কোনো এক অজানা কারনে হঠাৎ করে ভাবনাস্থল গর্ভবতী হওয়ার কারনে অক্ষরের রূপে প্রসবিত কিছু প্রলাপের সংকলন এই ঠেক। গুনী লেখকের সমৃদ্ধশালী লেখনি পড়তে পড়তে, অক্ষমের প্রয়াসে কম্পিউটারের কিবোর্ডে হাত চলে যায়। ফল স্বরূপ, ঘটে চলা রাজনীতি, সমকাল, মানবিক বিকার, সময়চর্চা, ছ্যাঁচোর এর মত রিকেটগ্রস্থ লেখনীর জন্ম হয়। এরই রেশ ধরে সময়চর্চা, রবিবাসরীয়, সমকাল সহ রম্য, রচনা, গল্প ইত্যাদি ভুলভাল গুলোকে সংরক্ষিত করা হয়েছে এই টোলে। এটা সমমনষ্ক মানুষদের ভাব বিনিময়ের স্থান। উন্মাদের টোলে সকলকে স্বাগতম জানাই।
মঙ্গলবার, ১৫ জুন, ২০২১
সালভাদর আলেন্দে
বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১
বিজেপি রুখতে CPIM বিনা গতি নেইঃ ইতিহাস
দোকর
স্বীকারোক্তি এক ধরনের স্বীকৃতি যার কোনো ছকে
বাঁধা সংজ্ঞা নেই। কেউ ভাবে গুণাহ কবুল করে নেওয়া, যে গুণাহের
সাজা দেওয়ার জন্য কখনও কখনও নিজেকেই সালিশ বসাতে হয় অন্তরের আদালতে এক অবিভাজ্য
দ্বন্দ্বের নিরসনে। যেখানে হাকিমও আমি, ফরিয়াদি থেকে বিবাদীও নিজেই। এ সাজা চোখে দেখা
যায় না বটে কিন্তু মর্মপীড়ার ক্লেশ সারাজীবন কুরেকুরে খায়, এটা কিছুটা
তেমনই এক অমীমাংসিত প্রমিতি- যার ফয়সালা করে মীমাংসাতে পৌঁছাবার সাহস জোটাতে
পারেনি ব্যক্তি মালিকানায় থাকা নিজ অন্তর।
স্বীকৃতির মূল হলো সাক্ষ্য, আর
স্বীকারোক্তি সেই সাক্ষ্যের প্রশাখা। সুতরাং, সকল
স্বীকারোক্তি স্বীকৃতি হলেও, সকল স্বীকৃতি স্বীকারোক্তি নয়। তবুও একে ঠিক
স্বীকারোক্তি বলা যাবে কিনা জানি না। অনেকের কাছে ভ্রমণ কাহিনী মনে হতে পারে, কারও কাছে
গাঁজাখুরি গপ্পো মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা জীবনের এক অতি সংবেদনশীল
অতীত যা পরিবার-পরিজন, সমাজের কাছে প্রথম বারের জন্য প্রকাশ পেল। স্বভাবতই এটা
স্বীকৃতি, স্বীকারোক্তি, না প্লটে ফাঁদা গল্প, তা পাঠকই
তাঁর নিজ ভাবনা মতো মন্তব্য করুক। কাহিনীটাকে একটা বিচ্ছিন্ন গল্পের মতো করেই পাঠ
করবেন বলেই আশা রাখি, এটাকে Inculpatory Confessional Statement হিসাবে
দেখলে সম্ভবত দৃষ্টির কৌণিক বিস্তারটা অনেক দূর পর্যন্ত ব্যাপ্তিলাভ করবে। সে
যাইহোক, প্রতিটি সত্য ঘটনাই সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি ব্যতিরেকে অবশিষ্ট পৃথিবীর কাছে
একটা গল্প।
গল্পের শুরুটা আজ থেকে ২৩ বছর আগেকার, ১৯৯৮ সালের
এমনই এক বর্ষার। ঘটনাকাল কিশোরবেলা হলেও আজ লিখতে বসেছি, করোনার
ডেল্টা ওয়েভের লকডাউনে। লেখনীর ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলব্ধি সহ সকল কিছুতেই আজকের এই
মধ্যবয়সী ‘আমি’র ভাবনার ছাপ দেখতে পাওয়া যাবে, ইচ্ছাকৃতভাবেই
সেটাকে রেখেছি যাতে টুকরো টুকরো ছেঁড়া স্মৃতিগুলোকে বোনা যায়। আরোপিত করে
কিশোরবেলার ভাষা ও ভাবনাপুষ্ট হয়ে লিখলে সেটা ব্যাকরণগতভাবে ঠিক হলেও, তাতে পাঠ্য
সুখের ঘাটতি থেকে যেতে পারত; কারণ সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ধরার বোধ ওই বয়সে থাকে
না, স্বভাবতই লেখনী ও বর্ণনাতেও সেগুলো ধরা পড়ত না। কিছুক্ষেত্রে রূপকেরও ব্যবহার
করেছি সজ্ঞানে, যাতে রসকষহীন শুকনো প্রতিবেদন না মনে হয়।
মাধ্যমিকের ফল বেরিয়েছে, একাদশে
ভর্তি হবার বিশেষ কোনো মাথাব্যথা ছিল না, নিজেদের ইস্কুলেই ভর্তি- তাই চাপমুক্ত।
মোটামুটিভাবে ক্লাস এইটে ছেলেদের পাখা গজালেও সেটার আক্ষরিক দৃষ্টিগোচরতা আসে
মাধ্যমিকের ফলের পরই। প্রায় দেড় বছরের প্রেসার কুকার সম পড়াশোনার চাপ থেকে মুক্তি
পেয়ে এই সময়ই অনেকটা ফাঁকা সময় পাওয়া যায়, তারপরই আবার
উচ্চমাধ্যমিকের জুজু। ‘আমি বড় হয়ে গেছি’, তাই প্রথম
বারের জন্য ‘পারিবারিক অভিভাবক’ ছাড়া
শুধুমাত্র বন্ধুদের সাথে কোথাও যাওয়ার জন্য বাড়িতে বলার মতো একটা পরিস্থিতি তৈরি
হয়ে গিয়েছিল, সুতরাং অনুমতি জোগাড় করতে খুব একটা অসুবিধা হলো না।
আশ্বিনের শেষে পুজোর সময় বাড়ি গমগম করে পিসি ও তুতো ভাইদের আগমনে, সেই সময়কার
আনন্দ ফসকানো সম্ভব নয়। এদিকে ‘বড় হয়ে যাওয়া’টাকেও
উদযাপন করাটাও মারাত্মক রকমের জরুরি, তাই ফুরসত খুঁজতে লাগলাম কোথায় যাওয়া যায়, যেখানে
সর্বক্ষণ শাসনের চোখরাঙানি থাকবে না।
ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের প্রায় সকলেই আশেপাশের বাসিন্দা, কার বাড়ি আর
যাই! হাতড়াতে হাতড়াতে সতু মানে শতদ্রু ছাড়া আর কারও কথা মাথাতে এল না। সে এক ক্লাস
নিচুতে পড়ত, আমাদের মূল যোগাযোগ অঙ্ক স্যারের টিউশনি। তার সঙ্গে আমার
বন্ধুত্বটা গড়ে ওঠার কোনো কারণ ছিল না, যদি না তারই যমজ বোন ইরাবতীর বিষয়টা জুড়ে থাকত।
ওদের বাবা-মা হানিমুনে কাশ্মীর নাকি কোথায় একটা গিয়েছিল, এই কারণেই
তাদের এমন নাম। খানিকটা অতিরিক্ত যতনে এই বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হয়েছিল অনেকটা ‘দাম’ দিয়ে।
যৌবনের কুসুমকুঞ্জে পদার্পনের দ্বারপ্রান্তে এসে প্রবল কৈশোরীয় কামনার পাশাপাশি
একটা নিজস্ব ‘মেয়েবন্ধু’ থাকাটা যেন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
স্বীকার করতে বাধা নেই, সে সময় আমার
যা দৌহিক সৌষ্ঠব ছিল সেটাকে আমার মাতৃদেবীর বাইরে প্রায় প্রত্যেকের কাছেই হাসির
কারণ ছিল। এমনকি নিজেও যখন দৈবাৎ আরশির প্রতিচ্ছবি দেখতাম, বিরক্তি আর
হতাশার বাইরে কিছুরই উদ্রেগ হতো না। কিন্তু মন যে মানে না, ওদিকে ক্লাস
নাইন থেকেই ‘কো-এড’ ক্লাসের সকল রঙিন প্রজাপতিগুলো শত্রুদের দখলে, কোনো এক
সময় যারা বন্ধু ছিল। অবশিষ্ট পড়ে ছিল আমার মতো কপিসাদৃশ্য কিছু হতভাগ্য
সদ্য পুরুষকুল আর এখনও ‘গুটি না কাটা’ আগামীর প্রজাপতিরা, মানে কিছু
শুঁয়োপোকা। ফলাফলে, বিফল মনোরথে কিছুটা ইজ্জত বাঁচাতেই ইস্কুলে ঘনিষ্ঠ এক
বন্ধুকে দিয়ে ক্লাসে গোপনে প্রচার করিয়ে দেওয়া হয়েছিল- গুলুকোজের সাথে ইরার
ইন্টিমিন্টু আছে। ক্ষীরোদসাগরের অনন্ত শয্যায় শুয়ে প্রেমের দেবতা
মুচকি হেসেছিলেন।
ইয়ে, আমাকে ভালোবেসে বন্ধুরা গ্লুকোজ বলে ডাকত, কে কবে কেন
এই নাম দিয়েছিল জানি না, তবে গোটা স্কুলজীবনে এই নামটারই প্রচলন ছিল সর্বাধিক, কালক্রমে তা
‘গুলুকোজ’ এ এসে দাঁড়ায়। আজ বড় আক্ষেপ লাগে, স্কুলজীবন
শেষ হবার সাথে সাথে এই নামটাও কর্পুরের মতো উবে গেছে, আজকাল
স্কুলের বন্ধুরাও আর এই নামে ডাকে না। সে যাইহোক, ইরার নাম ব্যবহারের পিছনে একটা
সুবিধা ছিল- সে নিজে গার্লস ইস্কুলে পড়ে আর তার ভাই আমাদের ইস্কুলে পড়লেও সে নিচু
ক্লাসে, তাই তার কাছে এ কথা পৌঁছাবার তেমন একটা সুযোগ ছিল না। কিম্বা হয়ত পৌঁছেও ছিল, কিন্তু আমার
থেকে ব্যাট, র্যাকেট আর রোজকার টিফিনে ইস্কুল গেটের নারানের কাছ থেকে
ফ্রিতে যথেচ্ছ পরিমাণে ঘুগনি, পেয়ারা, কামরাঙা, আচার বা
আলুকাবুলি- তার চোখকান বন্ধ রাখতে সাহায্য করেছিল।
শতদ্রু মানে সতুদের পদবি সরকার, ওরা প্রতি
বছর শ্রাবণমাসে দেশের বাড়ি যেত। সেখানে কিছু একটা পুজোর খুব ধুম হয়, গিয়ে
বুঝেছিলাম এই পুজোই ওদের পারিবারিক মিলনোৎসব, এর সাথে
স্থানীয়দের লোকউৎসবের একটা সুসম্পর্ক রয়েছে। তার দাদুর বাবা সাঁওতাল পরগণার কোথাও একটা খনির
ম্যানেজার ছিলেন। দেশ স্বাধীন হলে সাহেবরা যখন বিলেতে ফিরে যায়, তাদের একটা
বাংলোবাড়ি আর বেশ কিছু জমিজিরেত উপহারস্বরূপ দিয়ে যায় কামাক্ষ্যা চরণকে, যিনি সতুর
দাদুর স্বর্গীয় পিতা ছিলেন। সতুর দাদুরা সেখানেই থাকেন, চাষবাস-ব্যবসাদি
করেন। সতুর বাবা বিডিও অফিসে চাকরির দরুন আমাদের এখানে এসে বাড়ি করে স্থায়ী
বাসিন্দা হয়ে গেছেন। এসব কথা অবশ্য ওদের বাড়ি যাব বলেই জানতে হয়েছিল, মা’কে সবটা বলা
ছিল বাধ্যতামূলক।
তখনও ঝাড়খন্ড রাজ্য বিহারের গর্ভে, এদিকে
বিহারের নাম শুনে মা প্রায় আঁতকে উঠলেও দাদুর আশকারাতে দুপুরের শক্তিপুঞ্জ
এক্সপ্রেসে চড়ে বসলাম। সতুর বাবা মানে নন্দলাল কাকুর দু'হাত ধরে
আমার মায়ের সে কি আকুতি ভরে পুত্রের অভিভাবকত্বের ভার অর্পণ করেছিল, সেটা ছিল
একটা দর্শনীয় অধ্যায়। আমার লটবহর বেশি ছিল না, খান দুয়েক
ফুলপ্যান্ট, কয়েকটা গোলগলা গেঞ্জি আর জামা। সাথে হাফপ্যান্ট, গামছা, গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া, ব্রাশ
ইত্যাদি। তবে তার থেকেও বেশি জরুরি ছিল তিন ডজন বিড়ির প্যাকেট, সাথে নানা
ধরনের গোটা ২০ সিগারেটের ডিব্বা। যদি জলাজঙ্গলে না পাওয়া যায়, তাই এই
সতর্কতা। মাধ্যমিকের পরীক্ষা কেন্দ্রে ‘সময়’ দেখার জন্য নতুন ঘড়িটা হাতে দিয়ে বেশ মাঞ্জা মেরে, সেন্টের ঘড়া
উপুড় করে যতক্ষণে ট্রেনে চড়ে বসলাম, ঘেমে নেয়ে উঠেছি।
ট্রেন গিজগিজে ভিড়, স্লিপার
ক্লাসেও দেহাতি মানুষেরা তোফা মেজাজে চড়ে বসেছে যে যেখানে পেরেছে, দেখলাম টিটি
বাবু এক-আধা জনের সরকারি চালান কাটলেন, বাকি সকলের থেকেই ২০-২৫ টাকা করে পকেটে ভরে নিয়ে
যেন তাদেরই জিম্মাতেই বগিটাকে ছেড়ে গেলেন। স্বভাবতই এই আশ্চর্য নরক গুলজার
ট্রেনযাত্রার একমাত্র প্রাপ্তি ছিল, ভিড়ের চাপে দীর্ঘক্ষণ ইরাবতির গায়ে গা লাগিয়ে বসে
থাকা। সে যাইহোক, সূর্য ডুবতে জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস একটা গাঢ় ঘুম বয়ে
নিয়ে এল সকলের। ইরাবতী জানালার পাশে, উল্টো দিকের জানালা দখল করে তার ভাইয়ের মুখোমুখি।
কাঁধের উপরে যখন ইরাবতীর মাথাটা এলিয়ে পড়েছিল সেই সুখের তুরীয় উপলব্ধি কেবল
জনান্তিকেই জানে। বগিতে ঝিমুনি ধরানো হলুদ আলো জ্বলে ওঠার পরে কাকিমার দেওয়া পরোটা
আর আলুভাজা পেটে পড়তে আমারও চোখ জবাব দিল।
সতুর ঠেলাতে চোখ খুলতে দেখি ট্রেন প্রায় ফাঁকা
হয়ে গেছে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত্রি সোয়া এগারোটা। শুধালাম-
পৌঁছে গেছি? কাকু জবাব দিলেন, ম্যাকলাক্সি ছাড়িয়ে টোরি ঢুকব। কোনো কিছুরই নাম
শুনিনি আগে, তাই কিছুই বুঝলাম না। বাইরে জমাট অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে
চাকার ধাতব আর্তনাদ শুনতে শুনতে ইস্টিশানগুলো পার হচ্ছিল, হলুদ
ভেপারের আলোতে একটার নাম পড়লাম- মধুমালতি। অন্ধকারের মাঝে একটানা চেয়ে থেকে কেমন
যেন ঝিমুনি ধরে আসছিল। এবারে কাকু তাড়া দিলেন- নামতে হবে।
পরপর তিনটে রেললাইন পাতা, দুদিকে দুটো
প্ল্যাটফর্ম। তারমধ্যে যেদিকটাতে ছাউনি করা নেই আমরা সেই দিকে নেমেছি। ট্রেনটা চলে
যাওয়ার পর মধ্যেকার লাইনটা দিয়ে একটা ক্লান্তিহীন মালগাড়ির চলে যাওয়ার পর
ইস্টিশানের বাইরে এলাম। ধোঁয়াটে আলোতে দেখলাম টিকিট গুমটির উপরে তিনটে ভাষাতে লেখা
নাম- লাতেহার। ঘুমচোখে আমরা চারটে প্রাণী বাক্সপ্যাটরা নিয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগলাম
টিকিট কাউন্টারের সামনে। ট্রেন থেকে বাকি যে সকল প্যাসেঞ্জারেরা নেমেছিল তারা যেন
মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিস হয়ে গেল। খানিকক্ষণের মধ্যেই নন্দকাকু হাল ফ্যাশনের টুপি
পরিহিত সদ্য ঘুম থেকে ওঠা একজনকে সাথে করে নিয়ে এলেন, পিছু পিছু
আর একটা দেহাতি মানুষ এল। সকলে মিলে ধরাধরি করে ঝোলাঝাঁপি নিয়ে ইস্টিশানের বাইরে
এসে দেখি মাথায় ছই লাগানো খচ্চরে টানা এক ধরনের ছোট্ট গাড়ি। সামনে গাড়োয়ান, তার পিছনের
ডিব্বাতে মালপত্র, পিছনপানে মুখ করে একটা কাঠের বেঞ্চিতে পা ঝুলিয়ে পাঁচজন বসে
পড়লাম দুটো গাড়িতে ভাগাভাগি করে।
গাড়োয়ানের হাতে একটা ব্যাটারি টর্চ রাস্তা
দেখাচ্ছিল, খচ্চরের গলায় ঝুমঝুমি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে লাগল অন্ধকারের
বুক চিরে। আধা ঘন্টার একটু বেশি পৌঁছাতে লাগলেও মোট রাস্তা ৭-৮ কিলোমিটারের বেশি
হবে না। কোনোমতে হাত-পা ধুয়ে বিছানাতে গা এলিয়ে দিতেই সফরক্লান্ত শরীর
নিষ্প্রাণ দশায় পৌঁছে গেল।
(দুই)
পরদিন চোখ খুলতেই দেখি বিশাল উঁচু ছাদের কড়িবরগা, একটু চোখ
বুলিয়ে দেখলাম ঘরে অনেক পুরাতন আসবাবপত্র, নোনাধরা
মোটা পাথুরে দেওয়ালে কোথাও কোথাও রঙ চটে উঠে এসেছে খাবলা করে। ইয়াব্বড় জানালাতে
মোটা মোটা লোহার শিকের গরাদ, আর তার বাইরে চোখ যেতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল।
শিশু-কিশোরকালে বাবা-মায়ের সাথে একবার পুরী, একবার
গ্যাংটক ও একবার দার্জিলিং- এই ছিল সাকুল্যে ঘুরতে যাওয়ার খতিয়ান। জানালা দিয়ে
তাকালে প্রথমের একটা খালি সবুজ জমি, তারপর থেকে লম্বা গাছেদের সারি ঢালু হয়ে নেমে
গেছে। যতদুর চোখ যায় ঢালু জমিটা নদীর ধারে গিয়ে শেষ হয়েছে, চেয়ে থাকলে
কেমন যেন নেশা হয়ে যায়। একটা বিড়ি ধরিয়ে সুখটান দিতে দিতে সতুকে ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে
বললাম, ছাদে যাওয়া যায়? সে বিরক্তির সাথে বলল- আবার ছাদে কেন! বললাম দরকার আছে। সে
উল্টোমুখে শুয়ে জবাব দিল, বাইরে আছে খুঁজে নে। অগত্যা-
বাইরে এসে দেখি একটা লম্বা করিডর দিয়ে ইরা হেঁটে
আসছে, বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। সে জানাল আমাদেরই জাগাতে আসছিল, তাকে শুধাতে
ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির হদিশ পাওয়া গেল। ব্রাশে মাজন লাগিয়ে চললাম সিঁড়ির সন্ধানে।
একটা কাত করা থার্ড ব্র্যাকেটের মতো বাড়ির আকার, মাঝখানে
বাঁধানো উঠোন, সেখানে তুলসী মঞ্চ। দোতলা বাড়িটার দোতলাতে এগারোটা ঘর, নিচেও হয়ত
সমসংখ্যক। তুলসী মঞ্চের কিছুটা সামনে একটা চারচালার মাঝখান দিয়ে দেউরি, দু'দিকে
পাঁচিলের মতো সার দিয়ে দু'পাশে আরও গোটা ছয়েক ছোট-বড় ঘর। সিঁড়ি দিয়ে নেমে
পিছনের খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে কিছুটা গিয়ে একটা ছোট্ট ডোবা। খিড়কির বাইরে দেওয়ালের গা দিয়ে
কাঠের সিঁড়ি মাটি থেকে সোজা ছাদে উঠে গেছে। বেশ মজবুত, আমরা পলকা
শরীরে ওতে অনায়াসে চড়ে পড়লাম। অত্যন্ত কড়া রোদ, ছাদময় তিল
শুকাতে দেওয়া আছে।
চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখতেই মন ভরে গেল। যতদূর চোখ
যায় সবুজ আর সবুজ বন, বাড়িটা একটা বেশ উঁচু টিলার টঙে। অদূরে আরও একটা উঁচু টিলা, সেখানে
ঝর্ণা আছে। প্যাঁচালো উরগ রাস্তা উঠে এসেছে মালভূমির উপত্যকা থেকে, দূষণহীন
অঞ্চলে বেশ কয়েক কিলোমিটার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, দূরে
দিকচক্রবালে বনের বুক চিরে রেললাইন চলে গেছে, তারপরেই
একটা নদী, দূরে ঝাপসা জায়গাটাতে একটা হাট বসেছে হয়ত। বাকি তিনদিকে ঘন
জঙ্গল, যেন কোনো চিত্রকরের আঁকা তেলরঙা জলছবি। পিছনে হঠাৎ খসখস শব্দ, চমকে তাকিয়ে
দেখি একটা মেয়ে তিলগুলো ঝাঁট দিচ্ছে। সে হিন্দি, আদিবাসী আর
বাংলা মিশ্রিত এক খিচুড়ি ভাষায় বলে উঠল- আপনাকে নিচে ডাকছে। মেয়েটির দিকে তাকালাম, চোখেমুখে প্রখর
দীপ্তি, আদিবাসীদের মতোই ব্লাউজ বিহীন একছুটি দেওয়া একটা মলিন সুতির শাড়ি পরেছে।
বয়স আন্দাজ করা শক্ত, তবে কুড়ির কম মোটেও নয়। মুখের মাজনের থুতু ফেলে আরও একটা
বিড়িতে সুখটান দিয়ে নিচে নেমে এলাম।
হাতে কালো লাঠি, চোখে শৌখিন
চশমা ও ধুতি-মেরজাই পরিহিত এক ঋজু বৃদ্ধ গম্ভীর গলায় শুধালো, কী নাম! আমি
জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, মোটা থামের আড়াল থেকে জবাব এল- গুলুকোজ। ইরাবতী, সে ইশারা
করল প্রণাম করার জন্য। থাক থাক বলে একটা সন্দেহের দৃষ্টি ফেলে বৃদ্ধ অন্দরের দিকে
রওনা হয়ে গেলেন। আমারও দাদু আছে, বাড়িতে আমিই তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, কিন্তু এই
বৃদ্ধকে কেমন একটা যেন লাগল। দোতলাতে শুধু প্রস্রাব করার ব্যবস্থা আছে তাও রাত্রের
জন্য সংরক্ষিত, নিচতলায় সার দিয়ে স্নানঘর আর পায়খানা ঘর। কাকিমা উপর থেকে
হাঁক দিয়ে সতুকে বললেন, রাত্রের ক্লান্তি আছে, স্নান করে
নে- অর্থাৎ এটা আমার জন্যও প্রযোজ্য। বেশ খানিকটা দূরে উঁচু যে পাহাড়টা আছে, সেখানকার
একটা ঝর্ণা থেকে পাইপে করে জল আসে, বেশ ঠাণ্ডা জল। প্রাতঃরাশে বসে
দেখলাম এ বাড়ির বাসিন্দা খান তিনেক পরিবার, সতুর দাদুরা
দুইভাই ও তাদের এক বিধবা বড় বোন। দুই দাদুর ৫ ছেলে ৩ মেয়ের সকলের উপস্থিতিতে
বাড়ি গমগম করছে, তাদের বিভিন্ন বয়সের ছেলেপুলেরা কেউ কেউ আমাদেরই বয়সী।
বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা বলতে দুই দাদু, তিন ঠাকুমা, পিসিঠাকুমার
বৌমা আর নাতি-নাতনি, তাঁর ছেলেও গত হয়েছেন। আর রয়েছে গোটা দশেক কর্মচারী
আর চাকরবাকর। সকলের সাথেই প্রাথমিক আলাপ হলো আটার লুচি আর মেথি দেওয়া আলুর
ছেঁচকি খেতে খেতে।
দাদু সতর্ক করলেন, জঙ্গলে একা
একা কোথাও যাবে না, বুনোহাতি, চিতাবাঘ, ভাল্লুক আছে, তাছাড়া
বর্ষায় ভীষণ সাপের উপদ্রব। বেতলা জঙ্গল থেকে নীলগাই এমনকি বাঘও বেরিয়ে আসে কখনও
কখনও ইত্যাদি। উনি ওনার মতো সাবধান করতে লাগলেও আমার মন এই সকল কিছু দেখার জন্য
হাঁকুপাঁকু করে উঠল। সতুকে কথাটা পাড়তেই সে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, এসব আবার
দেখার কী আছে, জানালা দিয়েই তো দেখা যায়। বুঝলাম, সে
কারণে-অকারণে প্রতি বছরই এখানে আসে, তাই তার উৎসাহ নেই, কিন্তু আমার
কেন উৎসাহ থাকবে না! তার মামার দেওয়া একটা খেলনা ভিডিও গেম
নিয়েই ব্যস্ত হয়ে গেল। ইরাবতীও অন্দরের মেয়েদের মাঝে খেলতে ব্যস্ত, তাছাড়া
খেয়াল করছিলাম, প্রকৃতির প্রতি নতুন করে প্রেমে পড়ার দরুন হোক বা গতকাল
ট্রেনে একনাগাড়ে বেশ কয়েক ঘন্টা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে থাকার দরুনই হোক, আগে
মারাত্মক রকমের যে আকর্ষনটা ছিল ওর প্রতি, তাতে কেমন
যেন ভাটির টান অনুভূত হলো। ছুতোয় নাতায় ওকে দেখার যে সুখটা ছিল, সারাক্ষণ
তাকে সামনে দেখতে পেয়ে সেই সুখের নির্বাণ ঘটেছিল হয়ত বা। তবু চোঁয়া স্রোতের ঘাটতি
ছিল না, বয়সের দোষ হবে হয়ত।
বাড়িটা বেশ বড়, এবেলা
সেগুলোই ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। নিচেও টানা বারান্দা বেশ উঁচুতে, সেখান থেকে কয়েকধাপ
পাথুরে সিঁড়ি উঠোনে নেমে এসেছে। ব্র্যাকেটের পূর্ব বাহুর নিচতলার ঘরগুলো বাইরে
দিয়েও খোলা, ওগুলো কাছারিবাড়ি। সামনেটাতে ছাউনি করা রয়েছে। বিপরীত
বাহুটা গুদামঘর, দেউরির পশ্চিম দিকে হেঁশেল, ভোজনশালা আর
ঝি এর ঘর। পূবের ঘরগুলো অতিথিশালা, তারই একটাতে আমার ঠাঁই হলো পিসিঠাকুমার নাতি
সমবয়সী ধনঞ্জয়ের সাথে, প্রাতঃরাশের পরে। দক্ষিণখোলা ঘর, দু'দিকেই দরজা।
সামনে প্রশস্ত একটা ন্যাড়া মাঠের প্রান্ত থেকে ঢালু জঙ্গল নেমে গেছে, খাসা জায়গা।
নদীর তাজা মাছ দিয়ে জাঁকিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারা হলো সরকার বাড়িতে। নিশুতি দুপুরে
বেরিয়ে পড়লাম একাই। ডোবার একপাশে একটা গোয়ালে বেশ কয়েকখান গাই ও বলদ গরু, গোয়ালের
অদূরে কয়েকটা বড় সপ্তপর্নী গাছের নিচে খান দুয়েক কুঁড়ে। কৌতূহল বসত সেখানে
যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম, একটা মোটা মন্দার গাছে হেলান
দিয়ে কাঁচা বিড়ি খাচ্ছে গতরাত্রের টুপিওয়ালা সেই গাড়োয়ান। যেচে গিয়ে আলাপ করতে
আমতা আমতা গলায় জানালো তার নাম ফিরঙ্গি, সে তার মৌসার এক্কা চালায়। সকালে ডিউটি হয়ে গেছে, আবার রাত্রে
ডিউটি। নোংরা চামড়া, ময়লা জমা নখ, কটা চুল, গোঁফ, দাড়ির লম্বা
মুখো মানুষটাকে দেখে মনে হলো কিছুটা মদ খেয়ে আছে। এই অঞ্চলে
আদিবাসীদের মধ্যে সারাক্ষণ নেশা করে থাকাটা মোটেও আশ্চর্য নয়।
ভূগোল বইতে পড়েছিলাম ছোটনাগপুর মালভূমিকে ভারতের ‘খনিজ
ভাণ্ডার’ বলা হয়। কিন্তু কীভাবে সেই খনিজ তোলে তা দেখার খুব ইচ্ছা
হলো, কিন্তু তা পূরণ করবে কে! আইডিয়া খেলে গেল, গরুর গলায়
থাকা পাটের দড়ির মতো সরু পাকানো শরীরের ফিরঙ্গিকে শুধালাম- নিয়ে যাবি! খেয়াল করলাম, আমার মুখ
দিয়েও কেমন অবলীলায় তুই-তোকারি বেরিয়ে আসছে। ফিরঙ্গি না হলেও চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়স, জানলাম বিয়ে
থা করেনি, আক্ষেপের সাথে জানাল- তার বাপ মা বেঁচে থাকলে তারও সঠিক
সময়েই বিয়ে হতো। এখন সে কজরুকে পেতে চায়, তাকে বিয়ে করতে চায়, তাই ফাঁকা
সময় পেলেই কজরুর বাড়ির সামনে এসে বসে থাকে। আমি জানতে চাইলাম কজরু কে! সে বলল, বসো দেখতে
পাবে।
খানিক পর দেখি ছাদের সেই মেয়েটি সরকারদের বাড়ি
থেকে চপল পায়ে আঁচল চাপা দিয়ে কিছু আনছে, আমার সামনেই
ফিরঙ্গির রসালো প্রেম নিবেদনে সে বেশ লজ্জিত হয়ে ত্রস্ত পায়ে অদূরে সপ্তপর্নী গাছের
নিচের কুঁড়েতে সেঁধিয়ে গেল। বুঝলাম ওটাই ওদের বাড়ি। ফিরঙ্গিকে শুধালাম-
- তোর ঘর
কোথায়!
- নদীর ধারে
বাবু।
- কজরুও কি
তোদের সজাতি?
- হাঁ, বাবু। ওরা
জাতে সরাক। সারনা ধরম।
- পদবি কি!
টাইটেল!
- সেটা কী
বাবু!
ফিরঙ্গি মাথা চুলকিয়ে পাল্টা শুধাল। আদিবাসী
মেয়ের রোদে পোড়া এমন গমরঙা গায়ের রাগ! এমন টিকালো নাক! আমাদের ওখানে ধান জমিতে কাজ
করতে যে সকল আদিবাসীরা আসে, তারা সকলেই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ও চ্যাপ্টা খেঁদা নাক, তাই এমন
আদিবাসী মেয়ে দেখে বেশ কৌতূহল জন্মাল।
(তিন)
সারা বৈকালটা ফিরঙ্গির সাথে টিলার আশাপাশটা ঘুরে
দেখতে লাগলাম, অবশ্যই সরকার দাদুর থেকে অনুমতি নিয়ে। নদীর তীরে গেলাম, ভরা বর্ষার
ঘোলা জলে গর্ভবতী আরঙ্গা নদী দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে চলেছে নদীখাতে থাকা
পাথরের বাধাগুলোকে দর্পের সাথে মাড়িয়ে। সূর্যাস্তের নরম আলোতে তীরভূমি জুড়ে এক
কুহক পরিবেশের সৃষ্টি করে রেখেছে। ফিরঙ্গি মনের সুখে অজানা একটা সিংভূমি গানের সুর
ভাঁজছিল, চতুর্দিকে বুনো ফুলের গন্ধে নির্জনতা যেন ক্রমশ সত্তাকে
অবসন্ন করে দিচ্ছিল। এই প্রাকৃতিক ঔদার্য, একতরফা সবুজ
শালীনতায় আমরা গাঙ্গেয় সমতলের মানুষেরা অভ্যস্ত নই। ঘরে ফেরা পাখিদের পালকের খাঁজে
করে একটু একটু করে নরম অন্ধকার আকাশকে ধূসর করে তুলছে। তীরে ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে
লাল, বেগুনী, স্বচ্ছ কমলা রঙের নুড়ি পাথরের খাঁজে থাকা নামহীন ফুলের দল
দিনের শেষ আলোর সাথে আজকের মতো খেলা সমাপন করতে ব্যস্ত। একটা
রাত্রির সূচনালগ্নেও যে এমন একটা আসর বসে তা চাক্ষুষ উপলব্ধি
করতে এমনই নির্নিমেষ নির্জনতার প্রয়োজন। আধুনিকতার মেকি খোলসের আড়াল থেকে বেরোতে
পারলে যে কেউ এই পরবের অংশীদার হয়ে যাবে অজান্তেই।
সন্ধ্যায় হ্যাজাগ বাতির আলো অতো বড় বাড়িটার
অন্ধকার ছিটেফোঁটাও দূর করতে পারল না, সাধারণ সময়ে নিশ্চয়ই হ্যারিকেন আর তেলের কুপিই
ভরসা। শনশনে বাতাসের সাথে একপশলা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি গুমোট কাটিয়ে বেশ ঠাণ্ডা আমেজ
এনে দিল রাত্রির সূচনালগ্নে। দাদুর কাছে জানলাম
গ্রামটির নাম জের-বাচারা, এই বাংলো অবশ্য গ্রামের বাইরে। পূর্বদিকে জঙ্গলের
আড়ালে একদম কাছেই বেন্দি নামে একটা ইস্টিশান আছে। দাদু বললেন, চাকর
মুনেশ্বরকে নিয়ে কাল ভোরে উপরের টিলায় গিয়ে যেন সানরাইজ পয়েন্ট দেখে আসি। দোতলার
ঘরে খানিক গল্পগাছার পরেই খুব তাড়াতাড়ি নৈশাহার সেরে, টেলিফোনে মায়ের
সাথে খানিক কথাবার্তার পর ঘরে এসে শুয়ে পরলাম। দক্ষিণের
খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে বাতাস এসে ঢুকতে লাগল, ঘরে একটা ম্যাড়ম্যাড়ে
হ্যারিকেনের বাতি। বাড়িতে রাত্রি ১০টার আগে খাওয়াই হয় না, সেখানে
এখানে সন্ধ্যা আটটার সময় ঘুমানো কীভাবে সম্ভব! সাথে কোনও গল্প বইও আনিনি, অগত্যা
জানালার দিকে চেয়ে রইলাম বিছানাতে উবু হয়ে শুয়ে।
অনেকটা দূরে নিচের সমতলে বয়ে চলা দুকুল ছাপানো
আরঙ্গা নদীর ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ কানের কাছে বাজতে লাগল। জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোয় জঙ্গল
পাহাড় ঘেরা নিঝুম নিস্তব্ধ আদিম এই ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চল কেমন যেন অস্থির
মাতাল করে তুলল। চাঁদের শুভ্র আধো আলো-আঁধারির গা ছমছমে সন্ধ্যায় বন্য পাখপাখালির
পিলে চমকানো ডাক যেন আমাকে সৃষ্টির আদিতে পৌঁছে দিল। কিশোরবেলায় বইয়ের পাতায় পড়া
গূঢ় রহস্য-রোমাঞ্চের জন্ম দেওয়া ভয়াল রজনীর আজই যেন অভিষেক হতে চলেছে আমাকে সাক্ষী
রেখে, বাইরের সকল কিছুই তার আয়োজনেই ব্যস্ত।
ইতিমধ্যে ধনঞ্জয়ের সাথে বেশ ভাব জমে উঠল, ভায়া শহুরে
সিগারেট। তারা নাকি রাজপুতের বংশ, পদবি সিং। গোল বোকা বোকা চোখের
দিকে তাকালে মনে হয় মানুষটি জিরোচ্ছে। তেমনই গোল মুখ, তেলদিয়ে পেতে
আঁচড়ানো একমাথা চুল, মোটা মোটা ভোঁতা আঙুল, পড়নে ঢোলা জামা প্যান্ট। অনাবশ্যক চোখ
পিটপিটি করা ছাড়াও দেখলাম নাক খোঁটার রোগ রয়েছে। বেশ আমুদে
ছেলে, সমবয়সী ভাবলেও সে আমার চেয়ে অন্তত বছর পাঁচেকের বড়। ক্লাস এইট পর্যন্ত একটা
বোর্ডিং ইস্কুলে পড়েছিল, তারপর আর ফেরেনি সেখানে। কাজকর্ম তেমন একটা করে না, সারাবছর
আদিবাসীদের ঝুমুর টোলির সাথে সেরেঞ হয়ে ঘুরে বেড়ায়, নায়েকদের
সাথে দামদর করে ইত্যাদি। শিল্পী মন, সকলে শুয়ে পড়লে রাত্রের অন্ধকারে নিচে নেমে গিয়ে
আদিবাসী মহল্লাতে সেও নাকি নাচের মহড়াতে যোগ দেয়।
নাচগান থেকে আয়পত্র বিশেষ কিছু একটা হয় না, খাওয়া-দাওয়াটা
জুটে যায়, যেমন এই সংসারে থাকার দরুন ঘরে খাবারটুকু জোটে। তারও বড্ড
বিয়ের ঝোঁক উঠেছে, সেই ভাবনায় সারাক্ষণ ভয়ানক দুশ্চিন্তাতে থাকে সে। শুধাতে
তার কাছেই শুনলাম, এ এলাকাতে অনেক শহুরে বাবুই নাকি হাওয়া বদল করতে আসে, তারা যে সব
দ্রষ্টব্য স্থানে ঘুরতে যায় তার একটা সংক্ষিপ্ত তালিকাও পেলাম, যথা- বেতলার
জঙ্গল, তোপচাঁচি, কেচকি, কেঁড়, জোনা ঝর্না, নেতারহাট, ম্যাকলাক্সিগঞ্জ, মারুমার, চেরো রাজার
টুটা মহল, কেল্লা, কমলদহ, সুগাবাঁধ সহ নানান ঝর্না, যেগুলোর
সবকটার নাম সে নিজেও জানে না বা মনে নেই এই মুহূর্তে। রাত্রি সোয়া ন’টা নাগাদ
চুপিসারে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, বলল মহড়াতে যাচ্ছে, মাঝরাত্রে
ফিরবে।
একা একা বেশ গা ছমছম করতে লাগল, প্রথম
রাত্রেই এই আদিম আরণ্যক পটভূমির সমগ্র রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণকে আত্মস্থ করব তার সাধ্য
কি! দোতলায় একটা রেডিও চলছে মৃদু শব্দে, সেটাকে ছাপিয়ে দূরে ছাতিম কুটিরের
কাছ থেকে যেন একটা গোঙানি কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। জানালার দিকে চেয়েই ছিলাম, দেখলাম একটা
ছায়ামূর্তি পূর্বদিক থেকে দৌড়ে পশ্চিমের ঢালু মহুয়া, পলাশ, শাল, মাদারের বনে
অদৃশ্য হয়ে গেল। ভয়টা জেঁকে বসল, অগত্যা ঘুমাবার চেষ্টাতে ব্রতী হলাম। তন্দ্রা
আসতেই স্বপ্নের পরিধিতে হাতছানি দিতে লাগল নির্জন পাহাড়ি গ্রাম, উচ্ছল
পাথুরে নদী, গহিন জঙ্গল, বুনো গন্ধ- সব মিলেমিশে এক মোহাবিষ্ট করা
প্রতিকৃতি এঁকে দিল হৃদয়ের ক্যানভাসে।
ধনঞ্জয় কখন ফিরেছিল জানি না, খুব ভোরে
একজন দেহাতি স্থানীয় মানুষের আওয়াজে ঘুম ভাঙল। চোখ খুলে দেখলাম মুনেশ্বর এসেছে, পাকানো ধাতব
তারের মতো ঠিকরে বেরিয়ে আসা শিরা-উপশিরা যুক্ত আবলুস রঙা শরীরে খাটো নোংরা ধুতি
পরিহিত উপজাতি সম্প্রদায়ের বৃদ্ধ, মুখমণ্ডলে অযত্নের হলদে গোঁফদাড়ি, কানের লতির উপরেও
খুব বড় বড় লোম। ঘোলাটে চোখের দিকে তাকালে কেমন একটা ভয় করে, খোলা অথচ মৃতের
মত স্থির। যেতে যেতে তার কাছে শুনলাম ওরা বংশপরম্পরায় এই অরণ্যভূমিতে বসবাস করছে, অল্পবিস্তর
চাষাবাদ করত আগে, এখন বয়স হওয়াতে সে বাবুর সেরেস্তাতে ফাইফরমাইস খাটে, দুটো ভাত
জুটে যায়।
বুঝলাম এই জঙ্গলই এদের
জীবন-জীবিকা, এই সকল কিছুতে এদেরই একচ্ছত্র অধিকার থাকার কথা ছিল, কিন্তু
বন্দুকের নল আর চরম দারিদ্রতার কাছে মাথা নুইয়ে দাসত্বগিরি করে চলেছে এরা। এই জল, জঙ্গল, জমি সবকিছুর
সাথেই আদিবাসীদের জীবনধারা অঙ্গাঙ্গীভূত। শ্যাওলা ধরা আদিম পথে নানা রকমের গাছ
চোখে পড়ল, কত রঙিন অর্কিড। আনকা রঙিন পাখির ঝাঁক, মর্কট
গোষ্ঠী, কাঠবেড়ালি, প্রজাপতি আর ফড়িং এর দল আমাদের সহযাত্রী হলো। মুনেশ্বর
গাইডের মতো খুব যত্নের সাথে স্থানীয় নাম বলে যেতে লাগল। আরও জানাল আমি চাইলে সে
খরগোসের মাংস খাওয়াতে পারে, তার নাতি আধনুকে বললেই সে তীর দিয়ে শিকার করে এনে
দেবে। আরও জানলাম এই জঙ্গলে নেকড়ে, বাইসন, শম্বর, নীলগাই, চিতল, লাঙ্গুল, শিয়াল, আর চিঙ্কারা
আছে। যদিও সেসব মারলে পুলিশে ধরবে, কিন্তু চাইলে সেসবও নাকি যোগাড় করে দেওয়া সম্ভব।
দূরে একটা পাহাড়ের খাঁজ থেকে আদুরে সূর্যের
আড়মোড়া দিয়ে জেগে ওঠার যে রূপ অতো সুন্দর হতে পারে, তা এর আগে
কখনও উপলব্ধি করতে পারিনি। জঙ্গলের সাথে যেন একতরফা প্রণয়ের বাঁধনে ক্রমশ বাঁধা
পড়ে যেতে লাগলাম। দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঢেউখেলানো জমির উপরে ছোটবড় টিলা, নিচে সাপের মতো
শুয়ে থাকা রেললাইন, তারপরেই দুরন্ত নদী। কত জাতের নাম না জানা পাখিদের কাকলিতে
মুখরিত হয়ে উঠল এলাকাটা, আরও একটা নতুন দিন পাওয়ার ফুর্তি উদযাপন করছে তারা- প্রাণ
খুলে। খানিকক্ষণ সেখানে থেকে মুনেশ্বরের সাথে দেহাতি বাজারে এসে পৌঁছালাম। কয়েকটা
খুপরিতে চা বিক্রি হচ্ছে, আরেকটু দূরে আদিবাসী মহিলারা অ্যালুমিনিয়ামের
হাঁড়িতে করে কিছু একটার পসরা সাজিয়ে বসেছে, মুনেশ্বর
একটু শরমের সাথে বলল- ওটা হাঁড়িয়া ছোটবাবু। দু'একটা ছোট্ট
নিচু চালার দোকান। তারই একটাতে গরম গরম কচুরি ভাজছিল, লোভ সামলানো
মুশকিল হলো। কাঁচা শালপাতার ঠোঙায় মুনেশ্বরের ভাষায়- কচৌরি, সব্জি, জলেবি আর
ফুলড়া খেলাম পেট পুরে দুজনেই। মুনেশ্বর একটু আমতা আমতা করছিল, খাওয়ার পর
কৃতজ্ঞতাতে তার চোখ চকচক করে উঠল। বহুদিন এসব খায়নি হয়ত, হতদরিদ্র
উপজাতি বৃদ্ধকে সেধে খাওয়াবেই বা কে!
ফেরার সময় একটা ছোট্ট সরোবরের ধারে নিয়ে গেল
মুনেশ্বর, সেখানেই তার ঘর। তার মেয়ে শুকনি আর নাতি আধনুকেও দেখলাম।
মুনেশ্বরের পদবি গাঞ্জু। লম্বা লম্বা ডেউয়া, পলতা মাদার, পারিজাত আর নানা ধরনের জিয়ল গাছে ঘেরা
এই কাকচক্ষু টলটলে সবুজ জলাশয়টিকে দেখলে এক মুহূর্তে কোনো স্বর্গীয় চিত্রপট বলে
ভ্রম না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। বেশ নিকানো ঝকঝকে তকতকে আঙিনা ওয়ালা ঘর মুনেশ্বরের, বাইরের
দেওয়ালের চারিপাশে লাল মাটির প্রলেপ দেওয়া পৈটে। অদূরে একটা ছোট্ট সব্জি বাগান, গোয়ালে গরু।
কয়েকটা হাঁস মুরগির সাথে একপাল শুয়োরও চরছে সেখানে। সরকার নিবাসে পৌঁছাতে প্রায়
পৌনে নটা বেজে গেল।
(চার)
স্নান সেরে নমঃনমঃ করে একটা
পরোটা খেয়ে উঠে পড়লাম, বাজারে খাওয়ার পর্বটা চেপে গেলাম। খেয়ে কাছারির গদিতে বসে কার্যপদ্ধতি
দেখলাম খানিক। সতু তার তুতো ভাইদের সাথে ক্রিকেট খেলার জন্য ডাকলেও সেখানে যেতে মন
চাইল না। কাছারির বৃদ্ধ ম্যানেজার প্রেমচান্দ ভকত বেশ কড়া দরদাম করে আদিবাসী
পুরুষ-মহিলাদের থেকে ভুট্টো, সরষে, খেসারি, কলাই সহ নানা ধরনের ভুষিমাল খরিদ করতে ব্যস্ত। একপাশে কাঁচের
জাড়ে ঘি ডাই করা আছে। সরকার দাদু দাম মেটাচ্ছেন হিসাব মিলিয়ে, অধিকাংশ জনই
দেখালাম সাবেক দেনার দায়ে জর্জরিত। সরকার দাদুর আরেক ভাইয়ের রাঁচিতে দোকান আছে, এই মালগুলো
সেখানেই চালান করে দেন। এই পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারদের কয়েকশ বিঘা ধেনো জমি সহ
সম্পত্তি আছে, যেখানে শীতে আজকাল সরষে, গরমে তিল
চাষ হয় গোবর সার দিয়েই, অল্পবয়সী মুহুরি রামফল গোস্বামীর কাছেই এসব শুনেছিলাম। সে
মূলত তেজারতির জাবদা-খতিয়ান রাখে। এনারা দুজন সহ আরও একজন ছোট মুন্সী ও একটা খাস
চাকর আছে, প্রত্যেকেই আবাসিক কর্মচারী।
রোদের মধ্যে খানিক ক্রিকেট খেলে একটা ঝাঁকড়া মহুল গাছের নিচে
পাথরের উপরে বসে জিরোতে লাগলাম। সতু অন্দরে চলে যেতে ধনঞ্জয় এসে পাশে বসল ধূমপানের
লোভে। দূরে গোয়ালে একজন মহিলা কাজ করছিল, সেখানে প্রথম দিন ছাদে দেখা সেই মেয়েটিও ছিল।
ধনঞ্জয় একটা নিষ্ফলা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হেনে কাঁচা খিস্তি দিল। শুধাতে আকাশপানে মুখ
করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, কজরুর কথা। সে অনেক কথা, সংক্ষেপে
যেটা বুঝলাম- ধনঞ্জয়ের নাচিয়ের দল চায় কজরু তাদের দলে নাচুক। ওদের দলের নাম ‘সেঙেল’, সে দলের
সর্দার সেরেঞ ফুদিয়া পরহিয়া- কজরুর মা শনিচরীকে তার জন্য বায়নাও দিয়েছে অনেকটা
টাকা। কিন্তু কজরু গোঁ ধরে রেখেছে, সে নাচাগানা করবে না।
“বেজন্মা ছিনালের বাচ্চা আবার বলে- নটী সাজবে
না” দেহাতি টানের কথাটা কানে ঝনঝন করে বাজল। শুধাতে আমার দিকে ভ্রু কুঞ্চন করে
সন্দিগ্ধ দৃষ্টি হেনে বলল- সে মাগি তোমাকেও হেঁয়ালি দিয়েছে নাকি আবার! আমি কথা
কেটে বললাম, কী যে বলো দাদা…। ধনঞ্জয় বলল, ওই শনিচরী
বাঁজা বলে ওকে ডাইনি সাজিয়ে গাঁ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল যোগিয়াডিহ গাঁয়ের মাহাতো।
কোনো এক ডাকবাংলোতে কাজ নিয়েছিল, সেখান থেকে কোনো শহুরে ধনীর
অবৈধ সন্তানকে কুড়িয়ে এনে বড় করেছে। দাদু গোয়ালে কাজের জন্য বুড়ি মাহালিকে রেখেছে
সস্তায় পেয়েছে বলে। এবারে আমাকে সাক্ষী মেনে ধনঞ্জয় শুধাল- হলো কিনা বেজন্মা!
সত্যি বলতে সেই সময় বেজন্মা, অবৈধ এসবের মানেই বুঝতাম না। ধনঞ্জয়কে সেসব আর
বললাম না, হু হাঁ করে ওর কাছ থেকে উঠে চলে এলাম।
কজরু তাহলে আদিবাসী নয়, শহুরে ধনী
কন্যার মেয়ে, যার মা তাকে ফাঁকি দিয়েছে। এইটুকু বুঝেছিলাম, আর সেটাই
সারাক্ষণ মাথার মধ্যে পাক খেতে পাগল। ক্রমশই তার প্রতি আগ্রহ বাড়তে লাগল, আমার যেমন
বাবা মা আছে- তারও আছে। কিন্তু সে জানে না তারা কারা, কতই না
দুর্ভাগা মেয়েটি। দুপুরে খাবার পর মুনেশ্বরকে বললাম তার নাতিকে ডেকে দিতে, পৌনে তিনটে
নাগাদ আধনু এসে হাজির হলো, বছর ১০-১২ বয়স হবে, খালি গায়ে
একটা সস্তা ইংলিশ প্যান্ট শুকনো লতা দিয়ে বাঁধা। হাতে এক টাকার দুটো কয়েন দিতেই
চরকির মতো দুটো পাক খেয়ে নেচে নিল। সেই বড় মহুল গাছটার
নিচে গিয়ে বসলাম, আসলে চোখ তখন কজরুর কৌতূহল মেটাবার দায়ে ব্যস্ত। উপলব্ধি
করলাম- একেই হয়ত অবৈধ বলে।
আধনুর সাথে চললাম কেল্লা দেখতে। সরকার বাড়িতে
বিকাল থেকেই ভিসিপিতে সিনেমার আসর বসবে, তারই প্রস্তুতিতে সাজসাজ ভাব বাচ্চাদের মধ্যে।
সতু সহ বাড়ির কেউ রাজি না হলেও ইরা যেতে রাজি হয়ে গেল, সে সকলের
সাথে সিনেমা দেখবে না। কিন্তু তাকে সাথী করতে কেন জানি না মন সায় দিল না। বৃষ্টিতে
ধোয়া কাঁকর বেছানো পথের কোথাও এক বিন্দু ধুলোর উপস্থিতি নেই, সর্বত্র যেন
গাঢ় সবুজ রঙের পোঁচ মেরে রেখেছে প্রকৃতি। উতরাই থেকে নেমে রেললাইনের কাছটাতে থমকে
দাঁড়ালাম, একটা মেটে রঙের বিশাল মালগাড়ি মন্থর গতিতে চলছে তো চলছেই।
সামনেই বেন্দি ইস্টিশান, নামেই ইস্টিশান- না আছে কোনও প্ল্যাটফর্ম না টিকিটঘর। সারা
দিনে একটা আপে একটা ডাউনে ট্রেন থামে। থাকার মধ্যে আছে দুটো সিমেন্টের খুঁটিতে
আঁটা সিমেন্টের রঙচটা হলুদ বোর্ডে তিন ভাষায় বেন্দি নামটা।
একদিকে গহীন জঙ্গল, অন্যদিকে নদী- এমন স্থানের রেলস্টেশনে যেন প্ল্যাটফর্ম
থাকাটাই অপরাধ। প্রকৃতির মাঝে খোয়া বেছানো রেলপথ দূত হয়ে এই আদিম অরণ্যে সভ্যতার
মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। আমাদের যাওয়ার সকল উদ্দেশ্য নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল,
এই জঙ্গলের পথে পথে হেঁটে বেড়াবার মাঝেই যেন অভীষ্ট লিপ্সা লুকায়িত রয়েছে, যার খোঁজে
অভিভাবক ছাড়া প্রথম বারের জন্য বেড়াতে এসেছি।
নদীর দিকের লম্বা ঘাসের ঝোপ থেকে দেহাতি ভাষায়
একটা রিনরিনে গলায় ভেসে আওয়াজ এল- কোথায় এসেছিস! নিজের চারিদিকে একটা চক্কর খেয়ে
চতুর্দিক তাকিয়ে দেখলাম কজরু। বেশ খানিকটা থতমত খেয়ে গেলাম, আসলে
মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকলে যা হয় আর কি। হতেই পারে বয়সে সে আমার চেয়ে বছর চার পাঁচের বড় তাবলে আচম্বিতে
এই পাইকারি তুইতোকারিটা আমার হজম হলো না, বুঝতে চেষ্টা করলাম উদ্দেশ্য আমি না আধনু! আবার
একই প্রশ্ন ভেসে এলো, স্পষ্ট লক্ষ্য আমি। পাল্টা শুধালাম, তুই এখানে
কেন! সে বেশ মুখরা, বলল- এটা তো তাদেরই দেশ। একটু থেমে বলল, কেরোসিন
আনতে গিয়েছিলাম রেশন দোকানে। দেখলাম হাতে খান দুয়েক বড় জ্যারিক্যান। আর কী বলব
বুঝে উঠতে পারছিলাম না, অথচ এই খানিক আগেই তাকে নিয়ে কত ভাবনা ভাবছিলাম, আচমকা সব জট
পাকিয়ে গেল। আচমকাই ঘাসের ঝাপের দিক থেকে পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম, দেখলাম
নন্দলাল কাকু কয়েকজন আদিবাসী চাকরবাকর নিয়ে ওই পথ ধরেই ফিরছেন। দেখা হতে শুধালেন
কেমন লাগছে এই জঙ্গলের দেশ। আমি মৃদু হেসে সম্মতিসূচক অস্ফুট জবাব দিতে দিতেই উনি
উপরের দিকে হাঁটা জুড়লেন। যেতে যেতে বললেন- দেরি করবি না বাবা, জংলি
জানোয়ার বুনোহাতি বের হয় যখন তখন। খনিক থেমে একটা চাকরকে দিয়ে কজরুর হাত থেকে
জ্যারিকেন দুটো নিয়ে ওকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুই সাথে
সাথে থাক কজরু, সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরবি সন্ধ্যার আগে।
আমি নাড়াবুনের মত চেয়ে রইলাম, ওনারা ক্রমশ
চড়াইয়ে জঙ্গলের আড়ালে মিলিয়ে গেলেন। কজরু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, আমি বাধা
দিয়ে বললাম- এই তুই তোকারিটা করো না, বড় অশ্লীল শোনাচ্ছে। পরক্ষণেই ভাবলাম, কালই আমি
ফিরঙ্গির উপরে এটার প্রয়োগ করেছিলাম, অগত্যা আমাকেও তুমি বলা শুরু করতে হলো। সে শুধালো
নেতারহাট গেছি কিনা, যথারীতি জানালাম এই এলাকাতেই জীবনে প্রথম বার এলাম। সে বললো
চলো ‘পান্টেস’ দেখিয়ে আনি। যাচ্ছিলাম কেল্লা দেখতে, গেলাম অন্য দিকে, কে জানে প্যান্টেস
কী জিনিস। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কজরু এমনভাবে যেতে লাগল যেন চোখ বেঁধে
ছেড়ে দিলেও সে একইভাবে হেঁটে যাবে। আমার যাবতীয় আকর্ষণ হাতি আর ভাল্লুক দেখার, একথা বেশ
কয়েকবার তাকে বললামও। একস্থানে তো মিছিমিছি হাতি বলে চেঁচিয়ে ভয়ও দেখিয়ে সে কী
খিলখিলিয়ে হাসি।
কজরু আমার হাতে একটা গাছের ভাঙা ডালের লাঠি ধরিয়ে
বলল সাবধানে দেখে পা ফেলতে, শেয়ালের গর্ত আছে। মাঝে একটা উঁচু গাছ থেকে
কিছুটা মৌমাছির চাক ভেঙে এনে দিল আধনু, টসটস করে মধু গড়িয়ে পড়ছে। ওরা দুজনেও মধু চাঁটতে লাগল, আর আমাকে
খেয়ে প্রতিশোধ নিলো হিংস্র মৌমাছির দল। মশা, বোলতা, মৌমাছি, ভীমরুল এদের
সাথে যেন আমার জন্মের শত্রুতা, সুযোগ পেলেই হলো। অনেকটা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একটা
ফাঁকা প্রান্তরে এসে পৌঁছালাম। কজরু আধনুকে সাঁওতালি ভাষায় কিছু একটা বলতে সে
কোত্থেকে কিছু বুনো আতা আর খাজা কাঁঠালের কোয়ার মতো কিছু ফল এনে দিল জঙ্গল থেকে।
শুধালাম ‘পান্টেস’ কই? দেখাল- ওই তো। পাহাড়ের ধাপ কেটে কেটে সমতল জমি
বানিয়ে সেখানে সার দিয়ে কিছু একটা চাষ করেছে। কাছে গিয়ে বুঝলাম নাসপাতি বাগান।
যদিও পান্টেস এর ব্যাখ্যাটা পরে নন্দকাকুর থেকে জেনেছিলাম- ওটা প্ল্যান্টেশন। যা
কজরুর অপভ্রংশ ছিল - পান্টেস।
ফিরতে ফিরতে বলল, আমাদের মোটর
গাড়ি আছে কিনা, নতুবা সে তাদের দেশের নানা ঝরনা আর বিল দেখাত। বললাম, ফিরঙ্গির
গাড়ি নিলে হয় না! মুখে একটা বিকৃতি ফুটিয়ে বলল আমি নানকু মামার কাছ থেকে গাড়ি চেয়ে
আনব। নানকু কে! সে বলল, ফিরঙ্গির বাপ। রাত্রে সেদিন মনোহরী মেজাজে মোটা দুধের চায়ে
চুমুক দিতে দিতে অনেকক্ষণ তাস খেললাম ধনঞ্জয়, রামফল আর
দারোয়ান বিরোধী সিং এর সাথে। রামফল হোমিওপ্যাথি করে, ঘরে অনেককেই
ওষুধ দেয়। কিন্তু ম্যানেজার প্রেমচান্দ শুদ্ধ ভেষজ আয়ুর্বেদের জড়িবুটির বাইরে কিছুতেই বিশ্বাসী
নয়, তাই সে গুছিয়ে হোমিওপ্যাথির নিন্দা করে। যা বুঝলাম, বিরোধী সিং একটা
আস্ত গিনিপিগ, সে সবেতেই ‘হাঁ বাবু’ বলে- তাই তার উপরেই
যাবতীয় আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথির আরকের পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে। সে যাই হোক, এনাদের দুয়ের
শখের দ্বন্দ্বে বুনো আদিবাসীগুলো কিছু তো ওষুধ পায়। ঘরে টেলিফোনে কথা বলার রুটিন শেষ করে
বিছানাতে শরীর সঁপে দিতেই মেঘলা আবহাওয়াতে ঘুমিয়ে গেলাম সারাদিন হাঁটার ক্লান্তির
ভারে।
(পাঁচ)
বনবাসীরা এমনই সরলমতির হয়ে থাকে। ছোটনাগপুর
মালভূমির বিস্তীর্ণ পাথুরে ও জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলের লালচে কালো মাটির এই দেশের রুক্ষ
ভূ-প্রকৃতি, শাল পিয়াল মহুয়ার সজীব গহন, অজস্র ছোট
টিলা-পাহাড়ের জাদু মাখা পরশখানি একান্তই স্বতন্ত্র। এই প্রাকৃতিক কাঠিন্যর ভেতরে
যদি অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করা যায়, দেখা যাবে এই রুক্ষ দেশের বুকের ভিতরে থাকা মনটি
বড়ই কোমল। এই পাহাড়-অরণ্যের দেশের একান্ত সংস্কৃতিগুলো এদের স্বাতন্ত্র্যতাকে পুষ্ট
করেছে। কাঁকুরে মালভূমি, ফাঁকা টাঁড়, জঙ্গলের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা অসংখ্য
নির্জন গ্রামের জনজাতিভুক্ত মাটির মানুষেরা, বিচিত্র
তাদের জীবনযাত্রার ধরন। সবই যেন মিলেমিশে থাকে, যা আমাদের
তথাকথিত আধুনিকতার বাইরে, এক আলাদা ভারতবর্ষ। তরঙ্গায়িত এই ভূমি পত্রপতনশীল
শাল, কেন্দু, সেগুন, মহুয়া, পিয়াল, আবলুসের নিবিড় বনানীর শ্যামল আলিঙ্গনে দৃঢ়বদ্ধ।
খেয়ালী নদনদীর কলতান আর খলখল হাসিতে উচ্ছল। এই রুক্ষ রূঢ় প্রকৃতির কোলে লালিত মানব
সন্তানদের জীবনের বিচিত্র লীলা, অনার্য সংস্কৃতির সাবলীল বিকাশ।
সামনের বুধবার নাগপঞ্চমী তিথি, শ্রাবণ
সংক্রান্তি বা ডাক সংক্রান্তি। সরকার নিবাসে এই দিনই মূল পুজো, আজ রবিবার
থেকেই হাঁকডাক পড়ে গেছে। গ্রামের সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওঁরাও, হো, খাড়িয়া, বীরহড়দের
মতো উপজাতিদের পাশাপাশি এতদ অঞ্চলের নানা কৃষিজীবী সম্প্রদায়, ভূমিজ ও
অন্যান্য বৃত্তিজীবী সম্প্রদায় যেমন বাগদি, কুড়মি, কুমহার, হাড়ি, রাজোয়াড়, মাল, মহালি
প্রমুখ সম্প্রদায়ের মানুষেরা দেবীর উদ্দেশ্যে নৈবদ্য অর্পণ করে, যাকে বাটা
বলে। সরকারেরা অর্থবান মহাজন, তাই তাদের পুজোতে ইচ্ছা হোক বা অনিচ্ছাতে- এলাকার
প্রায় সকলেই যোগ দেয়। কার কখন অর্থের দরকার পড়ে কে বলতে পারে, তাই নেক
নজরে থাকা আর কি। অনেকে মানতও করে থাকে, সেই মতো পাঁঠা বলি দেয়, কেউ কেউ
মুরগি, এমনকি লাউ বলিও দেয়। ফি সন্ধ্যায় মজলিশি আসরে এই সকল কথা আর সরকার বাড়ির
পূর্বজদের বীরত্বের ইতিহাস নিয়ে আলাপচারিতার দরুন সরকার দাদুর বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে
উঠলাম। খেয়াল করলাম ইরাবতী একটু অতিরিক্ত যত্নের চেষ্টা করছে না চাইতেও, কারণে-অকারণে
ঘনিষ্ঠ হয়ে গল্প ফাঁদার প্রচেষ্টা করছে। ব্যাপারটাকে বেশ উপভোগ করতে লাগলাম।
সকালটা এদিক সেদিক, কাছের
জঙ্গলে, নদীর পাড়ে কাটিয়ে দিলাম ইরাবতী সহ বেশ কিছু বাচ্চাকাচ্চার দলকে সাথে করে। ফিরে
দেখি কজরু মহুল গাছের নিচে বড় পাথরটার উপরে বসে আছে। গত চার দিনে ওকে
এভাবে বসতে দেখিনি, নিশ্চয়ই আজ ঘরের কাজগুলো যথাসম্ভব শেষ করে ফেলেছে বেলা
একটার আগেই। ওর পাশে ধনঞ্জয় আর ফিরঙ্গি উৎপাত করছে। অনুমান করলাম সে আমারই
প্রতীক্ষা করছে, খাওয়া শেষ হতে বেলা দুটো বেজে গেল। কোনোমতে আঁচিয়েই দে ছুট।
কিছুটা কপট ধমকের সুরে কজরু বলল- এইটুকু সময়ে কদ্দুরেই বা আর যাব, তার উপরে
যদি বৃষ্টি হয় তো সব মাটি। কাজরু এক্কা চালাতে লাগল, আমি পিছন
পানে পা ঝুলিয়ে জঙ্গল দেখতে দেখতে চললাম। এই জংলী বুনো পরিবেশে এক আদিবাসী(!) মেয়ে
যেন আমাকে বশ করে ফেলল, সে আমার অভিভাবক হয়ে আমার উপরে তদারকি করতে লাগল।
যে মানুষ জঙ্গলে যায়নি, সে কখনই তার
অনাবিল আত্মাকে খুঁজে পেতে পারে না। সভ্যতার নাড়ি যোগ রয়েছে জংলার
স্যাঁতস্যাঁতে পথে। জঙ্গল এমনই এক পরিবেশ
এখানে মানুষ বেহিসাবি বেপরোয়া হয়ে উঠে, লুকিয়ে থাকা সাহসেরা যেন খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসে।
ঘন্টাখানেক শুধুই এক্কাগাড়ির চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর বাতাসের হিসহিসানি ডাক।
এমনই তন্ময় হয়ে ভাবসাগরে ডুবে ছিলাম যে কতটা এসেছি বা কতক্ষণ এসেছি সেটা খেয়ালই
করা হয়নি। গাড়ি থেমে যেতে পিছনে চেয়ে দেখি একটা নদী, পাড়ের সাথে
এক সমান্তরালে ছুটে চলেছে। কজরু বলল, এটা কোয়েল নদী বাবু। অরঙ্গার মতোই, কিন্তু এর
বেগ আরও বেশি। চারিদিকে রঙবেরঙের শ্যাওলা, বড়বড় ফার্ণ
গাছের ঝোপ। নদীর ওপাড়ে কিছু লতাগুল্মের ঝোপের পরেই গাছগুলো পাইন, দার্জিলিং
এর রাস্তায় দেখেছিলাম। নদীতে কিছু ভোঁদড় আর তীরের বালিতে গেঁড়ি গুগলি খাওয়ার লোভে
ভিড় করা অসংখ্য পাখি, প্রজাপতি আর ফড়িংদের সম্মেলন বৈকালটাকে অপার্থিব করে
তুলেছে।
কজরু কিছু পাকা ডুমুর, পাকা
তেলাকচু আর জংলি কাঁকুড় এনে দিল। কথা বলতে মন চাইছিল না, কজরু বলেই
চলল- নদীর ওইপাড়ে নেতারহাট। অনেক লোক ওখানে ঘুরতে আসে, ওর মা
সেখানেই আগে কাজ করত ইত্যাদি। আমি কথার অমনোযোগী হয়ে নদী অরণ্য আর এই আদিবাসী
মেয়ের উচ্ছলতাকে প্রাণভরে আস্বাদন করতে লাগলাম। নদীর উপরের বড় গোল শিলাখন্ডে বসে
সেই দস্যি মেয়েকে পা দোলাতে দেখে আমিও সাহসে ভর করে সেখানে পৌঁছে গেলাম। এ মেয়ের শরীর
জুড়ে একনই একটা উচ্ছল নদী বয়ে চলেছে অদৃশ্য কোনো বিনোদ বাঁশির সুরের ইশারায়। কজরু আবার
মিছিমিছি ভাল্লুকের ভয় দেখাতে আর একটু হলে পড়েই যেতাম নদীবক্ষে পা হড়কে। কজরু
ঝাঁপিয়ে জাপটে ধরে বাঁচিয়ে নিল পড়ে যাওয়া থেকে। কোয়েলের বুকে হয়ত বা পড়তে পড়তে
বেঁচে গেলাম, কিন্তু কজরুর বুকের নদীতে তলিয়ে গেলাম কবিত্বের রসে লেপ্টে
থাকা আমি।
আদিবাসী রঙ্গিনী মেয়ের শক্তপোক্ত মেদহীন
আঁটোসাঁটো শরীর, শিশুকালের অপুষ্টিকে ছাপিয়ে যৌবন নদীর জোয়ার তার জিনগত
কমনীয়তাকে খাঁজে খাঁজে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ত্রপিত সূর্য পাইনের
মাথার আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাঙা হয়ে রয়েছে, শূদ্রক হয়ত এমনই এক কল্পে মৃচ্ছকটিক রচনা করেছিল।
আমি সেই পুরাকালের পালকরাজ- প্রোদ্যৎ সাম্রাজ্যের বণিক চারুদত্ত, রাজনর্তকী
বসন্তসেনা আজ কজরু নাম নিয়ে জন্মেছে। ভয় হচ্ছিল এই বোধহয় সমস্থানিক চলে আসে আর
দুর্দরকের সাথে শলা করে আমার নামে বদমান ছড়িয়ে দেয় নগরে!
আর্যকের মুখ কল্পনা করলাম, তাকে সতু
মনে হলো, দাদুকে মাথুর- ওরা ধুতাকে জানিয়ে দিয়েছে আমার প্রেয়সীর কথা।
ইরাবতীকে ধুতা কল্পনা করার চেষ্টা করে সফল হলাম না। মুহুর্মুহ দৃশ্য বদলে যাচ্ছিল
নাকি সময় স্থির হয়েছিল তা ভবপিতায় জানে। এ যে আমার সদ্য যৌবনের প্রাকলগ্নে
বাহুলগ্না কোনো ললনা। ভালোবাসার অদৃশ্য পাখিটা মহুলের নেশায় মাতাল হয়ে গান গাইছে
আর এই আদিম অরণ্যে কোয়েলের বুকে এক অদৃশ্য মুকুরে আঁকা হয়ে চলেছে একটা একতরফা অবৈধ
প্রেমের উত্থান পর্বের ইতিহাস। বিপ্লবীরা আজ হিম নিথর হয়ে গেছে, সবটুকু
বিদ্রোহ আমার ধমনীর রাজপথে দুর্দমনীয় গতিতে এগিয়ে চলেছে- এই ক্ষুদ্র জীবনে না
পাওয়া কোনো নিয়তির দিকে।
বাবু, খুব লেগেছে? সম্বিৎ
ফিরল। যে মেয়ের মুখে পূর্ণিমার হাসি চুইয়ে পড়ত মুক্তের মতো দাঁত বেয়ে, এখন সেখানে
ভয়ের করাল অমানিশা। সে পুনরায় বলল, এইটুকু ভয়ে কেউ অজ্ঞান হয়ে যায়! চলো ঘরে ফিরতে
হবে। আমি আমতা আমতা করে নেমে এলাম, সন্ধ্যা হতে তখনও বেশ খানিকটা বাকি। এক্কাতে
কজরুর পাশে এসে বসলাম, অজ্ঞানতার আড়ালে আমার যাবতীয় সঙ্কোচ কেটে গেলেও- কজরু শক্ত
আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। এবারে আমি সারাক্ষণ বকবক করতে লাগলাম, সে ঘোড়া
ছোটানোতে মন দিল। আমার মনের রঙ্গমঞ্চে যে একটা ছোট্ট নাটক মঞ্চস্থ হয়ে গেল এ মেয়ে
তার খোঁজই রাখে না। সে হয়ত জানেই না নাটক কি, ইস্কুলেই
যায়নি কখনও। আমার অধিকাংশ প্রলাপের জবাবে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল আমার মুখপানে।
পিছনে পড়ে রইল আমার যৌবনবনের শাখায় ধরা প্রথম অনিষিক্ত মুকুলের ছায়া। আলিঙ্গন হলো
নিবিড় স্পর্শ, যা শরীর ও মনে প্রশান্তি বয়ে আনে। এখন জানি এ সবই
অক্সিটোসিন হরমোনের লীলা। যে যাইহোক, আমার প্রথম অসমাপ্ত লীলার ঘ্রাণের সব ইতিহাস
সন্ধ্যার আঁধার দিয়ে চিরতরে মুছে দেবে এই প্রৌঢ় পৃথিবী!
(ছয়)
যখন ঘরে ফিরলাম দেউরিতে তখন শাঁখ বাজছে। অনেকগুলো
প্রশ্নবাণ ছুটে এলো, নন্দকাকুই রক্ষা করলেন- জোয়ান ছেলে ঘুরে দেখছে ক্ষতি কী!
এটাই তো বয়স। সহসা মায়ের ফোন আসাতে প্রশ্নে ইতি পরল। সন্ধ্যায়
চা-মুড়ি খেয়ে অন্ত্যাক্ষরীর আসর জমে উঠল, দিলওয়ালে দুলহনিয়া হোক বা আকেলে হাম আকেলে তুম, আশিকি,
রাজা হিন্দুস্থানী, ইশক কিম্বা কুছ কুছ হোতা হ্যায় সিনেমার গানগুলো যখন ঘুরে
ফিরে কারও ঠোঁটে গুঞ্জিত হতে লাগল, সবার অলক্ষ্যে চারটে চোখের সলাজ দৃষ্টির শিক্ত
অভিষঙ্গ হতে লাগল। সাড়ে আটটার মধ্যেই জলসা ভঙ্গ হলো, খেতে যাব
বলে হাত ধুতে যাচ্ছি একটা আবেগপূর্ণ চঞ্চল হাসি হেসে বারেবারে চোখের সামনে দিয়ে
যাতায়াত করতে লাগল ইরাবতী। হৃদয়ের চেয়ে শক্তিশালী অদৃশ্য পরিবাহী আর দ্বিতীয়টি নেই, একপ্রান্তে
তড়িৎ সঞ্চারিত হলে মুহুর্তে অপরপ্রান্তে তার বার্তা পৌঁছে যায়। কে যেন এক
বন্ধু বলেছিল, সমবয়সী কিশোরের চেয়ে সমবয়সী কিশোরীটি মানসিক ভাবে অন্তত ৫-৬
বছরের পরিণত হয়, আজ তার প্রমাণ পেলাম। দীর্ঘ ৮-৯ মাস যাবৎ হ্যারিকেনের বাতির
সামনে ঝুঁকে পড়ে ক্রমাগত হতাশার দীর্ঘশ্বাসকে অন্যজন জ্ঞানত উপেক্ষা করেছিল, অর্থাৎ আমার
মনের খবর সম্বন্ধে সবটাই ওয়াকিবহাল ছিল ইরাবতী।
জোয়ান চিবোতে চিবোতে ঘরে এসে শুতে গিয়ে দেখি
চৌকিতে একটা চিরকুট। সমস্ত ব্রহ্মান্ড যেন ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো নেত্য করতে লাগল, হৃদস্পন্দনের
গতি মুহূর্তে চর্তুগুণ হয়ে উঠল। এখনও খুলে দেখিনি, কিন্তু জানি
এ চিঠি কে লিখেছে। এটা আমার এতদিনকার লালন করা একবুক ভালোবাসার সনদপত্র। হোয়াটস
অ্যাপ প্রজন্মের কিশোর-কিশোরী কাগজের চিরকুটের লুকানো চিঠির মাহাত্ম্য বুঝবে না।
জানি না সে কত গোপনে এসে এই চিরকুটখানি এখানে ফেলে গেছে, কিন্তু আমি
বোধহয় তার চেয়েও বেশি গোপনে পরম মমতায় খুলে দেখলাম- সকাল আটটাতে উপরের টিলার ঝরনার
পিছনে। একটা আধিদৈবিক সুখের স্টিমরোলার আমার সর্বাঙ্গ জুড়ে চলতে শুরু করল, অভিলাষের
শুঁয়োপোকারা যেন তার শত সহস্র রোম দিয়ে আমাকে অনুরাগের কাঁটায় বিদ্ধ করে রক্তাক্ত
করে তুলতে লাগল।
পুরুষের চরিত্র কতই না কর্বুর। আমি আমিই সন্ধ্যার
সময় এক চপলা বন্য মেয়ের প্রেমে নিজেকে চারুদত্ত ভেবে স্বপ্নের সাগরে সপ্তডিঙা
মধুকর তরনী ভাসিয়ে দিয়েছিলাম, তার পরবর্তী প্রহরে সে আমিই তথাকথিত সভ্য সমাজের
এক অসামান্যা রূপসী কিশোরীর পিরিতে আবেগহারা কোটালপুত্র হয়ে পক্ষীরাজের জিন
সাজাচ্ছি। আসলে প্রকৃতিগতভাবে পুরুষ মাত্রই বহুগামী, তাই বিশ্বের
সকল পতিতালয়ই পুরুষের জন্য। মনটা খারাপ হয়ে গেল এই অনাহুত দোটানার ফাঁসজালে আঁটকে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে আতালি-পাতালি ভাবতে লাগলাম। ইরার সাথে সম্পর্ক জমে গেলে তা
আমার জন্য হয়ত বা চিরন্তন, কিন্তু কজরুকে কে মেনে নেবে! তাছাড়া কজরু কি চায়
সেটাও তো জানিনা! সে হয়ত মালিকের অতিথির সেবা-যত্ন করছে, যেটাকে আমি
প্রেমের নীরব বহিঃপ্রকাশ ভেবে ভ্রমে আছি।
পাপ-পুণ্যের কথা এলেই ধর্মের স্মরণাপন্ন হতে হয়।
শাস্ত্রের দিকে তাকালে আমরা দেখি শ্রীকৃষ্ণ ও দ্রৌপদী, দুটোই
বহুগামি চরিত্র। শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু পুরুষ তাই তাঁর বহুগামীতাকে লীলাখেলা হিসাবে
শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। অর্জুনের ক্ষেত্রেও তাই। আজকের সমাজে সকলেই পার্থ বা
পার্থসারথির মতো সন্তান চাইলেও কেউ দ্রৌপদী কিম্বা কুন্তির মতো কন্যা বা বৌমার
প্রত্যাশা করে না। কারণ আজকের সমাজব্যবস্থায় এদের বলা হয় নষ্টা, চরিত্রহীনা।
শ্রীরামচন্দ্রের মায়েরও দুইজন সতীন ছিল, তার পরেও বহুগামিতার সন্দেহে সীতাকে অগ্নিকুণ্ডে
আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল। সিদ্ধান্তে এলাম, বহুগামিতা
নারী-পুরুষ সকলের মধ্যেই আছে, সেটা দোষের নয়- দোষ হচ্ছে ধরা পড়ে যাওয়াটা, নতুবা এটা
এক প্রকারের লীলা। অতএব একটা খাসা ঘুম দরকার।
ধনঞ্জয় এসে ঘরে ঢুকল, বলল- যাবে নাকি মহড়াতে! আজ সেই শালীকেও নিয়ে
গেছে। আবার ভাবনার ভরকেন্দ্র পক্ষীরাজ থেকে সপ্তডিঙায় সাওয়ার হলো। শুধালাম, মারধর করেছে নাকি!
জবাব এল, নাহলে কি
মানত! মনে মনে ভীষণ রাগ হলো, কিন্তু প্রকাশ করার উপায় নেই, এদের কাকে কতটুকুই বা চিনি! সিদ্ধান্ত নিলাম যাব, কিন্তু এই বিদেশ
বিভূঁইতে এমন মাঝরাত্রে বাড়ির কর্তাকে অজ্ঞাত রেখে যাওয়া কি ঠিক হবে! এই ভাবনাতে
খানিকক্ষণ সময় ব্যয় করে যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিলাম। এক পাপেও পাপ, বাহান্ন পাপেও পাপ; তাতে যা আছে কপালে।
চুরি ডাকাতি তো আর করতে যাচ্ছি না, তাছাড়া ধনঞ্জয় এই বাড়িরই লোক। ফুল প্যান্টটা গলিয়ে নিয়ে
ত্রস্ত পদে রওনা দিলাম।
খোদ কোলকাতা শহরের লোক না হলেও এক্কেবারে অজ
গাঁয়ের বাসিন্দা নই,
পাকা রাস্তা,
বিজলি বাতি আর বিপুল জনঘনত্ব দেখে অভ্যস্ত। এমন অরণ্য পরিবেশ একদমই নতুন আর
অনভ্যস্ত। নৈশব্দেরও যে একটা শব্দ আছে সেটা অনুভব করাই হতো না যদি না এই রাত্রে
বের হতাম। এই শব্দ কান দিয়ে নয়, সর্বাঙ্গ দিয়ে অনুভব করতে হয়। স্পষ্ট নিজের হৃৎস্পন্দন শোনা যাচ্ছে। একঝাপটা ভিজে
বাতাস মাঝে মাঝে সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করছে অদ্ভুতভাবে, দামাল তরুদলের সাথে শলা করে এক রহস্যময় আওয়াজ
তৈরি করছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে রাতচরা পাখিদের ডাক, আর্তনাদের মতো ভয় আর প্রাণের উপস্থিতির জানান
দিয়ে যাচ্ছে। জমাট অন্ধকারের প্রাচীর দিয়ে গড়া এই বিশ্বচরাচরে, মেঘের আবডালে থাকা
আকাশকেও কালো আলকাতরার মতো লাগছে। একটা আধটা নক্ষত্ররাজি মাঝেসাঝে জোনাক পোকার মতো
তার ফিকে আলোকবর্তিকায় শিরশিরানি আদিমতাকে আরও বেশি মোহময় করে তুলেছে।
অরণ্যের প্রেক্ষাপটে মেঘের চাদর সরিয়ে কখনও সখনও
চাঁদের ধোঁয়াটে আলো পড়লে, পিছনের সরকার বাড়িটাকে অতিকায় হানাবাড়ির মতো লাগছিল। একটা
বিড়ি জ্বালাতে গিয়েও জ্বালালাম না, তাতে এই পরিবেশের কৌলীন্যে আঘাত হানত। নেশার খেয়ালে ধনঞ্জয়
যন্ত্রমানবের মতো নিশ্চুপ হয়ে হেঁটে চলেছে অন্ধকারে। ওকে অনুসরণ করে অবশেষে মিনিট
২৫ পর জঙ্গলের মাঝে একটা গ্রামে পৌঁছালাম, মাটির বাড়িগুলো গোরস্থানের কবরের মতো শুয়ে আছে
বিক্ষিপ্তভাবে। গোয়ালের প্রাণীগুলোর নিঃশ্বাস ছাড়া কোথাও কোনো মানুষের সাড়াশব্দ
নেই। অবশেষে একটা মৃদু আলো দেখতে পেলাম, কয়েকটা লোক একটা হ্যারিকেন জ্বেলে বসে আছে। কাছে যেতে
বুঝলাম এটা মাটি থেকে এক ফুট উঁচু একটা আটচালার মঞ্চ, প্রমাণ সাইজের খান চারেক ঘরের সমান। আড়ে বহরে
সমান, সরু
শালবল্লারের খুঁটির মাথায় জংলি ঘাসের ছাউনি। আরও মিনিট পনেরোর মধ্যে প্রায় জনা
তিরিশ নানা বয়সের মহিলা-পুরুষ এসে হাজির হলো হ্যারিকেন সহ, স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল এরা একপ্রস্থ ঘুম সেরে
এসেছে।
আমার খাতির আপ্যায়নের কোনো ঘাটতি হলো না, উষ্ণ আথিতেয়তায়
মহুয়ার মদ, হাঁড়িয়া সহ
অনেক কিছু ফলমূল খাবার এলেও এক জামবাটি গরম গাঢ় দুধ ছাড়া কিছুই নিলাম না। খানিক
আগেই সরকার বাড়িতে বনমুরগির ঝোল দিয়ে হা-ঘরের মতো ভাত সাঁটিয়ে এসেছি। গাঁয়ের বৃদ্ধ
মাহাতো এসে স্বাগত জানাল, আমি তাদের রীতি জানি না, তাই ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়েই রইলাম। জানলাম তার
নাম মাটরু ভেটকা। আমি একটু দূরে একটা দড়ির খাটিয়াতে পা তুলে বসে বসে দেখতে লাগলাম।
খানিক পরেই একজনকে প্রায় হিঁচড়াতে হিঁচড়াতে নিয়ে এল, আলোর কাছে আসতে বুঝলাম কজরু। ক্ষণিকের বিহ্বলতায়
আমার কেমন প্রতিক্রিয়া করা উচিৎ ভুলে গেলাম। মেয়েটির শরীরী ভাষায় পরিষ্কার
বিদ্রোহের ছাপ, ভাষা না
বুঝলেও এটা বুঝলাম সে নিশ্চিত খিস্তিখেউর করছে, কারণ এটা কাকুতি-মিনতির ভাষা নয়। আমি একটু দূরেই
বসেছিলাম অন্ধকারের মধ্যে, এরই মাঝে সে আমাকে দেখতে পেয়ে ভূতে পাওয়া রোগীর মতো আচমকাই
বরফের মতো শীতল হয়ে গেল,
খানিক আগের ওই চিল-চিৎকারগুলো যেন ঘটেইনি। আসলে সে এখানে আমাকে আশাই করেনি।
এবারে তারা নিজেদের মধ্যে কী কথা বলল কে জানে, তারা আর জোরজবরদস্তি না করে কজরুকে ছেড়ে দিল, সে আমার উল্টোদিকের
অন্ধকারে আরও মহিলাদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।
আমি গোটা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। একটা
অল্পবয়সী ছেলে ‘ঝনবা’ আমার খটিয়ার নিচে
মেঝেতে বসল, তাকে আমি এই
নাচ সম্বন্ধে বাংলাতে শুধাতে সে কী বুঝল কে জানে, কয়েকজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে এনে বসিয়ে দিল।
হ্যারিকেনের আবছা আলোতেও দেখতে পেলাম অগুন্তি বলিরেখা এনাদের মুখমন্ডলের উপরে
ইচ্ছামতো খেলা করেছে। এনাদের নাম রামকিষুণ, শকুন্তী, সোমরী ও জগদীশ। তাদের মতন করে দেহাতি ভাঙা ভাঙা
বাংলাতে এই নাচের বিশ্বকোষ তুলে ধরল আমার কাছে। এদের সংস্কৃতিও যে কতটা ধনী আমরা
তথাকথিত সভ্য সমাজের লোক কতটুকু জানি, অথচ আমরা হাজার হাজার বছর ধরে এদের পড়শি হয়ে বাস করছি। আমরা
কতই না স্বার্থপর।
(সাত)
আমরা আদিবাসী মানে সকলকেই সাঁওতাল বলে একটা মোটা
দাগে বিষয়টাকে শেষ করে দিই। আসলে এদের মাঝে হরেক জাতের উপস্থিতি আছে, কেউ উচ্চ
আবার কেউ নিচু। সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওঁরাও, হো, খাড়িয়া, বীরহড়, ভূমিজ, কুর্মী, লোহার, বাউরি, বীরনিয়া, খেরওয়ার, শবর, কোড়া, পাহাড়িয়া, হাড়ি, বাগদি, বেদে, ঘাসিরা
সকলেই স্বতন্ত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। প্রত্যেকেই উপজাতি মানে সিডিউল ট্রাইব।
এরা গর্বের সাথে বলে আমরা হিন্দু নই, আমরা প্রকৃতি পুজারি, যে ধর্মের
নাম ‘সারনা’। এই অরণ্য অঞ্চলের ভূমিজ মানে যারা জমির মালিক তারা ছাড়াও
ভুনজার, তুরি, মাহালি, মুশহরদের বাস রয়েছে। এরা মূলত হিন্দু, যাদের মূল
দেবী মনসা। তার পুজোতেই এই অঞ্চলের যাবতীয় ধুম। সারনা ধর্মাবলম্বীরা মূলত সূর্যের
পুজো করে, যার নাম সিং বোঙ্গা। এদের ভাষার নাম ‘কুরুখ’। এই সকল
উপজাতিদের মূল উৎসব কার্তিক মাসের ‘সোহরায়’, এছাড়া আমাদের পুরুলিয়া অঞ্চলে যখন টুসু পরব হয়
তখন এই উপজাতিদের মধ্যে ‘করম পরব’ পালিত হয়।
কোথাও কোথাও করমের ধুম সবচেয়ে বেশি হয়। এছাড়া বাঁধনা, জাওয়া ও
সারহুল নামে ছোট ছোট পরবও পালিত হয়।
করম পরবে ‘খিল কদম’ নামের একটা
পবিত্র গাছের ডাল কেটে সেটাকেই পুজো করা হয়। সোহরায় মূলত আদিবাসী বর্ষশেষের উদযাপন, এই পরবে
পাঁচদিন ধরে শুচিকরণ, মহাভোজ, গবাদী পশুর সেবা, নাচগান ও
বিসর্জন পালিত হয়। এনাদের তরফে আমি বারংবার নিমন্ত্রণ পেলাম সামনের কার্তিক মাসের
পরবে যেন আমি অবশ্যই অংশগ্রহণ করি। এরপর এল নাচের মাহাত্ম্য। এই নাচের নাম ঝুমুর, ধান রোয়া
হয়ে গেলে এরা দল নিয়ে বেরিয়ে পড়বে, গাঁয়ে গাঁয়ে গিয়ে নাচ দেখাবে। নামটা আমার কমন
ঠেকল, ফি বছর শীতের সময় আমাদের পাড়ার মেলায় কবিগান, বাউল ও
ঝুমুরের আসর বসে। রাত্রে হয় বলে কখনও দেখার সুযোগ হয়নি, তাই আগ্রহ
বাড়ল আরও কিছুটা।
ঝুমুর মূলত বিসর্জনের গান, কোথাও কোথাও
একে ঝুমেইর, ঝুমরি নামেও ডাকে। একসময় রেডিওর অনুরোধের আসরে একটা স্থানের
নাম আমরা রোজ শুনতাম, বিহারের ঝুমরি তালাইয়া। সেখান থেকে প্রচুর মানুষ তাদের
পছন্দের গান শুনতে চেয়ে চিঠি লিখত বেতার দপ্তরে। এ নামটাও
ঝুমুর থেকেই উৎপত্তি। গবেষক সোহম দাসের একটা লেখায় পড়েছিলাম- পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম
মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম, ঝাড়খণ্ডের রাঁচি, সিংভূম, হাজারিবাগ, পালামৌ, গিরিডি, ধানবাদ, বোকারো, সাঁওতাল
পরগনা, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ, কেওনঝাড়, সুন্দরগড়, সম্বলপুর
ইত্যাদি বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই গান ভীষণভাবে প্রচলিত। গোটা বাংলা জুড়েই নানান
ধরনের হরেক প্রকার লোকনৃত্যের প্রচলন আছে যারা প্রত্যেকে স্বতন্ত্র। কেরালার কুচিপুরিকে
নিয়ে যেভাবে মার্কেটিং করা হয়েছে তার ছিটেফোঁটাও পায়নি আমাদের বাংলার নিজস্ব
লোকসংস্কৃতি। তাই ছৌ নাচ, কাঠি নাচ, বুলবুলি নাচ, নাচনি নাচ, দাসাই নাচ
সহ বিভিন্ন চলমান লোকসঙ্গীতের আসর যেমন টুসু গান, ঝুমুর গান, ভাদু গান, সোহরায় গান
খ্যাতি পাওয়া তো দূরস্থান, ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে যাবার প্রতীক্ষায় অন্তিম
শ্বাস নিচ্ছে।
এরই মধ্যে একটা গাছের কাটা ডালে সিঁদুর তেল
মাখিয়ে তাকে নমস্কার করে ওদের নাচের রিহার্সাল শুরু হয়ে গেল। ঢোল, নাগাড়া, মাদল, টিটকারি
বাঁশি ও সানাই এর শব্দে রাতের জমাট নিস্তব্ধতা খানখান করে উঠল। ঘুমিয়ে থাকা পাখিরা
ককিয়ে ডেকে উঠল। মাথায় সাদা ফেট্টি পরা একজন গান ধরল- “ভাদর মাসে
গাদর জনাইর, জল হৈল ঘাট হে, পুড় গৈলা, মোর ভাদর
মাইসা লেট হে, পুড় গৈলা”। ঝুমুর গায়ককে বলা হয় রসিক বা মাদোইলা। বছরভর
নানা আনন্দ-বিষাদের ঘটনার কথা, পুজো-পার্বণ নিজেদের সংস্কৃতি সবকিছু মিলেমিশে
তাদের গানের বোল তৈরি হয়। ঋতুভেদে ও দৈনন্দিন কাজের ধরন ভেদে গানের কথা ও সুরের
বদল ঘটে।
ঝুমুর আসলে এই মানুষগুলোর তপ্ত শোনিতধারার মতো, ঝুমুরের
প্রতিটা লয় এদের প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে যুক্ত, যা চলমান
সমাজের জলছবি। অরণ্যচারীদের সময়কে জানতে হলে, তাদের
জীবনধারাকে বুঝতে হলে ঝুমুর জানতে হবে। আদিবাসীদের সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান, অবসর-বিনোদন, প্রেম-বিরহ, আশা-নিরাশা, শিল্প ও
সৃজন, কীর্তি, সংগ্রাম কিম্বা প্রতিবাদ- ঝুমুরই তাদের হাতিয়ার। পুরুষেরা
মূলত বাজনা বাজায় আর মেয়েরা দল বেঁধে হাত ধরাধরি করে নাচে। রামপতিয়া, পাউয়ান, সুরিণ, কুলেশ্বরের
বাজনা বেজে উঠতেই রুদনী, সবুতরী, মুনিয়ারা একটা অদ্ভুত ছন্দে দুলেদুলে নেচে উঠল
ঘুঙুরের ঝুমঝুম শব্দে। এই ছন্দগুলোর নামও আছে, ডহরওয়া, রিঁঝামাঠা, ঝুমরা এমন
আরও কত কী। সার্থক নাম বটে ঝুমুর। এদের সকলের আদর্শ সলাবত মাহাতো, ইনি নাকি
ঝুমুরের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী।
এই দফা নাচ শেষ হয়েই আচম্বিতে উপস্থিত সকলকে অবাক
করে কজরু একটা অন্য ধারার নাচ নাচতে শুরু করল মাদলের দ্রিমি দ্রিমি বোলের ছন্দে।
তার পায়েও ঘুঙুর বাজছে ঝুমঝুম করে, এক বৃদ্ধা বলল এটা বাঈ নাচ, ভীষণ কঠিন।
আমি নাচের ন বুঝিনা, আমার কাছে সবই সমান, ব্যক্তিগতভাবে যদিও
কোনোটাই আমার সেভাবে পছন্দ হয়নি এ যাবৎ। তবুও দেখলাম অন্ধকারের মধ্যে চিতা আর
হরিণের লড়াইয়ের মতো কজরুর শরীরে নানান বিভঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে, অপলক ভাবে
সেই আদিম নাচ দেখতে লাগলাম। সে ডুবে আছে একটা মাতাল ঘোরের ভিতরে, মাঝে মাঝে
তার করুণ তীর্যক দৃষ্টি আমার হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে এই দৃশ্যের
অভ্যন্তরে আরেক দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে। যুবতী শরীর জুড়ে উন্মাদীয় মাদকতা, কফির মতো
কোমল তেতো লালিত্যে মাখা, শরীরের বিভঙ্গে যৌবনের নিশিডাক। বেচারা ফিরঙ্গী
আগুনের রথে সাওয়ার হতে চায় শুকনো কাঠের তেজ নিয়ে। কজরু যেন ঝিনুকজন্ম, একটা
মুক্তার বিস্ফোরণের অপেক্ষায় দিন গুনছে।
সৌন্দর্য বর্ণনাতে মধ্যযুগের কবিরা আজকের
অস্থিচর্মসার নায়িকাদের কথা দুঃস্বপ্নেও আনেননি। আমাদের লৌকিক চিন্ময় দেবী
মূর্তিগুলোর শরীরও বেশ মাংসল, সুডৌল বক্ষদেশ, আর গালদুটো
অবশ্যই ফোলাফোলা। কবি জয়দেব হোক বা মহাকবি কালিদাস, তাঁদের
বর্ণনার নিক্তিতে মেদ ততটা প্রাধান্য পায়নি কখনই যতটা স্তন গুরুত্ব পেয়েছে।
কমনীয়তাই নারীর সৌন্দর্যের মাপকাঠি, কমনীয়তা যত বেশি আবেদনময় হবে সৌন্দর্য ততই
অসীমতার দিকে ধাবিত হবে। এক অপার মুগ্ধতায় এই স্বল্পালোকে এক চরম মোহিনীশক্তির
আবেদনে বুঁদ হয়ে রইলাম।
প্রায় পৌনে দুটোর সময় আমরা ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা
দিলাম। মানা করা সত্ত্বেও মাহাতো দুজন শক্ত পুরুষকে সাথে দিলেন পৌঁছে দিতে। পথে বাঁকের
মুখে হাতির পালের সামনে পড়তে পড়তে নাকি বেঁচে গেছিলাম, ধনঞ্জয়
তেমনটাই বলল। আমি যদিও অন্ধকারে কিছুই ঠাওর করতে পারিনি, তখনও কজরুর
মোহিনী ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারিনি। চুপি চুপি দরজা খুলে চৌকিতে শরীর দিতেই ঘুমিয়ে
কাদা হয়ে গেলাম।
(আট)
সকালটা হলো খুব সুন্দরভাবে। মুখের উপর একটা কোমল
হাতের স্পর্শ খেলা করে বেড়াচ্ছে, চোখ খুলে দেখি ইরা। সামনের জানালা দিয়ে এক টুকরো
নিশ্চল রোদের খণ্ড তার রূপের দুত্যিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসতে
যেতেই একটা স্নিগ্ধ সোহাগমাখা হাসির গোপন ইশারার ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন করে নিজের
পদ্মরঙা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে সুসসসসস করে আওয়াজ করে বলল- ‘উঠে পড়ুন
সরকার’, সাতটা যে বাজতে চলল। অনেকটা রাত্রে শুয়েছি, তাই একটু
দেরিতে ঘুম ভাঙাটা স্বাভাবিক, ওকে আর কিছু বললাম না। এ মেয়ের কামনা বড় পবিত্র ও
একমুখী, আমার মতো দ্বৈধীভাবাপন্ন ব্যামিশ্র চরিত্রের নয়। নিজেদের যৌবনের বন্ধ দুয়ারের
ওপারে কী নেশা আছে জানি না, প্রতিটি রাত কাটে নীলচে নীলাভ স্বপ্নময় কৌতূহলের
এক দাহন কারাগারে।
চৌকির একদম ধারে কাত হয়ে একটা পাছা দিয়ে অর্ধেক
উপবিষ্ট হয়ে বাম হাতের উপরে ভর দিয়ে বসল ইরাবতী, ক্রমশ ইরার
মুখটা আমার মুখের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল, হৃদয়াবতীর ঐশ্বর্য স্বয়ম্বরে আমি আজ একাকী
রাজপুত্র। আমার সদ্য ওঠা গোঁফের রোঁয়াতে ইরার নিঃশ্বাসের অগ্নিরথ ঢেউ খেলিয়ে
দিচ্ছে, এক অসহনীয় আবেগে চোখ বন্ধ হয়ে আসবে- ঠিক তখনই হঠাৎ বৃদ্ধ পিসিঠাকুমা তার নাতি
অর্থাৎ ধনঞ্জয়ের খোঁজে ঘরে ঢুকতেই আমরা দুজনেই ভীষণ চমকে মুদ্রাভঙ্গ হয়ে গেলাম।
এমন প্রেমাস্পদ প্রলোভনসঙ্কুল দৃশ্যের প্রাকলগ্নে পিসিঠাকুমা একটা ভয়ানক সন্দিগ্ধ
শীতল অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি হেনে, থমকে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আস্তেব্যাস্তে বিড়বিড় করতে
করতে বেরিয়ে গেলেন।
উনি যেতে ইরাও ঘূর্ণিঝড়ের মতো উধাও হয়ে গেল।
নিজেকেই বলল্যাম, ব্যাটা এ বাড়িতে তোমার মেয়াদ শেষ, মার খেতে না
চাইলে মানে মানে এই বেলা কেটে পড়ো। মানস চক্ষে ফুটে উঠল, সরকার বাড়ির
আঙিনা দানবদের ক্রীড়াক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। জিহ্বার খন্ডিত অংশে চাপচাপ রক্তপিণ্ডের
দলা জমে বাকরুদ্ধ করে রেখেছে, কিছু যে বলব সে উপায় নেই। দেউরির বাইরে
স্বর্ণচাঁপা গাছটার নিচে অবৈধ কৃতকর্মের দলিল হিসেবে দেহের আনাচে কানাচে ক্ষত আর
আঘাতের ভূগোল নিয়ে পড়ে রয়েছি আমি। নিস্পন্দ দেহ হতে নির্গত রক্ত আর অশ্রুর নোনা
গন্ধে ছেয়ে গেছে গোটা টিলাটা। ডুমুরের মতো ফুলে ওঠা চোখের কুঠুরি থেকে
আর্তনাদ করছে শোধশঙ্খের মন্দ্রতা। শাস্তির দস্তানা পরিধান করে বিচারের নামে আসামীর
বক্ষচ্ছেদেই যেন একমাত্র প্রতিকার। একটা মহলে একটা জঙ্গলে, দুটো পাখি
অসহায় ডানা ঝাপটাচ্ছে সামাজিকতার মেকী শৃঙ্খলে। অতঃপর নিথর হয়ে পড়ে থাকা লাশ পচে
যাবে জঙ্গলের কোনো গহিনে কিম্বা ভেসে যাবে নদীর আবর্জনার সাথে; শুধু আখ্যান
রয়ে যাব কোনো রূপকথায়, হয়ত বাঁধা হবে কোনো ঝুমুর গান। হতাশ আমি ঈশ্বরের কাছে পাপ ও
তার প্রায়শ্চিত্তের সাক্ষ্য দানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দিলাম।
বাইরে থেকে কেউ নাম ধরে হাঁক দিল, শিরে
সংক্রান্তি। ঝটাপট বাক্সপ্যাঁটরা গুছাতে লাগলাম, তার মধ্যেই
ঘরে প্রবেশ করলেন নন্দলাল কাকু অর্থাৎ ইরার বাবা। আমি তখনও প্রায় লাশ, ওনাকে দেখে
ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে টাল খেয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। উনিই ধরে বললেন- কী অবস্থা, শরীর খারাপ
নাকি! ও দিকে বাস যে চলে এসেছে, তুমি যাবে না বেতলা? ইয়ে, না মানে – আমি আমতা
আমতা করতে লাগলাম। উনি বলে চললেন, তাড়াতাড়ি স্নান করে রেডি হয়ে নাও। ঠিক ১০টার সময়
রওনা, মুখহাত ধুয়ে ব্রেকফাস্ট করে নাও। প্রমাদ গুনলাম, পিসিঠাকুমার
থেকে ‘খবর'টা পেলে এই মানুষটাই বদলে যাবেন মুহূর্তে। উনি চলে যেতে
আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলাম আর দুঃসময়ের মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম, এই বুঝি কেউ
এল! কতক্ষণ বসে বসে ভাবলাম জানি না, অবশেষে ঠিক করলাম, বেতলা যাব; কারণ এখান
থেকে পালাতে গেলে সন্দেহ বেড়ে যাবে, তাতে বিপদও বাড়বে। বেতলা ব্যাগ নিয়েই যাব, বেগতিক
বুঝলে সেখান থেকেই চম্পট দেব।
বাইরে এসে স্নান সারলাম ভয়ে ভয়ে, যদিও সব
কিছুই স্বাভাবিক ছিল- কিন্তু আমার উৎকণ্ঠা তাতে কমল না। স্নান সেরে রসুই এর দিকে
গিয়ে দেখলাম বাড়ির অনেকেই সেখানে পরোটা-আলুভাজা আর ছানার পায়েস খাচ্ছে, আমার সবই
কেমন তেতো লাগল। আশেপাশে চেয়ে দেখলাম ইরা নেই কোথাও, নিশ্চয় সেও
ঘরে খিল দিয়েছে ভয়ে। আমার পেটের ভিতরে পিলেটা চমকে চমকে উঠতে লাগল সারা শরীরে
কাঁপুনি দিয়ে। বৃদ্ধ প্রেমচান্দ ভকত আমার অসুস্থতা দেখে অত্যন্ত আহ্লাদিত হয়ে তার
ঘর থেকে একগাদা জড়িবুটি দিয়ে গেল আমাকে, বলল কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে। ইতিমধ্যে শরীর খারাপের
খবরে সতু থেকে কাকিমা সকলে এসে দেখে গেল পালা দিয়ে, ভিন জায়গার
জলহাওয়াতে এমনটা যে হয় তা বারেবারে বলেও গেলেন কাকিমা। গদিঘরে গিয়ে ম্যানেজার
সায়েবের পাশে একটা তাকিয়াতে হেলান দিয়ে গতকালের আনন্দবাজারের খেলার খবরে চোখ
রাখলাম।
শাস্ত্রে বলে বিপদকে সর্বদা চোখের সামনে রাখতে হয়, তাই কোথায়
যাচ্ছি বা কীভাবে যাচ্ছি এসব প্রশ্নের ধারপাশ না মাড়িয়ে বাবুছেলে হয়ে দাদুর পাশে
ফাঁকা আসনে গিয়ে বসলাম ঠিক বেলা ১০ টাতে। একটা মেরুন রঙা ফ্রকে আমারই সারিতে
দুজনের পাশে বসা ইরাবতী যেন ছোট্ট একটা রাজকন্যা। বাসে আন্ডাবাচ্চা আর আমাদের বয়সী
কয়েক পিস নমুনার সবেধন অভিভাবক ঐ দাদুই, সাথে খান কয়েক চাকরবাকর। গাড়িটা মিশকালো রঙের
ভোঁতা মুখো মার্শাল কোম্পানির, মুখোমুখি দুটো বেঞ্চ সিট জানালার দিকে পিছন করে, তাতে আমরা
সকলে বসে। কাজের লোকেরা মালপত্র নিয়ে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে। সতু এসে আমার শরীরের
কুশলবার্তা নিয়ে গেল, সে তার এক পিসতুতো ভাই এর সাথে একটা ছোট্ট টেপে গান বাজাতে
ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বাসটা মিনিট দশেক চলতে কিছুটা ধাতস্থ হলাম, ভাল করে
চেয়ে দেখলাম আমাকে নিয়ে সবশুদ্ধ ১৭ জন পরিবারের সদস্য। এবারে খেয়াল করলাম, ড্রাইভারের
কেবিনে জানালার পাশে খালাসির বদলে রামফল বসে, চোখোচোখি
হতে মুচকি হাসল।
গোটা যাত্রাপথে আমি আড়চোখে ইরাবতীকে খেয়াল করে
যেতে লাগলাম, কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও আমার পানে তাকাল না। দাদু নানান
মজাদার গল্প শোনাতে লাগলেন সকলকে। হিন্দু, শাক্ত, সহজিয়া, বৌদ্ধ, জৈন, নির্গুণ
তত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, জন্মান্তরবাদ, রামায়ণ, মহাভারত সহ আরও কত কী, কিছু বুঝলাম
বাকিটা মাথার উপর দিয়ে গেল। অবাক নেশাধরা যে চোখে ইরাবতীকে দেখছিলাম, সেই চোখে
যখন দাদুর দিকেও তাকাচ্ছিলাম- উনি ভাবছিলেন, আমার গল্প
শুনে কী আপ্লুতই না হচ্ছে ছেলেটি; স্বভাবতই ওনার গল্প বলার জোশ বেড়ে যাচ্ছিল। খোয়া
উঠা রাস্তায় বাস চলতে লাগল ধুকধুক করে, সহসা ৩৯ নং জাতীয় সড়ক ছেড়ে লঙ্কা নামক একটা
স্থানে এসে আমরা আরঙ্গা নদীর সেতু পেরিয়ে বাঘঝোপরি নামের একটা গহন জঙ্গুলে
অঞ্চল দিয়ে বেতলা এসে পৌঁছালাম।
রামফল এসে জানাল সে আমার জন্যই এসেছে, শরীর খারাপ
হলে ওষুধ দেবে। একটা প্রাচীন জরাগ্রস্ত সাবেক ব্রিটিশ বাংলোর কাঠের বারান্দায় আমরা
সকলে একত্রিত হলাম, বুঝলাম এটাই আজকের আমাদের ক্যাম্প হাউজ। সেখানে পৌঁছেই
একপ্রস্থ জলখাবার সারা হলো কেক, কলা, ডিমসিদ্ধ আর ডালমুট দিয়ে। সবশেষে সকলের জন্য
কাঁচের শিশিতে ঠাণ্ডা থামস আপ আসতেই সকলে হৈ হৈ করে উঠল। চাকরের দলেরা রান্নার
জন্য আয়োজন করতে লাগলে আমরা চললাম পালামু কেল্লা দেখতে, সেখান থেকে
কমলদহ দেখে এখানে ফিরে মধ্যাহ্নভোজন, তারপর ওয়াচটাওয়ার থেকে জঙ্গল দেখে কেচকির
সঙ্গমস্থল ছুঁয়ে অন্য পথে ঘরে ফেরা। দাদু একটা নাতিদীর্ঘ বক্তিমে দিয়ে
জানালেন, আমাদের এই সফরে বিরাঞ্চি হলো গাইড- বলেই জুলজুল করে তাকিয়ে
থাকা একটা আটহেতে ঘিয়ে রঙা ধুতি পরিহিত, টাকমাথা গোলগাল বৃদ্ধের দিকে ইশারা করলেন। এই
সবের মাঝে বারকয়েক ফিসফিসিয়ে ইরা বলে ডাকতেও, সে না শোনার
ভান করে হনহনিয়ে এদিক সেদিকে যেতে লাগল ভীষণ উদ্ধত ভঙ্গিতে। ক্ষণিকের ছায়ার শরীরে
আশারা যেন বুনো হাঁসের পালকের জীবন, এই আছে তো এই ঝরে যায়।
(নয়)
এখানে দুটো কেল্লা রয়েছে, প্রথমে
পৌঁছালাম সমতলের পুরাতন কেল্লাতে। দাদু জানালেন এই কেল্লা চেরো রাজাদের তৈরি। মোটা
মোটা পাথুরে দেওয়ালের ভাঙাচোরা কেল্লা হয়ত বা ভাল লাগলেও লাগতে পারত, কিন্তু
বর্ষায় গজানো লতাগুল্মে জঙ্গল হয়ে যাওয়া এই ঐতিহাসিক কেল্লা ভয়ানক অস্বস্তিকর মনে
হলো ইরাবতীর অদ্ভুত ব্যবহারে, সে বাচ্চাদের সাথেই ব্যস্ত রইল। সতু তার লাল রঙের
কোডাক ক্যামেরাতে পটাপট ছবি তুলতে লাগল, রিজার্ভ হিসাবে আরও একটা রিল এনেছে সে। পাহাড়ের
উপরের নতুন কেল্লাতে দাদু আর সাথে গেলেন না, তিনি একটা
চাকরকে নিয়ে নিচে রইলেন। বললেন, চটপট দেখে তাড়াতাড়ি ফিরে আয় সকলে। বেশ খানিকটা
চড়াই উঠে পৌঁছালাম কেল্লার দুয়ারে, উঁচু সেই ফটকের চারিপাশে ততোধিক উঁচু তিনতলা সমান
পাথরের দেওয়াল খাড়া উঠে গেছে। দাদু না আসাতে সকলের মধ্যেই একটা ফুরফুরে বাঁধনছাড়া
ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, সতু ছবি তোলার জন্য হরেক রকমের পোজ নিয়েই ব্যস্ত, বাকি
ছেলেপুলে স্বভাবতই তার পিছুপিছু। আমি আর রামফল উপরে ভাঙা পরিখার উপর থেকে অকারণ
জঙ্গল দেখতে লাগলাম বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে।
“একটু জল এনে দেবেন রামকাকু”! পিছন ফিরে
দেখি ইরা। চড়া রোদে বেশ খানিকটা চড়াই ভেঙে উঠতে হয়েছে, তার উপরে
বর্ষার গুমোট, ফর্সা দুই গালে কেউ যেন রক্তচন্দন লেপে দিয়েছে। রাগে তার
শরীর বিসর্জনের প্রতিমার মত টলছে। জলের ফ্লাক্স সমতলে দাদুর কাছে রয়ে গিয়েছে, রামফল দ্রুত
পায়ে সেটা আনতে যেতে আমি পরিখা থেকে নিচে নেমে এসে পাশে দাঁড়িয়ে কিছু বুঝে ওঠার
আগেই সপাটে চপেটাঘাতে হকচকিয়ে গেলাম। সামলে ওঠার আগে আরও একটা, আমি নিজেকে
বাঁচানোর বৃথা চেষ্টার মধ্যে দুমাদুম কিলঘুষির বর্ষণ শুরু হলো। মিনিট খানেকের
একতরফা মল্লযুদ্ধকে বিরতিতে পৌঁছে দিল নিরবধি অশ্রুধারা। আমিই আহত অথচ…, সে যাইহোক
আরও একটু কাছে গিয়ে থুতনিটা তুলে ধরতে যেটা ঘটল সেটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম
না। প্রথমে কাঁধের জামা খামচে ধরে আমার রোগা বুকে মুখ গুঁজে দিল, ভাবলাম
চোখের জল মুছছে। কয়েক মুহূর্ত পরেই লতার মতো হাত দুটো আমার মেরুদন্ড বরাবর পেঁচিয়ে
ধরল। উষ্ণ অশ্রুধারা বুকের চামড়া স্পর্শ করছে। এমন আলিঙ্গন কেবল সিনেমায় দেখেছি, সমস্ত
দেহভার ন্যস্ত করে এভাবে কেউ কখনও নিজেকে আমার বুকে সঁপে দেবে তা কল্পনারও অতীত, এক চূড়ান্ত
উত্তেজনায় মুহুর্মুহ কেঁপে উঠতে লাগলাম। মর্মর পাতার ধ্বনি তখন বাঁশির সুর হয়ে
দুটি মনকে বিনি সুতোর একটি মালায় গেঁথে দিল।
কবিগুরু কবেই বলে গেছেন-
“চক্ষে বহে অশ্রুধারা, ঘন ঘন বহে
উষ্ণ শ্বাস।
নাহি জানে কী যে চায়, নাহি জানে
কিসে ঘুচে তৃষা,
আপনার মনোমাঝে আপনি সে হারায়েছে দিশা
বিকারের মরীচিকা-জালে”।
এটাই কী প্রেমের চূড়ান্ত সুখ! সেই মুহূর্তে সমস্ত
ভাবনাশক্তিরা লোপ পেয়ে গেল, কী করা উচিত, কী করা নয়, কতটা শোভনীয়
আর কোনটা ইতরতর এই সকল অস্থিরসংকল্পতার ঊর্ধ্বে বিরাজ করতে লাগলাম। ক্রমশ আমার
বাহুও দৃঢ় হয়ে তাকে আবিষ্ট করে নিল, কোনো অদৃশ্য শক্তির ইশারাতে কলের পুতুলের মতো
আচরণ করতে লাগলাম। ক্রমশ তার মুখ ঊর্ধ্বগামী হলো আর আমার অধোগামী। দুইজোড়া তৃষিত
অধরের প্রান্তে যেন শতাব্দীর তৃষ্ণারা অপেক্ষারত ছিল লোনা বালুচর নিয়ে। অজস্র
বেদনার মতো ইরাবতী পাক খেয়ে আমার শরীরের অস্থিমজ্জার ভিতরে প্রবেশ করে যেতে লাগল।
কবিতার খাতায় যে অলিখিত শব্দেরা কতবার হাতছানি দিয়ে আলেয়া হয়ে গিয়েছিল তারা সকলেই
আজ ফিরে এল এই জঙ্গুলে প্রাচীন কেল্লায়। ভোরের চাঁদ, দুপুরের
সূর্য আর রাত্রের শুকতারাদের অনুজ্জ্বল সম্মিলনীতে ভাবনার শিকড়েরা চোরাপথে হৃদয়ের
অন্তঃস্থলেও একটা পেল্লায় কেল্লা ফেঁদে বসলো। আগস্টের
গ্রীষ্মে ঘেমে নেয়ে থাকা ঘাড় বেয়ে নেমে আসা স্বেদস্রোতে যেন
সুরভিত পরিমলের আঘ্রাণ, যা ক্রমশ উত্তেজিত করে তুলছিল। পৃথিবীর অতুল সম্পদও যদি কেউ
সেই মুহূর্তে উপহার দিত, সে সবও নেহাতই তুচ্ছ বলেই পরিগণিত হতো। আদরের ধন প্রেয়সীকে
বুকে টেনে নেওয়ার চেয়ে সুখ আর কিছু কি আছে পৃথিবীতে?
শ্রাবস্তী নগরীর জনৈক অশ্বঘোষ এমন প্রেমে মাতাল
হয়েই কি ‘উর্বশী-বিয়োগ’ রচনা করেনি! সাকেতের ভ্রমরকৃষ্ণ কেশধারিনী প্রভার
প্রেমে কেউ মাতাল হতে পারলে আমি কেন ইরাবতীর দুর্নিবার প্রেমে অভিষবণীত হতে পারি
না! কালো সরযূর তীরস্থিত পুষ্পকুঞ্জে তাদের প্রেমের রসকল্প রচিত হলে- বেতলার এই
কালো সবুজ অরণ্যকুঞ্জে আমাদের প্রেমের আলেখ্য নিশ্চই রচিত হবেই।
আয় সুখ যায় সুখের প্রেমিক যুগল সমগ্র বিশ্বজনের প্রতিনিধি, সুতরাং
কল্পলোকের অশ্বঘোষের সাথে আমার কোনো বস্তুগত পার্থক্য থাকতেই পারে না যতক্ষণ আমি
প্রেমিক। ইরাবতীর রেশমের মতো চুল যখন আমার কপোল স্পর্শ করল, তখন কোনো
অদৃশ্য বীণার সুর তরঙ্গ লহরী ভাসিয়ে নিয়ে গেল স্বপ্নের বাজারে। ওষ্ঠের মুদ্রাঙ্কিত
সেই নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেখি যেখানে অশ্বঘোষেরা কাব্য রচনা করছে যুগ্ম
জীবনপ্রবাহের সাকার সম্মেলনে।
কুন্তক নাড়ি বিন্দুকে স্থিরতা দেয়, কিন্তু
কুম্ভক শক্তি সম্মোহনের চূড়ান্তে পৌঁছে দেয় মদন, মাদন, শোষণ ও
স্তম্ভন রতির মাধ্যমে। করনখ, পদনখ, গ্রীবা, ললাট, জিহ্বা সহ চব্বিশ চন্দ্রস্পর্শ ঘটলে- বৈদিক
বাণের দ্বারা আবদ্ধ দুটি প্রাণী তখন একীভূত হয়। তীব্র অনুরাগের এই মিলন ক্রিয়া
সাধন মার্গের ব্রহ্ম ভাণ্ড, যা ষড়দর্শনের দ্বারা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
প্রতিটি প্রেমিকের বুকেই কি এই আকুতি হয়? কবিরা বলেন, ভালোবাসলে
আমি ব্রহ্ম হয়ে উঠি। গ্রহনলাগা চাঁদের মতো হারিয়ে যেতে মন চায় প্রেয়সীর ছায়ায়, চুম্বনের
ক্ষত থেকে ঝরা রক্তের স্বাদের জন্য আতুর হয়ে উঠি। আলো ঢাকতে পারে না প্রেমের
তৃষ্ণার ক্ষত, তাই সকল আলো নিভে যায় শরীরে প্রতিটি রন্ধ্র হতে। বুভুক্ষু
শরীরের খাঁজে থাকা মিথ্যার অলৌকিক ভাস্কর্যগুলো একটানে খসে গিয়ে অনাবৃত হয়ে তীব্র
আশ্লেষে অভিষঙ্গ আলিঙ্গনের ঊরুপগৃহণে মুক্তি খোঁজে। এই কলঙ্ক যাকে আমি জন্মদাগের
মতো আজীবন সাজিয়ে রাখতে চাই আমাদের নগ্ন শরীরে।
দিনবদলের পালাগান শেষ হলে বিষাদ ছড়িয়ে পড়ে, এখানেও তার
ব্যতিক্রম হলো না। অসংবৃত অধরে এঁকে দেওয়া চুম্বনের সোহাগে সেটা রক্তজবার মতো রাঙা
হয়ে উঠেছে, আনত নয়নে তখন অসীম লজ্জাপট। স্বপ্নসন্ধানী শুদ্ধ বালিকার
শরীরের প্রতিটি রোমকূপে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে দিয়েছি। শুধালাম, ওভাবে মারতে
আছে! এবারে ফোঁস করে উঠল, আমার অনুভূতির কোনো দাম নেই বুঝি! জঙ্গলের মধ্যে
উন্মাদের মতো একাই দাঁড়িয়ে রইলাম… সে বলেই যেতে লাগল। আমি জিভ কেটে বললাম, বড্ড ভুল
হয়ে গেছে, পিসিঠাকুমার অমন ব্যবহারের পর আমার সব গুলিয়ে গিয়েছিল, ভুলে
গিয়েছিলাম তোমার সাথে দেখা করতে হবে, গত রাত্রের চিঠিটার কথা। পরিস্থিতির চাপে আর কি, প্লিজ…। এবারে খিলখিলিয়ে
হেসে জবাব এলো, ধুর হাঁদারাম, পিসিঠাকুমা চোখে ভাল দেখতেই পায়না। হয়ত আরও
একটা চুম্বনের ভাগ পেতাম যদি না রামফল সেই সময় এসে উপস্থিত হত।
অতঃপর, পুনরায় এক কঠিন কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা দুজনকেই গ্রাস
করাতে পুনরায় আমরা অচেনা হয়ে গেলাম। দ্বিপ্রহরে বনমুরগির ঝোল দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন
হোক বা বেতলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবকিছুই ম্লান হয়ে গিয়েছিল কেল্লার উপরে ইরাবতির
ওই রৌদ্ররসে মাখা উপহারের দৌলতে। প্রকৃতি এখানে সৌন্দর্যের সবগুলো দুয়ার খুলে
দিয়েছে, স্বভাবতই এ অঞ্চল দৃশ্য সুখদায়ক হিসাবে ততটাই ধনী। ছোট ছোট টিলা, সবুজ অরণ্য
আর নীল আকাশ। নাম নাজানা আদিম ঝর্ণা, গা ছমছমে জনমানব শূন্য জঙ্গল, কুয়াশামাখা
পাহাড়ের উপরে উঁচু পলাশ, পাইনের বন এক স্বর্গীয় মূর্ছনার সৃষ্টি করে। হনুমান
মর্কটদের বৈঠকী জলসার কিচকিচে ডাক সকলকে স্বাগত জানায়। কাঠবিড়ালিরা পালিয়ে গেলে
বোঝা যায় ওখানে কেউ ছিল। রাস্তার দুইপাশে বেয়াড়াভাবে গজিয়ে ওঠা কাঁটাগাছের জঙ্গল
বেতলা ভ্রমণের তৃপ্তিদায়ক স্মৃতি। একটু খেয়াল করলেই ইতিউতি হরিণের পাল নজরে আসবেই, যেমন অসংখ্য
ময়ূরের দল অবাধে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে যত্রতত্র। শুনেছিলাম সংরক্ষিত জঙ্গলে বাঘ
রয়েছে, খৈরাহি আর মধুচুঁয়া নামের দুটো ওয়াচ টাওয়ারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও বাঘবাবাজিদের
দেখা মিলল না। পাহাড়-জঙ্গলে ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে, ফেরার পথে
নীল বাইসনের দল, শেয়াল ও হায়না দেখাল বিরিঞ্চি খুড়ো। জঙ্গলের পোষা হাতি শুঁড়
তুলে ডাক দিয়ে আমাদের বিদায় সম্ভাষণ জানাল।
মধুরেণ সমাপয়েৎ হতে আরও কিছু বাকি ছিল, কেচকি-ঔরঙ্গা
আর কোয়েল নদীর সঙ্গমস্থলে পৌঁছালাম সন্ধ্যার একটু আগে। গোধূলির সময়কার এই দৃশ্য যে
কাউকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ করে রেখে দেবেই। দাদু একটা বাংলো দেখিয়ে বললেন, এখানেই সত্যজিত
রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল। হৈ হৈ করে ঘুরে দেখলাম। বিরিঞ্চি
খুড়ো জানাল আমরা চাইলে তিনি কালকে মারুমার ফরেস্ট বাংলো, সুগা বাঁধ, লোধ
জলপ্রপাত দেখাতে নিয়ে যেতে তৈরি, তাকে দাদুর কাছে পাঠিয়ে দিলাম আমরা। বড় রাস্তায়
উঠে খাস্তা কচুরি, জিলাপি দিয়ে দিয়ে টিফিন করে রওনা দিলাম ঘরের দিকে, লাতেহারের রাস্তার পাতলা সরের
মতো কুয়াশার আস্তরণকে ভেদ করে। ফুল মানুষের মনে আনন্দ দেয়, আর সেই
ফুলের একটা কলির নাম যদি ইরাবতী হয় তাহলে সেই আনন্দের যে সীমা থাকে না তা বলাই
বাহুল্য।
(দশ)
মানুষ হঠাৎ করে হারিয়ে যায় না, দূরত্ব
বাড়িয়ে ধীরে ধীরে জীবন থেকে সরে যায়। কিন্তু কিশোরবেলার লাতেহার, ইরাবতী আর
কজরুরা আমার জীবন থেকে ভোজবাজির মতোই উবে গিয়েছিল, বা বলা ভালো
তাদের হারিয়ে যেতে দিয়েছিলাম- যে বয়সে পুরুষের মনে নারী ও প্রেম নিয়ে এক সমুদ্র
কৌতূহল থাকে ঠিক সেই সময়। আসলে বুকের মধ্যে জমাট বেঁধে থাকা গভীর দীর্ঘশ্বাসের
মাঝে ইরাবতী আর কজরুদের আজও বয়ে বেড়াই, দীর্ঘশ্বাসেই আঁটকে বেঁচে থাকে হাজারো না বলা
কথারা। এভাবেই কিছু মানুষ নিজের মধ্যে কীভাবে মরে বেঁচে থাকে তা নিজেরাও জানে না।
আমরা কোনো এক মায়ামৃগের দিয়ে ধাবিত হয়ে চলি অধরা সুখের খোঁজে, আর সেই সুখ
পড়ে থাকে অতীতের কোনো এক ধূসর অপরাহ্ণে- যাকে আমরা তুচ্ছ ভেবে তাচ্ছিল্যের সাথে
ফেলে এসেছিলাম। তাই ইচ্ছে হলেই কাঁদা যায় না, প্রেমিক
মানেই বুকে পাথরের চাষ করতে হয়, পরিবার নামক দায়িত্বের পায়ে সমস্ত আকাঙ্ক্ষাকে
তর্পণ করে হৃদয়ের বিলাপ লুকিয়ে, বোবা হাহাকার সুশীলতার দ্বাররক্ষা করে।
গতকাল যে সময়ে আমি ইরাবতীর সাথে প্রণয়ের জোয়ারে
উজানে পাড়ি দিয়েছিলাম, তখন আর একজন গত দুদিনের মতোই সেই মহুলগাছের নিচের
শিলাখন্ডের কাছে প্রতীক্ষা করছিল। বেতলা থেকে ফিরতে বেশ খানিকটা রাত্রি হয়ে
গিয়েছিল, হাত-পা ধুয়ে ঘরে টেলিফোন করে, নৈশভোজন
সেরে যখন শুয়ে শুয়ে দুপুরের ঐ অপার্থিব সুখস্মৃতির জাবর কাটব বলে প্রস্তুতি নিচ্ছি, জানালার
ওপাশে একটা খুঁট করে আওয়াজ হলো। অন্ধকারের মাঝে ছায়ামূর্তি দেখে প্রায় চেঁচিয়ে
উঠতে গিয়ে নিজেকে সংবরণ করে দেখি কজরু দাঁড়িয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে। অন্ধকারের
মধ্যে অনেকক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল সে। বুঝলাম- অপেক্ষা হলো কিছু প্রাপ্তির আশা, এটাই
মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কজরু কিছু বলবে না, তাই আমিই
তাকে সবটা বললাম, একটা ফ্যাকাশে হাসির রেখা ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল।
অদ্ভুত এক ভালোলাগা বিবশ করে দিল মনকে, এই বহুব্রীহি পনার মাঝে একটা অনীক আমেজ আছে এটা
মানতেই হবে। দেহাতি উচ্চারণে- ‘আগামীকাল দুপুরে যেতেই হবে’ কথাটা ভীষণ
জোরের সাথে বলে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল পাহাড়ি মেয়েটি।
জানালার পাশের গন্ধরাজের ঝোপের গায়ে লেগে রইল
বুনো মেয়ের গায়ের গন্ধ। আঁশটে কায়ার ফেলে যাওয়া ছায়ার ঝিল্লিতে লেপ্টে থাকা জাগরণী
সুর বুঁদ করে রাখল প্রেমিক মনকে। তার কথার তীব্র ঝাঁঝের আড়ালে তিক্ত স্বাদটুকু
বুঝতে পারলে তবেই না প্রেমিক। মনে হলো, কজরু যেন বলে গেল- তাকে খুব করে কেউ একজন শাসন
করুক, তার এই এলোমেলো চলাফেরায় খুব করে বকুক। তাকে সযত্নে আগলে রাখুক বুকে- ‘আমি ছাড়া
তোকে কেউ ছুঁতে পারবে না’ নিয়মটা জারি করে দিক। এত বড়
পৃথিবীতে সে চায়, তাকেও কোনো একজন তার মতো করে একটু বুঝুক, তার
অনুপস্থিতিতে কেউ হন্যে হয়ে খুঁজুক। শক্তহাতে নাকটা ডলে দিয়ে বলুক- আমার চেয়ে তোকে
কেউ ভাল চেনে না। কবি কি সাধে বলেছেন- নীরবতাকে যে উপলব্ধি করতে পারে তার চেয়ে কেউ
বেশি ভালবাসতে পারে না। আজ আমি নীরবতাকে পড়ে ফেললাম।
শুনেছি মদের নেশা নাকি প্রেম প্রেম বাতিক তৈরি
করে, কিন্তু প্রেমের নেশা যে মদের চেয়েও গাঢ় সেটা যদি সুরাপায়ীরা জানত, তারা মদ
ছেড়ে রোজ প্রেমে পড়ত। যেই চোখ বুজলাম- সেই কেল্লা, সেই জঙ্গল, খোলা আকাশের
নিচে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো দুটো ছেলেমেয়ে। দোতলার মহল থেকে বাক্সবন্দি
ঘুমপাড়ানি গান ভেসে আসছিল ঘুরে ফিরে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, বারবার।
দৃশ্যবদলে ভাবনার চেষ্টা করলাম, বিষাদভাব এনে সেখানে ইরাবতীকে আবার ছুঁতে চাইলাম।
আমার অনিয়ন্ত্রিত আঙুল, ঠোঁট- বারে বারে খুঁজে পেলো কজরুর কপাল আর মায়াভরা দুটো
ডাগর কালো চোখ। আষ্টেপৃষ্ঠে তাকেই জড়িয়ে স্বপ্নে ডুবে যেতে চাইলাম, কিন্তু
পরক্ষণেই কেল্লার উপর থেকে বোকা বোকা অথচ সর্বাঙ্গ জ্বালিয়ে দেওয়া দৃষ্টি হেনে
ইরাবতী হাতছানি দিয়ে ডাকছে, যেন ভেসে উঠতে বলছে। সহসা চোখ মেলে চেয়ে দেখি আমি
একা, জানালা দিয়ে সোঁ সোঁ করে হাওয়া ঢুকছে যাতে কারও একটা গুমরে ওঠা কান্না, কজরু না
ইরাবতী! শেষবারের মতো হাত বাড়ালাম, দুজনেই হারিয়ে গেল রাত্রির নিকষ দিগন্তে। আমার
ঘুম অবিসংবাদিত এক ভোরের খোঁজে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল অজানা কোনো অন্তরীপে। তারপর আর
জানি না; তিক্তরাজ, গুলার, বাঁদরলাঠি, আসান, বহেরা, কেন্দু, মহুয়া, শাল, পাইনের
জঙ্গলের বিছানাতে কখন চৈতন্য হারিয়েছিলাম।
আজ রাত্রে প্রতিমা তৈরি হবে, এটাই
রেওয়াজ। ঘাসের ছাউনির অস্থায়ী আটচালায় বলির বেদী তৈরি হয়েছে, কাল পুজোর
পর দুপুরে বলি-বাটার প্রসাদ চড়ানো হবে দেবীকে। বাড়িময় সাজসাজ রব, পলকে এক
আধবার ইরাবতীর সাথে চোখাচোখি এক অলীক সুখের সঞ্চার ঘটাচ্ছিল মনের চাতালে। বেলা
বাড়তেই আমার যৌগস্যন্দী চিত্তে কজরুর ছায়া অন্ধকার করে তুলল, একটা শরীরে
দুটো চোখের মতো দুটো মন থাকলে কী এমন রসাতলে যেত সৃষ্টি! প্যানপ্যানে পুরুষের
দ্বারা প্রেম হয় না, যেমন ওগো হ্যাঁগো দিয়ে বিপ্লব হয় না। তাই মনের যাত্রাপথে
বিবেককে দাঁড় করিয়ে অহেতুক সংরুদ্ধ করলাম না।
সুন্দরী নারী সরষের মতো, তাকে দু'হাতে ধরে
রাখা অসম্ভব- স্বেচ্ছাচারী সার্বভৌমত্ব ছাড়া। সংশয়ের দৃষ্টি পড়লেই অদৃশ্য কোনো
শক্তি যেন সকল মুগ্ধতাকে হরণ করে নেয়। ভালোবাসাকে ছুঁতে পারা যায় না, ছুঁলেই সে
যেন অতীত হয়ে যায়। ইরাবতীর রয়েছে কতই না আড়ম্বর, সৌন্দর্য, শিক্ষা, বংশ পরিচয়, কিন্তু
কজরুর বন্য কুহকতার সামনে সেই সকল একাধিপত্যের একচ্ছত্র নিয়ামক এলোমেলো হয়ে গেছে।
ক্লান্ত হয়ে ভেবেই যাচ্ছি, কাকে আগলে রাখব বুকের ভিতর! উত্তর মিলল না, মিলতে পারেও
না। আবহমান আবর্তে আর ঘটনার প্রবহমানতায় হেরে চললাম বার বার। বিবর্তনের ইতিবৃত্ত
লিখে চলেছে অদৃষ্ট, যেন সকল কিছুতে তার অবাধ দখলদারি। কী আশ্চর্য, এই সন্ধ্যায়
যাদের ছাড়া কোনো ভাবনাই সম্পুর্ণ নয়, তারা কোথাও নেই হয়েও সর্বত্র উপস্থিত। এই জন্যই
প্রকৃত প্রেমের সংজ্ঞা নিরূপণ করতে পারেনি কোনো কবিবর।
নিশির ডাকের মতো ঠিক বেলা একটার সময় দুজনে একটা
এক্কায় চড়ে বেড়িয়ে পড়লাম সকলের অলক্ষ্যে। অম্বরে সাক্ষী রইল
স্বর্গদূত, মর্তে
সাক্ষী রইল মহুলগাছ, তার নিচের শিলাখণ্ড আর নিশ্চল ভাবে জঙ্গলের বুকে দাঁড়িয়ে
থাকা সরকার বাড়িটা। জঙ্গলের শুরুতেই একটা মৃত পশুর উপরে কতকগুলো শকুন লাশটা
ছিঁড়ে খাচ্ছে, মনে কু ডাকল। শুধালাম কোথায় যাচ্ছি, জবাব এল-
নরকে। পরনে একটা জরি পাড়ের হলুদ শাড়ি, আলতা রাঙা পায়ে আজ একটা চামড়ার পুরাতন জুতো, সম্ভবত
সরকার বাড়ির কোনো মহিলার বাতিল মাল। মাথার খোলা চুলে একটা বুনো ফুলের সাদা মালা, একহাত
সস্তার কাঁচের চুড়ি। অনুভূতিহীন মুখমণ্ডলের প্রসাধনবিহীন ত্বকে পবিত্র নিষ্পাপ
জেল্লা পিছলে যাচ্ছে। একটা স্থানে কিছু একটা পরব উদযাপন হচ্ছে, সেই উপলক্ষে
জঙ্গলের মাঝে একটা ন্যাড়া স্থানে অস্থায়ী মেলা মতন বসেছে। বিহারি জলসা, চদর-বদর
নাচ আর হরেক অনুষ্ঠান। ফুটবল খেলার সাথে বেশ কিছু খাবারের দোকান আর হাঁড়িয়ার হাঁড়ি
চোখে পড়ল। তবে আমার নজর টানল মোরগ লড়াই। গাড়ি থেকে নেমে খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করলেও
কজরু নির্বাকই রইল, অল্পক্ষণের মধ্যেই আবার রওনা দিলাম। ক্রমশ গহিন জঙ্গলের
মধ্যে প্রবেশ করলাম, বাতাশের শনশনানি আর পাখিদের ডাকের বাইরে যেন পৃথিবী বলে
কিছুই নেই এখানে। শনৈঃ শনৈঃ আকাশ মসী বর্ণ ধারণ করল, জলদরাশি
ছেয়ে ফেলল চরাচর। বললাম, ভীষণ বৃষ্টি আসছে, ভিজলে জ্বরজ্বালা হবে- আশেপাশে ছাউনি বা ঠেক আছে
কোথাও? কজরু একটা চেরা দৃষ্টি হেনে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে খচ্চর ছুটিয়ে চলল, কে জানে
কার উপরে প্রতিশোধ নিচ্ছে সে।
প্রকৃতি কারও কিছুর প্রতীক্ষা করে না, কিছুক্ষণের
মধ্যেই আকাশ ভেঙে বাদল নামল। জঙ্গল যেন গিলে খেতে উদ্যত হলো ছোট্ট এক্কাটিকে, বৃষ্টির
নিরবচ্ছিন্ন শব্দধারা আর চারিপাশের পরিবেশ সহসা প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরিয়ে নিয়ে
গেল আমাদের। বৃষ্টির ছাটে আমার পায়ের দিকটা ভিজলেও মেয়েটি সম্পূর্ণ স্নান করে গেল, বেশ খানিকটা
ভয়ভয় আর শীত করতে লাগল। একটা মৃদু অথচ ক্ষণস্থায়ী হাসি হাসল আমার অবস্থা দেখে, যা নজরেই
আসে না প্রায়। হাতে ঘড়ি নেই, সময় বুঝতে পারছিলাম না। এমন ভয়াল প্রকৃতিকে এভাবে
সামনে থেকে দেখার প্রত্যাশা দুঃস্বপ্নেও করিনি।
(এগারো)
আচমকা একটা বড় লোহার গেটের সামনে গাড়িটা থেমে গেল, মরচে ধরা
একটা পাল্লা যেন কয়েক শতাব্দী ধরে ওভাবেই রয়েছে, অন্য
পাল্লাটা হাঁ করে একটু খোলা। সুরকি বিছানো একটা অযত্নের রাস্তা যেখানে এসে উঠল
সেটা একটা জীর্ণ বারান্দা। প্রাচীন ব্রিটিশ স্থাপত্য, এতে সন্দেহ
নেই। দূর থেকে দেখলে বেশ কেতাদুরস্ত মনে হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু কাছ
হতে এক্কেবারে ঝুরঝুরে। আঁধারে ঢাকা নির্জন বনপ্রান্তরের মধ্যবর্তী জায়গায়
দন্ডায়মান এই প্রাগৈতিহাসিক বাড়িটি কয়েকশো বছরের পুরনো না হলেই অবাক হবো। চারিদিকে
বিশাল উঁচু উঁচু শাল, মহুয়ার সারি, দিনের বেলাতেও যেন রৌদ্রের ঢোকা মানা এখানে। কজরু
মুখ খুলল, এটা একটা পান্টেস বাবুর কোঠি। বলেই, ‘বটুক প্রসাদ… ও বুঢ়া…’ বলে বেশ
সোহাগের ধ্বনিতে কয়েকবার ডাক দিতেই এক লোলচর্ম বৃদ্ধ এসে দাঁড়াল। একা
থাকলে এমন ভুতুড়ে পরিবেশে এনাকে দেখে আমি নিশ্চিত অজ্ঞান হয়ে যেতাম। কজরু বলল, বৃষ্টিতে
আঁটকে গেছি, খানিকক্ষণ তোর ঘরে বসব বাবুকে নিয়ে। বৃদ্ধ সম্মতির সাথে
একটা ঘরের দরজার শিকল খুলে দিল ঝনাৎ শব্দে। শতাব্দী প্রাচীন একটা গন্ধ হঠাৎ খোলা
দরজা দিয়ে আগত নতুন শতকের বাতাসে মেশার জন্য বিলীন হয়ে গেল।
দেহের প্রতিটি রোমকূপ বেয়ে একটা শীতল আতঙ্ক পরিস্থিতিকে প্রায় বরফের মতো হিমাঙ্কের
নিচে পৌঁছে দেওয়ার উপক্রম করল।
টেনেটুনে মাথা গোঁজার মতো একটা আস্ত ঘর পাওয়া
গেছে এটাই পরম প্রাপ্তি। এই অঞ্চলের সব জায়গার মতো এই বাড়িটিতেও কোনো বিদ্যুৎ
সংযোগ নেই। এমনিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থাকলেও, খানিকক্ষণ
চোখ সয়ে যেতে দেখলাম আমরা বিশাল একটা ঘরে রয়েছি, ঘরের মেঝে
চুন সুরকি দিয়ে পেটাই করা মসৃণ। অদূরে একটা পরিচ্ছন্ন পালঙ্ক, এছাড়া একটা
আলনা, একটা সুদৃশ্য টেবিল, হাতলভাঙা চেয়ার, ঘষা আয়না সহ নানান দামি আসবাবে ঠাসা। জল ও আহার
পরিষেবা এখানে নেই। বিছানা, কম্বল, চাদর, থাকলেও তার দরকার ছিল না। ভিতর থেকে জানালা দরজার
ছিটকানিও নেই সবগুলোর, জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট ঢুকতে লাগল। ক্ষণিকের মধ্যে বৃদ্ধ
এসে একটা ‘মিট্টিকা তেল’ এর কুপি দিয়ে যেতে ঘরটা গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল।
ভিতরের বারমুডাটা ভেজেনি, তাই
ফুলপ্যান্টটা খুলে নিংড়ে জানালাতে মেলে দিলাম। কজরুকেও একই নির্দেশ দিলাম, কিন্তু তার
অতিরিক্ত কাপড় কই! গায়ের কাপড় ভিজে এমন লেপ্টে ধরেছে, সুডৌল
শরীরটাকে পাথরের মূর্তির মনে হচ্ছে। বললাম, বুড়োর থেকে
কি একটা শুকনো ধুতি পাওয়া যাবে না! সে কেয়ার করল না, ফের আমি
বললাম- আমার জামাটা শুকনো আছে- ওটা পরবে! খানিকক্ষণ চুপ থেকে স্থির কন্ঠে বলে উঠল-
পরিয়ে দাও। কিছু পরিস্থিতির ভাষান্তর হয় না, আমি
কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে থাকতে, একটা
তীক্ষ্ণ ও ঋজু আওয়াজে সে রিনরিনিয়ে উঠল- কি দেবে না! আমার চোখের সামনে তখন আগুন- “লম্বিত গলে
মুন্ডমালা, দম্ভিত ধ্বনি মুখ করাল, স্তম্ভিত
পদে মহাকাল, কম্পিতা ভরে মেদিনী”। সাক্ষাৎ
নিষ্কর সঙ্গমের আঁশটে নিমন্ত্রণ।
পাপসুন্দরীর সম্মোহনকে উপেক্ষা করার শক্তি
বিশ্বচরাচরে কোনও পুরুষ তো ছাড়, কোনো দৈত্য, যক্ষ কিম্বা রক্ষেরও নেই;
এই সময় দেহস্মৃতি লুপ্ত হয়। পবিত্র ব্রত সুসম্পন্ন করতে এককালে বিলেতের নাইট যোদ্ধাদের
ব্রহ্মচর্য্য পালন করতেই হতো, আমি না কোনো ব্রহ্মচারী না বিলেতের নাইট। প্রেমে
ধর্মসংকটে পড়তে নেই, সেক্সপিয়ার হ্যামলেট নাটকে লিখেছেন- “গো টু
নানারি”! অর্থাৎ যৌবন উদযাপন করতে স্বচ্ছন্দে বেশ্যালয়ে যাও। এখানে তো উত্তম পরিস্থিতি, স্বেচ্ছায়
আজ্ঞাচক্রের প্রেমসম্পাদন। পিছনে শেষ কৈশোরের ভীরুতা, সামনে অসীম
যৌবনজলতরঙ্গ- যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে। বাঙালির চোখে বিপ্লবীরা সর্বত্যাগী
অতিমানব সন্ন্যাসীতুল্য, কামিনীকাঞ্চন থেকে তাঁরা শতহস্ত দুরে। তাঁদের যৌনতার বোধ না
থাকাটাই স্বাভাবিক, কারণ জিতেন্দ্রিয় হবার দায় রয়েছে। আমি অতিক্ষুদ্র নামহীন
কাপুরুষ বাঙালি, না বিপ্লবী না সন্ন্যাসে আগ্রহ রয়েছে, তাহলে
মিছিমিছি জিতেন্দ্রিয় সাজার ভান করে থাকলে কোন মহার্ঘ্য হাসিল করব! অতএব
প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করাটাকেই সমীচীন মনে করলাম।
একটা জংলি রাতচরা পাখি তার তীব্র কর্কশ কণ্ঠে
চিৎকার করে সম্ভবত আমাকে বারণ করে গেল, তখন আমাকে কজরুর নেশা পুরোদস্তুর পেয়ে বসেছে।
রূপতৃষ্ণা বর্ণহীন, গন্ধহীন, স্বাদহীন। এ না কঠিন, না তরল, না বায়বীয়!
এর ঘনত্ব, গভীরতা, গলনাঙ্ক, স্ফুটনাঙ্ক, ত্বরণ, সরণ, ভর, ওজন বা আয়তন
সব কিছুই ক্ষেত্র ও ব্যক্তি বিশেষে পরিবর্তন হয়। প্রতিটা ঘটনার নির্দিষ্ট
পরিব্যাপ্তি নিয়তি নির্দিষ্ট, ইচ্ছে করলেই তার পরিবর্তন করা যায় না। আমি কালের
অধীশ্বর ত্রিকালদর্শী নই যে যৌনতা আমার কাছে গৌণ হবে। কালো টানা ডাগর চোখ রক্তজবার
মতো মন্দ্র নিমীলিত। শরীর জুড়ে রোদে পোড়া মাজা রঙ, যেন সার্থক
কৃষ্ণকলি। এমন রূপের আগুন আর উষ্ণতার আবেদনে যে ধরা খায় না, সে পুরুষই
নয়।
অন্তরে শুরু হয়ে গেল মহা রক্তপ্লাবন। একটা ক্ষীণ
আলো জানালা বেয়ে ঝুলে আছে নিথর লাশের মতো, আমার দৃষ্টি
সে সবের উপরে নেই। নজর মেপে চলেছে লাল টিপ, খোঁপার ফুল, বুনো ফুলের
সুবাস মাখা নিরাভরণ দেহমন্দির। দুটো শরীরের উত্তাপে লাজসেতু ক্রমেই বিলীন হয়ে গেল, প্রহনন আর
শীৎকারে শুরু হয়ে গেল চারুচন্দ্র মিলনের যোগক্রিয়া। পঞ্চবাণের ছিলা কেটে
ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে পরাক্রমী পুরুষাকার ছুটে চলল কুক্ষিগতকে উদঘৃষ্টক নিষিক্তনে।
যৌবনের পূর্ণ দিগন্তে এই জংলি মেয়ের কামুক শরীর তাবড় তাবড় ঋষিরও মাথা ঘুরিয়ে
দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যৌনতার তুষের আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া, সবুজ
মাদকতার জাল বুনে এই কাকভেজা বিকেলে মন্দ হওয়ার ষড়যন্ত্রে সামিল ছিল গোটা প্রকৃতি।
মেঘ যেন এ মেয়ের শরীর জুড়ে বৃষ্টি বয়ে এনেছে, আঙুররঙা
টসটসে দেহতনুপটে গেঁজানো তাড়ির অদ্ভুত মাদকতা। চোখের গভীরতায় ঠাসা যৌবনের কূট
কামড়ে শরীর জুড়ে ভীষণ আগুনে শিহরণ বইতে লাগল। হৃদয় ঘরে চূর্ণ চুম্বনের ফেনা তোলা
উদ্ভিন্ন যৌবনা রূপসী তার দুটি ঠোঁটের প্রস্ফুরণে তাপিত মেয়েবেলার কাব্য লিখে চলল
আলগোছে।
গুরুদেবের কবিতায় বলা আছে-
“মরণ আলিঙ্গনে
কন্ঠ পাকড়ি ধরিল আঁকড়ি দুইজনা দুইজনে।
দংশনক্ষত শ্যেন-বিহঙ্গ জুঝে ভুজঙ্গ সনে”।
কাব্যের উষ্ণতা বয়ে গেল তার গ্রীবা, ঠোঁট, বক্ষ, নিতম্ব, নাভিকোমল, উরুসন্ধি
হয়ে পদপল্লবে। খোলা চুলের আঁধারে পুরুষ মাত্রই পরাধীনতার ইতিহাস। অরুণাভ ঋষি এমন
উরুসন্ধি নাভিমূলেই পদ্ম জাগরণ করে মোক্ষ লাভ করেছিলেন, স্পন্দিত
ঠোঁটে এক রক্তাক্ত চুম্বন উপহার দিলাম, ছটফট করে উঠল কোমল শরীরখানি। ঘাড়ের ওপরে শোণিত
শ্বাসের ঢেউ, নিতম্বের সম্মুখাবর্তী খাঁজে কঠিন উত্তপ্ত ছোঁয়া। কমনীয়
দেহ পল্লবের আলিঙ্গনপাশ আরও প্রগাঢ় হয়ে উঠল। সর্বাঙ্গ সর্বশক্তি দিয়ে চটকে এক
আদিম খেলায় মেতে উঠলাম, এটা প্রেম নাকি বন্যতা! এই নারীর ছোঁয়ায় শরীরের স্নায়ু
নিজের আয়ত্তে থাকে না, ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো দুটো মানবশরীর এক হয়ে গেল। যৌবনের
পরাগরেণু অনিয়ম চুম্বনের সিঁড়ি ধরে পাক খেয়ে ফিরতে লাগল মেরুদণ্ড বরাবর। কী
চমৎকার একটা বিলোল শরীরী প্রেমের চিত্র অঙ্কিত হলো, অবশেষে
বাতিঘর ডুবে গেল সাগরের জলে। তাপমান শরীর কয়েকবার কম্পন করে রেতঃক্ষেপের দরুন
নিস্তেজ হয়ে যেতেই, নিজেকে কেমন যেন শকুনের মতো মনে হতে লাগল। মেয়েটিও শিকড়-কাটা
কচি শ্যামলতার মত নেতিয়ে পড়ে রইলো, বাইরে তখন
বৃষ্টি থেমে গেছে।
শেষ হলো এই বর্ষার উপাখ্যান, জঙ্গলের
পথের ঘাসবনের ভিতর গাছের ডালে ঝটপট ঝটপট শব্দ। বৃষ্টিভেজা ময়ূরগুলো পাখসাটে ঝড়
তুলছে ক্যাঁওক্যাঁও শব্দে। পাপী আত্মার মতো নিঃশব্দে ফেরার সময় দেখলাম মাটিতে সার
বেঁধে রোঁয়া ফুলিয়ে বেজির দল ঘোরাঘুরি করছে ফ্যাস ফ্যাস শব্দে। ময়ূরেরা এ ডাল থেকে
ও ডালে গিয়ে বসছে উড়ে উড়ে। বেজিগুলোর ধারালো দাঁতের সারি দেখা যাচ্ছে, অন্ধকার সেই
দাঁতের ক্রূরতা চাপা দিতে পারেনি। সামনে চেয়ে দেখলাম, এক
নিশ্চিন্ত প্রশান্তিতে মেয়েটি খচ্চর হাঁকাচ্ছে, সে যেন
ময়ুরের মতো পবিত্র আর আমি বেজীর মতো সুযোগলোভী লোলুপ ক্রূর।
সেই রাত্রে ফিরে কীভাবে শুয়েছি, কী করেছি তার আর বিস্তারিত বর্ণনাতে গেলাম না। পরদিন যখন দেবীর থানে বলি হচ্ছে, আমি তখন আসানসোল ছাড়িয়ে কোলকাতার পথে রেলগাড়িতে। কি ভেবে এসেছিলাম, আর কি নিয়ে বাড়ি ফিরছি! ক্ষণে ক্ষণে ভাবনার গতিপথ বদলে গেছে বিগত কয়েকদিনে, ভাবনা আলোর চেয়ে বেশি গতিতে দৌড়ায় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পরদিন পুজোর মণ্ডপে একই সময়ে এক দৃষ্টিতে দুই কন্যাকে দেখার সাহস আমার ছিল না। পরবর্তীতে ইরাবতী যোগাযোগ করেছিল বার কয়েক, কিন্তু বছর ঘুরতে মাধ্যমিকের পরেই তার বিয়ে হয়ে যায়। এই অধ্যায়ের এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে, সে এখন দুই কৃতি সন্তানের মা।
পৃথিবীতে তিন ধরনের মহিলা রয়েছে, প্রথম- যাকে ছাড়া আমি থাকতে পারি না। দ্বিতীয়- যাকে আমি মোটেই পছন্দ করি না, আর তৃতীয়- যার সঙ্গে আমি থাকি। বড় অদ্ভুত এই জীবন। বছর দুয়েক আগে এক ব্যবসায়িক কাজে ঝাড়খণ্ডে যেতে হয়েছিল। যদিও কাজ ছিল রাঁচিতে, তবুও এক অদম্য নেশায় উপস্থিত হলাম লাতেহারের সরকারবাড়িতে। বর্তমানে ভাঙাচোরা পোড়ো বাড়ি, একটা খোট্টা পরিবার থাকে। বাজারে খোঁজ করতে ফিরঙ্গির সন্ধান মিললো, সে আজও অবিবাহিত। কজরুর কথা শুধালাম, জানালো তার মেয়েকে নিয়ে সে রাঁচিতে থাকে। বিয়ে করে সংসারী হয়েছে জেনে ভালই লাগল, সেখানে এসে বাজারে খোঁজ করতে সরকার বাড়ির হদিস পেতে বেগ পেতে হলো না।
বর্তমানের আমি’র পরিবর্তিত চেহারা থেকে বিশ বছর আগের আমিকে সনাক্ত করা নোবেল পুরস্কার জয়ের সমান কৃতিত্বের, স্বভাবতই স্বশরীরে রেইকি করে যা দেখলাম, তাতে চোখ ছানাবড়া। অস্থিচর্মসার কজরু সরকার বাড়িতেই ঝি এর কাজ করে, থাকে গর্মেন্ট থেকে পাওয়া বাড়িতে। ফেরার পথে একটা আড়তে গেলাম, রামফল চিনতে পারল, সে নিজেই ব্যবসা করছে। শুধালাম, কজরুর একটা মেয়ে আছে, চেনো! তার জবাবে বেশ আশ্চর্যই হলাম, বলল- মেয়েটি নাকি ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। অর্থাৎ কুড়ি একুশ বছরের কম বয়স নয়। শুধালাম, কজরু কোথায় বিয়ে করেছে! রামফল জানালো- ওদের আবার বিয়ে কত্তা, বর নাই, কার না কার অবৈধ সন্তান কে খোঁজ রাখে। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল, বড় ইচ্ছা গেল মেয়েটির মুখটা একবার দেখি, সাহসে কুলালো না। সেই রাত্রেই নিজের বাড়ি ফিরে এলাম কাজ অর্ধসমাপ্ত রেখে।
নাহ, অনুশোচনা হয় না, কারণ
ভবিতব্যকে মেনে চলাটাই জীবন। কিন্তু বয়ে চলা নিস্তরঙ্গ জীবনের মাঝে বুদ্বুদের মতো
কিছু- যেগুলো কম্পনের সৃষ্টি করে, এ ঘটনা তেমনই একটা। এখানে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল
না, না ছিল সামাজিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈধ-অবৈধতার পরিমাপ। না ছিল দায়িত্ব
সোপর্দ বা অর্পণের কোনো জায়শুমারী। সবটাই ছিল তাৎক্ষণিক, প্রাণের
উচ্ছ্বাস, তারুণ্যের স্রোতে ভেসে, প্রেমের
দুর্বোধ্য ভাষায় সময়ের দাবিকে কেবল মাত্র মান্যতা দিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রকৃতির
খেয়ালে। ভালোমন্দ পাপপূণ্যের জ্ঞান সেদিন না থাকলেও আজকে আপন চৈতন্যের সাথে যখন
একাকী আলাপন করি- একটাই প্রশ্ন উঠে আসে- কাকে ঠকালাম? নিজেকে, নাকি তাকে, নাকি তৃতীয়
কাউকে যার আসল পরিচয় হয়ত কখনও কেউ জানবে না! এ এক অব্যক্ত যন্ত্রণার স্বীকারোক্তি।
-সমাপ্ত
তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না
⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...
-
ছোটবেলায় বাবা বলতেন "শাগ খেলে বাঘের বল"। যদিও তিনি ওটাকে শাকই বলতেন আমরা কচি কানে বাঘের সাথে মিলিয়ে শাগ শুনতাম। এহেন পরিস্থ...
-
(১) জাতীয় ডিম্ভাত দিবস ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই এর জমায়েত কী উদ্দেশ্যে হয়েছিলো জানেন? তোলামূলের রাজ্যে না জানাটাই আপনার অধিকার। ভোটার তাল...