মাত্র ৩ বছরের শাসনাকালে গোটা পৃথিবীকে সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পথ দেখিয়েছিলেন, যা যারা পৃথিবীর জন্য অনুকরনীয় ও দৃষ্টান্তমূলক। আমাদের রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারের পদক্ষেপের অধিকাংশই আলেন্দের কল্যাণমুখী প্রকল্পগুলোকে পরিমার্জন করে অনুসরণ করা।
• চিলি’র প্রেসিডেন্ট হবার পরপরই তিনি ঘোষনা করেন- The Chilean Path To Socialism. চিলি’র নিজস্ব পন্থায় সমাজতন্ত্র’ বা সমাজতান্ত্রিক দেশ গঠনের আন্দোলনের ঘোষনা তিনি দিলেন। তিনি শুধু ডাক দিয়েই ক্ষান্ত থাকলেন না, তিনি উৎসাহের সাথে কাজে নেমে পড়লেন।
• বৃহৎ আকারের শিল্প জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রীয়করণ করেন। তিনি কপার খনি ও ব্যাংক খাতসহ বিভিন্ন বড় বড় শিল্প ও শিল্প কারখানা জাতীয় করণের ঘোষনা দেন। তিনি স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষাখাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা করেন।
• শিক্ষার হার বাড়ানোর পাশাপাশি, আগামী প্রজন্মকে পুষ্টি দিতে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশুদের জন্য তিনি বিনা খরচে দুধ বিতরণের কাজে হাত দেন। স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেন। যা আমাদের দেশে মিডডে মিল নামে চালু হয় গত দশকে।
• বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর অবধি শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিন বছরের মধ্যে ভর্তির হার বেড়ে যায় ৮৯ শতাংশ।
• শহরাঞ্চলে গৃহহীনদের জন্য ঘর করে দেবার উদ্যোগ নেন।
• শ্রমিকদের নুন্যতম ন্যায্য বেতনের পরিমাণ নির্ধারন করেন।
• আগে থেকেই জমি অধিগ্রহণ ও জমি পুনঃবন্টনের যে কাজ চলছিল তিনি তা আরো দ্রুততার সাথে করার উদ্যোগ নেন।
• ১৮ মাসের মধ্যে লাথিফুন্দা বা বৃহদাকারের কৃষি জমিদারী দেশ থেকে লুপ্ত করেন।
• বিদ্যুতের দাম তিনি কমিয়ে দেন।
• জনগণের বিভিন্ন খাতের ট্যাক্স কমিয়ে দেন।
• তিনি পপুলার সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
• নারীদের মাতৃত্ব ছুটি ৬ সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ১২ সপ্তাহ করেন।
• প্রজেক্ট সাইবারসিন(Cybersen) একটি উন্নত নেটওয়ার্কৃ ব্যবস্থা তিনি সৃষ্টি করেন। যার মাধ্যমে কলকারখানা থেকে টেলেক্স মেশিন ও কম্পিউটারের সাহায্যে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করা হয়।
চিলি দেশের মধ্যে এই সকল সংস্কারমূলক কাজ মুখের কথা কথা ছিলো না। বাস্তবেই সাধারণ জনগণ এই সংস্কারের সুফল ভোগ করতে সক্ষম হচ্ছিলো। একইসাথে পূঁজিপতিরা এই সংস্কার কাজে জর্জরিত হয়েছিলো। এরইমধ্যে আমেরিকান সরকার চিলি’র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের কাজকে নানাভাবে ভন্ডুল করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিলি ঘোষনা দিলো আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা ও বিদেশী কোনো দেশের দেনা চিলি শোধ করবে না।
স্বভাবতই চিলি’র সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার চক্রান্ত সমানতালে চলতে থাকলো।
আলেন্দে যেদিন থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়িছিলেন সেদিন থেকে তার বিরুদ্ধে আমেরিকা নানা চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের জাল বিছাতে থাকে। আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি আরকাইভস-র ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সালেই CIA বলেছিল যে, আলেন্দে সামরিক অভ্যুত্থানে মারা যাবে এমনটা নির্ধারিতই ছিল।
সেখানে বলা হয়, ’এটা নিশ্চিত এবং অবধারিত বিধান যে, আলেন্দেকে ক্যু’র মাধ্যমে সরিয়ে দেয়া হবে.. …’
In 1970, the CIA’s deputy director of plans wrote in a secret memo: “It is firm and continuing policy that Allende be overthrown by a coup. … It is imperative that these actions be implemented clandestinely and securely so that the USG [the U.S. government] and American hand be well hidden.”
একই বছরে আমেরিকান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সিআইএকে নির্দেশ দিলেন, ‘”make the economy scream”। চিলি’র অর্থনীতিতে হাহাকার এনে দাও! শাসনতান্ত্রিক সংকট শুরু করা হলো নানা ওজর উছিলা সৃষ্টি করে।
সাল ১৯৭৩, ১১ সেপ্টেম্বর। আলেন্দে রেডিওতে সরাসরি বক্তব্য দিচ্ছেন। এদিকে দূর থেকে শোনা যাচ্ছে গোলাগুলির আওয়াজ। এরই মধ্যে তিনি বললেন-
“আমার দেশের প্রিয় শ্রমিক জনতা! চিলি’র জনগণ ও তাদের আকাংখার উপর আমার বিশ্বাস আছে। বিশ্বাসঘাতকতা’র ভেতর থেকেও নিশ্চয়ই আগামীর যারা আসবে তারা এই অন্ধকার-অসহ্য সময়কে পরাজিত করতে পারবে। মনে রাখবেন, দিনক্ষণ সমাগত, বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে, যার মাধ্যমে মুক্ত জনতা নতুন একটি ভালো সমাজ গঠনের কাজে এগিয়ে আসবে।
চির জাগরূক থাকুক চিলি!
চির দেদিপ্যমান থাকুকি জনতা!
চিরজীবন বেঁচে থাকুক শ্রমিকসমাজ”!
তিনি এই বক্তব্য শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যে ক্ষমতা দখলকারীরা ঘোষনা দিলো, আলেন্দে আত্মহত্যা করেছেন।
১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সালভাদর আলেন্দে’র মৃত্যু হলো।
চিলি’র সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা আপাতত থেকে গেলেও, রয়ে যায় চিলিকে আমূল পরিবর্তনের শ্রমসাধ্য চেষ্টার বিরাট এক দক্ষযজ্ঞ। অসমাপ্ত অধ্যায়ের অশেষ কর্তব্য কর্ম আজও সমগ্র বিশ্ব অনুসরণ করছে।
__________________
পরিমার্জিত ও সংযোজিত
সুত্রঃ বিডি নিউস
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন