথাগুলো শুধু ভেবেছি, ওনাদের বলিনি।
যেটা বললাম সেটা হল-
- কেন থাকবেনা জল!! আছে তো। বলেই আমিও জারটা ব্যাগ থেকে বেড় করে
দিলাম। এমনিতেই NJP তে ফেলেই দিলাম, যাক
সৎকারে লেগে গেল।
- জলে কি সুগন্ধী দেওয়া আছে দাদা?
আমি
শুনেও অগ্রাহ্য করলাম কথাটা, কারন জানি ওটা আমার মায়ের কীর্তি। উনি
যে, ১০০ লেবুর শক্তি সম্পন্ন ভিম লিকুইড দিয়ে জারটি পরিষ্কার
করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যথারীতি প্রায় নিরুপদ্রবেই
বাকি পথটা অতিক্রম করে, ভোর শোয়া তিনটের সময় নিউ জলপাইগুড়ি
স্টেশনে নেমে এক কাপ চা-পান করে ঘুম তারালাম।
মনের
সুখে একটা মান্নাদের গান গুনগুন করতে করতে দীর্ঘ ফুট ওভারব্রিজ বেয়ে বাইরে ট্যক্সি
স্ট্যান্ডে এসেই বাজটা পড়ল। একটা গাড়িও পাহাড়ে যাবেনা, গুরুঙ
এর নাকি পুরকি আবার চেগেছে। স্বয়ং বড়লাট (স্ত্রীলিঙ্গে পড়ুন) পাহাড়ে অধিষ্ঠান
করছেন ভাইগুলোকে (কি জানি কিসের ভাই!!) নিয়ে, অতএব একটা
হেব্বি থ্রিলিং। অধিকাংশ পর্যটকের দল ডুয়ার্স, গ্যাঙটক,
নেপাল ভুটানের দিকে রওনা দেবে বলে সেই মাঝরাত্রে ডিসিসন নিয়ে অনলাইনে
হোটেল খুঁজে বেড়াচ্ছে।
অনেক
উঁচু থেকে ঠিকরে পরা সাদা আলোতে ধুয়ে দেওয়া হেরিটেজ রেল ইঞ্জিনের কাছে বসে খান
দুয়েক সিগারেটের মুখাগ্নি করে ভাবতে লাগলাম-
যাব্বো
কি যাবো না!!!
........ক্রমশ
বৃহস্পতিবার, ৮ জুন, ২০১৭
।। নদিয়া ২ বর্ধমান ।।
নিরুপায় দশা মাঝামাঝেই চর্ম চক্ষুর
সাথে সাথে মনের চোখও খুলে দেয়। নাহলে এই ভরা জ্যৈষ্ঠের গ্রীষ্মে কেনই বা বাইক নিয়ে
সফরের ভূত মাথায় উঠবে। প্রান্তিক নদীয়া থেকে যাব আধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলা সদর
বর্ধমানে, মিহিদানার শহর বর্ধমান। গ্রামীণ বর্ধমানের গ্রামাঞ্চলের প্রবাদ
“ধান-আগুরি-মুসলমান , তিন নিয়ে বর্ধমান”। কথাটা যে কতটা সত্যে, সেটা একমাত্র এসেই
উপলব্ধি করতে হবে। অবশ্য বর্ধমানকে সাবেক বাম আন্দোলনের আতুর ঘর বললেও অত্যুক্তি
হয়না। গতমাসে আমাদের পিসিমনি বর্ধমানের লেজ কেটে দিয়েছে, শিল্পাঞ্চল আলাদা, বাকিটা
গ্রামীণ।
গ্যারাজে আমার বুলেট বাবাজি স্টার্ট
নিলেননা সকালসকাল, অবশ্য সুইচ টিপেই চেষ্টাটা করছিলাম। মেন গেটের বাইরে ঠেলে এনে
লাগালাম কিক, এ কি আর যার তার কম্ম! গতরাত্রের ঝড়-বৃষ্টির স্যাঁতসেঁতে পনাতে
সম্ভবত ব্যাটারি চার্য ছেরে দিয়েছে। যাই হোক বার পাঁচেকের চেষ্টায় ৫০০ সিসি এর
ইঞ্জিন গগনভেদি চিৎকার করে জানান দিল, সে ছোটার জন্য প্রস্তুত। পিঠে হালফ্যাসানের
একটা ব্যাকপ্যাক; তাতে একটা গামছা, একটা লুঙ্গি, পাতলা টিশার্ট, ডেলি ব্যবহারের
টয়লেট এক্সেসারিজ, পানীয় জলের, আধুনা মোবাইলের পাওয়ার ব্যাকআপ, একটা বোতল আর দুটো
বিস্কুটের প্যাকেট একটা খোপে থাকেই থাকে। বাকিগুলোতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে গন্তব্যে
যাচ্ছি, তার মানানের কাগজপত্র ফাইল ইত্যাদি। আমার কাছের দুটো পাওয়ার ব্যাকআপই
জয়দার দেওয়া। এমাসের বাক্সপ্যাটরাতে নতুন সংযোজন বলতে একটা বিগসপার সাইজের ঢাউস
নাইলন ব্যাগ। তাতে অত্যন্ত সযত্নে মুড়ে রাখা আমাদের অকপট সাহিত্য পত্রিকা। পথে যদি
বড় ও চালু কোনো ম্যাগাজিন স্টল পায়, ২-৫ পিস রেখে যাব এই অভিপ্রায়ে।
আজকাল পিসির ‘সেফ ড্রাইভ- সেভ লাইফ’
বিজ্ঞাপনের জন্য নয়, সেই বাইক প্রেমের শুরুর দিন থেকেই স্টাইলিশ হেলমেটের প্রতিও
একটা ভীষণ দুর্বলতা রয়েছে আমার। এখন অবশ্য স্টাইল আর বেঁচে নেই তেমন, কিন্তু
হেলমেটের সু অভ্যাসটা যথারীতি রয়েছে। রওনা শুরু করতে করতে দেখি পৌনে নটা, প্রাতরাশ
হয়নি; পথে কোথাও একটা করে নিলেই হবে।
প্রথম আধা ঘন্টা তেমন কিছু বলার মত
নয়। গঙ্গার উপরে শ্রীচৈতন্য সেতু, পশ্চিমমুখী হয়ে ডানদিকে নদীর নিচে অনেকটা স্থান
জুড়ে চড়া পরেছে, ডানদিকে নব নির্মীয়মান ISCON মন্দিরের সুউচ্চ
চূড়া চূড়ান্ত বৈভবের প্রতিমূর্তী হয়ে নিজেকে জানান দিচ্ছে। রাস্তার দুধারে
টিপিক্যাল নদীয়ার খালবিল, আর দূরে দিগন্তরেখানে কিছু গ্রাম ও মন্দিরের চুড়ো অথবা
মসজিদের মিনার। নদীর চড়াতে বেশ কিছু সব্জির চাষ, ফুটি, তরমুজ, শশা, পটল, ঝিঙে
ইত্যাদি। দূরে আখ ও ভুট্টার ক্ষেতও জনজরে আসছে। গাঙ্গেয় পলিমাটির উর্বরতার প্রভাবে
গঙ্গার দুইপাড়ের বেলেমাটিতে সব্জির চাষ সেই নদীমাতৃক সভ্যতার শুরু থেকেই যে
সমৃদ্ধ, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। নদীয়ার সীমানা অতিক্রম করে বর্ধমানে ঢুকে
কয়েক কিমি এসেই একটা তেমাথার মোর মত জাইগাতে জানলাম দুটো রাস্তাই বর্ধমান যাচ্ছে;
একটা ভায়া ধাত্রি গ্রাম, অন্যটা ভায়া কুসুমগ্রাম। শেষেরটা ৫-৭ কিমি কম ও সোজা
রাস্তা, অতএব সেই পথেই পা বাড়ালাম। তবে আসার পর দেখলাম, এ পথের আসেপাসের
ঘরবাড়িগুলোর উঠোন কিন্তু এই রাস্তাটাই।
রাস্তার কথাতে বলি, বেশ কিছুদিন ধরেই
দেখছি, গ্রাম বাঙলার রাজ্যসড়ক গুলোর দারুণ ভাবে হাল ফিরেছে। বেশ চওড়া, দুপাশে সহ
মাঝে সাধা রঙের বর্ডার, গাঢ় সবুজ বোর্ডে সাদা রঙ দিয়ে জনপদের নাম লেখা ইত্যাদি। জনপদগুলোতে
দেখি রাস্তার পিচে রেডিয়াম লাইট রিফ্লেক্টার বসানো। বেশ ঝকঝকে, আর বাইক আরহীদের
জন্য এই ধরনের রাস্তা এক কথায় স্বর্গ। কিন্তু শুধু সুন্দর রাস্তা আমি বা আমরা বললে
তো হবেনা, অন্যেদেরও সুন্দর লাগে অন্যভাবে। অতএব অনেক
চাষির কাছে এটাই খামার, ফসল পেটাচ্ছে, শুকাচ্ছে, গাদা দিচ্ছে সহ আর কতো কি। দুএক
স্থানে তো গোটা হাটটাই রাস্তার উপরে বসে পরেছে, সে এক কেলেঙ্কারিয়াস কাণ্ডকারখানা।
আর সেই দানা বা শাকপাতারির লোভে যতো রাজ্যের পোষ্যের আমদানি এই রাস্তার উপরেই;
হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া, গোমাতা, গোপিতা, গোহধর সহ কুকুর, বেড়াল সকল কিছুর অবাধ
বিচরন ক্ষেত্র। আর দুরন্ত আবাল মানবশিশুর কথা তো জাষ্ট ইচ্ছা করে উহ্য রাখলাম।
জানিনা এমন রাস্তা বাঙলার আর কোথায় আছে। গাড়ি ঘোড়ার
চাপ তুলনামূলক বেশ কম, অথচ উপরোক্তদের দাপটে মাইল মিটারের কাঁটা ৩০ থেকে পঞ্চাশের
মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
বর্ধমান জেলা ঢুকে প্রায় ৫-৭
কিলোমিটার যাবার পরেই জীবনানন্দের বাংলার সেই চিরাচরিত রূপ। গ্রামীণ বর্ধমানের
পরিবেশের সাথে আমি কিছুটা হুগলী, দক্ষিন ২৪ পরগনা আর পূর্ব মেদনীপুর জেলা ছারা
সবুজের সাথে মাটির এমন মমত্ব ও এই বিপুল বৈচিত্র আর কোথাও দেখিনি। চাষি ধান কেটে
নিয়ে গেছে গত মাসেই, কোথাও সামান্য পাটের ক্ষেত কোথাও কিছু তিল বোনা; বাকিটা কাটা
ধান গাছের গোঁড়া বা চলতি ভাষায় নাড়া ভর্তি খালি জমি মাইলের পর মাইল। মাঠে
ট্রাক্টারের চাকার ধান বয়ে নিয়ে যাবার দাগ এখনও স্পষ্ট, সেখান থেকে ঝরে পরা ধান
গুলো ইতি মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে বিঘৎ খানিক করে লম্বা হয়েছে বিনা পরিচর্যাতেই।
দিগন্ত জোড়া সেই সবুজ গালিচার মধ্যে, জলে পচা, রোদে পোড়া সেই নাড়াগুলো গোটা
মাঠটাকে একটা অদ্ভুত সুন্দর পান্ডুর সবুজাভ বর্ণ দান করেছে। মাটি যথারীতি
ফুটিফাটা, চাষিও বৃষ্টির প্রতীক্ষায়, এই অনাহুত ঝরে পরা ধান থেকে জন্ম নেওয়া চারা
গুলোও বৃষ্টির প্রতীক্ষাতে। অথচ দুজনের লক্ষ্য আলাদা, চাষী এই নাড়া সহ সবুজ
চারাগুলোকে ট্রাক্টারের ধারালো ফাল দিয়ে কাঁদার মধ্যে মিশিয়ে দেবে। যেগুলো সার
হিসাবে পুষ্টি প্রদান করবে বর্ষার ধানের চারাগুলোকে। আর এদিকে এই ঝরে পরা ধান থেকে
জন্মানো চারাগুলো বৃষ্টির আকুল প্রতীক্ষাতে শুধু বেড়ে উঠার জন্য , বাঁচার জন্য। এ
এক চরম ও অসম প্রতিযোগিতা।
গোমাতা-পিতা-ভাতৃ-ভগীনের দল রীতিমত
পিকনিকের মুডে মাঠের আলের লকলকে ঘাস সহ, কচি ধানের চারা খেয়ে চলেছে। সাথে মোষও
চড়ছে ভারী সংখ্যাতে। একটা জিনিস কিছুতেই ভেবে উদ্ধার করতে পারিনি, আজও সেই ভাবনাই
ভাবতে লাগলাম। গরুও ঘাস খায়, খড় খায়, খোল খায়, পাচনের বারিও একই। দুজনেই গোবর
নাদে, ছরছর করে বালতি বালতি মোতে, সিং আছে, একই ধরনের লেজ এমনকি গাছে মাছি ভনভন
করে, গুঁতায় সুযোগ পেলেই এবং হাটেই কেনাব্রচা হয়।
উভয়েই হাম্বা ডাকে, জাবর কাটে, চাঁট মারে। দুজনেই দুধ দেয়, চারটে করে বাঁট। কারোরই
ছাগলের মত দাড়ি নেই যে বুদ্ধিজিবী হিসাবে গন্য হবে। বরঞ্চ মোষ পরিমাণে অনেকটা বেশি
দেয়। দুজনেরই মাংস খাওয়া হয়, সারা পৃথিবী জুড়ে। শরীরে যৌনাঙ্গের অবস্থান থেকে রতিক্রিয়ার
পদ্ধতিও একই স্টাইলের।
পিতা মোষ বেশি শক্তিশালী গোপিতার
চেয়ে, অতএব গাড়ি বা নাঙল- যোঙাল জুড়তে মোষই শ্রেষ্ঠ। গোপিতা মহাদেবের সাথে পূজিত
হলে, মোষ মা দূর্গার সাথে পুজিত হয়। এমন কত্তো কি সিমিলারিটিস ছরাছরি। অথচ
গো মাতা হয়ে গেল, আর মোষ? সে কিনা মোষই রয়ে গেল? সৎ মা না হয় নাইবা হল, মাতার
পিতৃকুল মাতৃকুলের কোনো আত্মীয় তো হতেই পারত। শ্যালিকা, বৌদি, বান্ধবী, সই, সেলুজ
ইত্যাদি গুলো নাহয় ফচকে সম্পর্ক, কিন্তু মাসীমা, পিসিমা ঠাকুমা, দিদিমা,
রাঙ্গাপিসি, ফুল মাসি, ইত্যাদি নামে তো ডাকাই যেত, এগুলো কি গম্ভীর রিলেসন নয়!
মায়ের অধিকার গোমাতা পেলেও এমন তো নয় যে গোমাতার জন্মদাত্রী মা টিকে দিদিমা ডাকার
বিলটাও পাস হয়ে গেছে! চূড়ান্ত ফেমিনিজমে আক্রান্ত এই সমাজের সংবিধানে তো শুধুই মা
শব্দ। ভাই, ভগীনি, নাতি পুতি তো কোন ছার এমনকি পিতারও
কোনো ক্রেডিট নেই। গোমাতা যেন এ্যামিবার মত নিজে নিজেই গোহদরা বা গোহদরি প্রসব
করেন।
গো পিতার এমন দুর্ভোগ যে গেরস্তের ঘরে থাকলে আগেই নর সন্তানেরা শিশুপিতার অন্ডকোষ
কেটে খোঁজা করে হাতে ধরিয়ে দেয়, থুড়ি মুখে জাল পরিয়ে দেয়। অন্য ভাগ্য হল ভগার নামে
রাস্তাতে ছেরে দেওয়া। যত রাজ্যের ফল পাকুরের দোকানে হুজ্জুতি বা তোলা আদায় করার
পাশাপাশি ময়লা ফেলা ভ্যাটগুলোর সবুজ সাফ করা, পাইকারি হারে গুতানো ও রাস্তা অবরোধ। তার
ফাঁকে রাস্তা গোবর নাদার ফাঁকে কোনো গোমাতা সু-নজরে এলো, নধর দেহ ছুটিয়ে ইমানদন্ড
তরিবারির মত উঁচিয়ে তাঁকে ধাওয়া করে আদর সোহাগ করা। এবিষয়ে অবশ্য কুমারি বা বাচ্চার
মাতা ইত্যাদির বাছবিচারের মত নিকৃষ্ট বিলাসিতা গোপিতাদের থাকেনা। অথচ এদিক থেকে
মোষ এই সকল চরিত্র গুণ থেকে মুক্ত। প্রকাশ্য রাস্তাতে ধাওয়া করে লাগাতার অন্যের
স্ত্রী কন্যা পুত্রবধু ইত্যাদি সম্পর্কিত মহিলাদের ধর্ষনের ইতিহাস মোষেদের বংশে
নেই। পার্থক্য বলতে মোষের বাসস্থান খাটাল হয় আর গরুর গোয়াল। দু স্থানেই মশার
ভনভনানি, রক্তচোষা ডাঁশ, আর বিচ্ছিরি গন্ধ।
তাহলে এই বৈষম্যের পিছনে কি কারন
থাকতে পারে? একটা চক্রান্ত, সেই চিরাচরিত বর্ণ প্রথা। মোষ এলোমেলো লোমযুক্ত কালো
বলে ব্রাত্য, আফ্রিকান মানুষদের মত। সেখানে গরু হল গিয়ে হিপিদের মত, কত রঙের
বাহার, পেলব কোমল শরীর। তাই গো হল মাতা, আর মোষ রয়ে গেল অসুরই।
এরই নাম কপাল। সে যাই হোক, মাথা থেকে
এই সকল আলতু ফালতু ভাবনা ঝেড়ে ফেলতে একটা সিগারেট না ধরালেই নয়, একটা ছোট জনপদে
দাঁড়ালাম। আরো কিছু দূর চলে এসেছি, এখানে মাটির চরিত্রে কিছুটা বদল লক্ষ্যনীয় হল। জনপদগুলোতে
চা, পান, বিড়ি, মিষ্টান্ন, মোবাইল রিচার্জ এর দোকানই বেশি, তাছারা বাকিগুলো সবই
প্রায় ব্যাবসায়িক ছোট ছোট আড়ত। গোটা রাস্তা জুড়েই ধানের বস্তা বোঝায় ট্রাকের
ছড়াছরি, নিকটবর্তী চালকল গুলো খোরাক এই ট্রাক গুলোই।
প্রায় প্রতিটি জনপদের কাছে একটা করে স্কুল বিশেষ লক্ষ্যনীয়। দূরে ঘন কালচে সবুজ
গাছের সারির ফাঁক দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম নজরে আসছে, বাকিটা সেই তেপান্তরের
সমতুল্য। রাস্তার ধারের কয়েকটি বাড়ির
পাশের জমিতে কচু, ভেন্ডি, বরবটি, করলা বা উচ্ছে, বারমেসে লঙ্কা, বেগুন সহ
বিক্ষিপ্তভাবে শব্জি চাষ হচ্ছে, তবে গোটা রাস্তা জুড়ে মাংসের জন্য বিক্রি হওয়া
পোল্ট্রি ফার্ম বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যাতে চোখে পড়ল। এছারা বলার মত একমাত্র চালকলের
চিমনীগুলো। পরিবেশ দূষনের ভারী ভারী আপ্তবাক্য তথা নিষেধাজ্ঞাকে মধ্যমা আঙুল
দেখিয়ে গলগল করে ছাই সহ কালো ধোঁয়াতে আকাশকে ঢেকে দেবার ব্যার্থ প্রচেষ্টাতে রত।
যাত্রা শুরু থেকে প্রায় ৩৫ কিমি চলে
এসেছি, সময় ৪৫ মিনিট। এবারে রোদের তেজ বেশ অনুভূত হচ্ছে। হেলমেট মাথাকে এক্সট্রা
ঘামিয়ে দিচ্ছে। অতএব আবার বাইক দাঁড় করাতেই হত। কিন্তু রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে
রাস্তার ধারের গাছগুলো সব আত্মাহুতি দিয়েছে, বেড়েছে শুধু দুধারের নয়ানজুলি গুলো,
আড়ে ও বহরে। একটু ছাওয়া খুঁজতে গিয়ে সামান্য দুরেই সেটা পেলাম। একটা বাবলা গাছ। এই
চাঁদি ফাটা রোদ্দুরে বাবলা গাছের ওই ছোটছোট পাতার পাতলা ছায়াও যে কতটা
স্বস্তিদায়ক, সে শুধু ভুক্তভোগীই জানে। এর আগে বোধহয় কখনই বাবলা গাছকে এতোটা
ভাললাগেনি, এতো ভালো করে দেখিওনি। এই গরমেও
দেখি কি সুন্দর হলুদ হলুদ ফুল ফুটেছে। দু ঢোক জল খেয়ে, একটা পিওর শান্তিনিকেতনী
সুতির বড় রুমালকে; বীরেন্দ্র সেহবাগ স্টাইলে মাথায় ব্যান্ডেনা মত বেঁধে মুখটাও
মাওবাদীদের মত করে চোখে খোলা রেখে আবৃত করে নিলাম। নচেৎ পোড়া মুখ আরো পুড়ে জয় বজরঙবালীড় বংশতুতো
ভাই সদৃশ্য ধারণ করব।
ওই বাবলার ছায়া এক আশ্চর্য পরিবর্তন
আনল মনজগতে, আলফাল ভাবনা সরিয়ে হঠাত করেই দেখার পরিসরকে বিস্তৃত করে দিল। বাইক যত
এগোয় ততই দুধারের অবশিষ্ট গাছগাছালি গুলোকে খেয়াল করি মন দিয়ে। তিরতিরে
হাওয়ায় সোনাঝুড়ির ডালে যেন হলুদ রঙের বন্যা লেগেছে, আবার কোথাও কৃষ্ণচূড়ার লাল
আগুনে ফুলে সেজে গ্রীষ্ম তার নিজের রূপ জাহির করছে। রংগনের লাল থোকা হোক বা
শিরীষের সাদা তীব্র গন্ধ যুক্ত গোটা পরিবেশকে একটা অন্য মাত্রা দান করেছে। রাস্তার
ধারের ঝোপ গুলোতেও টগর, জবা, বুনো বেলফুল, সহ অনামী নানান গুল্মতে যে কত রকমের
রঙের পসরা, আমরা যাত্রা পথে যদি একটু খেয়াল করি, গরম কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। হলুদ
টিকুমা, রাধাচূড়া, কলকেফুল, চাঁপা এমনকি আকন্দও নিজেকে ফুলের সাজে সাজিয়ে রেখেছে।
গোটা মাঠ জুড়ে অসংখ্য তাল গাছে জলভরা তালকাঁদি গুলো দুর থেকে পুঁই মিচুরির মত
লাগছে, আবার পুরুষ তালগাছ গুলোতেও পুরুষ ফুলের দণ্ড অনেক সুউচ্চে কি গাম্ভির্য
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এলোমেলো হাওয়ার জন্য পথের ধারের কলাগাছের পাতা গুলো শতচ্ছিন্ন
হয়ে কি সুন্দর ছন্দবদ্ধভাবে হাওয়াতে নেচে চলেছে।
ইউক্যালিপটাস বা ওই জাতীয় কোন
গাছের চ্যাপ্টা শুকনো কালো সিমের মত ফলগুলো গোটা রাস্তাময় বিছিয়ে ছরানো। দুধারে
পিটুলি, বহল, আঁশ ফল, কড়ুই, গামারি, আঁটির আম, প্যাঁক গজানো সজনের গুড়ি, জারুল,
ফলসা, পাকুড়, শ্যাওড়া, ঘোড়ানিম, পাহাড়ি শিমুল, বকুল, কদম সহ কত্তকি যে আমরা অদেখা
করে চলে যায় তার লেখাজোখা নেই। বাঁশ ঝাড়েও নতুন কোঁড়া গজিয়েছে, কোঁড়া মানে নতুন
চারা বাঁশ গাছ। একটা গ্রাম্যক উন্নয়ন সমিতি দেখলাম লোহার খাঁচা দিয়ে ঘিরে বেশ কয়েক
কিলোমিটার জুড়ে রাস্তার দুধারে কলম আমের চারা বসিয়েছে, যদিও তাতে আমের চিহ্ন মাত্র
নেই। তাছারা ফল যুক্ত গাছের মধ্যে জাম আর তেঁতুল লক্ষ্যনীয়, ফলের ভারে যেন প্রতিটি
গাছই ভেঙে পড়ার উপক্রম। নয়ানজুলির ভিজে জমিতে বড় চওড়া ও ধারালো প্রান্ত যুক্ত
লম্বা ঘাসেরই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, পাশে ঢোলকলমির ঝাড়, কোথাও নোটে শাক, কোথাও মেঠো
লতানে কলমি, খারকোন, মানকচুর ঝোপ; এটাই তো আমার শস্য শ্যামলা বাংলা। শুধু কিছু
স্থানে পার্থেনিয়ামের বিষ প্রায় সমগ্র অঞ্চলটাকে গ্রাস করে নিয়েছে, যা এক অশনি
সঙ্কেত।
কতকিছুই আমাদের রোজকার চলতি পথে
দেখেও অদেখা রয়ে যায়, অথচ আমরা বৈচিত্রের খোঁজে কি কি না করে বেড়ায়। সামান্য বট বা
অশ্বত্থের নতুন গজানো কালচে পাতা গুলোতে এই নির্দয় জ্যৈষ্ঠের সূর্যকিরন প্রতিফলিত
হয়ে চোখে আসলে যে কি এক অপরূপ রূপ পরিলক্ষিত হয় তা কেবল জনান্তিকিই জানে। এর
মধ্যেই কখন যে এই গরম, দুরত্বকে অনায়াসে টপকে বর্ধমান শহরের উপকন্ঠে নির্মিয়মান
রেলওভার ব্রিজে পৌঁছে গেলাম সেটাই জানিনা। এর পর তো সেই পুর্ব নির্ধারিত সূচি
অনুযায়ী কাজে হারিয়ে গেলাম। প্রাতরাশটাও কি সুন্দর মধ্যাহ্ন ভোজে রুপান্তরিত হয়ে
গেল।
রবিবার, ৪ জুন, ২০১৭
।। খেউর নামা ।।
কিছু বন্ধু আজকাল আমার অধিক কাছেরজন হয়ে গেছেন দেখছি, যারজন্য তাঁরা
আমাকে সযত্নে এরিয়ে চলছেন। কি আর বলি তাদের, একটাই কথা ‘আপনাদের দ্যায় কে’? কিছুজন
আবার ছোঁয়াচ বাঁচায়, তাদের বলি কাকা/পিসিমা, আমার পোষ্ট বা টাইমলাইনে এলে মাথায়
একটা কন্ডোম পরে নিয়েন প্লিজ, এখানে HIV ভাইরাস চিলুচিলু করে ঘুরে বেড়ায়। খপাৎ করে আপনার
ঢাউস সাম্মানিক ফানুশ ফাসিয়ে দিতে পারে। কিছুজন কোনো কারন ছারায় আমায় দেখে এমনধারা
নাক সিটকায়, যেন আমার হাত দিয়ে হস্তমৈথুন করতে গিয়ে তার লিঙ্গের নুনছাল উঠে গেছে। বলি
ও মশাই, এতো পতিভা কি ঘরের লোক জানে? কয়েকজন তো আবার আমার ঠিকেদারি নিয়ে রেখেছে,
কে জানে বিবাহযোগ্যা মেয়ে বা বোনের জন্য মনেমনে আমি তাদের মানসপুত্র ছিলাম কিনা।
এমনও হতেই পারে নিজের অতৃপ্ত শয্যা সঙ্গী বা সঙ্গীনির জন্য আমাকে নিতান্ত মনোনীত
করা হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। এগুলো দেখলেই আমার মনে এমন ভাব চলে আসে যে, কেঁদে ফেলি
মাইরি, আর আজকাল কে আর না জানে চোখের জলেও গর্ভসঞ্চার হয়।
গত কয়েকদিন ধরেই মান ও সম্মান নিয়ে বেশ কয়েকটা সুতো ইতিউতি নজরে
পরেছে। আমাদের এক বিশেষ গ্রুপ সহ বেশ কিন্তু বন্ধুর সময় সারণীতেও যার চোরাবালি
অপসৃতমান; চেরানোবিল পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়ার মত বেশ ভালই ঘা করেছে পরিচিতমহলে।
যদিও আমার ওটা
সাবজেক্ট নয় বলে, তেমন উৎসাহিত হইনি। আমার তো শ্লা হল গিয়ে, সম্মানই
নেই, তো অসম্মানিত হবো সে উপায় মোটে নাই। দুটো দিন ধরে বেশ পবিত্র চেষ্টা
চরিত্র করলাম, ভোরে প্রাণায়াম, সকালে কাঁচা দুধে ডিম ফাটিয়ে দুপিস আমন্ড, দুপুরে
চাউমিন, সন্ধ্যায় ছাতু ও রাত্রে বাংলা... নাহ। মানই গজালোনা, তো যাবে, লোম অবশ্য
গজানো বন্ধ নেই, নির্দিষ্ট মাত্রাতে বাড়ছে। চেষ্টা করলে অবশ্য ঘরের পিছনের
ছাঁচতলাতে, যেখানে ছোটবেলা হিসি করতাম সেখানে দুটো কচু বুনলে নিশ্চিত ‘মান’-
বাঁচিয়ে দিত, একটা লম্বা গজিয়ে, নিচের দিকে।
আমার তো...
বাপ বললে মোদির
ভাই (এক্ষেত্রে আপনি মনে মনে যা খুশি বসাতেই পারেন), আনন্দের আর সীমা নাই।
লোকে জন্মাবার পর ছ্যাবলা হয়, আমি মায়ের পেট থেকেই ত্যাদোঁড়। হতেই পারে,
নিষিক্তকরণকালে কোনো ফলিডল বা গ্যামাক্সিনের প্রকোপ থাকলে সেটা আশ্চর্যের কিছুনা।
তাই বলে রাখি কিছু রেমিডি আমার টাইমলাইন ও গ্রুপের উপরোক্ত অবন্ধু, শুভান্যুধায়ী ও বন্ধুদের জন্য-
আমার পোষ্ট বা কমেন্টে কারোর খারাপ কিছু লাগলে, আমার ভাবনা অনুযায়ী
একটাই কাজ করতে পারেন, খুবই রেডিমেড প্রায় ২ মিণিটস নুডলসের মতোই আরকি:-
একটা গ্লাস নিন, একটু ঠান্ডা জল ঢালুন তাতে। হালকা ইসব গুলের ভুষি
বা কায়মচূর্ন মিসিয়ে ঢক করে গিলে নিন। এবার মানসিক ভাবে নিজেকে যুদ্ধের জন্য
প্রস্তুত করুন। মনে রাখবেন বাঙালীর যুদ্ধ, আধাঘন্টার বেশী
সময় লাগার কথা না।
এবারে মনে করুন শ্বশুর বাড়ির প্রথম অপমানের কথাটা, নাহ আত্মা
জাগলনা তো? রোজ ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করেন যে জন-বাহনটিতে, সেখানের সেই বিশেষ
যাত্রীটিকে মনে করুন, তার বগলের গন্ধ... দেখুন এবারে আপনার রোমকূপের ছিদ্রগুলো
খুলে গেছে। এবারে ভাবুন, প্রাক ভার্চুয়াল যুগে যখন কাওকে টাইমলাইনে গালি দেবার
সুযোগ ছিলনা, তখনকার দিনের অফিসে বা কর্মস্থলে সেই অপমানের কথাগুলো, কয়েকবিন্দু
ঘাম টপ করে দেখবেন ঝরে পড়ল বলে। এবারে হালকা করে একবার পাছায় হাত বুলিয়ে নিন, এটা
সামান্য বিরতি মাত্র, মানসিক প্রশান্তি পাবেন নিশ্চিত। দিয়ে আবার ভাবুন, যেবারে
হিসি করতে গিয়ে অসাবধানতা বসত অর্ধেক হিসিটা প্যান্টেই পরেছিল, আর আপনি সেটা
লুকাতে কলের জলে হাত ধোয়ার বাহানাতে আরো খানিকটা প্যান্ট ভিজিয়ে ঢাকাবার চেষ্টাটা
, চায়ের দোকানের ছোঁড়া চাঁদু সকলকে বলে দিয়েছিল... ব্যাস, রাগে কপাল ফেটে দরদর করে
ঘাম ঝরছে। রগের শির ফুলে উঠেছে, ঠিক এই সময় ঘড়িটা দেখে নিন।
মিনিট পনেরো এভাবেই কাটিয়ে ফেলেছেন ইতোমধ্যে, অতএব আপনি সম্পূর্ন
প্রস্তুত সমরের জন্য। এবারে একটা কমোড ওয়ালা প্যানে গিয়ে হাতে সময় নিয়ে বসুন, সাথে ২ টো মাড়ি বিস্কুট
রাখা অবশ্যকর্তব্য। আর এক বোতল ফ্রিজের জল তো থাকতেই হবে, এটা জীবনদায়ী। হ্যাঁ,
অবশ্যই ইজের খুলে বসবেন। এবারে আগের কাজ আগে, ব্যাটা ছেলে হলে, আগে বিড়ি টা শেষ করুন। কারন ওই সুখটান পৃথিবীর আর কিচ্ছুতেই নেই। মেয়েরা
শ্বাশুরী বা ননদের নাম নেবেন ১১ বার, ভরভর করে ও কাজটা ত্বরান্বিত হবে।
এবার বারমুডার পকেট থেকে, বা লুঙি না নাইটির কোঁচর থেকে
এন্ড্রোয়েডটা বের করে নেট অন করে ফেসবুক এপসে ক্লিক মারুন। এই এক ফেসবুক, আমাদের
প্রতিষ্ঠিত ক্লিকবাজে পরিণত করে সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছে। ফেবু তার নোটিফিকেশনের
আপডেট দিতে থাকুক, তার মত সময় নিয়ে; আপনি উইকিপিডিয়াতে গিয়ে একবার নিজের খিস্তির স্টকটা
ঝালিয়ে নিন। যাঁহারা তরলমতি, তাদের কোষ্ঠে কাঠিন্য অতি স্বাভাবিক, অতএব এবারে একটা
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চালিয়ে দিন ওই মোবাইলেই, যাদের বায়ুর দোষ আছে তারা হিমেশের নিজের
গাওয়া গান লাগিয়ে দিন, কারন নাক টিপে গুনগুন করলে ওটা যাবে ভাল, বাকিরা হানি সিং,
কারন বলছি।
হিমেসের গান শুনলেই, মুখে অটোমেটিক বিকৃতি শুরু হয়ে যাবে, যেটা আপনাকে কোঁথ পারতে সাহায্য করবে। এবার নিম্নচাপের টুপটাপ বর্ষন শুরু
হয়ে গেলেই, ওই বিকৃতি মুখের যাবতীয় এক্সপ্রেশন এক্সটেন্ডেড
করুন। ফিরে আসুন ফেসবুকে, সোজা চলে আসুন আমার পোষ্টে। যাবতীয় কাঁচা গালাগালি সহ
ইত্যাদি ইত্যাদি পরিবেশন করুন থরে থরে, সমস্ত রেজুলেসন ভুলে রেভুলিউসন সহ। কারন
ততক্ষন আপনার উদরলঘুতার কারনে, মনেও হালকা প্রাশান্তি ভাব বিরাজমান।
এবার বিস্কুট দুটো খেয়ে নিন, একটু ঠান্ডা জলো গলায় ঢালুন। বেগটা আবার ফিরে
পাবেন।
আবার এক প্রস্থ নিজের মনকে সুখ দিয়ে নিন, আমায় গাল দিয়ে,
অন্য অনেকের প্রতি যত্তো ক্ষোভ, নিজের যাবতীয় না-পারা সহ সকল কিছুর
দায় ভার্চুয়ালি সব আমার উপর ঢেলে দিন। কেও মানা করবেনা, সব্বাই দাঁত ক্যালাবে। আর
মাইরি বলছি, শৌচাগারে আমি নেই দেখার জন্য, নিশ্চিবতে করুন। সাথে সাথে যত্তো রাগবেন,
পেট টাও রিলাক্স ফিল করবে।
এবার একটু হালকা ঘাম মুছে নিন। ছেলারা লুঙ্গি দিয়ে, মেয়েরা নাইটির
অতিরিক্ত অংশ দিয়ে। বারমুডা বিলাসীরা হাত দিয়েই ঘাম ঝাড়ুন। যদিও আমার আবার ওই
সুবিধা নেই। আমি বাথরুমে জন্মাবস্থার সময়কালেই বিশ্বাসী। জীবনে নাগা হবার যে সুপ্ত
বাসনা টা ছিলো, ওখানেই মেটায়।
সে যাই হোক। পেটের এবং মনের যাবতীয় স্খলন পরিপূর্ন করে, টয়লেট পেপারে
গুহ্যদ্বার মুছে নিন, আপনার হলুদ পাখীদের আপাতত টাটা করুন।
তার সাথে আমার নাম ২১ বার অত্যন্ত ঘৃনামিশ্রিত স্বরে উচ্চারিত করুন। কমোডে ফেলার
আগে জয় সতীনাথের জয় বলে, অরিজিত সিং এর একটা রোমান্টিক গান
চালিয়ে, হাত ধুয়ে (ডেটল সাবান দিয়ে) আরেকটা সরি পোষ্ট অথবা কমেন্ট
করে দিন।
ব্যাস....
সাপ-লাঠি দুই ই অক্ষত।
সাপ-লাঠি দুই ই অক্ষত।
যারা আমাকে ব্লক করে রেখেছেন তাদের জন্য বলি, ফেক একাউন্ট থেকে
দেখছেন সেটা আর লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলতে হবেনা, আমি আমার
সেই সকল কাছের মানুষ নিয়েই সুখী ও খুশি, যাদের জাত যায়না
আমিত্বের দায়ে।
আপনি থাকছেন স্যার।
(ক্যালাবেন না প্লিজ)
শনিবার, ৩ জুন, ২০১৭
।। হতাশা ।।
সারমেয় যখন উলঙ্গ থাকে, তখন
আরেকটি সারমেয় কখনো মনে করে না যে এটা অশ্লীলতা। কারন সে নিজেও উলঙ্গ। সে আবার যখন
প্রকাশ্যে যৌন কাজ করে, তখনো আরেকটি সারমেয়র
মনে আসে না, যে এটা অশ্লীলতা। তাতে
মানুষই লজ্জা পায়, আবার কিছু নিকৃষ্ট
রুচির মানুষ তারিয়ে তারিয়ে সেই রতিদৃশ্য উপভোগ করে, কারন
হিসাবে বলে "বাওয়া, এতো রাস্তার মোড়ে হচ্চে, দেকবো না?"। কেও আবার তাদের সেই
জটিল শারীরবৃত্তীয় অন্তিম কৌশলের দরুন, আঘাত
হানতেও লজ্জিত হয়না।
এটাই
পৃথিবী।
কারন সারমেয়র বিবেক নাই, মনুষ্যত্ববোধ
নাই। সন্দেহ, ওই আঘাতকারী
ব্যাক্তি বর্গ বা বিকৃতকাম মানুষগুলোর মনুষত্ব বা বিবেকবোধ নিয়েও বড় জিজ্ঞাসা
অবশিষ্ট পৃথিবীর। যদিও এটা তারা শুনলেই আবার মস্তিষ্কে বদবায়ুর সঞ্চার ঘটিয়ে
সুললিত বাণীর প্রবাহ ঘটাবেন নির্দ্বিধায়।
মানুষের বিবেক যখন লোপ পায়, তখন সেও হয়তো সারমেয় সদৃশ্য আচরণ করে। সেও তখন অশ্লীলতাকে আর অশ্লীলতা মনে করে না। প্রধানত অহং থেকেই এই যাবতীয় রোগের সুত্রপাত। কিন্তু এইসব মানুষ এইটুকুতেই থেমে থাকে না, তারা চায় এই অশ্লীলতা সমাজেও ছড়িয়ে যাক। তার দলে লোকবল বৃদ্ধি পাক।
.
বড় আক্ষেপ আমাদের এই সমাজ নিয়ে নিয়ে। সকলেই একটা অদৃশ্য লেজ নিয়ে চলছেন। কখনও সেটা সর্প সদৃশ্য, ফোঁস করে ওঠার জন্য, কখনও বাঁদরের মত, ঝুলে থাকতে, কখনও শেয়ালের মত, শিকার ধরতে, প্রয়োজন মাফিক ব্যবহার চলে। উপকার গ্রহন করার সময় লেজটি সারমেয় সদৃশ্য থাকে, সেই তাৎক্ষণিক বৈতরণী পার হয়ে গেলেই, গরুর লেজের মত চাবুক সদৃশ্য হয়ে প্রহার করতে থাকে।
নপুংসক এর দল তালি বাজিয়ে অসাড়গর্ভে রসসঞ্চারের ব্যার্থ
চেষ্টা চালালেও, আদতে সেই তৃতীয় লিঙ্গের
মর্যাদা নিয়ে দন্তবিকশিত করে লজ্জা নিবারণ করেন, ঘোমটার
নিচে।
নাহ, এর থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো
নির্দিষ্ট সলিউসন নেই। চুপ থাকা, আর অনুমান ক্ষমতা বাড়ানো
ছাড়া।
জ্ঞান আর জ্ঞানীর ফারাকটা হল, ফলিত প্রজ্ঞার সঠিক প্রয়োগ।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যসমূহ (Atom)
তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না
⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...
-
(১) জাতীয় ডিম্ভাত দিবস ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই এর জমায়েত কী উদ্দেশ্যে হয়েছিলো জানেন? তোলামূলের রাজ্যে না জানাটাই আপনার অধিকার। ভোটার তাল...
-
ছোটবেলায় বাবা বলতেন "শাগ খেলে বাঘের বল"। যদিও তিনি ওটাকে শাকই বলতেন আমরা কচি কানে বাঘের সাথে মিলিয়ে শাগ শুনতাম। এহেন পরিস্থ...






