পশ্চিমবঙ্গের ভোটের রাজনীতিতে নাকি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কখনও জায়গা পায়নি, এটা অনেকেই গর্ব করে বলেন। ইতিহাস ও তথ্য কি তাই বলছে?
স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন- ১৯৫২ সালের বিধানসভা ভোট; জাতীয় কংগ্রেস, কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টি, CPI সহ মোট ৭টি বামদল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল- যারা সেকুলার ছিল।
সাম্প্রদায়িক দলগুলোর মধ্যে ২৩৮টি বিধানসভা ক্ষেত্রের ৮৫টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভা ৩৩টি আসনে ও রামরাজ্য পার্টি ১৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। যার মধ্যে জনসঙ্ঘ ৫.২৯% ভোট পেয়ে ৯টি আসনে জয়লাভ করে আর হিন্দু মহাসভা পায় ৪টি আসন, মোট ভোটের ২.৩৭%। লক্ষ্যণীয়ভাবে পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড় আসনটি জনসঙ্ঘ জিতেছিল। মুসলিম লিগ ৩৬টা আসলে নির্দল হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল।
১৯৫৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জনসঙ্ঘ কোনো আসন না পেলেও, হিন্দু মহাসভা মাত্র ২.১৫% ভোট পেয়ে ২৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদীরা শূন্য হয়ে যায় বিধানসভাতে, কারণ বামেরা আলাদা আলাদা লড়েও ২৫২টি আসনের মধ্যে ৭৭টা আসন পেয়েছিল যা মোট ভোটের ৩৭.৫৭% ছিল।
১৯৬৭ সালের নির্বাচনে হিন্দু মহাসভা প্রার্থীই দিতে পারেনি, কিন্তু জনসঙ্ঘ ৫৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ১.৩৩% ভোট পায় ও ১টি মাত্র আসন জিততে সক্ষম হয়। বলাই বাহুল্য, এই সময়ের মধ্যেই ১৯৬৪ সালে CPIM দলের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, এবং সর্বাপেক্ষা বেশি CPIM উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসে জ্যোতি বসু বিরোধী দলনেতা হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠা লগ্নেই CPIM আজকের বিজেপির পূর্বপুরুষদের বাংলার মাটিতে প্রায় নির্বংশ করে যাত্রা শুরু করেছিল।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, কেন সেই সময় CPI ভেঙে গেছিল! কারণ মানুষ মনে করেছিল CPI ক্রমশ ভাববাদী দলে পরিণত হয়ে গিয়েছে- যারা কংগ্রেসকে হারাতে পারবে না। স্বভাবতই সদ্য জন্মানো CPIMকে মানুষ ঢেলে আশীর্বাদ করেছিল। একই ঘটনা ১৯৯৯ সালেও দেখা যায়, সরকার বিরোধী মানুষ মনে করেছিল CPIM কে হারানো কংগ্রেসের কম্ম নয়, তাই সদ্য জন্মানো তৃণমূল কংগ্রেস বেশ চোখে ধরা সাফল্য পায়।
এই একই ধারাতে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ মনে করেছে CPIM ক্রমশ কোলকাতা কেন্দ্রিক মধ্যবিত্তের ‘ভাববাদী জড়’ দলে পরিণত হয়েছে, তাই ভোটের বাক্সে CPIMকে বিবেচনাই করেনি। এই জায়গা থেকেই সুপ্ত জনসঙ্ঘের DNA ‘জিন’ আবার কোমা থেকে বেরিয়ে ‘আলাদীনের জিন’ হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে।
১৯৭১ এর নির্বাচনেও জনসঙ্ঘ ১টি আসন পেয়েছিল। আরেক সাম্প্রদায়িক দল মুসলিম লিগ এই বছর নিজেদের সিম্বলে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। এই সময় CPIM একাই ১১৩টা আসন পেয়ে বিধানসভায় বৃহত্তর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, এবং লক্ষ্যণীয়ভাবে CPI ক্রমশ পিছোতে থাকে। ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কোনো ভোট হয়নি, গণতন্ত্রকে লুঠ করেছিল কংগ্রেস। সিদ্ধার্থ রাজের প্রথম ৩ বছরে নির্বিচারে খুনোখুনির পর ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি হয়। পরবর্তীতে কংগ্রেস বিরোধীরা দুটো গোষ্ঠীতে সংঘবদ্ধ হয়, CPI ছাড়া অন্যান্য বামপন্থীরা ‘বামফ্রন্ট’ গঠন করে, বাকিরা জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ‘জনতা দল’ গঠন করে, যার মধ্যে জনসঙ্ঘও ছিল। ১৯৭২ সালে বরানগর আসনে জ্যোতি বসু CPI এর প্রার্থীর কাছে হেরেছিল, CPI কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে ভোটে লড়েছিল।
১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ সাল অবধি বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে জনতা দল ২৯টা আসন পেয়েছিল, যার মধ্যে সিংহভাগ আসন ছিল অবিভক্ত মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলায়। এই বছরও ‘CPI-কংগ্রেস’ জোট ছিল। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি ভেঙে ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (BJP) নাম নিয়ে জনসঙ্ঘ আত্মপ্রকাশ করে, যা ছিল RSS এর মুখ্য রাজনৈতিক শাখা। ১৯৮২ সালের নির্বাচনে জনতা পার্টি বা বিজেপি কেউ কোনো আসন পায়নি। CPIM এর গণসংগঠনের দাপটে এদের সংগঠন শিকেই উঠে গিয়েছিল তা প্রাপ্ত ভোট শতাংশ দেখেই সহজে অনুমেয়, যথাক্রমে- ০.৮৩% ও ০.৫৮%।
১৯৮৭ সালের নির্বাচনেও জনতা দল, বিজেপি বা মুসলিম লিগের কেউই বিধানসভায় খাতা খুলতে পারেনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজেপি সর্বপ্রথম ২৯১টা আসনে প্রার্থী দিয়ে ১১.৩৪% ভোট পেয়েছিল, আদবানীর রথযাত্রাকে পুঁজি করে। এই বছর আরেক জনসঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভা ও শিবসেনা আলাদা ভাবে প্রার্থী দিয়েছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি কোনো আসন পায়নি, অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলের মধ্যে শিবসেনা, জনসঙ্ঘ ও হিন্দু মহাসভার পাশাপাশি মুসলিম লিগ প্রার্থী দিয়েছিল।
২০০১ সালের নির্বাচনেও বিজেপি সহ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলগুলো বিধানসভাতে শূন্য ছিল। ২০০৬ সালে বিজেপি তৃণমূলের সাথে জোট করে, সেখানে তৃণমূলরূপী বিজেপিরা ৩০টা আসন জিতলেও স্বনামে বিজেপির হাত খালিই রয়ে যায়।
২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের পতন হলেও বামেরা প্রায় ৪০% ভোট পেয়েছিল। এই বছরও বিজেপি ঠনঠন গোপালই ছিল। দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯১ ছাড়া বিজেপির প্রাপ্ত ভোট সর্বদাই ৫% এর আশেপাশে ছিল, গোটা আশির দশকে RSSকে কার্যত ‘হাফ পার্সেন্টেজে’ নামিয়ে দিয়েছিল CPIM। কিন্তু ২০১৬ সালে এসে তৃণমূল সরকারের অভিভাবকত্বে বিজেপির অভিষেক ঘটে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাতে, ৩টে আসন নিয়ে।
এর পর ২০২১ তো টাটকা ইতিহাস।
মরাল অফ-দ্যা স্টোরি কী?
১) পশ্চিমবঙ্গীয় রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকতার ভাইরাস ছিলই, CPIM নামের ভ্যাক্সিন ‘ধর্মীয় রাজনীতিকে’ কোমায় পাঠিয়ে রেখেছিল।
২) বামেরা নয়, CPIM এসেছিল বলে জনসঙ্ঘ বা হিন্দু মহাসভা শূন্য হয়ে হারিয়ে গেছিল। এক দশক ধরে ভোট শেয়ারিং ‘হাফ পার্সেন্টেজে’ নামিয়ে দিয়েছিল।
৩) CPIM এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ছিল বলে বিজেপি এই রাজ্যে খাতা খুলতে পারেনি বিধানসভাতে।
৪) সুতরাং, বিজেপিকে তাড়াতে CPIM ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এতে অবশ্য আনন্দিত হয়ে লেঙুড় তুলে নাচার কিছু নেই, অতীতটা অতীতই হয়। লড়াইটা আজকের বাস্তবতাতে লড়তে হবে, তাহলেই আবার বিজেপিকে নিষ্ক্রিয় করে কোমায় পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব। ভাববাদী মধ্যবিত্তের দল হতে গিয়ে কংগ্রেসের মতো বুর্জোয়া দলের সাথে জোট করা, CPI এর উবে যাওয়ার উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। পিছনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন মধ্য মেধার নেতাদের দ্রুত মুক্তি দিয়ে তরুণ লড়াকু মানসিকতার ‘শ্রেণী ও সংখ্যালঘু’ নেতাদের জায়গা দিলে তবেই সেটা CPIM হবে, না হলে আগামী ঠিক তার বিকল্প খুঁজে নেবে, দল রয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায় আর সাইনবোর্ডে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন