বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২০

কুলুপাধীন কালের পরকীয়া

 


(১)

লকডাউন তথা কুলুপাধীন নাম্নী এক ব্যাতিক্রমী প্রতিকুল যুগের অবতারনা হইয়াছে মানবসভ্যতায়, সেই সন্ধিক্ষণের সাক্ষী রূপে নিজেকে আবিষ্কার করিলেও তাহার সম্যক রূপ উপলব্ধি করিতে পারি নাই। বিশ্বচরাচরের সমুদায় মনুষ্য প্রজাতি অদৃশ্য বীজাণুর আক্রমণ হইতে সভ্যতাকে সংরক্ষণ করিবার তরে সংগ্রাম করিতেছে; আমি তুচ্ছ নাগরিক, অগত্যা গৃহবন্দী হইয়াই সংরক্ষিত হইতেছি। পূনঃ পূণঃ এই একঘেয়ে মুখমণ্ডল ও তদনিসৃত ফরমাইস পুঞ্জ দ্বারা অতিষ্ঠ হইয়া; গৃহকর্ত্রীর সমাঙ্গিত অসূয়া পরিবেষ্টিত আমি ক্রমশই নিঃসঙ্গ পার্ষদহীন রূপে দ্বিতলের একটি কক্ষে ঠাই লইয়াছি, দোসর সেই একমেবাদ্বিতীয় দূরসঞ্চালক বার্তালাপ তথা অন্তর্জালীয় অভিগমন যন্ত্র ও অঙ্কশীর্ষক পরিগণক যন্ত্র। এই দুই এর বিদ্যুৎবাহী যবনিকা প্রান্তরে যাবতীয় জৈবিক চলন গমন সীমাবদ্ধ হইয়াছে দর্শন কর্তৃক।

 অবিরতভাবে সপ্তম দিবসকাল হইল গৃহবন্দী সমগ্র দেশবাসী, বিগত কয়েকদিন যাবৎ রাত্রির অন্তিম প্রহরে অদ্ভুত এক অতিপ্রাকৃত বিষয়ে প্রতীত হইলাম। আমাদের বাসভবনের পূর্বপ্রান্তে নব্য আমদানি পট্টাদারের নিবাস হইতে এক তরুনীর বসন্তদূতাকন্ঠী কাব্য-নির্ঝর কর্ণকূহরে পুলকের সঞ্চার ঘটাইলো। লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হইল, অনুদিন একই কাব্যের আবৃত্তি সাধনা অনুশীলিত হইত। কখনও কখনও সান্ধ্যলগ্নে সাধিত হইলেও, রাত্রি চতুর্থ প্রহরের সূচনা লগ্নে কাব্যবিলাস নির্দিষ্ট ছিল। অতঃপর বিরামহীন নিরবতা, গৃহসম্মুখে শিলাজতু নির্মিত মূলসরণি হইতে যন্ত্রশকটের মৃদু তূর্যধ্বনী বিনা কোনো কিছুই আর শ্রবণগ্রাহ্য রহিতনা।

 আমি নিশিপালক প্রজাতির মরমানব, করোনা বীজাণু ভীতির দরুন বর্তমানে রাষ্ট্র কর্তৃক আদেশকৃত 'সঙ্গরোধ' যাপন করিতেছি, দপ্তর যাইবার তাড়া বিহীন জীবনধারায়- বেলা ১২ ঘটিকায় প্রাতঃকালের উদ্ভাস হয়, স্বভাবতই রাত্রি জাগরণে নুন্যতম অসুবিধা হয়না। আমাদিগকের এই আবাসনটি দ্বিতল বিশিষ্ট, উত্তর আধুনিক গঠনপ্রাণালীর না হইলেও নিতান্ত অনাড়ম্বরও নহে। পিতামহের জামানায় এই ভবনগুলি নির্মিত হইয়াছিল, যথেষ্ট মুক্ত পরিসর চতুর্ভিতে অবশিষ্ট রাখিয়া। একই ভিটাতে অন্যান্য পিতৃব্য শ্রেণীর গুরুজন ও তুতো ভ্রাতা-ভগীনিদের নিবাস। কনিষ্ঠ খুড়ো মহাশয়ের বাটিকার অতিরিক্ত কক্ষে নয়া পট্টাদার পরিবারটি ঘাঁটি গাড়িয়াছে, তাহাদিগকে অদ্যাবধি চাক্ষুষ করিবার ফুরসৎ মেলে নাই।

 স্বভাবিক অবসরে আমার মা জননীই স্থানীয় বিশ্বের যাবতীয় তথ্যাদি আহরণ করিয়া সকলের নিকটে তাহা রসমিশ্রিত করিয়া পরিবেশন করিয়া থাকেন। বর্তমান সময়ই অসুস্থ, ইচ্ছাকৃত পল্লীভ্রমণে রোগাক্রান্ত হইবার শঙ্কা শিয়রে দণ্ডায়মান; তদুপরি পিতৃদেব বিকল্প আবাসে স্বপার্ষদ পলায়ন করিয়াছেন আমার মাতৃদেবীর স্বৈরাচারী নিপীড়নের শিকার হইয়া, সেই পাপখন্ডনে তিনি নিজেকে আজকাল অধিকাংশ সময়ই ধর্মকর্মেই ব্যাপৃত রাখিয়াছেন। নিতান্ত প্রয়োজন ব্যাতিরেকে বাহিরে গমন করেননা।

 কাব্য বিষয়ে আমার অধিক শিরঃপীড়া নাই, বিষয়টি যথেষ্ট দুর্বোধ্যও বটে। তদহেতুও ব্যাতিক্রমী ক্ষেত্রে কদচিৎ আগ্রহ প্রসব করে চিত্তপটে। তত্রাচ, দৈনন্দিন মধ্যনিশীথের অপরিবর্তনীয় ও সুনিয়ন্ত্রিত কাব্যগাথা শ্রবণ করিয়া কেমন অদ্ভুতুড়ে প্রকারের অনুভব উদগীরন হইতেছিল। অতীব দরদ মিশ্রিত সেই মায়াবী কন্ঠের উক্ত কাব্যের শব্দমালা আমার নিকটে স্পষ্ট ছিলনা, তথাপি ললনাটি যে এই বিশেষ কাব্যটির উপর সিদ্ধপ্রাপ্ত হইয়াছে তাহা লইয়া সন্দেহের কোনো অবকাশ ছিলনা। গ্রীষ্মকালের নিমিত্ত কক্ষের বাতায়ন উন্মুক্তই থাকে, আমি সেই বাতায়নের একটির প্রকোষ্ঠে উপবিষ্ট হইয়া অদৃশ্য সুরেলা কন্ঠের প্রতি মনোনিবেশ করিতে লাগিলাম প্রত্যহ।

 কুলুপাধিনস্তের প্রতিটি দিবস অতিবাহিত হইতেছিল নির্বিঘ্নেই, অপর দিকে অতিন্দ্রিয়ার বিরামহীন কাব্যবিলাসে কোন ছেদ পড়ে নাই। অন্তরের ব্যাকুলতা দিনদিন বৃদ্ধি পাইবার দরুন, অষ্টম দিবসে মাতাশ্রীকে গূঢ়সংবাদবাহক রূপে তথায় প্রেরণ করিলাম কৌশলে। নব্য পড়শীর কুশলাদি সহ কুলুপাধিন কালে কোনো প্রকারের সহযোগিতার প্রয়োজন রহিয়াছে কিনা তাহার সন্ধান লওয়া সুনাগরিকের ধর্ম।

 নৈশভোজনকালে মাতৃদেবী হইতে প্রাথমিক রেইকির যাবতীয় বিষয়ে অবগত হইলাম। পরিবারটির সদস্য সংখ্যা দুই জন, পার্শ্ববর্তী জিলায় তাহাদের নিবাস। বদলির চাকুরীর সুত্রে এই মহল্লাতে আগমন, বর্তমানে অবশ্য একটিই প্রাণীর বাস হেথা, স্ত্রী'টি। তাহাদের সন্তানহীন পরিণয়ের বয়স দশটি বসন্ত পার করিয়াছে, স্বামী কোটাল বিভাগে চাকুরিরত। বদলি আদেশ হইলেও কুলুপাধীনের আকস্মিকতায় তাহার রুপায়ন স্থগিত হইবার দরুন, পুরাতন কোতোয়ালিতেই কর্তব্যরত রহিয়া গিয়াছেন, অথচ স্ত্রী ও গৃহাদি আসবাবপত্র সকলই এই নূতন আস্তানায় পৌঁছাইয়াছে।

 উপচিত হইলাম, এক নিরুপায় রমণীর সোহাগবিচ্ছেদের আর্তকাব্য শ্রবন করিতেছি রোজ, চিত্তাভ্যন্তরে পরকীয়া নাম্নী পাপবোধ জাগ্রত হইতেই তাহা স্বত্তাকে দংশন করিতে লাগিল। আমার কনিষ্ঠ খুড়ো রাষ্ট্রীয় সৈন্যদলের করণিক, ভিনরাজ্যে তাহার নিবাস। সেই হেতু তাহাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত কক্ষগুলিতে নিয়মিত পাট্টাদার তথা ভাড়াটিয়াদের আনাগোণা দেখিয়াছি, সুতরাং নূতন মানুষ আমার সন্নিকটে নতুন কোনো বিষয় যেমন ছিলনা, তেমনই তাহাদিগক সম্বন্ধীয় কখনও কোনো প্রকারের কৌতুহলও সঞ্চার করেনি ভাবনাপটে। নিশিজাগরণ করিয়া আমার সাহিত্যচর্চার স্বভাব বহু পুরাতন, স্ত্রী-কন্যাত্রয় মিলিতভাবে জাগরণ পীড়া ও আমার ন্যায় 'সংক্রামক নমুনা' হইতে পরিত্রাণ পাইতে অগত্যা অন্য কক্ষে শয়নের ঘটনা- নিজ ক্ষেত্রেই ইতিহাস। এমতাবস্থায় একাকী ব্যাক্তির মধ্যরাত্রে পুনরায় কাব্যবিষাদনামা কর্ণকূহরে প্রবেশ করিতেই চিত্ত ব্যাগ্র হইয়া উঠিল, পরকীয়ার পাপবোধ মুহুর্তেই নিশীথের তিমিরে বিলীন হইয়া হৃদয়ে অনুরাগের মুকুল অঙ্কুরিত হইয়া গেল। অনুভব করিলাম, তাহার একাকীত্ব আমার প্রানে চঞ্চলতা সৃষ্টি করিয়াছে, যাহা ক্রমশই বর্ষার ছত্রাকের ন্যায় সংক্রমণ ছড়াইয়া দিতে লাগিল সমগ্র মননে।

 নবম দিবসে শরমের মাথা খাইয়া স্ত্রীকে প্রশ্ন করিয়াই বসিলাম, "পড়শী পিতৃব্য গৃহের নূতন ভাড়াটিয়া কী উন্মাদ"?

ভার্যা আমার দিকে সন্ধিগ্ধ দৃষ্টিপাত করিয়া শুধাইল- "কেন, কি হইয়াছে? সহসা এই উদ্বেগের হেতু”?

কহিলাম, "না তেমন গুরতর কিছু নয়, তথাপি একটি ঘটনা প্রাণে ক্লেশের সঞ্চার ঘটাইয়াছে। তুমি শ্রবণ করিয়াছো কিনা জানিনা- স্ত্রীলোকটি মধ্যরাত্রে নিত্যদিন একই কবিতামালা বারংবার আবৃত্তি করেন, এবং নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে। বিষয়টা কী অস্বাভাবিক নহে"?

 স্ত্রী ঈষৎ বক্র হাস্যের সহিত কহিল, "উঁ, মিনশে যেন রাধাভাব ধারন করিয়া শ্রীনন্দনন্দনের মোহনবংশী শুনিয়া অবস হইয়া গিয়াছে। রাত্রিকালীন আবৃত্তি বিষয়ে জানিনে, তবে রাসমণ্ডলের রসিকেশ্বরীটি অতিশয় সুন্দরী এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু..."।

 সেই মুহুর্তে মধ্যম কন্যার তীব্র চিৎকারে আলাপচারিতাতে বিরতি আসিল, কারন স্ত্রী দ্রুতপদে সেই অভিমুখে ধাবিত হইল, নিশ্চই ভগিনীগণের মাঝে ক্রীড়াচ্ছলে কলহজনিত বিবাদ ঘটিয়াছে। পরন্তু, মনজগতের উৎকণ্ঠা আরো বিপুল পরিমাণ বাড়িয়া গেল স্ত্রীলোকটি সৌন্দর্য জনিত সংবাদ শ্রবণ করিবা ইস্তক। অবচেতনে কতশত ভাবনারা জট পাকাইয়া গেল, স্বামীর বিরহে বিরহিণী বেচারি রমণীর সন্তানও নেই যাহাতে তাহার একাকীত্ব দুরীভূত হইতে পারে। সুতরাং, আপন চরিত্রের সমাজসেবক বৈশিষ্টটি চরমরূপে জাগ্রত হইবার বাসনা প্রকাশ করিল। 

 

(২)

 যেহেতু দ্বিতীয়তলে অন্য পিতৃব্যের বসবাস, সেইহেতু গগনচন্দ্রাতপ-প্রদেশে পট্টাদারদিগের আসাযাওয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ এর বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত ছিলাম। এই কুলুপাধীন কালের অখন্ড অবকাশের অপরাহ্ণে গগনচন্দ্রাতপ-প্রদেশে গমন করিয়া যে মধ্যরাত্রির মোহিনীকে চাক্ষুষ করিব সেই উপায় ছিলনা, তবুও বিবাগী ইন্দ্রিয়ের বশবর্তী হইয়া গত দুইদিন যাবৎ সেইস্থান হইতেই একাকী উদয়ারম্ভ চলিতে লাগিল। বর্তমান জীবনে আমার কোনোরূপ অস্বচ্ছন্দ্যতার লেসমাত্র ছিলনা, তথাপিও নিজেকে কষ্টবিলাসী ভাবিতেই বেশ প্রসন্নতা ভাবের উদ্রেগ ঘটিল চিত্তে। ভাবিতেছিলাম বেচারির বৈবাহিক জীবনে বসন্তেরা নিয়মিত উপনীত হইলেও দাম্পত্যে হয়ত শুধুই কাষ্ঠল গ্রীষ্মের দাবদাহ, সেই শুষ্ক জমিনে সামান্য বর্ষার বারিধারা নাজানি কতই নবপ্রানের সঞ্চার ঘটাইবে।

 নিজেকে সাক্ষাৎ কৃষ্ণাকায় জলগর্ভ জীমূতের প্রতিরূপ কল্পনা করিতেই কিছু গম্ভীর ধ্বনী কর্নকূহরে পশিল, তীব্র বজ্রপাত করিয়া বিরহীর উপরে ঝরিয়া পড়িব ওমনি লক্ষ্যভ্রষ্ট কামানের ন্যায় আপন বপুতেই বজ্রপাতের ন্যায় ঝঙ্কারধ্বনি পতিত হইল। ভীষণ রকমের চমকিত হইয়া দেখি, আপন স্ত্রীরত্নটি কুঞ্চিত ললাটে, তীর্যক দৃষ্টি হানিয়া বিস্বাদ কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়িয়া দিল, "কয়েকদিন হইতেই খেয়াল করিতেছি, নিয়মিত একাকী এই গগচ্ছাদনে কিসের তরে আগমন"? আমি দ্বিধাগ্রস্থের ন্যায় কিছু কহিতে যাইব, কুপিত স্ত্রী কহিল, "গৃহে অতিথি নারায়ণের আগমন ঘটিয়াছে, মিষ্টান্নভাণ্ডার হইতে কিছু মিঠাই আনিলে ধন্য হই। পড়শী নবীন পট্টাদার রমণীটি আসিয়াছেন, অতিশয় সজ্জন। দ্রুত কর্ম সম্পাদন করিয়া ধন্য করিলে বাধিত হই"।

 অস্ফুটেই আপন মুখ দিয়া বাহির হইয়া আসিল "...আসিয়াছে"! দুরদর্শের ধারাবাহিকের নেপথ্য সঙ্গীতের ন্যায় আমার মস্তিষ্কের প্রায় প্রতিটি কোষিকাতে তন্ত্রীনির্মিত বাদ্যযন্ত্রের সুরঝঙ্কার উঠিল। আবেগের বশবর্তী হইয়া স্ত্রীকেই আলিঙ্গনাবদ্ধ করিয়া তীব্র আশ্লেষে ভরাইয়া দিলাম। স্ত্রী কি অনুধাবন করিল তাহা বোঝা দুষ্কর, আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বলিল- "আচ্ছা ঠিক আছে, একটু অধিক কটুস্বরে শাসন হইয়া গিয়াছে, আজি হইতে কিছুদিন তোমাকে অব্যাহতি দিলাম"। কিছুদিন! ত্রাসের প্রকোপে আপনা হইতেই আলিঙ্গনের মুষ্ঠি শিথিল হইয়া আসিল।

 নববধূর মত লজ্জিত হইয়া স্ত্রীধনটি প্রায় দৌড়াইয়া সোপান বাহিয়া দ্বিতলে অবতরণ করিয়া অদৃশ্য হইল, অপরাহ্ণের স্তিমিত সুর্যালোকে বহুকাল পর তাহার প্রতি নেত্রপাত করিলাম, শুভদৃষ্টির মতনই সে আজও রূপসী। কিন্তু স্ত্রীরূপে তাহার উত্তরোত্তর শাসকবৃত্তির প্রকোপে আমার অন্তরাত্মা প্রহারেন সারমেয়র লেঙ্গুড়ের ন্যায় নতমস্তক যাপনে অভ্যস্ত হইয়া  গিয়াছিল।

 সে যাহাই হউক আমি ভাবিতে লাগিলাম ঠিক এই মুহুর্তে অকুস্থলে আমার উপস্থিতি কতটা বাঞ্ছনীয়! এক অত্যাশ্চর্য উদ্দিপনাকে দমন করিয়া আমি নিন্মতলে যাওয়া হইতে বিরতই রহিলাম।

 সেই দিবসগত রাত্রেও বাতায়নের লৌহশলাকাকে মুষ্ঠিবদ্ধ করিয়া কানপাতিয়া কাব্য শ্রবণ করিলাম, যথারীতি শব্দমালা পূর্বের ন্যায়ই অস্পষ্ট রহিয়া গেল। এক অদ্ভুত প্রগলভ রহস্যজাল ক্রমশই আমাকে গ্রেপ্তার করিয়া নিল।

 দশম দিবসের প্রাতঃরাশে কনিষ্ঠা কন্যা কহিল, "গতকাল যে মাসীমণি আসিয়াছিলেন তিনি সকালে 'ডিমের হালুয়া' পাঠাইয়াছেন, তুমি খাইবে"? এরই মধ্যে এতটা ঘনিষ্টতা, তবুও চোখেমুখে এক নির্লিপ্ততা রাখিয়া শুধাইলাম, "কোন মাসিমনি রে"? কনিষ্ঠা পঞ্চমবর্ষীয়া, সে নিরুত্তর রহিলে জ্যেষ্ঠা কন্যা বিষদে বুঝাইবার কসুর করিলনা, কিন্তু আমার ন্যায় জ্ঞানপাপীকে বুঝাইবে সে সাধ্যি তাহার কোথায়! মুশকিল আসান করিল মধ্যম কন্যা, সহসা সে তাহার মায়ের দূরভাষ যন্ত্রের চিত্র সংগ্রহশালা উন্মুক্ত করিতেই- গতকাল অপরাহ্ণে ভগিনীত্রয়ের সহিত সেই মোহনীয় অতিথির প্রতিকৃতি আঁখিপাতে ফুটিয়া উঠিল। কীভাবে নিজের উত্তেজনা গোপন করিব সেই ভাবনাতে প্রাতঃরাশ মুলতুবি রাখিয়া যন্ত্রটি কুক্ষিগত করিয়া আপন কক্ষে শয়ন গ্রহণ করিলাম।

 স্ত্রী পাকশালায় রন্ধনকর্মে ব্যাস্ত ছিল, আমার এহেন কর্মটি প্রাথমিকভাবে তাহার চুক্ষু এড়াইয়া যাইলেও, ভুক্তাবশেষ দেখিয়া চড়াও হইলেন ক্ষনকাল বাদেই। আমি সম্পূর্ণরূপে তাহার ভর্ৎসনা উপেক্ষা করিয়া তাহার রৌদ্ররসে পরিপুর্ণ লাবন্য উপভোগ করিতে লাগিলাম নির্লিপ্ত মুখাবয়বে, পত্নীমহাশয়াও যে পরমা সুন্দরী তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই, তথাপি আমার রাত্রিকালের ওই নিশিঅঙ্গনার রূপলাবণ্য যেন কিঞ্চিৎ পরিমান হইলেও অধিক বলে বোধ হইল। অগত্যা পট্টিকা পরিষ্কার করিয়া অবশিষ্ট ভুক্তাবশেষ হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিলাম, স্ত্রীর রোষ হইতেও। ততক্ষণে সেই পরস্ত্রীর দূরভাষ সংযোগ রাশি হাসিল করিয়া লইয়াছি স্বীয়’স্ত্রীর দূরভাষ যন্ত্র হইতে। অতএব ভাবসাগরে সমাধি লইয়া পরবর্তী কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি নিরুপন দরুন, আদিম রিপুকে তুষ্ট না করিলে প্রাণের সন্তোষ বিলুপ্ত হইবে। কোনো এক আসব উৎপাদক সমিতির প্রজ্ঞাপন বানী শুনিয়াছিলাম বিলাতী ভাষ্যে- man will be man, আমি খামোখা তাহার বিরুদ্ধাচারন করিব কেমনে! 

 

(৩)

 হিনা'র সহিত অন্তর্জালীয় বার্তাপ্রেরন মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনা আজ পঞ্চম দিবসে গড়াইয়াছে। সম্পর্কটি শুরু বন্ধুত্বের মতই কিন্তু প্রতিদিনিই তাহার চেয়েও অধিক গাঢ় হইতে লাগিল। নকল পরিচয়বহ আননকিতাবের নকল পরিলেখাবৃত পরিচিতির গভীরে আমার উপস্থিতি অত্যন্ত সচেতন ও নিগূঢ়তাচ্ছন্ন; অতএব ব্যাক্তি আমিকে ঠাহর করা অতি দুঃসাধ্য, ধুরন্ধর ব্যাতিরেকে। যদিও আমি আমার অভীষ্ট লক্ষ্যে অবিচল থাকিয়া সফলতা অর্জন করিয়াছি প্রত্যাশা মতই, কারন অন্তর্জালীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মুসাবিদায় আমার অতীব কুশলতার বিষয়ে, তদশ্রেনীয় পরম মিত্রদিগের হইতে প্রভূত শংসা হাসিল করিয়াছি। নিন্দুকে বলিয়া থাকে, তথায় আমার বাকপটুতা যেন বরষার ছত্রাকের ন্যায় ক্রমশ বিস্তার লাভ করিয়া সন্মুখস্থ ব্যাক্তিকে সমাচ্ছন্ন করিয়া তোলে। হিনা প্রত্যহ সর্বদিনব্যাপি সাংসারিক কর্মসম্পাদনের অনুমুখিতা রক্ষা করিয়াও নিরবিচ্ছিন্নভাবে আমার সহিত আপচারিতাতে মগ্ন থাকে রাত্রি দ্বিপ্রহরের কিয়ৎকাল পুর্ব পর্যন্ত, অতঃপর উহা পরবর্তী দিবসের তরে মুলতুবি হইয়া যায়।

 মাত্র সপ্তমদিবসীয় আলাপচারিতাতেই তাহার শৈশব হইতে বর্তমান দিন পর্যন্ত প্রায় সকল কিছুরই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস উন্মোচিত হইলেও, মধ্যরাত্রের কাব্যসাধনার প্রহেলিকা হইতে অবগুণ্ঠন উন্মুক্ত করিতে পারিনাই। স্পষ্টুরভাবে শুধাইব এমন সাহস নেই, সেক্ষেত্রে পরিচয় উদ্ঘাটন হইয়া যাইবার সমূহ সম্ভাবনা, তিনি কৌতূহল বসত শুধাইতেই পারেন, "আপনি কেমনে জানিলেন আমার মধ্যরাত্রির কাব্যবিলাসের প্রসঙ্গ"। বিগত সাতদিনে তাহার তরফে একটি শব্দও ব্যায় হয়নি কাব্য সংক্রান্ত বিষয়ে, অথচ আমার প্রচেষ্টা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের। অগত্যা এই সপ্তম রাত্রিব্যাপীও কাব্যমুর্চ্ছনায় নিবৃত্তি আসিলনা।

 ক্রমশই সম্পর্ক ঘনীভূত হইতেছিল, আদিম প্রবৃত্তি তাহার বিষাদগ্রস্থ অতৃপ্ত আত্মায় কামচেতনা জাগরিত করিয়া তুলিল অচিরেই। তাহার পক্ষ হইতেই সর্বপ্রথম চাক্ষুষ সাক্ষাতের নিবেদন- পরিস্থিতি অতিষ্ঠ করিয়া তুলিল। কুলুপাধিনের অজুহাতে সেই আব্দার হইতে কোনোপ্রকারে পরিত্রাণ পাইতেই, 'কি-নিবেশ' বাহনের দুরেক্ষণ আহ্বান বাণী- প্রতিষিদ্ধ অম্লমধুর কহনের গগনে, কজ্জ্বলের ন্যায় ধুম্রজালে আচ্ছাদিত করিয়া ফেলিল, যাহা উপেক্ষার সর্বপ্রকার বাহানা প্রতিবার অকৃতকার্য হইতেছিল।

 পূর্বরঙ্গের অতীব যাতনায় হিনা নান্মী রমণীটি, প্রণয়ের প্রস্তাবনা করিয়া বসিল আপন বৈবাহিক পরিচয় গোপন রাখিয়াই। আমি পত্রপাঠ তাহা নাকচ না করিলেও বাচনভঙ্গি দ্বারা আমার ঔদাসীন্য অভিলষিত করিলাম। ইহাতে সে দৃশ্যত কুপিত হইয়া দিবসভাগের প্রায় অষ্টঘন্টাধিক কাল আলাপচারিতা রুদ্ধ রাখিল। নৈশভোজনের পর ধ্বান্তচিত্তে ধুম্রপানের নিমিত্তে দেউরিতে পদচারনা করিতেছি, অমনি টুং শব্দযোগে হিনার মুখমণ্ডলের গোলাকৃতি বিম্ব দূরভাষ যন্ত্রের স্ফটিক যবনিকাপাতে প্রস্ফুটিত হইল।  অতঃপর সটান বার্তাবহ চালনতন্ত্র ক্রিং ক্রিং স্বনে নিনাদিত হইতে লাগিল, হরিৎ বর্ণের বোতাম উর্ধ্বে উন্মুলিত করিয়া 'হ্যালো' কহিবার পূর্বেই অপরপ্রান্ত হইতে রোদনধ্বনি সহযোগে তর্জন গর্জন আসিতে লাগিল। আহা কী সুমধুর সুরধ্বনি যেন প্রতিটি বাক্য হইতে পুষ্পরস নিঃসৃত হইতেছে, আমি নিশ্চুপই রহিলাম। ভাবিলাম ইতিপুর্বে তো তাহার সহিত কোন প্রকারেরই বাক্যালাপের অবকাশ হয়নাই, সুতরাং যদি দুএকটি প্রশস্তিসুচক কিম্বা সান্ত্বনাদায়ক ভাষণ প্রদানও করি ধরা খাইবার সম্ভাবনা শূন্য। কহিলাম,

-      আহা এতো উতলা হইবার কী ঘটিয়াছে?

-      হইবনা উতলা! একজন নারীর বেদনা তোমরা পুরুষজাতি কেমনে বিদিত হইবে! নির্মম, পাষাণহৃদয়, বর্বরোচিত...

-      কটূভাষ্যে পীড়া নাই, কিন্তু পুরুষের প্রতি এই ক্ষোভের কারণ কী আমি একাই! নাকি আমি এই গণনার একটি সংখ্যা মাত্র

-      তোমাদের সকলেই নিষ্ঠুর, নির্বিবেক। কেউ কেউ তো পাশবিক স্বত্তাধারী মাংসাশী প্রজাতির...

-      আমি কী আপনার সহিত কোন প্রকারের অশালীন আচরণ করিয়াছি এই ক্ষণকালের আলাপে?

-      তা হয়ত করোনি ঠিকিই, কিন্তু প্রেম নিবেদন করিতেই কুঞ্চিত কেন্নোর ন্যায় সঙ্কুচিত হইয়া আপনার চর্তুপার্শ্বে আবর্তিত হইয়া গিয়াছিলে

-      আহা তা কেন, আসলে এখনও তো আমাদিগের মধ্যে সাক্ষাৎই হয়নাই। না দেখিয়াই...

-      থাক থাক, আর বচনবাজি করিয়া লাভ নাই। কেবলমাত্র সোহাগ অভিষঙ্গে আহ্বান করিলে তো শ্ব'যূথ নাড়াইতে নাড়াইতে আবির্ভুত হইতে

 ইহার পর আর কথোপকথন চালাইয়া যাওয়া মুর্খের কর্ম, স্বভাবতই দূরভাষের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিলাম। পরদিন প্রভাতে হিনার তরফে উপন্যাসের ন্যায় লম্বা বার্তা আসিল, "আমি ক্ষমাপ্রার্থী, তোমার সনে ওইরূপ রূঢ় আচরণ অনভিপ্রেত ছিল। আসলে পুরুষ জাতির উপরে আমার বিরাগভাজনের ইতিহাস বেশ পুরাতন। ঈশ্বর প্রাপ্ত সৌন্দর্যের অপরাধে কিশোরীবেলা কাটিতে না কাটিতেই, পিতৃদেব আমার পরিণয় করাইয়া দিলেন বয়সে দ্বিগুণেরও অধিক এক সরকারী চাকুরের সহিত, যিনি তাহার পিতার একমাত্র পুত্র। অতঃপর আমার বয়সজনিত চপলতাতে, স্বভাবগম্ভীর স্বামী রাজনের ক্রোধাগ্নিতে কুপিত হইলাম। শারীরিক মিলন ছিল আমার জন্য অভিশাপ স্বরূপ, তাহা সত্বেও সন্তানাদির লোভে কয়েক বৎসর সেই নির্যাতন সইয়া লয়েছিলাম। অতঃপর আমাকে বাঁজা মহিলা প্রতিপন্ন করিয়া দাগাইয়া দিলে, আমি চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্মরণাপন্ন হই, এবং প্রমাণিত হয় স্বামী ঠাকুর নিজেই নির্বিজ পুরুষ।

কিন্তু লোকসমাজে পৌরুষত্বের উপরে কালিমা লিপ্ত হইতে দেওয়া যায়না, সুতরাং শ্বশুর-শাশুড়ি ও তাহার জ্ঞাতিগোষ্ঠী দল সমবেতভাবে মিলিয়া আমাকে, হরেকরকমের পরীক্ষানিরীক্ষার জীবন্ত গবেষণাগার বানাইয়া তুলিল। তাহারা স্বীকারই করিতনা যে তাহাদের পুত্রের কোনো প্রকারের যৌনত্রুটি থাকিতে পারে, সুতরাং নিত্যুনতুন গাছগাছড়া, লতাপাতা, ফলমূল, হাকিমি কবিরাজী পথ্যাচার চলিতে লাগিল। শিন্নি, বাতাসা, ধাগা, ধুলফুল সহ সাপ-ব্যাং-গিরগিটির ঠ্যাং খাইনাই এমন অখাদ্য কুখাদ্য ইহজগতেই সম্ভবত অবশিষ্ট নাই। স্বাভাবিকভাবে সকল ক্রিয়াদি নিষ্ফলা হইলে, স্বামী প্রবাসে থাকিবার সুযোগে প্রথমে সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে রাখিয়া আসিত, যাহাদের অনেকেই আমাকে সংজ্ঞাহীন করিয়া সতীত্ব বিনাশ করিত সমস্ত রাত্রি যাবত। এমনকি শ্বশুর মহাশয়ের দূরসম্পর্কের কিছু আত্মীয় পুরুষও আমার কক্ষে আসিয়া আমাকে বলপূর্বক বলাৎকার করিয়াছিল। কিন্তু প্রতিবারই আমি গর্ভনিরোধক বাটিকা সেবন করিয়া জারজের জন্মদান হইতে নিজেকে রক্ষা করিয়াছি"।

 গোটাটা পড়িয়া অন্তর অত্যন্ত ব্যাথাতুর হইয়া উঠিল, কী বলিয়া সান্ত্বনা প্রদান করিব তাহা খুঁজিয়া পাইলামনা। সম্যক অনুধাবন করিলাম তাহাদের স্বগৃহ ত্যাজিবার হেতু। যথারীতি তাহার বার্তাপেটিকায় নীলবর্নের অধিকৃত মোহর প্রত্যায়িত হইতেই আমার প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই সে পুনরায় লিখিল, "আগামীকাল শ্বশুর মহাশয় তাহার এক সাধক বান্ধবের সহিত এখানে আসিবেন, সংক্রান্তির পূন্যলগ্নে আমাকে নিরীক্ষণের তরে। এহার কারনে আমি যথেষ্ট পরিমাণে শঙ্কিত রহিয়াছি। ইহাদের প্রতিহত করিবার পন্থা জানা আছে কি? কোনো প্রকারের সহযোগিতা কী সম্ভব তোমার পক্ষ হইতে! আচ্ছা তোমার সাকিন কোথায়"!

 শেষ প্রশ্নের উত্তর আমার ওষ্ঠে বাস করে, কহিলাম- "আমার সাকিন তো আপনার হৃদয়ে"। সে বিগলিত হইয়া জবাব দিল, "তুমিও কী তাহা হইলে শেষমেশ প্রণয়জালে আবদ্ধ হইয়াই গেলে"? পরবর্তীতে হরেকরকমের গল্পগাছাতে আমার মাতিয়া উঠিলেও, হিনার শ্বশুরকে জব্দ করিবার ফন্দিফিকির খুঁজিতে লাগিলাম মনেমনে। 

(৪)

 দ্বিপ্রহরে ভোজনে বসিয়া পরিচারিকার মুখে শুনিলাম, পল্লীতে সদ্য ফিরত পরিযায়ী যুবকের দল চোপরদিবস গৃহবন্দি থাকিবার আদেশ অমান্য করিয়া সমগ্র উপকন্ঠে ঘুরিয়া পল্লিবাসীর প্রাণ অতিষ্ট করিয়া দিতাছে। চকিতেই বুদ্ধি খেলিয়া গেল, শুধাইলাম- “পিসি, উহাদের মাঝে যে সর্দার গোছের তাহার নাম কহিতে পারো”? তিনি কহিলেন, “হারু, বুড়ো, কেষ্টা প্রমুখ, সকলেই ওই ছারিগঙ্গার গাবায় ঘাঁটি গাঁড়িয়া থাকে বৈকালে”। সূর্য পশ্চিমে কিছুটা ঢলিতেই মৎস ধরিবার ছিপখানি লইয়া রওনা দিলাম গঙ্গার উদ্দেশ্যে, গ্রামের অভ্যন্তরে আরক্ষাবাহিনীর তরফে কেউ প্রহরাতে থাকেনা সুতরাং শঙ্কা বিহীন যাত্রায় মেজাজ বেশ ফুরফুরেই রহিল।

 যথারীতি মুখে ধুলানিরোধক বদনবর্ম ও মস্তকাভরন শোভিত আমাকে কেহই ঠাহর করিতে পারিলনা, এই হারু কিম্বা কেষ্টাদের পিতাদের সহিত আমার পরিচয় থাকিলেও, উপস্থিত এই প্রজন্মের সকলেরই বয়স অনুর্ধ্ব বিশবর্ষীয় যাহারা বিগত একদশক ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কর্মে রত। সুতরাং তাহাদের পিতামাতা ও নিকটাত্মীয় ভিন্ন অপর কাহারো পক্ষেই উহাদিগকে সনাক্ত করা অতি দূরহ বিষয়। এই সুত্র তাহাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য আমাদের নিমিত্ত, যাহারা কালেভদ্রে মহল্লাতে প্রবেশ করে।

 ভণিতা পর্ব মিটিতে, তাহাদের সম্মুখে কর্মের বিষয়টি উত্থাপন করিতেই তুমুল উৎসাহ লক্ষ্য করা যাইল, যেন চড়ক সংক্রান্তির মেলা ও সেই সংক্রান্ত আমোদ বিনষ্ট হইবার আক্ষেপ মেটাইবার এক দারুণ সৌকর্য আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। অর্থবিষয়ক পারিশ্রমকের প্রশ্নই উঠলনা; বরং সস্তার কুক্কুটমাসের গুরুপাকের পরিতোষিকেই তাহারা প্রানবন্ততার সহিত সকল কিছু বুঝিয়া লইল। অনুমান করিলাম তাহারা দলে প্রায় এক ডজন সদ্য যুবক, ধোলাই যে উত্তম প্রকারেই হবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। শুধু তাইই নয়, এক্ষেত্রে ওই ছেলের দলের নিকটে আমি অপরিচিত আগন্তুক, পরিচয় ফাঁস হইবার কোনো শঙ্কা নাই।

 এই দিনগত রাত্রিকালে হিনা সেইভাবে প্রকট হইলনা তরঙ্গমাধ্যমে, নৈশভোজের পর তাহার তরফে একটি বৈদ্যুতিন ডাক পাইলাম। সাথে সাথেই একটি সন্দেশ আসিল বার্তাপ্রেরক মাধ্যমে, “রাত্রি তৃতীয় প্রহরের সূচনা লগ্নে এই ডাক উন্মোচন করিবে, তাহার আগে নহে”। ভাবিলাম, কিইবা আর নতুন লিখিবে আপন বেদনাগাথা ছাড়া, তাই আমি সেই আব্দার মানিয়া ঠিক রাত্রি ১২টা বাজিতেই ডাকবাক্স খুলিয়া দেখিলাম তাহা শূন্য, সাথে সাথে তাহাকে তার পাঠাইলাম। অবগত করাইলাম যে তাহার প্রেরিত ডাকে কিছুই আসে নাই। সে আশ্চর্য জনক ভাবে প্রত্যুত্তর দিল, “আমি অত্যন্ত খুশি। আমার মান রাখিয়াছো, আমি পরখ করিতে চাইছিলাম যে তুমি আমার ভাবনাকে কতটা মান্যতা দাও। এছাড়া তুমি ভাবিতেই পারো- ডাকখানি আমার হৃদয়ের অনুরূপ, শূন্যতায় পরিপূর্ণ, তুমি তোমার অনুরাগ দিয়া শূন্যস্থান পূরণ করিয়া দাও”।

 উদ্বেগ হইল, পরকীয়ার এই ক্রীড়নক না সাজায় পর্যবাসিত হয়। কারন দুজনেই একে অনের নিকট পরিচয় গোপন করিয়া প্রোমোদলীলাতে রত হইয়াছি, এক্ষনে তাহা পরিপক্ক হইয়াছে আপন নিয়মে। কিন্তু ভাবগতিক যাহা ঠাহর হয় তাহাতে অধিক পক্কতার ফলে পচিয়া দুষিত না হইবা পর্যন্ত কেহই ক্ষান্ত দিবনা। শীঘ্রই শুইয়া পরিলাম সেই রাত্রে, তবুও অবচেতন মনে রাত্রি চতুর্থ প্রহরের প্রাক্কালে পুনরায় সেই কাব্যগাথা শুনিতে পাইলাম।

 

(৫)

 আগামীকাল পয়লা বৈশাখ, প্রশাসনের তরফে আজ কুলুপাধিনতা কঠোরতা অনেকটাই শিথিল, আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করিবেন। নববর্ষ, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাৎসরিক বকেয়া পরিশোধের মুখ্য সময়। যদিও পথে গনপরিবহণ ব্যবস্থার সামান্যতম উন্নতি ঘটে নাই, তথাপি যন্ত্রচালিত দ্বিচক্রয়ান, ত্রিচক্রয়ান, পণ্যবাহী শকট, তোপশ্রেনী চালিত “নিরীহ-শকট” ইত্যাদিতেই অধিবাসীবৃন্দ পরিবহণের তরে স্থানান্ততরিত হইতেছে। আজই সেই সংক্রান্তির রাত্রি, বিশেষ উপাচারে হিনার জন্য সন্তানসাধন উপাসনা করিবেন কোন এক তান্ত্রিক আত্মীয়। তিনি সন্ধ্যায় আসিবেন শ্বশুর শ্বাশুরি সনে। কোন বাহনে তাহারা আসিবে সেটা হিনার নিকট হইতে জানিয়া লইয়াই যায়, কিন্তু সন্ধ্যায় যদি কোনো প্রকারের গোলযোগ হয় সেক্ষেত্রে আমি সন্দেহের তালিকাতে রহিয়া যাইব, হাজার হউক হিনার স্বামী দারোগা, কোটালের চাকুরি করে; সাবধানের মার নাই।

 সমগ্র দিবস ভীষণ উৎকণ্ঠার সহিত কাটিল সন্ধ্যার প্রত্যাশায়। বৈকাল হইতেই গৃহঅভ্যন্তর হইতেই খেয়াল করিলাম রাস্তায় সেই কুক্কুটখোরেদের জমায়েত হইয়াছে। সুতরাং, শ্বশুর ও তাহার স্যাঙাত ঠ্যাঙাইয়া, হিনাকে চমকপ্রদভাবে বিস্মিত করিয়া উপহার প্রদান করিব; এবং অভিলাই এইরূপ যে- নববর্ষের দিনই আমি আমার পরিচয় উন্মোচন করিব। তাহার প্রাথমিক চমক ভাঙিলে পরে একটা সুস্থ স্থিতিশীল সম্পর্কের পানে বিষয়টাকে অভিমুখ প্রদান করিব এমনই মনোবাঞ্ছা।

 আঁধার সামান্য গাঢ় হইতেই আমি গগনচন্দ্রাতপে উপস্থিত হইলাম, প্রকৌশলী হিসাবে গোটা বিষয়টির সাক্ষী স্বরূপ বিদ্যমান থাকিতে। সামান্য পরেই একটা কোলাহল ও পরে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার শব্দ শুনিলাম, বাজারের বিবিধ বিপণি, গুদাম, ভাণ্ডারগুলি বন্ধ থাকিবার কারনে আলোর প্রকাশ ক্ষীন, ফলত ঘটনাক্রমটি চাক্ষুষ করিতে সক্ষম হইলামনা। দ্বিতলে অবতরণ করিয়া কক্ষের বাতি অক্রিয় করিয়া হিনার তারের প্রতীক্ষাতে প্রীতাক্ষাতে করিতে লাগিলাম।

 কিয়ৎক্ষণ পর, রাজা ও বাবলু নাম্নী দুজন প্রতিবেশী যুবক আসিয়া আমার নাম লইয়া অত্যন্ত চঞ্চল ও সশঙ্কভাবে হাঁকডাক পাড়িতে লাগিল। মাতৃদেবী নিলম্বিত দেউড়িতে যাইয়া কিজানি কী শুনিয়া উর্ধ্বশ্বাসে গৃহ হইতে বাহির হইয়া গেলেন, তাঁকে অনুসরণ করিবার আদেশ করিতে করিতে। সদর হইতে আনুমানিক একশত গজ উত্তরে, অন্ধকারের ভিতরে একটা ছোট্ট জটলা। দুইজন রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটাইয়া রহিয়াছে, ভিড়ের গুঞ্জন হইতে শুনিলাম পথিক দুইজন সশস্ত্র দস্যু দলের সম্মুখে পড়িয়াছিল। চকিতেই জনসমাগম হইতে সেই দস্যুদল পলায়ন করিয়াছে, কিন্তু যাইতে যাইতে দুজনকেই বেধড়ক প্রহার করিয়াছে। একজন জল আনিল, অন্যজন বৈদ্যুতিন মশাল প্রজ্বলিত করিতেই চক্ষু চড়কগাছে চড়িয়া পরবার উপক্রম হইল। দুইজনের একজন আমার পিতাশ্রী, নাতনীদের সহিত নববর্ষ উদযাপনের জন্য যিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন। অন্যজন পঞ্চাশোর্ধ নিরীহ প্রজাতির এক মানুষ, দেখিলাম উপস্থিত কাহারোই পরিচিত নন তিনি। তাহার মুখমণ্ডলে ডাণ্ডাঘাত হইয়াছে, প্রায় সংজ্ঞাহীন।

 ছাউনি হইতে খনিজতৈল চালিত শকট বাহির করিয়া, সকলে মিলিয়া ধরাধরি করিয়া ওনাদের দুজনকে চড়াইয়া দিলেন। দুইজন সঙ্গী সহযোগে অনতিদূরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লইয়া যাইলাম। চিকিৎসক মহোদয় অতীব সজ্জন ব্যাক্তি, করোনা আবহের মাঝেও তিনি কর্তব্য পালনে অবিচল। তিনিই কহিলেন, “দুজনেই সম্পূর্ণ বিপোন্মুক্ত, শারীরিক আঘাত সামান্যই তবে মানসিক ভাবে অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হইয়া রহিয়াছেন। কয়েকদিনের বিশ্রাম প্রয়োজন, এই করালিভাব হইতে উদ্ধারের হেতু। দ্বিতীয় ভদ্রলোকের জ্ঞান ফিরিয়াছে, তাহার জেবস্থিত দূরভাষ যন্ত্র বাজিয়াই চলিতেছিল। ভদ্রলোকের অনুমতি লইয়া যন্ত্রটিকে কানে লাগাইলাম, কেহ একজন মহিলা কহিতেছেন- “কোথায় রহিয়াছো, বাবা আজিকে আসিতে পারেন নাই যানবাহনের সঙ্কটে”। আমি থরথর করিয়া ভিতর হইতে কয়েকবার কম্প-দিয়া যন্ত্রটি মাতৃদেবীর হাতে সমর্পন করিলাম, তিনিই অবশিষ্ট বার্তালাপটি সারিলেন। আমি ওই কণ্ঠস্বরের সহিত পূর্বপরিচিত।

 আরো দেড় ঘন্টাকাল পর অবশেষে সকলে গৃহে উপস্থিত হইলাম, বাপিবাবু অনেকটাই চাঙ্গা হইয়া উঠিয়াছেন। আমার পিতাশ্রী অবশ্য উনার আগেই সুস্থ হইয়া, চা-পান সহযোগে স্বাস্থ্যালয়েই প্রশাসনের কিছু বাক্তিবর্গের সহিত- লকডাউনের প্রভাবে দস্যুবৃত্তি কীভাবে ও কতটা সমাজের বুকে ছড়াইয়া যাইবে সেই বিষয়ে জ্ঞানদান করিতে ব্যাস্ত ছিলেন।

 বাপিবাবুকে আপন স্কন্ধের ভারে লইয়া তাহার কক্ষ অবধি পৌঁছাইয়া দিলাম, তাহার স্ত্রী কপাট খুলিয়া উচ্চস্বরে রোদন শুরু করিয়া দিলেন। বাপীবাবুর স্ত্রী প্রকৃতঅর্থে তাহার কন্যাসমা, বয়সের দিক হইতে। আমার মাতৃদেবী ও খুড়িমাদ্বয় মিলিয়া তাহাকে শান্ত করিল। আমি ফিরিয়া আসিবার জন্য উঠিতেই বাপীবাবু চা-পানের নিমন্ত্রণ দিয়া বসিলেন। ওনার স্ত্রী পাকশালায় যাইতেই আমি স্বচ্ছন্দ পিরিয়া পাইলাম, এদিকে বার্তা বাক্সে মুহুর্মুহ শিহরন হইতে লাগিল। তার চেয়েও বড় শিহরণ বাপিবাবুর প্রত্যয়ী বাক্যবাণে নিবদ্ধ ছিল, “একটু সুস্থ হইয়া নিই, তাহারপর দেখিব কোন বাপের ব্যাটা আমার লাঠিপেটা করে”।

 অতঃপর পড়শী হিসাবে তাহার দূরভাষ যন্ত্রের সংখ্যা সমষ্টি প্রত্যায়িত করিবার উদ্দেশ্যে, অলত্তয়া আহ্বান করিতেই বিগত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ রাত্রি চতুর্থ প্রহরের সেই মহিলা কন্ঠের কাব্যাবৃত্তি বাজিয়া উঠিল, বুঝিলাম কোনও এক নির্দিষ্ট কারনে ওই নির্দিষ্ট সময়ে রাত্রির চতুর্থ প্রহরে- স্ত্রী তাহার স্বামীকে দূরভাষে আহ্বান বসত যন্ত্রটিকে উচ্চনাদে ‘অভ্যাগত রাগিণী’ বাজাইত।

 চায়ে চুমুক মারিয়া উপলব্ধি করিলাম, আমার পরকীয়ার সলিলসমাধি বিষয়ে সামান্যটুকুও সন্দেহের অবকাশ নাই। শুধু আক্ষেপ রহিয়া গেল, দৃশ্যৎ বৃদ্ধ বাপি-পুলিসের স্ত্রীরত্নটি অপ্সরার ন্যায় সুন্দরী, তথাপি বিষাদের বসনে ঢাকা। নকল পরিচয়বহ আননকিতাবের নকল পরিলেখাবৃত পরিচিতি অচিরেই বিনষ্ট হইবে, ফুরাইবে বিবাহত্তর প্রণয়ের এই খতিয়ান। আর যাহাই হউক, কোতোয়ালীতে মুগুরপেটা হজম করিবার চেয়ে প্রণয়াশক্তির ভূত পরিত্যাগ করা অধিকতর সহজ।

 শেষমেশ পুনরায় সেই অঙ্কশীর্ষক পরিগণক যন্ত্রকে সঙ্গী করিয়া ব্যার্থ কাহিনীকার হইবার অপচেষ্টা ব্যাতিরেকে কিইবা অস্তিমান রহিল জীবনে!


সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

ভক্তদের বয়কট বিপ্লব



ভক্তরা চীনের টুনিলাইট বয়কটের ডাক দিয়ে বিপ্লব শুরু করেছিল, এখন নাগপুরের শেখানো বুলি দিয়ে চীনের বিপক্ষে আওয়াজ তুলে দেশপ্রেম জাহির করছে। মজা হল যতক্ষননা কোনো একটা যুৎসই অপোনেন্ট না পাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ভক্তদের দেশপ্রেম জাগ্রতই হয়না। এখন তাই শুধু পাকিস্থানে তাদের রাগমোচন হচ্ছেনা, তাই চীনই সই। কিন্তু চীন তো আর কাংলা দেশ নয় পাকিস্তানের মত, ভক্তদের বাপেরা চীনের দুপায়ের নিচে জিভ বের করে বসে আছে- যদি দু ফোঁটা ঝরে তো সাময়িক তেষ্টা মেটে।

স্বাভাবিকভাবেই, ভক্তদের বাপ গুলো ভক্তদের দুবেলা পায়ু মর্দন করে চলে যাচ্ছে, একদিকে নাগপুর বানরসেনাদের শেখাচ্ছে "চাইনিস করোনা গো ব্যাক" কিম্বা "রাষ্ট্রপুঞ্জে চীনের বিরুদ্ধে গন মামলা হয়েছে" মত খবর; যেগুলো দেদার বিকোচ্চে ভায়া হোয়াটসঅ্যাপ স্কলার।
দীপক পারেখ তেমনই একজন, উচ্চকোটির ভক্তদের অন্যতম নয়নমনি ও নিজেও ভক্তদের অন্যতম শিরোমনিও বটে। তৃণমূল স্তরের ভক্তরা অবশ্য এনার নাম জানেনা, এ নাম জানতে গেলে যে পরিমান শিক্ষাদিক্ষা প্রয়োজন তা ভক্তদের থাকেনা আর থাকলে সে ভক্ত হতনা।
এখন সেই পারেখ সাহেবে HDFC ফাইনান্সিং কোম্পানির কর্ণধার, যারা HDFC ব্যাঙ্কের অন্যতম পরিচালক। এহেন HDFC তাদের ১ কোটি ৭৩ লক্ষ শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে চীনের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ককে। এই দীপক পারেখ সমগ্র দেশব্যাপী ও দেশের বাইরেও মোদীজির সংস্কার ও আচ্ছেদিনের বিজ্ঞাপনের অন্যতম ফেরিওয়ালা ছিল। এখন চীনের "দো বুন্দ জিন্দেগীকি"কে চোনামৃতের মত পান করছে।
চীন নিঃসন্দেহে পুঁজিবাদের নতুন প্রতীক ও বিশ্বের কাছে নতুন থ্রেট। যেখানে গনতন্ত্র শব্দের অস্তিত্বই নেই, সকলকিছুই চরম গোপনীয়তায় ঢাকা। তারপরও চীন? আসলে মোদীজি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায় শ্লোগানে ভর দিয়ে দেশজ কোম্পানি গুলো চীনের কাছে বিকোচ্ছে, টুনি লাইটে ভর করে ভক্তদের মনে দেশপ্রেমের জোয়ার বইয়ে।
দেশের অখন্ডতার জন্য চীনের এই অগ্রাশন এক নিদারুণ চ্যালেঞ্জ এই দুর্বল আর্থিক সময়ে। ভক্তদের কিছু যায় আসেনা, কারন অন্ধের কিবা দিন কিবা রাত।
কিন্তু অবশিষ্ট ৬৯% মানুষের ভবিষ্যত কি?

কে দেবে উত্তর?

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২০

বিদঘুটে খেয়াল


(১)

করোনা আবহে গৃহবন্দীর অস্বস্তি যখন কিছুটা সয়ে যাব যাব করছে, ঠিক তখনই ছাল ক্যালানো গরমটা আবির্ভুত হল এলাকাতে। কিছুদিন আগেই একটা বিধ্বংসী অগ্নিকান্ডে বাড়ির ইলেকট্রিক ওয়্যারিং সিস্টেমের অনেকটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছেতাই পরিস্থিতি করে দিয়েছিল। কিছু লাইট ফ্যান ছাড়া অধিকাংশ ইলেকট্রনিক্স গেজেটই বর্তমানে কোমায়, তার মাঝে এসি থেকে ইনভার্টার সবই আছে। লকডাউনের বাজারে এই গাঁ-ঘরে মিস্ত্রী পাওয়া দুষ্কর, থাকলেও তাকে ঘরে ঢুকতে দিতে মন সায় দেয়না, কে জানে সেই লোক করোনার বাহক কিনা। অগত্যা, ‘জান হ্যায় তো জাহান (নুসরত নয়) হ্যায়’, গরমকে এঞ্জয় করা ছাড়া উপায় থাকেনা। কারেন্ট চলে যাওয়া মানেই গরমের তাণ্ডবে মশাদের চড়ুইভাতির জন্য কুলকুল করে ঘামা কুঁদো শরীরটাকে আহুতি দেওয়া

গতকাল রাত্রেও তার ব্যাতিক্রম হলনা, আকাশে মেঘের সঞ্চার হয়ে পরিবেশ গুমোট হতেই কারেন্ট চলে গেল। কিছুক্ষণ ছাদে ঘোরাঘুরি করে অবশেষে নিচের তলার ঘরে সিফট হলাম বালবাচ্চা সহ। বালবাচ্চা মশারির মাঝে খানিক বিদ্রোহ করে ঘুমিয়ে যেতেই তাদের মা ও আমার মা দুজনেই দ্রুত তাদের অনুসারী হল। আমার এদিকে ঘুমই আসেনা, বারান্দায় এসে খানিক শুলাম- ওমা, সেটা শুধু মশাদেরই ‘ধারাবি’ ছিল তা নয়, বরং সামান্য দূরের উঠোনে হরেক কীটপতঙ্গ ও রাতচড়া পাখিদের রেওয়াজ করার স্টুডিও ছিল সেটি। সুতরাং অবৈধ অনুপ্রেবেশের দায় থেকে মুক্তি নিয়ে অগত্যা দোতলার দক্ষিণের ঘরে এসেই ডেরা নিলাম, মোবাইলেও চার্জ নেই যে ফেসবুক টুইটারে গুঁতাবো

জুলুজুলু চোখে জানালার গ্রিলের ওপাড়ে, পেয়ারা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে- নিম গাছের কল্পিত পেত্নিকে খোঁজার চেষ্টা করতে লাগলাম, তারপরই একটা ন্যাড়া শিমুল গাছ কঙ্কালের মত দাঁড়িয়ে। সামনের ছোট্ট চত্বরটাকে ঘিরে থাকা কিছু হাতির শুঁড়, চটকাঠি, শেয়ালকাঁটার ঝোপের মাঝে গলা উঁচিয়ে থাকা শ্যাওড়া, জিবলি, বাঁদরলাঠি, ফলসা, নারকেল, কাঁঠালগাছ ইত্যাদির মত জাঁদরেল পার্শ্ব চরিত্রদের উপস্থিতি- পরিবেশের হন্টেড লুকটাকে একটা আদর্শ টেক্সচার দান করেছে। কোনও কিছুতেই কিছু খুঁজে পেলামনা, অথচ মাঝরাত্রের আদুরে চাঁদের আলো, সামান্য দূরে কুকুরদের একটা স্ট্রীট কর্ণার, ব্যাঙেদের সমবেত স্লোগান, ঝিঁঝিঁদের গলা সাধা, ডাহুকের ছমছমানি ডাক, কয়েকটি পেঁচার পেট্রোল ডিউটির চোটে রাতকানা পায়রার ঝাঁকের কলরব ইতাদির উপস্থিতি ব্যাকগ্রাউন্ডকে একদম সিনেমাটিক সিল্যুয়েড মোডে রেখেছিল ভয় পাওয়ানোর জন্য

ভয় কিন্তু অধরায় রয়ে গেল। আসলে সেই যবে থেকে বিয়ে করেছি, যা কিছু প্রেতজনিত ক্রীড়াকলাপ সবই দাম্পত্যের মাঝে ঘটতে দেখেছি একতরফা ভাবে। আমার চোখ স্ত্রীজাতির দানবীয় ঘটনার সাক্ষী বলেই হয়ত, ফচকে ভূত-পেত্নীর মত কোনো তুচ্ছ অতিপ্রাকৃত বিষয় ধরা দেয়না চর্মচক্ষে। হয়ত সেই অশরীরীর দল ভাবে, “এই বেচারার কাঁধে এমনিতেই আমাদের গুরুমার বাস- অগত্যা কেন মিছিমিছি সেখানে গিয়ে নিজেদের বেইজ্জত করব”! নিশ্চই বুঝতে পারছেন, সাধু-ফকিরেরা কেন প্রেতাত্মাদের দেখা পায় বা তাদের বশীকরণ করতে পারে। কারন তাদের ঘরে বৌ থাকেনা বলেই ভূতপ্রেত আসতে সাহস পায়

তো সে যাই হোক, চোখটা বুজে যেই বালিশে মাথা রেখেছি- ওমা দেখি কে যেন পায়ের দিকটাতে কাঁদছে। ভূত দেখার যে আনন্দটা ছিল সেটা ছোট্ট করে আতঙ্কে পরিণত হল, কয়েক মুহুর্তের সেই আতঙ্ক বিলাস সামলে কানটা খাড়া করে শুনতেই বুঝলাম, মাল সে যেই হোক- আছে কিন্তু ঘরের মধ্যেই। জেগে উঠে দেখার চেয়ে ঘুমের ভান করে পরে রইলাম, কার্যক্রম বোঝার জন্য। কান খাড়া করে শুনলাম- মিনমিনে আওয়াজ কিন্তু একজন নয়, অনেকের আওয়াজ

- কাঁদিসনা ভাই, সবুর কর আরো কিছুদিন। নিশ্চই উপরওয়ালা আমাদের উপরে সদয় হবেন

- সমানে মাথার উপরে টকাটক এমন বারি কাঁহাতক সহ্য হয়রে বোন!

- কিইবা করার আছে বল, আমিও তো কোমরের যন্ত্রণাতে মাজা সোজা করতে পারছিনা মোটেই

- হুম পিঠে হাত রেখেই তো সারাক্ষণ কুট কুট করে ভাঙা জাইগাটাতে টিপে যাচ্ছে হতচ্ছাড়াটা

তৃতীয় একজন কেউ ওমনি বলে উঠল,

- তবু তো তোদের টিপেটাপেই ছেড়ে দেয়, আর আমাকে তো জ্বালিয়ে রেখে দেয় দুপুর থেকে ভোর পর্যন্ত। এখান দিয়ে সেখান দিয়ে গোঁজাগুঁজি চলে। আমি তো গরম হয়ে উঠি তীব্রতাতে, তবুও কী আমার নিস্তার মেলে!

একটা চোখের কোনা একটু খানি খুলে যা দেখলাম তাতে চক্ষু চড়কগাছ

ল্যাপটপটা ভেন্টিলেশনে থাকা রোগীর মত ব্যাথাতুর আওয়াজে কথা বলছে কিবোর্ড আর মাউসের সাথে। কিবোর্ডের সুইচ গুলো কোন নিয়মে ভাই হয়েছে সেটা যেমন বুঝতে পারলামনা, তেমনি মাউসকে কেন বোন বলে সম্বোধন করছে সেটাও অজানা; আজব কেলেঙ্কারিয়াস ব্যাপারস্যাপার

হঠাৎ ডাইনিং থেকে একটা দেঁতো হাসির আওয়াজ এলো, অন্ধকারের মধ্যেই ঘাড়টা একটু তেরছাভাবে তাকাতেই পিলে তড়াক তড়াক করে লাফাতে লাফাতে মুখ দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হল। দেখি ফ্রিজটা হাতপা ছুড়ে গড়াগড়ি দিয়ে হাসছে, সাথে অনেক কিছুই বলছে সবটা বুঝতে পারলামনা। এটুকু বুঝলাম যে সে ল্যাপটপকে নিয়েই তামাশা করছে। ল্যাপটপ ও তার সম্প্রদায়েরা কখনও হয়ত ফ্রিজের ওই সারাক্ষণ চালু থাকা বিষয়ে কখনও খোঁটা দিয়েছিল, এখন সেটাই উশুল করছে ফ্রিজ ব্যাটা। আমি যতটা সন্তর্পনে দেখতে গিয়েছিলাম, তার চেয়েও বেশি সাবধানতা অবলম্বন করে আবার স্বস্থানে ফিরে এসে, কিবোর্ডের সুইচগুলোর বেদনা গাথা শুনতে লাগলাম

 

(২)

একটু ঢুলুনি এসেছে কী আসেনি, শুনলাম মাথার দিক থেকে বাঁশির মত পিঁ পিঁ আওয়াজে নাকডাকার শব্দ ভেসে আসছে। নিজের নাকে হাত দিয়ে দেখলাম, উঁহু সেখানে কোনো গোলোযোগ নেই। ভাবতে লাগলাম, হচ্ছেটা কী আজ আমার সাথে! কিবোর্ডের মাথা যন্ত্রণা, ফ্রিজের হাত পা ছুড়ে নাচ, মোটেই গতিক ভাল ঠেকছেনা। বৌকে হাঁক দিতে যাব, ওমনি মাথার নিচে থেকে বালিশের আওয়াজ এলো-

- মরণ দশা, মিনসে নাক ডেকে ঘুমানোর ছিরি দেখো। বলি ও ঠাকুরপো, তোমার নাক ডাকাটা একটু কম করো বাপু, সারাদিন কনুয়েই গুঁতো খেয়ে খেয়ে আমার সারা পাঁজরে পাকা ফোঁড়ার মত ব্যাথা তো ছিলই, এখন ওই ন্যাড়া মাথার খোঁচা চুলের খোঁচায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও বাপু

পাশবালিশটা খৈনি মুখে রাখা আওয়াজে বলে উঠল, “ও ছোট, ওকে জাগাসনা ভাই। ও জেগে গেলেই কর্তা আবার আমার উপরে তোকে ফেলে, মাথা চড়িয়ে দেবে। বড্ড শ্বাসকষ্ট হয় রে আজকাল, ওকে শান্তিতে ঘুমোতে দে

বিছানাটার ছাদরটা দেখি ফ্যাচ ফ্যাচ করে হেঁচে নিয়ে, সর্দি ধরা গলায় সুর করে বলল, “টয়লেটে যাওয়া ছাড়া আমার কোনো রক্ষা আছে! এখানেই খাচ্ছে, হাত মুছছে, নাকের শিকনি থেকে চোখে পিঁচুটি, কানের খোল, পাছার ফুসকুড়ির রস সব পুঁছছে আমার উপরে”। ভীষণ রকমের চোটে গিয়ে গদিটা বলে উঠল, “ওলো চাদর মাগি- তোর তো তবু শিফটের ডিউটি, হপ্তায় দু’দিন চান করারও সুযোগ পাস, দড়িতে দোলনাতে হাওয়াও খেয়ে আসিস। আর আমরা! আমার কথা ভাব দেখিনি, সারাটা দিন আমার উপরে নেত্ত করছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে, খেলা করছে, লাইট বন্ধ করে অন্ধকারে শোয়ার নামে যা সব বিচ্ছিরি কাজকম্ম করে- ম্যা গো, ছিঃ ছিঃ ছিঃ, লজ্জায় তাকাতে পারিনা নিজের পানেই। এসব তো আমাকেই সইতে হচ্ছে”

এবারে একটা কফ বসা ধরা গলায়, গলাখাঁকারি দিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে খাটটা বলে উঠল, “আমি বুড়ো হয়ে গেছি বলে কি তোরা আমাকে হিসাবের মাঝেই আনছিসনা মনে হচ্ছে। কাঠের তৈরি খাট বলে কী আমি মানুষ নয়! আমার এই চার পায়ার উপরেই তো তোদের পৃথিবী। দীর্ঘদিন নড়াচড়া না করে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে বাতের ব্যাথায় বড় কাহিল, অনেকদিন ইউরিক এ্যাসিডের লেভেলটাও চেক করা হয়নি রে। তার উপরে ওই হাতির মতন শরীর নিয়ে ধম্বল মারা, আর যে সহ্য হয়না রে। আগে তো এমন জলহস্তী ছিলনা, হঠাৎ এমনতর কেন হল রে!

এদের আলাপচারিতার মাঝেই, ‘ওরে আমার কি হলো রে, এবারে আমাদের কি গতি হবে রে!’ বলে কারা যেন মাতন করছে। রাজস্থানে রুদালি নামের এক মহিলাদের দল আছে যারা দল বেঁধে এমন করে মড়াকান্না গেয়ে থাকে, পেশাদার বিলাপকারীর দল, কিন্তু আমার ঘরে আবার রুদালি কোত্থেকে এলো! ঘুরঘুট্টি অন্ধকারের মাঝে আমিও যেমন কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা আমাকেও কেউ দেখতে পাচ্ছেনা। ল্যাপটপ সম্প্রদায়ের খচরমচরের মধ্যেই আমি নিঃশব্দে উঠে গেলাম সেই রুদালির কান্না লক্ষ্য করে। কান খাড়া করে সামান্য অনুসন্ধানের পরেই উৎসস্থল খুঁজে পেলাম, আমার জামাকাপড়ের আলমারি থেকে আওয়াজ আসছে

খুব সন্তর্পনে দরজাটা ঈষৎ খুলতেই কে যেন হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠল, “We're on our way, way, way/We're on our way somehow”কথাটা বিশুদ্ধ সাহেবি উচ্চারণে, সাহেবি কেতায়, কতকটা যেন টনি গ্রেগের ধারাভাষ্য দেওয়ার মত লাগল। মনে মনে ভাবলাম, ইংরেজ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে কী এই আলমারিতেই কোনো গোরা ভুতের আরক রেখে গিয়েছিল নাকি! ভূত দেখার আতঙ্কে ও আনন্দে একটা লাফ দিতে যাব, ওমনি একটা ডেঁপো গোছের কেউ বিচ্ছিরি ভাবে বলে উঠল- “আরে ও কাক্কা, তোমাকে তো ওয়াড়া ঠিক কেউ না কেউ দখল করে গায়ে চড়াবেই। কখনও কাউকে দেখেছো ব্লেজার-কোট ফেলে দিতে! অতো ইঞ্জেরি না ফুটিয়ে আমাদের কথাটা একটু ভাবো বস, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত শতচ্ছিন্ন ঘরমোছা ন্যাতা হয়ে বাঁচা ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি হবে”!

মাঝ বয়সী কাকু টাইপের কেউ একজন বলে উঠল, “ওরে ও জাঙিয়া, তুই থামতে বাপু কত নিবি বলতো? অসভ্য স্থানে যাদের সাথে ঘরকন্না করিস, তাদের নাম নিয়ে কী ডাকাডাকি না করলেই নয়? ভদ্রসমাজে ওগুলোকে গালিগালাজ বলেরে হতভাগা, বলি মানুষ হবি কবে”! পাল্লাটা আরো একটু খুললাম, চোখ ততক্ষণে সয়ে গেছে অন্ধকারে। উদাস মুখে স্যান্ডো গেঞ্জিটা যেন নিজেই নিজেকে বলল, “আগে বগলের গন্ধে অতিষ্ট হয়ে, কিম্বা ডিও’র স্প্রের গন্ধে হেঁচে হেঁচে প্রাণ যেন; এখন বাকি জীবনটা রান্না ঘরের ন্যাতা হয়ে হাঁচতে থাকবো ফোঁড়নের গন্ধে। এই তো জীবন, টি-শার্টদা”

আরেকটা ফুলহাতা জামা যেটা গতবছর কে যেন গিফট দিয়েছিল, সে মঞ্চে ভাষণের মত বলে উঠল- “বন্ধুগণ, সুখ দুঃখ নিয়েই এই ক্ষণস্থায়ী পোশাকজীবন, তোমরা তবুও জানো তোমাদের ভবিষ্যৎ কোনদিকে। আমাদের কথা ভাবো একবার, কোথায় ওয়াসিং মেশিনে স্নান করতাম দামি সুগন্ধি ডিটার্জেন্ট দিয়ে, কত সুন্দর ইস্তিরি করে ভাঁজে ভাঁজে রাখা হত, হাওয়া খাওয়ানোর জন্য হ্যাঙ্গার ছিল। দামি পারফিউমের বিন্দু গুলোও তো আমার শরীরেই ছেটনো হত। এখন ভাবো, মালিকের বৌ নিশ্চই গরীবদের বস্ত্র দানের নামে আমাদের ইজ্জত লুন্ঠন করবে। সেখানে কোথায় ডিটার্জেন্ট, কোথায় ইস্ত্রি আর কিসের পারফিউম। মালটা যদি মাতাল হয় তাহলে তো কথায় নেই, আমার এই রেশমি শরীর মদের গন্ধে মাখামাখি হয়ে কোনো নর্দমাতে পরে থাকবে, পারফিউমের বদলে নেড়ি কুত্তার হিসু স্প্রে হবে”। বলেই ডুকরে কেঁদে উঠে হাতা দিয়ে চোখের জল মুছল। তখনই একটা হাফহাতা জামা যেটাকে সেই বিয়ের আগে কিনেছিলাম, সে রাশভারি বয়স্ক গলায় বলে উঠল- “আচ্ছা তোমরা সবাই কি গো! আমাদের মালিকের মৃত্যু হয়েছে। অশৌচ চলছে, কোথায় তোমরা কান্নাকাটি করবে তা নয়- খুনসুটি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছো, বলিহারি তোমাদের পোশাকিকতা”। বুঝলাম দীর্ঘদিন এদের ব্যবহার হয়নি বলে ওরা ভেবে নিয়েছে আমি নিশ্চিত মরে গেছি

দরজাটা যেই বন্ধ করে খাটে ফিরৎ যাব, কেউ যেন সিটি মেরে ডাকল আমাকে। চতুর্দিকে জানলা দরজা সব দেখলাম, উঁহু কেউ তো কোথাও নেই। আবার আওয়াজ এলো, “করনা, দরজা বন্ধ করনা”। শুনলাম সে আবার উর্দু শায়ারি বলছে- ‘কবসে ইস পিয়াসী কন্ডেন্সারমে বারিসকে বুন্দ তক নেহি গিরি, আব বৈশাখী আয়া”। নিশ্চই কোনো দুশ্চরিত্রা মেয়েমানুষ, নাহলে এভাবে সিটি মেরে, দরজা বন্ধ করার অবৈধ ইঙ্গিত কে করবে! ভেবেই নিলাম, যে হবি হ বাবা- আমি আর তাকাবোনা। কে কে না কথাবার্তা বলছে আজকে, শেষে কী আমি ক্ষ্যাপাই হয়ে গেলাম! বালিশে যেই চিৎ শুয়েছি, দেখি উঁচু দেওয়াল থেকে কুৎসিত ইঙ্গিত করছে এসিটা। ভাবখানা এমন, সে যদি নিচে চলাফেরা করতে পারত এক্ষুনি আমার ইজ্জত লুটে নিত। এসিটা সমানে আমাকে হাকাডাকা করে যেতে লাগল যাতে তাকে চালু করি। আমরা মাত্র ১ মাসের লকডাউনেই হাফিয়ে উঠেছি, সে বেচারি ৭-৮ মাস বন্ধ, ব্যাকুলতা তো স্বাভাবিক

 

(৩)

নাহ, ঘুম আসছেনা। ভাবলাম- যাই দেখি বাইরের বাকি সব আসবাবপত্রের কী দশা। রান্নাঘর থেকে কিছু খেলাধুলার আওয়াজ পেলাম, কিন্তু যেতে সাহস পেলামনা। ওটা বৌ এর এক্তিয়ারে, তাছাড়া আমি দীর্ঘদিন ও মুখো হইনা- পরপুরুষ দেখে যদি চালডাল, শাকসব্জি, মশলাপাতি, হাঁড়িকুড়ির দল চেঁচিয়ে উঠে- মানসম্মানের ব্যাপার। সিঁড়ি দিয়ে নিচে যেতে যেতে দেখলাম, বেসিন- ওয়াসিং মেসিন আর জলের দেওয়াল ফিল্টারটা মস্তিসে গানের লড়াই আন্তাক্সরি খেলছে। তাদের উপেক্ষা করে নিচের ড্রয়িংরুমে যেতেই দেখি বুক সেলফে কিসের যেন উৎসব চলছে জমায়েত করে। মনে হল সবকটা বেল্লিকের কান থাবড়ে বলি- ওরে বোকাচন্দ্রের দল, দেশে লকডাউন চলছে; এভাবে গাদাগাদি ভিড় করে ফুর্তি করা মানা। যেই কথাটা বললাম, একটা মোটামত বই বেশ দাঁত খিচিয়ে বলে উঠল- “ওহে ছোকরা, আমরা বই- আমাদের বেশি জ্ঞান দিতে এসোনা, বিশ্বের যাবতীয় জ্ঞান সব আমাদের জ্ঞাতি ভায়েদের বুকেপেটেই রাখা আছে। তাছাড়া গাদাগাদি করেই আমরা সেলফে থাকি চিরকাল, আমরা কেউ এয়ারপোর্ট হয়ে একখানে ঢুকিনি যে করোনা হবে…”

লম্বা ভাষণ দিতে শুরু করেছিল আরকি, পালিয়ে বাঁচলাম। যেটুকু বুঝলাম- বহুদিন পর ওদের ধুলো ঝেরে একে একে বের করে পড়েছি বলে তাদের আতিসায্যের শেষ নেই, বারংবার হাতের ছোঁয়া পেয়ে তারা ভীষণ উজ্জীবিত। যদিও অন্ধকারে আমাকে চিনতেও পারেনি ব্যাটারা, তাই ভুলকরে মালিককেই দুটো ছোটবড় কথা কয়ে ফেলেছে মুখ ফসকে; ক্ষমাই করে দিলাম । গ্যারাজে গিয়ে দেখি বাইকটা আর গাড়িটা যুগলবন্দী করে কীর্তন গাইছে। জুতোগুলো তাদের যোগ্য সঙ্গত দিচ্ছে দোহারে তালি বাজিয়ে। কী জানি বাবা, এরা হয়ত আমার শ্রাদ্ধ শান্তিই করে এখন কীর্তনের আসর বসিয়েছে। সামনে যাওয়াটা সমীচীন মনে করলামনা, ধর্মকর্মে বাঁধা এলে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া অন্ধকারে জুতো পেটা হোক বা গাড়ির চাকায় পিষে যাওয়া, কোনোটাই সুখকর হবেনা

মানে মানে পালিয়ে এসে দেখি, বালিশটা সমানে গজর গজর করে যাচ্ছে কারো একটা নাক ডাকাকে কেন্দ্র করে। এবারে আমি সেই বাঁশির মত নাকডাকার পাত্রকে খুঁজতে গিয়ে দেখি, আমার মোবাইলটা ওই দুষ্কর্ম করছে। বালিশের হাঁকাহাকিতে সে স্ক্রিন মেলে চাইল ম্যাড়ম্যাড়ে ব্রাইটনেসে। কিছুটা আড়মোড়া ভেঙে বলল, “তোদের এত সুখ তবুও অভিযোগের শেষ নেইরে বর্বরের দল। আমার কথা ভেবেছিস কখনও, ঘুমের ঘোরে হাত ফসকে মুখের উপরে না পরা পর্যন্ত, কবে আমাকে ছেড়েছে বল দেখি! সারাটাক্ষন তো আমারই পিছনে পড়ে আছে কারনে অকারণে। বই পড়লেও আমায় দিয়ে ট্রান্সস্টেলর খোলাবে, উইকিপিডিয়া, গুগুল, ফেসবুক, টুইটার, ক্যামেরা, গেম খেলা, সিনেমা দেখা, গানশোনা, পেমেন্ট করা, কথা বলা সহ নটি আমেরিকা হয়ে ক্যালকুলেটর সেজে কিনা করতে হয় বলতে পারিস? রণে বণে জলে জঙ্গলে স্বর্গে নরকে তো বটেই, বাথরুমেও আমাকে নিস্তার দেয়না। মালিক ঘুমালেও কী আমার শান্তি আছে, ওমনি পিছনে চার্জার গুঁজে দেবে সারারাত। তবুও তো তোরা কাঁদছিস, এদিকে আমি শোকে পাথর হয়ে গেছি

বারে আমাকে জেগে উঠতে দেখে- ল্যাপটপ সম্প্রদায়, বালিশ, বিছানা, খাট ও মোবাইল সবাই মিলে একসাথে প্রশ্ন করল। আমার এই ঘরে থাকার পিছনের রহস্যটা কি! ধীরে সুস্থেই বললাম, বিশ্বজোড়া অতিমারি পরিস্থিতির জন্য দায়ী করোনা ভাইরাসের কথা। ওমা সে কথা শোনা মাত্রই ল্যাপটপ থেকে মোবাইল হো হো করে হেসে উঠল। ল্যাপটপ বলল, এ আর কি এমন বড় কথা! ভাইরাস তো জলভাত ব্যাপার, আরেকবার আন ইনস্টল করে ইনস্টল করে নিলে মালফাংশন দূর হবে। মোবাইল বলল- আরে বস লেটেস্ট ভার্সনটা আপডেট মেরে নাও না, বাজারে কি স্ক্র্যাপ মাল লিক হয়নি!। সমানে তাদের জ্ঞানের ঝুলি থেকে একের পর এক পথ্য দিতে পাগল; বুঝলাম, এদের কাছে ভাইরাস নিয়ে আলোচনাই বৃথা

আমার নিজেরই কেমন মায়া হয়েছিল, সান্ত্বনা দিয়ে কিছু বলতে যাব ভেবেছিলাম, এখন ওদের ভাইসার জ্ঞানের ভাঁট আলোচনা শুনে কান গরম হয়ে উঠল। আমি চেঁচিয়ে কিছু বলতে যাব, ঠিক তখনি খানিক দুলে উঠে সিলিং ফ্যানটা ভয়ানক রাগী মুখে বলে উঠল- “আমাকেও কী একটু শান্তিতে বিশ্রাম নিতেও দিবিনা আহাম্মকের দলেরা? সময়ে ঘুম তো আমার জীবন থেকে কবেই গায়েব হয়ে গেছে, সামান্য লোডশেডিং এর সময় টুকুই তো বিশ্রাম এই জীবনে। আজকাল কারেন্টও যায়না নিয়মিত, এদিকে চৈত্রের শুরু থেকে তো সমানে চলেই যাচ্ছি। আজকের এই সুখ টুকুও কি ছিনিয়ে নিবি উজবুকের দল”। বলেই ভীষণ রেগে গিয়ে বনবন করে ঘুরতে লাগল নিজের চারপাশে

ফ্যান অমন রেগে পাগলের মত বনবন করে ঘুরতে শুরু করতেই, আমি ধড়মড় করে জেগে উঠে বসলাম, নিরাপদ দূরত্বে সরে যাব বলে। জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি বাইরের অমানিশা কেটে ভোরের আলো এই ফুটলো বলে, কারেন্ট চলে এসেছে তাই ফ্যানটা চালু হতেই ঘুমটা ভেঙে গেছে। মানে ওই গরমের মধ্যেই চোখটা লেগে গিয়েছিল। তারপরেই মনে পরল সেই সব অদ্ভুতুড়ে ঘটনা গুলো। যাই হোক, আজ ল্যাপটপ মোবাইলকে কিছুটা বিরাম দিয়ে, জামাজুতো পরে গাড়িটা নিয়ে একটু চক্কর মেরেই আসি। যতই স্বপ্ন হোক, ব্যাথার কথা গুলো তো নিজে কানেই শুনেছি

ও হ্যাঁ, তোমরা যেন আবার কেউ পাঁচকান কোরোনা এসব কথা, লোকে উন্মাদ বলবে

-সমাপ্ত

 

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...