রবিবার, ১০ মে, ২০২০

তোমার মাঝে বসত করে কয়জনাঃ করোনা ভাইরাস (৩)



তোমার ঘরে বসত করে কয়জনাঃ করোনা


তৃতীয় পর্বঃ বাণিজ্য যুদ্ধের আড়ালে কি করোনার জন্ম

পৃথিবীতে তিন ধরনের তত্ত্ব রয়েছে, একটা মীমাংসিত, অন্যটা অমীমাংসিত। এই দুই তত্ত্বের মাঝে যে তত্ত্বের বাস তাঁর নাম ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বা ইংরাজিতে ‘দ্য কন্সপিরেসি থিয়োরি’- এটাই তৃতীয় প্রকারটি। রাষ্ট্র বা ক্ষমতা- সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রচারমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের মগজধোলাই করে যেটা বলে দেয়, প্রায় প্রত্যেকেই সেটাকেই ধ্রুবসত্য হিসাবে মেনে নেয়। কিন্তু কিছু মানুষ রয়েছেন, যারা যুক্তি ও তর্কের মাঝে তথ্য বিশ্লেষণ করে, যেকোনো তত্ত্বের একটা বিপ্রতীপ কিন্তু সমীচীন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে। রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীনেরা একেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে। বহুক্ষেত্রেই দেখা গেছে, কোনো ঘটনার বহু বছর- এমনকি কয়েক দশক বা শতাব্দী পরও এই ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের ব্যাখ্যা হুবহু মিলে গেছে।

করোনা নিয়েও এমন বহু কন্সপিরেসি থিয়োরি বাজারে চালু হয়েছে, তারমধ্যে বিভিন্ন তথ্য ঘ্যেটে যেগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হল তেমনই তিনটে ঘটনার বর্ণনা করব। দুটো বর্তমান চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের নেপথ্য কথন, তৃতীয়টা দু’দশক আগের গল্প।

প্রথম দুটো তত্ত্বে বহু তথ্য রয়েছে, যেগুলো ছাড়া আলোচনা অর্থহীন তাই খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম।

প্রথম ঘটনা
°°°°°°°°°°°°

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সহ মিডিয়া ব্যবসার ‘বিশ্ব বানিজ্যের’ অধিকাংশই মার্কিন ব্যবসাদারেদের দখলে ছিল। আগামীতে ব্যাঙ্কিং, যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা ক্ষেত্রে 5G প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে আমরা সকলেই কমবেশি ওয়াকিবহাল। এমতাবস্থায় চীন এই প্রযুক্তি বাজারে দ্রুত ঢুকে এসে জাঁকিয়ে বসেছে, বিশেষ করে Huawei ও ZTE গোটা বিশ্বব্যাপী দ্রুতগতির 5G ইন্টারনেট সরঞ্জাম বিক্রিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। ‘হুয়াওয়ে’ কোম্পানী- কানাডা, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, ভারত, পাকিস্তান, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, রাশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর সহ মোট ১৭০টি দেশে একচ্ছত্র ভাবে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। শিপিং নেভিগশনে তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির খরিদ্দার বিশ্বের ৯৫% শিপিং এজেন্সি। মজার কথা হল- ওই ১৭০টি দেশের তালিকাতে খোদ আমেরিকাও রয়েছে।

সমস্যা বাঁধে, ‘হুয়াওয়ে’ যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পরোয়া না করে ইরানকেও 5G প্রুক্তি বিক্রিতে চুক্তি সম্পাদনা করে। প্রতিহিংসা বসত, প্রথমে হুয়াওয়ের কর্মকর্তার মেয়েকে কানাডায় গ্রেফতার করা হয় CIA এর মদতে, ২০১৮ এর ডিসেম্বরে। পাল্টা হিসাবে চীনও কয়েকজন কানাডিয়ান দূতকে পাল্টা জাতীয় নিরপত্তা বিঘ্নতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। এমনই বিভিন্ন নাটকীয় পরিস্থিতির পর উভয় দেশই সকলকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, যাতে ভীষণ চটে যায় আমেরিকা।

হবেনা টাই বা কেন, হুয়াওয়ে এর নিজস্ব ওয়াবসাইটেই দেওয়া আছে- ২০১৮ সালের তাদের মোট পণ্য বিক্রয় ছিল ৭২১.২০ বিলিয়ন ইউয়ান, যা আমাদের ভারতীয় মুদ্রাতে সাত লক্ষ বাহাত্তর হাজার কোটি টাকা। যা আমাদের ‘গর্ভমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার’ ২০১৮-১৯ সালের মোট বাজেটের একচতুর্থাংশেরও বেশি(১)। ২০১৮ সালে হুয়াওয়ের রাজস্ব বৃদ্ধির হার ছিল ১৮ %, লভ্যাংশ বেড়েছিল ২৫%। ২০১৯ সালে এই বৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ১৮% ও ১৪%। এই বাজারকে নষ্ট করার বা দখল করার চেষ্টা আমেরিকার মত দেশ যে করবে তা বলাই বাহুল্য।

যথারীতি তীব্র ক্রোধে এই হুয়াওয়েকে গোটা বিশ্বে নিষিদ্ধ করতে এক প্রকার হুইপ জারি করে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু সস্তার যন্ত্রাংশ ও উন্নত পরিষেবার কারনে, ব্রাজিলের মত এক আধটা দেশ ছাড়া কেউই তাতে পাত্তা না দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। এমনকি খোদ মার্কিনিদের কাছেও হুয়াওয়ের কোনো বিকল্প ছিলনা, এই এপ্রিল ২০২০ তেও নেই(২)। ইউরোপিয়ান কোম্পানী নোকিয়া ও এরিকশন এই 5G প্রযুক্তির সরঞ্জাম বেচলেও তা হুয়াওয়ে তো দূরস্থান, চীনের আরেক প্রযুক্তি দানব- ZTE এর সমমানেরও নয়।

এদিকে ট্রামের নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্য দেশগুলোই যে মানেনি তা নয়, আমেরিকার ৫০টা প্রদেশের ৩৮টা প্রদেশই সেই নিষেধাজ্ঞা না মেনে- হুয়াওয়ের সাথে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। মরিয়া মার্কিন প্রশাসন তখন- হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ এনে আমেরিকাতে হুয়াওকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়। ইন্টারনেট প্রোটোকল থেকে নকল পণ্য সরবরাহের দোহায় দিয়ে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে কোর্ট থেকে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে সেই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করে।

২০১৫ সালেও আমেরিকা একবার এই চুরির অভিযোগ তুলেছিল চীনা কোম্পানী গুলোর বিরুদ্ধে, এবং আশ্চর্যজনক ভাবে চীনা রাষ্ট্রপ্রধান- সিনপিং এর তরফে বিবৃতি ছিল “আগামীতে আর চুরি করবেনা”, পক্ষান্তরে চুরি স্বীকারই করে নিয়েছিল। এরপর চীন খুলমখুল্লা আইন করে তাদের দেশজ প্রযুক্তি কোম্পানীগুলোকে নির্দেশ দেয় যে, তাদের ব্যবসা, খরিদ্দার সহ সকল ধরনের যাবতীয় তথ্য চীনের সরকারের কাছে তারা দিতে বাধ্য।

প্রসঙ্গত, হুয়াওয়ে যদিও চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, তবুও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রতিটি কোম্পানিকে তারা সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়ে থাকে। বিগত দশকে এই হুয়াওকে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, সাড়ে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা দিয়েছে ঋণ ও অনুদান বাবদ দিয়েছিল; পাশাপাশি ২০১৮ সালের আগে হুয়াওয়ে এর গোটা ব্যবসাটাই ছিল করমুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই হুয়াওয়ে- শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষেই কয়েকলক্ষ কোটি টাকা গবেষণা খাতে লগ্নি করতে পেরেছে।

যাই হোক, আমেরিকার নিষিদ্ধকরনের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ চীনও তাদের দেশে গুগুল, এ্যপল ও ফেসবুককে ব্যান করে দেয় রাতারাতি, এমনকি তাদের মোবাইল হ্যান্ডসেটে এন্ড্রেয়েড অপারেটিং সিস্টেম লাগানোও বন্ধ করে দেয়, সাথে সাথেই হুবহু এন্ড্রোয়েডের কার্বন কপি বাজারে নিয়ে চলে আসে। গুগুল থেকে শুরু করে মার্কিন কোম্পানিগুলি এর ফলে বিপুল পরিমাণে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এছাড়া ভিসন ২০৩০- আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ইন্টারনেট অফ থিংস এর ক্ষেত্রেও একই কাহিনীতে আমেরিকা সম্পূর্ন ভাবে পর্যদুস্ত হয়ে পরে চীনের কাছে। হাস্যকর বিষয় হল- মার্কিনিদের পরম মিত্র ব্রিটেনও আমেরিকার নিষেধাজ্ঞাকে উড়িয়ে দিয়ে চীনের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক দৃঢ় করে চলেছে দিনদিন।

দ্বিতীয় ঘটনা
°°°°°°°°°°°°°
উচ্চাশার কোনো সীমা হয়না, ক্ষমতার লোভেরও সীমা নেই। উল্টো দিক থেকে ভাবলে স্বপ্ন না দেখলে কীভাবে এগোবে আগামীতে? তাদের মুল লক্ষ্য হল ব্যবসা, আর তাতে উন্নত পরিষেবা দিতে গেলে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরী, আর এই প্রকল্পেই কাজ শুরু করেছে চীন।

BRI প্রকল্পের নাম শুনেছেন কি! যার পুরো নাম হচ্ছে “বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ”। এ এক মহাপ্রকল্প যাকে এই একবিংশ শতাব্দীর ‘রেশম পথ’ নামে অবিহিত করা হচ্ছে। আফ্রিকা, পূর্ব থেকে পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ভারত মহাসাগর, পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সামুদ্রিক অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে ৪০০০ কিমি ব্যাপী এই দানবীয়-যোগাযোগ প্রকল্প। এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ২০১৪ সালে যা তাদের প্রেসিডেন্ট সিনপিং এর মস্তিষ্কপ্রসুত, ৭০টি দেশকে এক সড়কে মেলানোর প্রচেষ্টা- যার দ্বারা পৃথিবীর ৬০% জনসংখ্যাকে ছুঁয়ে যাওয়া যাবে। এটা পৃথিবীর ৪৫% ‘গ্লোবাল গ্রোথ’ এলাকা জুড়ে করিডোর প্রতিষ্ঠা করে পরিকাঠামো নির্মাণের দরুন সমগ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে রেল, সড়ক ও নৌপথে।

নক্সা মোতাবেক, পশ্চিম চীন থেকে কাজাখস্তান হয়ে পশ্চিম রাশিয়ার দিকে একটা পথে চলে যাবে। যাতে চীনের জিনজিয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, কাজাখস্তান, রাশিয়া, বেলারুশ, পোল্যান্ড এবং জার্মানি হয়ে নেদারল্যাণ্ড যুক্ত হয়ে যাবে। দ্বিতীয় পথটি, চীন – মঙ্গোলিয়া – রাশিয়া করিডোর, যা উত্তর চীন থেকে রাশিয়ান পূর্বদিকের শহর গুলোকে ছুঁয়ে যাবে। তৃতীয়টি, চীন – আফগানিস্থান – ইরাণ- তুরস্ক- বুলগেরিয়া- সার্বিয়া- স্লোভেনিয়া- সুইজারল্যাণ্ড- ইতালি- ফ্রান্স হয়ে স্পেনে ঢুকে যাবে। এই তিনটে মূল করিডরের মাঝ অসংখ্য কানেক্টিং রোডেরও প্রস্তাবনা আছে বিভিন্ন দেশ দিয়ে। ইরান থেকে চতুর্থ পথটি সোজা ওমান- ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকার মূল ভূখন্ডে যুক্ত হবে। এছাড়া বাংলাদেশ- থাইল্যান্ড, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া- ফিলিপিন্স সহ পূর্ব এশিয়ার সমকটি দেশই এই প্রকল্পের অধীনে যুক্ত হয়েছে।

ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে চীন প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার লগ্নি করে ফেলেছে, মোট বাজেট ১০ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার। ইতিমধ্যেই চীনের এই বিপুল পুঁজির কাছে ১৩৮টি দেশ ও ৩০ টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা মাজা নুইয়ে দিয়েছে; তারা একজোট করে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে চীনা ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানী গুলো একচেটিয়া এই কাজ শুরু করে দিয়েছে।

পরিকাঠামো প্রকল্পগুলির মধ্যে বন্দর, রেলপথ, মহাসড়ক, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিমান ও টেলিযোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এইখানেই হচ্ছে আমেরিকার কাছে চ্যালেঞ্জ, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চিমা সাম্প্রাজ্যবাদ- চীনের বাণিজ্যিক কূটনীতির কাছে এক্কেবারে ধরাশায়ী হবার আশঙ্কা রয়েছে। আমেরিকা প্রাসঙ্গিকতা হারাবে অনেকটাই, কারন ইতিমধ্যেই মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্থান সহ বিশ্বের অন্তত ৪৭ টা দেশের বিভিন্ন বন্দর ৯৯ বছরের লিজে অধিগ্রহণ শুরু করেছে চীন সরকার, যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে বিশাল হুমকি। রাশিয়া ও চীন মিলে যৌথ তহবিল বানিয়েছে, এছাড়া লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা ও জামাইকাও এই প্রকল্পে সামিল হয়েছে। খোদ ব্রিটেন পর্যন্ত এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়ে ইংল্যান্ডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে চীনা ছাত্রদের জন্য বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করেছে বরিস জনসন।

আমেরিকার রাশ হালকা হওয়া শুরু হয়েছে G7 গোষ্ঠীর দেশ হিসাবে সর্ব প্রথম ইতালির অন্তর্ভুক্তিকরন, গোটা ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন সহ CIA প্রকাশ্যে চীন-ইতালি বাণিজ্য চিক্তির বিরোধীতা করেছে, বিষয়টা এখানেই থেমে নেই- বর্তমানে সৌদি আরব সহ ইজরায়েলও এই প্রকল্পের অংশীদার হয়ে গেছে।

কোণঠাসা আমেরিকা এই প্রকল্প শুরুর পাঁচ বছর পর এসে প্রচার শুরু করছে, এটি মোটেও উন্নয়নের রোডম্যাপ নয়- এটা চীনা ঋণের ফাঁদ, যাতে ফেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে চীন। আরো প্রচার করছে যে এতে বায়োডাইভারসিটি নষ্ট হবার সম্ভাবনা বিপুল, ইত্যাদি। এখানেই না থেমে থেকে, আমেরিকা এদের পাল্টা প্রকল্প শুরু করেছে- "Free and Open Indo-Pacific strategy" (FOIP) নামে, যেখানে আমেরিকা ছাড়া- জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও আমাদের দেশ ভারতও রয়েছে। ভারতের জন্য চীনা মহা-প্রকল্পের সবচেয়ে বড় হুমকি হল পাকিস্তান-চীন করিডর, আর এটির জন্যই ভারত পরিষ্কার করে জবাব না দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে বেজিংকে।

সুতরাং, বিকল্পহীন প্রযুক্তি আর পরিকাঠামোর সুবিধা সহ বিপুল পুঁজি নিয়ে চীনের এই উত্থান আমেরিকার দাদাগিরিতে ইতি টেনে দিতে পারে। তাই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কোনো মজবুত প্রমান না থাকলেও, ঘটনাপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি “করোনা-ভাইরাস- একটি মার্কিন-জায়োনিষ্ট ষড়যন্ত্র” তত্ত্বকে নাৎস ও করতে পারছেনা বিশেষজ্ঞরা। কারন এর আগে আমেরিকার প্রমাণিত সত্য দুনিয়ার সামনে আজ উন্মুক্ত।

তেতো সত্য তথা তৃতীয় ঘটনা
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
আমরা সকলেই জানি, আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলার (9/11) দায়ে জর্জ বুশ ইরাক আক্রমণ করে ও কয়েক হাজার মার্কিন সেনা সহ লাখ ছয়েক ইরাকীকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়ে দেশটিকে তছনছ করে দেওয়া হয়েছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে সেই সময় মার্কিন পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ‘Halliburton’ এর শেয়ারের দাম বেড়ে গেছিল প্রায় ৫০০ শতাংশ, ও তাদের মুনাফা বেড়েছিল ৬৮০ শতাংশ লিঙ্ক (৩) রইল। ‘হালিবার্টন’ এর সাবসিডিয়ারি কোম্পানিই আবার ইরাক পূনর্গঠনের বরাতও পেয়েছিল। বুঝতেই পারছেন, মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ তেলের একটা বৃহৎ অংশকে সরাসরি নিজেদের কুক্ষিগত করা হয়েছিল এই যুদ্ধের অজুহাতে।

এই ‘হালিবার্টন’ কোম্পানির সর্বেশ্বর কর্তার নাম জানেন? তিনি হলে ‘ডিক চেনী’। এনার অন্যতম বড় পরিচয় হচ্ছে- ইনি জর্জ বুশের আমলে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আজকের দিনে এসে আর কষ্ট করে অনুমান করতে হয়না ইরাক যুদ্ধের নেপথ্য কারন। এবং গোটা বিষয়টি পরিচালিত হয়েছিল- বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধর্মীয় মৌলবাদী জাতি ‘ইহুদিদের’ দ্বারা। বুশের প্রশাসনে, বুশের বক্তিগত মুখ্য সহায়ক, হোয়াইট হাউসের চিপ অফ স্টাফ, ডিক চেনীর চিপ অফ স্টাপ, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ডাইরেক্টর, ডিফেন্সের আন্ডার সেক্রেটারি ও তার ডেপুটি, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি, স্পিচ রাইটার, হোয়াইট হাউসের পলিটিক্যাল ডাইরেক্টর, সহ এক ঝাঁক ইহুদি। লিঙ্ক রইল(৪)। আমারিকান জনসংখ্যার শতকরা দেড় জন মাত্র একজন ইহুদী, কিন্তু মুল ক্ষমতার অলিন্দে? সিংহভাগ মূল ক্ষমতাতে তারা।

প্রসঙ্গত- ইহুদিদের ইরাকীদের প্রতি ঘৃণার কারন, ৫০০০ বছর পূর্বে কোনো এক ইরাকি শাসক তাদের ঐশ্বরিক ক্ষমতা সম্পন্ন সিন্দুক ‘Ark of the Covenant’ লুন্ঠন করে নিয়ে গিয়েছিল, তার পর থেকে ইহুদিদের নাকি দুর্ভোগের শুরু, তাদের ধর্ম বিশ্বাস মোতাবেক। ওই ‘Ark of the Covenant’ কে খোঁজার জন্য ইরাকে তারা আমেরিকার ঘোমটার আড়ালে যুদ্ধ বাঁধিয়েছিল। ওই Ark of the Covenant খুঁজে পেলেই গোটা পৃথিবী ইহুদিদের শাসনে চলে আসবে এটাই তাদের ধর্ম বিশ্বাস। আপনি ভাবেনঃ হিন্দু-মুসমানেরাই সাম্প্রদায়িক জাতি।

সুতরাং, কে বলতে পারে, করোনা রহস্যের নেপথ্যে এমনই কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা। কারন খুব পরিষ্কার, প্রথমত সেই দেশকে সমূলে ধ্বংস করে দাও যাদের সাথে ব্যবসা যুদ্ধে পারা যাচ্ছেনা, আর সেই দেশগুলোকেও চরমতম সাজা দাও- যারা মার্কিন প্রভুদের আদেশ অমান্য করে হুয়াওয়ের সাথে বা চীনের BRI প্রজোক্টে যুক্ত হয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এটা যে আমেরিকা করতেও পারে সেটা হোলিবার্টনের উদাহরনেই পরিষ্কার। খালি চোখে কারো সর্বনাশের আড়ালে ঘটে চলে পুঁজিবাদ, ব্যবসায়িক প্রতিপত্তি ও ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের নিকৃষ্ট খেলা।

আর সবচেয়ে হিংস্র ও নৃশংস তথ্যটা হল- ‘বায়ো-উইপন’ বা জৈব-অস্ত্র নিরোধ কনভেনশনে ১৮৩ টি দেশ পক্ষে স্বাক্ষর করেছিল, যে তারা এই সংক্রান্ত গবেষণা করবেনা। চাদ, জিবুতি, কমোরস, নামিবিয়া, ইরিত্রিয়া, কিরিবাতির মত অজানা কয়েকটি ‘শক্তিহীন’ দেশের সাথে আরো একটা দেশ এই বিরতি প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেনি(6)।

যে দেশটা প্রতিটি বিশ্বযুদ্ধে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে নিজেদের ধর্মীয় জাতির জন্য পৃথক দেশের প্রতিশ্রুতি হাসিল করেছিল; আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেই প্রস্তাবিত দেশটির মালিকানা পেয়েছিল ‘ইহুদিরা’। এখন এরা চায় পৃথিবীর ‘বাপ হতে’, যার জন্য প্রয়োজন আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ। চীন ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলনা কখনই, আগামীতেও থাকার সম্ভাবনা শূন্য, কারন ইহুদি মানেই ৫ হাজার বছর আগের ধর্ম বিশ্বাসকে বাস্তবায়ন, আর চীন ধর্ম ছাড়া বাকি সবেতেই থাকে। তাই ইহুদিরা, পরাক্রমী চীনের সাথে সরাসরি যুদ্ধংদেহী মনোভাব না দেখিয়ে ‘মোসাদ’কে দিয়ে গোপনে কোনো ঘৃন্য চাল চালতেই পারে; তাই করোনা-প্যান্ডেমিক মোটেই কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়। এটা একটা সুপরিকল্পিত নৃসংসতা, বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকা তৈরি জন্য এই লকডাউনে ভেঙেপড়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক্কেবারেই আদর্শ।

দেশটির নাম ইজরায়েল। এরাই জৈব-অস্ত্র বিরোধী কনভেনসনে বিপক্ষে ছিল। আমেরিকা আর চীন নামের দুই বেড়ালের ঝগড়ার মাঝে, ইজরায়েল নামক নেপোয় দই মেরে দিচ্ছে হয়ত। এই ইহুদিরাই মানে রথচাইল্ড ফ্যামিলি(৫)- ওয়াটারলু যুদ্ধে নেপোলিয়ন ও ইংল্যান্ড দুপক্ষকেই ঋণ দিয়েছিল অস্ত্র খরিদের জন্য, যেই জিতুক লাভ শুধুই ইহুদিদের, যারা আজ ইজরায়েল নামক দেশ গঠন করে বিশ্বপিতা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। নেটে ঘ্যেটে তথ্য দেখে ফ্যাক্ট চেক করার দায় আপনার, আমি শুধু সত্যানুসন্ধান করে সম্ভাবনার কথা উস্কে দিলাম।

আরো দু দশক পর হয়ত এই আশঙ্কার সত্যতা প্রকাশ পাবে, ততদিন আমরা মরে বেঁচে থাকি।

1. https://www.huawei.com/.../2019/3/huawei-2018-annual-report
2. https://thehill.com/.../486014-lawmakers-look-for-5g...
3. https://www.irishtimes.com/.../iraq-war-turns-handsome...
4. https://www.jewishvirtuallibrary.org/jews-in-the-george-w...
5. https://www.businessinsider.com/the-rothschild-gang...
6. https://en.wikipedia.org/.../List_of_parties_to_the...

বুধবার, ৬ মে, ২০২০

গণতন্ত্র মিথ ও আগামীর পৃথিবীঃ ৪

 

চতুর্থ পর্ব

উপরোক্ত দুই ধরনের গণতন্ত্রেই মূলত দুটো অধিবিভাগ দেখা যায়, যথা- সংসদীয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রপতি পরিচালিত গণতন্ত্র।

সংসদীয় ব্যবস্থাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তথা সংসদেরা মিলে তাদের নেতা নির্বাচন করে। এই নির্বাচিত নেতাই সরকারের সর্বাসের্বা তথা প্রধানমন্ত্রীর হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন, মন্ত্রীসভার বাকিদেরকে মূলত তিনিই মনোনীত করেন। এই ধরনের গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রধান ‘রাষ্ট্রপতি’ হলেও তা নেহাতই একটা আলঙ্কারিক পদ বহুলাংশে, তবুও রাষ্ট্রের সকল কিছু রাষ্ট্রপতির নামেই সম্পাদিত হয় প্রোটোকল অনুয়ায়ী। এই ব্যবস্থায় যেকোনো সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদেরা তাদের নেতা তথা তথা প্রধানমন্ত্রীকে যেকোনো সময় বদলে ফেলতে পারে। এই গণতন্ত্রের অনুশীলনে দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ট সংসদীয় দলটি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে, যাদের কাজ হয়- গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি আনুগত্য রেখে, সরকারের গঠনমূলক বিরোধিতা বা সমালোচনা। মন্ত্রীগোষ্ঠীর সাথে- সরকারপক্ষ ও বিরোধীপক্ষ মিলে গঠিত বিভিন্ন সংসদীয় যৌথ কমিটি গঠনের মাধম্যে সরকার পরিচালিত হয়ে থাকে।

রাষ্ট্রপতি পরিচালিত গণতন্ত্রে, রাষ্ট্রপতি একাই- রাষ্ট্র ও সরকার উভয়ের প্রধান পরিচালক হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি হিসাবেই সরাসরি মানুষের ভোটে জিতে আসে, সমগ্র মন্ত্রীসভা রাষ্ট্রপতির আয়ত্তাধীন থাকে। এক্ষেত্রে আইনসভার সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচ বা অভিযুক্ত করার ক্ষমতা রাখলেও বহিষ্কার করার ক্ষমতা রাখেনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, কারন রাষ্ট্রপতি ও আইনসভা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ বিশিষ্ট, এক বা একাধিক, নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তিদের ঐক্যমত্যে আনা অতীব দুঢ়হ কর্ম।

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই কখনও না কখনও ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশ ছিল, যে ইউরোপ গণতন্ত্রের ধাত্রী ভূমি। অথচ তারাই গোটা বিশ্বকে দাস বানিয়ে রেখেছিল বেশ কয়েক শতাব্দী, গণতন্ত্রের আজকের ধ্বজাধারীরাই সমগ্রবিশ্বের অধিকাংশ দেশগুলোকে পরাধীনস্ত করে রেখেছিল সম্পদ লুঠের জন্য। বহু রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর, উনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেশগুলো সার্বভৌমত্ব তথা স্বাধীনতা লাভ করে। তাই লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সর্বত্রই অষ্টাদশ শতকের ইউরোপিয়ান আইনের উপরে ভিত্তিকরে স্বাধীন দেশগুলির সংবিধান রচিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা সময়ের চাহিদায় নিজ নিজ দেশের মত করে সংযোজন, সংশোধন, ও পরিমার্জন করে ‘প্রতিটি’ স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। পৃথিবীতে বেশ কিছু দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব তথা ক্ষমতা বন্টনের মাধ্যমে এক ধরনের শঙ্কর জাতীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, কিছু দেশে আবার প্রত্যক্ষ ও প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মিশেলে একটা মিশ্র গণতন্ত্র বিন্যাসিত হয়েছে।

একটা সময় গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রে মাঝে বেশ কতকগুলি বিরোধ ছিল; কোনটা বেশি জনহিতকর নাকি দুটোই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত- এ নিয়েও তর্কের শেষ নেই আজও। কারন ব্রিটেন, স্পেনের মত বেশ কিছু দেশে এখনও প্রতীকি রাজক্ষমতার আধারে ‘সাংবিধানিক রাজতন্ত্র’ বর্তমান, সেখানে প্রজাতন্ত্র শব্দটা ব্যবহার করা যায়না। আবার ভারতের মত দেশে না রাষ্ট্রপতি না প্রধানমন্ত্রী না কোনো রাজতন্ত্র সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক, আমাদের দেশের সিস্টেমটা আক্ষরিক অর্থে ‘প্রজাতন্ত্র’, যেখানে জনগণই রাষ্ট্র ও সরকারের নিয়ন্ত্রক। মেয়াদ ফুরালে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী যে ই হোক তাকে ক্ষমতায় থাকতে গেলে মানুষের ভোটে জিতে আসতেই হবে।

প্রজাতন্ত্র হলেই যে সোনার কাঠি হবে তেমনটাও হয়; আমাদের দেশে কি প্রতিটি জনগণ তার প্রাপ্য সুবিধা ভোগ করে? আমাদের দেশে কি রাজনৈতিক অনুশীলন সম্পূর্ণ ‘কপি-বুক’ গণতান্ত্রিক নিয়ম মানা হয়? ‘ভারতীয় গণতন্ত্র ও তার প্রয়োগ’ নিজেই একটা বিপুল চ্যাপ্টার, তার পরবর্তী কোনো ফুরসতে এ বিষয়ে আলাপ করা যাবে। কোনো কোনো দেশে ধর্মীয় আনুশাসনিক গণতন্ত্র বর্তমান, যেমন পাকিস্থান বা আগের নেপাল ইত্যাদি। এগুলো সবই ওই শঙ্কর প্রজাতীয় গণতন্ত্র, যারা কোনো আদর্শলিপি পাওয়া যায়না। মার্ক্সীয় তত্ত্বকে ভিত্তি করে বহুদেশে সমাজতন্ত্রিক গণতন্ত্র প্রচলিত রয়েছে, এখানে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী রাষ্ট্র পরিচালনা করে যারা সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র থেকে প্রতিনিধিত্ব করে, এখানে গণভোটের কোনো বালাই নেই। বহুলাংশেই দেখা গেছে সামাজিক গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই ‘সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থায়, কারন ক্ষমতার বৈভব ও ক্রমবর্ধমান লালসা- বহুলাংশেই মার্ক্সীয় নীতি থেকে সরে গিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আইন লাগু হয়েছে।

কিছু দেশে নির্বাচন বিনাই ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে জুড়ি কমিটি জনগণের মধ্যে থেকে যাকে বেশি যোগ্য মনে করবে তাকেই রাতারাতি ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে- একে ‘সর্টিসন’ গণতন্ত্র বলা হয়। কিছু দেশে সংখাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠীগুলো ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে একটা গণতান্ত্রিক সমন্বয় গঠন করত, যাকে ‘একচেটিয়া’ গণতন্ত্র বলা হয়। এখানে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো থাকে। এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রদেশে- Inclusive democracy, Participatory politics Democracy, Cosmopolitan Democracy, Creative democracy, Guided democracy ইত্যাদি নামের ভিন্নভিন্ন উপধারার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায় ইতিহাসে। এর বাইরেও যৌক্তিকতন্ত্র, সমষ্টিতন্ত্র, বিচক্ষণতন্ত্র, মৌলিকতন্ত্র নামের কয়েকটি গণতান্ত্রিক মতবাদের উদ্ভব হয়েছিল, যা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশ শতকের গোঁড়ার দিকে ইউরোপের ‘চূড়ান্ত ব্যাক্তি স্বাধীনতাকামী’ একটা শ্রেনীর জনগণের কাছে গণতান্ত্র বা রাজতন্ত্র ও তাদের সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত সরকার ব্যবস্থারই প্রয়োজন নেই বলে বিশ্বাস করত। রাজতন্ত্রকে যেমন ‘মনার্কি’ বলা হয় ইংরাজিতে, তেমনই সরকারের প্রয়োজনীয়তাকেই মান্যতা না দেওয়াটাকে ‘এনার্কি’ বলা হয়। শুদ্ধবাংলাতে একে ‘নৈরাজ্যবাদ’ বলা হয়, অনেকে ক্ষেত্রেই এদের দ্বারা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হত বলে- একে মাৎস্যন্যায়ও বলা হয়। যারা এনার্কিতে বিশ্বাস রাখে তাদের এনার্কিষ্ট ও তাদের মতবাদকে এনার্কিজম নামে ডাকা হয়। এনার্কিজম কোনো প্রকারের কর্তৃত্তকারীকেই স্বীকৃতি দেয়না, এই মতবাদে শাসক মানেই প্রহসন। তারা বিশ্বাস করে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেখানে কর্তৃপক্ষ ছাড়াই সমাজ থাকবে, প্রতিটি ব্যাক্তি নিজেই স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান- এবং এভাবেই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব।

কিছু বেসরকারি ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক ভোটদান প্রক্রিয়ায় তাদের কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়ে থাকে, যেমন কো-অপারেটিভ, ট্রেড ইউনিয়ন প্রমুখ।

এই হল গণতন্ত্র বিষয়ে, মোটের উপরে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা।

…ক্রমশ

তথ্যঋণঃ উইকিপিডিয়া

বৃত্ত ও অন্তকাব্য

 



মুখবন্ধ
ভাবনা আর বাস্তবের আবর্তক্রম পুনরাবৃত্তি ঘটে আমাদের মনোজগতে- পরিভাষা ভেদে মূর্ত আর পরাবাস্তবের প্রবাহ বলয়ে আমরা প্রত্যেকে বন্দি। চরিত্রভেদে কারো অপলাপ- কারো চিত্রণ হয়ে দাঁড়ায়। আমারটা আমি নিজেকে যতটা উন্মোচন করেছি, এটা তারই আখ্যান। এটা কোনো ‘কাফকায়েস্ক’ নয় যে, প্রচলিত গল্প বলার সীমানা অতিক্রম করব বা আখ্যানের ধরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মুরোদ রাখি। মানব অভিজ্ঞতার ধুসর অপ্রাপ্তিগুলোকে- তন্ময় হয়ে কল্পনা রূপে অন্বেষণের মন্ময়যাত্রা এটা। অত্যুচ্চ প্রশংসার সামান্যতম আকাঙ্খাও নেই, তাই একে প্রলাপ বা বিলাপ ভেবে স্বচ্ছন্দ্যে এড়িয়ে যাওয়াও যায়


()

আমি মফঃস্বলের পাড়া গেঁয়ে ভুত, সেকেলে। যতবার মহানগরের রাজপথে নিজেকে ফেরি করে ফিরি কাজের দোহায় দিয়ে, প্রতিটা মুহুর্তে অনুভব করি- আমি বড় আদিম সঙ্গতিরহিত এই আধুনিক পৃথিবীতে। আমার বাস হওয়া উচিৎ বিবস্ত্র প্রকৃতির সান্নিধ্যে যেখানে লৌকিকতা নেই, জাত নেই, ধর্ম নেই। নেই সম্পর্ক নামের প্রহসন। রাষ্ট্রের কঠোর আইনের ফাঁস নেই, সান্ত্রী নেই, সারাক্ষণ নরজরদারি নেই। খিদে আর লোভের পিছনে ছুটে নষ্ট করার জন্য কোনো জীবনদর্শন নেই। না থাকবে ইঁদুর দৌড়ের শিক্ষা, এগুলোকে বিজ্ঞাপিত করার কোনো ব্রতকেন্দ্রিক বিগ্রহও থাকবেনা যেখানে। আনুষ্ঠানিক আচার-সংস্কার, তত্ত্ব, ভক্তি, কর্ম, বৃত্তি, ব্যঙ্গ, প্রতিষ্ঠার উর্ধ্বে- যেখানে থাকবে অমূল্য পুষ্টি যুক্ত জ্ঞানসুধা বর্ষা, অকৃত্রিম খাদ্যশৃঙ্খল আর শুল্কহীন নিখিল সৃষ্টি জগৎ।

দেহতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, দয়ালতত্ত্ব, ভাবতত্ত্ব- নিদেন পক্ষে বাউল, মুর্শিদি, মারফতিও হতে পারিনি। আমার মত অনোভিযোজিত অনুন্নত জীবের জন্য বিচ্ছিন্ন কোনো প্রান্তরই আদর্শ। মন গেলে খাবো, যা জুটবে। মাঝরাত্রে গান গাইব গলা ছেড়ে, খালি গায়ে ঘাসের বিছানাতে শুয়ে আকাশগঙ্গায় পবিত্রতা খুঁজব। মাটিতে আঁক কষব দায় আর দায়িত্বের জটিল গনিতের, ‘নেই সম্পর্কের’ রসায়নের ইতিহাস গুলোকে শরীরের ভূগোল থেকে মিথ্যা বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টাতে- সময়কে ব্যবচ্ছেদ করব জৈবিক চাহিদার যুপকাষ্ঠে। আর সেই অলীক বলির অস্তিত্বহীন রক্তে এসবই দুকলম ‘অজ্ঞাত কুলশীল’ লিখে ফেলব নড়বড়ে অনভ্যস্ত হাতে, যেগুলো কেউ কখনও পড়বেনা কোনোদিনও।

সেই ছোটবেলায় জন্ম হবার দরুন বুদ্ধিটা যেটুকুই পেকেছে, তা এই বড় বয়েসে এসে। রোমহর্ষহীন একটা বৃত্ত, যা শুরু হতেই অন্তে পৌঁছে গিয়েছে, তাই বৃত্তান্ত হয়ে উঠতে পারেনি কখনই। স্বভাবতই, কাল থাকতে পড়াশোনা করিনি মোটেই। তার উপর আমার গায়িত্রী মন্ত্র-

পড়াশোনা করিবি, মরিবি দুঃখে

মৎস ধরিবি খাইবি সুখে

সুতরাং, বাল্যকাল থেকে জপা এই ইষ্টমন্ত্রই জীবনে একমাত্র জেঁকে বসে আছে নাছোরবান্দার মত। যা খুশি করি, পড়াশোনা ‘নৈব নৈব চ’।


()

কল্পনা করি, আমি থাকি- মনুষ্য কোলাহল মুক্ত রসিক বিলের এক পাড়ের ছোট্ট কুঁড়েতে। একটু দূরে গাঁয়ের ইস্কুলবাড়ি একতলা, ইস্কুলের আবাসিক ভবনটিও লাগোয়া, দ্বিতল বিশিষ্ট। সন্ধ্যায় লন্ঠনের নিভুনিভু আলো জ্বলে তাদের ঘরে। উপরে ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছের শামিয়ানা। আশেপাশে কয়েকটা ফলসা, চালতা, কামরাঙা, কুল, জাম, জামরুল আর বিলাতি আমড়ার ফলদায়ী গাছ। অনেক দূরে সীমানার কোনে জোড়া পাঁকুরের গাছ, সেখানে বহু পাখির বাস, দিনের বেলা এই গাছতলাতে অস্থায়ী দোকান বসে, আলুকাবলি, সিদ্ধছোলা, ঘুগনি, পাঁপড়, বারোভাজা আর শশা বিক্রি হয়।

সামনে একটা বাচরা খেলার মাঠ, তারপর ঢোলকলমি আর নিশিন্দার বেড়া দেওয়া একটা এঁদো ডোবা, এখানে মশার চাষ হয় প্রকৃতির তদারকিতে। দোতলাতে শিক্ষক আবাস, একলা দোকলা, কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে চার বা পাঁচকলা পরিবারও থাকে ওখানে। হয়ত তাদের আসা যাওয়া লেগে থাকে ওখানে। ইস্কুলের বাচ্চাদের বড় ভালো লাগে, মানুষের বাচ্চারা ঠিক মানুষ নয়, তারা যেহেতু মানবিক ক্লেদ, গ্লানি, লালসা আর রিপুর উর্ধ্বে- তাই তারা নিজেরা একটা আলাদা প্রজাতি- ছত্রাকের মত ক্ষনস্থায়ী ও পবিত্র

রসিক বিলের মাছ পাহারায় স্বনিয়োজিত রক্ষী আমি। এখন পচা ভাদর, ত্রয়োদশী চাঁদ হোক বা কন্যা, ভাদরের আদর নিতে মেঘের আড়াল থেকে সমানে উঁকিঝুঁকি দিয়ে যায় সামান্য ফুরসৎ পেলেই। মাঠের পাট, বিলের চারি পাড় বরাবর পচাতে দেয় এই সময়, উপরে কলা গাছের লাশ, বিলের কালো পাঁক আর ছটের দড়ির আষ্টেপৃষ্টে সোহাগের জড়াজড়িতে এক আশ্চর্য সহাবস্থান। একঘেয়ে মাছের আঁশটে গন্ধ, দুরের বাঁশবাগানে চ্যাংড়া ছোঁড়াদের গাঁজার উৎকট গন্ধে দুষিত বাতাস আর ইস্কুলের ছেলেদের হিসুর রাসায়নিক গন্ধের ভিড়ে, পচা পাটের গন্ধ- জীবনে একটু ভিন্নতা আনে প্রতি বছর এই সময়টা

পচা পাট মানেই চটুই পাখির সাইজের ডেঁয়ো মশা। জানিনা এগুলো মদ্দা না মেদ্দি। তবে কামরানোর আগে একটা বিনাকা গীতমালা শুনিয়ে বেশ সুড়সুড়ি দিয়ে তবেই প্যাঁক করে হুল ফোটায়, যতক্ষণ জেগে থাকি। এটাই সেই ‘বেশ ভাল আছি’ জীবন। অকৃতদার জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস খেলা প্রো-নিয়ানডারথাল প্রাইমেট আমি। এই পাণ্ডববর্জিত স্থান, তার উপর রাত্রের দিঘীর পাড়, জটপাকানো শালুকের ডাঁটির ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট শুভ্র সাদা রঙের চাঁদমালা ফুলে মৃদু হাওয়ার ঢেউ লেগে একটা ছন্দ খেলা করিয়ে যায়। ব্যাঙাচির দলেরা হইহই করে গোল্লাছুট খেলে কলমি লতা আর হেলেঞ্চার বনে।


()

মাদারের ডালে হাওয়া লাগে, বহলের বুকে কাঁপন ধরিয়ে। কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেলে, হিজলের বুকের জমাট অন্ধকার ঝড়ে পরে দীর্ঘশ্বাসের মত নিঃশব্দে। সামনেই শারদীয়া, বড় নল, কাশ আর খাগড়াদের সমাজে তাই সাজসাজ রব, বোবা বাতাসে বুক পাতলে তার গুনগুনানি শুনতে পাওয়া যায়। জারুল গাছের কান্ড বেয়ে ধুধুল আর গোয়াললতার পরকীয়া চলে প্রকাশ্য আঁধারে। একটা বেওয়ারিশ হাসনুহানা তার গন্ধ দিয়ে অবৈধ সম্পরর্কের নোংরা ইঙ্গিত দেয়। সেই ইঙ্গিতে কে কার কাছে কুহকিনীর মত ধরা দেয় জানিনা, আমার শুধু মশারাই একমাত্র সাথী। ওরা আমায় কামড়ে সুখ পায়, আমি ওদের তাড়িয়ে, অদ্ভুত অতীন্দ্রিয়বাদ। এভাবেই দিন কাটে মশাদের সঙ্গে সহাবস্থানে। কখনও ওরা আমাকে একা পেয়ে রক্ত খায় রীতিমত দলবেঁধে। ব্যাপারটা ক্রমশ একতরফা পর্যায়ে পৌঁছালে আমিও ওদের পিটিয়ে মারি, নিষ্ফল ক্রোধ এভাবেই নিষ্ক্রমণের পথ খুঁজে নেয় হয়তো। হৃদয়ের শরীর জুড়ে ছুঁয়ে থাকে দীর্ঘ শুষ্ক চাওয়ারা, মৃত উদ্ভিদের বাকলের মত। অনন্ত, অনন্ত ঘুমের আগে যার থেকে পরিত্রাণ নেই

কিছু রাতচড়া পাখির দল ভয় দেখানো গান গেয়ে যায়, মেঠো ইঁদুরের দলের এটা অফিস টাইম, চুড়ান্ত কর্মব্যস্ততা। অন্ধ ফড়িং এর দল ব্যাঙের খাদ্য হতে চেয়ে তিরতির করে উড়ে উড়ে যায় নক্ষত্রের কানা আলোর পথ বেয়ে। ভেজা মাটিতে সাপের খসখসানি শব্দ না উঠলেও নেউলের দৌরাত্ব টের পাওয়া যায়। জোনাকির পিছনের আলো দেখে ঝিঁঝিঁর দলের একটানা সমস্বরে মড়া কান্নার ফাঁকে- বাঁদুরের ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজে সম্বিৎ ফিরলে, দূর মাঠের মাঝে ক্ষুধার্ত শেয়ালের দলের বিলাপ শুনলে মনটা সেই কৈশরের ভাবনাহীন রাতগুলোতে ফিরে যায়। আবেগ আর অনুভবের বায়বীয় খাদ্যশৃঙ্খল যখন ‘আমিকে’ খেয়ে ফেলেনি, সেই মিষ্টি কৈশরের গন্ধ মাখা এই অন্ধ ভাদর আজও অপলক করে দেয়। গন্ধ শুঁকে শুঁকে চলে আসা একটা খোঁড়া নেড়ি এসে জলন্ত চোখ দেখিয়ে নিরবে বলে যায়- অন্ধকারের অধিরাজ্যে জেগে উঠা পৃথিবীতে ‘মানুষ’ বড়ই অনাহূত

মশা’য় কাটা, আমারই রক্ত খাওয়ার দাগ গুলো ছাড়া, আমার সারা শরীর বা জীবনে কোথাও বিন্দুমাত্র রঙ নেই। প্রেম আমার সধবার একাদশী, মৌনতা দিয়ে যৌনতার মন্থন নির্নয় করি দুর্বিপাকের পরিধি বরাবর। স্বমেহনে গৌন থাকা বিষয়সূচি কর্বুরিত সঙ্গমের লাবন্যে ঋদ্ধ হয় উদ্দীপিত রেতঃক্ষেপে। রাত্রে মাঝে মাঝে ছিপ নৌকা নিয়ে বের হই অন্বেষণে, টহল দিই দিঘীর চারি বেড়া। জিয়লের বনের ধারে মেছো ভুত, মামদো ভুতের উপদ্রব খুব বেশি, জেলেদের উপকথায় শুনেছি। তেনাদের আবছায়া শরীরের শীতলতা অনুভূত হয়, চোখ বন্ধ করলেই। বেম্মোদত্যি আছে কিনা জানিনা, অবিশ্যি তারা সাত্তিক ব্রাহ্মন, মাছ ছুঁয়ে দেখেননা, তবে গন্ধ নেন হয়ত।

আমি মনের সুখে পরিক্রমা করি, গুনগুন করে এক আধটা জারিগান, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া গানের কলিও ভাঁজি। শ্রমভার নেই, তাই লাঘবতা হীন চিত্তবিনোদনের জন্য এ বড় সরল সঙ্গীতের আয়োজন। আলকাপ, গম্ভীরা, ঝুমুর বা খাম্বাজ- আঁধারের পথে এই বড়লোকি মানায়না। নদীবিধৌত অরণ্যাকীর্ণ এই প্রান্তভূমে কাক চিল পানকৌড়ি মাছরাঙা ছাড়া কারো উপদ্রব নেই, যেহেতু এখানকার কোনো মালিকপক্ষ নেই তাই পাহারাও নেই আমি ছাড়া।

দিত সূর্যের সাথে আমার আজন্ম বিবাদ, সারারাত টো-টো করে ঘুরে বেড়াই হেঁটে বা ছিপ নিয়ে, তাই দিনে ঘুমাই। সকল শখ এখন ছিলিমে বন্দি করে অধ্যাত্মপিপাসা নিবৃত্ত করি


()

কোন একসময় বাইবেলে পড়েছিলাম, “পবিত্র আত্মার স্থায়ী শক্তি ব্যতীত, আমাদের প্রচেষ্টা দৈহিক এবং অকার্যকর”। আমার মাঝে আত্মা থাকলেও তাতে পবিত্রতা নেই, তাই অবশিষ্ট সবটুকুই দেহ। সেই দেহতে দুপুরের তপ্ত সূর্যের জুলুমে ঘুম ভাঙে, মশককুল সৃষ্ট রক্তের লাল ছোপ অংশে হাত চলে যায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। স্পর্শনাতীত চরাচর থেকে বাস্তবের নীল-সাদা ইমারতের দিকে নজর চলে আপনা হতেই, ইস্কুলবাড়ির দিকে। দেখা যায় কতগুলো অমেরুদণ্ডী প্রাণী বুকে হেঁটে চলেছে মস্তিষ্কহীন জেলিফিসের মত লালসার রসে চোবানো বিষাক্ত একটা দলাপাকানো চটচটে শরীর নিয়ে। এনারাই শিক্ষক।


জীবন হল একটি ত্রুটিপূর্ণ শক্তি, একটা শিল্প। শিল্পীর একমাত্র কর্তব্য সম্ভাব্য তাৎপর্যগুলির অনুসন্ধান চালানো, সুশৃঙ্খল প্রণালীতে যার কোন বৈধত্ব নেই। অননুকরণীয়ভাবে নিশ্চয়াত্মক প্রতিকল্প স্থাপন করতে কর্তৃত্ব লাগে, যা আজকের শিক্ষককুলের নেই। তারা নিজেদের ত্রুটিমুক্ত ও সম্পূর্ণ ভাবেন। নান্দনিকতার মাত্রায় সময়কে মাপা যায়না, এর জন্য বোধ দরকার, শৈল্পিক সুক্ষ বোধ। আমরা সকলেই শিল্পী, যখন আমরা অনুসন্ধান করতে শিখি, প্রশ্ন করতে শিখি, বিশ্লেষণের প্রচেষ্টা করি। আমরা ভুলে যায়- একজনের ন্যায়পরায়ণতার চোখে অন্যকে বিচার করা বিভ্রান্তিজনক, কারন প্রত্যেকের প্রেক্ষিত আলাদা। অথচ আমরা এটাকেই সামাজিকতার নাম দিয়ে সভ্যতা বানিয়েছি। তাই শিক্ষক শিল্পী হতে পারেননি কখনও। পুলিশের মত একটা আলাদা বর্গ বা প্রজাতি হয়ে গেছে সমাজে। সে যাই হোক-

এমনই এক সন্ধ্যায় সামনের শিক্ষকাবাসে হঠাৎই নতুন কেও এলেন বুঝি! একজন একলা মানুষ, একটি একলা দেহ। শিক্ষক সম্প্রদায়ের কি? হবেও বা। আমার ঘর নেই, শনের চালের নিচে বাঁশের মাচা, জানালা দরজার আড়ম্বর নেই। কিন্তু সেই একলা মানুষটির ঘর আছে, রমণীয় ভাদরে সেই ঘরের জানালা খোলা। সম্ভবত ছোট শহর থেকে আগত, তাই চিৎকার নেই। বিদ্যুতশক্তি বিহীন এই পাড়াগাঁ, কালিঝুলি মাখা টিমিটিমে লণ্ঠনের মায়াবি আলোতে একটা অবয়ব ধরা দেয়, কাঁধের নিচ পর্যন্ত ঝুলে থাকা খোলা চুল। বৈরাগী মন দ্রুত এবং সবলীল পদচারনার দৌর্মনস্য তন্ত্রে চর্মচক্ষুকে একক বানিয়ে, বিনুনির খোঁজে বাঁধা পরে যায় আবার। খুঁজে নিই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তুচ্ছ বিষয়- হাতে একটাই চুড়ি, বেশ মোটা, অবিবাহিত ধরে নেওয়ার মাঝেই ফলাগমের শক্যতা


()

অগত্যা, আমি অনাসক্তির উপরে পুনরায় অনাসক্তি এনে রোজ সন্ধ্যায় ওই অপরিচিতার ছায়ার মায়ায় পড়ে গেলাম। আমার মাচায় একটা কেরোসিনের কুপি ছিল বটে, কিন্তু কখনই জ্বালানো হয়নি, দরকারই ছিলনা। ব্যাটারি টর্চেই জরুরী কাজ মিটত। থাকার মধ্যে মুখের বিড়ি, তাতে উনার দৃষ্টি আকর্ষনের কোন সুযোগ ছিলনা। শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নাতে ঝলসে গিয়ে প্রেতাত্মা স্বরূপ ভৌতিক অবয়ব তার দৃষ্টি আকর্ষণে অক্ষম হলেও, আমার তরফে ক্রমে ভাললাগা অতঃপর ভালবাসা গড়ে উঠল; একতরফাই

তোমার এবং পৃথিবীর মধ্যে দ্বন্দ্বে পৃথিবী দ্বিতীয়”, মানে তুমি প্রথম আর আমি সর্বদা তৃতীয়

আমার অনুসন্ধায়ী ক্ষুধার্ত নাগরবাউল চিত্ত, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়ের উপরে পর্যবেক্ষণ শুরু করে দিলো। ফি’সন্ধ্যায় নিপুনতার সাথে পরিপাটী করে চুলের পরিচর্যা তিনি করেন, অনুমান করি- পোষাক পরিবর্তনও করেন জানালা খোলা রেখে নিভু নিভু আলোতে। উন্নত বক্ষদেশ, আহা। সুতনুকা কটিদেশ, লন্ঠনের মায়াবী আলোতে নেশা ধরিয়ে দেয়। এর পরেরটা বড় বেদনাদায়ক। উপুড় হয়ে শুয়ে হাতের ভরে শরীরটাকে কেমন উপর নিচে করতে থাকেন আধা ঘন্টা প্রায়। ব্যাপারটা পুরোটা বুঝিনা, প্রেম না থাকলে কৌতুহল মেটাতে জানালার ফাঁকে উঁকি দিতাম নিশ্চই, কিন্তু ভালবাসাকে ফাঁকি দিতে নারাজ; ফলত আমি ঝুঁকি নিতে পারলাম না। বরং সেই কষ্টে ঠোঁটে উঠে কাল্পনিক মোহন বাঁশি। ছিপের ধরাটির উপরে এলিয়ে দিই শরীরকে। কোনো সুর জানিনা, তবুও বাঁশি বাজে আপনসৃষ্ট সুরে। ওতে বিষাদ থাকে, তাই ওটা বিষাদসিন্ধুই হবে

কন্যা-ভগিনী-জননীরূপে পরিবারে নারীর অবস্থান সত্য, কিন্তু যাকে কেন্দ্র করে সংসার-সাগরে ভাবরাশি উত্থিত হয়- তা প্রণয়িনী রূপেই। যথাক্রমে, এর পর তিনি গৃহকর্ম সারেন একে একে, আমার অপলক দৃষ্টি তার প্রতি থাকে, অন্তরে বাজতেই থাকে বিষাদসিন্ধুর সুর। রাত বাড়ে, ক্রমশ ঘরের আলো নিভুনিভু হয়ে আসে, এরপর কেন জানিনা চঞ্চল পায়ে পদসঞ্চালনা করেন রোজ। কল্পনার কোন সীমা থাকেনা শুনেছি। আমার কল্পনাও তেমনি ডানা মেলে উড়ে চলে উর্ধ্বপানে।

জ্যোৎস্না রাতের মায়াবী চাঁদও কম্পিত হয় লাজে, ‘তুম্বা আর ডান্ডির’ প্রতিটা তারে পিছলে যায় গতস্পৃহ সুর, সেই লাজে মেঘের ঘোমটা টেনে নেয় শুকতারা, মিটিমিটি চায় আমার ঘুমঘুম চোখের দিকে। চমকে উঠি, হৃদয়ে তোলপাড়, শিহরিত হই মুহুর্মুহ। নবীন যৌবনের উন্মত্ত ঝঙ্কার, সেতারের তীক্ষ্ণ সুর ধৈর্যের প্রতীক হয়ে লুটোপুটি খায় বিলের জলে। অনবিল আনন্দেরা সৃষ্টি সুখের উল্লাসে বাজিয়ে চলে সুরের মুর্চ্ছনা। মধুর দমবন্ধ পরিস্থিতি যা একই সাথে পরমসুখ ও যন্ত্রনার, ক্রমে চেপে বসে বুকের উপরে। নিঃশ্বাসের জন্য হাহাকার করা সমস্ত চেতনা একাকার হয়ে যায় প্রকৃতি, আমি ও সেই কুহকিনীর সাথে।

অসমস্তরের প্রেমে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সামন্তপতি, তার প্রতিনিধি, বিত্তশালী, ক্ষমতাধর, রূপতৃষ্ণা, প্রণয়বাসনা, কামপ্রবৃত্তি ইত্যাদি অনুগামী হয়ে চলে আসে। অত্যাচার, শোষণ, নির্যাতন, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, কৌলীন্য, রক্ষণশীলতা, আভিজাত্যের অহঙ্কার, ইন্দ্রিয়াসক্তি, সম্ভোগপ্রিয়তা, বহুগামিতা এমন শব্দের দল ক্ষতবিক্ষত করে তোলে আত্মাকে। যেন একমাত্র মহাজাগতিক অস্তিত্ব আমি, বাকি সব ভ্রম। এই দ্বন্দ্বে নির্ভার প্রেমের তন্ত্রী ছিঁড়ে যায় উপচানো মায়া বিছানো উঠোনে, অন্তরঙ্গ মুহুর্তেরা হাহাকার করে উঠে

কোন এক বিখ্যাত জনের বানী শুনেছিলাম, আরেক জ্ঞানগম্যিওয়ালা মানুষের কাছে, সেটা এ রকমঃ-
ক্ষুধা ও সৌন্দর্যবোধের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে-সব দেশে অধিকাংশ মানুষ অনাহারী, সেখানে মাংসল হওয়া রূপসীর লক্ষণ; যে-সব দেশে প্রচুর খাদ্য আছে, সেখানে মেদহীনতাই সৌন্দর্য্য”।

সেহেতু ওই অপরিচিত সান্ধ্যকালীন আবছায়াটা ঈষৎ চর্বিযুক্ত হলেও, আমার পিরিতসুখের অনাহারী দৈন্য দশাবস্থাতে, যে শুধু মাত্র মশার সাথে সহবাস করে করে, এই মাংসল ছায়াচিত্র আমার মন জগৎকে যথেষ্ট প্রেমাশিক্ত করত। এমনিই চলে কয়েক পক্ষকাল জুড়ে


()

রোববার, ছুটির দিন। বাবুরা নিজেরা ‘থলে আর চাকর’ নিয়ে বাজারে আসেন। আমার অপরিনত ঘুম ভেঙে যায়, ভোরে বিলের জলে জাল ফেলে বাগদী জেলে মহিলারা, সেই মাছ বাজারে যায়। কাজকর্ম থাকেনা, তাই ওই দিন বাজারে আমিও যায়, সংসার পিরীত মানুষ দেখে নিজেকে সুখী ভাবি। শিক্ষকাবাসের অবিবাহিত শিক্ষক শিক্ষিকার দল সাধারনত বাড়ি ফিরে যায় ছুটির দিনে। আজ দেখলাম একজন রয়ে গেছেন, এসেছেন বিলের তাজা সরপুঁটি কিনতে। নতুন মানুষ, আগে দেখিনি। বরেন বাবু এলাকার রেশন ডিলার, ইস্কুলের সেক্রেটারিও বটে। নানান কথাবার্তার ফাঁকে আমার উদ্দেশ্যে তিনিই বললেন- হ্যাঁরে, ইনাকে চিনিস!

- আমি মাথা নাড়লাম। না চিনিনা

- আরে ইনি আমাদের ইস্কুলের নতুন শরীরশিক্ষার মাষ্টার মশাই। এই তো মাস খানেক আগে এসেছেন। মেদিনীপুর থেকে, খুব ভাল মানুষ


আমি খেয়াল করলাম, কি শক্তপোক্ত চেহারা, বুকের দিকটা চওড়া, কোমর সরু, পাক্কা পালোয়ান মার্কা। গালে হালকা দাড়ি, পুরু ঝাঁটার মত গোঁফ। আর দেখলাম প্রসারিত রোমশ হাতে একটা পাঞ্জাবী স্টাইলের স্টিলের বালা, আর দুই বাহুজুড়ে কত কি সব ভয়ঙ্কর উল্কি আঁকা। দেখাই কেমন সম্ভ্রম জাগে মনে

- তুমিই কী সন্ধ্যাবেলা গান গাও বিলের ধারের মাচাতে?

- আজ্ঞে হ্যাঁ, তা গাই বৈকি

- কি নাম আপনার?

- আজ্ঞে মশা, ইয়ে মানে … আমাকে গানওয়ালা বলেই নাহয় ডাকবেন

- তা বেশ তা বেশ, আমি আপনার ওই মাচা ঘরের কোনাকুনি ইস্কুলবাড়ির আবাসনে থাকি। প্রাণ খুলে গলা সাধেন কিন্তু, খুব ভাল লাগে। আমি ডন বৈঠক দেওয়া থেকে, খেয়ে দেয়ে পায়চারি করার সময় অবধি সময় রোজ শুনি। খুব খুব সুন্দর।


বলতে বলতে, একটা মুচকি হেঁসে উনি সেক্রেটারি বাবুর সাথেই চলে গেলেন। আর আমি খেয়াল করলাম, ওই পালোয়ানের মাথায় বেশ লম্বা চুল, ঘাড়ের নিচ পর্যন্ত ঝুলেছে। তাতে আবার ছোট ছোট বিনুনি বাঁধা।


বাকিটা আর নিজেকেও কখনো শুধাইনি।


()
বিলাসিতা কাকে বলে জানেন!

বিলাসিতা হচ্ছে, আমাদের অন্তর যা পছন্দ করছে নিষ্কলুষ ভাবে, কাউকে আঘাত না করে, কাউকে ক্ষতি না করার মাঝে বিলাসিতার আসল বাস। হয়ত বোকাবোকা, কিন্তু বিলাসিতা মানে যে নিজেকে সম্মানিত করা। বিলাসিতা হচ্ছে পরিবারের সঙ্গে থাকা। বিলাসিতা হচ্ছে সন্তানদের সাথে কাটানো সময়গুচ্ছ। কী কে চি বলার মাঝে, ককোলির মত অর্থহীন শব্দে, না কে লা উচ্চারনে কিম্বা মিঠি শব্দের ওমে- এগুলো আমার একান্ত নিজশ্ব বিলাসিতা। যা মূল্য দিয়ে খরিদ করা যায় না

দামি ঘড়ি, মোবাইল বা অলঙ্কারে বিলাসিতা খোঁজা অর্থহীন। অর্থ কিম্বা নৌকার পালে বিলাসিতা নেই। বিলাসিতা হল প্রাণ খুলে হাসতে পারার কারনে, সুখী হওয়ার নির্দিষ্ট উপাদান না থাকার মাঝে। বিলাসিতা থাকে বন্ধুত্বে। বিলাসিতা মুখের পেশিতে খেলে যাওয়া মিষ্টি হাসির ঝিলিকে। আশ্লেষ আলিঙ্গন এবং বুকভরা শ্বাসে নেওয়া দীর্ঘ চুম্বনে। দোকানে বিলাসিতা কেনা যায়না, উপহারের মাঝেও বিলাসিতা নেই। অন্যের ক্ষতি না করে অন্তরে যা কিছু সুখানুভব পৌঁছে দেয়, সেটাই বিলাসিতা। জাঁকজমক আসরে বিলাসিতা খুঁজে ফেরা আপনি যদি একবার একাকীত্বের মাঝে নিজেকে খুঁজে পেয়ে যান, দেখবেন সেই যাপনের মাঝে কি ধরণের স্বর্গীয় বিলাসিতাটাই না রয়েছে।

আবার ফিরে আসি বাস্তবে, কোলাহল কল্লোলিনীর কোলে। দায়ে পরে, পালিয়ে যাওয়ার অনুষঙ্গ পেতে, একা হয়ে যাওয়ার অজুহাত খুঁজতে

সকলে পারেনা মুক্তি পেতে, আমিও সেই দলেই। তাই মনোজগতে বিচরণ করি স্বপ্নবিলাসী হয়ে। চুম্বনহীন প্রেম গণিকার জীবিকা, এতে ভালবাসা থাকেনা। ভালবাসা বিলাসিতা নয়, এটা আবশ্যিক। এটা সমাপ্তিবিহীন, কেবলমাত্র একটি তাৎপর্য মূলক পদ্ধতি, যার কোন সীমাবদ্ধতা নেই। রসিক বিল, বাঁশের মাচা, চাঁদমালা ফুল, মেছো ভুত আর নরম আলোয় দেখা আবছা মুর্তিতে খুঁজে ফিরি বিলাসিতা, হোকনা স্বপ্ন- তবুও বিলাসী হওয়ার মাঝেই তো সুখ, কল্পনার ইতি বৃত্তান্ত। এটাই জীবনের কবিতা



ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...